শৈলেন ঘোষ

এবার তোমাদের একটা খুব খুশির খবর শোনাবে রোশন। খুশি! খুশি! রোশনের বুকভরা খুশি এখন! কেন বলো তো? তার ফুলতিদিদির বিয়ে। ফুলতিদিদির বিয়ে সাত ক্রোশ দূরেও নয়, এক ক্রোশ ফারাকেও নয়। ফুলতিদিদির বিয়ে এই গ্রামেই। রোশনের বন্ধু সুনীলের দাদার সঙ্গে। অনেক চেষ্টা করে রোশনের মা-ই সম্বন্ধ করেছেন। ফুলতিদিদির মা রোশনের মাকে কাঁদতে-কাঁদতে সেদিন বলেছেন, “দিদি, আমার মেয়ের বিয়ের সব ভার তোমায় নিতে হবে। আমার তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। আমি অথর্ব। আমি অনেক কষ্টে জমিয়ে রেখেছি ক'টা টাকা আর দু-চারটে গয়না। আমার ওই একটি মেয়ে। আমার মেয়ে তোমারও মেয়ে। তোমরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। রোশনের বাবাকে বলো ফুলতির বিয়েতে যেন বাজনা বাজে। গ্রামের সব মানুষ যেন আসেন।”
রোশনের মা ভরসা দিয়েছিলেন, “তুমি কিচ্ছু ভেবো না দিদি। সব হবে।”
ওঃ! সে যে কী আনন্দ রোশনের, যদি দেখতে! সে একবার ছুটতে-ছুটতে মাস্টারজির বাড়ি যায়। মাস্টারজিকে বলে, “মাস্টারজি, মাস্টারজি, ফুলতিদিদির বিয়ে। অনেক বাজনা বাজবে।”
একবার দরবেশদাদুর কাছে ছুটে যায়, “দরবেশদাদু, দরবেশদাদু, ফুলতিদিদির বিয়ে। তোমায় আসতে হবে। অনেক বাজনা বাজবে।”
ছুটে যায় সে পোস্টম্যানভাইয়ের কাছে, “পোস্টম্যানভাই, পোস্টম্যানভাই, ফুলতিদিদির বিয়ে। তোমার নেমন্তন্ন। কত বাজনা বাজবে।”
ছুটে যায় সে কুমোরকাকার কাছে।
ছুটে যায় বিজুর কাছে। রাজনের কাছে। শচীনের কাছে। বসন্ত, রহমত, সকলের কাছে। সারা গ্রামটাকে তোলপাড় করে সে শুধু একাই ছুটে বেড়ায়। একাই চেঁচিয়ে বলে, “বাজনা বাজবে, বাজনা বাজবে, বাজনা বাজবে। ফুলতিদিদির বিয়ে হবে।”
হঠাৎ যেন ঠিক এই সময়ে রোশনের শহরের কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে যত বাজনা বাজে, তত আলো জ্বলে। সারা শহরটা যেন আলোর রূপকথা! সে ছুটতে-ছুটতে বাবার কাছে যায়, “বাবা, বাবা, ফুলতিদিদির বিয়েতে বাজনা বাজবে শুধু, আলো জ্বলবে না? লাল, নীল, হলুদ, সবুজ? যেমন শহরে দেখে এলুম জ্বলছে আর নিবছে?”
বাবা বললেন, “হ্যাঁ, বাজনাও বাজবে, আলোও জ্বলবে-নিববে।”
রোশন আবার ছুটল মাস্টারজির কাছে, “মাস্টারজি, মাস্টারজি, বাবা বলেছেন ফুলতিদিদির বিয়েতে বাজনাও বাজবে, আলোও জ্বলবে-নিববে।”

দরবেশদাদুর কাছে ছুটল, “দরবেশদাদু, দরবেশদাদু, বাবা বলেছেন, ফুলতিদিদির বিয়েতে বাজনাও বাজবে, আলোও জ্বলবে-নিববে।
“পোস্টম্যানভাই, পোস্টম্যানভাই, ফুলতিদিদির বিয়েতে বাজনাও বাজবে, আলোও একবার জ্বলবে, একবার নিববে।”
রোশন যেন আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেল। আর ফুলতিদিদি লজ্জায় আধখানা হয়ে মায়ের কাছে বসে রইল। মায়ের গায়ে হাত বুলোতে-বুলোতে বলল, “আমি পরের ঘরে চলে গেলে তোমায় কে দেখবে মা?”
“রোশন দেখবে আমায়। ওর মা দেখবে। বাবা দেখবে।” মা উত্তর দিয়েছিলেন।
“সত্যি ওরা বড্ড ভাল।” বলেছিল ফুলতিদিদি।
এমনই সময়ে রোশন ছুটতে-ছুটতে ঢুকে পড়েছিল ফুলতিদিদির ঘরে। ফুলতিদিদির মাকে বলেছিল, “মাসি, মাসি, বাবা বলেছেন, ফুলতিদিদির বিয়েতে বাজনা বাজবে। লাল-নীল আলো জ্বলবে। আলো একবার জ্বলবে আর একবার নিববে। মাসি, মাসি শহরের ডাক্তারবাবু আসবেন। তিনি বলেছেন, তোমার অসুখ ভাল করে দেবেন। আমি যদি ডাক্তারবাবুর মতো ম্যাজিক জানতুম, তবে এক্ষুনি মন্তর পড়ে তাঁকে খবর পাঠাতুম, ফুলতিদিদির বিয়ে হবে। তিনি যেন ফারহানাকে নিয়ে চলে আসেন।”
রোশনের কথা শুনে ফুলতিদিদি হাসল। তার মা-ও হাসলেন। আর ঠিক তক্ষুনি একটা কুকুর ডেকে উঠল। ক’টা পাখি একসঙ্গে কিচিরমিচির করে কান ঝালাপালা করে দিল। ক’টা কাক কা-কা করে চেল্লাতে শুরু করে দিল।
রোশন বলল, “মাসি, মাসি, ফুলতিদিদির বিয়ের খবরটা সবাই জানতে পেরে আনন্দে চেঁচাচ্ছে।” বলতে-বলতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল রোশন। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সে-ও চেঁচাতে লাগল, “কা-কা!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন