শৈলেন ঘোষ

রোশন যেন জাদু জানে। অচেনা-মানুষকে এমন আপন করে নিতে পারে ছেলেটা। নিমেষের মধ্যে গল্প জুড়ে দেবে অচেনা মানুষের সঙ্গে। ধরো, তোমাকেই যদি প্রথম দেখে সে, বলা নেই, কওয়া নেই, তার মুখখানা হাসিতে উছলে উঠবে। তোমার কাছে এগিয়ে এসে নিজের নামটা বলেই তোমার নামটা জিজ্ঞেস করবে। তুমি যেই তোমার নামটা বলবে, অমনই রোশন আনন্দে উছলে উঠে তোমার হাতটি ধরে ফেলবে। তারপর বলবে, বাঃ! তোমার নামটা কী সুন্দর! বলতে-বলতে এমন বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলবে, আর কোনওদিন সে-বন্ধুত্ব ভাঙছে না। গ্রামের হেন মানুষ নেই যে তাকে ভালবাসে না। তাকে দেখলে খুশিতে মুখখানি কার না ঝলমল করে ওঠে! কে না ‘রোশন’ বলে তাকে কাছে ডেকে আদর করে! যেমন ভালবাসেন সোনাজিকাকা, তেমনই দরবেশদাদু। ওই যে চিঠি বিলি করেন পোস্টম্যানভাই, তিনিও কি কম ভালবাসেন!
সাইকেলে চেপে পোস্টম্যানভাই যখনই এর-তার বাড়ি চিঠি বিলি করতে বেরোন, তখন যদি রাস্তায় দেখা হয়ে যায় রোশনের সঙ্গে, তবে এক মিনিটের জন্য হলেও তিনি থামবেন। সাইকেল থেকে নামবেন। রোশনকে আদর করে জিজ্ঞেস করবেনই, “রোশন কেমন আছ?”
“ভাল।” বলেই রোশন জিজ্ঞেস করবে, “তুমি কেমন আছ?”
পোস্টম্যানভাইও বলবেন, “ভাল।”
তাঁর উত্তর শুনে রোশন জিজ্ঞেস করবে, “আজ চিঠি কম, না বেশি?”
পোস্টম্যানভাইও যেমন-যেমন চিঠি থাকে তাঁর হাতে তেমন-তেমন উত্তর দেন। যেদিন বেশি থাকে, বলেন, বেশি। যেদিন কম থাকে, বলেন, কম। তারপর রোশনের চিবুক ছুঁয়ে সাইকেল চালিয়ে ‘আসছি’ বলে চলে যান। হাসতে-হাসতে। রোশন ভাবে, চিঠি কম হলেই ভাল। বেশি চিঠি থাকলে মানুষটাকে বড্ড খাটতে হয়! বলো, রোদের দিনে কী কষ্ট! যার বাড়িতে যার চিঠি, তার বাড়িতে ঠিক তার চিঠি পৌঁছে দিতে হয়। কাজটা কি কম শক্ত! একজনের চিঠি অন্যজনের বাড়িতে চলে গেলে লোকে তো পোস্টম্যানভাইকেই বকাবকি করবে!
মাস্টারজিও কম ভালবাসেন না রোশনকে। মাস্টারজিও যেন রোশনের কাছে তার কল্পনার জাদুকর। রোশনকে তিনি যতই তার না-জানা গল্প শোনান, ততই যেন মাস্টারজিকে আরও অনেক বেশি কাছে পেতে ইচ্ছে করে রোশনের। ইচ্ছে করে আরও গল্প শোনার। আর সত্যি, মাস্টারজি কত কী জানেন বলো! সেদিন বললেন বরফের গল্প। বললেন, পৃথিবীর বুকে যত উঁচু-উঁচু পাহাড়-চুড়ো আছে, তাতে কত বরফ। আর পৃথিবীর দু’ প্রান্তে দুই মেরুর দেশ যেখানে, সেখানেও বরফের পাহাড়। মাস্টারজি বলেছিলেন, এই পাহাড়-চুড়ো আর মেরুতে যত বরফ আছে সব যদি একসঙ্গে গলে যায়, তবে ভারি বিপদ ঘটে যাবে এই পৃথিবীর। কেননা, তখন পৃথিবীর বুকে যত সমুদ্র আছে, ওই বরফগলা জল সেইসব সমুদ্রে এসে পড়লে আজকে সমুদ্রের বুকে যত জল আছে, তা বেড়ে হয়ে যাবে কুড়ি-বাইশতলা, তখন গোটা পৃথিবীটাই জলের তলায় তলিয়ে হাবুডুবু খাবে! কী ভয়ঙ্কর কথা, বলো!
মাস্টারজি আর একবার বলেছিলেন, মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলে চড়াইপাখির মনে হয়, অনেকদূরে যেন বাজ পড়ছে। খুব নিচু গলায় কোনও মানুষ যখন গান গায়, চড়াইপাখির কানে সে-গান পৌঁছয়ই না। বাজপাখির এমন চোখের দৃষ্টি, দূর আকাশের কোন ওপর থেকে ঠিক দেখতে পায় টিকটিকির নড়নচড়ন। এমনকি, মাটির ওপর একটা কেঁচো ঘুরঘুর করলেও তার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। আকাশ থেকে হুস-স-স করে উড়ে এসে ঠিক ছোঁ মেরে ধরে ফেলবে। কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বলো!
বন্ধু তার বসন্ত, সুনীল, বিজু, শচীন, রহমত, আরও অনেকজন। সবাই তারা একই ইস্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে। একসঙ্গে খেলা করে। একসঙ্গে কবিতা পড়ে। ছবি আঁকে। গান গায়। রোশনের চেয়ে বিজু অবশ্য অনেক ভাল গাইতে পারে। প্রতি বছর ইস্কুলের প্রাইজের সময় একটা গান একা বিজু গাইবেই। গানের জন্য বিজুর একটা প্রাইজ বাঁধা। আর রহমত ছবি আঁকায় ফার্স্ট। তারও প্রাইজ বাঁধা। তবে রোশনেরও একটা প্রাইজ আছে। সে কবিতা পড়ায়। তবে বিজু যখন গানের জন্য প্রাইজ পায়, আর রহমত ছবিতে, তখন কী জোর হাততালি দেয় রোশন। কী খুশি সে!
রোশন এখনও পর্যন্ত জানে না, কেন সে হিন্দু। আর কেনই-বা দরবেশদাদু আর রহমতরা মুসলমান! নিজে ভেবে পায় না বলেই সে তার ফুলতিদিদিকে জিজ্ঞেস করেছিল। কী বললে যে রোশন এই শক্ত কথাটা সহজে বুঝতে পারবে, ফুলতিদিদি ভেবে পায় না। অনেক ভেবে তাই একদিন ফুলতিদিদি রোশনকে বলেছিল, “যাঁরা মন্দিরে ঠাকুরপুজো করেন তাঁদের বলে হিন্দু। আর যাঁরা আল্লার কাছে প্রার্থনা করেন মসজিদে, তাঁদের বলে মুসলমান।”
তারপর রোশন যখন জিজ্ঞেস করেছিল, “মন্দিরে-মন্দিরে কত ঠাকুর থাকে, গণেশ, শিব, কালীমা, অথচ মসজিদে কিচ্ছু নেই কেন? কেন রোশনকে মসজিদে ঢুকতে কেউ মানা করে না, অথচ মন্দিরে মুসলমান ঢুকলেই কেন হইচই বেঁধে যায়?”
তার কোনও উত্তর দিতে পারেনি ফুলতিদিদি।
এ-কথার ঠিক-ঠিক উত্তর কারও কাছে পায়নি বলেই সে মাস্টারজিকেও জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।
মাস্টারজি বলেছিলেন, “এর উত্তর বড় হলে পাবে।”
বড় হতে আরও কত দেরি রোশনের, আরও বড়! কবে ও জানতে পারবে, ওই যে জঞ্জাল পরিষ্কার করে সুখনদাদা, ও মন্দিরের ধারেকাছে গেলে ওকে সবাই কেন বকে? কেন বলে, ছুঁয়ে ফেলবি, সরে যা! অথচ দ্যাখো, দরবেশদাদু ধর্মে মুসলমান হলেও রোশনকে তিনি কত ভালবাসেন। হ্যাঁ, রোজ অন্তত একটিবার তাঁর কাছে যাওয়া চাই রোশনের। তাঁর বাড়িতে তাঁর এক নাতি আছে। নাতির স্ত্রী আছে। তাদের এইটুকু একটা ছোট্ট ছেলে আছে। তার নাম দিয়েছে রোশন ‘লিল’। কে জানে, ‘লিল’ নামটাই বা কেন রোশনের মাথায় এল! রোশনকে দেখলেই লিল দু’ হাত তুলে তার কাছে ছুটে আসবে। পারে না, তবুও তাকে কোলে নেওয়ার জন্য কী কাণ্ডটাই না করবে রোশন। যেদিন লিলকে কোলে নিতে গিয়ে ধপাস করে পড়ল, সেদিন থেকে আর একদিনও ও-কাজ করেনি রোশন। এখন পুঁচকেটা রোশনকে দেখে ছুটে এলেই, রোশন ওর গালটা টিপে চুক করে একটা চুমো খেয়ে আদর করবে। ছেলের তাতেই কী আনন্দ! এমন খিলখিল করে হাসবে, দেখলে রোশন তো খুশিতে লুটোপুটি খাবেই, এমন কি, দরবেশদাদু পর্যন্ত হো-হো করে হেসে উঠবেন।
নামটা কী মজার! দরবেশদাদু! কেমন যেন হাসি-হাসি গন্ধ মেশানো। ভাবতেই পারো, দরবেশ আবার নাম হয় নাকি? দরবেশ তো মিষ্টি খাবারের নাম। লোকে খায়! কিন্তু একসময়ে কী ভয়ঙ্কর ক্ষমতা ছিল মানুষটার। একটা জ্বলন্ত কয়লার টুকরো অক্লেশে ধরে রাখতে পারতেন জিভের ওপর। তখন মুখ দেখে কে বলবে তাঁর কষ্ট হচ্ছে।
আসলে দরবেশদাদুর নামটা তো আর সত্যি-সত্যিই দরবেশ নয়। আসল নাম তাঁর ‘হাজিবাবা’। তাঁদের বলা হত, ‘দারবিশ’। সেই দারবিশই কখন যে রোশনের মুখে দরবেশ হয়ে গেছে, সেটা যেমন রোশন জানে না, তেমনই জানে না তার ফুলতিদিদিও। এমন কি, দরবেশদাদু নিজেও। ফুলতিদিদির মুখেই রোশন শুনেছে দরবেশদাদুর নাম হাজিবাবা। তেমনই তাঁদের আসল দেশও এটা নয়। অনেক, অ-নে-ক বছর আগে, অনেক, অ-নে-ক দূর এক দেশ থেকে দরবেশদাদুর ঠাকুরদাদা এসেছিলেন এ-দেশে। বাসা বেঁধেছিলেন এই গ্রামে। সেই থেকে তাঁরা এ-দেশের মানুষ। এই দেশ তাঁদেরও দেশ। যখন প্রথম এলেন দরবেশদাদু এ-দেশে, তখন তিনি রোশনের মতো ছোট্ট কি না সে-কথা বলতে পারেনি ফুলতিদিদি। বলতে পারেনি সেই অনেক দূর দেশ কোথায়! কোথা থেকে এসেছেন দরবেশদাদুরা! তাই একদিন আচমকাই রোশন জিজ্ঞেস করেছিল, “দরবেশদাদু, আমাদের এই গ্রামটা বুঝি তোমাদের দেশ নয়?”
দরবেশদাদু চমকে তাকিয়েছিলেন রোশনের মুখের দিকে। তারপর হেসে ফেলেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কে বলল?”
“হ্যাঁ, আমি জানি। তোমাদের দেশ ছিল অ-নে-ক, অনেক দূরে।” উত্তর দিয়েছিল রোশন।
রোশনের মুখে ‘অনেক দূরে’ কথাটা শুনে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল দরবেশদাদুর মুখখানা। ভার-ভার গলায় বলেছিলেন, “আমাদের কোথাও দেশ ছিল না রে রোশন। আমাদের কোনও পাকাপোক্ত ঘরও ছিল না। আমরা দারবিশ। আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদা দোরে-দোরে ভিক্ষে করে অন্ন জোটাতেন। ওই ‘দোর’ থেকেই আমাদের নাম হয়েছে দারবিশ। আর তোর মুখে এখন আমি দরবেশ।” বলার সঙ্গে সঙ্গেই দরবেশদাদুর ভার-মুখে একঝলক হাসি ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে গিয়েছিল।
রোশনের মুখখানাও দরবেশদাদুর মুখের দিকে চেয়ে কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দৃষ্টি এড়াল না দরবেশদাদুর। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “রোশনের মুখখানা অমন শুকিয়ে গেল কেন?”
রোশন থতমত খেয়ে, অন্য কিছু ভেবে না পেয়ে আচমকা জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমরা ভিক্ষে করতে? তা হলে বলো, তোমাদের খুব কষ্ট গেছে?”
“না রে, ভিক্ষে করা আমাদের ধর্ম। এতে আমাদের কষ্ট নেই।” উত্তর দিয়েছিলেন দরবেশদাদু।
দরবেশদাদুর মুখে এ-কথা শুনে রোশন যেন এবার একটু ঠেস দিয়েই শোনাল, “তোমাদের তো কোনও কিছুতেই কষ্ট হয় না। পেটের চামড়া তরোয়াল দিয়ে এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে দিলেও তোমাদের কষ্ট হয় না। জ্বলন্ত কয়লার টুকরো জিভে ধরলেও তোমাদের কষ্ট নেই। এমন কি, কাচের টুকরো চিবিয়ে খেয়ে হজম করতেও তোমাদের কষ্ট-টষ্ট কিচ্ছু হয় না।”
“হ্যাঁ, তুই সত্যি কথাই বলেছিস রোশন, এসব আমাদের অভ্যেস,” বলে দরবেশদাদু আকাশের ওপরে হাত তুলে বলেছিলেন, “এসব করলে আমরা আল্লার কাছে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাই। এমন কি, এই আশায় আমাদের মৌলবীরা ভয়ঙ্কর ঘূর্ণি নাচতে-নাচতে যখন মৃত্যুকে ডাক দেন, তখনও তাদের কষ্ট হয় না।”
ঘূর্ণি নাচ! না, রোশন এ-নাচ কোনওদিন দেখেনি। এ-নাচের নামও কোনওদিন শোনেনি। দেখেনি বলেই অবাক হয়ে দরবেশদাদুর মুখের দিকে তাকাল।
দরবেশদাদু বললেন, “এ-নাচ তোকে দেখাতে পারতুম, যদি তোকে নিয়ে যেতে পারতুম সেই দেশে।”
“কোন দেশে?” উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল রোশন।
“যে-দেশে এখনও ঘুরছে আমাদের বন্ধুরা, আমাদের স্বজন-আত্মীয়রা, আমাদের দারবিশের দল।” উত্তর দিয়েছিলেন দরবেশদাদু।
“সে-দেশ কোথায়? কী নাম?”
“তুরস্ক।”
“সে-দেশে তোমরা থাকতে?”
“না, থাকতুম না। তোকে তো আগেই বলেছি, আমরা কোথাও থাকতুম না। অনেক দেশ ঘুরতে-ঘুরতে আমার মা, বাবা, আমার দাদা, দিদি যখন সে-দেশে পৌঁছল, তখনই আমার জন্ম হয়েছিল। তুরস্ক আমাদের দেশ নয়, আমার জন্মভূমি। কিন্তু আমার জন্মভূমিতে তখন যুদ্ধের দামামা বেজেছে। সেই যুদ্ধের কবলে পড়ে কেমন করে যে আমার দাদা, দিদি, মা, বাবা, আমার দিদা চলে গেল পৃথিবী ছেড়ে, সে-কথা মনে পড়লে এখনও আমার বুক কেঁপে ওঠে। চোখ ভিজে যায়।” বলতে-বলতে সত্যিই দরবেশদাদুর গলার স্বর ধরে এল। চোখের পাতা অশ্রুফোঁটায় ভিজে গেল। তিনি নির্বাক হয়ে রোশনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রোশনও কেমন যেন কথা বলতে ভুলে গেল। তারপর হঠাৎই তার মনে পড়ে গিয়েছিল ফুলতিদিদির কথা। ফুলতিদিদি তাকে বলেছিল, দরবেশদাদুরা থাকতেন অনেক দূর দেশে। তবে কি তুরস্কই সেই দূর দেশের নাম!
বেশিক্ষণ আনমনে থাকতে পারল না রোশন। চমকে উঠেছিল রোশন হঠাৎ। কেননা, রোশনকে অবাক করে দিয়ে আচমকা দরবেশদাদুর গলায় একটুকরো সুর গুন-গুন করে উঠল। তিনি আপন মনে গেয়ে উঠলেন:
হিন্দু হও কি, হও মুসলিম,
ইহুদি, খ্রিস্ট, শিখ,
হিংসা অথবা প্রতিহিংসায়
হও কেন আসুরিক!
ভূতল-গুহায় বন্দি আমরা
অসহ অন্ধকারে,
মিছে কেন তবে রক্ত ঝরানো
খুনোখুনি বারেবারে!
গান গাইছেন দরবেশদাদু। অবাক চোখে রোশন তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। দরবেশদাদুর চোখ দুটি যেন অনেক দূরে হারিয়ে গিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে কাউকে। কে জানে কাকে!
আচমকা তাঁর গলার সুর থামল। আচমকাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমার চোখের দিকে অমন করে কী দেখছিস রে, রোশন?”
“তুমি কাঁদছ কেন?” ভারি মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল রোশন।
দরবেশদাদু উত্তর দিয়েছিলেন, “এ-গানটা যখনই আমার মনে পড়ে যায়, তখনই ওই দেশটার ছবি আমার চোখের ওপর ভেসে ওঠে। তখনই আমার গলায় সুর বেজে ওঠে। ওরে রোশন, সে-দেশে যে আমার মাকে আমি হারিয়ে এসেছি মানুষেরই অমানুষিক অত্যাচারে। মানুষই মানুষকে মারে। যুদ্ধবাজরা মানুষেরই রক্তের ওপর পা ছুড়ে উল্লাস করে। আর আমরা অসহায়ের মতো চোখের জল ফেলি। ওরে রোশন, এই যে দেখছিস মস্ত পৃথিবীটা, এটা যেন একটা অন্ধকার গুহা। এই গুহায় আমরা সবাই বন্দি। এখান থেকে আমাদের পালাবার কোনও পথই খোলা নেই। মরতে আমাদের হবেই। তবুও দ্যাখ, আমরা নিজেদের মধ্যে কেমন বোকার মতো মারামারি করি, ধর্ম নিয়ে জাঁক দেখাই।”
এসব কথার সবটাই রোশন এই বয়সে বুঝতে পারল কি না কে বলবে! তবু যে মায়ের কথা মনে পড়লেই দরবেশদাদুর চোখে জল আসে, এটা বুঝতে তার একটুও কষ্ট হল না। তাই, ঠিক তখনই তার মনে হল, ফুলতিদিদিরও তো তা হলে কত কষ্ট। ফুলতিদিদিও তো তা হলে মায়ের জন্য কাঁদে একা-একা! কেননা, ফুলতিদিদির মা থেকেও যে নেই। তিনি তো উঠতেই পারেন না। সব কাজ তো ফুলতিদিদিকে একাই করতে হয়।
“কী রে রোশন, চুপ করে গেলি কেন?” রোশনকে অমন চুপচাপ আনমনা দেখে দরবেশদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
এবার রোশন সত্যিই লজ্জায় পড়ে গেছে। কী বলবে, তার কোনও উত্তর খুঁজে না-পেয়ে আমতা-আমতা করে বলে ফেলল, “আচ্ছা দাদু, তুরস্ক দেশটা বুঝি অনেক দূরে?”
“দূর বলে দূর!” উত্তর দিয়েছিলেন দরবেশদাদু।
“সেখানে পাহাড় আছে?”
“আছে বইকি! কত পাহাড় সে-দেশে। পাহাড়ে-পাহাড়ে চড়াই-উতরাই। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে ইউফ্রেটিস আর টাইগ্রিস নদী। ও-দেশের মানুষ ইউফ্রেটিসকে বলেন, ‘ফিরাট’। আর টাইগ্রিসের নাম, ‘ডিকলে নেহরি’। নেমে এসেছে ‘সাকারিয়া’ আর ‘কিজিল ইরমাক’ নদীও। পাহাড়ের গায়ে নোনাজলের সরোবর ‘কুজ’। তেমনই পাহাড়ের মাথায় কত আগ্নেয়গিরি। কোনওটা নিঃশেষ হয়ে গেছে, কোনওটা জীবন্ত। কোথাও-কোথাও পপলার আর পাইনগাছের বন। কোথাও-বা ওক। থরে-থরে উঠে গেছে পাহাড়ের গায়ে। পাহাড়ের মাথায় যেখানে বরফ, ঠিক তার নিচে রডোডেনড্রন-এর থোকা রঙের বাহার ছড়িয়ে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। আছে শুকনো খটখটে মরুভূমিও। কোথাও ঠাণ্ডা। কোথাও গরম। কোথাও বরফ। কোথাও তপ্ত বালি রাশি-রাশি। পাহাড়ের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় কত বাদামি রঙের ভালুক। নেকড়ে বাঘ। বন্য শূকর। কত হরিণ আর পাঁচশো রকমের পাখি।” বলতে-বলতে থামলেন দরবেশদাদু।
দরবেশদাদুর কথা শুনতে-শুনতে রোশনের চোখে একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠছিল। ভেসে উঠছিল সেই দেশটার ছবি। ভাসছিল বন। বনে ভালুক আর নেকড়ে বাঘ। হরিণ আর রঙ-বেরঙের পাঁচশো রকমের পাখি। কিন্তু রোশনদের গ্রামে পাঁচশো রকমের পাখি কেউ কোনওদিন দেখেনি। পাঁচশো রকমের কথা ছেড়ে দাও, কাক-চিল মিলিয়ে সবসুদ্ধ পাঁচশোটা পাখি রোশনের গ্রামে আছে কি না সন্দেহ। রোশন যখন আরও ছোট ছিল তখন পাখিতে-পাখিতে গাছ আর আকাশ ছেয়ে থাকত। গাছের ডালে-ডালে কত যে পাখি খেলা করত, গুনে শেষ করা যেত না। তার ওপর হাড়-কাঁপানো শীত পড়লে তো আর রক্ষে নেই, পাহাড় ডিঙিয়ে আসত আরও কত পরদেশি পাখি। আশ্রয় নিত এখানে জলার ধারে, গাছে-গাছে। এখন তারাও আসে না। বলে বাতাসে নাকি দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে, তাই। কে জানে হবেও বা!
“কী ভাবছিস রে রোশন?” রোশনকে অমন আনমনে বসে থাকতে দেখে আবার আচমকা জিজ্ঞেস করলেন দরবেশদাদু।
রোশন যে একটু থতমত খায়নি, তা বলতে পারো না। কিন্তু নিজেকে সামলে নিতে তার সময় লাগল না একটুও। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, “ও-দেশের সেই অত পাহাড় আর নদী পেরিয়ে তুমি এ-দেশে এসেছ?”
দরবেশদাদু উত্তর দিলেন, “শুধু ও-দেশ নয়, আরও অনেক দেশ পার হয়ে এ-দেশে এসেছি। এসেছি, কখনও পায়ে হেঁটে। কখনও ঘোড়ায় চড়ে, নয়তো উটের পিঠে। সে কী ভীষণ দুর্গম পথ। এখন আমার বয়েস চার কুড়ি পেরিয়ে গেছে। তখন আমি তোরই মতো ছোট্ট। তা, সে আজ থেকে সত্তর-পঁচাত্তর বছর আগের কথা। ঠিক সেই সময় তুরস্ক আক্রমণ করল বিদেশি সেনা। তখন তুরস্কের শাসনকর্তা এক সুলতান। সুলতানের সেনারা বিদেশি সেনার সঙ্গে পেরে উঠল না। কত বোমা পড়ল। কত কামানের গোলা ছুটল। কত মানুষের প্রাণ গেল। কত নিরীহ মানুষ বিদেশি সেনার হাতে বন্দি হল। বন্দি মানুষদের তারা পাঠাল নির্বাসনে। কাউকে পাঠাল সাগরের নির্জন দ্বীপে। কেউ-বা গেল জনমানবশূন্য তপ্ত মরুভূমিতে। আবার কাউকে-কাউকে নির্বাসন দিল বরফ ঢাকা পর্বতচুড়োয়।” বলতে-বলতে দরবেশদাদুর মুখখানা যেন রাঙা হয়ে ওঠে। রেগে গেলে ঠিক মানুষের যেমন হয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি কথা বলতে পারলেন না। থমথম করছিল তাঁর মুখখানা। তারপর হঠাৎ তিনি এমন চিৎকার করে উঠলেন, রোশন ভয়ে আঁতকে উঠল। চমকে তাকাল দরবেশদাদুর মুখের দিকে। দরবেশদাদুর মুখখানা যেন হঠাৎ কেমন পালটে গেছে। কেন, তা রোশন বুঝতে পারল না। কেন তিনি চিৎকার করে উঠলেন আচমকা এমন করে!
এবার রোশন স্পষ্ট দেখতে পেল, দরবেশদাদুর চোখ দুটো ছলছল করছে। ঠোট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। তিনি রোশনের মুখের দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে রইলেন নিমেষের জন্য। সেই চোখের দৃষ্টি দেখে ভয় পেয়ে গেল রোশন। রোশনের মনে হল, এখনই এখান থেকে সে উঠে পালায়। কিন্তু পারল না। কেননা, দরবেশদাদুই কথা বললেন।
দোষ করে ফেললে যেমন লজ্জা পায়, এই বৃদ্ধ মানুষটিও তেমনই যেন রোশনের মুখের দিকে চেয়ে লজ্জা পেলেন। ভয়ে আড়ষ্ট ছোট্ট রোশনকে তিনি কাছে টেনে নিলেন। আদর করে বললেন, “না রে, আমি তোকে বকিনি। মাঝে-মাঝে যখন সেইসব কথা একটু-একটু মনে পড়ে যায়, মাথাটা ঠিক রাখতে পারি না। কেমন যেন বোকার মতো চিৎকার করে ফেলি। বুড়ো হলে বোধ হয় মানুষ এমনই হয়ে যায়।” বলতে-বলতে দরবেশদাদু আচমকা হা-হা করে হেসে উঠলেন। বুকের ভেতর থেকে সে-হাসি যেন উপচে পড়ল হাওয়ায় লুটোপুটি খেতে-খেতে। এ-হাসি বুঝি-বা রোশনের ভয় ভাঙানোর জন্য।
রোশনের ভয় ভাঙল কি না কে বলবে! কারণ, দরবেশদাদুকে অমন করে হাসতে দেখেও রোশনের মুখে একটুও হাসি ফুটল না। একটি কথাও সে মুখ ফুটে বলতে পারল না। শুধু শান্ত চোখে চেয়ে রইল দরবেশদাদুর মুখের দিকে।
দরবেশদাদু রোশনের মাথায় ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কথা বলছিস না কেন? এখনও রাগ করে থাকবি?”
“আমি তো রাগ করিনি।” হঠাৎই রোশন মুখ ফুটে বলে ফেলল।
“তবে চুপ করে আছিস যে?” জিজ্ঞেস করলেন দরবেশদাদু।
রোশন দরবেশদাদুর মুখের দিকে তেমনই শান্ত চোখে চেয়ে বলল, “যুদ্ধে যখন সুলতান হেরে গেল, তখন তোমরা কী করলে দরবেশদাদু?”
“আমরা আর কী করব! আমাদের বন্দি করা হল। বন্দি করল সেই বিদেশি সেনা। বন্দি করল আমার বাবাকে, মাকে, আমার দাদা, দিদি সক্কলকে। এমন কি, আমাকে পর্যন্ত। আমার বাবা বিদেশি-সেনাদের কত অনুরোধ করলেন, কত কাকুতি-মিনতি করে বললেন, ‘শোনো হে সৈনিকের দল, আমরা তোমাদের শত্রু নই। আমরা দারবিশ। এ-দেশ আমাদের দেশ নয়। আমরা দেশে-দেশে ভিক্ষে করে বেড়াই।’ তারা বাবার কথা শুনলই না। উলটে সকলের চোখে ঠুলি পরাল জোর করে। যেন কেউ চোখে দেখতে না পায়। এক-একজনের জোড়া-হাত পেছনে টেনে এনে শেকল দিয়ে বাঁধা হল। যেন কেউ হাত দিয়ে চোখের ঠুলি খুলতে না পারে। কিংবা যেন কিছু ছুঁতে না পারে। কিন্তু কী জানি কেন, বোধ হয় আমি ছোট বলে, আমার হাত বাঁধল না তারা। চোখে ঠুলিও পরাল না। আমাদের সকলকে বন্দি করে নিয়ে চলল, অনেকদূরে এক পর্বতের ওপর। নিচে পাথর আর পাথর। কোনওটা মস্ত উঁচু। কোনওটা নিচু। ছোট-ছোট। আর পর্বতের অনেক ওপরে বরফে ঢাকা। আমাদের সকলকে সেই পাথরের ওপর দিয়ে টানতে-টানতে সেনারা নিয়ে চলল পর্বতের ওপরে। খানিকটা উঠেই তারা আমাকে আচমকা ঠেলে ফেলে দিল একটা গুহার ভেতর। অন্ধকার চারদিক। আমি অন্ধকারে পড়েই চিৎকার করে উঠলুম। কেঁদে ফেললুম। কিন্তু আমার কান্না শোনার জন্য সেখানে তখন কে আর বসে আছে! আমার ভাগ্য ভাল, আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লুম বটে, তবে আমার তেমন লাগল না। শুধু একটু-আধটু এধার-ওধারে ছড়ে-ছিঁড়ে গেল। কিন্তু তাতে লাভ কী! আমাকে যে এই অন্ধকারেই পড়ে-পড়ে মরতে হবে। এখান থেকে বাঁচবার কোনওই রাস্তা নেই। আমার চারপাশে পাথর উঁচু-উঁচু। পাথর পাশে, সামনে মাথার ওপর। কে নড়াবে সেই পাথর! সুতরাং কান্না ছাড়া তখন আর আমার কিছুই করার নেই। আমি জানতেও পারব না আমার মা, বাবা, দাদা, দিদির কী হল?”
শুনতে-শুনতে রোশনের গায়ে কাঁটা দেয়। উৎকণ্ঠায় তার শিরদাঁড়ায় টান ধরে। সে সিধে হয়ে বসে। ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “তারপর কী হল?”
“তারপর যা হল শুনলে শিউরে উঠবি।” বললেন দরবেশদাদু, “সে এক ভয়ঙ্কর বিপদভরা আমার জীবনের গল্প।” বলতে বলতে একটু থেমে তিনি রোশনের চিবুক ছুঁলেন। ছুঁয়ে বললেন, “না থাক। সে-গল্প শুনে কাজ নেই। শুনলে তুই কষ্ট পাবি।”
রোশন উত্তর দিল, “আমি যদি কষ্ট না পাই, তা হলে বলবে তো?”
দরবেশদাদু রোশনের মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হাসলেন।
রোশন দরবেশদাদুর মুখে হাসি দেখে বলল, “সত্যি বলছি, আমি একটুও কষ্ট পাব না। তুমি বলো!”
রোশনের কথা শুনে দরবেশদাদু বললেন, “বেশ, তবে শোন!” এই কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে রোশনের মনে হল, দরবেশদাদুর চোখের দৃষ্টি যেন অনেক, অ-নে-ক দিন আগের অনেক দূর এক দেশে হারিয়ে গেল। তিনি বলতে শুরু করলেন, “তারা আমাদের যে পর্বতে নির্বাসন দিয়েছিল, সে পর্বতের নাম আরারাত। একসময়ে এই পর্বত ছিল এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। অনেকদিন আগে পর্বতের চুড়োটা এক ভীষণ শব্দে ছিটকে পড়ে ঝলসে উঠেছিল আগুনে। সেই গনগনে আগুনের সঙ্গে পর্বতের পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল আকাশ ছেয়ে ছাই আর ছাই। তারপর গলগল করে গড়িয়ে পড়ে ফুটন্ত লাভা। গাদা-গাদা ছাই ছড়িয়ে পড়ল সারা পর্বতের গায়ে-গায়ে পাথরের ওপর এত পুরু হয়ে। তবে এখন সেই আগ্নেয়গিরি নিষ্প্রাণ। কিন্তু পর্বতের সেই রাশি-রাশি পাথরের ওপর এখনও ছড়িয়ে আছে। সেই আগ্নেয়গিরির ছাই। সেই ছাই এতই পুরু যে, পর্বতের মাথার ওই জমাটবাঁধা বরফ গলে পর্বতের গা বেয়ে নিচে ঝরনা হয়ে নেমে আসতে পারে না। বরফ-গলা জল শুষে নেয় সেই ছাই।
“এ ছাড়াও এই আরারাত পর্বতের আর-এক কারণে খুব নাম।” বলতে-বলতে একটু থেমে দরবেশদাদু রোশনকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাইবেলের সেই গল্পটা জানিস?”
“কোন গল্পটা?”
“সেই মহাপ্লাবনের গল্প?” জিজ্ঞেস করলেন দরবেশদাদু।
রোশন বলল, “একটু-একটু জানি। ভাল মনে নেই।”
“তবে শোন!” বলে দরবেশদাদু আবার বলতে শুরু করলেন, “সে অনেকদিন আগের কথা। ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন তখন এই ভেবে যে, মানুষ পৃথিবীকে সুন্দর করবে তার সৎ কাজে, সৎ আচরণে আর ভালবাসায়। কিন্তু মানুষ হয়ে গেল ভীষণ পাপী। ঈশ্বর মানুষের ওপর খুব অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি ঠিক করলেন, পৃথিবীতে যত মানুষ আছে তাদের নিশ্চিহ্ন করে আবার নতুনরূপে পৃথিবীকে গড়ে তুলবেন। তাই তিনি শুধু একটি মানুষের একটি পরিবারের বউ, ছেলেমেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই মানুষটির নাম নোয়া। তিনি জানতেন, নোয়া আর তার পরিবারের সব মানুষ সৎ। ঈশ্বর তাই নোয়াকে তাঁর মনের ইচ্ছা জানিয়ে একটি মস্ত বড় জাহাজ তৈরি করে তাতে আশ্রয় নিতে বললেন। আরও বললেন, জাহাজে বেশ কয়েক মাসের জন্য খাবার সংগ্রহ করে রাখতে। এমন কি, কয়েকটি জীবজন্তুকেও জাহাজে আশ্রয় দিতে বললেন। নোয়া ঈশ্বরের আদেশ শুনে এসব করার পর ঈশ্বর টানা চল্লিশ দিন একনাগাড়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে পৃথিবীকে জলের নিচে ভাসিয়ে দিলেন। সেই বৃষ্টির প্লাবনে নোয়ার জাহাজ ভেসে চলে এদিক-ওদিক। তারপর যখন পৃথিবীর সবকিছু জলের তলায় তলিয়ে ধুয়েমুছে শেষ হয়ে গেল, তখন বৃষ্টি থামল। ধীরে-ধীরে মহাপ্লাবনের জল কমতে থাকল। নোয়ার সেই জাহাজ ভাসতে-ভাসতে এই আরারাত পর্বতের চুড়োয় এসে আটকে গেল।
“এই সেই আরারাত পর্বত। এই আরারাত পর্বতে আমাদের নিবাসন দেওয়া হয়েছিল।
“আমি তখন অন্ধকার গুহায়। আমার মা, বাবা, দাদা, দিদি যে কোথায় গেল আমি জানি না। রোশন, আমি তখন তোরই মতো ছোট্ট। আমি না হয়ে আমার বদলে তুই হলে তখন কী করতিস, আমি জানি না। আমি কিন্তু গুহার সেই অন্ধকার কাঁপিয়ে বুকফাটা কান্না শুরু করে দিলুম। আর্তনাদ করে ডাকতে লাগলুম আমার মাকে, বাবাকে, সবাইকে। কে সাড়া দেবে! কাজেই মরবার আগে যেমন সব মানুষ বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে রাস্তা খোঁজে, আমিও তাই করলুম। আমি অন্ধকার হাতড়াই আর চিৎকার করি।
অন্ধকার হাতড়াতে-হাতড়াতে হঠাৎ যেন আমার মনে হল জমাট অন্ধকারটা হালকা হয়ে আসছে! মনে হয় যেন একটু-একটু আলো দেখা যাচ্ছে। আমার কেন ভয় লাগে! এ কী আশ্চর্য কথা! বিপদের সময় আলোর আভাস দেখলে ভয় পায় কোন মানুষ! আলো দেখলেই তো মানুষ আনন্দে উল্লাস করে! তবে কি আমিই পৃথিবীর প্রথম সেই নিরেট বোকা ছেলে, যে আলো দেখে ভয় পেয়েছিল! হবে হয়তো! তবে কি আমি আবার অন্ধকারেই লুকিয়ে পড়ব।
“না, আমি আলোর দিকেই এগিয়ে চললুম। গুহার অন্ধকার ডিঙিয়ে আলো যতই আমার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে, ততই যেন আমার কান্নাটাও ধীরে-ধীরে মনের ভেতর থিতিয়ে আসে। হঠাৎ যেন আমার মনে হয়, আমি বোধ হয় বেঁচে যাব। কেননা, পর্বতের বিশাল-বিশাল পাথরের ফাঁক দিয়ে একটুকরো আকাশ আমার নজরে পড়ে গেল। আমি মস্ত উঁচু একটা পাথরকে আঁকড়ে ধরে ওপরে ওঠার জন্য আঁকপাক শুরু করে দিলুম। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর আমি পাথরটার মাথায় উঠতে পারলুম। এই পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে আমার মনে হল, গুহার যে-প্রান্তে সেনারা আমায় মারবার জন্য ফেলে দিয়েছিল, সেই গুহার অন্য প্রান্ত দিয়ে আমি বেরিয়ে এসেছি। দেখছি, সামনে আর কোনওই অন্ধকার নেই। শুধুই আলো। এই আলো-ঝলমল পর্বতের মস্ত এই পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করে ডাক দিলুম, ‘মা-আ-আ!’ পর্বতের কঠিন পাথরের গায়ে-গায়ে আমার চিৎকারের নরম স্বর প্রতিধ্বনি তুলে বাতাসে মিলিয়ে গেল। আমি আবার চিৎকার করলুম, ‘বাবা-আ-আ!’ আবারও প্রতিধ্বনি উঠল। তারপর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। কেউ উত্তর দিল না। তখন আমার মনে হল, এই ভীষণ নিস্তব্ধতা যেন আমার বুকের ওপর চেপে বসছে। মনে হল, আমি বুঝি পালালেই এই নিস্তব্ধতার হাত থেকে বাঁচতে পারি।
“না, পালালে আমি কেমন করে খুঁজে পাব আমার মা-বাবাকে, দাদা-দিদিকে! কাজেই আমাকে চোখ খুলে চারদিকে নজর রাখতে হল। যদি কাউকে দেখতে পাই! কান পেতে শুনতে হল। যদি কারও সাড়া পাই! কেউ যদি হঠাৎ ডাকে আমার নাম ধরে!
“কিন্তু না, কাউকে দেখতে পেলুম না আমি। কেউ আমার নাম ধরে ডাক দিল না। একবার চিন্তা কর, তখন আমি বয়সে তোর মত। একা, একটা মস্ত পর্বতের নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার আপনজনকে ডাক দিয়ে খুঁজছি। পর্বতের মাথায় বরফ, নিচে খাদ। আমি যে পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তার মাথা ভর্তি আগ্নেয়গিরির ছাই। এতখানি পুরু। আমার পা ডুবে যায়। আমি এখন কী করব জানি না। এই পাথর ডিঙিয়ে কোনদিকে গেলে আমার বাবা-মার সন্ধান পাব তাও আমার মাথায় আসছে না। এই পাথরটার ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে যে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে তাদের খোঁজাখুঁজি করব, তারও উপায় নেই। কাজেই এই পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই আমায় কাঁদতে হবে।
“হ্যাঁ, আমি কাঁদছি। তবে এইখানে দাঁড়িয়ে না থেকে কাঁদতে-কাঁদতে একটার পর একটা পাথর ডিঙোবার চেষ্টা করতে লাগলুম। যতই পথের সন্ধানে এগিয়ে যাই, ততই দেখি এক-একটা ঢাউস পাথর আমার পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁড়ি-কাঁড়ি ছাই চারদিকে ছড়িয়ে। সেই ছাইয়ের গাড্ডায় বারবার পা গেঁথে যায়। ছাই ডিঙিয়ে সেইসঙ্গে পাথর টপকে আর কতক্ষণ যুঝতে পারব আমি! কখনও হাঁফাচ্ছি। কখনও দাঁড়াচ্ছি। কখনও হাঁক পাড়ছি, কখনও হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠছি। কারও সাড়া পাচ্ছি না। চারদিক সুনসান। হাওয়া বইছে ঠাণ্ডা কনকনে। আমি এমনই ভয় পেয়ে গেছি যে, সে-ঠাণ্ডা আমার গায়ে লাগছে না। ভয় আর ভাবনায় একটা ছোট্ট ছেলে যখন নাজেহাল হয়ে যায়, যখন সে অসহায়ের মতো একা বিপদের সামনে পড়ে, তখন বোধ হয় সে আকুল হয়ে মা আর বাবাকে ছাড়া আর কাউকেই ডাকে না। আমিও তাই ডাকছি। ডাকতে-ডাকতে আমার গলা যখন প্রায় ভেঙে যায়, তখন কে যেন আমার বাবার গাওয়া একটা গান আমায় মনে করিয়ে দিল। সে-গানটা এখনও আমার মনে আছে। এখনও যখন হতাশায় মন ভেঙে যায়, আমি মনে-মনে গেয়ে উঠি:
হয়েছে আলোর দিন শেষ,
আধার আসছে নেমে চোখে,
তবু কেন ভয় পাও তুমি?
সমুখে দাঁড়ায়ে দ্যাখো ও কে!
হাতে তার অনেক আলোর
ভালবাসার উজল শিখা,
নেই নেই আর কোনও ভয়,
এল ওই নিশান্তিকা।
“তখন আমি এ-গানের কোনওই মানে বুঝতুম না। তবু বাবার গলায় এ-গানটা শুনতে কী ভালই না লাগত! আমিও বাবার সঙ্গে কখনও-সখনও গুন্গুন করতুম। মানে না-বুঝি সুরটাই তখন মন ভরিয়ে দিত।
“আমি একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, ‘বাবা এ-গানটার মানে কী?’
“বাবা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বড় হলে বুঝবি।’
“আমি বললুম, ‘সুরটা কত ভাল। সুরটা ভাল লাগলে গানের মানেটা বুঝতে কেন অতদিন লাগবে?’
“বাবা চমকে তাকিয়েছিলেন আমার চোখের দিকে। তারপর বলেছিলেন, ‘বাপ আমার, অন্ধকার দেখে ভয় পাস না। অন্ধকারের পরেই তো আলো আসে। রাত কাটলেই সকালের উজ্জ্বল আলোয় জগতটা উছলে ওঠে, তাই না?’
“অনেকটা মানে তখন বুঝতে পেরেছিলুম। আশার আলোর ওই গান আমার মনে পড়ে গেলেও, ভয় গেল না। ভয়ে আমার বুকের কাঁপুনি থামল না। পাথর আর ছাইয়ে পা ঘষটে-ঘষটে। আমি এদিক-ওদিক করছি। একটার পর একটা পাথরে বুক ঠেকিয়ে, দু’ হাত জাপটে যখন উঠছি-নামছি, তখন আমি বুঝতে পারছি, আমার বুক ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ছে। দু’ হাতের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে যাচ্ছে। এমন সর্বনাশা বিপদের সময়ে কেন আমার মাথায় এই গানের কথাগুলো গুন্গুন করে উঠল! আমি থাকতে পারলুম না। আবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলুম, ‘বাবা-আ-আ।’
“ওপরে বরফ-ঢাকা পাথর, কাঁপিয়ে আমার কান্নার স্বরটা আঘাতে-আঘাতে ঘুরপাক খেতে লাগল। তারপর নিয়মমাফিক আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“এ কী, আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ এমন চমকে উঠল কেন? না, না নিস্তব্ধ তো নয়! একটা যেন কার গলার ক্ষীণ শব্দ আমার কানে ভেসে আসছে! হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি। আমার কান্নাটা থমকে থেমে গেল। উত্তেজনায় শিউরে উঠি আমি। আমার কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যায়। ভাবি, এ কী কোনও মানুষের গলার স্বর, না কোনও পাহাড়ি জন্তুর! নাকি কোনও পাখির! না, এ কখনওই পাখির কাকলি হতে পারে না। পাখি কেন ডাকবে অমন করে একটানা। তা ছাড়া এখানে গাছগাছালিই বা কই? কোথায় বাসা বাঁধবে পাখি? হলেও হতে পারে কোনও পাহাড়ি জন্তুর। হতে পারে কোনও গুহার ভেতর থেকে হাঁকাড় দিচ্ছে। বোধ হয় তারই অস্পষ্ট স্বর কানে আসছে।
“কিন্তু এ তো হাঁকাড় নয়। আরও একটু ভাল করে কান পেতে শোনার চেষ্টা করি আমি। হ্যাঁ, আমি শুনতে পাচ্ছি। শুনতে পাচ্ছি, অস্পষ্ট এক কোমল সুরের ঝঙ্কার। আমি উত্তেজনায় অস্থির হয়ে একবার এদিকে লাফিয়ে একটা পাথরে উঠি। আর-একবার ওদিকের পাথর থেকে লাফিয়ে নামি। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারি না, কোনদিক থেকে আসে ওই কোমল সুরের ঝঙ্কার। আশ্চর্য এই, আমি যেদিকেই লাফাই, মনে হয় শব্দটা যেন তার ঠিক উলটো দিক থেকে আসছে। আমার কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। একেই কি বলে অলৌকিক কাণ্ড!
“যখন অনেক লাফালাফি করে দমসম হয়ে গেলুম, তখনই আমার মনে হল এত হাঁকপাক করা ঠিক নয়। মনে হল, এখনই একটু দম নিতে হবে। আমি স্থির হয় দাঁড়িয়ে পড়লুম। কোনদিক থেকে শব্দটা আসছে শান্ত হয়ে ঠাওর করার চেষ্টা করলুম।
“কয়েক মুহূর্তই মাত্র আমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলুম। যখন বুঝতে পারলুম সামনের পাথরটা আমি সহজেই ডিঙোতে পারব, তখনই আবার এগিয়ে গেলুম। হ্যাঁ, এ-পাথরটা পার হতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হল না। তাই তো, শব্দটা যেন এইদিক থেকেই আসছে! আরও একটা চড়াই পার হলুম! এবার আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি আমার আন্দাজ ঠিকই। যদিও শব্দটা এখনও অস্পষ্ট, তবুও যে আমি শব্দের কাছাকাছি চলে এসেছি, এটা বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না আমার। আমি পাথর টপকাতে-টপকাতে আরও এগিয়ে চললুম।
“আমি যতই এগোচ্ছি, আমার বুকের ভেতরটা ততই যেন হাঁসফাঁস করছে। এবার আমি বেশ বুঝতে পারছি, এ মানুষের কণ্ঠস্বর। এ-মানুষ আর কেউ নয়, আমার বাবা। একটু আগে যে-গানটার কথা আমি বলছিলুম, সেই গানটাই আমার বাবা গাইছেন। আর আমার ভুল হল না। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, নির্জন পাহাড়ে, বাতাসের দুরন্ত দোলায় আমার বাবার গলার গান ভেসে আসছে।
“আমি একটা-একটা পাথর ডিঙোচ্ছি আর বাবার গলার সুরেলা স্বরটা আমাকে অস্থির করে তুলছে। আমি তাড়াতাড়ি বাবার কাছে পৌঁছবার জন্য এত তাড়াহুড়ো করছিলুম, পা হড়কে পড়ে যেতে কতক্ষণ! নিচে খাদের অতলে পড়লে আর দেখতে হবে না, নিমেষে সব শেষ।
“কিন্তু এখনও কেন বাবাকে খুঁজে পাচ্ছি না! এত-এত পাথর, তার ওপর গাদা-গাদা ছাই। কোথায়, কোন পাথরের আড়ালে বাবা ঢাকা পড়ে গেছেন! অথচ এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে বাবার কণ্ঠস্বর। কী মিষ্টি দরাজ গলা।
“আমি আর থাকতে পারলুম না। গলা ফাটিয়ে চেঁচালুম, ‘বাবা-আ-আ-আ।’
“গান থেমে গেল। আচমকা। বাবা সাড়া দিলেন আমার নাম ধরে, ‘রোশন-ন-ন-ন?’
“হ্যাঁ বাবা, আমি। তুমি কোথায়?’
“বাবা উত্তর দিলেন, আমি এইখানে।’
“আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
“বাবা জবাব দিলেন, ‘আমার চোখ বাঁধা। আমি জানি না, কোথায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। মনে হচ্ছে, কোনও পাথরের টিবির ওপর। একটুও নড়তে পারছি না। হাত দিয়ে যে হামাগুড়ি দেব, তারও উপায় নেই। হাতে শেকল। আমি রং গান গাই। তুই আমার গানের সুর শুনে আমাকে খুঁজে বের কর। দেখিস বাবা, আমাকে খুঁজতে গিয়ে পড়ে না যাস!
“বাবা আবার গান গেয়ে উঠলেন। আমি বাবার সেই গান শুনে বাবাকে আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগলুম।”
বলতে-বলতে হঠাৎ দরবেশদাদু থামলেন। রোশনের মুখের দিকে কেমন যেন নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। রোশন একমনে শুনছিল। সে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “থামলে কেন? তারপর কী হল, বলো?”
“তারপর?”
“হ্যাঁ, বলল, তারপর কী হল?”
“তারপর আমি দেখতে পেলুম বাবাকে। দেখলুম, বাবা দাঁড়িয়ে আছেন একটা পাথরের কিনারে। আমি দেখতে পেলুম, বেবাবা যদি এক-পা এগোয় নির্ঘাত খাদে পড়ে যাবেন। নিশ্চিত মরণ। আমি ভয়ে শিউরে উঠলুম। আর্তনাদ করে বললুম, ‘বাবা, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেইখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো! একদম নড়াচড়া করো না। সামনেই খাদ। আমি এই পাথরটা টকালেই তোমার কাছে পৌঁছে যাব।’
“আমি যে-পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখতে পেয়েছিলুম সে-পাথরটা টপকাতে আমার মুহূর্তও দেরি হল না। আমি ঠোক্কর খেতে-খেতে বাবার কাছে পৌঁছেও গেলুম। পৌঁছেই বাবাকে জড়িয়ে ধরলুম। বাবা একটি ছোট্ট ছেলের মতো হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমিও বাবাকে কাঁদতে দেখে কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে-কাঁদতে জিজ্ঞেস করলুম, ‘মা, দাদা, দিদি ওরা কোথায় বাবা?’
“বাবা আমার কান্না শুনে নিজে কান্না থামিয়ে বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা! তুই চট করে আমার চোখের ঠুলিটা খুলে দে! ওদের এক্ষুনি খুঁজে বের করতে হবে।’
“আমিও কান্না ভুলে চটপট বাবার চোখের ঠুলিটা খুলে দিলুম। অনেকক্ষণ অন্ধকারে চোখ ঢাকা থাকার পর, প্রথম আলো দেখলে যেমন করে মানুষ চোখ পিটপিট করে, তেমনই চোখ পিটপিট করে বাবা আমার দিকে তাকালেন। তারপর অবাক চোখে পর্বতটাকে দেখতে লাগলেন। দেখতে-দেখতে বললেন, ‘আমার হাতের বাঁধনটা খুলে দিতে পারিস কি না দ্যাখ তো বাপ!’

“বাবার হাতের শেকলটা চটপট খুলে ফেলার জন্য আমি টানাটানি শুরু করে দিলুম। এমন পেঁচিয়ে আঁটাআঁটি করে বেঁধেছে যে, প্রথমটা আমি কিছুতেই কায়দা করতে পারছিলুম না। আমার হাত ব্যথা হয়ে গেল।
“বাবা বললেন, ‘মনে হচ্ছে খুলবে না। ছেড়ে দে!’
“আমি বললুম, ‘খুলবে, তুমি চুপটি করে দাঁড়াও!’
“বাবা উত্তর দিলেন, ‘তোর যে কষ্ট হচ্ছে।’
“বাবার এই কথাটা মুখ থেকে পড়তে-না-পড়তেই সেই লোহার শেকলও খুলে গেল। ভারী শেকলটা আমার হাত ফসকে পাথরের ওপর পড়ল বটে, কিন্তু তেমন শব্দ হল না। কেননা, এ-পাথরের ওপরটাও অ্যাত্তোখানি পুরু ছাইয়ে ঢাকা। ছাই ভিজে সপসপ করছে। গাদা-গাদা ছাই বরফ-গলা জল শুষে খাচ্ছে আর খাচ্ছে।
“এই বয়সে শেকল খোলার মতো এমন যে একটা অসাধ্য সাধন করে ফেললুম, এর জন্য বাবা আমাকে ‘শাবাশ’ দেওয়ারও সময় পেলেন না। নিজের বাঁধন-খোলা হাত দুটো আকাশে তুলে। বাবা যে কাকে ধন্যবাদ জানালেন, আমি জানি না। তারপর আকাশ থেকে হাত নামিয়ে বললেন, ‘লোহার শেকলটা এইখানেই পড়ে থাক।’ বলে বাবা আমার হাত ধরলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই আর কারও সাড়া পাসনি?’
“আমি উত্তর দিলুম, ‘না।’
“বাবা বললেন, ‘চ’, একটা-একটা পাথর টপকে দেখি তারা কোথায় আছে।’
“আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘যারা যুদ্ধ করে তারা কি এমনই ভয়ঙ্কর হয়? নিরীহ মানুষের হাতে শেকল বেঁধে, চোখে ঠুলি পরিয়ে পর্বতের শিখরে ছেড়ে দিতে তাদের মনে একটুও দয়া হয় না?’ বলতে-বলতে আমার গলা কান্নায় কেঁপে উঠল।
“আমার কথায় বাবা বোধ হয় কান দিলেন না। দিলেও আমার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘এখন কান্নার সময় নয় রেহান। নির্জন পর্বতের ওপর আমাদের কান্না কেউ শুনতে পাবে না। দয়ার কথা না তুলে এখন আমাদেরই চেষ্টা করতে হবে। তাদের খুঁজে বের করার।’
“এই ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি, আমার ছোটবেলার নাম ছিল রেহান। এখন আমায় সবাই হাজিবাবা বলে ডাকে। কিন্তু রোশন, তুই ডাকিস আমায় দরবেশদাদু বলে! থাক সে-কথা। আমি আবার বাবাকে বললুম, ‘এত বড় পর্বতের কোথায় আমার মা, দাদা, দিদিকে খুঁজে পাব আমরা?’
“বাবা উত্তর দিলেন, ‘এত বড় পর্বতে তুই যেমন করে আমাকে খুঁজে পেয়েছিস।’
আমি বললুম, “তোমার কষ্ট হবে বাবা। তুমি বরং এখানে দাঁড়াও, আমি তাদের খুঁজে আনি।’
“রেহান, বাপ আমার, ছেলের মুখে এমন কথা শুনে কোন বাবার না গর্বে বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু ওরে ছেলে, তুই যে এখনও নেহাত কচি। আমি বাবা হয়ে তোর এমন কথায় কেমন করে সায় দিই? কোন বাবাই বা সায় দিতে পারে? তার ওপর তাদের খুঁজতে-খুঁজতে তুইও যদি হারিয়ে যাস, তবে আমার যে শেষ সম্বলটুকুও আমি খোয়াব। তোকে একা আমি কি ছাড়তে পারি? এত নির্দয় কি হতে পারে কোনও বাবা? আয়, আমরা দু’জনে একসঙ্গে তাদের খুঁজি! খুঁজতে-খুঁজতে যদি হারিয়ে যাই, তবে একসঙ্গে দু’জনেই হারিয়ে যাব। আর যদি তাদের খুঁজে পাই, আনন্দে একসঙ্গে গান গেয়ে উঠব।’
“অগত্যা বাবার কথাই শুনতে হল। আমরা দু’জনেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি আর দুর্গম পর্বতের এধারে-ওধারে হাতড়ে বেড়াই।
“সূর্য ঢলে পড়ছে। আর খানিক পরেই এই আরারাত পর্বতের চুড়োর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে সূর্য। আমরাও তখন দু’জনে এই পর্বতের পাথরের কোনও অন্ধকার আড়ালে হারিয়ে যাব। কতক্ষণ ধরে যে বাবা আর আমি হন্যে হয়ে মা, দাদা আর দিদিকে খুঁজেছি, তার হিসেব আমি বলতে পারব না। তবে, এখন আমরা দু’জনেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সত্যি বলতে কী, আর পা চলে না। গলায় এত ব্যথা হয়েছে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে যে, দু’জনেরই এখন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক কষ্টে শেষমেশ বাবা যখন বললেন, ‘ওরা হারিয়ে গেছে চিরদিনের মত। আর ওদের খুঁজে পাব না,’ তখন আমার বুকের ভেতরটা এমন গুমরে উঠল যে, আমি কান্নায় ফেটে পড়লুম। কাঁদতে-কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরলুম। আমার মুখখানা নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বাবাও কেঁদে ফেললেন। তারপর সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘রেহান থাম বাবা। তুই যতই কাঁদবি, আমার মন ততই ভাঙবে। সূর্য পশ্চিমে ঢলেছে। আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের বিপদ হবে। জানি না এখন আমরা কোন দিকে চলে এসেছি। চ’ এবার, এই পাথরের রাজ্য থেকে নেমে বাঁচার রাস্তা খুঁজি। আমি বোধ হয় সব হারালুম রেহান। এবার তোকে যদি রক্ষা করতে না পারি, তবে যে আমার কিছুই থাকে না। সব শেষ হয়ে যাবে।
“সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। নির্জলা উপোস। সারাদিন কত কসরত করেছি, কত লড়াই করেছি পর্বতের সঙ্গে। আর যেন পারছি না। সন্ধে নামছে আকাশ থেকে পর্বতের আনাচে-কানাচে। আমরা নামছি পর্বত থেকে উপত্যকায়। বাবা আমার হাত ধরে আছেন। আমি বাবার পায়ের দিকে চেয়ে আছি। বুঝতে পারছি বাবার পা পড়ছে এলোমেলো। খোঁড়াচ্ছেন। বোধ হয় কেটে গেছে। নয়তো লেগেছে। আমার বুকের ছড়ে যাওয়া ক্ষত থেকে এখন আর রক্ত পড়ছে না। কিন্তু জ্বালা করছে। এতক্ষণ যুদ্ধ করেছি পাথরের সঙ্গে। হেরে গেছি আমরা, বাবা আর ছেলে। হেরে ফিরে যাচ্ছি কোথায়, সেটাও জানি না। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি ক্ষত-বিক্ষত দেহ। আর কান্নার জল।
“এখন সন্ধের ছায়া অনেকটা চরাচরই ছেয়ে ফেলেছে। বাবা বললেন, ‘কী হবে রেহান, আমার যে হাত-পা কাঁপছে! অন্ধকার হয়ে আসছে যে!’
“হ্যাঁ, আমিও বললুম, ‘আমিও আর পারছি না। কোথায় চলেছি, কোন উপত্যকার দিকে কে জানে! আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলুম, ‘বাবা, তুমি কি এখানে একটু বসবে?’
“তুই বসলে আমিও বসতে পারি।’ বাবা উত্তর দিলেন। ‘বুঝতে পারছি তোরও কষ্ট হচ্ছে।’
“সত্যিই তাই। আর কিছুতেই পারছিলুম না। পাথর ডিঙিয়ে পর্বতের ওপর থেকে নামছি। তাও যে কী কষ্টের, বোঝাতে পারব না। আমরা দু’জনেই টলছি। মনে হচ্ছে এখনই টাল খেয়ে পড়ে যাব। কাজেই বসে পড়া ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই।
“প্রথমে বাবাই বসে পড়লেন। সামনে কী আছে, না আছে। দেখলেন না। বসেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু আমার বসা হল না। আমি অবশ্য বসতেই যাচ্ছিলুম, এমন সময়ে অনেক দূরে হঠাৎ চোখের দৃষ্টি পড়তেই থমকে গেলুম। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম একটা আলোর বিন্দু মিটমিট করে জ্বলছে ওই দূর অন্ধকার ভেদ করে। আমার খটকা লাগল। আরও একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য দু’ হাত দিয়ে আমার দু’ চোখ মুছে নিলুম। কখনওই না, কোনওই সন্দেহ নেই, ওটা আলো না হয়ে আর কিছু হতেই পারে না। বাবা আমাকে অমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাঁড়িয়ে কী দেখছিস?’
আমি আনন্দে উদ্বেল হয়ে বললুম, ‘বাবা, আলো!’
“‘আলো? কই?’ যেন উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ওঠেন বাবা।
“‘ওই যে, দূরে মিটমিট করছে।’
“বাবার আর সবুর সইল না। যেমন কষ্ট করে বসেছিলেন, তেমনই কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালেন। দূরে চোখ মেলে চেঁচিয়ে উঠলেন, হ্যাঁ রে, ঠিকই দেখেছিস!’
“আমিও উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘তা হলে চলো, এখানে এই বিপদ মাথায় নিয়ে বসে না থেকে ওইখানেই চলো। ওই আলোর কাছে নিশ্চয়ই কোনও-না-কোনও মানুষের দেখা পাবে।’
“বাবা আমার কথা শুনবেন কী, তার আগে নিজেই টলতে-টলতে ছুটতে শুরু করে দিয়েছেন। পর্বতের ওপর থেকে উপত্যকা, সেখান থেকে নিচে সমতলভূমিতে বাবা ছুটছেন। আমিও বাবার পিছু নিলুম। পারছি না, তবু ছুটছি। বাবা হোঁচট খাচ্ছেন, তবু থামছেন না।
“আঁধার রাতের ছায়াতে-ছায়াতে ছুটছি আমরা। কেমন করে ছুটছি জানি না। মনে হচ্ছে যেন কোন এক অজানা শক্তি আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই অজানা শক্তি এ-কথাটা হয়তো জানত না, আমাদের বেশিদূর টেনে নিয়ে যেতে পারবে না সে। কেননা, আমাদের শরীরে তখন একফোঁটাও বল ছিল না। কিন্তু বাঁচার জন্য মানুষ কী না করে! যা সাধ্যে কুলোয় না, তাই সে করে। আমরাও তাই করলুম। সমতলভূমির ওপর দিয়ে অনেকটা পথ আমরা ছুটে এলুম। যতই ছুটতে-ছুটতে এগিয়েছি, দেখেছি সেই অস্পষ্ট আলো স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে। আরও খানিকটা, আ-র-ও খানিকটা ছুটতে হবে আমাদের। তা হলেই পৌছে যাব আলোর কাছে।
“বাবা চেঁচালেন, ‘রেহান, বাপ আমার, প্রাণটাকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে রাখিস। আমি আর পারছি না। আমি বোধ হয় ওই আলোর কাছে আর যেতে পারলুম না। পারলুম না বোধ হয় নিজের প্রাণটাকে বুকের মধ্যে ধরে রাখতে। রেহান, আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। রেহান বাপ আমার—’
“কথা শেষ করতে পারলেন না বাবা। অন্ধকারে বাবা ছিটকে পড়লেন। আমারও তখন শক্তি ফুরিয়ে এসেছে। বুঝতে পারছি আমার দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু, আমার এই নিস্তেজ হাত দুটো বাড়িয়ে দিলুম বাবাকে ধরার জন্য। পারলুম না। বাবা পড়ে গেলেন। পড়লুম আমিও। তারপর আর কিছু জানি না। আমি জ্ঞান হারালুম।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন