রিয়া ভট্টাচার্য

|| তার চোখের তারায় ||
মাথার ওপরে জ্বলতে থাকা একশো ওয়াটের বাল্বটার ম্লান আলো দশফুট বাই দশফুটের ঘরখানাকেও সম্পূর্ণ আলোকিত করে উঠতে পারছে না। বাল্বের কাচে ধুলো জমেছে, পরিষ্কার করা হয়ে ওঠেনি বহুদিন। ঝাপসা হলুদ আলো যেন মৃত মানুষের চোখের মতো থমকে রয়েছে। এই ঘরে জীবনের হদিশ পাওয়া বৃথা।
পারাওঠা আয়নায় নিজের ধূসর প্রতিবিম্ব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে পিয়ালি। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরেছে সে। বাড়ি বলতে ছোট দু’খানা ঘর, প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য একচিলতে স্থান৷ এছাড়াও রয়েছেন নিত্য কলহরত একজোড়া দম্পতি। আকণ্ঠ মদের নেশায় ডুবে থাকা বাবা নামক মানুষটি নেশার ঘোরে শীর্ণকায় মাকে পেটাচ্ছেন। ওঘর থেকে এঘরে প্রতিটি প্রহারের শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু মা নামক মানুষটি কোনওরকম চিৎকার করছেন না। পিয়ালি জানে, তিনি এখন দু’চোখে অজস্র ঘেন্না নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর স্বামী নামক প্রাণীটির দিকে। আদপে স্বামী কী!
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে পিয়ালি। মা ও বাবার বিয়েই হয়নি কখনও। তাঁরা একসঙ্গে থাকেন, একান্ত অভ্যাসে। মায়ের কথা অনুযায়ী, তার জন্মের আগে ঠিকই ছিল সবকিছু, দুইজনে জড়িয়ে ছিলেন প্রেম নামক অবোধ সম্পর্কের আশ্বাসে। কিন্তু তারপর...
আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একদলা ঘৃণা যেন দলাপাকিয়ে উঠে আসতে চায় পিয়ালির গলা বেয়ে। নিজের দিকেই সে উগরে দেয় থুতু। তার বাবা তাকে স্বীকার করেন না নিজের মেয়ে হিসাবে, মাকেও কখনও এর প্রতিবাদ করতে দেখেনি সে। বরং তার জন্মের পরে মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা কমে যাওয়ার শোকেই মুহ্যমান ছিলেন তিনি। দায়ী হয়েছিল একজনই, পিয়ালি। শিশুকাল থেকে অনাদর ও অবজ্ঞা তার নিত্যসঙ্গী। নেশাতুর বাবার প্রহার, মায়ের উদাসীনতা তাকে ঠেলে দিয়েছে একাকিত্বের গহীন অন্ধকারে। বাবা মায়ের অশান্তির জন্য প্রতিবার বাসা বদল করতে হয়েছে তাদের, বিরক্ত হয়ে দরজা দেখিয়েছেন বাড়িওয়ালা। নিত্য ঠাঁই এর জন্য ছোটাছুটি করতে করতে কোথাও আর শেকড় গজানো হয়ে ওঠেনি। এসবের জন্য পিয়ালির পড়াশোনাও গোল্লায় গিয়েছে কবেই। এখন দুই স্টেশন পার করে একটি বিউটি পার্লারে কাজ করতে যায় সে। মাইনেটা ভালোই দেয় তারা। পিয়ালির কাজের হাত আছে৷ তার নরম হাতের স্পর্শে কাস্টমাররা অভিভূত হয়, বারবার তার কাছেই ফেসিয়াল, ম্যানিকিওর পেডিকিওর এর জন্য আসে। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও জীবনের শিক্ষায় শিক্ষিত সে। কিন্তু তার কোনও শিক্ষাই তাকে বুঝিয়ে উঠতে পারে না কেন নিত্য বাবার প্রহার ও গঞ্জনা মুখ বুজে সহ্য করেন মা! কেন শুধুমাত্র বাবার অপছন্দ বলেই নিজের গর্ভজাত সন্তানের প্রতিও অসীম উদাসীন তিনি! এ কী ভালোবাসা নাকি বেদনা বিলাস! কই সেই সন্তানের রোজগারের টাকা হাত পেতে নিতে তো কোনও সমস্যা হয় না তাঁর! তিনজনের ছোট্ট সংসারের অধিকাংশ আর্থিক দায়িত্বই এখন পিয়ালির কাঁধে। মদ খেয়ে খেয়ে শরীর গিয়েছে বাবার, আজকাল মাঝেমধ্যেই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আবার যে কে সেই! মা তিনবাড়ি রান্নার কাজ করেন। সেই টাকার অধিকাংশই কেড়েকুড়ে নিয়ে নেন বাবা। নেশার খরচ চালাতে হয় যে!
মাথা গলিয়ে কামিজটা খুলে তক্তপোশের ওপরে ছুঁড়ে দেয় পিয়ালি। নিজের শরীরের কাটা অংশগুলিতে আলগোছে হাত বোলায়। তার সারা শরীরে অজস্র কাটা দাগ। সবগুলিই তার নিজের সৃষ্টি, অবহেলার ক্ষত। জীবনের সাতাশটা বছর ধরে বয়ে চলা অজস্র অপমান তার শরীরে ক্ষতচিহ্ন হয়ে জ্বলজ্বল করছে। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে এক অদ্ভুত আনন্দ পায় পিয়ালি। নিজের রক্ত তাকে তৃপ্তি দেয়, মুছিয়ে দেয় পারিবারিক নির্যাতন। কিন্তু আজ...
নিজের কবজির কাছটায় আলগোছে হাত বুলোয় পিয়ালি। তার মনে আছে বড্ড গভীর হয়ে কেটেছিল এইখানটা। রক্ত বেরোচ্ছিল ফিনকি দিয়ে৷ কিন্তু এখন, সব একেবারে পরিষ্কার। কোনও ক্ষত নেই, নেই কোনও দাগ। কিন্তু কী করে!
ভাবতে গিয়েই একজোড়া নীল চোখের তারা ভেসে ওঠে পিয়ালির স্মৃতির পাতার। একজোড়া মায়াতুর নীল চোখ... এত ভালোবেসে কেউ তো কখনও তাকায়নি তার দিকে! মানুষের চোখে ঘৃণা আর লোভ দেখে অভ্যস্ত পিয়ালি, সেই দৃষ্টিগুলো তার ভেতরে কোনও প্রভাব সৃষ্টি করে না। কিন্তু এই মায়াভরা দুই চোখ, কিছুতেই তাদের ভুলতে পারছে না পিয়ালি। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে ওই দুইচোখের পাতায়। সে জানে ওই দু’চোখ তার স্বপ্ন নয়, অশনায়া স্বপ্ন নয়, বরং স্বপ্নের মতো সুন্দর বাস্তব।
“তুমি কেন বাঁচালে আমায়! আজ মরে গেলে কত ভালো হত বলো তো! রোজ মা-বাবার অশান্তি, তাঁদের চোখে নিজের জন্য ঘেন্না দেখতে হত না, দেখতে হত না নিত্য পার্লারে আসা লোকগুলোর চোখে মাংসাশী লোভ! অবশ্য, আজ তুমি আমায় না বাঁচালে তোমায় দেখতে পেতাম কি! কিন্তু, অমন মায়াভরা চোখে কেন দেখছিলে তুমি আমায়! জানো না, আমার ভয় করে! কেউ কখনও এভাবে দেখেনি আমায়! তোমার দৃষ্টি যেন আমার আজীবন সৃষ্টি করা ক্ষতে একটুকরো ওষুধের মতো, নিজের অজান্তেই তোমার দৃষ্টির জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছি আমি। তোমায় কি আবার কখনও দেখতে পাব অশনায়া! তুমি কি আর আসবে আমার সামনে! তোমার নামটা এমন অদ্ভুত কেন বলো তো! আর কী করে আমার কবজির ক্ষত সারিয়ে দিলে তুমি! তবে কি আমার শরীরের বাকি ক্ষতগুলোও সারাতে পারবে তুমি! আর আমার মনের ক্ষত! পারবে তুমি অশনায়া! কেন এত দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায় বলো তো! কেন মনে হচ্ছে, তোমার ওই চোখের তারায় আমার সবটুকু লুকোনো রয়েছে! আমি... আমি মন্দ অশনায়া, খুব খুব খারাপ, তুমি কি ফিরবে আমার কাছে!”
নিজের মনেই বিড়বিড় করে পিয়ালি। জিভ দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট চেটে নেয়। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে তার, সেই দুপুরের পর আর খাওয়া জোটেনি। রাতে মা রান্না করেননি আজ। মাঝেমধ্যেই রান্না করতে ভুলে যান তিনি, মদের নেশায় চুর বাবার খাওয়ার কথা মনে থাকে না। কোনও কোনওদিন নেশার ঘোরে খাবারদাবার উলটে ফেলে দেন তিনি, সেদিনও জল খেয়ে শুয়ে পড়ে সে।
তেলচিটে তক্তপোশের গভীরে মিশে যেতে যেতে অশনায়ার কথা ভাবে পিয়ালি। জীবনে প্রথমবার বড্ড লোভ হয় তার। বাঁচতে লোভ হয়। কালো পোশাকের অসামান্যা সুন্দরীর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয়, নিজের সব ক্ষতচিহ্ন খুলে দেখাতে তাকে, সে জানে ওই মেয়ে ছুঁয়ে দিলে সেরে যাবে তার সব ক্ষত। ম্যাজিকের মতো!
আধখোলা জানলাটা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে আসছে, সেইসঙ্গে ভেসে আসছে সোঁদা মাটির গন্ধ। পাশের ঘর থেকে আর কোনও শব্দ ভেসে আসছে না। মনে হয় মারধোর শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন বাবা। মা এখন মুখে আঁচল চাপা দিয়ে শব্দহীন হয়ে কাঁদছেন। শব্দ হলে বাবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে তো! তেলচিটে গদির তলা থেকে চকচকে ব্লেডটা হাতে তুলে নেয় পিয়ালি, নিজের শরীরের আনাচে কানাচে ক্ষমাহীনভাবে ব্লেড চালায়। ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু রক্ত। নিজের রক্তের গন্ধে ঘুম আসে তার, শরীরে ভিড় করে আসে ক্লান্তিসুখ।
বিছানায় শুয়ে মাথার ওপরে টালির চালের দিকে চেয়ে থাকে পিয়ালি। একটু আগেই ঝুপ করে একটা শব্দ হয়েছে চালে, বাঁদর টাঁদর হবে হয়তো!
নিরবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির শব্দ সঙ্গী করে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে সে। তার বসনহীন শরীরটা দলাপাকিয়ে পড়ে থাকে তক্তপোশের ওপরে। জানলার ফাঁক দিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকে একজোড়া চোখ, একজোড়া নীল চোখ। পিয়ালির শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলি দেখে সেই চোখ জলে ভরে আসে। অদ্ভুত পাখির ডাকের সুরে ফুঁপিয়ে ওঠে সে। জানালার গরাদে চেপে বসে তার ফরসা আঙুল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন