জয়দীপ চক্রবর্তী

মালতিকে ফোনটা বাসব নিজেই কিনে দিয়েছিল। স্বপনের দোকান থেকে চুরাশি দিনের আনলিমিটেড কল আর প্রতিদিন এক জিবি ডাটার স্কিম ভরে দিয়েছিল মালতির ফোনে।
ফোনটা দামি। বাসব নিজে এত দামি ফোন ব্যবহার করেনি আজ পর্যন্ত। তবু মালতিকে কিনে দিয়েছিল। ফোনটা কেনার জন্যে কম কষ্ট করেনি সে। তিল তিল করে পয়সা জমিয়েছে। নিজের জন্যে একটা টাকাও বাজে খরচ করেনি শেষ কয়েক মাসে।
যেদিন ফোনটা কিনে এনে মালতির হাতে দিয়েছিল, সেদিন মালতির মুখে বাসব যে হাসিটা দেখেছিল, তার মনে হয়েছিল ওই হাসিটুকুর জন্যে সে সব কিছু করতে পারে।
মালতি নিজে থেকে খুব কমই কাছে আসে, কিন্তু সেই রাতে মালতি তাকে খুব আদর করেছিল।
মালতি হাই ইস্কুলে টেন ক্লাস পর্যন্ত পড়াশুনো করা মেয়ে। বাসব প্রাইমারির গণ্ডিপেরিয়ে হাই ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল বটে, তবে ক্লাস এইটের পরে আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। মাস্টারমশাইরা বুঝিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'বাসব, পড়াশোনায় তুই তো খারাপ নোস, কাজেই একটা অন্তত পাশ দিয়ে নে কোনওরকমে। মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেটটা পরে কাজে লাগবে দেখিস।'
বাসবের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। বাবা মারা গিয়েছিল এক্কেবারে ছোটবেলায়। গরিব ঘরে অভাবের সংসারে পড়াশুনো করে বেশি সময় নষ্ট করার বিলাসিতা করা যায় না। প্রথমে রঙের মিস্তিরির জোগাড়ের কাজ নেয় সে। তারপর কাজ করতে-করতেই ক্রমশ নিজে মিস্তিরি হয়ে ওঠা।
বাসবের বাজে নেশা নেই। কাজটাও করে মন দিয়ে। পরিপাটি কাজের জন্যে তার যথেষ্ট সুনাম। এ জন্য সারা বছর কাজের অভাব নেই বাসবের। আয় ইনকামও খুব মন্দ হয় না। অন্তত তাদের মতন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালাতে যে অর্থটুকু না-হলে চলে না, সেটুকুর অভাব তার নেই।
মালতির মামার বাড়িতে রঙের কাজ করতে গিয়ে মালতির মামিমার চোখে পড়ে গিয়েছিল সে। তার পরিবার, আয়, ভবিষ্যৎ এইসব বিষয়ে খুচরো কিছু কথা হয়েছিল। তার পরেই বিয়ের কথাটা তুলেছিলেন তিনি। বাপ-মা মরা মালতি যে মামার সংসারে বাড়তি বোঝা সে কথা বুঝতে বাসবের সময় লাগেনি। কেমন যেন মনের মধ্যে মায়া জমেছিল মেয়েটার জন্যে। বিয়ে-থা করার পূর্ব পরিকল্পনা মাথায় না-থাকলেও মহিলার কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল সে।
মালতির মামা পরিমল সর্দার বাজারের নাম করা ব্যবসায়ী। পুরোনো বাজারে মস্ত মুদিখানার দোকান তাদের। মালতি তার নিজের মেয়ে হলে বাসবের সঙ্গে যে কিছুতেই তিনি বিয়ের সম্বন্ধ করতেন না সে কথা বাসব বোঝে। কিন্তু একটা ক্ষীণ সম্ভাবনার কথা মনে হয়েছিল তার, মালতি কি এই বিয়েতে সায় দেবে?
মালতি অবশ্য সায় দিয়েছিল। বাধ্য হয়েই দিয়েছিল, বাসব পরে জেনেছে। মালতির যে বিয়ের ব্যাপারে নিজস্ব কোনও মতামত থাকতে পারে, এ কথাটা তার মামা-মামি আমলই দেননি। দু-চোখে টলটলে জল নিয়েই একদিন বাসবের হাত ধরে মামার বাড়ি থেকে সিঁদুর মাথায় বেরিয়ে এসেছিল সে।
বিয়েতে বাসবের কোনও দাবি-দাওয়া ছিল না। এতে পরিমল খুশি হয়েছিলেন। নিজে থেকে জামাইকে তেমন উপঢৌকন দেবার বোকামি তিনি করেননি। তার হাত ধরে মামার বাড়ি ছেড়ে মালতি যে সত্যিই বেরিয়ে এসেছিল, ভাবলে এখনও বুকের মধ্যেটা কেমন যেন হয়ে যায় বাসবের।
বাসবকে দেখতে শুনতে ভালো নয়। দোহারা কালো চেহারা। সামনের দাঁত উঁচু। সে খুব ভালো করে বোঝে তার চেয়ে অনেক দরের বর তার প্রাপ্য ছিল। অনেক সুন্দর, অনেক বিত্তবান। আর এই কথাটা মনে এলেই মালতির জন্যে মনের মধ্যেটা এক্কেবারে ভিজে যায়। সে সময় মালতির খুশির জন্যে কত কী করতে ইচ্ছে করে তার। এমনকী মাঝে-মাঝেই মালতি তার সঙ্গে যে শীতল ব্যবহার করে তার জন্যেও তার ওপরে অভিমান করতে ইচ্ছে করে না আর।
সেই মালতি যখন মুখ ফুটে একবার বলে ফেলেছে একটা ভালো ফোনের ভারি শখ তার, বাসব সেই শখ না পূরণ করে থাকে কী করে?
সংসারে সারাদিন মুখ বুজিয়ে শুধু খেটেই যায় মেয়েটা। কথা বলার মতন একটা লোকও নেই যার সঙ্গে অবসরে দু-দণ্ড কথা বলে। পাঁচ বচ্ছর বিয়ের পরে এখনও ছেলেপুলে হয়নি বলে মেয়ে-বউরা বাঁজা বলতেও ছাড়েনি তাকে। তাই কারো সঙ্গেই বাইরে আড্ডা মারার মানসিকতা তার নেই।
মালতির মুখে একথা শুনে মনে মনে বড় কষ্ট পেয়েছিল বাসব। মালতিই তাকে কাছে আসতে দেয় না, তবু তার মনে হয়েছিল ছেলেপুলে না-হবার জন্যে সে নিজেই দায়ী। মালতির জন্যে খুব খারাপ লেগেছিল তার। একা একা সংসারে মুখ বুজিয়ে কাঁহাতক থাকা যায় আর। কাজেই ফোনটা কিনে দিয়ে বাসব নিজেই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল কী করে ফেসবুকে বন্ধু তৈরি করা যায়। বলেছিল, 'শোনো এই বন্ধুদের বলে ভার্চুয়াল বন্ধু।'
'মানে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল মালতি।
'মানে হল যে বন্ধু আছে অথচ নেই!' বাসব হাসে।
কথাটা কিছুদিন আগে বিষ্টু দত্তের ছেলে বিতান শিখিয়েছে তাকে।
বিতান কলকাতার কলেজে পড়ে। ওদের বাড়ি রঙের কাজ করছিল বাসব। সেদিন ছুটির দিনে বাড়িতে ছিল বিতান। কাজ করতে-করতেই লক্ষ করছিল বাসব। বিতান ফোন হাতে নিয়ে খুটুর খুটুর করেই যাচ্ছে। আর তার মুখের ভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে মুহুর্মুহু। বাসব অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল, 'কী করছ বলো দেখি তখন থেকে? কখনও হাসছ, কখনও আবার বেজায় গোমরা মুখে তাকিয়ে থাকছ দেখি ফোনের দিকে?'
'কথা বলছি।' বিতান হেসে বলে।
'কার সঙ্গে গো? শুনতে পাচ্ছি না তো?'
'এ হল ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড। আছে অথচ নেই। এদের কারো সঙ্গে দেখা হয়নি আমার কোনওদিন। দেখা কোনওদিন হবেও না হয়তো। কিন্তু নিজেদের মধ্যে অনর্গল লিখে লিখে কথা বলি। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিই নিজেদের মধ্যে। মন হালকা হয়, সময়ও কাটে। আমার এরকম কয়েকশো বন্ধু আছে জানো তো বাসবদা।'
'তাই?' বাসব বেশ মজা পেয়েছিল ব্যাপারটায়।
বিতান তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল কী করে ফেসবুকে নিজের নামে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়, পাঠাতে হয় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। বলেছিল, 'তুমিও সোশ্যাল মিডিয়ায় জুড়ে যাও বাসবদা। দেখবে কী মজা!'
'ধুস, আমার সময় কই?' বলেছিল বাসব।
কিন্তু ব্যাপারটা মাথায় রেখে দিয়েছিল। ভেবেছিল মালতিকে যদি এটা শিখিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ওর সময় কাটাতে সুবিধে হবে।
বিলুদার সঙ্গে এতদিন পরে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গিয়েছিল মালতির। কখনও যে বিলুদার সঙ্গে আর দেখা হতে পারে ভাবেইনি সে। মালতি ভেবেছিল বিলুদা ওকে চিনতেই পারবে না। অথচ বিলুদা চিনতে পারল। একবার তার দিকে তাকিয়েই বাইক থামিয়ে মাথার হেলমেট খুলে হাতে নিয়ে হেসে জিগ্যেস করল, 'আরে মিলি না?'
মালতি চমকে গিয়েছিল। বিলুদার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল তার। সত্যিই বিলুদা? এতদিন পরে?
'চিনতে পারলে না মিলি, আমি বিলু। সেই যে তোমার বন্ধু চন্দনার দিদির বিয়েতে আমাদের আলাপ হয়েছিল...।' বিলুদা হাসে। আগেরই মতন। মিষ্টি করে।
চন্দনার দিদির বিয়েতে গিয়ে প্রথম আলাপে বিলাসদার এই হাসি দেখেই মরে গিয়েছিল মালতি। চন্দনা মুখ টিপে হেসে বলেছিল, 'কী রে মিলি, চোখ যে মোটে সরছে না তোর বিলুদার দিক থেকে।'
'ধ্যাত', বলে চন্দনার পিঠে চাপড় মেরেছিল মালতি। কিন্তু জেনে নিয়েছিল বিলুদা ওর মাসতুতো দাদা। ন'হাটায় নিজেদের বাড়ি ওদের। বাবার মস্ত ব্যবসা। সেই ব্যবসার একমাত্র উত্তরাধিকারী বিলুদাই।
চন্দনা আবার বলেছিল, 'দাদাকে বলব নাকি? দেখ ভাবনা চিন্তা করে।'
'জানি না যা।' বলে সেখান থেকে অন্য দিকে সরে গিয়েছিল মালতি।
চন্দনা ওর কথা পরে জানিয়েছিল বিলুদাকে। কিন্তু তার সপ্তা কয়েক পরেই একদিন বলেছিল, 'বিলুদা ব্যবসার কাজে নাকি বাইরে আছে। কবে ফিরবে ঠিক নেই।
এর পরে মালতি নিজেই আগ বাড়িয়ে কয়েকবার জিগ্যেস করেছিল বিলাসদার কথা। কিন্তু কেন যেন এড়িয়ে গেছে চন্দনা। তারপর দিন গড়িয়েছে। বাসবের সঙ্গে আচমকাই ওকে জুড়ে দিয়েছে মামা আর মামি। তাও পাঁচ বছর হয়ে গেল। ভুলেই গিয়েছিল মানুষটার কথা। আজ আচমকা দেখা হয়ে গিয়ে...।
'তোমাকে চিনেছি বিলুদা। না চেনার তো কথা নয়। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।' মালতি বলে।
'কেন, বিশ্বাস করতে পারছ না কেন?' একদৃষ্টিতে মালতির দিকে চেয়ে বলে বিলাস। সেই যেদিন বিয়ে বাড়িতে প্রথম দেখা হয়েছিল, মালতির দৃষ্টিটা এখনও তেমনই নরম বুঝতে পারে সে। বুঝতে পেরে হাসে।
সেই হাসিতে বুকের মধ্যে ভালো লাগার পুরোনো ঢেউটা জেগে ওঠে মালতির। সে নিজেই নিজের মনের উচ্ছ্বাসে অবাক হয়ে যায়।
বিলাস বলে, 'কত দিন বিয়ে হয়েছে তোমার?'
'পাঁচ বছর', মালতি মুখ নামিয়ে নেয় মাটির দিকে।
'ছেলেপুলে?'
'উঁহু', মাটির দিক থেকে মুখ না তুলেই দুদিকে মাথা নাড়ায় মালতি।
'এদিকে কোথায় এসেছিলে?'
'এখানেই তো আমি থাকি এখন।' মালতি মুখ তুলে হাসে, 'ওই গলি দিয়ে খানিক এগিয়ে বাঁ-দিকে তিনটে বাড়ির পরে।'
'আর কে থাকে বাড়িতে?' খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিগ্যেস করে বিলাস।
'কে আবার', মালতি হাসে, 'আমি আর আমার বর। তা তিনি সারাদিন কাজ করে বেড়ান আর আমি যক্ষের মতন তার বাড়ি আগলে একলাটি পড়ে থাকি সমস্তটা দিন।'
এরপর দু-একটা সাধারণ মামুলি কথা। বাইক স্টার্ট করে হুউস করে চলে গিয়েছিলবিলাস। বলেছিল, 'বেশ, দেখা হবে পরে। কোথায় থাকো জানা হয়ে গেল যখন। আসি তো আমি মাঝেমধ্যেই এদিকে, ব্যবসার কাজে। কোনও একদিন দুম করে ঢুকে পড়তে পারি চা খাবার জন্যে।'
বিলুদা কথা রেখেছিল। দিন কয়েকের মধ্যেই সে এসেছিল মালতির ঘরে। চা খেয়ে গল্প করে গিয়েছিল মালতির সঙ্গে। তারপর আরও একদিন। তারপর...।
সম্পর্কটা বেশ দানা বেঁধে উঠেছিল কয়েকদিনের মধ্যেই। একদিন মালতিকে হালকা আদর করতে করতে বিলুদাই মোবাইলের কথাটা তুলেছিল। বলেছিল, 'ফেসবুকে আমার বন্ধু হয়ে যাও। মেসেঞ্জারে গল্প করা যাবে। মনেই হবে না দুজনে দূরে দূরে আছি।'
কালও বাসব কাজে বেরিয়ে যাবার পরে ও এসেছিল। বসে কিছুক্ষণ গল্প করার পরে দু-হাতে জড়িয়ে ধরেছিল মালতিকে। তারপর গাঢ় গলায় বলেছিল, 'তোমার সবটুকু নিতে ইচ্ছে করে আমার মিলি।'
'ধ্যাত।' মালতি মৃদু প্রতিবাদ করে। কিন্তু সে নিজেই বোঝে সে প্রতিবাদে তেমন জোর ছিল না তার। বিলাসও বোঝে। আর বোঝে বলেই...।
বিলাস চলে যাবার পরে মালতির অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল একটা। সেই অনুভূতির মধ্যে ভালোলাগা একেবারেই যে ছিল না তা নয়, কিন্তু তার বাইরেও একটা অন্যরকম অস্বস্তি টের পাচ্ছিল সে মনের মধ্যে। বার বার মনে হচ্ছিল এতখানি না এগোলেই ভালো হত বোধহয়। বিলুদা তো তাকে বলেইছে খুব শিগগিরি তাকে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে যাবে সে। তাই যদি হয় তাহলে আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলে কী এমন ক্ষতি ছিল? সত্যি বলতে কি সে তো এখনও বাসবেরই স্ত্রী। অস্বস্তিটা ক্রমশই জাঁকিয়ে বসতে চাইছিল মালতির মনের মধ্যে। ফোনটা হাতে নিয়ে নেট অন করল সে। বিলুদা অনলাইনই আছে। মেসেঞ্জারে লিখল মালতি, 'বিলুদা, তুমি একটা দস্যু।'
'কেন, কী হল?' সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল।
'তোমার সব কিছুতেই তাড়াহুড়ো।'
'কেন?'
'আর কয়েকটা দিন সবুর করলে কী এমন ক্ষতি হত। আমি তো তোমারই হচ্ছি ক'দিন পরে...।'
বিলু স্মাইলি পাঠাল। তারপর একটুক্ষণ অপেক্ষার পরে বিলু লিখল, 'একটা ছবি পাঠাও প্লিজ। তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। একটা জম্পেশ সেলফি। একটু খোলামেলা। আমার জন্যে স্পেশাল।'
এমন অনুরোধ বিলুদা প্রায়ই করে।
মালতির আজ ছবি পাঠাতে কেন কে জানে ইচ্ছে করল না। সে লিখল, 'কেন যে অমন ছেলেমানুষি করো বিলুদা, এই তো একটু আগে প্রাণ ভরে দেখে গেলে আমাকে। তারপরেও ছবি চাই তোমার?'
সে কথার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বিলু আবার লিখল, 'ছবি কই ডার্লিং? সেলফি দাও একটা।'
মালতি ঠোঁট ওল্টাল। বিলুদাটা একটা পাগল। ছবি না দেওয়া পর্যন্ত এমন ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকবে। ফোনটা হাতে নিয়ে ফোটো অপশনে গেল মালতি। নিজের মুখটা আঁচল দিয়ে মুছে নিল একবার। তারপর ছবি তুলতে গিয়েও থমকালো। নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে আঁচল দিয়ে বিভাজিকা ঢেকে নিল আজ।
এই ফোনের ক্যামেরাটা বেশ ভালো। ছবি খুব পরিস্কার ওঠে। কিন্তু আজ কী অদ্ভুত, নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে চমকে গেল মালতি। তার মুখের ওপর দিয়ে অমন একটা কালো দাগ এসেছে কেন? তাহলে ছবি তোলার সময় কোনও সমস্যা হয়েছিল?
এর মধ্যে বিলু আবার ছবির জন্যে তাগাদা দিল। মালতি আবার সেলফি তুলল সন্তর্পণে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, এবারেও তার মুখের ওপরে আগের ছবিটারই মতন একটা বিশ্রী কালো দাগ। এমন তো আগে হয়নি কখনও। তাহলে কি ফোনটা খারাপ হয়ে গেল?
খুব মন খারাপ হয়ে গেল মালতির। ছবিগুলো বিলাসকে আর পাঠাল না সে। ফোনের নেট কানেকশন অফ করে দিল মালতি। কিছুক্ষণ পরে ফোন করল বিলাস। ফোন ধরতে ইচ্ছে করল না তার। মালতি জানে বিলাসের ফোন আসতেই থাকবে এইবার। বিলাসের সঙ্গে কথা বলতে তার এখন আর ইচ্ছে কছে না। ফোনটার দিকে চেয়ে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে মালতি। তারপর ফোনের সুইচ অফ করে দেয়।
আজ বাসবের ফিরতে অন্যদিনের থেকে খানিক দেরি হল। মানুষটাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল খুব। মালতি দেখেছে আজকাল বাসব তার সঙ্গে খুবই কম কথা বলে। কী যেন ভাবে সবসময়। কী এত ভাবে লোকটা সবসময়? মালতি নিজেও ভাবে, কিন্তু বাসবকে জিগ্যেস করে না কিছু। মালতি ভেবে রেখেছিল আজ বাসব বাড়ি ফিরলে ফোনের কথাটা বলবে। সে জানে তার খুশির জন্যে বাসব সদা তৎপর। মালতির ফোন দুদিনের মধ্যে ঠিক সারিয়ে এনে দেবে সে। কিন্তু আজ বাসবের মুখের দিকে চেয়ে ফোনের কথা তুলতে পারল নামালতি। বাসবকে এত গম্ভীর বিয়ের পর থেকে একদিনও দেখেনি সে।
খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় এসে আজ নিজে থেকেই বাসবের সঙ্গে কথা বলতে গেল মালতি। নীচু গলায় জিগ্যেস করল সে, 'কিছু হয়েছে তোমার?'
বাসব জবাব দিল না। মালতি আবার জিগ্যেস করল, 'তুমি কি কোনও সমস্যায় পড়েছ?'
এবার তার দিকে ঘুরল বাসব। একদৃষ্টিতে মালতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। ঘরের মধ্যে একটা কম আলোর বালব জ্বলছিল। হালকা নীলচে আলো মশারির মধ্যে আরও হালকা হয়ে এসে ঢুকছিল। সেই আলোতেও মালতি দেখল বাসবের দুচোখে আজ অন্য একরকমের চাউনি। মালতির বুকের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল। কোনও ভনিতা না করে বাসব সরাসরি জিগ্যেস করল, 'তুমি বিলাসকে ভালোবাসো?'
মালতি ভয়ানক চমকে উঠল। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডের সেই ভীতু শব্দ সে নিজের কানে শুনতে পাচ্ছিল।
খুব স্থির, শান্ত গলায় আবার বলে উঠল বাসব, 'মালতি, আমি নানান জায়গায় কাজ করি। আমার চেনা পরিচিতের সংখ্যা কম নয়। এই অঞ্চল এবং আশেপাশে আমার আসলে হাজার চোখ। তোমার পক্ষে আমাকে লুকিয়ে কিছু করা সম্ভবই নয়।'
মালতির ঘাম হচ্ছে। বাসব লোকটাকে যতটা সহজ ভেবেছিল এতদিন, মানুষটা মোটেও ততখানি হাবাগোবা সহজ সরল নয়। সবথেকে মুশকিলের কথা এই বাসবকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না মালতি। তার চাউনি এবং তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু আছে যা মালতি পড়তে পারছে না। বাসব রেগে গেছে, এমনটাও মনে হচ্ছে না। তার কণ্ঠস্বরে ক্ষোভ, হতাশা, ঘেন্না, বিষাদ কিচ্ছু নেই। বিলুদা সম্পর্কে বাসবকে এই মুহূর্তে কতখানি বলা উচিত সে বিষয়ে কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না মালতি।
মালতির হতভম্ব মুখের দিকে চেয়ে বাসব হাসল। শব্দহীন বাতাসের মতন মৃদু সেই হাসি, অথচ সে হাসির স্পর্শ বুকের ভেতরে পর্যন্ত টের পাওয়া যায়। মালতি সেই স্পর্শে কেঁপে উঠল। কাঁপা গলায় সে শুধু বলতে পারল, 'আজ বিলুদা এসেছিল।'
'জানি', মালতিকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নিরুদ্বিগ্ন গলায় বলে বাসব, 'এর আগেও এসেছে। বাসব তো তোমাকে মাঝেমধ্যে ফোনটোনও করে।'
'হুঁ।'
বাসব আবার হাসে। সেই শব্দহীন, মৃদু হাসি। তারপর এই বহুদিন পরে নিজে থেকে এগিয়ে এসে মালতির পিঠে হাত রাখে। মালতি শিউরে ওঠে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মনে মনে। বিয়ের পরে পরেই এমন করেই এগিয়ে এসেছিল বাসব। মালতি সংকুচিত হয়ে বলে উঠেছিল, 'না। আমি পারব না। তুমি দয়া করে আমাকে ছোঁবে না। আমার মনের মধ্যে যে ছবিটা আছে, যাকে আমি মনে মনে আদর করি, নগ্ন হই মনে মনে যার সামনে প্রতিদিন, সে তুমি নও!'
মালতি ভেবেছিল এই ঘটনার অভিঘাতে বাসব রেগে যাবে। তাড়িয়েও দিতে পারে তাকে। বউ হিসেবে অস্বীকার করতে পারে মালতিকে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বাসব সেসব কিছুই করেনি। হাত সরিয়ে নিয়েছিল। মালতির থেকে একটু সরে গিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়েছিল। তারপর থেকে এতদিন মালতির দিকে নিজে থেকে এগিয়ে আসেনি কক্ষণও। মালতির এগিয়ে আসার জন্যে অপেক্ষায় থেকেছে। মালতির ওপরে রাগ তো সে করেইনি, বরং তার সুখের জন্যে, আনন্দের জন্যে সবসময় সচেষ্ট থেকেছে বাসব। একেকদিন মালতি এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই আসায় স্বতস্ফুর্ততা ছিল না।
আজো মালতি সরে এল না। বাসবের হাত সরিয়েও দিল না। ঠিক ভয় নয়, একটা অন্যরকম অস্বস্তি হচ্ছিল তার মনের মধ্যে। বাসব খুব নরম গলায় বলল, 'মালতি, আমি জানি আমাকে বিয়ে করে তুমি খুশি নও। হবার কথাও নয়। তুমি পড়াশুনো করা মেয়ে। দেখতে শুনতেও যথেষ্টই ভালো। আমি কুৎসিত। রোজগার অল্প। আমি তোমার যোগ্য নই। বিয়ের পরে বুঝেছি এই বিয়েতে একটুও সায় ছিল না তোমার মনের মধ্যে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই তুমি...তোমার কথা ভেবে আমার কষ্ট হয় মালতি। আমিও তো অসহায়। কী-ই বা করতে পারতাম আর তোমার জন্যে। তবু আমার সাধ্য মতন তোমাকে ভালো রাখার চেষ্টা করে এসেছি আমি প্রাণপণে। এখনও আমি তোমার ভালোই চাই।'
মালতি চুপ করেই রইল।
বাসব আবার বলল, 'মালতি তুমি কি বিলাসকে বিয়ে করার কথা ভাবছ?'
'বিলুদা আমাকে তেমন আশ্বাসই দিয়েছে।' দ্বিধাগ্রস্ত লাজুক গলায় বলে মালতি।
একটুক্ষণ চুপ করে থাকে বাসব। মালতি তার চেপে নেওয়া দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়। কেন কে জানে, তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। বাসব জিগ্যেস করে, 'তুমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়েছ?'
'হ্যাঁ', মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় মালতি,'আমি মনে মনে তাকে ভালোবেসেই তো তোমাকে সরিয়ে রেখেছিলাম এতদিন। তখন অবশ্য ভাবিনি এমন করে বিলুদার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে আবার।'
'ও,বিলাস সম্পর্কে সব জেনেশুনেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছ তো?'
'মানে? বিলুদাকে সেই কবে থেকেই তো চিনি আমি...'
বাসব হেসে ওঠে। শব্দ করে হেসে ওঠে এইবার, 'মানুষকে চেনা কি এতই সহজ মালতি? এক ছাদের নীচে থেকেও তো আমরা একে অপরকে চিনতে পারি না অনেক সময়ে। বলো? আর বিলাসের সঙ্গে তো দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই তোমার। কী করেই বা তার সম্পর্কে জানবে তুমি?'
'বিলাসদা সম্পর্কে তুমি কিছু জানো?'
'ছেলেটা ভালো নয় মালতি। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেবার আগে ওর বিষয়ে আর একটু খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল তোমার।'
'মানে?' আকুল হয়ে বলে ওঠে মালতি, 'কী জানো তুমি বিলুদা সম্পর্কে? কী করেছে সে?'
'মাঝে বেশ কিছুদিনের জন্যে জেলে ছিল বিলাস।'
'কী করেছিল বিলুদা?' মালতি অবিশ্বাসের চোখে তাকায় বাসবের দিকে।
'জালিয়াতি', বাসব একইরকম অনুত্তেজিত গলায় বলতে থাকে, 'একটি মেয়েকে প্রেমের অভিনয় করে ফাঁসিয়েছিল সে। মেয়েটার কাছ থেকে প্রচুর টাকা গয়না হাতিয়ে নিয়েছিল বিলাস। মেয়েটা সুইসাইড করে। তার মৃত্যুটা সন্দেহজনক। পুলিশের অনুমান ওটা সুইসাইড নয়, খুন। সন্দেহভাজনের তালিকায় বিলাসের নামই উঠে এসেছিল। প্রমাণের অভাবে তার শাস্তির মেয়াদ অবশ্য খুব বেশি বছর হয়নি।'
'কী বলছ তুমি? এ কথাটা মিথ্যে রটনা নয়, তুমি ঠিক জানো?' মালতির গলায় বাষ্প জমতে শুরু করেছে এখন।
'আমি মেয়েটাকে চিনতাম।' মালতির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার হাসে বাসব, 'জেল থেকে ফিরে এসে বিলাস আবার একটা বিচ্ছিরি কেসে জড়িয়ে পড়ে।'
'আবার? এবার কী করেছিল বিলুদা?'
'রেপ।'
'ছিঃ।'
'তুমি কষ্ট পাচ্ছ জানি। তবু তোমার শুনে রাখা ভালো। হাজার হোক তার সঙ্গে একটা স্থায়ী সম্পর্কে যেতে চাইছ তুমি কিছু দিনের মধ্যে। এই ব্যাপারটাও অনেক দূর পর্যন্তই গড়াত হয়তো, কিন্তু মেয়েটাকে বিয়ে করে নিয়ে কেসটা সালটে দিয়েছিল বিলাস।'
'বিলুদা বিবাহিত?'
'হ্যাঁ। মাস চারেক আগে ওদের একটা মেয়েও হয়েছে।' বলে চুপ করে যায় বাসব।
মালতিও চুপ করে থাকে। কী বলবে বুঝতে পারছিল না সে।
একটু সময় নিয়ে ও পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়বার আগে বাসব মালতির দিকে তাকালো আর একবার। দেখল মালতি জেগেই আছে। বাসব নীচু গলায় বলল, 'আমি তোমাকে দু-চার দিন সময় দিচ্ছি। আমার কথাগুলো সত্যি কিনা যাচাই করে নিও তুমি। শুধু-শুধু আমার সব কথা মেনে নিলে পরে হয়ত কখনও মনে সন্দেহ জাগবে তোমার। মনে হবে মিথ্যে বলে তোমার সুখের পথে ভাংচি মারার চেষ্টা করেছি আমি।'
মালতি জেগে জেগে ফোঁপাচ্ছিল। এবার সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। দু-হাত দিয়ে জাপটে ধরে বাসবকে। শক্ত করে। তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে নির্ভরতা খুঁজতে থাকে।
বাসব তার কপালে চুমু খেতে গিয়েও ঠোঁট সরিয়ে নেয়।
মালতি বাসবের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, 'তুমি সব জানো যখন আমাকে আটকানোর চেষ্টা করোনি কেন আগে?'
'জোর করে কি কাউকে আটকে রাখা যায়?'
'যায় যায় যায়। তুমি তো পুরুষমানুষ, জানো না, জীবনে কখনও কখনও জোর খাটাতেও জানতে হয়?' বলে বাসবের ঠোঁট কামড়ে ধরে মালতি।
বিয়ের পরে এই প্রথমবার বিনা বাধায় বাসব দু-হাতে জড়িয়ে ধরে মালতিকে। ধীরে ধীরে মালতির শরীরের দখল নিতে থাকে সে যত্নে ও মমতায়।
কাজে বেরোনোর আগে আজ বাসবকে কাছে ডাকল মালতি। বলল, 'এসো, দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আজ একটা সেলফি তুলি।'
বাসব হাসল। বাসবের রং কালো। সামনের দাঁত উঁচু। তবু তাকে আজ অসম্ভব সুন্দর দেখতে লাগছিল মালতির।
সদ্য তোলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে চমকে গেল। কী আশ্চর্য, আজ ছবিটা এক্কেবারে পরিষ্কার। ঝকঝকে উজ্জ্বল। ফোনের ক্যামেরাটা কি তাহলে খারাপ হয়ে যায়নি? দেখবার জন্যে নিজের একটা সেলফি তুলল মালতি।
নাহ। একদম ঠিক আছে। ছবির ওপরে আর কোনও দাগ নেই আজ।
বাসব বেরিয়ে যাবার আগেই বিলাসের নম্বর ব্লক লিস্টে পাঠিয়ে দিল মালতি। বাসবের দিকে চেয়ে বলল, 'আবার যদি বিলুদা এ বাড়িতে আসে?'
'যা উচিত তাই কোরো।' বলে কাজে বেরিয়ে পড়ে বাসব। তার চলে যাওয়া দেখতে থাকে মালতি। দরজায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।