শৈলেন ঘোষ

এই একটা মস্ত ঘরে রোশন এখন একা। কোথা থেকে কোথায় সে কেমন করে চলে এল! এখন যদি সে বাবার খোঁজ না পায় তা হলে কী হবে? বসে-বসেই রোশন ঘরের চারদিকটা জুলজুল করে দেখছিল। অবশ্য কতক্ষণ আর বসে-বসে দেখা যায়! কত দেখার জিনিস! সে উঠে দাঁড়াল। যে-সোফাটায় সে বসে ছিল, সেই সোফাটাই সে প্রথম ভাল করে দেখল। এটাকে যে ‘সোফা’ বলে সে আর রোশন জানবে কেমন করে! কাজেই সে হাত দিয়ে টিপে-টিপে দেখতে লাগল ভেতরে কী আছে! কী নরম! মনে হল, তুলোর চেয়েও নরম। ঠিক এই সময়ে দেওয়াল ঘড়িটা বেজে উঠল: টুং টিং টিং টং টুং। ঘড়ির ভেতর এমনই সব নানা বাজনা-বাজতে বাজতে হঠাৎ ঢং ঢং ঢং করে সাতটা ঘণ্টা বেজে থেমে গেল! রোশন বুঝতে পারল এখন সকাল সাতটা।
হঠাৎ ঘরের একদিকের কোণের টেবিলটার ওপর রোশনের দৃষ্টি পড়ল। সেইদিকেই সে এগিয়ে গেল। টেবিলটার ওপর চোখ রেখে সে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। সে স্পষ্ট দেখল তাদের গ্রামের ডাক্তারবাবু যেমন দু’ কানে দুটো নল লাগিয়ে একটা যন্ত্র দিয়ে মানুষের বুকের সর্দিকাশি দেখেন, তেমনই একটা যন্ত্র টেবিলের ওপর পড়ে আছে। সেটা হাতে ছুঁয়ে দেখবে কি দেখবে না এমন কথা যখন ভাবছিল রোশন, তখনই তার চেয়ে একটু বড় একটি মেয়ে ঘরে ঢুকে হঠাৎ কথা কয়ে উঠল, “কী দেখছ?”
চমকে ফিরে দাঁড়াল রোশন। কী চমৎকার দেখতে একটি মেয়ে! কী সুন্দর একটা জামা পরে আছে! কথা বলবে কী, তাকে দেখে অবাক হয়ে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল রোশন।
মেয়েটি এবার হাসতে-হাসতে এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে সেই যন্ত্রটা তুলে নিয়ে বলল, “এটাতে হাত দিয়ো না। এটা দিয়ে বুকের অসুখ দেখে। এটার নাম স্টেথিস্স্কোপ।” বলে স্টেথিস্স্কোপটা আবার টেবিলেই রেখে দিল।
রোশন যে যন্ত্রটায় হাত দেয়নি শুধু সেটা জানাবার জন্যই বলল, “আমি তো হাত দিইনি।”
মেয়েটি বলল, “আমি জানি তুমি হাত দাওনি। কিন্তু হাত দিয়ে ফেললেই মুশকিল।”
মেয়েটির কথা বলার ধরনটা এমন মিষ্টি, রোশনের ভারি ভাল লেগে গেল। রোশন খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের বাড়িতে বুঝি ডাক্তারবাবু থাকেন?”
“হ্যাঁ, আমার বাবা ডাক্তার।” মেয়েটি উত্তর দিল।
“অ। ”
মেয়েটি বলল, “চলো, তুমি মুখ-হাত-পা ধুয়ে নেবে চলো। কাল থেকে তোমার নিশ্চয়ই কিছু খাওয়া হয়নি!”
“কে বলল?” জিজ্ঞেস করল রোশন।
“কেন, বাবা বললেন।”
মেয়েটির কথা শুনে কেমন যেন সব গুলিয়ে গেল রোশনের। মনে-মনে ভাবল, মেয়েটির বাবা জানলেন কেমন করে! তবে কি যিনি রোশনকে গাড়ি করে এ-বাড়িতে নিয়ে এলেন, তিনি মেয়েটির বাবাকে রোশনের সব কথা বলেছেন! রোশনের ভাববার জন্য যতটুকু সময় গেল, ঠিক ততটুকু সময়ই চুপ থেকে হঠাৎ রোশন জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা জানলেন কেমন করে?”
“বা রে, বাবাই তো তোমাকে নিয়ে এসেছেন।” উত্তর দিল মেয়েটি।
রোশন অবাক গলায় বলল, “আমাকে যিনি এনেছেন, তিনি তো একজন ড্রাইভার!”
এবার মেয়েটি আর থাকতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল। রোশন তার হাসি দেখে লজ্জায় একশেষ। হাসতে-হাসতেই মেয়েটি বলল, “তুমি একদম ঠকে গেছ। আমার বাবা নিজে গাড়ি চালান। রোজ সকালে গাড়ি চালিয়ে সমুদ্দুরের তীরে বেড়াতে যান।”
রোশনের মুখে এবার যেন সত্যিই কথা হারিয়ে গেল। সে অবাক চোখে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ যখন তার মনে হল সে অনেকক্ষণ হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে আছে, তখনই সে আমতা-আমতা করে বলল, “টেবিলের ওপর ওই যে যন্ত্রটা তুমি আমায় হাত দিতে বারণ করলে, ওটা তোমার বাবার?”
“হ্যাঁ। আমার বাবার নাম, ডাক্তার কাইজার্ড।”
রোশন এবার নিজেই বলল, “আমার নাম—”
“রোশন।” রোশনের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মেয়েটি উত্তর দিল। উত্তর দিয়েই আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।
রোশন এবার সত্যিই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। কেমন যেন মিয়োনো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানলে কেমন করে?”
“কেন, বাবা তো তোমার নাম জানেন। তুমিই তো বলেছ!” মেয়েটি উত্তর দিল।
রোশন বলল, “আমার তো নামটা তোমার জানা হয়ে গেছে। কিন্তু তোমার নামটা তো বলছ না?”
“আমার নাম ফারহানা।” মেয়েটি হাসিমুখে উত্তর দিল।
রোশন জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের নামগুলো এমন অদ্ভুত কেন? এমন নাম তো আমাদের গ্রামে কারও নেই! শহরের মানুষের নাম বুঝি এমনই হয়?”
“না, সবার নাম এমন কেন হবে! পার্শিদের এমনই সব নাম হয়। আমরা যে পার্শি।”
রোশন জিজ্ঞেস করল, “সে আবার কী? তোমরা বুঝি কোনও গ্রামে থাকো না? তোমাদের বুঝি জমিজমা নেই? তোমাদের জমিতে জোয়ারের চাষ হয় না?”
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের আছে বুঝি?”
“আমার বাবা জমিতে জোয়ারের চাষ করেন। সূর্যমুখী ফুলের বীজ ফেলেন।”
মেয়েটি বলল, “আমাদের বাড়ির পেছনে ফুলের বাগান আছে।”
“দেখাবে?” রোশন জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি বলল, “দেখাব। আগে তুমি চলো! মুখটুখ ধুয়ে খাবে চলো! মুখখানা তো শুকিয়ে চিমসে হয়ে গেছে।”
রোশন হাসল। বলল, “তুমি ঠিক ফুলতিদিদির মতো কথা বলো। চলো!”
রোশনের চেহারার যে কী হাল হয়েছিল, এখন তুমি তাকে দেখলে বুঝতেই পারবে না। এখন রোশন একেবারে ফিটফাট। বাবুটি। নতুন একটা হাফপ্যান্ট পরেছে। নতুন জামা। পায়ে নতুন জুতো। সব কিনে দিয়েছেন ফারহানার বাবা। রোশন এখনও জানে না, একটু পরেই তার বাবা আসবেন। কাল সারারাত ধরে বাবাও যে ছেলেকে খুঁজেছেন এ-কথাও রোশনের জানা নেই। ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে বাবা বাধ্য হয়েই থানা-পুলিশ করেছেন। এক থানা থেকে শহরের সব থানাতেই খবর গেছে। রোশনের খোঁজ-তল্লাশি শুরু হয়ে গেছে। এদিকে ফারহানার বাবা ডাক্তার কাইজার্ডও থানায়-থানায় টেলিফোন করে রোশনের খবরটা পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং রোশনের বাবা ছেলের খবর পেয়ে খানিক পরেই যে এখানে আসবেন, এটা এ-বাড়ির সবাই জানেন। এ-বাড়ির সবাই বলতে, ফারহানার মা জানেন, বাবা জানেন, ফারহানা জানে, বাড়ির দরোয়ান, কাজের লোক সব্বাই। শুধু জানে না রোশন আর ফারহানার একটা ছোট্ট এইটুকু ভাই। এই ছোট্ট ভাইটাকে রোশনের কী আদর করার ধুম!

ফারহানার সঙ্গে এরই মধ্যে বাগানটাও দেখা হয়ে গেছে রোশনের। এরই মধ্যে সারা বাড়ির এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে ঘুরে তন্নতন্ন করে সব কিছু দেখে কোনটাকে কী বলে তা-ও জানা হয়ে গেছে। সে যেমন জানে, কোনটাকে স্টেথিস্স্কোপ বলে, তেমনই জানে কোনটার নাম ফ্রিজ, কোনটা ওয়াশিং মেশিন, কোন মেশিনটা ঘর ঠাণ্ডা করে। এমন কি, জেনে ফেলেছে কোনটার নাম অর্গ্যান।
হারমোনিয়াম তো রোশন রোজ দেখছে, কিন্তু অর্গ্যান কখনও দেখেনি। ফারহানা যখন বলল, তার বাবা অর্গ্যান বাজিয়ে গান করেন, তখন রোশন যেন বিশ্বাসই করতে পারে না। কেননা, যে-মানুষটা মানুষের রোগ সারান, গাড়ি চালান, আবার সেই মানুষটাই যে এত বড় একটা অর্গ্যান বাজিয়ে গান করেন, এ যেন রোশনের মনে হয় একটা অসম্ভব ঘটনা। কিন্তু তারপরেই ফারহানা যখন বলল, সে-ও একটু-একটু অর্গ্যান বাজাতে পারে, তখন রোশন অবাক না হয়ে পারল না। আধফোটা মুখে বলল, “কেমন করে বাজাও একটু দেখাবে?”
ফারহানা ছোট্ট টুলের ওপর বসে যখনই রিড টিপেছে, ঠিক তখনই ফারহানার বাবা ঘরে ঢুকে পড়েছেন। ঢুকেই তিনি হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “ফারহানার কী হচ্ছে? বন্ধুকে গান শোনানো হচ্ছে?”
রোশন দেখল, ফারহানার বাবার গায়ে এখন একেবারে অন্য পোশাক। হাফপ্যান্টের বদলে পা অবধি একটা সাদা-ধবধবে জামা। কোমরে একটা পাকানো কোমরবন্ধ। মাথায় গোল টুপি। একদম অন্যরকম দেখতে লাগছে।
রোশন তাঁকে অন্য আর কিছু না বলে জিজ্ঞেস করল, “তুমি নাকি গান জানো?”
তিনি হাসতে-হাসতেই বললেন, “একটু-একটু।”
“শোনাবে?”
“শোনালে আমায় বকশিস দিবি তো?” বলে হো-হো করে হাসলেন তিনি। ফারহানাও হাসল। রোশন বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল।
তার মুখের কাঁচুমাচু চেহারাটা দেখে ডাক্তার কাইজার্ডের ভারি মায়া লাগল। তিনি বললেন, তোর চোখ দুটি দেখলেই আমার মনটা কেমন খুশিতে উছলে ওঠে। বেশ, শোন, আমার গান। এতক্ষণ ধরে এই গানটাই আমি লিখছিলুম:
আজকে ভোরের বেলা
সাগর খুশির খেলা
করছে যখন,
একটি ছোট্ট ছেলে,
তীরে তার অবহেলে
ঘুমোয় তখন।
চোখের পাতায় ঘুম,
সারা দেহ নিঝ্ঝুম
নেইকো খেয়াল,
কখন কেটেছে রাতি,
কেউ তার নেই সাথী,
কেন এ বেহাল!
আমার ধমকে যেই,
ঘুম তার ভাঙতেই,
আলো দেখি আলো!
দেখে ভাবি আহা কে এ
প্রাণ যেন ওঠে গেয়ে
তাকে বাসি ভাল।
গান শেষ হতেই তিনজনে একসঙ্গে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে রোশন বলল, “বুঝতে পেরেছি, গানটা তুমি আমায় নিয়ে লিখেছ। একসঙ্গে তুমি কত কী পারো! তুমি ডাক্তারি করো, গাড়ি চালাও, গান লেখো, অর্গ্যান বাজাও, আবার গানও গাও।”
ডাক্তার কাইজার্ড একটু চাপা ঠাট্টার সুরে বললেন, “আবার ম্যাজিকও জানি।” বলে প্রাণ খুলে একচোট হাসলেন।
ম্যাজিকের কথা বলতেই রোশনের হাসিখুশি মুখখানি হঠাৎ শুকিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “কই, তোমার ম্যাজিকের মন্তরে বাবা তো এল না!”
ডাক্তার কাইজার্ড উত্তর দিলেন, “আমার ম্যাজিকের মন্তরটা খুব শক্তিশালী। তাই কাজটাও হয় ধীরে-ধীরে। মন্তরের শব্দটা তোর বাবার কানে একবার পৌঁছলেই, ব্যস, তোর বাবার এখানে না-এসে উপায়ই নেই।”
রোশন মনমরা হয়ে উত্তর দিল, “তোমাদের শহরে এত লোক, এত গোলমাল, তোমার মন্তর কি বাবা শুনতে পাবে?”
কাইজার্ড বললেন, “আরে বাবা, এ হল আমার মন্তর। যতই হইহল্লা করো, আর গাড়ি ছোটাও, আমার মন্তরকে আটকাতে হচ্ছে না।”
“আচ্ছা, মন্তর দিয়ে তুমি অসুখও ভাল করতে পারো?”
রোশনের কথা শুনে ফারহানা এবার হেসে উঠল। ফারহানার সঙ্গে তার বাবাও।
“তোমরা হাসছ কেন?” জিজ্ঞেস করল রোশন। তারপর বলল, আমার ফুলতিদিদির মায়ের অসুখ বলেই জিজ্ঞেস করছি। আমাকে অসুখ সারাবার মন্তরটা তুমি শিখিয়ে দিলে, তোমার বদলে আমিও তা হলে মন্তরটা পড়ে তাঁকে ভাল করে দিতে পারি।”
ডাক্তার কাইজার্ড বললেন, “মন্তরে অসুখ সারে না।”
“তবে?”
“ওষুধে অসুখ সারে।”
“তা হলে আমাকে কটা ওষুধ দিয়ে দাও!”
ডাক্তার উত্তর দিলেন, “ক’টা ওষুধ খেলেই মানুষের রোগ সারে না। যেমন-যেমন রোগ, তেমন-তেমন ওষুধ খেতে হয়, বুঝলি!”
রোশন থমকে গেল। মনটা কেমন যেন হতাশ হয়ে গেল তার। সে আনমনা হয়ে ফুলতিদিদির মায়ের কথা ভাবতে লাগল।
রোশন যে একটু হতাশ হয়ে পড়ল, ডাক্তার তার মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন। তারপরেই হাসতে-হাসতে বললেন, “মন খারাপ হয়ে গেল বুঝি? ঠিক আছে। আমি একদিন তোর ফুলতিদিদির মাকে তোদের গ্রামে গিয়ে নিজে দেখে ওষুধ দিয়ে আসব।”
খাঁচার বন্দি পাখি যেমন ছাড়া পেলে আকাশে উড়তে-উড়তে আনন্দে লুটোপুটি খায়, তেমনই আনন্দে রোশনও যেন উচ্ছল হয়ে ওঠে। চিৎকার করে বলে, “সত্যি!” তারপর ঘরখানা কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। সে-ও যেন ডাক্তার কাইজার্ডের গানের মতো মিষ্টি। অথবা ফারহানার চোখের চাউনির মতো ঝকমকে।
ডাক্তার কাইজার্ড হাসতে-হাসতে বললেন, “জানিস তো, আমরা পার্শি। আমার গায়ে এই যে সাদা জামাটা দেখছিস, এটার নাম সুদরেহ্। আর জামার ওপর আমার কোমরে বাঁধা এই যে পাকানো বন্ধনীটা দেখছিস, এটার নাম কুশটি। ভেড়ার লোমের পশম দিয়ে এই কুশটি বোনা হয়। এতে বুনন আছে বাহাত্তরটা। আর এতে পাক দেওয়া আছে ছ’টা। আমার যখন বয়েস সাত বছর, তখন আগুনকে সাক্ষী রেখে এটি আমার কোমরে বেঁধে দেওয়া হয়। আমাদের ধর্মগুরুর নাম জোরোস্তার। আমরা আগুনের পূজারী। যখনই এই কুশটি আমার কোমরে পরিয়ে দেওয়া হল, তখন থেকেই তিনটি প্রতিজ্ঞা আমাদের মেনে চলতে হয়, ‘ভাল কাজ করো, ভাল কথা বলো, আর মনে-মনে ভাল কিছু চিন্তা করো।’ কাজেই, সত্যি ছাড়া আমরা কখনও মিথ্যে বলি না। আমি একবার যখন বলেছি তোর ফুলতিদিদির মাকে দেখতে যাব, তখন যাবই।”
ঠিক এই সময়েই দরোয়ান ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, “হুজুর, পুলিশ এসেছে।”
ডাক্তার কাইজার্ড বললেন, “ওঁদের বসাও।”
হ্যাঁ, পুলিশের সঙ্গে তখন রোশনের বাবা এসেছিলেন। তাঁরও যে সারারাত চোখে ঘুম ছিল না, সে তাঁর চোখ দেখেই বোঝা যায়। রোশন ফিরে পেয়েছিল তার বাবাকে। বাবাও খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ছেলেকে। তারপর বাবা আর ছেলে ফিরে গিয়েছিল নিজেদের গ্রামে। যাওয়ার সময় চোখ ছলছল করে উঠেছিল রোশনের, ফারহানার মুখের দিকে চেয়ে। ফারহানার অশ্রুফোঁটাগুলি তখন গড়িয়ে পড়ছিল গাল বেয়ে। আর ডাক্তার কাইজার্ডও তাঁর আবেগ সামলাবার জন্য রোশনের গালে একটি চুমো খেয়ে আবার একবার বলেছিলেন, “ফারহানাকে নিয়ে একদিন যাব তোদের গ্রামে। তোর ফুলতিদিদির মাকে ওষুধ দিয়ে আসব।”
বাবার সঙ্গে নির্বিঘ্নে ফিরে এসেছিল রোশন তাদের গ্রামে। ফিরে এসেছিল রোশন তার মায়ের কাছে যেমন, তেমনই তার ফুলতিদিদি আর ফুলতিদিদির মায়ের কাছেও। ফিরে এসেছিল দরবেশদাদুর কাছে। পোস্টম্যানভাই, মাস্টারজি, তার বন্ধু শচীন, রহমত, বসন্ত, সুনীল, সকলের কাছে। ফিরে এসেও রোশনের বারবার মনে পড়ছিল সেই মানুষটির কথা, ডাক্তার কাইজার্ড। মনে পড়ছিল ফারহানার কথা। মনে পড়ছিল তার মা আর এইটুকুনি ভাইটির কথা। আর মনে পড়ছিল গানের কথা। রোশন যতবারই গেয়ে-গেয়ে ফুলতিদিদিকে গানটা শোনাবার চেষ্টা করেছে, ততবারই সে সুরটা ভুলে যাচ্ছে, না হয় গানের লাইনগুলো। সে ভারি মজার কাণ্ড! ফুলতিদিদি আর রোশন দু’জনেই হাসতে-হাসতে যায় আর কি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন