শৈলেন ঘোষ

বন-রাজ্যের সব মানুষই যে বন্য, সে-কথা না বললেও কে না জানে! বন্য যেমন চেহারায় আর স্বভাবে, তেমনই হাঁটা-চলায়, খাওয়া-শোওয়ায়, সাজগোজে। কাজেই গুপ্তচরকেও ভোল পালটাতে হল। বনের মানুষ যেমন পোশাক পরে, সেই পোশাক গুপ্তচরও পরল। পরে গভীর রাতে বনের পথে পা বাড়াল। গভীর রাত ছাড়া উপায় কী! কে না জানে লুকিয়ে-ছাপিয়ে শহরের সীমানা পেরিয়ে অন্ধকারে বনে না-ঢুকলে, শত্রু প্রহরীর নজর এড়ানো দায়! আর, একবার শত্রুর নজরে পড়ে গেলে মৃত্যুর হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তবে শত্রুর চোখে ধুলো দিয়ে ঢুকে পড়তে পারলে, তখন নিশ্চিন্ত।
গুপ্তচর পারল। অন্ধকার রাতেই সে শত্রুর ডেরায় ঢুকে পড়ল। আর ভাবনা কী! একবার যখন ঢুকে পড়েছে তখন কে গুপ্তচর, আর কার বিদেশে ঘর, সে নিয়ে কে আর মাথা ঘামাচ্ছে! তার ওপর তোমার সাজপোশাক যদি হয় সে-দেশের মানুষের মতো, তখন তোমাকে সন্দেহই-বা করছে কে!
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বনে ঢোকা না-হয় সহজ হল, কিন্তু এবার সে অন্ধকারে যাবে কোনদিকে?
না, অন্ধকারে বোকার মতো বন হাতড়ানো কোনও কাজের কথা নয়। গুপ্তচর ভাবল, সকালের রোদ না-উঠলে তার পক্ষে কিছু করাও সম্ভব নয়। কাজেই, এইখানেই এখন তাকে বিশ্রাম করতে হবে। এই কথা ভেবেই সে যখন একটা পছন্দমতো গাছের আড়াল খুঁজছে, তখনই বুকটা তার ধড়াস করে উঠেছে। কেননা, নজরে পড়ে গেল, ঠিক তার পেছনেই একজন শক্রদেশের প্রহরী দাঁড়িয়ে। গুপ্তচর ভয়ে একেবারে পাথরের মতো স্থির হয়ে তাকে দেখতে লাগল।
“তুমি কে হে?” প্রহরী ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞেস করল। “এই অন্ধকারে কী করছ?”
লোকটা গুপ্তচর। গুপ্তচর বলেই উপস্থিত বুদ্ধিটাও তার তেমনই প্রখর। কাজেই, নিজেকে সামলে নিতে তার বেশি সময় লাগল না। ঝটপট উত্তর দিল, “আজ্ঞে, আমার নাম রামনায়েক।”
“সে তো বুঝলুম। তা, থাকা হয় কোথায়?” আবার জিজ্ঞেস করল প্রহরী।
“থাকি তো আজ্ঞে অনেকদূরে। বনের দক্ষিণে।” বলে গুপ্তচর অন্ধকারে প্রহরীর মুখখানা ঠাওর করার চেষ্টা করতে লাগল।
“তা, নিজের আস্তানায় না-গিয়ে নায়েকমশাই এই রাতে, অন্ধকারে হাঁকড়পাঁকড় করছ কেন?” এবার প্রহরীর গলায় শোনা গেল কিঞ্চিৎ ঠাট্টা-মেশানো সুর।
“আর বলেন কেন,” বানিয়ে-বানিয়ে উত্তর দিল গুপ্তচর, “আজ্ঞে, কাজকর্ম সেরে আস্তানাতেই ফিরছিলুম। অবশ্য একটু রাতই হয়ে গেছল। এমনই সময় হঠাৎ কোত্থেকে একটা ভালুক আমাকে দেখতে পেয়ে তেড়ে এল। আমি প্রাণের ভয়ে ছুট দিলুম। ছুটতে-ছুটতে দিক হারিয়ে এদিকে চলে এসেছি। আসলে ভালুকটার ভয়ে ওই সামনের গাছটায় উঠে আমি লুকিয়ে বসে ছিলুম। অনেকক্ষণ বসেও, তার সাড়াশব্দ পেলুম না। মানুষ আর কতক্ষণ গাছের ডালে বসে থাকতে পারে বলুন! শিরদাঁড়ায় খিল ধরে গেল। চোখেও এমন ঘুম জড়িয়ে এল যে, গাছ থেকে না-নেমে আর উপায় রইল না। এখন তাই গাছ থেকে নেমে এইখানেই কোথাও একটু গড়িয়ে নেওয়ার মতো জায়গা খুঁজছিলুম।”
প্রহরী কেমন যেন একটু বাঁকা ঠোঁটে হেসে উঠল। সেটা তার হাসি শুনেই বোঝা গেল। হাসতে-হাসতেই প্রহরী বলল, “এখন আমার বদলে যদি সেই ভালুকটাই আবার এসে পড়ত!”
“মরা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকত না।” গুপ্তচর উত্তর দিল।
“আর খানিকটা ছুটলে তো একেবারে রাজপ্রাসাদের সামনে গিয়ে পড়তে। তখন আর তোমাকে কষ্ট করে গাছে উঠতে হত না। রাজপ্রাসাদের সান্ত্রীরা সটান গারদে পুরে তোমার নিশ্চিন্তে থাকার একটা পাকা ব্যবস্থা করে দিত।” বলে আবার হাসল প্রহরী।
“কেন? কাউকে বুঝি রাজপ্রাসাদের কাছেপিঠে যেতে দেয় না?” জিজ্ঞেস করল গুপ্তচর।
“যেতে যে দেয় না, এ-কথা তুমি জানো না?”
“জানলে আপনাকে জিজ্ঞেস করব কেন?” জবাব দিল গুপ্তচর।
“যেতে দিলে?” জিজ্ঞেস করল প্রহরী।
“একটু চোখ মেলে রাজপ্রাসাদটা দেখতুম, এই আর কি!”
“কেন, তুমি এর আগে কখনও এদিকে আসোনি? রাজপ্রাসাদ দ্যাখোনি?”
“না।”
“ঠিক আছে। আমি তোমার দেখার ব্যবস্থা করে দেব।”
আচমকা প্রহরীর এই আশ্বাস শুনে গুপ্তচর কেমন যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। আমতা-আমতা করে বলল, “আপনি... আমাকে..”
কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রহরী বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমিই সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি চলো এখন আমার সঙ্গে!”
তার কথা শুনে পরক্ষণেই গুপ্তচর ভড়কে গেল। জিজ্ঞেস করল, “আপনার সঙ্গে কোথায় যাব?”
“কেন, আমার ঘরে!” সহজ সুরে উত্তর দিল প্রহরী।
“আপনার ঘরে? আপনার ঘরে গিয়ে কী করব?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল গুপ্তচর।
“থাকবে কোথায়? আজ রাতটা তোমায় কোথাও না-কোথাও থাকতে তো হবে?” বলে প্রহরী নিজে আকাশের দিকে তাকিয়ে গুপ্তচরকে বলল, “আকাশ দেখছ?”
গুপ্তচর আকাশের দিকেই তাকাল। এখন যেখানে তারা দুজনে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে আকাশ দেখতে যথেষ্ট কসরত করতে হয়। কেননা, গাছের মাথার ঘন পাতা আকাশটা প্রায় ঢেকেই ফেলেছে। তবুও যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে এই গভীর রাতে একটি তারাও গুপ্তচরের নজরে পড়ল না।
প্রহরী বলল, “বৃষ্টি নামল বলে!” গলায় তার উৎকণ্ঠা।
ঠিক সেই মুহূর্তেই একঝলক দমকা বাতাস নাড়া দিয়ে গেল গাছের মাথাগুলো। গুপ্তচর উত্তর দিল, “ঠিক বলেছেন। মনে হচ্ছে ঝড়ও উঠবে।”
“তা হলে তুমি আমার ঘরে না-গিয়ে থাকবে কোথায়?” জিজ্ঞেস করল প্রহরী। “দুর্যোগে এখানে দাঁড়িয়ে ভেজার শখ থাকলে আমি তোমায় কিছু বলতে চাই না।”
“আপনার ঘর এখান থেকে কতদূর?” জিজ্ঞেস করল গুপ্তচর।
“ভয় নেই, বৃষ্টি আসার আগেই পৌঁছে যাবে।” উত্তর দিল প্রহরী।

“আমি গেলে কোনও অসুবিধে হবে না তো?” প্রহরীর মুখখানা দেখার চেষ্টা করল গুপ্তচর।
“অসুবিধে থাকলে আগ বাড়িয়ে আমি কি তোমায় আমার সঙ্গে যেতে বলতুম?” রাখঢাক না-করেই প্রহরী উত্তর দিল।
“এখন মনে হচ্ছে, ভালুকটা আমায় তাড়া না দিলে আপনার মতো একজন সদাশয় ব্যক্তির দেখা পেতুম না।” বলতে-বলতে হাসল গুপ্তচর।
“তার মানে তুমি বলতে চাও বিপদের তাড়াটা সবসময় আপদকে ডেকে আনে না। বিপদকে যে টেক্কা দিতে পারে, কেল্লা ফতে করার ক্ষমতা তার হাতের মুঠোয়!” বলেই প্রহরী হাসল।
কিন্তু তার চেয়েও জোরে হাসল গুপ্তচর।
ঠিক সেই সময়ে আচমকা প্রহরীর কপালে একফোঁটা বৃষ্টি পড়ল।
“আরম্ভ হয়ে গেছে।” প্রহরী কপালের জল মুছতে-মুছতে বলল।
“হ্যাঁ, আমারও মাথায় দু’-এক ফোঁটা পড়েছে।” উত্তর দিল গুপ্তচর।
“কী করবে, ঠিক করো তাড়াতাড়ি!” তাড়া দিল প্রহরী।
“কী আর করব, ভিজি।” উত্তর দিল গুপ্তচর।
“শুধু ভেজার কথা হলে কিছু বলার ছিল না। গাছের গায়ে বাতাসের ঝাপটা শুনে বুঝতে পারছ না, যথেষ্ট ভয়ের কারণ আছে।” তার কথার কায়দায় বোঝা যায়, গুপ্তচরকে যেন একটু ভয় দেখাতে চায় প্রহরী।
গুপ্তচর ভয় পেল কি না তা কেমন করে বোঝা যাবে! তবে তার যদি একটু সন্দেহ মনে দানা বেঁধে থাকে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যতই হোক লোকটা প্রহরী। সুতরাং গায়ে-পড়ে তাকে এই ঝোপের ভেতর থেকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহটা কোনও গুপ্তচর সহজে নিতে পারে না। সুতরাং শত্রুর ঘরে যেতে তার ভেতরটা খুঁতখুঁত করতেই পারে। এই অন্ধকার রাত বলেই যেন সন্দেহটা আরও বেশি করে চেপে বসছে।
গাছের পাতায় একটি-দুটি বড়-বড় ফোঁটার বৃষ্টির শব্দ কানে আসছে। বাতাসের শব্দও ধীরে-ধীরে গতি বাড়াচ্ছে।
“কী হে, তোমার তো দেখি কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই!” একটু যেন হেসেই বলল প্রহরী।
“কেন এ-কথা বলছেন?” জিজ্ঞেস করল গুপ্তচর।
“সামনে বিপদ দেখেও, তুমি দিব্যি দাঁড়িয়ে আছ!” যেন ভীষণ উদ্বেগ প্রহরীর গলায়।
এবার গুপ্তচর কথা বলল, “ভাবছি।”
“কী ভাবছ?” জিজ্ঞেস করল প্রহরী।
“ভাবছি, একটু আগে আপনি যে-কথাটা বললেন সেই কথাটা ঠিক নয়।”
“কোন কথাটা বলো তো?”
“ওই যে বললেন, বিপদের তাড়াটা সবসময় আপদকে ডেকে আনে না!”
“হ্যাঁ, তাই তো!”
“এখন মনে হচ্ছে, একটা বিপদ কাটলে আর-একটা বিপদ যে আসবে না, তার কোনও পাকাপাকি ভরসা কেউ দিতে পারে না।”
“কেন এ-কথা বলছ?” জিজ্ঞেস করল প্রহরী।
“বলছি, কারণ ভালুকের বিপদটা কেটে যেতেই দেখুন আকাশ ভেঙে কেমন আর-একটা বিপদ আমাকে তাড়া করতে এগিয়ে আসছে!” বলেই হেসে ফেলল গুপ্তচর।
গুপ্তচরের কথা শুনে প্রহরীও হাসল। হাসতে-হাসতে বলল, “বাঃ, তুমিও তো দেখছি কম যাও না। তবে তোমার কথাটা আমি এক্ষুনি মিথ্যে করে দেব। চলো আমার সঙ্গে!”
“কোথায়?”
“আরে, চলোই না!” বলে প্রহরী গুপ্তচরের হাত ধরল। প্রহরীর হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল গুপ্তচর। হাঁটতে-হাঁটতে ভাবতে লাগল, এবার সত্যিই কি কোনও বিপদে পড়ল সে!
“এইটা আমার ডেরা।” বন থেকে একটু ফাঁকা জায়গায় একটা ঘর। তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রহরী গুপ্তচরের মুখের দিকে তাকাল। তখনও ভিজে যাওয়ার মতো বৃষ্টি শুরু না-হলেও মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের চমকানির সঙ্গে ঝড়ের দাপট বাড়ছে।
“এসো!” হাত ধরে ডাক দিল প্রহরী।
গুপ্তচর ঘরে ঢুকতে একটু ইতস্তত করল।
“আরে, তাড়াতাড়ি এসো। দুর্যোগের আঁচ পেলে বুদ্ধিমানেরা কখনও বাঁচার আশ্রয়টাকে হাতছাড়া করে না।” প্রহরী তার হাত ধরে টান দিল।
গুপ্তচর গুটি-গুটি পায়ে ঘরে ঢুকে গেল।
“বসো!” প্রহরী তাকে একটা চাটাই পেতে বসতে বলল। এবার কিন্তু গুপ্তচরের বুকের ভেতরটা একটু অস্থির হয়ে উঠল। যতই হোক তার কাজটা তো আর বন্ধুত্বের কাজ নয়। গুপ্তচরের। কাজেই যখন সে শত্রুরই এক প্রহরীর ঘরে আশ্রয় পেয়েছে, তখন তাকে কতখানি যে সাবধান হতে হবে সেটা হাড়ে-হাড়ে বুঝছে এখন গুপ্তচর। তার মতলবটা একবার টের পেলে, মরণের হাত থেকে তাকে কে বাঁচাবে তখন!
এবার বাতাসের দাপট বেশ ভাল করেই ঝড়ের দিকে বাঁক নিচ্ছে। বৃষ্টিও বেশ জোরেই শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে মেঘের হাঁকাহাঁকিতে দুর্যোগ ঘনিয়ে উঠেছে।
“আপনার ঘরে আর কেউ নেই?” সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল গুপ্তচর।
“আমার বউ আছে।” একটা লম্ফ জ্বালতে-জ্বালতে উত্তর দিল প্রহরী।
“কই, দেখছি না!”
“গেছে কোথাও। বোধ হয় বৃষ্টিতে আটকে পড়েছে।”
“আপনাদের আশেপাশে আর তো কোনও ঘরদোর দেখছি না।”
“এদিকে লোকজনের বাস কম।”
“আপনার ভয় করে না?”
“আমি কাকে ভয় পাব! আমাকেই তো সবাই ভয় পায়।”
প্রহরীর কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল গুপ্তচর। হাসতে-হাসতে বলল, “সে তো বটেই, রাজার প্রহরীকে ভয় না-পেলে রাজ্য চলবে কী করে!”
প্রহরীও হাসল। তারপর বলল, “তা যা বলেছ, পাহারা দিতে-দিতেই জীবন চলে গেল!”
আবার গুপ্তচর হাসল। হাসতে-হাসতেই প্রহরীর ভুলটা শুধরে দিয়ে বলল, “কথাটা ঠিক বললেন না। জীবন এখনও যায়নি। এই লম্ফের আলোয় আপনার মুখখানা দেখে মনে হচ্ছে, আপনার সময় হতে এখনও অনেক দেরি।”
“তাই নাকি!” প্রহরীর গলায় এবার অট্টহাসি।
প্রাণ খুলে হাসল গুপ্তচরও।
বাড়ছে। বৃষ্টির দাপানি আর বাতাসের শাসানি বেড়েই চলেছে। গুপ্তচরেরও হাসি-মুখ ভাবনায় শুকোচ্ছে। বটেই তো, সে তো আর প্রহরীর সঙ্গে ঘরে বসে খোশগল্প করতে আসেনি। সে এসেছে এ-রাজ্যের হাঁড়ির খবর নিতে। দুর্যোগ এমন করে যে বাদ সাধবে কে জানত! হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। দরজার ফাঁকে মাথা গলিয়ে আকাশটা দেখে নিল।
“কী দেখছ?” প্রহরী এগিয়ে এল।
“বৃষ্টি থামবে বলে মনে হচ্ছে না!” গুপ্তচর শুকনো গলায় উত্তর দিল।
“না থামলে ক্ষতি কী? তুমি তো আর জলে পড়ে নেই।”
গুপ্তচর উত্তর দিল, “তা অবশ্য নেই, তবে আমার বাড়ি তো একটা আছে।” ভাবনার ভান করল।
প্রহরী সায় দিল, “তা ঠিক, বাড়িতে তোমার বউ খুবই ভাবনায় পড়বে।” বলতে-বলতে প্রহরী গুপ্তচরের হাত ধরে আবার চাটাইয়ে এসে বসল।
গুপ্তচর বসতে-বসতে বলল, “হ্যাঁ, সে আর বলতে!”
প্রহরী উত্তর দিল, “তা এখন তো আর কিছু করা যাচ্ছে না। আজ রাতটা তো তোমাকে আমার এখানেই থাকতে হচ্ছে। তারপর কাল বৃষ্টি থামলে তখন অন্য চিন্তা।”
“যেরকম শুরু হয়েছে, তাতে কালও যে থামবে, তেমন ভরসাও তো পাচ্ছি না। ইচ্ছে ছিল, কখনও রাজবাড়ি দেখিনি। যখন এদিকে এসে পড়েছি, ভাল করে দেখে যাব। তা আর বোধ হয় হল না।” গুপ্তচরের গলায় যেন হতাশার সুর।
“হবে না কেন? তবে এখন রাত, তার ওপর দুর্যোগ। অন্ধকার আর দুর্যোগ মাথায় নিয়ে পাগল ছাড়া রাজপ্রাসাদ দেখার বাসনা আর কার মনে আসে। অন্ধকার যাক, দুর্যোগ কাটুক, তারপর আমিই তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব প্রাসাদ দেখতে।”
গুপ্তচর খুশি হয়ে উত্তর দিল, “ওহ, তা হলে তো খুবই ভাল হয়। কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে কি মনে হয় এ-দুর্যোগ কাল সকালেও কাটবে?”
প্রহরী বলল, “ঝড় যখন উঠেছে, তখন একটা আশাও আছে। কেননা, ঝড়েরও দম ফুরায়। সুতরাং তোমার হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্য কথা কী জানো, বিপদ যদি রাতে আসে, তখন মনে হয়, রাতটা যেন ঘাড়ে চেপে বসেছে। কিছুতেই কাটতে চায় না, তুমি যতই সকালের জন্য ছটফট করবে, সকালও ততই যেন অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকবে। তা ছাড়া, তোমার ভাবনার তো কিছু নেই। তুমি তো আর নাচারের মতো পথে-পথে ঘুরে বেড়াচ্ছ না।”
গুপ্তচর মুচকি হাসল। হাসতে-হাসতেই জিজ্ঞেস করল, “তুমি রাজাকে দেখেছ কোনওদিন?”
প্রহরী নিজেই এবার হাসিতে ফেটে পড়ল। তবে সে-হাসি কয়েক মুহূর্তের জন্য। হাসিটাকে সামলে নিয়ে প্রহরী উত্তর দিল, “তুমি দেখছি একেবারে নিরেট। আমি প্রহরী। প্রহরীর কাজই হচ্ছে রাজার যেন জীবন বিপন্ন না হয়, তা দেখা। তা এই কাজ করতে গিয়ে সময়ে-অসময়ে কতবার যে রাজার গায়ে আমার গা ঠেকেছে, সে বলে শেষ করা যায় না।”
গুপ্তচর আবার বোকা সেজে ভান করে বলল, “বলো কী, তুমি তো তা হলে দেখছি দারুণ ভাগ্যবান।”
প্রহরী বলল, “আমার আক্ষেপ কী জানো, তুমি আমাকে চেনো না।”
গুপ্তচর উত্তর দিল, “তুমি মিথ্যে-মিথ্যে আক্ষেপ করছ। তোমার সঙ্গে আমার চেনা-জানার সুযোগ কই? আমি কি এখানে থাকি? আমি থাকি, এই সরহদ্দ পেরিয়ে সেই ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে। পথটা কম-দূর তো নয়।”

“তা বটে!” গুপ্তচরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে প্রহরী উত্তর দিল, “আসলে ভালুকটার জন্যেই তোমার পথ ভুলে এদিকে আসা।”
“ভাগ্যিস ভালুকটা আমায় মেরে ফেলেনি।” যেন কথাটা বলতে ভালুকের ভয়ে দম তার বন্ধ হয়ে আসে। মিথ্যে বলার কায়দা জানে বটে!
প্রহরী হাসতে-হাসতে উত্তর দিল, “মেরে ফেললে কী আর হত, সোজা কথায় মরে যেতে।”
গুপ্তচর বলল, “সে তো সবাই জানে, মেরে ফেললে মরে যেতুম। কিন্তু তোমার মতো এমন একজন বন্ধুর সাক্ষাৎ তো পেতুম না।”
আলতোভাবে হাসল প্রহরী।
“হাসলে যে! আমার কথা বুঝি বিশ্বাস হল না?” প্রহরীর হাসির শব্দ শুনতে-শুনতেই গুপ্তচর জিজ্ঞেস করল।
প্রহরীর হাসি থামল। হঠাৎ তার মুখের চেহারাটা কেমন যেন পালটে গেল। আচমকা সে বলে উঠল, “তুমি কিন্তু আমার বন্ধু নও!”
থতমত খেয়ে গেল গুপ্তচর, “কেন এ-কথা বলছ?”
“কারণ আমি তোমাকে চিনি যে। শুধু চিনি না, হাড়ে-হাড়ে চিনি।”
প্রহরীর হঠাৎ এমন বেখাপ্পা কথা শুনে গুপ্তচরের মুখখানা ভয়ে থমথম করে উঠল। আর ঠিক সঙ্গে-সঙ্গে বিদ্যুৎ ঝলসে, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে মেঘ ডেকে উঠল। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল গুপ্তচর। ভয় পেল সে মেঘের গর্জনে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পেল প্রহরীর ওই কথাটা শুনে। যেন সে কথা বলতে ভুলে গেল। এই মুহূর্তে সে ঠিক একজন বোবা। আলো-আঁধারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও, বোঝা গেল গুপ্তচর লোকটা বোধ হয় ঘামছে। ভয়টা তাকে সাঙ্ঘাতিক চেপে ধরেছে। কিন্তু সে গুপ্তচর। কাজেই, ভয়টাকে যেমন করে হোক মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে তাকে কথা বলতেই হবে। তাই সে খানিকটা আমতা-আমতা করেই বলল, “আমাকে তুমি ...।”
“হ্যাঁ, তোমাকে আমি চিনি।” বেশ দৃঢ় গলায় এবার উত্তর দিল প্রহরী।
“কিন্তু আমি তোমাকে তো ...”
গুপ্তচরের মুখের কথা কেড়ে জবাব দিল প্রহরী, “আমাকে তোমার চেনার কথা নয়। কারণ, আমি যখন বেঁচে ছিলুম তখন তুমি আমাকে দেখেছ। যেমন করে একজন শক্রদেশের গুপ্তচরের দেখা উচিত তেমন গোপনে, লুকিয়ে-ছাপিয়ে দেখেছ আমাকে। কিন্তু আমাকে মনে রাখা তোমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং এখন তুমি যাকে তোমার মুখোমুখি দেখছ, এই আমি, এক মৃত মানুষের প্রেতাত্মা!”
মনে হল, খুব কাছেই একটা বাজ পড়ল। কেঁপে উঠল সারা বন। গুপ্তচরের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। যেন শরীরের সব রক্ত তার মাথায় উঠে তোলপাড় শুরু করে দিলে। সে তখন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু প্রহরীর সেই প্রেতাত্মা আবার শুরু করল, “আমি মৃত। সেদিন তোমার রাজার সেনারা আমাকে একা পেয়ে হত্যা করেছে। সেই রাজারই তুমি একজন গুপ্তচর। আর আমাকে হত্যা করা হয়েছে তোমারই উসকানিতে।”
দপ করে নিবে গেল লম্ফটা। ঘরের মধ্যে এখন জমাট অন্ধকার। গুপ্তচর আর বসতে পারল না। আঁকপাক করে উঠে পড়ল। মাথাটা টলমল করে উঠল। হাঁপ ধরে গেল তার। প্রাণের ভয়ে সে অন্ধকার হাতড়ে পথ খুঁজতে লাগল। বুঝি ঘর থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে।
কিন্তু না, গুপ্তচর পালাতে পারল না। তার একেবারেই সমুখে প্রহরীর প্রেতাত্মার চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল। হা-হা-হা! প্রেতাত্মা তাকে দেখে বিকট স্বরে হেসে ওঠে। হেসে উঠতেই তার মুখের ভয়ঙ্কর গহ্বরটা অন্ধকারেও গুপ্তচর স্পষ্ট দেখতে পেল। গুপ্তচর আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল, “বাঁচাও-ও-ও!”
তার আর্তনাদ কে তখন শুনতে পাবে! তাকে বাঁচাবার মতো তখন সেখানে আর কেউ থাকলে তবে তো! তখন সেই অন্ধকার ঘরে তার সামনে দাঁড়িয়ে একা প্রহরীর সেই প্রেতাত্মা। সে হাসতে-হাসতেই বলল, “আমাকে যখন হত্যা করা হয়, তখন আমিও বোধ হয় তোমার মতো এমনই করে চিৎকার করেছিলুম, “বাঁচাও-বাঁচাও!” আমাকে কেউ বাঁচায়নি। সব নিরস্ত্র মানুষই বোধ হয় শত্রুর অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর আগে এমনই করে প্রাণ ভিক্ষা করে। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে না। তোমাকেও কেউ বাঁচাতে আসবে না গুপ্তচর। আমার হাতেই তুমি আজ মরবে।”
এখন প্রেতাত্মার চোখ দুটো দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে গুপ্তচরের দিকে এগিয়ে আসছে।
ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে।
প্রেতাত্মার নিশ্বাসে প্রতিহিংসার ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ভয়ে থরথর করে কাঁপছে গুপ্তচর।
বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে আকাশে আলোর ঝলক ছুটিয়ে।
মৃত্যু নিশ্চিত জেনে এবার একবার শেষ মিনতি করল গুপ্তচর প্রহরীর প্রেতাত্মার কাছে, “তুমি আমায় মারবে কেন? তুমি বিশ্বাস করো আমি কোনও অন্যায় করিনি।”
প্রেতাত্মার হাসির শব্দটা এখন বড়ই কর্কশ শোনাল। তার হাসি যেন মেঘের গর্জনকে তুচ্ছ করে আরও বিকট শব্দে গর্জে উঠল। সে বলল, “অন্য দেশের গুপ্তচর যখন শত্রুর দেশে গোপনে ঢোকে, তখন যে সে কোনও ন্যায় কাজ করতে ঢোকে না, এটা আশা করি তোমার অজানা নয়। তুমি এখানে এসেছ গোপন খবর জোগাড় করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তোমার, আমার নজরকে তুমি ফাঁকি দিতে পারোনি। আর তোমার নিস্তার নেই।” প্রেতাত্মার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে জ্বলন্ত আগুনের গোলার মতো ছিটকে বেরিয়ে আসছে।
দুরাত্মার হাতে মরবার আগের মুহূর্তে মানুষ যা করে, গুপ্তচরও তাই করল। সে অন্ধকারে আলগা চোখে ঘরের দরজাটা হদিস করতে লাগল।
এগিয়ে আসছে প্রেতাত্মা। কী বীভৎস তার চেহারা!
বাঁচবার জন্য গুপ্তচর আঁকপাক করে অন্ধকার হাতড়াতে লাগল। যদি একটা জায়গা পেয়ে যায় লুকোবার!
কিন্তু যেখানেই সে লুকোয়, সেখানেই সেই প্রেতাত্মার নিশ্বাস। এগিয়ে আসে তার হাত দুটো গুপ্তচরের গলার কাছাকাছি। সেই হাত এবার বোধ হয় গুপ্তচরের টুটি টিপে ধরবে!
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। ঝড়ের গতি ভয়ঙ্কর। এখন প্রেতাত্মার এই বন্দিশালায় গুপ্তচরের সময় বোধ হয় শেষ হয়ে এল! কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল! ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। চালাকি করতে গিয়ে গুপ্তচর যে নিজেই এক প্রেতাত্মার মায়াবী ছলনায় ভুলে মরণের ফাঁদে ধরা পড়বে, ঘুণাক্ষরেও তা বুঝতে পারেনি। আর আফশোস করা মিথ্যে। কেননা, প্রেতাত্মার হাত দুটো গুপ্তচরের সব চালাকি খতম করার জন্য এই বুঝি টিপে ধরল তার গলাটা! মেঘের গর্জন, বৃষ্টির দাপট আর ঝড়ের ঝাপটার একটুকরো শব্দও যেন এখন আর কানে ঢুকছে না গুপ্তচরের। মৃত্যু যখন হাত বাড়িয়ে কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন বোধ হয় সব মানুষেরই এমন হয়। কানে ঢোকে না কিছুই। তার কানে তখন সব নিস্তব্ধ। চোখের তারায় সব অন্ধকার। বুদ্ধিটা পর্যন্ত চোখ মটকে কেটে পড়ে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাঁপানো ছাড়া তখন আর কিছুই করার থাকে না।
বলতে বলতেই-প্রচণ্ড শব্দ করে দরজায় ধাক্কা মারল এক ঝলক দমকা হাওয়া। হাট হয়ে খুলে গেল ঘরের দরজাটা। সঙ্গে-সঙ্গে গুপ্তচরের চমক ভেঙেছে। চকিতে নজর পড়েছে খোলা দরজার দিকে। প্রেতাত্মা তার গলাটা খামচে ধরার আগেই সে যেন শক্তি ফিরে পেল। মারল এক লাফ। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ছুট দিল বাইরে।
চিৎকার করে উঠল প্রহরীর প্রেতাত্মাও। চিৎকার করে পিছু নিল গুপ্তচরের।
কিন্তু কোথায় পালাবে গুপ্তচর! পেছনে প্রেতাত্মা, বাইরে এ কী সাঙ্ঘাতিক দুর্যোগ! উফ, কার সাধ্যি বাইরের এই ঝড় আর বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে! নিমেষে আপাদমস্তক ভিজে ঢোল হয়ে গেল গুপ্তচরের। তা যাক। এখন তাকে যেমন করে হোক প্রেতাত্মার হাত থেকে বাঁচতে হবে।
ঝড় যেমন প্রচণ্ড, বনও তেমনই জমাট।
বৃষ্টির দাপট যেমন সর্বনেশে, বনের পথও তেমনই পিচ্ছিল।
কোথাও জলে থইথই বন। দুর্গম পথ। কোথাও ঝড়ে ভেঙে-পড়া গাছের গুঁড়ি পথের বাধা। সেই পথের ওপর দিয়ে হোঁচট খেতে-খেতে ছুটে পালাবার চেষ্টা করছে গুপ্তচর। কিন্তু পারবে কেন প্রেতের সঙ্গে? গুপ্তচর দু’ পা ছুটলে, সে দশ পা ছোটে! ছুটতে-ছুটতে হাসে, হি-হি-হি! ঠিক যেমন করে হাসে ভূত-প্রেত। কী আশ্চর্য এক কিম্ভূত কাণ্ড! এই কিছুক্ষণ আগেও যাকে দেখতে ছিল গুপ্তচরের মতো একজন মানুষ, এখন সে একটা বুক-কাঁপানো প্রেত! কে আন্দাজ করবে, একটা প্রেত স্পষ্ট প্রহরীর রূপ ধরে গুপ্তচরকে এমন একটা বিপদে ফেলে নাকানিচোবানি খাওয়াবে!
গুপ্তচর পারে না প্রেতের সঙ্গে। সে গুপ্তচরের সামনে দাঁড়িয়ে তার পথ আটকে অট্টনিনাদ করে ওঠে।
গুপ্তচর পিছু ফিরে পালাবার পথ খোঁজে। খুঁজতে গিয়ে কাদায় পিছলে সে ছিটকে পড়ে। কাদায় মাখামাখি হয়ে সে যেই আবার উঠে দাঁড়ায়, প্রেতের হাসি বন কাঁপায়! হাসি শুনে সে যেই আবার পালাতে যায়, ঝড়ের ঝাপটায় একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গুপ্তচরের ঘাড়ের ওপর। ‘আঃ’ বলে একটু দম ফেলারও সময় নেই তার। আবার সে ছুট দিল। তাকে যেমন করে হোক প্রাণে বাঁচতেই হবে। নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি মানুষ আর কী ভালবাসে! এবার সে অন্যদিকে ছুটল।
চোখের পলকে, ঝড়ের আগে আবার পথ আগলাল প্রেত।
চিৎকার করে উঠল গুপ্তচর, “কী চাও তুমি পিশাচ?”
“তোমার প্রাণ।” সে উত্তর দিল।
“না, আমার প্রাণ কেউ নিতে পারবে না।” গলা ফাটিয়ে জানিয়ে দিল গুপ্তচর। আবার সে মুখ ফেরাল। আবার সে দুর্যোগ তুচ্ছ করে আর-এক পথে যেই ছুটতে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝড়বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল আর-এক শব্দ। মনে হয়, যেন অনেক জলের ঢেউ একসঙ্গে ধেয়ে আসছে বন-জঙ্গল তোলপাড় করে। চারদিক ভাসিয়ে গাছপালা ভেঙে তছনছ করে।
আনন্দে হা-হা-হা করে উঠল প্রেতাত্মার গলার স্বর। মনে হল, সে যেন একটা মস্ত গাছের মগডালে উঠে নাচানাচি করছে। হ্যাঁ, সত্যিই তাই। নাচতে-নাচতে সে বিচ্ছিরি খ্যানখেনে গলায় চিল্লিয়ে উঠল, “আর পালাবি কোথায় রে শয়তান গুপ্তচর! সমুদ্দুরের ঢেউ ঢুকে পড়েছে বনের ভেতর! জলোচ্ছ্বাস! জলোচ্ছ্বাস! দু’ কূল ছাপিয়ে বান এসে পড়েছে! আমায় আর কিছু করতে হবে না। এবার তুই নিজেই জলের তলায় তলিয়ে মরবি!”
হলও তাই। ঝড় আর বৃষ্টির প্রকোপে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস তীরবেগে ছুটে আসছে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে। ক্ষিপ্ত সমুদ্র ভাঙছে ঘরদোর। গ্রাস করছে এই বন। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সামনে যা পায় তাই। রেহাই পেল না কিছুই। জলে-জলে জলময় হয়ে গেল চারদিক। মনে হল, সমুদ্র যেন গিলে খাচ্ছে যা পাচ্ছে তাই। খেতে-খেতে সে আর বাকি রাখল না কিছুই। এমন কি, সেই গুপ্তচরও যে জলের বন্যায় কোথায় ভেসে গেল, কেউ জানতেও পারল না।
তিন দিন, তিন রাত ধরে চলল এই ভীষণ দুর্যোগ। কোথায় গেল সেই বন! বনের রাজা! কোথায় গেল সেই বনের রাজ্য, তার রাজপ্রাসাদ, সৈন্যসামন্ত, পাত্রমিত্র! তার হদিস কেউ দিতে পারল না। দেবে কে? সবই যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এমন কি, একটি মানুষও আর প্রাণে বেঁচে রইল না সেই রাজ্যে। সে যেন এক শ্মশান। ধ্বংসের শ্মশান! এখন বন নেই, তাই আকাশ আড়াল করে বনের গাছও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নেই। এখন আকাশের সব আলো একসঙ্গে রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে, যতই বিশাল রাজবাড়ি হোক না কেন, যতই শক্তিশালী হোক রাজা, রাজভাণ্ডারে রাজার যতই থাকুক ধনসম্পদ, সেসব মিথ্যে। প্রকৃতির কাছে সবাই হেরো। সে-প্রকৃতিকে তুমি সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস বলতে পারো। তার নাম আকাশও হতে পারে, হতে পারে মেঘ অথবা বৃষ্টি, বিদ্যুতের চমক কিংবা ঝঞ্ঝা। বলতে পারো সূর্য, গ্রহ-তারা, আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প যা ইচ্ছে। এমন কি, ফুল, প্রজাপতি, পাখিও।
আবার ধীরে-ধীরে প্রকৃতি শান্ত হল। মেঘ কাটল। ঝড় থামল। রোদ উঠল। শুকিয়ে গেল কাদা-মাটি। বোঝা গেল, সেই বন আর বনের রাজ্য ধ্বংস হয়েছে বটে, কিন্তু সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যায়নি। এখানে হয়তো আবার কোনওদিন জনপদ গড়ে উঠবে। মানুষ বাসা বাঁধবে।
এ-কথা মিথ্যে হল না। একদিন সত্যি-সত্যিই এখানে রোশনদের এই গ্রামটা গড়ে উঠল। তবে সে-ও অনেকদিন, অনেক বছর আগে। কিন্তু রোশন জন্মাবার কত বছর আগে, তার হিসেব কেউ জানে না। বন আর এখন বন নেই। আজ সেখানে জোয়ারের ক্ষেত। জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ। চারদিকে ঘরবাড়ি। দোকানপাট। মানুষের কোলাহল। সেখানে যেমন রোশন আছে, রোশনের মা আছেন, বাবা আছেন, তেমনই ফুলতিদিদি আছে। সেই সঙ্গে কত গল্প আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন