লোভ পাপ ভালোবাসা

জয়দীপ চক্রবর্তী

মাত্র দিন সাতেক আগে পর্যন্তও অবনীশের এই অদ্ভুত সমস্যাটা ছিল না। আর পাঁচটা পরিচিত অপরিচিত মানুষের মতো সেও অফিসে যেত। ক্লাবে গিয়ে ছুটির দিনে হইহল্লা করত। উইকএন্ডে বারে বসে মদ্যপান করত এবং অফিসে ওপরঅলাদের সুনজরে পড়ার জন্য যা কিছু করা দরকার সবই করত। কিন্তু বিচ্ছিরি রকমের এই সমস্যাটা শুরু হল হঠাৎই।

বিনা নোটিশে গতকালই টেন্ডার বক্স খুলে লোয়েস্ট রেট দেখে অনিল মোদকের টেন্ডারই অ্যাকসেপ্ট করা হয়েছে। তাই আজ মোদককে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

মোদক এসে বসেছে অবনীশের টেবিলের উল্টোদিকে। মুখে চোখে উদবেগের ছাপ। এমনিতে টেন্ডারের রেট কোটেশন নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু এস্টিমেটেড বাজেটের চেয়ে রেট অনেক বেশি। এই অজুহাতে মোদককে ভয় দেখানোর সমূহ সুযোগ রয়েছে অবনীশের হাতে। তাই অবনীশ সাবধানে লেজে খেলাতে শুরু করল। অবনীশ জানে মোদক ঝানু ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায় ব্যাপক পুঁজিও ঢেলেছে। তাই অর্ডারটা হাতাতে হাত খুলতে কার্পণ্য করার কথা তার নয়।

টেন্ডার পেপারের পাশে পড়ে থাকা ক্যালকুলেটরটা টেনে নিল অবনীশ। মনে মনে ভাবছিল এই প্রজেক্টের ক্ষেত্রে থ্রি পার্সেন্ট আন্ডার হ্যান্ডে দেওয়াটা মোদকের কাছে একেবারে নস্যি।

ক্যালকুলেটরে টোটাল প্রজেক্ট কস্টের ওপরে থ্রি পার্সেন্ট মারতেই অবনীশ চমকে উঠল। এবার এই এক দাঁওয়েই গ্যারেজে একটা নতুন ফোর হুইলার ঢুকিয়ে ফেলা যাবে। আদ্যিকালের হিরো হন্ডাটা নিয়ে চলাফেরা করতে ইদানীং নিজেরও কেমন ইজ্জতে লাগে। আর মণিদীপার কাছে ওটা তো দু-চক্ষের বিষ।

অবনীশ অনেক দিন ধরেই তক্কে তক্কে রয়েছে। একটা ভালো দাঁও মারতে পারলেই বাইকটা ঝেড়ে দিয়ে একটা মোটামুটি চলনসই ফ্যামিলি কার কিনে নেবে। সেই সুযোগ যাতে কোনওভাবেই আজ হাতছাড়া না হয়ে যায়, সেজন্যে নিজেকে মনে মনে গুছিয়ে নিল অবনীশ। কিন্তু ওই থ্রি পার্সেন্টের কথাটা পাড়তে যেতেই আবার সেই অদ্ভুত অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা ফুটে উঠল।

মোদকের বাঁ-কানের ঠিক পাশেই শূন্যে ভেসে উঠল সেই দুটো চোখ। বেশ আয়ত। নিষ্পাপ দুটো চোখ। ঝকঝকে কালো মণি। চোখদুটো স্থির উজ্জ্বল দৃষ্টিতে অবনীশের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝট করে চোখদুটোকে দেখে অবনীশ থ মেরে গেল। প্রথমে ভাবল, এ নিশ্চিত তার চোখের ভুল। চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে ভালো করে চোখ মুছল অবনীশ। তারপর আবার সামনে তাকাল। কিন্তু না, চোখদুটো দিব্বি ভেসে রয়েছে। তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে।

আর একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় এল অবনীশের। অফিসের নানা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ইদানীং গোপন নজরদারির বন্দোবস্ত হচ্ছে। তেমনই কোনও আলট্রা মডার্ন ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে না তো তাকে ওয়াচ করার জন্যে? চিন্তাটা মাথায় আসতেই শরীর ঘেমে উঠল অবনীশের। একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তি শুরু হল মনের মধ্যে। পারচেজ ম্যানেজার চ্যাটার্জিটা একেবারে হারামির হাতবাক্স। নিজে কোম্পানির পুকুর চুরি করে দিনকে রাত করে দিচ্ছে হরদম, আর যত নজরদারি শালা তাদের জন্যে!

'খচ্চর', নিজের মনে মনেই গজগজ করতে থাকে অবনীশ।

'কিছু বললেন স্যার?' মোলায়েম স্বরে বলে ওঠে মোদক।

অবনীশ সতর্ক হয়। গলাখাকারি দিয়ে বলে, 'বুঝতেই তো পারছেন, কাগজপত্রে আপনার বিস্তর গোলমাল।'

মোদক পান খাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া কালচে লাল দাঁত বের করে হাসে, 'সে জন্যেই তো আপনি আছেন স্যার। কী করলে কী হবে একটু নাহয় গাইড করে দেবেন আমাকে। আমরা স্যার অর্ধশিক্ষিত মানুষ।'

অবনীশ হালকা গলায় বলে, 'গাইড যে করব, সেটা কি আর মুফতে হয়? কিছু গুঁড়ো ছাড়তে হবে তো, নাকি?'

'কী যে বলেন স্যার', খুব অর্থপূর্ণভাবে হাসে মোদক, 'বিনা পয়সায় কি আর এ বাজারে কিছু পাওয়া যায়! বলুন, নজরানা কত?'

'থ্রি পারসেন্ট', বলতে গিয়েও থমকে যায় অবনীশ। চোখদুটো জুলজুল করে তাকে দেখছে। দুটো আয়ত, নিষ্পাপ চোখ। মণিদুটো উজ্জ্বল আর কালো।

মোদককে সেদিনের মতন কাটিয়ে দিল অবনীশ। মোদক বেরিয়ে যেতেই, কী আশচর্য, চোখদুটোও মিলিয়ে গেল সামনে থেকে।

সেদিন আর কাজে মন বসাতে পারল না অবনীশ। কিছুতেই চোখদুটোর কথা মন থেকে সরানো যাচ্ছে না। মাঝে-মাঝেই মনে হচ্ছে, চোখ দুটো যেন বড় চেনা। কোথায় যেন দেখেছে। কার মুখে। ভাবতে ভাবতে পরিচিত সকলের মুখেই চোখদুটোকে একবার করে বসাতে থাকে অবনীশ। মণিদীপা, তার মা, দত্ত, মিত্তির, এমনকী তার বস চ্যাটার্জি...কিন্তু কারো মুখেই চোখদুটোকে খাপ খাওয়াতে পারল না সে। অসহিষ্ণু অবনীশ শেষমেশ বেরিয়েই পড়ল অফিস থেকে।

গেট দিয়ে বাইরে বেরোতেই রাস্তার পাশের পানের দোকানের ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে লম্বা করে হাসল। ছেলেটার দোকান থেকে প্রতিদিনই সিগারেট কেনে অবনীশ। মন মেজাজ ভালো থাকলে মাঝেমধ্যে পান কিনেও খায়। আজও অভ্যাসবশে তার কাছ থেকে সিগারেট কিনল অবনীশ। ছেলেটা একগাল হেসে জিগ্যেস করল, 'পান সেজে দিই দাদা একখানা?'

'উঁহু', আনমনে মাথা নাড়ে অবনীশ।

ছেলেটা আরও কী সব যেন বলছিল। অবনীশের কানে ঢুকল না। সিগারেটটা অর্ধেক টেনেই মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জুতোর সোলের নীচে পিষে ফেলল সে। তারপর পা বাড়াল রাস্তায়। ওই অদ্ভুত দুটো চোখের চিন্তা কিছুতেই মন থেকে সরছে না। সেজন্যে মনটাও বড় অস্থির লাগছে। নিজের মনেই ভাবে অবনীশ, ব্যাপারটা কি নিছকই ইলিউশন নাকিকোনও সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার হচ্ছে তার?

'অসম্ভব নয়', নিজেই নিজেকে বোঝায় অবনীশ, ঘরে বাইরে যা ধকল যাচ্ছে আজকাল।

অবনীশের নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস নেই। উইক এন্ড, অফিসের পার্টি বা তেমন কোনও অকেশন ছাড়া সাধারণত সে মদ্যপান করে না। আজ কী জানি কেন, আচমকাই টেলিফোন ভবনের উল্টোদিকের একটা বারে এসে বসল সে। ছায়া ছায়া আলো জ্বলছে। ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। নরম সোফায় ধপাস করে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল সে। সরু লম্বা কাচের গ্লাসে ঠান্ডা জল দিয়ে গেল ওয়েটার। লোকটা চেনা। উইক এন্ডে মাঝেমধ্যে এখানে এসে বসলে দেখা হয় ওর সঙ্গে। অবনীশ কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, 'হুইস্কি তো?'

'না।'

'স্কচ?'

'ভদকা। একটা লার্জ', অলস ভঙ্গিতে সে বলে।

'সঙ্গে চিকেনের প্রিপারেশন দিই কিছু?'

'দাও।'

দু-এক টুকরো চিকেন মুখে ফেলে পানীয়ের গ্লাসে হালকা চুমুক দিল অবনীশ। একটুক্ষণ চুপ করে চোখ বুজিয়ে বসে থাকার পর একটা লম্বা সিপ দিতেই দ্বিতীয়বার ঘটল ঘটনাটা। টেবিলে গ্লাস রেখে সামনের দিকে তাকাতেই অবনীশ আবার চমকে উঠল। সেই দুটো চোখ। আয়ত, নিষ্পাপ, গভীর কালো চোখের তারা। তাকে ধাওয়া করে এখানে এসেও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

মোদকের কথা ভাবছিল অবনীশ। মনে মনে অঙ্ক কষছিল। মোদকের টোটাল অর্ডারটার থ্রি পারসেন্ট মানে ঠিক কত অ্যামাউন্ট হতে পারে। চোখদুটো সামনে ভেসে উঠতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। চিন্তাটাও চটকে গেল। চোরা চাউনিতে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল অবনীশ। চোখদুটোকে অন্যরাও কি দেখতে পাচ্ছে?

অন্যদের ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল না, চোখদুটো সম্পর্কে আদৌ এদের একজনও সচেতন। অবনীশ আরও ঘাবড়ে গেল। নিমেষে গ্লাস শেষ করে বিল মিটিয়ে বাড়ির পথ ধরল সে।

কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিল মণিদীপা। অবনীশ দ্রুত পায়ে বেসিনের কাছে গিয়ে চোখে মুখে জল দিতে লাগল অনেকক্ষণ ধরে। জল হাত বুলোতে লাগল ঘাড়ে, মাথায়।

মণিদীপা দৌড়ে এল। উদ্বিগ্ন গলায় জিগ্যেস করল, 'তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?'

'না', দুদিকে মাথা নাড়ায় অবনীশ। বেসিনের কল বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুখ মুছে ফেলে সময় নিয়ে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মণিদীপার দিকে।

মনিদীপা আবার জিগ্যেস করে, 'কী হয়েছে তোমার?'

মনিদীপার মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই অবনীশ আবার বলে, 'কিছু না...'

'তোমার চোখমুখ যেন কেমন অন্যরকম লাগছে আজ!' চোখ কুঁচকে বলে মণিদীপা।

'কীরকম?'

'ঠিক বলতে পারব না, বাট সামথিং আনন্যাচারাল' বলে অবনীশের মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ে মণিদীপা। তারপর অবাক হয়ে বলে, 'তুমি আজ ড্রিঙ্ক করেছ?'

অবনীশ মণিদীপার মুখের ওপর থেকে নজর সরিয়ে নিয়ে বলে, 'তোমার চোখের সঙ্গেও সত্যিই ওই চোখদুটোর মিল নেই।'

'কী সব আবোলতাবোল বকছ?'

'দুটো চোখ সবসময় আমাকে ফলো করছে মণি। আমার সব কাজকর্মের ওপরে নজর রাখছে। আর আমি কিছুতেই আইডেন্টিফাই করতে পারছি না, চোখদুটো কার'

অবনীশের কথাগুলোকে আমল না দিয়ে তার দু-কাঁধ ধরে হালকা ঝাঁকুনি দেয় মণিদীপা, 'আর কথা নয়। যেটুকু পারো খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ো তাড়াতাড়ি। এখন ঘুম দরকার। তোমার নেশা হয়ে গেছে।'

গত দু-তিনটে দিন যে কীভাবে কেটেছে, বলে বোঝাতে পারবে না অবনীশ। জীবনে এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কখনও হতে হয়নি তাকে। পথে ঘাটে বাসে ট্রেনে সর্বক্ষণ দুটো চোখ খুঁজে বেড়িয়েছে সে। পাগলের মতো। ভিখারি ভিক্ষা চাইতে এলে তাকিয়ে থেকেছে তার চোখের দিকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে ক্লায়েন্ট এবং কোলিগদের চোখের দিকে। অথচ কারো সঙ্গেই ওই চোখদুটোকে সে মেলাতে পারেনি।

ওই অদ্ভুত চিন্তাটা কতবার যে চেয়েছে মাথা থেকে, মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে। কিন্তু পারেনি অবনীশ। যতবার ভুলতে চেয়েছে, ততবারই আচমকা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ওই দু-চোখের তারা। অফিসের কাজে মন বসছে না, বাড়ি ফিরেও স্বস্তি নেই। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও অবনীশ বার বার ধরা পড়ে যেতে লাগল অন্যদের চোখে।

শঙ্কাটা সত্যি হল অবশেষে। চ্যাটার্জি ডেকে পাঠিয়ে জিগ্যেস করলেন, 'অবনীশ, আর ইউ ওকে? ক'দিন ধরেই আপনাকে আমার কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। ব্যাপারটা কী বলুন তো?'

'না মানে...'

'তাহলে কি শরীর-টরির...'

'না না স্যার, ঠিকই আছি তো' অবনীশ মুখে আলতো হাসি টেনে আনে, 'তেমন কিছু না।'

'ব্যাপারটা হালকাভাবে নেবেন না প্লিজ। আসলে প্রতিদিন কাজের লোড যে ভাবে বাড়ছে, সেই স্ট্রেস সামলানো সত্যিই সহজ নয়। তাছাড়া সংসার...'

'আমি ঠিক আছি স্যার।'

'না ঠিক নেই।' চ্যাটার্জির গলায় পেশাদারি শীতলতা ফুটে উঠল, 'গত ক'দিন ধরে দেখছি, কাজে আপনার ঠিক মন নেই। আমি জানি, গত তিনদিন আপনি অফিস থেকে আর্লি বেরিয়েছেন। মোদকের সঙ্গে বড় ডিলটা অহেতুক ডিলে করছেন। জেনেরালি আপনি তো এমন করেন না। সো, আই সাজেস্ট, খুব ফ্যাটিগড ফিল করলে ছুটি নিয়ে ক'দিন ঘুরে-টুরে আসুন। আপনার ছুটির ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।'

নিজের চেম্বারে এসে বসার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সুবিমল এসে ঢুকল। অবনীশের টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে ওর মুখোমুখি বসে চাপা গলায় বলল, 'কী ব্যাপার রে? চ্যাটার্জি তোকে ডেকে পাঠিয়েছিল শুনলাম?'

'হুঁ', মাথা নাড়ে অবনীশ।

'এনি প্রবলেম?'

'না, না।'

'তবে?'

'এমনিই।'

'আমাকে গাধা ঠাউরেছিস? চ্যাটার্জিকে আমি চিনি না? আস্ত এক ধুরন্ধর মাল। এমনি গপ্প করার জন্যে তো কাউকে ডেকে পাঠানোর পাত্তর চ্যাটার্জি নয়। কেসটা কী, ধানাই-পানাই না করে ঝেড়ে কাশো তো চাঁদু।'

'আমায় ছুটি নিতে বলছিল।'

'হোয়াট! ভি আর এস নাকি?' উত্তেজিত গলায় বলে সুবিমল।

'আরে না না, সে সব নয়। ছুটি নিয়ে ক'টাদিন বাইরে ঘুরে-টুরে আসার জন্যে বলছিল।'

'হঠাৎ?'

একটু ইতস্তত করে অবনীশ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'আসলে ক'দিন হল, আমি কাজে ঠিক মন বসাতে পারছি না।'

'এগজ্যাক্টলি। কথাটা আমিই তোকে জিগ্যেস করব ভাবছিলাম। তোর কী হয়েছে অবনীশ? ক'দিন ধরেই দেখছি, তুই কেমন যেন ভয়ে কুঁকড়ে থাকিস সারাক্ষণ। কারও সঙ্গে কথা বলিস না। গম্ভীর মুখ। তার ওপরে চ্যাটার্জি আবার তোকে ডেকে পাঠিয়েছে শুনে হেবি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আসলে চ্যাটার্জি আর তুই দুজনে এক্কেবারে রিভার্স মেন্টালিটির, আমি জানি। ও লোকটা যদি পাক্কা হারামি হয়, তুই একেবারে পারফেক্ট যুধিষ্ঠির। অন্যায় করবি না, বাঁকা পথে চলবি না।'

অনেকগুলো কথা একনাগাড়ে বলে সুবিমল থামে। দম নেয়। অবনীশ কথা বলে না। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে সুবিমলের দিকে।

সুবিমল টেবিলের ওপরে কনুই রেখে তার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে। তারপর নীচু গলায় বলে, 'তোর সমস্যাটা কী বল তো ভাই?'

'কিছু না', হাই তুলে বলে অবনীশ।

'আমাকে লুকোস না অবনীশ। আমি তো আর তোকে আজকে থেকে দেখছি না। সত্যি কথা বল। মণির সঙ্গে কি কিছু গোলমাল বাঁধিয়েছিস?'

'উঁহু।'

'যাই বলিস অবনীশ, আমি কিন্তু জানি, তোর কেরিয়ার নিয়ে মণির একটা ডিসস্যাটিসফ্যাকশন আছে।'

'ও একটু ওভার অ্যামবিশাস।'

'আচ্ছা, ও চায়টা কী?'

'আমার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা ওর পছন্দ নয়, ও চায় এক্ষুনি একটা ফোর হুইলার কিনি আমি।' দু-হাত মাথার ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙে অবিনাশ।

'ওর চাহিদাগুলো তো অমূলক নয়। মণিও তো দেখছে, তোর সেম ডেজিগনেশনে থেকে অন্যেরা কী লাইফ লিড করছে। ও বেচারা জানবে কী করে, তার জন্যে তারা ডানহাত বাঁ-হাত দুটোকেই কেমন সব্যসাচীর মতো ব্যবহার করছে।'

অবনীশ হাসে।

সুবিমল আবার বলে, 'কিছু মনে করিস না অবনীশ, তোর এই সাধু হয়ে থাকার কোনও দাম নেই সমাজে। কেন যে এমন সততার প্রতীক হয়ে বসে আছিস কে জানে! এ বাজারে কে সৎ ভাই?'

'হুঁ।'

'হুঁ মানে?'

'আমার সমস্যাটা আসলে আলাদা।'

'কীরকম?'

'তোর আজকের এই কথাগুলো আমিও ভাবা শুরু করেছিলাম সুবিমল। ভালোমানুষের অচল খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসব, সে সিদ্ধান্তও পাকা করে ফেলেছিলাম মনে মনে। কিন্তু...'

'কে বাধ সাধল, চ্যাটার্জি?'

'না।'

'তবে?'

'দুটো চোখ।'

'কী?' অবাক হয়ে বলে সুবিমল।

'দুটো চোখ সবসময় নজরদারি করে বেড়াচ্ছে আমার ওপর।'

'কী যা তা বলছিস?'

'সত্যি বলছি।' বলে সুবিমলকে চোখদুটোর ব্যাপারে সব কথা জানায় অবনীশ। 'তুই তো ইউনিয়নের কত্তা গোছের লোক। সব ডিপার্টমেন্টেই ঘুরিস-টুরিস। খোঁজ নিয়ে দেখিস তো, আমাদের ওপরে স্পায়িং করার জন্যে কোম্পানি কোনও অত্যাধুনিক ডিভাইস-টিভাইস...'

কিছুক্ষণ হাঁ করে একদৃষ্টিতে অবনীশের দিকে তাকিয়ে থাকে সুবিমল। তারপর নরম গলায় বলে, 'কাজের স্ট্রেস তোকে গিলে খেয়ে নিচ্ছে অবনীশ। চ্যাটার্জি খারাপ সাজেশন দেয়নি। সত্যিই দু-চারদিন ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে আয়। আর পারলে যত দ্রুত সম্ভব, একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কনসাল্ট করে নে। এসব কেসে ঠিকঠাক কাউন্সেলিং কিন্তু দারুণ কাজ দেয়।'

বাস থেকে নেমে একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল অবনীশ। রাস্তার পাশে ওই তো সেই হলুদ ফুলে ছাওয়া রাধাচূড়া গাছটা। একটু দুরেই লাল হয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া। পিছনে মাঠ। মাঠের ওধারে শান বাঁধানো পুকুর।

প্রায় দুই যুগ পরে রূপনগরে এল অবনীশ। তবু গ্রামটা যেন আজও একইরকম মায়াবী। এই গ্রামেই শৈশব কেটেছে অবনীশের। প্রথম যৌবনেরও কিছুটা। কত বিচিত্র স্মৃতি যে জমা হয়ে আছে এই গ্রামের বাতাস মাটি জলে। সেই স্মৃতি ঠেলতে-ঠেলতে পথ হাঁটতে লাগল অবনীশ। ভ্যাপসা গরম। ঘাম গড়াচ্ছিল পিঠ বেয়ে। কপালের পাশ দিয়ে। তবু অসম্ভব ভালো লাগছিল অবনীশের।

মনে মনে সে চ্যাটার্জিকে থ্যাংকস জানাল। মণিদীপাকেও। শেষ ক'দিন ধরে মণি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কেমন অদ্ভুত ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে থাকত অবনীশের দিকে। ওর ধারণা, অবনীশের মস্তিষ্কবিকৃতি দেখা দিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ উন্মাদও হয়ে যেতে পারে সে। এমন একটা মানুষের সঙ্গে বাকি জীবনটা কী করে কাটাবে সে! ইদানীং সুযোগ পেলেই নানান প্রশ্ন করে অবনীশকে যাচাই করছিল সে। বোঝার চেষ্টা করছিল, এখনও কতটুকু সুস্থ আছে অবনীশ। সে প্রশ্নে উদবেগ যেমন আছে, ভালোবাসাও আছে হয়ত। কিন্তু সেসবের কিছুই আর স্পর্শ করছিল না অবনীশকে।

মণি যখন তাকে রূপনগরে একা আসার পরামর্শ দিল তার সঙ্গ এড়িয়ে যাবার জন্যেই মূলত, অবনীশ খুশিই হয়েছিল মনে মনে। তার নিজেরও মনে হয়েছিল, এই জটটা তার একারই খোলার চেষ্টা করা উচিত। এই লড়াইয়ে অন্য কারো না থাকাই ভালো।

কালো পিচের রাস্তা থেকে বাঁ-দিকে বেঁকে লাল মোরাম বিছনো গ্রামের পথ ধরল অবনীশ। প্রামাণিক আর চক্কোত্তিদের বাড়ির পাশের নাবাল জমিটা পেরোলেই ডান হাতে মিত্তিরদের মস্ত শান বাঁধানো পুকুর।

পুকুরের কাছে এসেই যেন একেবারে থ মেরে গেল অবনীশ। হৃদপিণ্ডে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ল। এতদিন পরে আবার দেখা। তবু একবার দেখেই চিনতে পারল অবনীশ! গায়ে ভিজে কাপড় জড়িয়ে শ্লথ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ঘাটের ওপরের দিকে উঠে আসছে রুমি।

সেই রুমি, যাকে একবার দেখার জন্যে দিনে পঁচিশবার তার বাড়ির সামনে নানান অছিলায় ঘুরপাক খেত সে একসময়। শুধুমাত্র চোখের দেখা আর রুমির তাকে দেখে চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে গালে টোল ফেলে মিষ্টি হাসির লোভে। কিন্তু কলেজে ভর্তির সময়ে সেই যে গ্রামের পাট চুকিয়ে বাবার সঙ্গে শহরে চলে এল, তারপরে তার পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেল একেবারে। সেই পৃথিবীতে তখন রুমির জন্যে ভাববার আর সময় রইল না। পরে, অনেক পরে রুমির বিয়ের খবর পেয়েছিল সে। বিয়ে ভাঙার খবরও।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল অবনীশ। রুমির জীবনের এই বিপর্যয়ের জন্যে সে নিজেও কি তাহলে খানিক দায়ী?

রুমি মাথা নীচু করে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। অবনীশকে খেয়াল করেনি। রুমি পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় সেই পরিচিত গন্ধটা আজ এত দিন পরে আবার আবার নাকে এসে লাগল অবনীশের। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। রুমির গন্ধ। মণির গন্ধের থেকে এই গন্ধ সম্পূর্ণ আলাদা। অবনীশ গভীর শ্বাসে সেই গন্ধ একেবারে ফুসফুস পর্যন্ত টেনে নিল। তারপর প্রায় সম্মোহিতের মতো ডাকল, 'রুমি।'

রুমি থমকে দাঁড়াল। চমকেও গেল। ডাকটা খুব চেনা। কিন্তু এই ডাকটার ওপরে পলি পড়ে গেছে এখন। পিছিয়ে এসে মুখ তুলে চাইল সে অবনীশের দিকে। তারপর অবাক হয়ে বলল, 'অবুদা, তুমি! না ডাকলে তোমাকে যে চিনতেই পারতাম না। কতদিন পরে আবার তোমায় দেখলাম!'

'বছর বাইশ-তেইশ হবে বোধহয়। কিংবা আরও একটু বেশি।' অন্যমনস্ক গলায় বলে অবনীশ।

'তা হবে।' রুমি আগের মতোই গালে টোল ফেলে হাসল। 'তা হঠাৎ এতদিন বাদে এই পোড়া গ্রামে ফিরলে যে! দেশের বাড়ির জায়গা জমি, সম্পত্তির ভাগ নিতে এসেছ বুঝি?'

'সম্পত্তির ভাগ?' অবাক হয়ে বলে অবনীশ।

'সে বাপু যাই বলো আর যত দূরেই সরে যাও, নিজের সম্পত্তির ভাগ কি কেউ ছেড়ে দেয়?' রুমির চোখে একটা অদ্ভুত কৌতুক।

'আমি সে জন্যে আসিনি রুমি।'

'ভাগ ছেড়ে দেবে তাহলে?' বলে খিলখিল করে হেসে উঠল রুমি, 'তা তুমি অবশ্য পারো বাপু...'

অবনীশের কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। প্রসঙ্গ পাল্টাতেই সে জিগ্যেস করল, 'কেমন আছ রুমি?'

'খুব ভালো আছি গো।'আবার হেসে গড়িয়ে পড়ল রুমি, 'ভাইয়ের সংসারে খেদমত খেটে পরনের কাপড়, মাথার তেল, পেটের ভাত সবই জুটে যাচ্ছে এখনও। তা এর বেশি আর কী চাই বলো? আর চাইও যদি, দেবে কে?'

অবনীশ দু-চোখ ভরে রুমিকে দেখছিল। বছর চল্লিশের রুমি কিন্তু এখনও নিটোল, ভরভরন্ত। শরীর একটুও টাল খায়নি। মণির থেকে বেশি বয়েসি এবং কম সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও, রুমি তাকে যেন বড্ড বেশি টানছে।

রুমি তার মুখের দিকেই তাকিয়েছিল। হঠাৎ সে তাড়া লাগাল, 'এ ভাবে রাস্তায় ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়ে কি গল্প করা যায় অবুদা? তারচে' বাড়ি চলো। বাড়িতে আর কেউ নেই আজ। আমি একেবারে একা। এক্ষুনি গিয়ে ভাত না চড়ালে হরিমটর খেয়ে থাকতে হবে আজ। ভালোই হল, তুমিও চলো। আজ না হয় আমার ওখানেই পাত পাড়বে। কতদিনের ইচ্ছে, তোমায় রান্না করে সামনে বসিয়ে খাওয়াব...'

বুকের মধ্যে ছলাৎ করে উঠল অবনীশের। রুমি কেন বলল, বাড়িতে ও একেবারে একা? ও কি বিশেষ কোন ইঙ্গিত দিতে চাইল অবনীশকে?

রুমির গায়ের গন্ধটা আবার যেন তীব্র হচ্ছে।

রুমি অবনীশের হাত ধরল, 'কই চলো। কথা দিচ্ছি, অতিথি আপ্যায়নের ত্রুটি রাখব না।'

রুমির গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে অবনীশ। ঠিক তখনই, ভিজে শাড়ি জড়ানো রুমির ভিজে ভিজে শরীরের পিছনে শূন্যে ভেসে উঠল সেই চোখদুটো। আয়ত, নিষ্পাপ। উজ্জ্বল কালো দু'চোখের তারা। চোখদুটো স্থির, নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অবনীশের দিকে।

রুমি বলল, 'কী হল, চলো। এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? গায়ে জল শুকিয়ে এক্ষুনি যদি একটা অসুখ বাঁধাই, কে সেবা করবে আমায়?'

'চলো', বলতে গিয়েও চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে যায় অবনীশ। নিজের ওপরে বিরক্তি আসে তার।

অবনীশের দিকে তাকিয়ে রুমি হাসে। বলে, 'তুমি কেমন পাল্টে গেছ অবুদা। তোমার চোখদুটোও কেমন যেন অন্যরকম লাগছে আজ।'

'এখন আমার তোমার সঙ্গে গেলে চলবে না রুমি। অনেক কাজ। বাড়ি যেতে হবে। কতদিন যাইনি বলো তো।'

'এই যে একটু আগে বললে কোনও কাজ নিয়ে নয়, এমনিই এসেছ?'

'না, মানে...'

'বুঝেছি।' বলে অবনীশের হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটা লাগায় রুমি। আর আনমনা অবনীশও পুরোনো অশ্বত্থগাছের পাশ দিয়ে দ্রুত পা চালায় বাড়ির দিকে।

সেই ছোট্টবেলা থেকেই কাকিমা ইন্দুবালা অবনীশকে বড় ভালোবাসেন। অবনীশও তাঁর ন্যাওটা ছিল খুব। যেদিন তারা এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, কাকিমা খুব কেঁদেছিলেন। অবনীশও লুকিয়ে কেঁদেছিল। ভেবেছিল কাকিমাকে ছেড়ে কী করে সে থাকবে এরপর। অথচ সময় সবই সইয়ে দেয়। বাবা মারা যাবার পর কাকিমা কলকাতার বাড়িতে গিয়ে ছিল ক'দিন। মা মারা যাবার পরেও এসেছিল একবার। কিন্তু অবনীশ এত বছরে একবারও এ বাড়িতে আসেনি আর। কাকা, কাকিমা, রুমি, সকলের জন্যেই তার সেই হেউঢেউ ভালোবাসাটা কেমন ফিকে হয়ে গেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।

এতকাল পরে অবনীশকে দেখে ইন্দুবালা কেঁদে ফেললেন। অনুযোগের সুরে বললেন, 'হ্যাঁ রে অবু, তুই এত নিষ্ঠুর কী করে হলি রে? এত বছরে একবারও আমাদের কথা মনে পড়ল না তোর?'

অপ্রস্তুত অবনীশ হাসল, 'মনে পড়ে বলেই তো এলাম কাকিমা।'

'বেশ করেছিস। তা বউমাকেও তো সঙ্গে আনতে পারতিস?'

'কিন্তু আমার যে একা আসতে ইচ্ছে হল কাকিমা'

কেমন যেন সন্দেহ হয় ইন্দুবালার। চাপা গলায় জিগ্যেস করেন, 'বউমার সঙ্গে কি কিছু অশান্তি বাঁধিয়ে চলে এসেছিস?'

'উঁহু।'

'তবে?'

'ক'দিন ধরে একটা জিনিস হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি কাকিমা।'

'কী এমন জিনিস রে অবু?'

'দুটো চোখ। আয়ত, নিষ্পাপ।'

'তোর কী হয়েছে রে অবু?'

'ওই চোখদুটোকে চিনতে না পারলে আমি পাগল হয়ে যাব কাকিমা!'

'কেন?'

'ওই চোখদুটো ক্রমশ জিনা হারাম করে দিচ্ছে আমার...'

'সে আবার কী কথা?'

'ওদের সঙ্গে একটা শেষ বোঝাপড়া আমাকে করতেই হবে!' দাঁতে দাঁত পিষে বলে অবনীশ।

ইন্দুবালা হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন অবনীশের দিকে। তারপর ভয় পাওয়া গলায় বলেন, 'তুই ঠিক নেই অবু। ভয়ংকর কিছু একটা গোলমাল রয়েছে তোর মধ্যে। তোর মুখ, চোখ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে আমার!'

বড় জানলাটা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। অবনীশ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়েছিল। আড়াই দশক আগেও দোতলার পুব দিকের একেবারে প্রান্তের ঘরটাতেই সে থাকত। ঘরটা একইরকম আছে এখনও। জানলার বাইরের জগতটাও প্রায় একই। কাকিমা পরিপাটি করে বিছানা করে রেখেছেন অবনীশের জন্যে। ঠিক যেমনটা তার মা রাখতেন।

বিছানা থেকে উঠে উত্তরের দেওয়ালে টাঙানো মস্ত আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল অবনীশ। সকলেই বলছে সে নাকি পালটে গেছে। সত্যিই কি? নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে অবনীশ। সোজা দাঁড়িয়ে, পাশ ফিরে। ক্রমশ বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে তার। কী যেন একটা গরমিল। হ্যাঁ, সত্যিই কী যেন একটা হারিয়ে গেছে তার অবয়ব থেকে। কী হারিয়ে গেল? অবনীশের মন খারাপ হয়ে যায়। অলস ভঙ্গিতে সে ধপ করে বিছানায় এসে বসে আবার। আর তখনই ঠাকুরমার ছোট্ট টিনের বাক্সটার দিকে নজর পড়ে।

দরজার মাথায় অর্ধগোলাকৃতি কুলুঙ্গির মধ্যে রাখা রয়েছে বাক্সটা। কতদিন হাত পড়েনি ওটায় কে জানে! বাক্সটার গায়ে পুরু ধুলোর আস্তরণ। কখনও এমন হয়নি, কিন্তু আজ বাক্সটাকে খুলে দেখার জন্যে ভারি কৌতূহল হল তার।

বিছানা থেকে নেমে হাত বাড়িয়ে দরজার মাথা থেকে বাক্সটাকে ঘরের মেঝের ওপরে নামিয়ে আনল অবনীশ। ধুলোয় ভরতি হয়ে গেল হাত। টিনের বাক্সটার ঢাকনা চটপট খুলে ফেলল সে। বাক্সের ভেতরে তার ঠাকুরদার লেখা কয়েকখানা চিঠি, ঠাকুরমার একটা হিসেব লেখার খাতা আর দাদুর সঙ্গে একটা সাদা কালো ছবি। এছাড়া রয়েছে কিছু অচল খুচরো পয়সা আর একটা ভাঁজ করা লালচে কাগজ।

অবনীশ কৌতূহলে ভাঁজ খুলে ফেলল কাগজটার। ভেতরে আর একটা সাদা-কালো ছবি। বছর দুই বয়েসের এক উলঙ্গ শিশুর। তার মাথা বোঝাই ঝাঁকড়া চুল। ছবির অনেকটাই আবছা হয়ে গেছে। তবু ছবির শিশুটার চোখের দিকে তাকিয়েই অবনীশ চমকে উঠল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। এ কী করে সম্ভব! এই তো সেই চোখ। আয়ত, নিষ্পাপ চোখ। গভীর কালো আর উজ্জ্বল চোখের মণি।

ছবিটা হাতে নিয়ে দৌড়ে নীচে নেমে আসে অবনীশ। কাকিমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর চোখের সামনে মেলে ধরে ছবিটা। তারপর উত্তেজনায় হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করে, 'এ ছবিটা এখানে কী করে এল কাকিমা? ছবিটা কার?'

অবাক দৃষ্টিতে ইন্দুবালা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর অবনীশের মাথায় হাত রেখে বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, 'তুই এতটাই বদলে গেছিস অবু? নিজেকেই চিনতে পারছিস না আর!'

ইন্দুবালার শেষ কথাটায় সারা শরীর কেঁপে উঠল অবনীশের। সত্যিই তো, এতদিনে সে নিজেকেই চেনেনি! আপশোসের জ্বালায় মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল তার।

ছবিটাকে হাতে নিয়ে দ্রুত ওপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকল অবনীশ। শালা পাপ, মনের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থেকে এতদিন সততার লোভের ভেল্কি দেখাচ্ছিল! মহান হবার লোভও যে আসলে পাপেরই জন্মদাতা, এই সত্যটা এতদিন ভুলে মেরে দিয়েছিল সে? নিষ্পাপ সততার ভড়ং নিয়ে লোভের চক্কর ঠেলা এতই সহজ? তার চেয়ে মুখোশ ছিঁড়ে ন্যাংটো হওয়ার মধ্যেই আসল সততা।

দ্রুত গোছগাছ করতে শুরু করল অবনীশ। আর রূপনগরে পড়ে থেকে লাভ নেই। অফিসে অনেক কাজ। আর হ্যাঁ, যাবার পথে রুমির কাছ থেকেও ঘুরে যেতে হবে একবার।

টাকার লোভ, কামের লোভ, সততার লোভ সবই তুল্যমূল্য ঠেকল অবনীশের কাছে। পুরোনো, আবছা হয়ে যাওয়া ছবিটা টুকরো-টুকরো করে জানলা দিয়ে বাইরের খোলা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল অবনীশ।

অবনীশের আর এখন কোনও অসুখ নেই। সকাল দশটায় অফিসে ঢুকতে গিয়ে নজর পড়ল অনিল মোদকের দিকে। লোকটা ঘাগু, কিন্তু ভিজে বেড়ালের মতো বসে আছে। হালকা হেসে তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিজের চেম্বারে গিয়ে বসল অবনীশ। তারপর মোদকের টেন্ডারের ফাইলটা টেনে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল।

উল্টোদিকের চেম্বারে মোদক এসে বসতেই, অবনীশ সরাসরি মোদকের চোখের ওপরে চোখ রাখল, 'আমার পার্সেন্টেজটা রেডি তো?'

'আজ্ঞে, হ্যাঁ স্যার', ক্ষয়ে যাওয়া লাল দাঁত বের করে মোদক হাসল।

'গুড। ওটা আজ হাতে পেয়ে গেলে কালই আপনার ফাইলটা ছেড়ে দেব।'

অধ্যায় ১১ / ১১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%