প্রথম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

সেই কখন থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, আর থামবে না। আশ্চর্য, এত বৃষ্টির জল মাথায় নিয়ে মেঘের দল যে কেমন করে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, কে জানে!

রোশনও ছটফট করছিল তখন থেকেই। কখন থামবে বৃষ্টি! কখনও সে বৃষ্টির ঝমঝমানিটা একমনে কান পেতে শুনছিল। কখনও সে বন্ধ জানালার দিকে চোখ ফেরাচ্ছিল। কখনও ঘরের দরজাটা খুলে আকাশে উঁকি মারছিল। নয়তো নিরাশ হয়ে ঘরের মেঝেয় বিছানো চাটাইটার ওপর শুয়ে পড়ছিল। বৃষ্টির শব্দটা যখনই একটু থিতিয়ে আসছিল, তখনই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ছিল। বুঝি থামল। না, আবার ঝেঁপে এল।

মা বাধ্য হয়েই ঘরের আর-এক কোণে রান্না করছিলেন। বৃষ্টি নামলে বাইরে দাওয়ায় বসে রান্না করে কার সাধ্যি। ক'টা বাজল, কে জানে! সকাল তো হয়েছে অনেকক্ষণ। রোশনের বাবা এই বৃষ্টিতেও ছতরি মাথায় দিয়ে ক্ষেতে গেছেন। বৃষ্টিতে আকাশ ভেঙে পড়লেও বাবার ক্ষেতে যাওয়া চাই-ই চাই। মালিকের জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ দিয়েছেন বাবা। জোয়ারের ডগায় পাক ধরেছে। এবার কাটলেই হয়। কিন্তু এমন ছিষ্টিছাড়া বৃষ্টি যদি একনাগাড়ে হতেই থাকে, তবে ক্ষতি হতে কতক্ষণ! ক্ষতি শুধু চাষের নয়, তাদের বাড়িরও। ছোট-ছোট পাথরের ওপর কাদামাটি লেপে রোশনদের বাড়ির দেওয়াল গাঁথা। মাথায় খাপরার ছাদ। অবিশ্যি কারও-কারও ছাদ টিনের। এ-গ্রামের সব বাড়িই এরকম। যদিও বৃষ্টি-বাদলে এখনও তেমন কিছু বিপদ ঘটেনি, তবুও কে বলতে পারে কখন কী ঘটে! সুতরাং বছর-বছর তদারকি করতেই হয়। তার ওপর রোশনের বাবা তো খুব বুঝসুঝ মানুষ। তিনি জানেন, বর্ষার এই বৃষ্টির পরেই ঘরের দেওয়ালে নতুন মাটির আস্তরণ দিতে হবে। দেওয়ালের মাটি বৃষ্টির তোড়ে ধুয়ে গেলে পাথরের পলকা দেওয়াল ধসতে কতক্ষণ! কাজেই দেওয়ালের খাবলাখুবলোগুলো আবার কাদা-মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা এক মস্ত কাজ। দেওয়াল সারানোর সময় রোশনও বাবার সঙ্গে লেগে পড়ে। বাবা কেন একা-একা অত কষ্ট করবেন! ছেলে তো আর ছোট্টটি নয়।

হ্যাঁ, বটেই তো! রোশন তো আর এখন হামাগুড়ি দেয় না। সে-বয়েস তার কবেই পার হয়ে গেছে। কিংবা, এখন সে টলতে-টলতে ছোটে না। ছুটতে-ছুটতে পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে ওঠে না। এখন সে একা-একা ইস্কুলে যায়। একা-একা নদীর সাঁকো পেরোয়। সূর্য যখন সোনা ছড়িয়ে দেয় মাঠে-মাঠে, তখন ছুটতে-ছুটতে সে ক্ষেতে যায়। চোখ মেলে চেয়ে থাকে সেই ফুল-ভরা মাঠের দিকে। সমুদ্র এখান থেকে আর কতই-বা দূর! সমুদ্রের জল ছুঁয়ে ভেসে আসছে বাতাস। দোলা দিচ্ছে মাঠ-ভরন্ত সূর্যমুখী ফুলের পাপড়িতে। আঃ, কী সুন্দর দেখতে লাগে!

রোশন এখন দুই ক্লাসে পড়ছে। পড়তে-পড়তে ও কত কী জানছে। ও জেনেছে একসময়ে বিন্ধ্যপর্বত ছিল পৃথিবীর সবসেরা পর্বত। স্বর্গের দেবতারা এখানে বেড়াতে আসতেন। একদিন নারদ বিন্ধ্যকে খেপিয়ে দিলেন। বললেন, “সুমেরু পর্বতের কাছে বিন্ধ্য লাগে কোথায়! সমস্ত দেবতারা দিনের বেলা আনন্দে সময় কাটান সুমেরু পর্বতে। সূর্য আকাশের তারাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান সুমেরুতে। সেইজন্য সুমেরুর কী অহঙ্কার। বিন্ধ্যকে সে গ্রাহ্যই করে না।” শুনে তো বিন্ধ্যর মাথা গেল বিগড়ে। কী, সুমেরুর স্পর্ধা তো কম নয়! ঠিক হ্যায়’ বলে বিন্ধ্য আকাশে মাথা তুলতে শুরু করে দিল। দেখি, সূর্য কেমন করে তার মাথা ডিঙিয়ে যেতে পারে! একদিন সত্যি-সত্যি এমন হল, সূর্য আর বিন্ধ্যের মাথা ডিঙিয়ে ওপারে যেতে পারে না। ব্যস, ওপারে সূর্যের আলো নেই বলে সব অন্ধকার হয়ে গেল। কাজকম্ম সব বন্ধ। আর এপারে সূর্যের তেজে পৃথিবী পুড়ে ছারখার হয়ে যায় আর কি! হাহাকার পড়ে গেল। বিপদ দেখে দেবতারা মহাদেবের কাছে ছুটলেন। মহাদেব বললেন, বিষ্ণুর সাহায্য নিতে। বিষ্ণু বললেন, এর প্রতিকার একমাত্র বিন্ধ্যর গুরু অগস্ত্যই করতে পারেন। তখন ছোটো অগস্ত্যের কাছে। অগস্ত্য দেবতাদের কাকুতি-মিনতি শুনে বললেন, “ঠিক আছে আমি দেখছি।” বলে, তিনি একদিন বিন্ধ্যর সামনে হাজির হলেন। বিন্ধ্য গুরুকে দেখে মাথা নত করে প্রণাম করতেই, গুরু অগস্ত্য বললেন, “বিন্ধ্য, আমি দক্ষিণদেশে যাচ্ছি। যতদিন না উত্তরে ফিরে আসি ততদিন তুমি এমনই মাথা নিচু করে আমার জন্যে অপেক্ষা করো।” বলে সেই যে অগস্ত্য গেলেন, আর ফিরলেন না। গুরুর আদেশমত বিন্ধ্যও আর মাথা তুলতে পারল না।

এ তো গেল পুরাণের গল্প। রোশন পৃথিবীর ইতিহাসেরও অনেক গল্প জানে। জানে ভূগোল-বিজ্ঞানেরও। কোথায় মরুভূমি, কোথায় নদী আর সমুদ্র, সব শিখে ফেলেছে রোশন। শিখেছে মানুষ কেমন করে সূর্যকে বশ মানিয়ে চুল্লির কাজে লাগাচ্ছে। আচ্ছা, এসব করতে গিয়ে এমন যদি হয়, একদিন সূর্যটা নিভে যায়! আকাশ থেকে তার কিরণ আর মাটিতে নেমে না-আসে! কিংবা আকাশে মেঘও না-জমে, বৃষ্টিও না-ঝরে! সেদিন কী হবে! সেদিন মাঠে ফসলও ফলবে না। রান্নাঘরের চুল্লিতে হাঁড়িও চড়বে না। খিদের জ্বালায় মানুষ “কী খাই, কী খাই” করে মরতে বসবে। মাস্টারজির মুখে রোশন শুনেছে, কোটি-কোটি বছর আগে এই পৃথিবীটা দখল করে ছিল ডাইনোসর। কী বিরাট-বিরাট তাদের চেহারা। আজকের মানুষ তো তাদের পাশে লিলিপুট! তারা মাছ-মাংস খেত না। তাদের খাবার ছিল সবুজ গাছপাতা, ফলমূল। কে ভেবেছিল, একদিন ওই দশাসই চেহারার ভয়ঙ্কর ডাইনোসরও পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়ে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে। বলা হয়, এই অসম্ভব ব্যাপারটা ঘটেছিল পাহাড়ের মাথা ফেটে আগুন বেরিয়ে পড়েছিল বলে। সেইসঙ্গে পৃথিবীর মাটিও উঠেছিল কেঁপে। এই আগুনের সঙ্গে পাহাড়ের বুক থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল রাশি-রাশি ছাই। ছেয়ে ফেলেছিল আকাশ। সূর্যের এককণা আলোও আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসতে পারেনি। চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। সূর্যের আলো না-পেয়ে গাছপালা মরতে বসল। গাছপালা মরল বলে ডাইনোসরদের খাবারও জুটল না। অনাহারে অত বড় প্রাণীগুলো ছটফট করতে-করতে শেষ হয়ে গেল। ডাইনোসর শেষ হয়ে গেল বটে, কিন্তু পৃথিবীর কাঁপুনি এখনও থামেনি। এখনও কাঁপে পৃথিবীর মাটি থেকে-থেকে। রোশন জানে এর নাম ভূমিকম্প। কেননা, তাদের গ্রামের মাটিও কাঁপে যখন-তখন। বছরে কতবার, তার হিসেব কে রাখে! মাটি কাঁপলেই রোশনের মনে পড়ে যায় ডাইনোসরদের কথা। মনে-মনে ভাবে, এখনই যদি একটা ভয়ঙ্কর কানফাটা আওয়াজ তুলে পৃথিবীটা পাতালের অন্ধকারে তলিয়ে যায়! কিংবা দাউ-দাউ করে আগুন বেরিয়ে আসে অন্ধকার পাতাল থেকে!

সেদিন যেন তাই হল। পৃথিবীর কতটুকু ক্ষতি হল, সে-কথা জানে না রোশন। সে শুধু জানে তার গ্রামের কথা। কী বীভৎস সেই দৃশ্য। মাটি কাঁপল। কাদা-মাটি লেপা পাথরের দেওয়াল ভেঙে ঘরগুলো ধুলোয় মিশে গেল। মানুষের কান্নার শব্দ! হাহাকার! আর...

এখন থাক সে-কথা। এখন বলি রোশনের ফুলতিদিদির কথা। আসলে তার নাম ‘ফুলতি’ নয়, ‘ফুলবতী’। ফুলবতী অবশ্য রোশনের নিজের দিদি নয়। পাতানো। রোশনদের ঘরের দরজা পেরিয়ে ক’-পা গেলেই ফুলবতীদের ঘর। ফুলবতী রোশনের চেয়ে অন্তত দশ বছরের বড়। তার মানে বয়সে রোশন এখন যদি হয় নয় বা দশ, তবে ফুলবতী নির্ঘাত উনিশ কি বিশ। তাই রোশন তাকে দিদি বলে। ফুলতিদিদি। ফুলবতী নামের ‘ব’-টা উবে গিয়ে কেমন করে রোশনের মুখে ‘ফুলতি’ হয়ে গেল, কেউ বলতে পারবে না। পারবে না যেমন ফুলবতী, তেমনই রোশন নিজেও। রোশন যখন খুব ছোট্ট, সেই তখন থেকে ফুলবতীর কোলে উঠেছে সে। সেই থেকে দুজনে দুজনার আপন। ফুলবতীর রোশন, আর রোশনের ফুলতিদিদি। রোশনের মুখে ‘ফুলতিদিদি’ ডাকটা শুনতে খুব ভাল লাগে ফুলবতীর। ভারি মিষ্টি।

তবে এখনও কি আর ফুলতিদিদির কোলে ওঠে রোশন! এখন সে বড় হয়ে গেছে। এখন সে ফুলতিদিদির কাছে গল্প শোনে। শিবাজির গল্প। শোনে শিবাজির সেই বীরত্বের কাহিনী। কখনও বা শোনে গণেশের গল্প। শনির দৃষ্টিতে গণেশের আসল মুখটি খোয়া যেতে, কেমন করে গণেশের ঘাড়ে হাতির মাথাটি বসল, শোনে তারই আশ্চর্য ঘটনা। এত গল্প কোথা থেকে জানল ফুলতিদিদি! অথচ দেখো, রোশনের ফুলতিদিদি পড়তেও পারে না একটি শব্দ, লিখতেও পারে না এক কলম। আশ্চর্য!

রোশন একটু-একটু বড় হয়েছে। একটু-একটু চোখ মেলে সে পৃথিবীটাকে দেখতে শিখেছে। যতই দেখেছে, ততই তার ফুলতিদিদির জন্য মনটা দুঃখে ভরে উঠেছে। কেননা, সে বুঝতে পেরেছে ফুলতিদিদির পড়ার সময় নেই। কোনওদিনই ছিল না। থাকবে কেমন করে! বাবা নেই যে ফুলতিদিদির। ঘরে থাকেন মা আর মেয়ে। ফুলতিদিদির বাবাকে সাপে কাটল। গ্রামে একটা ডাক্তারখানা আছে বটে। কিন্তু রোগী যদি সব চেষ্টার বাইরে চলে যায়, তখন শহরের হাসপাতাল ছাড়া গত্যন্তর কী? হ্যাঁ, শহরেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফুলতিদিদির বাবাকে। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাবা আর ঘরে ফেরেননি। আর ফুলতিদিদির বাবার শোকে মা সেই যে বিছানা নিলেন, এখনও উঠতে পারলেন না। এখন কী করবে রোশনের ফুলতিদিদি একা? কোথায় যাবে? কোথায় গেলে মায়ের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতে পারবে? নিজের কথা ভাবে না ফুলতিদিদি। ভাবে না বলেই শরীরের দশা অমন হয়েছে। আগে কী সুন্দর দেখতে ছিল মেয়েটাকে। গায়ের রং টকটকে না হোক, মুখখানি কী মিষ্টি! তোমার চোখের দৃষ্টি তার চোখের ওপর পড়লে, নিমেষের জন্য হলেও তোমার চোখ থির হয়ে যাবে। একটা কেমন যেন মায়াবী চাউনি সেই চোখে। একটা কেমন যেন অবাক-ছোঁয়া নরম স্পর্শ সারা মুখে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। চোখের পলক পড়লে আর ঠোঁটে হাসি ফুটলে এত ভাল লাগে দেখতে মেয়েটাকে!

এখন সেই মেয়েরই মুখখানা দেখো! কোথায় গেল সেই ঠোঁট উপচে-পড়া হাসি! আর, কোথায়ই বা গেল সেই মন-ভরানো দৃষ্টি!

ফুলবতী যখন অনেক ছোট ছিল, মানে, রোশন যখন এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়নি, তখন সে তাদের ঘরের কোণে দাঁড়-করানো বাবার কাজের কোদালটা নিয়ে নাড়াচাড়া করত। তখন সে জানত না, কেন তার বাবা রোজ কোদালটা কাঁধে নিয়ে সাত-সকালে বেরিয়ে যান। সে জানত না, কোদাল দিয়ে মাটি না কাটলে তার জন্য মিঠাই আনতে পারবেন না বাবা। মা চুল্লিতে আঁচ দিয়ে রান্না করতে পারবেন না দিন আর রাতের খাবার। শখ হলে, এক-একদিন দুধ ফুটিয়ে পায়েস করতে পারবেন না মা। দুধ অবশ্য রোজ জোটে না। যেদিন তার বাবা মাটি কেটে দু’ পয়সা বেশি পান, সেইদিনই শখ যায় এটা-ওটা করতে। কিংবা এটা-সেটা কিনতে। এমনই করে বাবা গঞ্জ থেকে রঙিন ঘাগরা কিনে এনেছিলেন ফুলবতীর জন্য। আর ফুলবতীর মায়ের জন্য এগারো হাত শাড়ি। কিন্তু নিজের জন্য কিচ্ছু না। কালেভদ্রে ইচ্ছে হলে, একটা দশহাত ধুতি, নয়তো মাথায় বাঁধা পাগড়ির কাপড়। পাগড়ির কাপড়টা অনেক কাজে দেয়। মাটি কোপাতে-কোপাতে যখন শরীর বেয়ে ঘামের ফোঁটাগুলি বৃষ্টির ফোঁটার মতো টপাটপ ঝরে পড়ে, তখন, ওই কাপড় দিয়ে ঘাম মুছে, কাপড়টা এপাশ-ওপাশ দুলিয়ে-নাড়িয়ে হাওয়া খাও! কিংবা গ্রীষ্মের আগুন-ঝরা রোদের তাতে যখন বাতাসে গরমের হলকা ছোটে, তখন, ওই মাথার কাপড়টা নাকে-মুখে ঢাকা দিলে খানিকটা স্বস্তি তো মেলে।

এই মাটি কাটতে-কাটতেই সেই সাঙ্ঘাতিক কাণ্ডটা ঘটে গেল! ফুলবতীর বাবাকে সাপে কাটল। পাকা রাস্তা হবে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার। অনেক মানুষ রাস্তা কাটার কাজ পেয়েছেন। সে-কাজ পেয়েছেন ফুলবতীর বাবাও। কোথাও ঝোপ-ঝাড়, কোথাও গর্ত-খোঁদল। কোথাও এবড়ো-খেবড়ো, কোথাও উঁচু-নিচু পাথর-মাটি। তারই ওপর কোদাল পড়ছে ঝপাঝপ। একটা নয়, দুটো নয়। অমন শ’য়ে-শ’য়ে মানুষের হাতে কোদাল। মাথায় উঠছে, মাটিতে নামছে। আশ্চর্য, অন্য আর কারও কিচ্ছু হল না, গর্তের ফোঁকর থেকে হঠাৎ একটা বিষধর সাপ ফোঁস করে ফণা তুলে ছোবল দিল ফুলবতীর বাবার পায়ে। তাঁর হাত থেকে কোদাল ছিটকে পড়ল। চিৎকার করে উঠলেন মানুষটা “সাপ, সাপ” বলে। তারপর মাথার পাগড়িটা নিজেই নিজের পায়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করলেন। তাঁকে সাহায্য করতে ছুটে এলেন আরও অনেকে। বাঁধা হল বটে, কিন্তু মানুষটা কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়লেন। সঙ্গে-সঙ্গে ডাক্তারবাবু এলেন। তিনি বললেন, “এখানে কিছু করা যাবে না। বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

শহরেই ছুটলেন সবাই ফুলবতীর বাবাকে নিয়ে। সবাই ফিরে এলেন, কিন্তু সাপে-কাটা মানুষটা আর ফিরে এলেন না। পড়ে রইলেন ফুলবতীর মা আর মেয়ে। নিস্তব্ধ হয়ে গেল কোদালের শব্দ চিরদিনের মতো।

তা, সে-ও হয়ে গেল অনেকদিন। সেদিনের কথা রোশনের তেমন মনে নেই। শুধু মনে আছে, একদিন রোশনকে নিয়ে ফুলতিদিদি সেই ঝোপটার কাছেই গিয়েছিল। সেই যে-ঝোপটার কাছে সাপে কামড়েছিল তার বাবাকে। তখনও রাস্তা এখনকার মতো পাকা হয়নি। একটা গাছের নিচে রোশনকে চুপটি করে দাঁড়াতে বলেছিল। তারপর নিজে সেই ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো মাটি আর পাথর ডিঙিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সেইখানে। ঠিক এইখানেই তার বাবাকে ছোবল মেরেছিল সাপটা। তার গর্তটা আঁতিপাতি করে খুঁজছিল ফুলবতী। সে দেখেনি কখন নিঃসাড়ে রোশন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ফুলতিদিদিকে অমন করে এধার-ওধার ঘুরতে দেখে রোশন আচমকা তার হাত ধরতেই ফুলবতীর বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠেছিল। ফুলবতী পিছন ফিরতেই দেখে, রোশন।

হঠাৎ চমকের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে ফিসফিসুনি গলায় ধমক দিয়ে বলল, “তুই এখানে এলি কেন?”

রোশনও অবাক হয়ে চুপিসারে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কী খুঁজছ?”

ফুলবতী মুহূর্ত চুপ থেকে এদিক-ওদিক চোখ ফিরিয়ে উত্তর দিল, “সাপের গর্ত।” কথাটা বলতে-বলতে যেন সাপেরই মতো ফোঁস করে উঠল ফুলবতী।

“কেন?” ভয়ে কেঁপে উঠল রোশনের গলা।

“আমার বাবাকে যে-সাপটা কামড়েছে, আজ তাকে আমি মারব।”

ফুলবতীর সেই মারমুখো চেহারা দেখে যেন ভয়ে কালো হয়ে গেল রোশনের মুখখানা। তার ফুলতিদিদির অমন সুন্দর মুখখানা সে তো কোনওদিন রাগে এমন হিংস্র হতে দেখেনি। তাই ছছাট্ট সেই রোশন ভয়ে কেঁদে ফেলল। তার কান্নার চিৎকারটা এই নির্জন দুপুরের সমস্ত নিস্তব্ধতা খানখান করে হাওয়ায় কেঁপে ওঠে। যেন। ফুলবতী তাড়াতাড়ি জড়িয়ে ধরল রোশনকে। জিজ্ঞেস করল, “কী রে, কী হল তোর?”

রোশন কাঁদতে-কাঁদতেই উত্তর দিল, “আমার ভয় করছে।”

নিমেষে ফুলবতীর সেই হিংস্ৰ মুখখানা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেল। সমস্ত রাগ যেন মুছে গেল মুখ থেকে। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রোশনের মুখের সামনে রাস্তার ধুলো-মাটির ওপর। বসে আদর করে বলল, “দুর বোকা, ভয় কিসের! আমি তো আছি।”

“তবে তুমি আমার দিকে চেয়ে অমন করে বকলে কেন?”

ফুলবতী হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতেই বলল, “অ্যাই দ্যাখো, তোকে বকব কেন, আমি তো সাপটাকে বকলুম!”

“না, তোমায় সাপকে বকতে হবে না। চলো, বাড়ি চলো!” আবদার ধরল রোশন।

অগত্যা ফুলবতীকে ঘরে ফিরতে হল রোশনকে নিয়ে। সাপ তার মারা হল না। আর কোনওদিন মারাও হয়নি। কেননা, যে-ঝোপটায় সে সাপটাকে খুঁজছিল, এখন সেখানে পাকা রাস্তা হয়েছে। সাপটা পাকা রাস্তার পিচের তলায় পিষে গিয়ে কবেই হয়তো মরে ভূত হয়ে গেছে!

সাপ মরে ভূত হয় কি না কে জানে! কিন্তু মানুষ মরলে যে ভূত হয়, সে-কথা অসংখ্যবার শুনেছে রোশন। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি ভূতও চোখে দেখল না রোশন। সাপ-ভূত তো নয়ই, এমন কি, মানুষ-ভূত পর্যন্ত নজরে পড়ল না। কিন্তু প্যাঁচা-ডাকা অন্ধকার রাতে কোনওদিন হঠাৎ যদি রোশনের ঘুম ভেঙে যায়, তবে ঠিক তার ভূতের কথা মনে পড়বেই। মনে পড়লেই ভয়ে শিরশির করে উঠবে বুকের ভেতরটা। এমন ভয় কার না পায়! তুমি বীরপুরুষের মতো যতই বুক ফুলিয়ে আস্ফালন করো, যাও দেখি রাতদুপুরে শ্মশানে। কত মুরোদ দেখব তখন! ঠিক আছে অন্ধকার রাতে যাওয়ার দরকার নেই, চাঁদনি রাতেই যাও! গাছের ছায়ার আড়াল থেকে ঝুপ করে যদি একটা কালো বেড়াল তোমার পায়ের কাছে লাফিয়ে পড়ে, দেখি তুমি ‘বাবা রে, মা রে’ বলে কেমন না পালাও। কালো বেড়াল! উফ, কী সাঙ্ঘাতিক! অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকলে কার সাধ্যি তাকে দেখতে পায়! শুধু তার চকচকে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আচমকা দেখলে নির্ঘাত মূর্ছা! অথচ দ্যাখো, ভয় যেখানে, মন যেন সেখানেই যাওয়ার জন্য সবসময় ছোঁকছোঁক করবেই।

রোশনেরও তাই। একবার যদি ভূতের গল্প পায়, তা হলে তো আর কথা নেই। সোনাজিকাকা ভূতের গল্প যা বলেন না! আর সেই গল্প যদি ভরসন্ধের জমাট আঁধারে শোনো তার মুখ থেকে, তবে আর দেখতে হবে না। আমি হলফ করে বলতে পারি, সেই রাতে তোমার চোখের পাতা এক হওয়া দূরে থাক, ঘুম যে কোথায় পালাবে, তার হদিস পর্যন্ত করতে পারবে না। সারারাত জেগে কাটাতে হবে।

রোশনও ছেলে বটে! এমন মিশুকে-ছেলে তুমি ভূভারতে দুটি পাবে কি না যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যাকে-তাকে চোখের পলকে আপন করে নেওয়ার জাদু যে কোত্থেকে শিখল কে জানে! এই সোনাজিকাকার কথাই ধরো! ফুলতিদিদির সঙ্গে প্রথম যেদিন সোনাজিকাকার ঘরে গেল, সেইদিন থেকেই সোনাজিকাকার খুদে বন্ধু রোশন! গল্প শোনার বন্ধু তো বটেই, রোশনের হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও সঙ্গী সোনাজিকাকা। চোখের ছানি কাটার পর অ্যাত্তো মোটা একটা কাচের চশমা চোখে উঠেছে সোনাজিকাকার। রাতের বেলা ঘরের কোণে বসে ভুড়ুক-ভুড়ুক করে হুঁকো টানতে-টানতে সেদিন রোশনকে যে-গল্পটা বলেছিলেন সেটা কী আশ্চর্য ভূতের গল্প! আশ্চর্য, কারণ, সেই গল্পে ছিল ভূতের সঙ্গে রোশনদের এই গ্রামটার জন্মকথা। এ-গ্রাম তখন এমন গ্রাম ছিল না। ছিল একটা গভীর বন। গভীর মানে যেমন-তেমন মনে কোরো না। বনের ভেতর একটি-একটি পা ফেলে ঢুকবে, আর অমনই তোমার একটু-একটু করে গায়ে কাঁটা দেবে। গাছ, শুধু গাছ। আর তারই ফাঁকে ঝোপঝাড় আর বাঘ-ভালুক। এই বনেরই গভীরে এক রাজার ছিল মস্ত এক রাজ্য। বনের রাজা বন্য ছাড়া আর কী হবেন! কিন্তু এই বনের রাজাই নিজের রাজ্যে বিশাল আর চমৎকার এক রাজপ্রাসাদ গড়েছিলেন। রাজা যেমন মণি-মুক্তোর মুকুট মাথায় দিয়ে রাজ সিংহাসনে বসে রাজ্য শাসন করতেন, তেমনই তিনি রাজপ্রাসাদের গায়ে-গায়ে মণি-মুক্তো গেঁথে-গেঁথে প্রাসাদ সাজিয়েছিলেন। এই বনের এখানে-ওখানে কত মন্দির! মন্দিরের দেওয়ালে-দেওয়ালেও সোনা-রুপোর ঝলমলানি। তার মানে, রাজার ভাণ্ডার ভর্তি ছিল সোনা-জহরতে।

তা, বনের ঠিক বাইরেই, উত্তরে ছিলেন আর-এক রাজা। সে-রাজার রাজ্য ছিল শহর ঘিরে। রাজধানী শহরে। সুতরাং রাজপ্রাসাদও শহরে। সাদামাঠা। না মণি-মুক্তো দিয়ে সাজানো, না সোনা-রুপোয় ঝলমলানো। এই শহরের রাজার কাছে তো আর বনের রাজার ধনদৌলতের খবরটা চাপা ছিল না। এ, না-হয় সে, সে, না-হয় আর-একজন বনের রাজার খবরটা শহরের রাজার কানে তুলে রাজাকে ভীষণ রাগিয়ে দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে শহরের রাজার ওই বনের রাজার ওপর ভীষণ হিংসেও হল। ভাবলেন, তা হলে তো বনের রাজাকে আক্রমণ করে তাঁর ধনদৌলত লুট করতে হয়। এই মতলবটা মাথায় রেখেই শহরের রাজা তাঁর গুপ্তচরের প্রধানকে তলব করলেন। গুপ্তচর-প্রধান তো পড়িমরি করে ছুটে এসে সেলাম ঠুকে বলল, “আজ্ঞে হুজুর, বলুন কী করতে হবে?”

রাজা বললেন, “দ্যাখো গুপ্তচর, শুনতে পাচ্ছি বনের রাজার নাকি অনেক ধনদৌলত। শুনতে পাচ্ছি সে নাকি সোনার বিছানায় গড়াগড়ি খায়। তার নাকি রাজপ্রাসাদটা মণি-মুক্তো দিয়ে গড়া। এসব কথা যদি সত্যি হয়, তবে এতদিন তুমি আমায় খবর দাওনি কেন?”

গুপ্তচর জবাব দিল, “আজ্ঞে এ-খবর আমিও পেয়েছি। আমি খবরটা আপনাকে দিতে গিয়েও দিতে পারিনি। কারণ সত্যি-মিথ্যে যাচাই না করে এ-খবর আপনার কানে তোলা ঠিক নয় বলেই মনে হয়েছে। খবরটা গুজবও তো হতে পারে।”

রাজা বললেন, “খবরটা সত্যি কি গুজব, এটা আমার এখনই জানা খুব জরুরি। বনের রাজার সম্পদের কথা শুনে ইস্তক আমার চোখে ঘুম নেই। কথাটা যদি সত্যি হয়, তবে বুঝতে হবে বনের রাজা আমার চেয়ে শক্তিশালী। কে বলতে পারে, একদিন হঠাৎ সে আমাকে আক্রমণ করবে না! সেই কারণেই আমি ঠিক করেছি, বনের রাজা কিছু বোঝার আগেই, আমাকে তাঁর ধনসম্পদ লুট করতে হবে। তাই বনের রাজার নাড়ি-নক্ষত্রের খুঁটিনাটি খবর তোমাকে সংগ্রহ করে এনে দিতে হবে। তোমাকে যেতে হবে বনে। আর সেটা আজই।”

গুপ্তচর রাজার আদেশ শুনে মাথা নত করে বলল, “যো হুকুম।”

রাজা আরও বললেন, “তোমাকে খুবই সাবধানে কাজ করতে হবে। বনের রাজ্যে গিয়ে তুমি ধরা না পড়ো। শত্রুর হাতে ধরা পড়লে তোমার যেমন প্রাণ যাবে, আমারও সমস্ত মতলব ভেস্তে যাবে। এমন কি, আচম্বিতে আমার কোনও বিপদও ঘটতে পারে।”

গুপ্তচর উত্তর দিল, “আজ্ঞে হুজুর, সে-সম্পর্কে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আজ পর্যন্ত আমার ওপর আপনি যত কাজের ভার দিয়েছেন, আমি যথাসাধ্য তা হাসিল করেছি। কোথাও বিফল হইনি। আশা করি এ-কাজেও আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারব।”

“তা হলে কখন যাত্রা করছ তুমি?” রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি তৈরি।” উত্তর দিল গুপ্তচর।

“আমায় কী করতে হবে? সৈন্যসামন্ত কি প্রস্তুত রাখতে হবে?” রাজা আবার জিজ্ঞেস করলেন।

“কিচ্ছু না।” জবাব দিল গুপ্তচর, খুবই দৃঢ় গলায়। “সৈন্য প্রস্তুত রাখলে, আর সেই খবরটা কোনও রকমে যদি বনের রাজা জানতে পারেন, তবে আমার কাজ করা দায় হবে। আর সেই সঙ্গে বিপদও দেখা দিতে পারে।”

গুপ্তচরের কথা শুনে রাজা খানিকটা চিন্তিত হলেন বটে, তবে ঘাবড়ালেন না। বললেন, “ঠিক আছে, তুমি যখন নিজেই দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করতে পারবে ভাবছ, তখন আর আমার কিছু বলার নেই। আমি রাজি।”

গুপ্তচর “যে-আজ্ঞে” বলে রাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বনে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিল।

অধ্যায় ১ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%