জয়দীপ চক্রবর্তী

বলরাম সঙ্কর্ষণের মন ভালো নেই। চিত্ত বিক্ষেপ এড়াতেই তো দ্বারকা ত্যাগ করে তীর্থ ভ্রমণ। হিংসা, বিদ্বেষ, রাজনীতির কূটচাল আর জ্ঞাতিশত্রুতার গনগনে পরিবেশের চেয়ে নিরাপদ ও সহনশীল স্থানই তাঁর প্রিয়।
কৃষ্ণকে বহুবার বলেছেন তিনি, কৌরব-পাণ্ডবের যুদ্ধে উভয় পক্ষ থেকেই সমান দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষপাতী তিনি। এমনকী তাঁর প্রিয় শিষ্য দুর্যোধনকেও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। দুর্যোধন যখন তার পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের আর্জি নিয়ে তাঁর কাছে আসে, তিনি অকপটে জানান যে এই যুদ্ধে কোনও পক্ষের হয়েই তিনি যোগ দিতে চান না।
তিনি অবিবেচক নন। তবুও, তিনি জানেন, দ্বারকাবাসী তাঁর বিচার বুদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের ওপর খুব বেশি ভরসা করতে পারে না। তারা মনে করে তিনি রাজধর্মে উদাসীন, সুরাসক্ত এবং অবিচক্ষণ। কৃষ্ণই তাদের যাবতীয় আশা ও আশ্রয়ের উৎস। অথচ কৃষ্ণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বহু যুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি বীর বিক্রমে।
তবু তিনি যেন অপাংক্তেয়, ম্লান। মনে কখনও যে কষ্টবোধ আসেনি তা নয়, কিন্তু একটিই দুর্বলতা তাঁকে সর্বংসহা করে রেখেছে চিরকাল। সে দুর্বলতা অর্থ নয়, ভোগ নয়, রাজসুখ নয়। তা হল কৃষ্ণ। ছোট ভাইটির প্রতি অপরিসীম স্নেহ চিরদিন তাঁর প্রতিবাদ ইচ্ছাকে ম্লান করে দিয়েছে। অনেক ভেবে দেখেছেন তিনি, কোনও কিছুর বিনিময়েই কৃষ্ণের সঙ্গত্যাগ সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। কাজেই জেনে বুঝে রাজনীতি, কূটনীতি থেকে সন্তর্পণে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি।
চোখ লোহিত বর্ণ ধারণ করেছে। সুরার আবেশে সেই টা অর্ধ নিমীলিত। তবু তিনি উচ্চকণ্ঠে আদেশ করলেন, 'কে আছ, পানপাত্র ভরে দিয়ে যাও।'
দ্বারকা থেকে রওনা দেবার সময় নিজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়াও প্রচুর স্বর্ণ, রজত, হস্তী, অশ্ব, গো, উষ্ট্র, খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র ও ধন সঙ্গে এনেছেন তিনি। পথে যেখানেই মানুষের দারিদ্র্য ও অসহায়তা দেখেছেন, অবাধে বিলিয়েছেন এইসব দানসামগ্রী। ভেবেছেন অকাতরে দান করে মনের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত উপেক্ষার গ্লানির অপনোদন করবেন। কিন্তু হা হতোস্মি! মন যে কিছুতেই স্থিতধী হচ্ছে না।
বলদেব পানপাত্র থেকে আরও কিছুটা সুরা গলায় ঢাললেন। কানাইয়ের মতিগতি আজ পর্যন্তও কিছুতেই বোঝা হল না তাঁর। তিনি অনেকবার তাঁকে বুঝিয়েছেন, 'এই মহাযুদ্ধে কার পক্ষ নেবে তুমি? একদিকে তোমার সখা ও ভগ্নীপতি অর্জুন, অপর পক্ষে দুর্যোধন তোমার পুত্র শাম্ব-পত্নি লক্ষণার পিতা সে। সেও আমাদের পরম আত্মীয় কানাই। কৌরব-পাণ্ডব উভয়েই আমাদের নিকট আত্মীয়। তাছাড়া ভীম আর দুর্যোধন উভয়েই আমার প্রিয় শিষ্য। উভয়কেই অতিযত্নে গদাযুদ্ধের কৃৎকৌশল শিক্ষা দিয়েছি আমি।'
বড় করে শ্বাস ছাড়লেন হলধর বলরাম। সুরাপাত্র নিঃশেষ করলেন এক চুমুকে। হৃদয় দুমড়ে উঠল বেদনায়। প্রতিনিয়ত যে পাঠ দিয়েছেন প্রিয় শিষ্যদের তা মিথ্যে হয়ে গেল। পরস্পরকে বিদ্বেষ না করার শপথ এক লহমায় মুছে গেল। আজ ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, গুরু শিষ্য পরস্পরের বিরুদ্ধে, প্রণম্য স্নেহাস্পদের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত। আর কেশব এই যুদ্ধ নিবৃত্তি না করে তার পুরভাগে। হোক সারথি। তবু বলভদ্র তো জানেন, তাঁর অনুজ অস্ত্র ধরুক আর নাই ধরুক, তার এই সারথি সাজাও আসলে প্রতীকি। মহাকালের রথ কোন অভিমুখে চলবে তা সম্পূর্ণই তারই ইচ্ছাধীন।
অভিমানে বুক ভারী হয়ে উঠল বলভদ্রের। কেন কৃষ্ণ এ যুদ্ধ রোধ না করে তাঁর কথা উপেক্ষা করে অংশ নিল তাতে। শুধুই অর্জুনের প্রতি অপার ভালোবাসা নাকি জ্যেষ্ঠের সিদ্ধান্তের অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণের তাগিদ? এমনকী সাত্যকিও তাঁকে অমান্য করে এ যুদ্ধে অংশ নিল। তাহলে কী মূল্য থাকল তাঁর সিদ্ধান্তের!দ্বারকায় আদৌ কি কোনও প্রয়োজন আছে তাঁর?
এক রক্ষী সম্মুখে এসে দাঁড়াতে চিন্তাজাল ছিন্ন হল বলভদ্রের। আরক্তিম চক্ষু তুললেন তিনি তার দিকে, 'কী সংবাদ, কিছু বলতে চাও আমায়?'
'হ্যাঁ মহাবাহু।'
'বলো।'
'অপরাধ নেবেন না আমার।'
'কী বলতে চাও ভনিতা না করে বলো।' স্খলিত গলায় বলেন বলরাম।
'হে হলধারি, সুরাপানে দয়া করে এবারে বিরত হোন আপনি...'
'আর একপাত্র। স্মৃতি বড় জীবন্ত লাগছে এখনও...' বলে আয়ত দুই চক্ষু বুজিয়ে ফেলেন বলরাম।
সরস্বতীর তীর ধরে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছুদিন আগে গিয়েছিলেন প্রভাস তীর্থে। সেই তীর্থস্মৃতি মনে এল তাঁর। দক্ষরাজ তাঁর সাতাশ কন্যার সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন চন্দ্রের। কিন্তু অবশিষ্ট ছাব্বিশ পত্নীকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র রোহিনীকে নিয়ে থাকার জন্য রাজা দক্ষ চন্দ্রকে ক্ষয়রোগাক্রান্ত হওয়ার অভিশাপ দিলেন। চন্দ্র সেই অভিশাপে যখন নিয়ত ক্ষয়িষ্ণু, দেবতারা দক্ষের কাছে দরবার করে বললেন, 'ভগবান, চন্দ্র আপনার অভিশাপে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ায় লতা ওষধি বীজ ও প্রজাগণও ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছি আমরাও। আপনি এর বিহিত না-করলে সৃষ্টির ভারসাম্য যে নষ্ট হয়ে যাবে প্রভু...'
দক্ষ বললেন, 'আমার অভিশাপ তো নিস্ফল হওয়ার নয়। তবে চন্দ্র যদি পশ্চিম সমুদ্রে সরস্বতীর সংগমস্থলে স্নান করেন তাহলে আবার প্রভা লাভ করতে পারবেন।'
অতএব প্রভাস তীর্থে এক অমাবস্যায় অবগাহন করলেন চন্দ্র। প্রভাযুক্তও হলেন আবার। সেই থেকে পনের দিন তিনি প্রভাযুক্ত হন ধীরে ধীরে আর পরবর্তী পনের দিন ক্ষয়ে যেতে থাকেন। চন্দ্র তাঁর প্রভা ফেরত পেয়েছিলেন বলেই ওই তীর্থের নাম হয় প্রভাস।
প্রভাসে কালযাপনের সময় প্রতিদিন নিবিষ্টচিত্তে সরস্বতীর পুণ্য প্রবাহের দিকে চেয়ে থাকতেন বলদেব। মনে হত চন্দ্রকে ক্ষয় হয়ে যাওয়া থেকে আবার বাঁচিয়ে দিয়ে প্রভাযুক্ত করতে পারে যে পুণ্যসলিলা সে মানুষের এই নিরন্তর ক্ষয়ে যাওয়াকে কি রোধ করতে পারে না...।
এই ভাবনাই এখন সর্বক্ষণ পীড়িত করছে তাঁকে। পাণ্ডব আর কৌরবের যুদ্ধের ভয়াবহতা আর লোকক্ষয়ের কথা ভেবে আবারও বিমর্ষ হলেন তিনি। এই রিরংসা থেকে দূরে সরে থাকার মানসেই দেশভ্রমণ এবং তীর্থ দর্শনের অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। এতদিনে প্রভাস, উদপান, সপ্তসারস্বত, কপালমোচন ইত্যাদি অসংখ্য তীর্থ পরিভ্রমণ করেছেন তিনি। চলার পথে পীড়িত ও আর্ত মানুষকে গো, অশ্ব, খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র অর্থ দান করেছেন দুই হস্ত প্রসারিত করে। অবশেষে সোমতীর্থ, বৃদ্ধ কন্যাশ্রম, সমন্ত পঞ্চক ও হিমালয় সন্নিকটস্থ বহু পুণ্যস্থান ঘুরে এসে উপস্থিত হয়েছেন মিত্রাবরুণের পুণ্য আশ্রমে।
এর মাঝে যুদ্ধের খবর নেবার চেষ্টাটুকুও করেননি তিনি। শুধু মনে মনে মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়ার ক্লেশ বহন করেছেন সঙ্গোপনে আর আশা প্রকাশ করেছেন মাধব শেষপর্যন্ত নিশ্চিত এমন কোনও উপায় বের করবেই যেখানে উভয় পক্ষেরই সার্বিক মঙ্গল সাধিত হবে।
মিত্রাবরুণের আশ্রমটি ভারি ভালো লেগে গেল বলভদ্রের। চারিদিক কী মোহময়, কী আশ্চর্যরকম শান্ত। কোথাও হিংসা নেই, লোভ নেই, হত্যা নেই। পশু-পাখিরা নির্ভয়ে বিচরণ করছে। বলরাম সঙ্কর্ষণ এখানে কয়েকটা দিন অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন।
পান আহার দান ধ্যান শাস্ত্র আলোচনায় ক'টাদিন অতিবাহিত হল। আজও তিনি আহারান্তে কিঞ্চিৎ সুরা পান করছিলেন। হঠাৎই দূত এসে সংবাদ দিল যে দেবর্ষি নারদ আশ্রমে উপস্থিত হয়েছেন এবং তিনি বলভদ্রের সাক্ষাৎ অভিলাষী। বলদেব দ্রুত গাত্রোত্থান করলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'তাকে যেন অধিকক্ষণ অপেক্ষায় রেখো না, নিয়ে এসো আমার কাছে।'
অপস্রিয়মাণ দূতের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন বলরাম। মন উতলা হল তাঁর। এ সময় দেবর্ষি নারদ তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থী কী অভিপ্রায়ে? কী এমন ঘটল ইতিমধ্যে যে তিনি ছুটে এলেন জগতপূজ্য শ্রী হরির পাদবন্দনা ছেড়ে!
জটামণ্ডলে আবৃত স্বর্ণ কৌপীন পরিহিত নারদ তাঁর কচ্ছপী বীণা হাতে গৃহে প্রবেশ করলেন যথাসময়ে। হলধর সংকর্ষণ উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন তাঁকে। পাদবন্দনা করলেন ভক্তিভরে। মহর্ষিকে আসন প্রদান করে জিগ্যেস করলেন, 'কী সংবাদ দিতে আমার কাছে আগমন আপনার দেবর্ষি?'
নারদ মৃদু হাসলেন। তারপর ধীর শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'কুরুক্ষেত্রে কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে যে মহাযুদ্ধ চলেছে সে সম্পর্কে আপনি কি কোনও সংবাদ রাখেন মহাবাহু?'
'নাহ।' আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন বলদেব।
'এ যুদ্ধের পরিণতি জানার কোনও কৌতূহলও নেই আপনার?'
'উঁহু', বলে একটু থামলেন বলদেব। তারপর নিরাসক্ত গলায় বললেন, 'সে যুদ্ধ এখনও কি শেষ হয়নি ঋষিবর?'
'প্রায় শেষ।' বলে হাসলেন নারদ, 'শুধু একটি হত্যা বাকি।'
'মানে?' অবাক হয়ে বললেন বলভদ্র।
দেবর্ষি নারদ কিছুকাল মৌন থাকলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'কুরুক্ষেত্রে রণাঙ্গনে কৌরব ও পাণ্ডব উভয় পক্ষেরই প্রায় সমস্ত রথী মহারথী গতায়ু হয়েছেন। মহামতি ভীষ্ম শরশয্যায়। দ্রোণ, কর্ণ, শল্য, শকুনিসহ দুর্যোধনের নিরানব্বই ভ্রাতা বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছে এই যুদ্ধে। আপনাদের প্রিয় ভগিনী সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুও মৃত্যুবরণ করেছেন।'
দেবর্ষির কথা শোনা মাত্রই দুই হাতে মস্তকের দীর্ঘ কেশদাম আকর্ষণ করে চলেন বলরাম। নারদ অপাঙ্গে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন সেদিকে। তারপর বলেন, 'কৌরবদের মধ্যে দুর্যোধন এখনও জীবিত। তিনি কুম্ভক অবলম্বনে দ্বৈপায়ন হ্রদের গভীরে লুকিয়ে আছেন আত্মরক্ষার্থে। কিন্তু পাণ্ডবরা যেরূপ কটুক্তি করছেন তাঁকে তাতে দীর্ঘক্ষণ লুকিয়ে থাকা দুর্যোধনের মতন অভিমানী পুরুষের পক্ষে অসম্ভব।'
'হুঁ', গম্ভীর গলায় বলেন বলদেব, 'কিন্তু তারপর?'
'আমার ধারণা কিছুকালের মধ্যেই দ্বৈপায়ন হ্রদের সন্নিকটে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক গদা যুদ্ধটি ঘটতে চলেছে আপনার দুই প্রিয় শিষ্যের মধ্যে।'
'দুর্যোধন আর ভীমসেন?' আনমনে বললেন বলভদ্র।
'আপনি কি সেই যুদ্ধ নিজে প্রত্যক্ষ করতে চান? দুই সেরা শিষ্যের দ্বৈরথ, শেষ এবং চূড়ান্ত দ্বৈরথ দেখতে চান সচক্ষে?'
বলরাম সঙ্কর্ষণ ক্ষণকাল মৌন রইলেন। কুরুক্ষত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যে সমস্ত বীর যোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন তাতে দুর্যোধনের পরাজয়ের কারণ ছিল না। তবু তাঁরা প্রায় সকলেই গতায়ু। কৃষ্ণের মুখচ্ছবি আবার ভেসে উঠল তাঁর স্মৃতিপটে। তাঁর অনুজ যে পক্ষে তার পরাজয় অসম্ভব। কৃষ্ণ ভগবান কিনা সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু ভূ-ভারতে তার অধিক বিচক্ষণ কূটনীতিক যে কেউই নেই এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
দেবর্ষি আবার বললেন, 'হে প্রণম্য, যুধিষ্ঠির ঘোষণা করেছেন যে এই যুদ্ধে দুর্যোধন জয়ী হলে তাঁকে হস্তিনাপুরের রাজ অধিকার ফিরিয়ে দেবেন তিনি এবং নিজে পরাজয় স্বীকার করবেন এই যুদ্ধে।'
বলদেব আয়ত চক্ষু ওপরে তুললেন। নারদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'এ কথা সত্য?'
'হ্যাঁ।'
'মাধব এ কথায় সম্মত হল?'
'তাঁর সম্মতির তো কোনও প্রশ্ন নেই এখানে মহাবাহু। স্বয়ং যুধিষ্ঠির স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ঘোষণা করেছেন সর্বসমক্ষে। পাণ্ডবরা এ ঘোষণায় বিচলিত, এমনকী মাধব স্বয়ং ক্রুদ্ধ হয়েছেন।'
এতক্ষণে বলরামের অধরোষ্ঠে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি জানেন, গদা যুদ্ধে দুর্যোধন অপরাজেয়। মানুষ, গন্ধর্ব, অসুর, দেবতা কারো সাধ্য নেই ন্যায় যুদ্ধে হারায় তাকে। পাণ্ডব পক্ষে যুধিষ্ঠির আছেন। তিনি অন্যায় করতে পারেন না। অতএব এই যুদ্ধে দুর্যোধনের জয় অবশ্যম্ভাবী। গদা বিদ্যা শিক্ষায় ভীমের চেয়ে অনেক মনোযোগী ছিল দুর্যোধন। ভীম পরাক্রমী, কিন্তু গদা চালনায় দুর্যোধন অধিক কৌশলী। তাকে পরাজিত করার সামর্থ্য ভীমসেনের নেই। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,'আমি যাব।'
হাতে অধিক সময় নেই। এবারে হয়ত এই কুৎসিত বৈরিতার অবসান ঘটতে পারে। নিঃস্ব দুর্যোধন তাঁদের মধ্যস্থতায় হস্তিনাপুর নিয়ে নিশ্চিত সন্তুষ্ট থাকবে যুদ্ধোত্তর কালে। যুধিষ্ঠিরও পূর্ণ মর্যাদায় সিংহাসনে আরূঢ় হোন ইন্দ্রপ্রস্থে। রথে অশ্বযোজনান্তর দেবর্ষি নারদকে যুক্তকরে প্রণাম জানালেন বলদেব। অনন্তর দ্বৈপায়ন হ্রদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন তিনি।
বাইরে চিৎকারটা ক্রমশ বাড়ছিল। ছাত্রদের জমায়েত এখন প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রফেসর প্রণব রায় নিজের সিটবেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। খুব অসহিষ্ণু লাগছে। ক'দিন ধরেই ব্যাপারটা দানা বাঁধছিল। কয়েকটি ছেলেমেয়ের পারসেন্টেজ এত কম যে তাদের এগেইন্সটে স্টেপ না-নিলেই নয়। তাছাড়া কলেজের ইন্টারনাল এগজ্যামেও তাদের অবস্থা শোচনীয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইউনিয়ন কোনও কথা শুনতে রাজি নয়। ছেলেমেয়েগুলোকে প্রায় বিনা শর্তে পরীক্ষায় বসতে দিতে হবে এই তাদের দাবি। তারপর দাবি থেকে আন্দোলন। প্রিন্সিপাল রনেন সোম কড়া মানুষ। ইউনিয়নের কথা মুখ বুজে মেনে নিতে তিনি রাজি হননি। কয়েকদিন আগেও ছাত্র-ছাত্রীরা অবস্থান বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে টলানো যায়নি।
প্রণব রায় নিজেও ছাত্র জীবনে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করেছেন। আন্দোলনে নেতৃত্বও দিয়েছেন বহুবার। তবু এই ছাত্রদের রাজনীতি তিনি নিতে পারেন না। যে কারণে এরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে সেটা আন্দোলনের বিষয় হতে পারে না। ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেই একজন ছাত্রের যা খুশি করার অধিকার জন্মে যায় একথা একেবারেই মেনে নেবেন না প্রণববাবু।
রনেনবাবুও এক্ষেত্রে যে নিজের শিরদাঁড়াটা সোজা রেখেছিলেন এজন্যে তিনি মনে মনে স্বস্তি পাচ্ছিলেন। কিন্তু গতকাল থেকে আন্দোলনের গতি দুম করে এমন পালটে গেল যে রনেন সোম পর্যন্ত বিপর্যস্ত।
সোহিনী সান্যাল, হিস্ট্রি সেকেন্ড ইয়ার। মেয়েটাকে প্রণববাবু চেনেন। ক্লাশে ইরেগুলার। পড়াশুনোতেও মনযোগ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু সে পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী। মিটিং মিছিলে খুব গলা ফাটাচ্ছে আজকাল। কলেজ পারসেন্টেজ নেই বলে আটকে গেছে। ক'দিন মিটিং-এর নামে ছেলেমেয়েদের জড়ো করে খুব বক্তৃতা করছিল। হুমকিও দিচ্ছিল 'হিটলারি মানসিকতার' প্রিন্সিপালকে। কাল বিকেলের দিকে উত্তেজিত হয়ে দু-একজন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সে প্রিন্সিপাল রনেন সোমের ঘরে ঢুকে যায়। আর তারপরেই এই কীর্তি।
রনেনবাবু নাকি মেয়েটির সঙ্গে অভব্য আচরণ করে ঘর থেকে বের করে দেন। এমনকী তার শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা করেছেন নাকি তিনি। তাই নিয়েই আজ কলেজ গরম। ছাত্রছাত্রীরা তুলকালাম করে ফেলছে কলেজ জুড়ে। প্রিন্সিপালকে এক্ষুনি পদত্যাগ করতে হবে এই তাদের দাবি।
চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিল ছেলেমেয়েরা এতক্ষণ। এবার তার সঙ্গে অশ্রাব্য খিস্তি খেউড় উড়ে আসতে লাগল। প্রণববাবুর মনে হল এবারে অন্তত বাইরে বেরোনো দরকার। রনেন সোম লোকটা ত্রুটিহীন নন। তিনি জানেন। তাঁর সঙ্গে ওনার রাজনৈতিক মতাদর্শেও মস্ত ফারাক। রনেন সোম বিশেষ রাজনৈতিক দলের দলদাস এমন কথাও তিনি শুনেছেন। তবু যে অপবাদে তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রদের এই জঙ্গি আন্দোলন, এ তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না।
প্রণব রায় দরজার দিকে এগোতে যেতেই বাংলার জহর মিত্র হাত ধরলেন তাঁর। হাতে হালকা টান দিয়ে জিগ্যেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছেন?'
'আর সহ্য হচ্ছে না হে' প্রণববাবু মাথা নাড়লেন, 'কিছু একটা করা দরকার।'
'কেন ফালতু ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে যাচ্ছেন? আপনার বয়েস হয়েছে। ক'দিন পরে রিটায়ার করে যাবেন। এসব হুজ্জুতির মধ্যে যাওয়ার চেষ্টা না-করাই ভালো।'
'তাই বলে এত বড় অন্যায়! একটা মিথ্যেকে কেন্দ্র করে অছাত্রসুলভ আন্দোলন মুখ বুজে সহ্য করব? শিক্ষক হিসেবে আমার গায়ে লাগছে জহর' উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলেন প্রণব, 'আমি নিজেও রাজনীতি করেছি, বহু ছাত্রকে মোটিভেট করেছি একসময় রাজনীতিতে আসার জন্যে। কিন্তু সেখানে একটা প্রিন্সিপল ছিল...সব তাহলে মিথ্যে হয়ে গেল বলছ?'
'ওসব সিলি সেন্টিমেন্টের কেউ মূল্য দেয় না এখন।'
'সিলি সেন্টিমেন্ট?' অবাক হয়ে বলেন প্রণব।
জহর হাসেন, 'আপনি ভাবছেন এই ছেলেমেয়েগুলো একা একাই এই আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে? মোটেও না। এর পিছনে সক্রিয় রাজনৈতিক মদত আছে। এমনকী সেখানে আমাদের মতন শিক্ষকও আছেন দেখুনগে যান...'
'তবু আমি যাব। অন্যায় মুখ বুজে মেনে নিলে শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব অস্বীকার করা হবে। আমার এখনও বিশ্বাস বুঝিয়ে বললে ওরা নিশ্চিত বুঝবে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়।'
প্রণব রায় দরজা দিয়ে বাইরে বেরোন। জহর বিরক্ত হলেন তাঁর ওপর।
প্রিন্সিপালের ঘরের সামনে লম্বা করিডরে থিকথিক করছে ভিড়। ছেলেমেয়েরা থেবড়ে বসে আছে। কেউ কেউ উচ্চস্বরে খিস্তি খেউড় করে যাচ্ছে। অনেকেরই হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রণব রায়। না এই ছাত্রদের তিনি চেনেন না। হঠাৎ নজর পড়ল প্রিন্সিপালের ঘরের দরজার কাছে রজত দাঁড়িয়ে আছে। খুব ব্রাইট ছেলে ছিল এই কলেজের। বছর চার-পাঁচ হল পাশ করে বেরিয়ে গেছে। প্রণববাবুর ন্যাওটা ছিল খুব। তাঁর কাছেই বলতে গেলে রাজনীতির পাঠ নেওয়া তার। প্রণববাবু বলেছিলেন, 'তোর মধ্যে পার্টস আছে রজত। আগুন আছে একটা। তুই একদিন খুব বড় নেতা হবি দেখিস...'
প্রণব রায় গম্ভীর গলায় হাঁক পাড়লেন, 'রজত'
রজত তাকালো তাঁর দিকে। প্রথমটা একটু অপ্রস্তুত মনে হল তাকে দেখে। পরক্ষণেই সামলে নিল অবশ্য সে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল প্রণববাবুর কাছে। বিরক্তি নিয়ে জিগ্যেস করল, 'আপনি, এখানে?'
তার গলাটা কানে বিচ্ছিরিভাবে ধাক্কা মারল প্রণববাবুর। রজতের এমন কণ্ঠস্বর আগে কখনও শোনেননি প্রণববাবু। তবু শান্তভাবে রজতের কাঁধে হাত রাখলেন তিনি, 'এসব কী হচ্ছে রজত, একটা মিথ্যে অ্যালিগেশন নিয়ে এরকম জঙ্গি অছাত্রসুলভ হইচই...'
'আপনি কী করে জানলেন অভিযোগটা মিথ্যে, আপনি সে সময় স্পটে ছিলেন স্যার?' রজত হাসল। হাসিতে স্পষ্ট ব্যঙ্গ।
'না, ছিলাম না। তবু আমি জানি।'
'স্যার আপনি এসবের মধ্যে থাকবেন না প্লিজ। আপনার ওপরে আমার দুর্বলতা আছে, কিন্তু এখানে জড়ো হওয়া অন্য ছেলেমেয়েদের নেই। ওরা আপনাকে অসম্মান করলে আমার খারাপ লাগবে।'
'কিন্তু এটা অন্যায় রজত!'
'স্যার আপনি শিখিয়েছিলেন একসময়, প্রেম আর যুদ্ধে অন্যায় বলে কিছু হয় না।' প্রণবকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে রজত, 'এটাও একটা যুদ্ধ। রনেনবাবুকে এখান থেকে হটানো আমাদের একটা পোলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা। এই লোকটা এখানে থাকলে আমার পার্টির পক্ষে অসুবিধা। মানুষটা কেমন সেটা এখন আর বিবেচ্য নয়, আসল কথা হল আমাদের পার্টির শত্রু আমাদের শত্রু, পার্টির মিত্র আমাদের বন্ধু, ওয়েল উইশার এটাই শেষ কথা। এই মুভমেন্টের সাফল্যের ওপরে আমার নিজের পোলিটিক্যাল কেরিয়ার ডিপেন্ড করছে খানিকটা। কাজেই...'
'তাই বলে তুমি...আমি কী তবে তোমায় কিছুই শেখাতে পারিনি!'
'স্যার কিছু মনে করবেন না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকে পালটে ফেলতে হয়। না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আপনি সময়ের থেকে পিছিয়ে পড়েছেন। আপনার সময় চলে গেছে। এটা নতুন সময়। এই সময়ের আন্দোলনের ভাষা, পথ, অ্যাজেন্ডা সবকিছু পালটে গেছে। আপনার যুক্তি তাকে আর ছুঁতে পারবে না।'
একদল ছেলে চিৎকার করে অশ্রাব্য গালিগালাজ করে উঠল রনেন সোমের নামে। একটা ছেলের ছুড়ে দেওয়া সিগারেটের টুকরো এসে পড়ল প্রণববাবুর পায়ের কাছে। রজত শান্তভাবে বলল, 'চলুন আপনাকে গেটের বাইরে দিয়ে আসি। আপনার বয়েস হয়েছে। এখনও অবরোধটা শুধু প্রিন্সিপালের ঘরের সামনে। এরপরে সমস্ত অধ্যাপককেই যদি আটকে দেয় এরা আপনি এই বয়েসে বিপদে পড়ে যাবেন। বাড়ি ফেরা হবে না আর।'
বলতে-বলতেই প্রণব রায়কেভিড়ঠেলে বাইরে এনে কলেজের গেটের ওপারে ছেড়ে দেয় রজত। তারপর হেসে বলে, 'এখানে আর না দাঁড়িয়ে সোজা বাড়ি চলে যান স্যার।'
আকাশ ঘোলাটে হয়ে আছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিকে। সন্ধে নামবে আর একটু পরে। প্রণব রায় পিছু ফিরে একবার কলেজের দিকে তাকালেন। তারপর কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটা শুরু করলেন। গন্তব্যহীন। বারবার মনে হতে লাগল তাঁর সময় শেষ হয়ে গেছে, তাঁর সময় শেষ হয়ে গেছে। এই নতুন সময়ে তিনি বেমানান, অসহায়, আত্মীয়বিহীন।
দ্বৈপায়ন হ্রদের নিকটে উপস্থিত হয়ে বলরাম দেখলেন গদাযুদ্ধের প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ। কৃষ্ণ এগিয়ে এসে কুশল জিজ্ঞাসা করে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন তাঁর। যুধিষ্ঠির পাদবন্দনা করলেন। ভীমসেন এবং দুর্যোধন উভয়েই প্রণাম করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন তাঁর।
বলরাম মনে মনে প্রীত হলেন। শিক্ষক হিসেবে দুই কৃতী ছাত্রের দ্বৈরথ ইতিহাস স্পর্শ করবে এই আকাঙ্ক্ষায় অপেক্ষমান ছিলেন তিনি। আজ সেই ক্ষণ সমুপস্থিত। বলভদ্র বললেন, 'নৃপশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির, ঋষিরা বলেন কুরুক্ষেত্র অতি পবিত্র স্থান। সেখানে যুদ্ধে দেহান্ত হলে ইন্দ্রাদি দেবতাগণের সঙ্গে অনন্ত স্বর্গবাস হয়। কাজেই আমি চাই এই গদাযুদ্ধ এখানে না-হয়ে পবিত্র সমন্তপঞ্চকে অনুষ্ঠিত হোক।'
যুধিষ্ঠির এ প্রস্তাবে সানন্দ সম্মতি প্রদান করলেন। পদব্রজে সকলে সমন্ত পঞ্চকে উপস্থিত হলেন। তারপর শুরু হল সেই ভীষণ যুদ্ধ।
দুই বীর পরস্পরের ত্রুটি অনুসন্ধান করে সেই ছিদ্র কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে লাগলেন নিরন্তর। বলরাম মুগ্ধ চোখে দেখছিলেন। তাঁর শিক্ষা অপাত্রে পড়েনি। ভীম শক্তিতে এগিয়ে থেকেও দুর্যোধনের শিক্ষা ও কৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হচ্ছে। বলরামের অভিজ্ঞ নেত্রে তা প্রতিফলিত হতে লাগল বারবার। তাঁর বিন্দুমাত্র সংশয় রইল না যে এ যুদ্ধে দুর্যোধনের জয় অবশ্যম্ভাবী।
হঠাৎই খানিক তফাতে দণ্ডায়মান মাধবের দিকে চোখ পড়ল তাঁর। আর তখনি বুকের মধ্যে কী এক অজানা সম্ভাবনার কম্পন অনুভব করলেন তিনি। মাধবের এই দৃষ্টি তাঁর জানা। এই মাধব কুটিল, কুটনীতিপরায়ণ। শৈশবে ননী চুরির সময়েও এমনই এক অদ্ভুত দৃষ্টি থাকত তার চোখে।
বলরামের হৃদয়ে আশঙ্কার উদ্রেক হল। আর তখনই অর্জুনকে কাছে ডেকে কানে কানে কী যেন বললেন কেশব। বলভদ্র নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। কিছু একটা ঘটতে চলেছে মাধবের পরামর্শে, কিন্তু কী ঘটতে চলেছে কিছুই বুঝতে পারলেন না তিনি।
এদিকে দুর্যোধনের গদার প্রভাবে ভীম মূর্ছিতপ্রায় হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বলরাম দুর্যোধনের গদাচালনার দক্ষতায় শিশুর মতন আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন উঠে দাঁড়িয়ে। ভীম নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল আবার। আর সেই সময়েই তাঁকে দেখিয়ে অর্জুন নিজের বাম উরুতে চপেটাঘাত করতে লাগল বারংবার। বলভদ্রের চক্ষু সঙ্কুচিত হল। কী ইঙ্গিত করতে চাইছে পার্থ ভীমসেনকে?
অকস্মাৎভীম গদার চরম আঘাত হানতে ধাবিত হল দুর্যোধনের দিকে আর দুর্যোধন সেই আঘাত এড়াতে লাফিয়ে উঠল শূন্যে। আর ভীম সেই অবকাশে গদাঘাতে চূর্ণ করে দিল তার ঊরু। সশব্দে ভূতলে পতিত হল দুর্যোধন।
নিজের চোখকেই যেন প্রথমটা বিশ্বাস করতে পারলেন না বলদেব। তাঁর শিষ্য এমন অন্যায় করতে পারে যুদ্ধক্ষেত্রে! গদাযুদ্ধে নাভির নীচে প্রহার নিষিদ্ধ একথা শিক্ষাকালে কতবার বলেছেন তিনি শিষ্যদের। ভীমসেন কি তা বিস্মৃত হয়েছে? পরক্ষণেই মনে পড়ল মাধবের মন্ত্রণাদানের দৃশ্য আর অর্জুনের ইঙ্গিত। মুহূর্তে রক্তিম হয়ে উঠল তাঁর মুখ। ক্রোধে দুই চক্ষু দিয়ে আগুন বেরিয়ে এল। লাফিয়ে উঠলেন বলরাম। এই যুদ্ধের অন্তরালে লুকিয়ে আছে নীচ ষড়যন্ত্র, শিক্ষা এবং শিক্ষককে অবমাননার অহংকার। এর প্রতিবিধান হওয়া প্রয়োজন। ভীমসেনের অপরাধ শাস্তিযোগ্য এবং তা তিনি নিজেই দেবেন তাঁকে।
বলরাম লাঙ্গুল হাতে ধেয়ে গেলেন ভীমসেনের দিকে। শিক্ষকের চোখের সামনে শিক্ষার এই অবমাননার প্রতিবাদে কিছুতেই পিছু পা হবেন না তিনি।
অথচ ভীমের কাছ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারলেন না বলরাম। কৃষ্ণ দ্রুত এগিয়ে এসে দু-বাহু বাড়িয়ে দৃঢ় আলিঙ্গনে তাঁকে রুদ্ধ করলেন। বিনয়ের সঙ্গে অথচ স্পষ্ট উচ্চারণে তাঁকে বোঝাতে লাগলেন, 'জ্যেষ্ঠ, আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন। পাণ্ডবেরা আমাদের মিত্র। আর আপনি তো জানেন, নিজের উন্নতি, মিত্রের উন্নতি, মিত্রের মিত্রের উন্নতি, শত্রুর অবনতি, তার মিত্রের অবনতি এবং তার মিত্রের মিত্রের অবনতি এই ছয় প্রকারই নিজের উন্নতি। অতএব হে মহাবাহু, আপনি আপন উন্নতির পথে অনুগ্রহ করে অন্তরায় হবেন না।'
স্তব্ধবাক হয়ে গেলেন বলরাম। অসহায় কণ্ঠে বললেন, 'তবু আমি যে শিক্ষক। আমার শিক্ষায় যে এত বড় ফাঁক থেকে গেল তা তাহলে আমারই ত্রুটি! তাহলে আমি নিজেই কি শাস্তির যোগ্য?'
মাধব মৃদু হাসলেন। তারপর মধুর কণ্ঠে বললেন, 'সময়ের সঙ্গেসঙ্গে আপন আপন বিচারবোধ বদলে নিতে হয় জ্যেষ্ঠ। আসলে আমি আপনি আমরা সবাই আমাদের নিজেদের কালকে অতিক্রম করে এসেছি। দ্বাপর শেষ হয়ে গেছে। কলিযুগে প্রবেশ করেছি আমরা। এই যুগ আমাদের নয়। আমাদের কালের বিচার দিয়ে এখনকার সময়কে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বিফলে যেতে বাধ্য।
বলরাম কৃষ্ণের বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন। আকাশের দিকে চাইলেন একবার আয়ত চক্ষু মেলে। সে চক্ষুতে আর ক্রোধ নেই। সেখানে অনন্ত বেদনা শুধু, আর অপরিসীম অসহায়তা। আর কোনওদিকে দৃকপাত না করে ধীর পায়ে নিজের রথের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। অশ্ব যোজনা করলেন। রথারূঢ় হয়ে সারথিকে নির্দেশ দিলেন দ্রুত রথ চালাতে। এই মেকি যুদ্ধ, যুদ্ধজয়, পুনরায় রাজ্যাভিষেক, এই সবকিছু, সমস্ত কিছু থেকে দূরে, অনেক দূরে চলে যেতে চান তিনি। একা। আত্মীয়বিহীন। সম্ভব হলে এই বদলে যাওয়া সময়ের বিপ্রতীপে।
রথ চলতে শুরু করল। আকাশে এক অদ্ভুত ঘোর লেগেছে তখন। অন্ধকার হয়ে আসছে। একটু পরেই সন্ধে নামবে বোধহয় চরাচর জুড়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।