শৈলেন ঘোষ

খুব ধুমধাম করে গণেশের পুজো হয় রোশনদের দেশে। রোশন শুনেছিল শহরে নাকি পুজোর আরও জাঁকজমক। এ-বছর বাবা রোশনকে শহরে নিয়ে গিয়েছিলেন গণেশ ঠাকুরের বিসর্জন দেখাতে। দেখতে গিয়ে সে কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড! ভাগ্যিস মা যাননি! ফুলতিদিদির তো আর কোথাও যাওয়া হয় না। শহরে যাওয়ার কথা ছেড়েই দাও। সে তো ফুলতিদিদির কাছে স্বপ্ন। অবশ্য শহরে রোশনও এই প্রথম গেল। তা বিসর্জনের দৃশ্য দেখার আগে শহরের চেহারা দেখে তো রোশন থ’। সমুদ্দুরটা একেবারে শহরের চারদিক ঘিরে এমন ঢেউয়ের খেলা দেখাচ্ছে, তাই দেখলেই সময় কেটে যায়। বাবা রে বাবা, শহরে কত লোক। কী পেল্লাই-পেল্লাই সব বাড়ি! কত গাড়ি! শহরে যে এত মানুষ বাস করে, রোশনের তা ধারণাতেই ছিল না। রোশনের বাবাকে বছরে একবার-দু’বার শহরে আসতেই হয়। বাবার সব রাস্তাঘাটই চেনা। কাজেই কোন রাস্তা দিয়ে বিসর্জনের ঠাকুর যাবে, তা তাঁর জানাই আছে।
যত সন্ধে হচ্ছে, ভিড় বাড়ছে। অবশ্য আজ বাড়ি ফিরবেন না রোশনের বাবা। রোশনকে মন ভরিয়ে আলোর বাহার, তাক লাগানো সাজগোজ আর ব্যান্ডপার্টির বাজনা-বাদ্যি শুনিয়ে, ঠাকুরের বিসর্জন দেখিয়ে কাল সকালে বাড়ি ফিরবেন। সুতরাং ভিড় ঠেলতে-ঠেলতে এগিয়ে চলেছেন বাবা আর ছেলে।
বাবা রোশনকে বললেন, “হাতটা আমার শক্ত করে ধরবি। ওই দ্যাখ, বাজনা বাজিয়ে কত বড় একটা ঠাকুর আসছে।”
রোশন বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরে ঘাড় ফিরিয়ে ঠাকুর দেখতে লাগল। আর হাঁটতে লাগল।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন,“দেখতে পাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কত লোক, দেখছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তোর ভয় করছে না তো?”
“না।”
“ভাল লাগছে?”
“খুব।”
“পা ব্যথা করছে?”
“না।”
“কত আলো, দেখছিস?”
“হুঁ।”
“দেখছিস, বাজনার তালে-তালে সবাই কেমন নাচছে?”
রোশন এতক্ষণে ‘হ্যাঁ-হুঁ-না’ করে এবার একটু বেশি কথা বলল, “আমাদের ক্লাসের রাজন এইরকম করে নাচে।”
বাবা হেসে বললেন, “তাই বুঝি!”
অমনই অতর্কিতে একটা প্রচণ্ড শব্দ করে বোমা ফেটে চারদিকে ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে গেল। অমনই শুরু হয়ে গেল চিৎকার-চেঁচামেচি। ছুটোছুটি-ধস্তাধস্তি। ধাক্কা লাগল রোশন আর তার বাবার গায়েও। অসংখ্য মানুষের ধাক্কা। রোশন বাবার হাত ফসকে ছিটকে গেল ভিড়ের মধ্যে। সে চেঁচিয়ে উঠল, “বাবা-আ-আ-আ!”
রোশনের বাবাও হাঁক পাড়েন, “রোশন-ন-ন-ন!”
শোনা গেল আবার একটা প্রচণ্ড শব্দ।
যাঃ! ভিড়ের ঠেলায় বাবা আর ছেলে দু’ দিকে ছিটকে, দু’জনেই হারিয়ে গেল। ভিড়ের ঠেলায় কে যে কোনদিকে গেল, তার খবর কে দেবে! সবাই পালাচ্ছে প্রাণ বাঁচাতে! পায়ের তলায় যা পাচ্ছে মাড়িয়ে-পিষে। সামনে যে পড়ছে তাকে ঠেলে ফেলে। কী ভয়াবহ কাণ্ড! রোশনও কি মানুষের পায়ের তলায় পিষে গেল! না কি তার বাবা!
না, পিষে গেল না। তারা মানুষের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। বাবা খুঁজে পায় না ছেলেকে, ছেলে খুঁজে পায় না বাবাকে! তা-ও যদি তখন দিনের আলো থাকত, তবে অন্য কথা। ভিড়ের মধ্যে খুঁজে পেলেও হয়তো খুঁজে পেত দু’জনে দু’জনকে। কিন্তু এমন একটা সময়ে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে, সাধ্যি কী, কেউ কাউকে খুঁজে পায়!
সুতরাং ঠেলা খেতে-খেতে যখন জনতার চাপটা একটু হালকা হল, তখন দেখা গেল রাস্তার একপাশে একলাটি দাঁড়িয়ে আছে, রোশন। রোশনের নাকে তখনও বারুদের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ লেগে আছে। রোশন ভয়ে জড়সড় হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে সন্ধানী চোখে বাবাকে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। বাবাকে দেখতে না পেয়ে আচমকা চিলের মত চিৎকার করে উঠল, “বাবা-আ-আ-আ!” একবার নয়, অসংখ্যবার সেই ডাক শোনা গেল। কিন্তু যার শোনার কথা, সেই বাবা শুনতে পেলেন না। তখন রোশন খানিকটা হনহন করে হেঁটে, পাঁইপাঁই করে ছুট দিল। ছুটতে-ছুটতে “বাবা-বাবা” বলে আর্তনাদ করতে লাগল। কিন্তু শহরের এই আলো ঝলমল উৎসবের রাতে তার দিকে ফিরে তাকাবার জন্য একটি লোকও মুখ ফেরাল না। অগত্যা রোশন একাই শহরের অচেনা পথে খুঁজে বেড়াতে লাগল তার বাবাকে।
বাবাকে সে খুঁজে পেল না। কিন্তু খুঁজতে-খুঁজতে সে হঠাৎ আবার দেখতে পেল সেই সমুদ্দুর। হাজার-হাজার আলোর ফুলকি বুকে নিয়ে সমুদ্দুরের ঢেউ লুটোপুটি খাচ্ছে। চারদিকে শুধু রাশি-রাশি জল। তার পায়ের তলায় যে বালি, এতক্ষণে সে বুঝতে পারল। বালির ওপর পা ফেলে-ফেলে সে সটান সমুদ্দুরের তীরে চলে এসেছে। চারদিকে রাতের আলো, সমুদ্দুরের জলের ওপর তার আভাতি। কী সুন্দর দেখতে লাগছে। রোশন আনমনে যেন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু মন তার বারেবারে চমকে ওঠে। ভাবে, এখন কী করবে সে!
না, এদিকে মানুষের জটলা নেই। হাঙ্গামারও কোনও চিহ্ন নেই। অনেকখানি পথ সে হেঁটেছে। অনেকক্ষণ ধরে সে বাবাকে খুঁজেছে। অনেক চিৎকার করেছে সে। ওই সমুদ্দুরের ঢেউয়ের মতোই তার মন এখন অস্থির। কিন্তু আশ্চর্য, সে একবারও কাঁদল না। শহরের সেই আলো আর আকাশের সেই আঁধারের দিকে তাকিয়ে সে সমুদ্দুরের তীরে বসে পড়ল। মনে-মনে ভাবল, একই জায়গায় বসে থাকা ভাল। কে বলতে পারে, বাবা খুঁজতে-খুঁজতে এদিকে চলেও তো আসতে পারেন।
না, বাবা এলেন না। রাত বাড়ছে। রাস্তার লোক বাড়ি ফিরছে। গাড়ির শব্দ কমছে। নিস্তব্ধ হচ্ছে চারদিক। এবার কিন্তু একটু-একটু ভয় চেপে ধরছে রোশনকে। সত্যিই তো এই সমুদ্দুরের ধারে এখন একা সে কেমন করে থাকবে! রোশন উঠে দাঁড়াল। সমুদ্দুরের বালিয়াড়ি পেরিয়ে রাস্তার ধারে আসতেই তার নজরে পড়ল একটা ছোট্ট ছাউনি। ছাউনির নিচে একটা বেঞ্চ। বেঞ্চের ওপরটাই খালি ছাওয়া। বাকি চারদিকই খোলা। এদিকে রাস্তা। ওদিকে সমুদ্দুর। হাওয়া বইছে শনশন করে। সেই বেঞ্চের ওপরই সে বসে পড়ল। মনে-মনে ভাবল, এখানে তবু বসে থাকা যায়। চোখের সামনেই রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে বাবা তাকে খুঁজতে-খুঁজতে এদিকে এলেই সে দেখতে পাবে। তখনই রোশনের মনে হল, শহরে যত মানুষের হট্টগোল, ততই রাস্তার ঝামেলা। এত রাস্তা কেন শহরে! অবাক হয়ে যায় রোশন শহরের ব্যাপার-স্যাপার দেখে। মানুষের গোনাগুনতি মাথার মতো শহরের রাস্তাও যেন গুনে-গুনে বানানো।
বেঞ্চে বসে থাকতে-থাকতেই হাই উঠল রোশনের। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ছেলেটা। ঘুম পাচ্ছে। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে হয়তো তার একঘুম হয়ে যেত। সত্যি, গ্রাম কত শান্ত। তেমনই শহরটা অশান্ত। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, শহরে ভূত-পেরেত বলে কিছু নেই। এত গোলমালে ভূত কখনও থাকতে পারে! ভূত আছে। গাঁয়ে-গঞ্জে। অবশ্য রোশন কোনওদিনই ভূত দেখেনি। রোশন জানে তার বাবা ভূত-টুতকে একদমই ভয় পান না। অথচ রোশনের বন্ধু শচীন বলে, তার বাবা নিজের চোখে ভূত দেখেছেন। শচীনের বাবার তো ঘুরে-ঘুরে কাজ। মানে এক গ্রাম থেকে আর-এক গ্রামে। রাস্তা তৈরির তদারকি করেন তিনি। তো, এক-একদিন অনেক দূরে গেলে বাড়িতেই ফেরা হয় না। একবার ওইরকম একটা গ্রামে গিয়ে রাতে বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। রাত কাটাতে হয়েছিল গ্রামেই। পঞ্চায়েতের অফিসে। পঞ্চায়েতের পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে নদী। নদীর ওপারে মাঠ ভর্তি ফসল। আর এপারে একদিকে ইস্কুলবাড়ি। আর একদিকে একটু দূরে বারোয়ারিতলা। ইস্কুলবাড়িটা খুব সুন্দর। সামনে সিংদরজা। দোতলা। ভেতরে বড়-বড় ঘর। পেল্লাই-পেল্লাই দরজা-জানালা। পেছনে খেলার মাঠ। সামনে খোলা চত্বর। নদীর হাওয়া সারা ইস্কুলবাড়ির ভেতরে দিনরাত লুটোপুটি খাচ্ছে। পড়তে-পড়তে যখন মাথা ভার হয়ে যায় ছেলেদের, তখন জানালার ধারে দাঁড়ালে নদীর বুক-উথলে ছুটে-আসা বাতাস সব ক্লান্তি মুছে দেয়। আসলে কিন্তু ইস্কুলবাড়িটা আগে ইস্কুলবাড়ি ছিল না। ছিল একজন মহারাজার বাড়ি। এরা ছিল খুব বড় জমিদার। সাহেবরা খেতাব দিয়েছিল, মহারাজা। তা, জমিদারদের যখন জমিদারি চলে গেল, তখন তাদের যেমন মহারাজা নাম ঘুচল, তেমনই ভাঁড়ারে যা ছিল, তাও একে-একে ফুরিয়ে গেল। শেষমেশ, মহারাজারা এ-গ্রাম ছেড়ে-ছুড়ে, জমি-জমা বেচেবুচে শহরে গিয়ে চাকরিবাকরির খোঁজে লেগে পড়ল। অবশ্য বাড়িটা তারা সেদিন পর্যন্ত নিজেদের দখলে রেখেছিল। কিন্তু এত বড় বাড়ি, এত ঘর, এতসব আসবাবপত্র দেখাশোনা করার লোকজন তো চাই। আর সে তো একজন-দু’জনে হবে না! অন্তত দশ-বারোজন লোকের দরকার। তা, এত লোক রাখতে গেলে তাদের খাই-খরচ থেকে শুরু করে, হাতখরচের পয়সাটা আসবে কোত্থেকে! চাকরি করে তো সে-খরচ পোষানো যাবে না। অগত্যা জমিদারবাড়ির বংশধররা ঠিক করল, বাড়িটা ইস্কুল করার জন্য গ্রামের মানুষকে দান করে দেবে। সেইমতো সব ব্যবস্থা পাকা হল। আর সেই থেকে জমিদারের বাড়িতে ইস্কুল চালু হয়ে গেল।

অবশ্য ইস্কুল চালু করতে প্রথমে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কিন্তু সে যাই হোক, এখন আর কাঠখড় কিছুই পোড়াতে হয় না। ইস্কুল গড়গড় করে চলছে। অবশ্য শচীনের বাবার এতসব জানার কথা নয়। জেনে লাভই বা কী! এমন হাজারো বাড়ি হাজারো লোক দান করছেন। সে নিয়ে কে আর অত মাথা ঘামাচ্ছে! কিন্তু সেদিন রাত্রে পঞ্চায়েতের ঘরে শুয়ে শচীনের বাবার সত্যি-সত্যি মাথা ঘামছিল। শুধু মাথাই ঘামছিল না, চোখেও ঘুম আসছিল না। কেননা রাত যখন সুনসান, জনপ্রাণীর। সাড়াশব্দ নেই, শুধু শোনা যাচ্ছিল একঘেয়ে ঝিঝির ডাক, আর নদীর ঢেউয়ের ছলাত-ছলাত শব্দ, তখনই দূর থেকে ভেসে আসছিল একটা কান্নার আওয়াজ। অবশ্য এ-কান্না কোনও শিশুর নয়। মনে হল, একজন বয়স্ক মেয়ে কাঁদছে। শচীনের বাবা শুয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। জানলার গরাদের ফাঁকে মাথা ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি নিশ্চিত বুঝলেন, ইস্কুলবাড়ির ভেতরে কেউ কাঁদছে। অথচ এই রাতে ইস্কুলে দরোয়ান আর মালী ছাড়া কারও থাকার কথা নয়। তাঁর কেমন যেন খটকা লাগল। তিনি পায়ে চটি গলিয়ে সেই অন্ধকার রাতে পঞ্চায়েতের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ইস্কুলের গেটের সামনে গিয়ে দেখেন গেট বন্ধ। ভেতর থেকে তালা দেওয়া। সুতরাং গেট দিয়ে ইস্কুলে ঢোকার কারও সাধ্যি নেই। তিনি একবার ভাবলেন, দরোয়ান বা মালীকে হাঁক দিয়ে ডাকেন। তারপরেই ভাবেন, না থাক। ঠিক করলেন, তিনি নিজেই নিঃসাড়ে ইস্কুলে ঢুকবেন। সামনের গেটে তালা দেখে, তিনি ভেতরে যাওয়ার অন্য কোনও পথ আছে কিনা তারই সন্ধান করছিলেন। অন্ধকার রাতে চোরের মতো তিনি ইস্কুলের বাইরের উঁচু পাঁচিলের চারপাশে ঘুরঘুর করতে লাগলেন। তাঁর চোখেমুখে যতটা কৌতূহল, তার চেয়ে অনেক বেশি উৎকণ্ঠা। কেননা, কান্না তখনও থামেনি। আশ্চর্য এই, এই কান্না শুনে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল, অথচ আর কেউ জাগে না! এর মানে কী! নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনও রহস্য আছে। সুতরাং তাঁকে যেমন করে হোক ইস্কুলের ভেতরে ঢুকতেই হবে।
তিনি অনেকক্ষণ ত্রস্ত পায়ে এধার-ওধার ঘোরাঘুরির পর ঠিক করলেন, পেছনের বাগানের পাঁচিল টপকাবেন। কারণ তিনি পাঁচিলের গায়ে পা রাখার মত একটা খাঁজ দেখতে পেয়েছিলেন। সেই খাঁজে পা রেখে চেষ্টা করলে হয়তো তিনি পাঁচিল টপকাতে পারবেন। এই কথা ভেবেই তিনি, চটিজোড়া খুলে, খাঁজে পা রেখে পাঁচিলে ওঠার জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগলেন। তিনি হয়তো টপকাতে পারতেন, কিন্তু হঠাৎ একটা সর্বনাশা কাণ্ড ঘটে গেল। হল কী, এতক্ষণ যে-মেয়ের গলায় কান্না শোনা যাচ্ছিল, সেই মেয়েটাই কান্না থামিয়ে চিৎকার করে উঠল, “চোর, চোর!”
আলটপকা অমন একটা চিৎকার শুনে শচীনের বাবার বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে লোপাট! পাঁচিল টপকাবেন কি, কোনওরকমে জুতো হাতে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মারলেন ছুট! অন্ধকারে ছুটতে-ছুটতে, তাঁর এমন ধন্দ লেগে গেল, তিনি পঞ্চায়েতের অফিসঘরের রাস্তাটাই গুলিয়ে ফেললেন। এই রে, এবার কী হবে!
যা হওয়ার তাই হল। তিনি ছুটতে-ছুটতে পেছন ফিরে স্পষ্ট দেখতে পেলেন, একজন মেয়ে তাঁকে তাড়া করেছে! সে হাসছে! হাসিটা তার কী বিচ্ছিরি খ্যানখেনে!
শচীনের বাবা এবার প্রাণপণ ছুটতে লাগলেন।
মেয়ে বলেই বোধ হয় সে শচীনের বাবার সঙ্গে ছুটে পারল না। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু শচীনের বাবা দাঁড়ালেন না। তিনি ছুটছেন।
আরও খানিকটা ছোটার পর, তাঁর খেয়াল হল, এখন কেউ তাঁকে তাড়া করছে না। তিনি একাই ছুটছেন। তিনি দাঁড়ালেন। তিনি ভীষণ হাঁফাতে লাগলেন। হবেই তো! এই বয়সে এমন করে ছুটে দম ফেটে তিনি যে মারা পড়েননি, এই যথেষ্ট!
কিন্তু তিনি এখন কী করবেন! তিনি বেবাক বোকার মতো জুলজুল করে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলেন। বোকা ছাড়া কী বলা যায় তাঁকে! কী দরকার ছিল ওস্তাদি করে ইস্কুলের পাঁচিল হাঁটকানো! যে কাঁদছে তাকে কাঁদতে দাও! কী দরকার বাহাদুরি দেখানোর!
আরও কিছুক্ষণ তিনি সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর যখন আবার সব নিথর হয়ে গেল, কান্না বা হাসির কোনও শব্দই তাঁর কানে এল না, তখন তিনি সেই নিশুতি রাতের অন্ধকারে পঞ্চায়েতের অফিসঘরটা খুঁজতে লাগলেন। আসলে হাসির তাড়া খেয়ে এমন সব তালগোল পাকিয়ে গেল তাঁর, হাতের চটিজোড়া যে এখনও পর্যন্ত তাঁর হাতেই রয়েছে, এটা খেয়াল করেননি। হঠাৎ যখন মনে পড়ল, তিনি পায়ে গলালেন বটে, কিন্তু পা যেন আর হাঁটে না। তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। এই অন্ধকার রাতে, একটা তাড়া-খাওয়া মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে যেতেই পারে। অবশ্য বলতে পারা যায়, একজন মেয়ের ভয়ে দৌড় মারাটা বোধ হয় উচিত কাজ হল না।
যাই হোক, হঠাৎ যেন তাঁর সাহস বেড়ে গেল। মন থেকে ভয়ডর সব ঝেড়ে ফেলে অন্ধকারেই তিনি বীরের মতো হাঁটতে লাগলেন। এবং হাঁটতে-হাঁটতে পঞ্চায়েতের অফিসটা খুঁজতে লাগলেন।
না, বেশিক্ষণ তাঁকে হাঁটাহাঁটি করতে হল না। একটু হেঁটেই তিনি পঞ্চায়েতের অফিসঘরটা দেখতে পেলেন। যাক, বাঁচা গেল! তিনি আর কোনওদিকে ফিরে না তাকিয়ে দুড়দাড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। ঝটপট দরজার হুড়কোটা টেনে, একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। সেই সময় ঘরে কেউ থাকলে সে নিশ্চয়ই শুনতে পেত নিশ্বাসের সঙ্গে তিনি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “যাক, খুব বেঁচে গেছি!”
তিনি আবার মশারির মধ্যে ঢুকে পড়লেন। জীবনে যে তিনি আর কারও পাঁচিল টপকাবেন না, মনে-মনে এই প্রতিজ্ঞা করে শুয়ে পড়লেন।
শুলে কী হবে! ঘুম তাঁর কথা শোনে কই? যতবার তাঁর চোখ ঘুমোই-ঘুমোই করে, ততবার চমকে-চমকে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়! আর ঘুম ভাঙলেই তাঁর কানে আসে, নদীর কলকলানি, গাছের পাতার ঝমঝমানি। আর তাঁর নিজের বুকের ধকধকানি। এ-কথা কে না জানে, যতক্ষণ নদী বইবে, তার কলকলানি ততক্ষণ থামবে না! বাতাস যতই ছুটবে, গাছের পাতার ঝমঝমানিও ততক্ষণ কানে আসবে। এসবে মানুষের হাত নেই। কিন্তু বুকটা যখন নিজের, এবং তার ধকধকানিটাও যখন সেই বুকেরই, তখন ইচ্ছে করলে সেই ধকধকানিটা তো তিনি থামাতে পারেন!
না, তিনি থামাতে পারলেন না। চেষ্টার তিনি কসুর করলেন না। বুকের ধকধকানিটা সামলাতে তিনি বিছানায় শুয়ে-শুয়ে যেন যুদ্ধ করতে লাগলেন। এপাশ-ওপাশ করে তিনি একেবারে লণ্ডলণ্ড করে ফেললেন বিছানাটা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বুক যেমন ধড়কাচ্ছে, তেমনই ধড়াতে লাগল।
এখন রাত কত হবে? ঘড়িটা একবার দেখা যাক। সকাল হলে বাঁচি! তিনি টর্চটা হাতড়াতে লাগলেন। বালিশের পাশেই রেখেছেন কিন্তু আশ্চর্য! খুঁজে পাচ্ছেন না যে! কোথায় গেল! না, না, বাইরে বেরোবার সময় তিনি তো টর্চটা নিয়ে বেরোননি! তবে কি টেবিলের ওপর আছে!
টর্চের খোঁজে তিনি মশারি গলে বেরিয়ে পড়লেন। অন্ধকার হাতড়াতে-হাতড়াতে তিনি টেবিলের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ একটা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হয়ে গেল। আলো জ্বলে উঠল। তাঁরই টর্চের আলো। জ্বলেই নিবে গেল। তিনি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন। তিনি “ওরে , বাবা রে” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সেই মেয়েটার গলা শোনা গেল। সে ধমক দিল, “চুপ!” তিনি থমকে গেলেন। এমন থমকান থমকালেন, তাঁর মুখের কথা মুখেই আটকে রইল। তিনি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন।

সে রুক্ষস্বরে বলে উঠল, “ঘড়ির দরকার নেই। আমার কাছে শোনো, এখন রাত দুটো। তোমার টর্চটা আমি তোমার বিছানাতেই রেখে দিয়েছি। টর্চটা জ্বালবার চেষ্টা কোরো না। আমাকে দেখার চেষ্টা কোরো না। চেষ্টা করলেও আমি দেখা দেব না। আমি ইচ্ছে করলে দেখা দিতে পারি। আবার অদৃশ্য হয়েও যেতে পারি। কারণ আমি মৃত। আমি ওই জমিদারবাড়ির বড় বউ। আমার কান্না শুনে তুমি যখন ওই বাড়ির পাঁচিল টপকাবার চেষ্টা করছিলে, তখন আমিই ‘চোর-চোর’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলুম। আমার ভয়ে তুমি যখন পালাচ্ছিলে, তখন আমিই তোমার সাহস দেখে হেসে উঠেছিলুম। আর এখন তো বুঝতেই পারছ, আমিই তোমার টর্চের আলো জ্বালালুম। তুমি কে আমার জানা নেই। আমি রোজ এমনই করে রাত্রে কাঁদি। ঠিক যেমন সময়ে আজ কাঁদছিলুম, ঠিক তেমন সময়েই। আমার কান্না শুনে-শুনে লোকের অভ্যেস হয়ে গেছে। তাই কেউ আর আমার কান্না নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা জানেও না, আমি কোথায় কাঁদি। কেউ ভাবে, এই জমিদারের বাড়িতে কাঁদি। কেউ ভাবে, মাঠে-মাঠে কেঁদে বেড়াই। আবার কেউ ভাবে, আমার কান্নাটা কান্না নয়, অন্য কোনও শব্দ। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ আমার কান্নাটা শব্দ নয়, কান্নাই। আমি কেন কাঁদি জানো? জমিদারি যখন ভেঙে পড়ছে, জমিদারির ঠাটবাট যখন ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে, তখন বাড়ির বড়কর্তা আমার ভারি শখের কাঁকন দুটো আমার হাত থেকে খুলে নিতে চেয়েছিল। আমি কিছুতেই দেব না। আর সত্যিই যখন দিলুম না, তখন বড়কর্তা আমায় শাসালো। বলল, আমায় সে দেখে নেবে। কিন্তু সে দেখে নেওয়ার আগেই আমি কাঁকন-দুটো হাত থেকে খুলে লুকিয়ে ফেললুম। তারপর একদিন গভীর রাতে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লুম। নদীর ধারে একটা গাছের নিচে গর্ত খুঁড়ে আমি কাঁকন দুটো মাটি চাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখলুম। আমি জানতুম, এদিকে কেউ আসবে না। এদিকের এই জলা-জঙ্গলে কেউ কোনওদিন আসেও না। কাজেই আমার বিশ্বাস ছিল, জমিদারবাড়ির সব যাবে, আমার কাঁকন দুটো অন্তত রক্ষা পাবে।
“হ্যাঁ, আমার কাঁকন দুটো রক্ষা করতে পেরেছিলুম আমি। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারিনি। আমার বড়কর্তা নিশুতি রাতে কেমন করে যেন টের পেয়ে গেছিল, আমি লুকিয়ে-লুকিয়ে বাইরে গেছি। সে-ও কাউকে কিছু বলেনি। সে-ও একা-একা আমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিল। আমি যে কোনদিকে গেছি, প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি। কিন্তু আমি যখন কাঁকন দুটো গর্তে লুকিয়ে নদীর তীরে হাত ধুচ্ছি, তখন সে আমায় দেখতে পায়। আমার অজান্তে আমার পেছনে এসে দাঁড়ায় সে। চাপা গলায় ধমকে ওঠে, ‘এখানে কী করছ?
“আমি হকচকিয়ে তার দিকে মুখ ফেরাই। কিন্তু কোনও উত্তর দিই না।
“সে আবার ধমক মারে, ‘এত রাত্রে এখানে কী করছ?’
“তবু আমি চুপ করে থাকি। উঠে দাঁড়াই।
“সে এবার আমার হাতের দিকে তাকাল। আমার হাতে কাঁকন না দেখে ক্ষিপ্তস্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘কাঁকন কই?’
“এবার আমি বেপরোয়া হয়ে উত্তর দিলুম, ‘বলব না।’
“সে আচমকা আমার গলাটা টিপে ধরল। জিজ্ঞেস করল, ‘বলো, কোথায়?’
“আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তার হাত থেকে নিজের গলাটা ছাড়াবার চেষ্টা করলুম। কিছুতেই পারলুম না। আমার মনে হল, আমি এবার দম আটকে মরে যাব। আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় পা ছুঁড়লুম। তার গায়ে লাগল। আমার গলা থেকে তার হাতটা ছিটকে গেল। সে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ল। আমি দৌড় দিলুম। নদীর তীর ধরে আমি দৌড়াচ্ছি। সে চোখের পলকে উঠে পড়েছে। সে-ও আমার পিছু নিল। আমি তার সঙ্গে ছুটে পারলুম না। সে আমায় ধরে ফেলল। আমি নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করলুম। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি লেগে গেল। কিন্তু কতক্ষণ যুঝব! সে আমায় টানতে-টানতে নদীর পাড় থেকে নদীর জলে ঠেলে ফেলে দিল। আমি ডুবে গেলুম।”
তারপর —?
তারপর—?
“তারপর আর কিছু জানি না। জানি না, কবে কেমন করে এই জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে আমি ঢুকে পড়েছি। ঢুকে সারারাত ধরে আমি এ-ঘর ও-ঘর করি। আমি খুঁজে বেড়াই আমার পঙ্খের কাজকরা সেই খাট, আমার দেরাজ। দেরাজে আমার থরে-থরে সাজানো ছিল গুলবাহার, কাতান, বেনারসি, গরদ, তসর, কতরকমের শাড়ি। আরও কত সাজসজ্জা। আমার গয়নার বাক্সে উপচে পড়ত কতরকমের গয়নাগাটি। পায়ের মল। কানের কর্ণমালা। চৌদানি দুল। ঝুমকো। বীরবৌলি। পাশা। গলার সাতনরী। মণিহার। চন্দ্রহার। ফুলোহার। আরও কত কী! ছিল কেয়ূর, মানতাসা। রতনচূড়। তাজ। কিরীট। চুড়ি। বলে শেষ করা যায় না। সেসব কিচ্ছু নেই। এখন জমিদারবাড়িতে ইস্কুল বসে। ছেলেরা দিনের বেলা পড়তে আসে। রাত্তিরবেলা আমি একা-একা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াই। আর আমার গয়নাগাটির শোকে আমি কান্নাকাটি করি।” বলতে-বলতে সে একটু থামল।
কিন্তু শচীনের বাবা এখন যে কী করবেন, সে তাঁর মগজে এল না।
সেই মৃত আত্মা আবার বলল, “তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমার কোনও ক্ষতি করব না, যদি তুমি আমার একটি কাজ করে দাও।”
শচীনের বাবা এবার উত্তর দিলেন, “বলো, কী কাজ?”
সে বলল, “তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“যেখানে আমি আমার কাঁকন দুটো মাটির নিচে পুঁতে রেখেছি, সে-জায়গাটা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তোমাকে খুঁজে দিতে হবে।”
তিনি বললেন, “তুমি কোথায় পুঁতে রেখেছ, আমি কেমন করে জানব?”
“আমি তোমাকে সেই জলা-জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাব। সেই জঙ্গলের ভেতরে যে-গাছটার নিচে আমি কাঁকন দুটো পুঁতে রেখেছি, সেই গাছটাও তোমাকে আমি দেখিয়ে দেব। তুমি শুধু সেই লুকানো গর্তের চিহ্নটা খোঁজ করে গয়না দুটো আমাকে বের করে দেবে।”
তিনি জবাব দিলেন, “অন্ধকারে এ তো এক অসম্ভব কাজ!”
“তোমার তো টর্চ আছে। সঙ্গে নাও!”
তিনি কোনও উত্তর দিলেন না। হয়তো-বা এই অশুভ আত্মার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি টর্চটা হাতে নিলেন। তারপর বললেন, “চলো, আমি জঙ্গলে যাব।”
দরজা ডিঙিয়ে বেরিয়ে এলেন শচীনের বাবা। বেরিয়ে বললেন, “তোমাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না যে!”
“দেখার দরকার নেই। আমার পায়ের শব্দ শুনে-শুনে তুমি আমাকে অনুসরণ করো। সাবধান, আলো জ্বেলে আমায় দেখবার চেষ্টা করো না!”
শচীনের বাবা কান খাড়া করে তার পায়ের শব্দ শুনতে-শুনতে এগিয়ে চললেন। অবশ্য মাঝে-মাঝে তাঁর আচমকা টর্চটা জ্বেলে রহস্যটা দেখার যে কৌতূহল হচ্ছিল না, তেমন নয়। কিন্তু যতবারই কৌতূহল হচ্ছিল, ততবারই তাঁর মনে হচ্ছিল, না, দরকার কী! হিতে বিপরীত হলে তখন তাঁকে দেখবার কেউ থাকবে না। কাজেই তিনি চুপচাপ তার পায়ের শব্দ শুনেই এগিয়ে চললেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি ভেতরে-ভেতরে ভয় পাচ্ছিলেন না। একটা সাঙ্ঘাতিক ভয়ের চাপ তাঁর বুকের ওপর চেপে বসে ছিল সারাক্ষণ। গলা তাঁর শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তবু তাঁকে হাঁটতে হচ্ছে তার পায়ের শব্দ শুনে।
অনেকখানি এসে পায়ের শব্দ থামল। সামনে সত্যি একটা জঙ্গল। সে বলল, “এই জঙ্গলে ঢুকতে হবে। এসসা আমার সঙ্গে। এখনও টর্চ জ্বালাবার সময় হয়নি। আমি যখন বলব, তখনই টর্চ জ্বালবে।”
বেশ খানিকটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলেন তিনি। তারপর আবার থামলেন। কেননা, সেই মৃতের পায়ের শব্দ থামল।
সে বলল, “ওই দ্যাখো, সামনেই সেই গাছ। আমি এইখানেই দাঁড়িয়ে রইলুম। তুমি এবার টর্চ জ্বালিয়ে গাছের চারপাশটা তল্লাশি করতে পারো!”
জঙ্গলে হাঁটতে-হাঁটতে তাঁর পায়ে কাঁটা ফুটেছে। গাছের ডালপালার ঘষটানি লেগে হাত-পা ছড়ে-ছিঁড়ে গেছে। তা যাক। সেসব তাঁর এখন খেয়াল নেই। তিনি টর্চ জ্বাললেন। জঙ্গলের ভেতরের গভীর অন্ধকারটা হঠাৎ আলোয় ঝলসে উঠল। তিনি চোখ ফেরালেন এদিকে-ওদিকে। কাউকে দেখতে পেলেন না। কিছুই দেখা গেল না। তিনি এবার গাছের নিচে টর্চের আলো ফেলে গর্তের চিহ্ন খুঁজতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ ধরে তিনি সন্ধান করলেন। নিস্তব্ধ চতুর্দিক। তিনি মুখ গুঁজে চিহ্ন খুঁজছেন।
হঠাৎ যেন তাঁর নজরে পড়ল একটা চিহ্ন। হঠাৎ যেন তাঁর মনে হল, এইটিই বোধ হয় সেই গর্তের নিশানা। তাঁর বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “পেয়েছি-ই-ই।”
সে সাড়া দিল, “খুঁড়ে ফেলো।”
তিনি বললেন, “গর্ত খোঁড়ার তো কোনও কথা ছিল না। তুমি তো বললে শুধু গর্তের চিহ্নটা খুঁজে দিতে।”
সে বলল, “হ্যাঁ, আগে যা বলেছি, সে-কাজটা তুমি ঠিক-ঠিক করেছ কি না, এবার তার প্রমাণ তোমাকেই দিতে হব। আমার সঙ্গে কথা বলে মিছে কথা বাড়াবার দরকার নেই। যা বলছি, তাই করো!” মনে হল সে যেন তাঁকে হুকুম করছে।
অগত্যা শচীনের বাবা গর্তই খুঁড়তে বসলেন। প্রথমে একটা গাছের মোটা ডাল দিয়ে সেই গর্তের মাটি খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে তুলে ফেললেন। অনেকটা গর্ত খোঁচানো হলে তিনি এবার নিজের হাত দিয়ে গর্তটা খাবলাতে লাগলেন। খানিকটা খাবলাবার পর সত্যিই তাঁর হাতে যেন শক্তমতো কী ঠেকল। আর একটু খাবলাতেই তাঁর হাতে উঠে এল দু-দুটো সোনার কাঁকন। শচীনের বাবা টর্চের আলোটা ভাল করে তার ওপর ফেলতেই তাঁর চোখ ঝলসে উঠল। মাটিতে পোঁতা সেই সোনার জেল্লা এখনও যে ফিকে হয়ে যায়নি, স্পষ্ট বুঝতে পারলেন তিনি।
“কী? পেয়েছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
তিনি বললেন, “পেয়েছি কিনা সে তো তুমি দেখতেই পাচ্ছ!”
সে বলল, “তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”
শচীনের বাবার গলার সুর এবার পালটালো। তিনি বললেন, “তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।”
সে বলল, “এবার সোনার কাঁকন দুটো গাছের নিচে রাখো! তোমার হাতের টর্চটা নিবিয়ে ফেলো! আমায় কাঁকন দুটো নিতে দাও।”
“আলো যদি না নেবাই?”
সে উত্তর দিল, “মানে? সোনা হাতে পেয়ে লোভ হয়ে গেল নাকি? আলো নেবাও?”
“না!” দৃঢ় গলায় উত্তর দিলেন শচীনের বাবা।
সে সতর্ক করল, “নিজের বিপদকে এভাবে ডেকে এনো না। সময় বড় তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। এখন রাত সাড়ে তিনটে। আর কিছুক্ষণ পরেই ভোর হবে। তার আগেই আমাকে লুকিয়ে পড়তে হবে। তুমি আলো নেবাও!”
শচীনের বাবা এবার বেশ দৃঢ় স্বরেই বললেন, “তোমার কথা আমি রাখতে পারছি না।” বলেই যেদিক থেকে তার গলার শব্দ ভেসে আসছিল সেইদিকেই টর্চের আলো ফেললেন। সঙ্গে-সঙ্গে একটা বিকট মেয়েলি চিৎকার। তারপর শোনা গেল একটা হিংস্র হাসি। তারপর দেখা গেল টর্চের আলোটা ঝপ করে নিবে গেল। চেঁচিয়ে উঠলেন শচীনের বাবা। তারপর কে যেন তাঁর ঘাড়ে প্রচণ্ড জোরে একটা ধাক্কা মারল। তিনি ছিটকে পড়লেন। তাঁর হাত থেকে সোনার কাঁকন দুটোও ছিটকে গেল। হাতের টর্চটা যে কোন ঝোপের মধ্যে পড়ল, দেখা গেল না। শুধু শোনা গেল, সেই হিংস্র মেয়েলি হাসিটা গাছের ফোকর দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। অনেক দূরে, আরও দূরে। তারপর আর শোনা গেল না।
শচীনের বাবা এখন এই অন্ধকারে পড়ে-পড়ে কিছুক্ষণ হাঁপালেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। না কোনও প্রেতাত্মা। না কোনও আলো। কোন পথ দিয়ে তিনি যে এই জঙ্গল পেরিয়ে বাইরে যেতে পারবেন তা-ও তিনি ঠাওর করতে পারলেন না। এবার তাঁর সত্যিই ভয়ঙ্কর একটা ভাবনা মনের ভেতরে দানা বাঁধল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আমাকে বাঁচাও-ও-ও।”
জঙ্গলের ভেতর থেকে সেই অন্ধকার রাতে তাঁর চিৎকার কারও কানে পৌঁছল না।
ভোর হল। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই দেখা গেল একটা বিধ্বস্ত মানুষ খোঁড়াতে-খোঁড়াতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছেন। বেরিয়ে তিনি প্রাণভরে একটু শ্বাস নিলেন। তারপর পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লেন। তারপর তিনি আর কিছু জানেন না।
অনেকক্ষণ পর তাঁর জ্ঞান ফিরেছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন