শৈলেন ঘোষ

“হাকিমের বন্ধুটিও হাকিমের মতো দয়ালু। তিনি আদর করে আমায় ‘বেটা' বলে ডাকতেন। আমি সাড়া দিতুম ‘চাচা’ সম্বোধন করে। পথে, তিনি কখনও আমায় গাড়ি করে নিয়ে যান। কখনও ঘোড়ায় চড়ি, কখনও উটে। কখনও পায়ে হেঁটে পাহাড় ভাঙি, কখনও জাহাজে কিংবা নৌকোয়। ক’দিন লাগল ঠিক বলতে পারব না, তবে ইরানের ইসফাহান শহর থেকে আফগানিস্থানের সবচেয়ে বড় শহর কাবুলে আসতে অনেক রাত আমাদের কেটেছে হয় পান্থশালায়, না-হয় তাঁবুর নিচে। নয়তো কোনও মসজিদে। কাবুল থেকে একশো মাইল পথ গাড়িতে চেপে আমাদের আসতে হয়েছিল খাইবার পাস-এ। হিন্দুকুশ পর্বতের শাখা সফেদ কোহ্ পর্বতের গায়ে এই খাইবার পাস। তখন তো হিন্দুস্থান ভেঙে পাকিস্তান হয়নি। তাই খাইবার পাসই ছিল তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্থান, তার সঙ্গে আরও নানান দেশের মানুষের হিন্দুস্থানে যাতায়াতের পথ। পাথর কেটে আটাশ মাইল সরু পথ তৈরি করা হয়েছিল পর্বতে। এখানে এখন গাড়িও চলে। কিন্তু তখন আমি আর চাচা ঘোড়ার পিঠে চলেছি খাইবার পাস দিয়ে হিন্দুস্থানে। দেখছি চারদিকে ছড়ানো কী চমৎকার সব দৃশ্য।
“চাচা আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন লাগছে?’
“আমি উত্তর দিলুম, ‘খুব ভাল।’
“চাচা বললেন, ‘আমরা এখন যে-পথ দিয়ে যাচ্ছি, তিন-চার হাজার বছর আগে আর্যরা এই পথ দিয়েই হিন্দুস্থানে গেছিলেন। অনেকে বলেন, আলেকজান্ডারও নাকি পঞ্জাবে পৌঁছেছিল এই খাইবার পাস দিয়েই। প্রায় হাজার বছর আগে এই পথ ধরে গিয়ে এক আফগান সুলতান মহম্মদ গজনি হিন্দুস্থান আক্রমণ করে উত্তর-পশ্চিম হিন্দুস্থানে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। প্রায় আটশো বছর আগে চেঙ্গিস খাঁ এই খাইবার পাসের ভেতর দিয়েই সিন্ধুনদের তীরে পৌঁছে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। প্রায় ছ’শো বছর আগে তারই এক বংশধর তৈমুরলং এই খাইবার পাস পেরিয়ে সিন্ধুনদের তীর থেকে গঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত কত যে শহর লুঠপাট করে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দিয়েছিল, তার হিসেব নেই। এই পথ ধরেই তাদের আর-এক বংশধর বাবর প্রায় চারশো বছর আগে হিন্দুস্থানে পৌঁছে মুঘল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন।’
“আমি চাচার মুখে এইসব গল্প শুনতে-শুনতে ঘোড়ার পিঠে বসে যতই এগোচ্ছি, ততই কী চমৎকার লাগছিল পাহাড়ি দৃশ্য। সে-দৃশ্য দেখে যেমন অবাক হয়ে যাচ্ছিলুম, তেমনই সেইসব গল্প শুনেও আমার গা শিউরে উঠছিল। ভাবছিলুম, যে-পথ দিয়ে এখন আমি যাচ্ছি, যাদের নিয়ে বড়-বড় ইতিহাস লেখা হয়েছে, একদিন তারাও এই পথ দিয়েই গেছে। গা তো শিউরে উঠবেই।
“সে যাই হোক, খাইবার পাস পেরিয়ে পঞ্জাবের লাহোর হয়ে বোম্বাইয়ের রাজেগাঁও গ্রামটায় আসতে আরও কটা দিন কেটে গেল।”
এই পর্যন্ত বলে দরবেশদাদু একটু থামলেন। রোশনের মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে বললেন, “এখন দ্যাখ, আমি আর রেহান নামে সেই ছেলেটি নই। এখন আমি তোর বুড়ো দরবেশদাদু। তুই তো এখন মাত্র আট-ন বছরের একটি ছোট্ট ছেলে। ভাব, তোর মতো বয়সে আমি এই রাজেগাঁও গ্রামে এসেছিলুম আমার সেই দাদুর কাছে। পড়াশোনা করেছি যতটা দাদু পড়াতে পেরেছেন। মাঠে দাদুর সঙ্গে হাতে-হাত মিলিয়ে ফসল ফলিয়েছি। দাদুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান শিখেছি। দাদুর কষ্টে, নিজেও কষ্ট পেয়েছি। দাদুই তখন আমার সব। দাদুই আমার বিয়ে দিলেন। তারপর দাদুও একদিন চলে গেলেন।” বলে দরবেশদাদু আকাশে হাত তুললেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “আমার ছেলের আমি বিয়ে দিলুম। আমার নাতি হল। কিন্তু এমনই আমার নসিব, তোর দাদিও আমায় ছেড়ে চলে গেল। সে তো তুই জানিস রোশন। এবার বোধহয় আমারও যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ওরে রোশন, এ-দেশে আমার জন্ম না-হলেও আমি কখনও মনে করতে পারি না, এ আমার দেশ নয়। এই দেশের মাটি গায়ে মেখে আমি বড় হয়েছি। এর জল, বাতাস আমার প্রাণ। এ-দেশের মানুষ আমার বন্ধু। যেমন তুই আমার ছোট্ট বন্ধু।”
এমন সময় রোশন হঠাৎই জিজ্ঞেস করল, “তোমার মায়ের কথা, বাবার কথা, দাদা-দিদির কথা এখন মনে পড়ে না দরবেশদাদু?”
“মনে পড়ে রে রোশন, মনে পড়ে, সবার কথা মনে পড়ে।” বলে দরবেশদাদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “সেই সঙ্গে মনে পড়ে দয়ালু মানুষ সেই হাকিমের কথা। তিনি আমায় প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। মনে পড়ে তাঁর বন্ধুর কথাও, যিনি আমায় এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছিলেন। এই পৃথিবীতে এখন তাঁরা নিশ্চয়ই কেউ নেই। তাঁদের সকলের সেই মুখগুলি এখনও অস্পষ্ট ভেসে ওঠে আমার চোখের ওপর। এমন কি, ভেসে ওঠে সেই মেষপালকের মুখখানিও। তিনি যদি দেখতে না পেতেন, আমি হয়তো কবেই মরে যেতুম!”
দরবেশদাদুর এই গল্পটা যেমন অবাক হয়ে শুনেছিল রোশন, তেমনই অবাক হয়ে শুনিয়েছিল তার ফুলতিদিদিকে। তারপর বলেছিল, “দ্যাখো ফুলতিদিদি, পৃথিবীতে কত রকমের মানুষ বাস করে। যেমন খারাপ মানুষ আছে, তেমনই ভাল মানুষও কম নেই।”
ফুলতিদিদি উত্তর দিয়েছিল, “ও-কথা বলতে নেই। খারাপ কেউ নয়, সক্কলে ভাল।”
রোশন সঙ্গে-সঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিল, “সব মানুষই যদি ভাল হয় তবে মানুষ নিজেদের মধ্যে মারামারি করে কেন?”

“একসঙ্গে থাকতে গেলে অমন একটু-আধটু হয়েই থাকে।” উত্তর দিয়েছিল ফুলতিদিদি।
“কিন্তু তাই যদি হয়, তবে দরবেশদাদু যে এত কষ্ট পেলেন, তাকে তো আর তুমি একটু-আধটু বলতে পারো না! তখন তিনি আমার মতো ছোট। সেই বয়সে সবাইকে হারিয়ে তিনি কত কষ্ট করে আমাদের দেশে এসেছিলেন।” জবাব দিয়েছিল রোশন।
ফুলতিদিদি একটু মুচকি হেসে বলেছিল, “সে তো যুদ্ধ হচ্ছিল, তাই।”
“যুদ্ধ তো মানুষই করে। যারা যুদ্ধ করে তাদের তো আর তুমি ভাল বলতে পারো না!” রোশনের গলার স্বরে আক্রোশ, “তুমি বলল, দরবেশদাদুর মা-বাবা, দাদা-দিদি সবাইকে অমন করে চোখ বেঁধে, হাতে লোহার শেকল পরিয়ে পাহাড়ের ওপরে ছেড়ে দিয়ে আসাটা কি ভালমানুষের কাজ? বলল, একটা ছোট্ট ছেলে সবাইকে হারিয়ে একা বেঁচে রইল এই পৃথিবীতে, সে কি মানুষের ভাল কাজের জন্য?”
এর কোনও উত্তর দিতে পারেনি ফুলতিদিদি। শুধু বলেছিল, “রোশন, আমিও তা হলে খুব খারাপ, না রে?”
রোশনের আক্রোশভরা মুখখানা চকিতে নরম হয়ে গেল। তার ফলতিদিদি যে হঠাৎ এমন একটা কথা বলে বসবে, রোশনের মতো একজন ছোট্ট ছেলে তা জানবে কেমন করে! সে তো দরবেশদাদুর কষ্টের গল্প শুনেই এই কথাটা বলেছে। যাকে ভালবাসে মানুষ, তার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনলে কার বুকের ভেতরটা গুমরে ওঠে না শুনি! সে যে ফুলতিদিদিকে ভালবাসে সবার চেয়ে বেশি। ফুলতিদিদির ওই তো বয়স। দ্যাখো, এই বয়সের একটা মেয়ে একা অসুস্থ মাকে দেখছে। সংসারের সব কাজ করছে। এর-তার বাড়িতে এটা-ওটা কাজ করে দু’ পয়সা রোজগার করে মায়ের ওষুধ কিনছে। পথ্য জোগাচ্ছে। অথচ নিজের শরীরের দিকে একটিবারও নজর দিচ্ছে না। নিজে দু’বেলা পেটে কিছু দিচ্ছে কি না, তার খোঁজ কে রাখছে! অসুস্থ মা জিজ্ঞেস করলে মেয়ে উত্তর দেবে, “মাগো, আমার কথা তোমায় ভাবতে হবে না। ভগবানের দয়ায় তুমি ভাল হয়ে উঠলেই, আমি ভাল থাকব।”
ফলতির কথা শুনে মা ক্রুদ্ধ গলায় বলে ওঠেন, “শুনে রাখ ফুলতি, ভগবান বলে যদি কেউ থাকে, তবে সে বড় একলষেঁড়ে। যার কেউ নেই, কিছু নেই তাকে দেখে না সে। যার অনেক আছে, তার ঘরেই তার যাতায়াত। আমি মরে গেলে কি ভগবান তোকে দেখতে আসবে? না। সে বড় নির্দয়।”
মায়ের কথা শুনে ফুলতিদিদি কেঁদে ফেলে। কাঁদতে-কাঁদতে বলে, “অমন কথা বোলো না মা! আমি যতক্ষণ আছি তোমায় মরতে দেব না। কিছুতেই না।”
রোশন এসব কথার কিছুই জানে না। কিন্তু ফুলতিদিদি যখন তাকে জিজ্ঞেস করল, “রোশন, আমিও খুব খারাপ না রে?” তখনই রোশনের চোখ ছলছল করে উঠল। সে দু’ হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।
থতমত খেয়ে গেল ফুলতিদিদি। রোশনকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “এ মা, এত বড় ছেলে কাঁদছে!”
রোশন ফুলতিদিদির দু’ হাতের তলায় হারিয়ে গিয়ে বলে উঠল, “আমি তো তোমাকে খারাপ বলিনি। তুমি তো ভাল।”
হেসে ফেলল ফুলতিদিদি।
তবু ফোঁপায় রোশন।
ফুলতিদিদি ভোলায় রোশনকে, “আজ রাত্রে যাত্রা হবে, দেখতে যাবি না রোশন?”
যাত্রার নাম শুনে রোশনের কান্নার রেশটা যদিও একটু কমল, কিন্তু একেবারে থামল না। সে মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে হাপুস নয়নে বলল, “আমি একা যাব না।”
ফুলতিদিদি এবার একটু জোরে হেসে ফেলে উত্তর দিল, “দুর বোকা, তুই একা যাবি কেন! আমিও যাব।”
রোশনের মুখে হাসি ফুটল। একটুখানি কান্না-মেশানো হাসি। বলল, “তা হলে আমিও যাব।”
ক’দিন ধরেই যাত্রার তোড়জোড় চলছিল। বছরে একবার যাত্রাগান গ্রামে বসবেই। কোন দূর-দূর গাঁ থেকে কত মানুষ যাত্রাগান শুনতে আসে। গত বছরে গণেশের পালা হয়েছিল। তখন তো আরও এক বছরের ছোট ছিল রোশন। তখন রোশন মন্দিরে যতবারই গণেশের মূর্তি দেখেছে, ততবারই অবাক হয়ে গেছে। সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারত না, কেন গণেশ দেবতার মুখ অমন হাতির মতো। গেল বছর গণেশের পালা দেখে তার ধাঁধা কেটে গেছে। তাকে এখন কেউ ঠকাতে পারবে না। সে জানে, শিব আর পার্বতীর ছেলে গণেশ। আবার গণেশ-দেবতার দুই ছেলে মঙ্গল আর সিদ্ধি। সব পুজোর আগে গণেশের পুজো করতেই হয়। তা না হলে সিদ্ধি হয় না। গণেশ যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল সব জায়গা থেকে দলে-দলে দেবতারা পার্বতীর ছেলেকে দেখতে আসেন। সেইসঙ্গে শনিও আসেন। শনির বাবা সূর্য, মা ছায়া। শনির বিয়ে হয়েছিল। চিত্ররথের মেয়ের সঙ্গে। একদিন শনি তপস্যা করছেন। এমন সময় তাঁর স্ত্রী খুব সাজগোজ করে শনির সামনে এসে দাঁড়ালেন। শনিকে একটিবার তাঁর দিকে চোখ মেলে তাকাতে বললেন। কিন্তু শনি তো তখন ধ্যান করছেন। স্ত্রীর কথা তাঁর কানেই গেল না। তিনি স্ত্রীকে দেখলেনও না। স্ত্রী তো রেগে খাপ্পা। স্ত্রী রেগে ধ্যানমগ্ন শনিকে অভিশাপ দিলেন, আজ যেমন তুমি আমায় দেখলে না, তেমনই এখন থেকে তুমি যার দিকেই দৃষ্টি দেবে তারই বিনাশ হবে। সুতরাং পার্বতীর ছেলে গণেশকে দেখতে গিয়েও শনির দেখা হয় না। তিনি মুখ নিচু করে বসে থাকেন। পার্বতী বারবার শনিকে অনুরোধ করলেন। শেষে পার্বতী যখন নাছোড়বান্দা, তখন শনি পার্বতীকে তাঁর স্ত্রীর অভিশাপের কথাটা বললেন। পার্বতী সব শুনেও তাঁর ছেলের মুখ দেখার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন। অগত্যা শনি পার্বতীর কথা শুনে যেই গণেশের মুখ দেখেছেন, অমনই গণেশের মুণ্ডুটা ধড় থেকে ছিটকে পড়ল। কী সর্বনাশ! এখন কী হবে? খবর চলে গেল বিষ্ণুর কাছে। তিনি ছুটে এলেন। সামনে আর কিছু দেখতে না পেয়ে রাস্তায় ঘুমন্ত একটি হাতি দেখতে পেলেন। সুদর্শনচক্র দিয়ে সেই হাতির মুণ্ডুটা কেটে এনে গণেশের গলায় বসিয়ে দিলেন। সেই থেকে গণেশের মুণ্ডুটি হাতির।
এবারের যাত্রায় হবে একলব্যের পালা। এ-গল্পটাও রোশন। একটু-একটু জানে। জানে নচিকেতার গল্পও। কিন্তু অভিমন্যুর গল্পটা মনে পড়ে গেলেই মনে-মনে ভীষণ রেগে যায় রোশন। বলল, কুরু-রা কেমন ছলচাতুরি করে মেরে ফেলল ওইটুকু একটা বীর ছেলেকে। রোশনদের গ্রামে অনেকের বাড়িতে এখন টেলিভিশন আছে। রামায়ণ আর মহাভারত দুটোই দেখেছে রোশন। খুব ভাল লেগেছে। কিন্তু যাত্রায় সামনাসামনি দেখলে আরও মজা লাগে। অবশ্য তীর ছোঁড়াছুঁড়ি বা আকাশে উড়ে যাওয়ার ছবিগুলো তো আর যাত্রায় দেখানো যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন