জয়দীপ চক্রবর্তী

ব্যাপারটা আগে ছিল না। মাস দুই ধরে ঘটছে। প্রথমটা কিছুই বুঝতে পারেনি বাবুলাল। সকালবেলা টিফিন করে নিয়ে সেই যে বেরোয় গাড়ি নিয়ে, ফিরতে ফিরতে বেলা দুপুর। তারপর চান করে খেয়ে বিছানায় একটু এপাশ-ওপাশ করে নিয়েই আবার বেরিয়ে পড়া। রাত দশটার ডাউন ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ধরে তারপর বাড়ি আসা। ফেরার সময় আবার মালিকের বাড়ি গিয়ে গাড়ি রেখে কড়ায় গণ্ডায় রোজকারের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে আসতে হয় তাকে।
এই সময়টা মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় বাবুলালের। কবে থেকে চেষ্টা করেই যাচ্ছে একটা নিজস্ব অটোর জন্যে। শালা পয়সা কিছুতেই যেন আর হাতে বাঁধে না। জলের মতন খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রতি মাসে।
বাবুলালের বদ নেশা নেই। মদ টদ খায় না। অন্য কোনও মেয়ের দোষও তার নেই। তপতিকে নিয়ে এমনিতে কোনও দুঃখু নেই তার। পাঁচ বছর হল বিয়ে হয়েছে। সংসারের কাজে-কর্মে বা চলনে-বলনে কথায়-বার্তায় তপতির কোনও দোষ তেমন চোখে পড়েনি। তার রান্নার হাত ভালো। সংসারে পরিশ্রম করে উদয় অস্ত। কোনও কিছুর জন্যেই অহেতুক বায়নাক্কা নেই। অল্পে খুশি হয়ে যায়। নিজের বউ বলে নয়, তপতিকে দেখতেও ভারি মিষ্টি। পাঁচজনের মধ্যে সহজেই তাকে আলাদা করে চোখে পড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে তপতির সঙ্গে তার কখনও ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে বলেও মনে পড়ে না বাবুলালের। এত সুখের মধ্যে একটাই শুধু কষ্ট। পাঁচ বছর ঘর করার পরেও তাদের ছেলেপিলে কিছু হল না এখনও।
মফসসল শহরে স্পেশালিস্ট ডাক্তার পাওয়া সহজ নয়। যদিও বা পাওয়া যায়, তাদের ফিজ বাবুলালের পক্ষে অনেকখানি। অটো চালিয়ে সাকুল্যে প্রতিদিন গড়ে আড়াইশো তিনশো টাকা রোজগার। সংসার চালিয়ে বাড়িভাড়া মিটিয়ে হাতে ক'পয়সাই বা উদ্বৃত্ত থাকে। কাজেই বাড়ির পাশের ডাক্তারখানায় বুড়ো ডাক্তার দেবেন সরকারকে দেখিয়েছিল একবার দুজনে। কিছু ওষুধও খেয়েছিল। কাজ হয়নি। ডাক্তারবাবু কয়েকটা টেস্ট লিখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন কলকাতা থেকে করিয়ে আনিস। নানা গোলেমালে যাওয়া হয়নি আর।
বাবুলাল বাচ্চা-কাচ্চা ভালোবাসে বরাবরই। খুব সাধ ছিল ছেলেমেয়ে একটা কিছু হলে চোখের সামনে তাকে বড় হয়ে ওঠার ছবিগুলো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবে। কিন্তু বিধি বাম। এ বিষয়ে বাড়িতে কোনও কথা তুলতেও পারে না চট করে। জানে তপতির মনে লাগবে কথাগুলো। তবে এক একদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বাবুলাল খুব ভাবে তার না জন্মানো সন্তানের কথা। মনে মনে কল্পনায় খেলা করে তাদের সঙ্গে।
এভাবেই চলছিল বেশ। বৈচিত্রহীন গতানুগতিক জীবন। কিন্তু সেদিন রঞ্জন খবরটা দেবার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা উথালিপাথালি শুরু হয়েছে। ইদানীং তাকে না জানিয়ে কোথায় যাচ্ছে তপতি একা একা?
প্রথম খবরটা দিয়েছিল সাহেব। লাইনে সেদিন প্যাসেঞ্জারের চাপ কম। স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ চুপ করে গাড়ির মধ্যে বসেছিল বাবুলাল। সাহেব নিজের গাড়ি থেকে নেমে এসে ওর গাড়িতে বসল। তারপর একথা সেকথা বলতে বলতেই দুম করে কথাটা পাড়ল। হাত আড়াল করে একটা বিড়ি ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, 'কাল রাতে বউদিকে দেখলাম।'
'বউদি মানে?' প্রথমটা বুঝতেই পারেনি বাবুলাল কার কথা বলতে চাইছে ও।
'আরে বউদি। তপতি বউদি। তোমার বউ।' হাত নেড়ে বলে সাহেব। চরণের প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাচ্ছিলাম। সন্ধে পেরিয়ে গেছে তখন। দেখি বউদি হেঁটে যাচ্ছে।'
'একা?' বাবুলাল জিগ্যেস করে। জিগ্যেস করেই অবাকও হয় মনে মনে। এই প্রশ্নটা করে ফেলল কেন সে? সে কি মনে করছে তপতি অন্য কারো সঙ্গে...তার আড়ালে তাকে না জানিয়ে...সে কি তবে তপতিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না?'
'একাই মনে হল তো। হন হন করে হাঁটছিল কোনওদিকে না তাকিয়ে।' সাহেবের কথায় চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল বাবুলালের। হাঁ করে বড় একটা শ্বাস ছাড়ল সে। একটু যেন নিশ্চিন্ত বোধ করল। তবু কথাটা মাথায় থেকেই গেল। রাতে বিছানায় তপতিকে জিগ্যেস করল বাবুলাল, 'সন্ধের পর একা একা সাহাপাড়া পার হয়ে কোথায় যাচ্ছিলে কাল? কোথায় গিয়েছিলে আমায় না জানিয়ে?'
'আমি?' আকাশ থেকে পড়ল যেন তপতি, 'কে বলল তোমায়?'
'এখানে কতলোক আমায় চেনে। নজর এড়িয়ে কী থাকা যায় ভেবেছ? সাহেব দেখেছে তোমায়।' বাবুলাল গম্ভীর গলায় বলে।
'দুর, সাহেবদা কাকে দেখতে কাকে দেখেছে' তপতি বাবুলালের কথাটা উড়িয়েই দিল একেবারে।
বাবুলাল প্রতিবাদ করল না। তর্ক করল না। চুপ করে গেল। চোখ বুজিয়ে শুয়ে পড়ল পাশ ফিরে। মনের খচখচানিটা সঙ্গে নিয়েই।
দ্বিতীয় দিন কথাটা পাড়ল সরিফুল। সাহেব যেদিন কথাটা শুনিয়েছিল তার দিন পাঁচেক পরে। চাপা গলায় বাবুলালকে বলল সে একধারে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে, 'বাবুলালদা একটা কথা বলি কিছু মনে কোরো না, বউদিকে দেখলাম আজ সন্ধের পরে শুঁলিপোতা গেটের কাছাকাছি। প্রথমটা আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম ওইসময় বউদিকে ওখানে দেখে। তারপর থেকেই খুব চিন্তা হচ্ছিল। জায়গাটা ভালো নয়। ফাঁকা, শুনশান। জঙ্গুলে। বোঝোই তো দিনকাল মোটেও ভালো না'
বাবুলাল আজও জিগ্যেস করল, 'বউদিকে একা দেখলি, নাকি সঙ্গে আর কেউ...'
'না না এক্কেবারে একা। হন হন করে হাঁটছিল। আর সেইজন্যেই তো আরও ভয় লাগছিল আমার। একা মেয়েমানুষ, যদি বিপদ হয় কিছু?'
বাবুলাল চুপ করে রইল খানিকক্ষণ। ভাবল তপতির সঙ্গে যদি অন্য পুরুষমানুষ থাকত কেউ তাহলে কি তার বিপদ কিছু কম হত? কথাটা সরিফুলকে বলল না সে। বরং একটু উদাস গলায় বলল, 'তা বউদিকে দেখলিই যখন, জিগ্যেস করতে পারলি না কোথায় যাচ্ছে?'
'কী করে করব?' সরিফুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, 'আমার গাড়িতে প্যাসেঞ্জার ছিল। উল্টোদিকে আসছিলাম তখন। গাড়ি চালাতে চালাতে একঝলক দেখলাম শুধু।'
'দেখায় ভুল হয়নি তো? কাকে দেখতে কাকে দেখেছিস হয়তো।' বাবুলাল তপতির আগের দিনে বলা কথাটাই আজ সরিফুলকে বলে দেয় অন্যমনস্ক গলায়।
'কে জানে হতেও পারে' মাথা চুলকে বলে সরিফুল, 'তবে মনে হচ্ছে ভুল দেখিনি। তুমি জিগ্যেস কোরো বউদিকে।'
'করব।' বলে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসে বাবুলাল। প্যাসেঞ্জার হয়ে গেছে। তারা গাড়ি ছাড়ার জন্যে তাড়া লাগাচ্ছে। গাড়িতে স্টার্ট দেয় বাবুলাল। মনে মনে ঠিক করে নেয় আজ আর বেশি রাত পর্যন্ত ভাড়া খাটবে না। আজ তাড়াতাড়িবাড়ি ফেরা দরকার তার।
বাবুলাল বাড়ি ফিরতে তপতি অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, 'কি গো আজ এত সকাল সকাল, শরীর ঠিক আছে তো?'
'আমি তাড়াতাড়ি ফেরায় অসুবিধে হল তোমার?' নিজের গলার স্বরে নিজেই চমকে গেল বাবুলাল। মনে মনে নিজেই নিজেকে শাসন করল। এ সময় মাথাটা ঠান্ডা রাখা খুব জরুরি। আসল সত্যিটা জানার জন্যে ধৈর্য ধরতে হবে তাকে। হুট করে মাথা গরম করলে তপতি সতর্ক হয়ে যেতে পারে। অথবা ভয় পেয়ে ভালো মন্দ কিছু করেও বসতে পারে। তার চেয়ে একটু খেলার সুযোগ দিয়ে হাতে নাতে ধরার চেষ্টা করতে হবে তপতিকে। বুঝতে হবে কার টানে মাঝেমধ্যেই একলা অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছে ও এমন চুপিসাড়ে।
রাতে খেতে বসে আচমকাই তপতিকে জিগ্যেস করল বাবুলাল, 'বাড়িতেই ছিলে সন্ধে থেকে?'
'কেন?' চমকে উঠল তপতি। তার এই চমকে ওঠাটাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করল বাবুলাল। তারপর আড়চোখে একবার তপতির দিকে তাকিয়ে নিয়ে খুব নরম গলায় বলল, 'আসলে তোমার জন্যে মাঝে-মাঝেই খুব খারাপ লাগে। সারাদিন একলাটি ঘরের মধ্যে থাকো। সেই কোন মাঝরাতে আমি ফিরলে তবে একটু কথা বলার লোক পাও। একটু-আধটু বেরোতে পারলে তোমারও ভালো লাগত।'
মাথা নীচু করে ডাল দিয়ে ভাত মাখছিল তপতি। বাবুলালের কথায় মুখ তুলল এখন। এমন একটা কথার জন্যেই যেন অপেক্ষা করছিল সে। বাবুলালকে আদুরে স্বরে সে বলে উঠল, 'এই শোনো, সামনের শনিবার সন্ধের পর আমি একজায়গায় যাব। ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেতে পারে। তেমন রাত হলে সেদিনটা নাও ফিরতে পারি হয়তো বাড়িতে। তুমি কিছু মনে করবে না তো?'
বুকের মধ্যে ধড়াস করে শব্দ হল বাবুলালের। বাইরে রাত কাটাতে চাইছে তপতি। এতদূর! কী করতে চাইছে সে? আর এত সাহসী সে হল কীভাবে! তপতি কি তাহলে মরিয়া হয়ে গেছে মনে মনে?'
'কী গো বললে না যে...' তপতির প্রশ্নে সম্বিত ফিরল বাবুলালের। রাগ আর তুমুল অস্বস্তিটাকে একঢোকে গিলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করল সে, 'কোথায় যাবে তুমি তপু?'
'আমার খুব পুরোনো এক বন্ধুর কাছে। কতদিন যাইনি ওর কাছে। ওর বাড়িতে পুজো। ওইদিন অমাবস্যা তো...'
'কোথায় বাড়ি বন্ধুর?'
'সুয্যিপুরের দিকে, রাস্তার কাছেই, বেশি ভেতরে না। একা যেতে আমার অসুবিধে হবে না একটুও।'
বাবুলাল স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল তপতির দিকে। এত কিছুর পরেও গুছিয়ে মিথ্যে বলাটা রপ্ত করতে পারেনি তপতি। এটুকু মিথ্যে বলতেই কথা জড়িয়ে যাচ্ছে ওর। ঘেমে উঠছে। যে কেউ বুঝতে পারবে ওর কথা শুনে যে ও সত্যি কথা বলছে না। কিছু একটা গোপন করার চাপা উত্তেজনা চোখে মুখে ফুটে উঠছে তীব্রভাবে।
'কাউকে অটো নিয়ে আসতে বলে দেব? কখন বেরোবে তুমি?' বলতে গিয়েও থেমে যায় বাবুলাল। এখন লাটাই থেকে সুতো ছাড়ার সময়। ঠিক সময়ে সেই সুতো গুটিয়ে নিতে হবে ঘুড়ি উপরে যাওয়ার আগে।
ভাত শেষ না করেই থালায় জল ঢেলে উঠে পড়ে বাবুলাল। কলের দিকে যেতে যেতে বলে, 'বেশ তো যেও।'
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে বড় করে হাই তুলল বাবুলাল। মাথার ওপরে দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল অলস ভঙ্গিতে। তপতির দিকে ফিরে বলল, 'শরীরটা যেন ঠিক জুত লাগছে না জানো, একটু ঘুমিয়ে নি বরং।' তপতি থালা বাসন তুলে মাজতে নিয়ে যাচ্ছিল। আড়চোখে চাইল তার দিকে। বলল, 'গাড়ি নিয়ে বেরোবে না এখন?'
'খুব ঘুম পাচ্ছে। চোখ লেগে আসছে।'
'ঠিক আছে শুয়ে নাও খানিক। ঘুমিয়ে পড়লে আমি ডেকে দেবখন। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়েই বেরিয়ো না-হয়।' তপতি কলতলার দিকে চলে যায় দ্রুত পায়ে।
বাবুলাল মনে মনে হাসে খানিক। এই তপতিই কতদিন দুপুরে তাকে বলেছে আজ না-হয় ভর দুপুরে নাই বেরোলে। চলো একসঙ্গে শুই দুজনে। সন্ধের পরে বেরোলে কী এমন ক্ষতি? অথচ আজ ওর তাড়াতাড়ি বেরোনোটা নিশ্চিত করতে চাইছে তপতি।
বিকেল হবার বেশ খানিক আগেই তাকে ডেকে দিল তপতি। তাড়া দিল, 'কই গো, কতক্ষণ ঘুমোবে? বেরোবে না? বিকেল হয়ে গেল তো...'
'তুমি কখন বেরোবে?' ঘুম জড়ানো গলায় বলে বাবুলাল, 'তোমার সঙ্গেই না-হয় বেরোতাম। তোমাকে বন্ধুর বাড়ি পৌঁছে দিয়েই স্ট্যান্ডে যেতাম।'
'ধুস আমার বেরোতে-বেরোতে তো সন্ধে। বাড়িতে ধূপ প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ-টাখ বাজিয়ে তবে না বের হওয়া', তপতি বলে, 'শুধুমুধু অতক্ষণ বসে থাকবে কেন তুমি আমার জন্যে। ওই সময়ে দু-তিন ট্রিপ ভাড়া খাটা হয়ে যাবে তোমার। প্যাসেঞ্জার পাও না-পাও দিনের শেষে তেলের দাম বাদেও মালিকের হাতে কড়কড়ে তিনশো টাকা তো তুলে দিয়ে আসতে হবে তোমায়...'
বাবুলাল তপতির গলায় চাপা টেনশন আর উত্তেজনাটা বেশ পড়তে পাচ্ছিল। দিব্বি বুঝল সে যে করে হোক তাকে বাড়ির বাইরে বের করে দিতে চাইছে এখন তপতি। অবশ্য এমনটাই হবার কথা। এমনই ভেবেছিল সে। তবু বুকের মধ্যে এই প্রথম আজ একটা চাপা কষ্ট বোধ করল বাবুলাল। তপতি বাবুলালকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। কখনও কি আদৌ নিজের কাছে রেখেছিল সে বাবুলালকে? তপতি কি আর কখনও ফিরে আসবে এই বাড়িতে? নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তবু সে দুর্বলতা সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল বাবুলাল, 'চাবি কোথায় রেখে যাবে?'
'বাড়িওলার কাছে রেখে যাবখন। ফিরে এসে চেয়ে নিও তুমি। তোমার রাতের খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে যাব। আমার আসতে দেরি হলে বেড়ে নিও একটু কষ্ট করে। একদিনই তো, পারবে না বলো?'
'পারব। নিশ্চয়ই পারব।' বলে উঠে পড়ল বাবুলাল। হাত-পা ধুলো। জল দিল চোখে মুখে। পোশাক পাল্টাল নিঃশব্দে। তারপর উঠোনে নেমে এসে গাড়িতে বসে ইঞ্জিনে স্টার্ট দিল। গাড়ি গিয়ারে দিয়ে হাত নাড়ল তপতির দিকে চেয়ে অভ্যাস বশে, 'আসি। সাবধানে থেকো।'
তপতিও হাসল। তবে অন্যদিনের চেয়ে সে হাসিটা আজ অন্যরকম মনে হল বাবুলালের।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আজ আর স্ট্যন্ডের দিকে গেল না বাবুলাল। ইস্কুল মোড় ফেলে ডানহাতি রাস্তা ধরে সোজা খানিক গিয়ে রাস্তার ধারে যে ঝুপসি মোটা বটগাছটা তার নীচে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দিল সে। পকেট থেকে ফোন বের করে ফোন করল কয়েকটা। তারপর অটোর পিছনের সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে রইল চোখ বুজিয়ে। বাইরে তিরতিরে হাওয়া বইছে একটানা। গাছের পাতায় বাধা পেয়ে সেই হাওয়া এক অদ্ভুত বিষণ আওয়াজে আছড়ে পড়ছে তার কানে। সেই একটানা সরসর মরমর শব্দের বিষাদগান শুনতে শুনতে মাথার মধ্যেটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।
বাবুলাল ঘুমিয়ে পড়েছিল। প্রথম ফোনটা এল সন্ধের একটু পরেই। মোবাইলের রিং টোনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে বসে বাবুলাল। কলটা রিসিভ করে চাপা গলায় বলে, 'বল।' একটু নীরবতা। তারপর সে আবার বলে, 'ঠিক আছে। নজর রাখিস। চরণের দিকে যে গাড়িগুলো যায় ওদেরকে বলে রাখ একটু। আমায় যেন সময়মতন খবর দেয়।'
ফোনটা ছাড়ার পর একটা অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করে বাবুলাল। সঙ্গে চাপা কষ্টও। রাস্তায় খানিক পায়চারি করে সে। রাস্তার ধারে পেচ্ছাপ করে আসে। গাড়িতে রাখা বোতল থেকে জল খায়। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকে। দ্বিতীয় ফোন এল আধঘণ্টার মধ্যেই। ফোনটা কানে ধরেই উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে বাবুলাল, 'জায়গাটা বুঝতে পেরেছিস? কোথায় নেমেছে বলছিস, শুলিপোতা গেটের কাছে? তারপর? ও আচ্ছা...ঠিক আছে। অনেক করলি আমার জন্যে। না না সঙ্গে আসার দরকার নেই। আমি একাই ম্যানেজ করে নেবখন। আর হ্যাঁ, কাউকে কিছু বলিসনি যেন...বুঝতেই পারছিস...' বলতে-বলতেই গাড়ি চালু করে বাবুলাল।
অটো থেকে নেমে চারপাশে তাকিয়ে নিল তপতি। জায়গাটা ফাঁকা আর অন্ধকার। রাস্তার দুপাশেই বড় বড় গাছ আর ঝোপ জঙ্গল। জনবসতি একেবারেই নেই এদিকে। দ্বিধাগ্রস্তভাবেই অটোর ভাড়া মেটালো সে। অটোচালকের দিকে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে চেয়ে দেখে নিল আর একবার। কে জানে এ লোকটা তাকে চেনে কিনা। যদি চেনে...বাবুলালকে খবর দেয় যদি! ভাবতেই ছ্যাঁত করে উঠল বুকের ভেতরটা। কিন্তু আর কোনও উপায় নেই তার। হাতের তির ছোড়া হয়ে গেছে।
রাস্তা ধরে আর একটু এগিয়ে হালকা অন্ধকারে সরু রাস্তাটা দেখতে পেল সে। রাস্তা থেকে নেমে বাঁ-দিকে এগিয়ে গেছে। ওই তো একটু দূরেই ঘরটা দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারে আরও ঝুপসি অন্ধকারের মতন। জংলি গাছের বেড়া দেওয়া। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় তপতি। বেড়ার দরজার ওপারে হ্যারিকেনের হালকা আলোর রেখা। পুরো এলাকাটা থমথম করছে একেবারে।
শ্মশান পেরিয়ে আসার পরেই জনবসতি আর নেই। তাছাড়া এলাকাটা ভূতুড়ে। তপতির গা ছমছম করে উঠল। অন্য একটা ভয়ও খেলা করে গেল দেহে মনে। এভাবে একা একা এখানে আসা বোধহয় ঝুঁকিই হয়ে গেল। অথচ কিছু করারও ছিল না যে তার। শংকরবাবা পইপই করে বলে দিয়েছেন সে যেন একা আসে আর কাউকে যেন ঘুণাক্ষরেও এ বিষয়ে কিছু না বলে। কাজটা খুব গুহ্য। পাঁচকান হলে এ ক্রিয়ায় কিছুতেই কোনও ফল হবে না আর।
শংকরবাবার কথা তপতিকে প্রথম বলে সীমা। সীমা বাড়িওলার ঘরে কাজ করতে আসে প্রতিদিন। আসা যাওয়ার পথে একতলায় তপতির সঙ্গে গল্প করে যায় মাঝে মাঝে। চা খায়। মেয়েটা মুখরা কিন্তু ওর মনটা সরল। একদিন সরাসরি তপতিকে প্রশ্ন করে বসল, 'হ্যাঁগো বউদি, বে-থা তো অনেকদিন হল তোমাদের। বাচ্চা-কাচ্ছা হল না এখনও...আর কবে নেবে?'
কী বলবে, লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয় তপতি। সীমা বুঝে ফেলল। চাপা গলায় জিগ্যেস করল, 'সমস্যা কার, তোমার নাকি দাদার?'
'জানি না', লাজুক মুখে বলে তপতি, 'টেস্ট করতে যাওয়া হয়নি এখনও।'
কাপ থেকে বড় একচুমুক চা খেয়ে সীমা বলে, 'ডাক্তার বদ্যি যা প্রাণ চায় করো বাপু আমার অমত নেই। অমত করা সাজেও না। এসব তোমাদের নিজেদের ব্যাপার। তবে বড় ডাক্তারের কাছে গিয়ে পয়সা খরচ করার আগে একবার শংকরবাবার কাছে গিয়ে দেখতে পারো। মস্ত সাধক। হাত আর মুখ দেখে হুড় হুড় করে সব কথা বলে দেবেন দেখবে। ওনার অসাধ্যি বলে কিছু নেই। একবার গিয়ে দেখো। ঠিক ছেলেপুলে হয়ে যাবে তোমার।'
'কোথায় যেতে হবে?' উৎসাহিত হয়ে জিগ্যেস করে তপতি।
এই তো সাহাপাড়ার ওপারে চেম্বার। সোম বুধ শুক্কুর বসেন সন্ধের পর থেকে। কত দূর দূর থেকে লোক আসে। তাবিজ করে নিয়ে যায়। বশীকরণের মাটি নেয় বাবার থেকে...'
'ওকে একবার জিগ্যেস করি।'
'এক্ষুনি কোরো না বউদি। আজকালকার পুরুষমানুষ তো, বিশ্বাস নেই। না বলে দেবে হয়ত নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে। তার চেয়ে প্রথমে একাই যাও। কথা বলো। কাজ কিছুটা পেলে তখন বোলো। আর অবিশ্বাস করতে পারবে না তখন।' সেই কথা শুনেই গিয়েছিল তপতি। একা একাই। বাবুলালকে বলেনি কিছু। শংকরবাবাও বলেছেন এক্ষুনি কাউকে কিছু না জানাতে।
প্রথম দিন মানুষটাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল তপতি। কালো বলিষ্ঠ চেহারা। লালচে চোখে তীক্ষ্ন দৃষ্টি। তপতির মনে হচ্ছিল লোকটা যেন বাইরের আবরণ ভেদ করে ভেতরের সবকিছু দেখে ফেলছে। শাড়ির আঁচল বুকের ওপরে আরও টেনে দিয়ে জড়সড় ভঙ্গিতে বসেছিল তপতি।
শংকরবাবা চাপা গম্ভীর গলায় বললেন জন্ম তারিখ মনে আছে? সময়?'
'হ্যাঁ।' ঘাড় কাত করে বলে তপতি। তারপর তার জন্মের তারিখ বলে। সময় বলে। শংকরবাবা একটা কাগজের ওপরে কঠিন মুখ করে বসে পেনসিল দিয়ে খানিক আঁক কাটেন একমনে। তারপর বলেন, 'কী জানতে চাচ্ছো?'
'আজ্ঞে আমার ছেলেপুলে...'
'হবে না। জন্মচক্রে বিচ্ছিরি সব বাধা আছে।' তপতিকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই বলে ওঠেন শংকরবাবা, 'আমরা লগ্নের পঞ্চম ভাব থেকে সন্তানলাভ বিচার করি। এই সন্তান স্থানে এখানে শনির পূর্ণদৃষ্টি। আবার রাহু নীচস্থ হয়ে ওখানে অবস্থান করছেন। তোমার জন্মচক্রে চন্দ্র ও বৃহস্পতির ওপরে সেই রাহুর প্রভাব পূর্ণমাত্রায়। কাজেই মা হওয়া খুব মুশকিল তোমার।'
'আপনি শুনেছি সব পারেন...' একটা মনখারাপ করা কান্না এসে গলাটাকে চেপে ধরে তপতির।
'আমি না', শংকরবাবা হাসেন, 'পারে এই বিদ্যে। তবে বিদ্যেটা ঠিকঠাক জানা চাই। আজকাল ক'জন আর শিখে কাজটা করে। সবাই চায় নাম আর মুনাফা।'
'এর কি কোনও প্রতিকার নেই বাবা?'
'আছে। মা হবার জন্যে তোমায় শনি, রাহু, আর বৃহস্পতির উৎকৃষ্ট গ্রহরত্ন ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি নীলা, একটি গোমেদ আর একটি পোখরাজ...'
'পরলে মা হব আমি?'
'হবে।'
'কত খরচ পড়বে?'
শংকরবাবা চোখ বুজিয়ে একটু ভাবেন। বিড়বিড় করে হিসেব করেন খানিক। তারপর বলেন, 'তা ধরো হাজার চল্লিশ...'
'চল্লিশ হাজার!' বলে মুখ নীচু করে ফেলে তপতি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মানুষটার জন্যে কষ্ট হয় খুব মনে মনে। ছোট বাচ্চাদের কী ভালোই না বাসে লোকটা। কতবার দেখেছে স্কুলের বাচ্চাদের ডেকে ডেকে অটোয় তুলে নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে। পয়সা নেয়নি।
শংকরবাবা গম্ভীর গলায় বলেন, 'হাজার কুড়ি অগ্রিম দিতে হবে। সামনের সপ্তায় মাল হাতে পাবে। আমিই ব্যবস্থা করে দেব। আঙুলের মাপ নিয়ে নিচ্ছি। আংটি বানিয়ে শোধন করে রাখবখন।'
'আমি পারব না।' তপতি ভাঙা গলায় বলে, 'স্বামী অটো চালায়। অত টাকা আমি কোথায় পাব বাবা? তাছাড়া দেবার মতন আত্মীয় স্বজনও কেউ নেই।' বলতে বলতে তপতি বাড়ি ফেরার জন্যে উঠে পড়ে।
তার দিকে উদাস চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন শংকরবাবা। তারপর চাপা গলায় বলেন, 'কারো জন্যে করি না। তবে তোমায় দেখে মায়া লাগল হে। কাজটা কঠিন, তবে করে দেব। অন্য কিছু না, তোমায় এ কাজের জন্যে সামান্য কাঞ্চন দান করতে হবে। অতি গুহ্য তান্ত্রিক ক্রিয়া। ফাঁকিবাজি চলবে না।'
'কাঞ্চন মানে?' তপতি বোকার মতন মুখ করে বলে।
'সোনা চাই। যজ্ঞে আহুতি দিতে হবে। তবেই না সোনার টুকরো ছেলে কোলে আসবে তোমার।'
'তাই বা পাই কোথায়?'
'কিচ্ছু নেই? হয় নাকি? মেয়েমানুষের সোনার গয়না নেই একটাও, হয় নাকি?' চোখ সরু করে তাকান শংকরবাবা।
'একটা সরু চেন...'
'তাই দিয়ে যেও। আর যজ্ঞের দরুন শ'চারেক অন্তত টাকা।'
'এখানে?'
'উঁহু, উঁহু। এখানে নয়।' বলে এই জায়গাটার কথা বলে দিয়েছিলেন উনি। কবে এসে জিনিসগুলো দিতে হবে তাও জানিয়েছিলেন। সবসময় উনি এখানে থাকেন না। এ তাঁর গুহ্য সাধনার জায়গা। খুব গোপন আস্তানা। বার বার করে বলেছিলেন কেউ যেন জানতে না পারে। তাহলে সর্বনাশ! যজ্ঞ নিস্ফল হয়ে যাবে একেবারে। আগে একদিন এসে তপতি সেই চেন আর টাকা দিয়ে গেছেন শংকরবাবার হাতে। সেদিনই এখানে দেখেছিলেন এক ভৈরবীকে। লাল পাড় শাড়ি। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ। কথা হয়নি তাঁর সঙ্গে। কথা বলার সুযোগই দেননি শংকরবাবা। কিন্তু তাঁর চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি দেখেছিল তপতি। ভেজা ভেজা চোখে কী আশ্চর্য আগুন ছিল একটা। সে চোখের ভাষা পড়তে পারেনি তপতি। আজ দেখা হলে তাঁর সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে হল খুব তপতির।
বেড়ার দরজায় আলতো চাপ দেয় তপতি। খুব মৃদু শব্দ করে ভেতর দিকে খুলে যায় দরজাটা। শংকরবাবা ভেতরে বসেছিলেন একটা কম্বলের ওপরে। পাশে বসে আছেন সেই ভৈরবীও।
তাকে দেখে শান্ত ধীর কণ্ঠে ডাক দিলেন শংকরবাবা, 'এসে গেছ? বেশ। ভেতরে এসো। বসো আমার সামনে।'
ঘরের মেঝেয় বিছিয়ে রাখা কম্বলের ওপরে মন্ত্রমুগ্ধের মতন বসে পড়ে তপতি। শংকরবাবা ভৈরবীর দিকে চাইলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, 'ব্যবস্থা সব পাকা?'
'হুঁ', ওপর নীচে ঘাড় নাড়লেন ভৈরবী।
'এবার তুমি এসো।'
'আমার যাবার কী দরকার। আমি থাকি না।'
'আঃ তর্ক করো কেন!' গর্জে ওঠেন শংকরবাবা, 'তুমি যাও। যেখানে বলেছি সেখানেই অপেক্ষা করো। কাজ হয়ে গেলে ওখানেই দেখা হবে আবার তোমার সঙ্গে। এ স্থান আজ রাতেই ত্যাগ করতে হবে আমাদের।'
ভৈরবী ওঠেন। একবার শংকরবাবার দিকে আর একবার তপতির দিকে স্থির চোখে তাকান কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যান। অন্ধকারে।
শংকরবাবা সেই চলে যাওয়াটা লক্ষ করলেন স্থির চোখে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। তারপর উঠে গিয়ে দরজাটা চেপে বন্ধ করে এলেন, যাতে ফাঁক না থাকে। তারপর কম্বলের ওপরে এসে বসে তপতির দিকে হাত বাড়ালেন, 'এগিয়ে এসো। আমার সামনে এসে বোসো।'
'আমি ঠিক আছি।' অস্বস্তি হচ্ছে এখন তপতির। মনে কী একটা কু গাইতে শুরু করেছে হঠাৎ।
'শংকরবাবা একটা তামার পাত্রে রাখা একটু তরল তপতির দিকে এগিয়ে দেন, 'খেয়ে নাও। চরণামৃত।'
তপতি গলায় ঢেলে নেয় সেটা। কটু স্বাদ। অস্বস্তি হচ্ছে শরীরের মধ্যে। শংকরবাবা এগিয়ে এলেন কাছে, আরও কাছে। তপতির গায়ের ওপরে ভারী, গরম নিঃশ্বাস পড়ছে তাঁর। শংকরবাবা তপতির কাঁধে হাত রাখলেন। হাত কাঁধ থেকে ক্রমশ পিছলে নেমে আসছে। শংকরবাবার দু-হাতের আঙুল তপতির দুই পুরুষ্টু স্তনের ওপরে খেলা করে বেড়াচ্ছে এখন।
তপতি শরীরে ঝটকা মেরে সরে যেতে চাইল, 'কী করছেন, ছাড়ুন।'
শংকরবাবা চেপে ধরলেন তাকে নিজের শরীরের সঙ্গে। এক টানে শাড়ির আঁচল সরিয়ে ব্লাউজ ধরে টান দিল শংকরবাবা। 'আমি দেব তোকে সন্তান। তোর স্বামী অক্ষম, আমি তো নই। কে জানবে কে কার ছেলে। আয়, মিশে যা আমার সঙ্গে।'
'শয়তান! সরে যা আমার শরীর থেকে' তীব্র চিৎকার করে উঠতে গিয়েও থমকে যায় তপতি। শংকরবাবার মোটা বেপরোয়া ঠোঁট কামড়ে ধরেছে তার ওষ্ঠ। যন্ত্রণায় চোখ বুজিয়ে ফেলে তপতি। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে আসে তার।
হঠাৎ দড়াম করে সেই বেড়ার দরজা খুলে যায়। তার শরীর অধিকার করে থাকা শংকরবাবার শরীর তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পিছলে সরে যায়। বাবুলালের হাতের ভারী স্লাই রেঞ্জটা আবার নেমে আসে শংকরবাবার মাথার পিছন দিকে। উপর্যুপরি। বাধা দেবার মতন অবকাশই পায় না লোকটা।
তপতির শরীরটা অবশ হয়ে আসছিল। চোখের সামনে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে আলোর নানা তরঙ্গে ভারহীন হয়ে ভাসছিল তপতি। ভৈরবীর গলা শুনতে পেল সে ভাসতে-ভাসতেই, 'সময় নষ্ট কোরো না। ওকে তুলে নিয়ে যাও। অটো স্টার্ট দিয়ে সোজা বাড়ি। কোথাও থেমো না। ডাক্তারের কাছেও যেও না এক্ষুনি ওকে নিয়ে। দরকার নেই। একটু সময় পেলে ঠিক হয়ে যাবে মেয়েটা। একটু যত্নে আর আনন্দে রেখো শুধু ওকে। না-হলে আমারই মতন হারিয়ে যাবে কোনওদিন...'
বাবুলাল দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে বলে, 'কিন্তু আপনি? আপনার কী হবে?'
'আমার জন্যে ভেব না। এত বড় পৃথিবীতে একটা জায়গা ঠিকই জুটিয়ে নেব কোথাও। আর শাস্তি পাই যদি ধরে নেব তা আমারই অর্জন। ওই লোকটার কথায় লোভে পড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম যেমন একদিন...কথায় বলে না লোভে পাপ, পাপে...'
কথাগুলো কেটে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ ঘুমিয়ে পড়ছে তপতি। বাবুলাল ওকে দু-হাতে তুলে নিল। শুইয়ে দিল অটোর মধ্যে। নিজে ড্রাইভারের আসনে বসতে যাবে এমন সময় ছুটতে ছুটতে এল ভৈরবী। স্লাই রেঞ্জ বাড়িয়ে দিল তার দিকে, 'সেলাই রেঞ্জটা নিজের কাছে রাখো। এমন বেভুলো হলে সংসার চালাবে কী করে। মার্ডার ওয়েপন কেউ পথে ফেলে চলে আসে?'
অটো চালু করেছে সবে তখন বাবুলাল। আর দাঁড়ানো যাবে না। কেউ এসে পড়লেই মহা সর্বনাশ। ওদিক থেকে একটা ট্রাক প্রবল গতিতে ছুটে চলে গেল। ট্রাকের হেড লাইটের আলো ছিটকে এসে পড়ল ভৈরবীর মুখে। চকিতে হারিয়েও গেল সেই আলো। কিন্তু তার মধ্যেই বুকের মধ্যে তোলপাড় হতে লাগল বাবুলালের। এই প্রথম স্পষ্ট আলোয় মহিলার মুখ দেখল সে।
কিন্তু এমন চেনা লাগল কেন মুখটা? অনেকখানি পথ পেরিয়ে আসার পরে মনে পড়ল। চমকে উঠল বাবুলাল। এও সম্ভব? প্রায় কুড়ি বছর আগে সে হারিয়ে গিয়েছিল। তার শৈশবের রামনগর গ্রাম...কতই বা বয়েস তখন। পনের ষোলো। হঠাৎ একদিন হারিয়ে গিয়েছিল তমালি। সে মনে মনে ভালোবাসত তমালিকে। তমালিও কি তাকে ভালো...?
এতদিন পরে! এত দূরে সে উত্তর পাওয়ার জন্যে মন ছটফট করে উঠল। তপতিকে বাড়িতে রেখে আবার অটোর অভিমুখ ঘোরাবে ঠিক করল সে মনে মনে। তারপর পথ পেরোতে পেরোতে নিজেই সেই ইচ্ছে থেকে সরে এল। আপনমনে নিজেই নিজেকে বোঝতে লাগল বাবুলাল পেরিয়ে যাওয়া সময়ের পিছনে ছুটে কিছুতেই সে সময়কে মুঠোবন্দী করা যায় না আর। বরং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।