শৈলেন ঘোষ

আজ বড্ড তাড়াতাড়ি রোশনের ঘুম পেয়ে গেছিল। সন্ধে থেকেই তার হাই উঠছিল। সারাদিন অনেক আনন্দ করেছে। অনেক ছোটাছুটি করেছে। ফুলতিদিদির বিয়ের খবরটা সবাইকে যে কতবার বলেছে! শেষমেশ কাকগুলোর সঙ্গেও আনন্দে কা-কা করে হুটোপাটি করেছে। এখন তো আর আকাশে কাকও নেই, পাখিও নেই। কিন্তু পাড়ার কুকুরটা এমন মাঝে-মাঝে ডেকে উঠছে! দু’বার ধমক দিয়েছে রোশন কুকুরটাকে। কিন্তু মাঝে-মাঝে সে ডাকছেই। বোধ হয় খিদে পেয়েছে কুকুরটার। হয়তো তাই। রোশন মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে দু’খানা রুটি ছিঁড়ে ডাল মেখে ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মুখে দিল না। তবে কি কুকুরটার অসুখ করেছে? হবে হয়তো! এই রাতেও হঠাৎ আবার একটা কাক কেন ডেকে ওঠে? ওদের ওই এক দোষ, একটা ডাকলে সবাই ডাকে। ডাকুক। আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ল রোশন। মাকে বলল, “মা, আজ আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। ঘুম পাচ্ছে।”
মা বললেন, “ফুলতির যতদিন না বিয়ে হচ্ছে, ততদিন তোমারও আর ইচ্ছে করবে না পড়তে, সে আমি জানি।”
রোশন হেসে ফেলেছিল মায়ের কথা শুনে। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কে জানে! কখন যে দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি পড়েছে আকাশ থেকে, তাও জানে না সে! আর কতবার যে কুকুরটা কেঁদে-কেঁদে ডেকে উঠেছিল, সে-ও তার কানে পৌঁছায়নি। অকাতরে ঘুমোচ্ছিল রোশন।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছিল রোশনের, একটা ভয়ঙ্কর শব্দ শুনে। সেই শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে যেমনই সে ধড়ফড় করে উঠতে গেছে, তখনই যেন মনে হল, তার দেহটা মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। অমনই তার ঘাড়ের ওপর ভেঙে পড়ে ওপরের টিনের ছাদটা। ঘরের দেওয়ালে গাঁথা পাথরগুলো হুড়মুড় করে খসে পড়ল। উঃ। রোশনের ঘাড়ে লাগল। পায়ে লাগল। পিঠে লাগল। হাতে লাগল। মাথাটা তার কোনওরকমে বেঁচে গেল। সে বুঝতে পারল, তাদের ঘরটা ভেঙে ধসে পড়েছে। সে মা-মা করে ক’বার চেঁচাল। বাবাকে ক’বার ডাকল। প্রাণপণে সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। কিন্তু কিছুতেই সে বেরিয়ে আসতে পারে না। তার দম ফেটে যায় যেন! তবু সে সেই ভগ্নস্তূপের ভেতরে নিজের প্রাণটা বাঁচানোর জন্য কখনও নিশ্চল হয়ে পাথরের ওপর মাথাটা রাখে। আবার কখনও গুঁড়িয়ে পড়া বালি-মাটি খামচিয়ে-খামচিয়ে পথের সন্ধান করে। কখনও ভীষণ ছটফটিয়ে কঁকিয়ে ওঠে। সে যেন জঞ্জালের সমুদ্দুরে হাবুডুবু খাচ্ছে। যেদিকে হাত বাড়ায় সেইদিকেই পথ রুদ্ধ। সে বুঝি আর শ্বাস নিতে পারে না! মনে হয় সে যেন ধীরে-ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। আরও অন্ধকারে, গভীর অন্ধকারে সে হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল তার জ্ঞান। নিথর হয়ে গেল রোশনের হাত-পা। অবশ হয়ে গেল রোশনের দেহটা। নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল রোশন সেই ধ্বংসস্তূ্পের অন্ধকারে। কতদিন, কতক্ষণ সে জানে না।
হঠাৎ রোশনের জ্ঞান ফিরেছিল। হঠাৎ সে চোখ মেলে তাকাতেই দেখে, তার সামনে একজন ডাক্তারবাবু দাঁড়িয়ে। রোশনের হাতে ব্যান্ডেজ। পায়ে ব্যান্ডেজ। মাথায় ব্যান্ডেজ। সে শুয়ে আছে একটা বেঞ্চির ওপর। এখন অন্ধকার নেই। চারদিকে আলো। সে উঠে বসতে গেল। পারল না। কেননা, উঠতে দেওয়া হল না রোশনকে। সে চিৎকার করে উঠল। সে ডাক দিল মা’কে। ডাক দিল বাবাকে। কেউ সাড়া দিল না। কেমন করে কী যে হল, সে কিছুই ঠাওর করতে পারল না। কেমন করে যে সে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এখানে এল, তা-ও সে জানে না। সে ছটফট করতে-করতে চেঁচাতে লাগল। সে বলে উঠল, “আমায় ছেড়ে দাও। আমি যাব। আমি যাব।”
তাকে ছাড়া হল না।
সে জোর করে উঠে পড়ল। আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “আমার কী হয়েছে?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “ভূমিকম্পে তোদের বাড়ি ধসে গেছে।”
আঁতকে উঠল রোশন। লাফিয়ে পড়ল বেঞ্চির ওপর থেকে। ডাক্তারবাবু তার হাত ধরলেন। রোশন ডাক্তারবাবুর হাত ছাড়িয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল। সে থমকে গেল। তার মনে হল, এতক্ষণ সে ইস্কুলবাড়ির একটা ভাঙা ঘরে বেঞ্চির ওপর শুয়ে ছিল। ইস্কুলবাড়ির একটা দিক ভেঙে ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে। তারপর রোশন যেদিকেই তাকায়, সেইদিকেই দ্যাখে সব ভাঙা। একটা বাড়িও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নেই। কোনটা তাদের বাড়ি, কোনদিকে, কিছুই চিনতে পারে না। সে আহত পা নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক দৌড়ঝাঁপ করতে লাগল। আর চেঁচাতে লাগল, “মা-আ-আ! বাবা-আ-আ!” কিন্তু সাড়া পেল না। সে যেদিকে তাকায়, শুধু ধুলোবালি। ভাঙা পাথর। ভাঙা ছাদ। ভাঙা ঘর। আর কিছু নেই। অনেক মানুষ একসঙ্গে ছোটাছুটি করে কান্নাকাটি করছে। অনেক মানুষের গা বেয়ে রক্ত পড়ছে। অনেক মানুষ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অনেক মানুষ নিজের আস্তানা খুঁজে বেড়াচ্ছে। আপনজনের জন্য আর্তনাদ করছে। তাদেরই একজন রোশনও। রোশনও আর্তস্বরে চিৎকার করছে। রোশনও খুঁজছে। রোশনও কাঁদছে। সে অনেকবার মাকে ডাকল। বারবার বাবাকে ডাকল। ডাকল ফুলতিদিদিকে। ডাকল দরবেশদাদুকে, মাস্টারজিকে, পোটম্যানভাইকে, শচীনকে, রহমতকে। কেউ সাড়া দিল না। সে ভাঙাবাড়ির স্তূপাকার জঞ্জালের ওপর দিয়ে এদিক থেকে ওদিকে ঠোক্কর খেতে-খেতে খুঁজে বেড়াল। তন্ন-তন্ন করে। কাউকেই খুঁজে পেল না সে। কেউ সাড়া দিল না তার ডাকে। সে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে-কাঁদতে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরে সে হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়ল। ভাঙা-ভাঙা পাথরগুলো খামচে-খামচে পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছড়াতে লাগল। তারপর আকাশের দিকে ছুঁড়তে-ছুঁড়তে চিৎকার করতে লাগল, “ওখানে ভগবান নেই। মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে।” বলে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।

সেই স্তূপাকার জঞ্জালের ওপরই পড়ে-পড়ে রোশন অনেকক্ষণ কাঁদল। কাঁদতে-কাঁদতে দেখল ইস্কুলবাড়ির ভেতরটা একটা হাসপাতাল হয়ে গেছে। সে হাঁটতে-হাঁটতে সেইদিকেই গেল। ইস্কুলবাড়ির ভেতরে ঢুকে সে দেখতে লাগল, আহত মানুষের মুখগুলি। না, সে দেখতে পেল না তার আপনজনের একটিও মুখ। ওদিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ওই আগুনের দিকেই ছুটে গেল সে। সবটা যেতে পারল না। ওদিকে সেনারা দাঁড়িয়ে। রুখে দিল তাকে। জেদ ধরল রোশন, “আমাকে যেতে দাও। আমাকে যেতে দাও! আমাকে যেতে দাও!”
যেতে পারল না রোশন। তাকে জোর করে সরিয়ে দিল সেনারা।
কিন্তু এখন তা হলে সে কোথায় যাবে?
কোথাও যাওয়ার আস্তানা নেই তার। সব ধসে গেছে। বাড়ি, ঘরদোর সব। সব ধুলোয় লুটোচ্ছে। তবু সে দিশেহারা হয়ে ছুটল। ছুটল ওইদিকে। ওইদিকেই হয়তো তাদের বাড়িটা খুঁজে পাবে সে।
না, পেল না।
কিন্তু চমকে উঠল সে।
কেন?
ও কে? একা হাঁটুর ওপর মুখ রেখে বসে আছে ধ্বংসস্তৃপের ওপর? বসে-বসে কী খুঁজছে সে? স্থির কেন তার চোখের দৃষ্টি?
রোশন এগিয়ে গেল। ধড়ফড় করে উঠল তার বুকের ভেতরটা। আরও একটু এগিয়ে গেল রোশন। তার আরও কাছে। তারপর তার পাশে সেই জঞ্জালের ওপরই বসে পড়ল রোশন। তার পিঠে আলতো করে মাথা ঠেকাল। ডাক দিল, “ফুলতিদিদি!” ভারি নরম সেই গলার স্বর। ভারি ক্লান্ত, কান্নায়।
ফুলতিদিদি রোশনের মুখখানি টেনে নিল নিজের মুখের দিকে। নীরবে তাকাল রোশনের জল-ছলছল চোখ দুটির দিকে।
রোশন কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার কোলে মুখ রেখে বলে উঠল, “ফুলতিদিদি, আমি আছি। ফুলতিদিদি, আমি আছি তোমার জন্যে।”
ফুলতিদিদির মুখে কথা নেই। শুধু হাতখানি তার রোশনের মাথায় রাখল। অশ্রুর ফোঁটাগুলি তার চোখের পাতায় টলমল করতে লাগল। কিন্তু পড়ল না একটি ফোঁটাও সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন