যুদ্ধ ও তার পরিণতি

রিয়া ভট্টাচার্য

|| যুদ্ধ ও তার পরিণতি ||

অন্ধকারের অন্তরালে নিজেদের লুকিয়ে শ্বাপদের মতো অপেক্ষা করছে অশনায়া, নোয়ি ও জাভেদ৷ তাদের তিনজনের মধ্যে একমাত্র জাভেদই বড্ড বেশি অধৈর্য। মাঝে মাঝেই বাতাসে নিজের চেরা জিভ বের করে কারও উপস্থিতি জানার চেষ্টা করছে সে। বদলে নোয়ির গাঁট্টা জুটছে মাথায়। নিজের শ্বদন্ত বের করে বারকয়েক নোয়িকে ভয় দেখিয়েছে সে, নোয়ি পাত্তা দেয়নি৷ মানুষরূপী জাভেদ একেবারেই ভয় পাওয়ার মতো নয়৷

“দুর্গ থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছিলি তুই! এত দেরি হল এখানে আসতে!”

ফিসফিস করে অশনায়াকে প্রশ্ন করে নোয়ি। বদলে কড়া দৃষ্টির সম্মুখীন হতে হয় তাকে৷ নোয়ির কৌতূহল বরাবর বেশি, অশনায়ার সামনে তা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়৷

“কোনও মানুষের সঙ্গে দেখা করতে৷”

নির্বিকার গলায় উত্তর দেয় জাভেদ। দুই বন্ধু চমকে তাকায় তার দিকে, নোয়ির মুখে হালকা হাসি খেলে যায়।

“তুমি কী করে জানলে!  কীসব বলছ!”

চাপা গলায় হিসহিসিয়ে ওঠে অশনায়া।

“সোজা কথা৷ আমি মানুষ ও তাদের রক্তের গন্ধ চিনি৷ পুরুষ ও নারীতে ভেদাভেদ করতেও সমস্যা হয় না। তুমি যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে সে একজন নারী।”

শান্তস্বরে বলে জাভেদ। তার অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন হয় না।

“কী বলল পিয়ালি?”

হালকা গলায় জানতে চায় নোয়ি। স্তম্ভিত অশনায়া উত্তর দিতে পারে না, গলা শুকিয়ে যায় তার। তাকে আর একটু অপ্রস্তুতে ফেলার জন্য কিছু বলার জন্য মুখ খোলে নোয়ি, কিন্তু দূরের জঙ্গল থেকে ঝরা পাতা মাড়াবার খসখস আওয়াজ পেয়ে কথাগুলো গিলে নেয় সে। তিনজনের মেরুদণ্ডই ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো টানটান হয়ে যায়। দম চাপা অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করে তারা। তাদের সামনেই ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় জনা সাতেকের একটা দল। পুরুষ ও নারী মিলিয়ে দলটি গঠিত। প্রত্যেকের পরনে কালো রঙের হুডতোলা আলখাল্লা। ম্লান মোমবাতির শিখা জ্বেলে একে অপরের পেছনে পথ চলেছে তারা, যেন আওড়াচ্ছে কোনও নিষিদ্ধ মন্ত্র। মনে মনে হাসে অশনায়া। পিতা খামোখাই বিপর্যস্ত বোধ করছিলেন। এই সাতজনকে মারতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না তাদের, এমনিতেই এরা বড় দুর্বল।

অশনায়ার ভাবনা যে কতখানি ভুল জানা যায় একটু পরেই। হঠাৎ তীব্র আলোর স্রোত আছড়ে পড়ে তাদের ওপরে, আলোর সামনে কুঁকড়ে যায় অন্ধকারের জীবরা। তাদের ঘিরে দাঁড়ায় সাতজনের দলটা। তাদের হাতের মোমবাতি দপদপ করে জ্বলে, তাদের শ্বদন্ত বিকশিত হয়।

“বড্ড ভুল করেছ আমাদের এলাকায় এসে। কী ভেবেছ, জানতে পারব না আমরা! তোমাদের একজনের শরীরে মানুষের গন্ধ অনেক দূর থেকেই পেয়েছি আমরা। ইচ্ছে করেই দেখা দিয়েছি তোমাদের, যাতে তোমাদের রক্তে তৃষ্ণা মেটাতে পারি। মূর্খ অন্ধকারের জীব, রক্তপিশাচদের সঙ্গে মাত্র তিনজন লড়াই করতে এসেছ!”

নোয়ির পেটে লাথি কষিয়ে বলে এক পুরুষ রক্তপিশাচ। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা গড়ায় লোভে৷ জাভেদের তীক্ষ্ণ ঝিনঝিন আর্তনাদে কানে তালা ধরে যায় অশনায়ার। ধীরে ধীরে নিজের শক্তিকে দৃঢ় সংবদ্ধ করে সে। তার শরীর থেকে বের হয় গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার। একটু একটু করে আলোকে গ্রাস করে নিতে শুরু করে অন্ধকার। কী হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই নোয়ির ছুরির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে এক রক্তপিশাচ। তার রক্তে কালো হয়ে পুড়ে যায় অরণ্যের জমিন, ধোঁয়া ওঠে। হুঙ্কার দিয়ে দুইজন রক্তপিশাচ নারীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাভেদ। হিলহিলে শরীর দিয়ে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে তাদের শরীর। হাড় ভাঙার মটমট শব্দ হয়। নিজের ভেতরের গরল এক পুরুষ রক্তপিশাচের ওপরে বমি করে দেয় জাভেদ৷ মুহূর্তে ভষ্মে পরিণত হয় সে।

বাকি দুইজনকে দুইহাতে ধরে মাটি থেকে বেশ খানিকটা ওপরে তোলে অশনায়া। অন্ধকারে ঝলসে ওঠে তার ব্লেডের মতো তীক্ষ্ণ কালো নখ ও শ্বদন্ত। নিজের নখ তাদের গলায় নির্মমভাবে গেঁথে দেয় সে, তীব্র আর্তনাদে কেঁপে ওঠে সমগ্র অরণ্যরাজি। অশনায়ার নখ বেয়ে রক্তপিশাচের রক্ত গড়িয়ে আসে তার হাত বেয়ে বাহুতে। তীব্র জ্বালা করে। সে পাত্তা দেয় না। মাত্র কিছুক্ষণ, দুইজন রক্তপিশাচের প্রাণহীন দেহ আছড়ে পড়ে জমিনে। বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজের অন্তরের দানবকে শান্ত করার চেষ্টা করে অশনায়া, কিন্তু একটি আর্তনাদ তার সমস্ত পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়। পায়ে পায়ে পেছন ফেরে সে। আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায় তার হৃদয়। অরণ্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে আরো দুই রক্তপিশাচ, এক পুরুষ ও এক নারী। তাদের হাতের তীক্ষ্ণ ছুরিকা তাক করা রয়েছে এক মানবীর দিকে, পিয়ালির দিকে। আতঙ্কে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে তার। অশনায়াকে দেখে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার দুই চোখ বেয়ে।

“আমরা জানি এই নারী তোমার সঙ্গিনী। দুর্ভাগ্যবশত সে আমাদেরই সন্তান। মানুষ হিসেবে কখনও আমাদের কাজে না এলেও আজ কাজে লাগবে সে। অন্ধকারের রানি নিজের সঙ্গিনীকে বাঁচাবার জন্য নিজের স্বজাতিকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়, নাকি নিজের স্বজাতিকে বাঁচাবার জন্য নিজের সঙ্গিনীর মৃত্যু নিজের চোখের সামনে দেখে। ভালোবাসা তোমায় কোথায় নিয়ে যাবে অশনায়া! বলো বলো!”

বীভৎস অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে পিয়ালির গলায় ছুরি ধরে রাখা নারী।

“মা!”

কাঁদতে কাঁদতে মুখ খোলে পিয়ালি। বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চমকে ওঠে অশনায়া। এরা পিয়ালির মা-বাবা! রক্তপিশাচ! শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত নামে তার।

“কী ভেবেছিলে! তুমি আমাদের বাড়িতে আসবে জানতে পারব না আমরা! আমাদের অপদার্থ পাগল মেয়ে এই প্রথম কোনও ভালো কাজ করেছে। তার পুরস্কারস্বরূপ তাকেই বন্দি করে নিয়ে এসেছি আমরা। দারুণ না!”

হালকা হেসে বলে মধ্যবয়সী পুরুষ, যার ছুরির ডগা ছুঁয়ে রয়েছে পিয়ালির পেট।

“একটা আঁচড় পিয়ালের গায়ে পড়লে তোমাদের অস্তিত্ব এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে মুছে দেব আমি, এটা অশনায়ার অঙ্গীকার। নিজেদের বাবা মা বলে দাবি করো তোমরা! তোমাদের জন্য কতখানি ভুগতে হয়েছে তাকে আন্দাজ আছে! তাতেও খিদে মেটেনি তোমাদের!”

দাঁতে দাঁত চিপে ঘৃণা উগরে দেয় অশনায়া।

“এই মেয়ে আমার নয়!”

গর্জে ওঠে মধ্যবয়স্ক পুরুষ রক্তপিশাচ৷

“ঠিক তাই। আমরা আগে মানুষ ছিলাম। অনেক বছর আগে স্বামীর উদাসীনতায় হতাশ এক গৃহবধূ এক রক্তপিশাচের প্রেমে পড়ে তার সন্তানের জন্ম দেয়। পরে একদিন রক্তের আকাঙ্ক্ষায় সে তার স্বামীকেও রক্তপিশাচে পরিণত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার জন্ম দেওয়া শিশুটি পিশাচ নয়, মানুষ রূপেই জন্মায় ও বেড়ে ওঠে৷ এক অপদার্থ সন্তানের রক্ত খাওয়ার ইচ্ছে আমাদের হয়নি৷ তাই বেঁচে গিয়েছিল সে। ভালোই হয়েছিল। সে না থাকলে অন্ধকারের রানিকে চোখের সামনে দেখতে পেতাম কি আমরা!”

হাসতে হাসতে বলে রক্তপিশাচ নারী। তার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রথম সাতজনের মধ্যে বেঁচে যাওয়া রক্তপিশাচটি লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তার বুকে গাঁথা নোয়ির ছুরি।

সঙ্গীর পরিণতিতে উৎকণ্ঠিত দুই রক্তপিশাচের হাত কেঁপে যায়, ফলতঃ হাতে ধরা তীক্ষ্ণ ছুরিকা চিরে ফেলে পিয়ালির গলা ও পেট। তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ে সে। অশনায়ার চারপাশটা হঠাৎ করে যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার চিরে ভয়ার্ত পাখির দল বাতাস কেটে কিচিরমিচির শব্দে উড়ে চলে। আকাশে হঠাৎ করে জড়ো কালো মেঘ, ঢেকে যায় চাঁদ ও তারা দল।

তীব্র আর্তনাদ করে নিজের দুই হাত দেহের দুইপাশে মেলে ধরে অশনায়া, বাতাস কাটিয়ে ঝাপটা দেয় তার দুই কালো ডানা। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ে। মেঘের বুক চিরে নেমে আসা বিদ্যুৎরেখা অশনায়ার দুই হাতের তালুতে সৃষ্টি করে অগ্নিবলয়। দুই রক্তপিশাচকে লক্ষ্য করে সেই বলয় ছুঁড়ে দেয় সে। জীবন্ত দগ্ধ হয়ে যায় তারা। তাদের মরণ আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে যায়।

মাটিতে পড়ে থাকা পিয়ালির রক্তাপ্লুত দেহটি কোলে নিয়ে ঝাঁকুনি দেয় অশনায়া৷ কোনওক্রমে খুঁজে নিতে চায় তার প্রাণের স্পন্দন। পায় না৷ হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে পিয়ালির। অশনায়ার পিয়ালের, তার সঙ্গিনীর। মাথার ওপরে যেন ভারী পাথর খসে পড়ে অশনায়ার। পিয়ালির নিস্পন্দ শরীরটাকে পাঁজকোলা করে উঠে দাঁড়ায় সে। বাতাস কেটে ঝাপটা দেয় তার ডানা। নিজের সঙ্গিনীকে বুকে নিয়ে আকাশে ওড়ে অন্ধকারের রানি।

“পিয়াল! পিয়াল! দেখো, আকাশ থেকে কতো ছোট মনে হয় পৃথিবীকে৷ কত সহজেই পেরিয়ে যাওয়া যায় জনবহুল রাস্তা, বাড়ি ঘর। এই দৃশ্য তোমার বড্ড পছন্দ হবে পিয়াল৷ একটিবার তাকাও চোখ খুলে৷ আমায় ছেড়ে যাবে না কথা দিয়েছ তুমি। নিজের কথা রাখো পিয়াল। তোমার কিছু হলে আমি হারিয়ে ফেলব নিজেকে৷”

নিজের মনে বিড়বিড় করে অশনায়া। অশ্রু তার গাল ভিজিয়ে নেমে আসে এই প্রথমবার। প্রমাণ করে অন্ধকারের ভালোবাসা, আলোর জন্য। অন্ধকারের বুকেই আলো সবচেয়ে ভালো করে ফুটে ওঠে যে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%