জয়দীপ চক্রবর্তী

কৃষ্ণপক্ষে লোকটা কোথায় থাকে কে জানে! কিন্তু গত তিন-চার মাস ধরে দেখছি, যেই আকাশে চাঁদটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, অমনি সে এসে হাজির হয় আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের রাস্তায়। রোগা হয়ে বয়ে চলা আদি গঙ্গার তীরে। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আমাদের বাড়ির দিকে।
লোকটার উলোঝুলো চেহারা। পরনে মলিন ট্রাউজার আর হাফশার্ট। একমাথা ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। কাঁধে শান্তিনিকেতনী কাপড়ের ব্যাগ। চট করে দেখলে শিল্পী-টিল্পি মনে হয়।
আমিও প্রথমটা তা-ই ভেবেছিলাম। কিন্তু সুগত লোকটার কথা শুনে বলল, 'ধুস, এখানে শিল্পী কোথা থেকে আসবে? আর কেনই বা আসবে! তাছাড়া যদি শিল্পীই হত লোকটা, তবে ঠিক বোঝা যেত। নিদেনপক্ষে ওই ঝোলা থেকে আঁকাআঁকি করার সরঞ্জাম বেরিয়ে পড়ত এতদিনে।'
সুগত বলার পরে মনে হল, ঠিকই তো, আর্টিস্টই যদি হবে তাহলে আঁকার বিষয় খুঁজতে কি কেউ একই জায়গায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমন তিথি নক্ষত্র মেনে দাঁড়িয়ে থাকে নাকি!
খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে আমি জিগ্যেস করলাম, 'তাহলে অমন নিয়ম করে লোকটা কেন এসে দাঁড়িয়ে থাকে বলো তো আমাদের বাড়ির দিকে চেয়ে?'
'পাগল-টাগল হবে হয়তো।' সুগত হাই তুলে পাশ ফিরে শোয়।
'লোকটা যদি পাগলই হবে তাহলে রোজ এমন ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে আসতে পারে নাকি? বেছে বেছে ঠিক শুক্লপক্ষেই? মেঘলা অথবা বৃষ্টিদিন বাদ দিয়ে প্রতিটা সন্ধেয়?'
'তাহলে লোকটা বোধহয় তোমাকেই দেখতে আসে।' সুগত আমার দিকে ফিরে মুচকি হাসল, 'ওই সময় তুমিও তো রোজ বারান্দায় এসে দাঁড়াও।'
'ধ্যাৎ', বলে উঠি আমি। কিন্তু রোমাঞ্চে গা শির শির করে ওঠে আমার।
'লোকটা মনে হয় তোমার প্রেমে পড়ে গেছে জানো।' আবার বলে সুগত।
'খুব বিচ্ছিরি তুমি, ভয়ানক অসভ্য!' বলে সুগতর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ফেলি আমি। নিজেই বুঝতে পারি, সুগতর কথায় আমার মুখ যতখানি রাঙা হয়ে উঠেছে এখন, তা লুকনোর জন্যে এইটাই আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
'ওকে নিয়ে তুমি এত ভাবছ কেন?' সুগত একহাতে জড়িয়ে নেয় আমাকে, 'আমার সুন্দরী বউকে ও দেখে দেখুক না। হতেই তো পারে, বিয়ের আগে তুমি ওর ক্রাশ ছিলে...তখন তোমাকে পায়নি। এখন দুম করে তোমার সন্ধান পেয়ে...আর যাই হোক, লোকটা তো আর তোমাকে বিরক্ত করছে না কোনওভাবে।'
'খালি বাজে কথা!' সুগতর বুকের মধ্যে থেকেই মৃদু স্বরে আমি বলি। তারপরে চুপ করে যাই। আর কথা বলি না কোনও। লোকটার উদাস, তদগত দৃষ্টিটা মনে পড়ে যায় আমার। রাস্তার উল্টোদিকে ঠায় দাঁড়িয়ে সে সত্যিই কি আমাকেই দেখে? ভাবতে থাকি আমি।
সুগত বড়সড় চাকরি করে না। মূল শহরের মধ্যে জায়গা কিনে বাড়ি করার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। যখন এই জমিটা সুগত কিনেছিল, এদিকটা খুবই নিরিবিলি ছিল। বাগান আর জঙ্গলে মোড়া ছিল চারপাশ। মাঝখান দিয়ে একটাসরু রাস্তা চলে গেছে মূল শহরের দিকে। একটু দূরে বংশীবটতলার শ্মশান। দিনের বেলাতেও শেয়াল ডেকে উঠত শ্মশানের দিক থেকে। সন্ধে হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি উড়ত বাড়ির সামনের ঝোপে ঝাড়ে, আকশে।
এই বাড়িতে উঠে এসে সুগত খুব আনন্দ করেছিল। হাজার হোক নিজের বাড়ি। কিন্তু আমার এই বাড়িতে থাকতে একটুও ইচ্ছে করে না। সুগত অফিসে বেরিয়ে গেলেই আমার জগতটা কেমন যেন শূন্য হয়ে যায় প্রতিদিন। বিকেলের পর থেকে একা থাকতে ভয় করে আমার। মনে হয় ফাঁকা বাড়িটা আমাকে যেন গিলে খেয়ে ফেলতে চাইছে।
সুগত আমার একা থাকার কষ্ট, আমার ভয়কে আমল দিতে চাইত না প্রথম প্রথম। বলত, 'ক'টা তো মাত্র দিন। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই সম্প্রসারিত ই এম বাইপাসের কাজ শুরু হয়ে গেছে আদি গঙ্গার দুদিক দিয়ে। সোজা কামালগাজি পর্যন্ত। গঙ্গার ওপর দিয়ে মেট্রো রেলও চলে আসবে শুনছি এই পর্যন্ত। এই জায়গা কেমন জমজমাট হয়ে যায় দেখবে ক'দিন পরে! এই গাছপালা, জঙ্গল, আদি গঙ্গার মরা খাল কিচ্ছুটি থাকবে না আর দেখো।'
'কবে হবে?'
'খুব শিগগির শ্রী।'
বাইপাস সত্যিই হল। আমাদের আশেপাশের অনেক জমি জায়গা, পেয়ারা বাগান বিক্রি হয়ে পাঁচিল উঠে গেল। আর একটু এগিয়ে দুমদাম ফ্ল্যাট উঠতে শুরু করল আকাশ আড়াল করে। আমি সুগতকে জড়িয়ে ধরে বললাম, 'তুমি ঠিকই বলেছিলে। আমাদের এই জায়গাটা দারুণ জমজমাট হয়ে যাবে ক'দিন পরেই। শুনছি বাড়ির কাছেই মস্ত মল হবে একটা...।'
'তোমাকে তো বলেইছিলাম' সুগত হাসে। তৃপ্তির হাসি। 'এই জায়গার ভ্যালুয়েশন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবতে পারছ?'
কিন্তু হঠাৎ করেই সব কাজ একদিন বন্ধ হয়ে গেল। বাঙালি রেলমন্ত্রী দুম করে পদত্যাগ করায় এদিকে আর মেট্রো এল না। বাইপাসে কিছু প্রাইভেট কার আর মোটর বাইক ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি চলাচল শুরু হল না। পাঁচিলে ঘিরে রাখা বাগানে আগাছা বাড়তে লাগল। আমাদের এলাকা তেমনই আদিম, তেমনই নিঃঝুম থেকে গেল আজ অবধি।
আমিও আবার সারাদিন ধরে একা অপেক্ষায় থাকি কখন অফিস থেকে ফিরে আসবে সুগত।
মাঝে-মাঝেই ক্লান্ত গলায় বলি, 'এই বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে আমরা অন্য কোথাও উঠে যেতে পারি না একটা দু'কামরার ছোট্ট ফ্ল্যট কিনে?'
সুগত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'কে কিনবে এই বাড়ি? একটা সময় এই জায়গার ডিম্যান্ড তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন কেউ আর এখানে জমি বাড়ি কিনতে চাইছে না চট করে। আর এক-আধজন যারা আগ্রহ দেখাচ্ছে, তারা এত কম দাম দিচ্ছে যে সেই দামে বাড়ি বিক্রি করা যায় না শ্রী।'
'তবু চেষ্টা কোরো, আমি একা থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছি এইখানে।'
'হুঁ', সুগত মাথা নাড়ায়। আমি বুঝি সে মাথা নাড়ানোয় তেমন জোর নেই আর।
লোকটা আমার জীবনে কেমন একটা অন্য ধরনের রোমাঞ্চ নিয়ে এসেছে। সারাদিন আমি তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকি এখন। পূর্ণিমা এসে গেলে মন ভারী হয়ে ওঠে আমার। চাঁদ ছোট হয়ে এলে সে তো আর আসবে না এইদিকে।
রোজ বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামলে আমি ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে বসি। তাকিয়ে থাকি লোকটার দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হয় আমি একা নই।
আগে রোজ বিকেল হলেই কান্না পেত আমার। এখন আর পায় না।
আজও বিকেল গড়াচ্ছে যখন, আমি বাইরে বারান্দায় এসে বসলাম। বাইরে আসার আগে আয়নার সামনে বসে হালকা প্রসাধন লাগিয়েছি মুখে। আসমানি জামদানিটাগায়ে জড়িয়েছি। দুই ভুরুর মাঝখানে নিল রঙের ছোট্ট টিপ। অন্যদিন বারান্দার আলো জ্বালি না। ইচ্ছে করেই বারান্দার উজ্জ্বল সাদা আলোটা জ্বেলে দিলাম আজ। লোকটা সত্যিই যদি আমাকেই দেখতে আসে তো দেখুক ভালো করে। আমাকে কেউ তো এমন আগ্রহ নিয়ে দেখতে চায় না আজকাল। সুগত প্রায়ই সামান্য ব্যাপারে খিটখিট করে আমার ওপরে। অফিস থেকে আরও রাতে বাড়ি ফিরছে ইদানীং।
লোকটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার বাড়ির দিকে। মুখটা ঈষৎ উঁচু করে দৃষ্টিটাকে ভাসিয়ে দিয়েছে ছাদের ওপর দিয়ে। আমার দিকে সে একবারও ফিরে তাকায়নি এখনও পর্যন্ত। আমার মজা লাগছিল। এমন করে আলো জ্বালিয়ে নিজেকে আরও স্পষ্ট করে তুলব তার চোখের সামনে এ কথা নিশ্চিত কল্পনা করে উঠতে পারেনি মানুষটা। অথচ এইটুকু, অন্তত এইটুকু তার তো প্রাপ্যই। এতদিন ধরে সে এসে দাঁড়িয়ে থাকে চুপটি করে। আমারই জন্যে। তার এই নিরুচ্চার আহ্বান কত দিন আর ফেরানো যায়?
আজ আয়নায় অনেক দিন পরে নিজকে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। নাহ, মোটেও বুড়িয়ে যাইনি আমি এখনও। ডাকসাইটে সুন্দরী না হলেও যথেষ্ট অ্যাট্রাকটিভ লাগে আমাকে এখনও।
আমি চমকে সামনে তাকালাম। মাথা নীচু করে লোকটা রাস্তা পেরোচ্ছে। কেন? এই কয়েক মাসে একবারের জন্যেও তো দিক পাল্টায়নি সে।
লোকটা এদিকে আসছে। আমাদের বাড়ির দিকেই। আমি এক অদ্ভুত উত্তেজনা বোধ করছিলাম মনে মনে। তবে কি, তবে কি...
মানুষটা সত্যিই আমার বারান্দার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার এক্কেবারে মুখোমুখি। সে আর আমি। মাঝে শুধুমাত্র লোহার গ্রিলের নিরাপত্তাটুকু। আমি আজ ভালো করে তাকালাম তার দিকে। লোকটার পোশাক মলিন, কিন্তু অপরিষ্কার নয়। তার মাথার এলোমেলো চুলে দু-একটা পাতা আটকে আছে। হাতের আঙুলগুলো শীর্ণ, লম্বা লম্বা। তার চেহারা, তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কোনও অসাধারণত্ব নেই। শুধু তার চোখদুটো অন্যরকম। আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের থেকে একেবারেই আলাদা। এমন অসম্ভব উজ্জ্বল এবং মায়াবী চোখ আগে আমি দেখিনি কক্ষনও।
আমি তার চোখ থেকে কিছুতেই নিজের চোখ সরাতে পারছি না।
লোকটা মৃদুকণ্ঠে বলল, 'কিছু মনে করবেন না, অনুগ্রহ করে যদি বারান্দার উজ্জ্বল এই আলোটাকে নিভিয়ে দেন।'
'কেন?' অবাক হয়ে আমি বলি।
'আমার তাকে দেখতে বড় অসুবিধে হচ্ছে। এই উজ্জ্বল আলোর সামনে দাঁড়িয়ে তার আলো গায়ে মাখতে গিয়ে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছি আমি।'
'কার আলো, কার?' আমি কৌতূহলী হয়ে বলি।
'অন্ধকার আকাশের গায়ে ওই যে চাঁদটা...' লোকটা হাত তুলে আমার বাড়ির ছাদের ওপর দিকে নির্দেশ করে, 'ঠিক এই জায়গা থেকে এত অপূর্ব ভিউ আসে! মূল শহরের উজ্জ্বল আলোয় আর আকাশ জোড়া ইলেকট্রিক তারের আড়ালে ওকে তো দেখাই যায় না ভালো করে। আর এই রাস্তার অন্য দিকে জঙ্গল গাছপালার আড়াল...শুধু এই জায়গাটা থেকে, আপনাদের বাড়ির ওপর দিয়ে এত সুন্দর লাগে ওকে! ব্যাকগ্রাউন্ডের গাছ, আকাশ...আপনি দেখেননি কখনও?'
'কই না তো!' আমি অবাক হয়ে বলি।
লোকটা আমার মুখের দিকে তাকিয়েও মাথা নামিয়ে নিল। মৃদুকণ্ঠে বলে উঠল আবার, 'এই নকল আলোটা নিভিয়ে দেবেন প্লিজ?'
'দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কী দেখেন ওই চাঁদের মধ্যে?'
'তাকে।'
'কাকে?'
'চন্দ্রিমাকে?'
'চন্দ্রিমা কে?'
'আমার স্ত্রী।' লোকটা হাসে, 'তার শরীরটা চলে গেছে। কিন্তু তার আলো, তার স্নিগ্ধতা তো মরেনি। আমি রোজ তার আলো গায়ে মাখি। চেয়ে থাকি তার দিকে। এই চাঁদের মধ্যে। তখন নিজেকে আর একা লাগে না। খোলা আকাশের নীচে যখন দাঁড়িয়ে থাকি আর জ্যোৎস্না নেমে এসে আপাদমস্তক জড়িয়ে ধরে আমাকে, আদর করে, মুখের মধ্যে, চুলের মধ্যে ঢুকে যায় আমার, মনে হয় এই প্রকৃতিতে সত্যিই তো কিছু হারায় না। সবকিছুই রয়ে গেছে এখানে। কোথাও একটুও কম পড়েনি কিচ্ছুটি।'
লোকটা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। এতগুলো কথা বলে বোধহয় হাঁফিয়ে গেছে খানিক। তার কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল আমার। সেই ঘোরের মধ্যে থেকেই আমি বলে উঠি, 'এই চাঁদের দিকে তাকালে সত্যিই নিজেকে একা লাগে না?'
'না।' দুদিকে মাথা নাড়ায় লোকটা।
আমি বারান্দার আলো নিভিয়ে গ্রিলের দরজার তালা খুলে পথে নামি। লোকটা ফিসফিস করে বলে, 'এদিক থেকে বুঝতে পারবেন না। চলুন, রাস্তাটা পার হয়ে যাই।'
আমিও নীচু গলায় বলি, 'একা রাস্তা পেরোতে আমার ভয় করে।'
লোকটা হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। তার হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে যাই আমি। মুখ তুলে তাকাই আকাশের দিকে। সত্যিই জ্যোৎস্না নেমে এসে আনখশির ভিজিয়ে দেয় আমাকে। আমি হাঁ করি। জ্যোৎস্না এসে ঢুকে পড়ে আমার মুখের মধ্যে।
আমারও তখন নিজেকে আর একলা লাগে না। সুগতর ওপরে জমে থাকা যাবতীয় অভিমান ঝরে পড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে। মনে হয়, আহা, এতবড় জনপদে অন্তত এই অঞ্চলটুকু এমন অনুন্নত, এমন আদিমই থেকে যাক চিরকাল। আর এই একলা থাকার ছোট্ট বাড়িটাও আমারই থাক এমনি করেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।