জয়দীপ চক্রবর্তী

রাবাংলা থেকে পেলিং বেশি দূর নয়। পরিমল ঘোষ, রা বাংলা হোটেলের ম্যানেজারই বললেন, 'বেশি তাড়াহুড়োর এক্কেবারেই দরকার নেই। ধীরেসুস্থে তৈরি হোন। ব্রেকফাস্ট খেয়ে রওনা হয়ে যাবেন দশটা সাড়ে দশটার দিকে। চাইলে লাঞ্চ করেও বেরোতে পারেন। বড়জোর ঘণ্টা দুই-আড়াইয়ের জার্নি। আপনারা যেমন বলবেন তেমন সময়েই গাড়ি অ্যারেঞ্জ দেওয়া যাবে।'
এই পরিমল ঘোষ ভদ্রলোকটি ভারি অমায়িক। ব্যবহারটিও ভীষণ আন্তরিক। আদতে শ্রীরামপুরের মানুষ। বছর দুই হল এই হোটেলের ম্যানেজারের দায়িত্বে রয়েছেন। আগে একটা চাকরি করতেন কলকাতায়। প্রাইভেট কোম্পানিতে। সে চাকরিটা চলে যায়। ফোর্সড রিটায়ারমেন্ট। অনেক কষ্টে এই কাজটা জুটেছে। কথায় কথায় বললেন, 'বাড়ি যেতে পারি না। পরিবারের কাছে যাওয়া বলতে সেই ডিসেম্বার জানুয়ারি। ওই সময়েই যা এখানে টুরিস্টের চাপ খানিক কম থাকে।'
'কত দিনের ছুটি পান তখন?' রুচিরা জিগ্যেস করে তাকে।
'বেশি দিন নয় ম্যাডাম', পরিমল ঘোষ হাসেন, 'বড়জোর সপ্তা খানেক।'
'কেন? ওই সময় তো টুরিস্ট থাকে না এখানে বলছেন?' আবার বলে রুচিরা।
'দু-একজন এসে যেতেও পারে', ভাস্কর মৃদু গলায় বলে রুচিরাকে, 'কিছু খ্যাপা মানুষ তো থাকেনই চিরকাল। ঠান্ডা জায়গায় ঘোর শীতে এসে থাকতে চান কেউ কেউ।'
রুচিরা একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ভাস্করের দিকে। দুদিন হল এসেছে এখানে। ট্রেনে ওঠা থেকেই রুচিরা লক্ষ্য করেছে ভাস্কর অস্বাভাবিক গম্ভীর এবং অন্যমনস্ক। কথাও বলছে খুবই কম। এমনিতেই সে অল্প কথার মানুষ। চাপা, অভিমানী, উদাসীন। বিয়ের পর থেকে এই চার বছরে রুচিরার কখনও মনে হয়নি, ভাস্কর তার ভালো-মন্দ, চাওয়া না-চাওয়া নিয়ে কখনও সিরিয়াসলি ভেবেছে এতটুকু। রুচিরার কত কী বলতে ইচ্ছে হয়েছে তার সঙ্গে, কিন্তু বলা হয়নি। মনে হয়েছে ভাস্কর তার সঙ্গে থেকেও যেন অনেক দূরে।
তবে এবারে ভাস্করকে একেবারে অন্যরকম লাগছে রুচিরার। অথচ রা বাংলা আর পেলিং বেড়াতে আসার পরিকল্পনাটা সম্পূর্ণই ভাস্করের। রুচিরা বারণ করেছিল। বলেছিল, 'এখন থাক। আমার একটু অসুবিধে আছে এই সময়। পরে কখনও যাব না হয়।'
'স্কুলে ছুটি না পাবার তো কারণ নেই। তোমার তো এবছরে এক দুটোর বেশি সি এল খরচা হয়নি। আমরা বেশি জায়গায় যাব না। বেশিদিনও ঘুরব না। রা বাংলা দুদিন, পেলিং দুদিন ব্যাস। তুমিই না বলেছিলে, আর একবার আমার সঙ্গে ওখানে যেতে চাও তুমি?' ভাস্কর নরম গলায় বলেছিল স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে।
সেই চাউনিতে কী যেন ছিল। রুচিরা জোর করে নিজের অসম্মতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সেই দৃষ্টির বিপ্রতীপে গিয়ে।
আগেরবার যখন রা বাংলায় এসেছিল রুচিরা, তখনও এই হোটেলেই এসে উঠেছিল। দোতলার ঠিক এই ঘরটাতেই ছিল তারা। পরিমল ঘোষ অবশ্য ছিলেন না তখন।
বেডরুম লাগোয়া ছোট্ট ব্যালকনি। ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই বাঁ-দিক ঘেঁষে রাস্তার উল্টোদিকের বুদ্ধ পার্কের বুদ্ধমূর্তিটা দেখা যায়। সামনের দিকটা নয়, মূর্তির পিছন দিকটা।
সে বছর চারেক আগের কথা। ওটা ছিল রুচিরার হনিমুন ট্রিপ। বুদ্ধমূর্তিটার দিকে চেয়ে সেবার অস্বস্তি হয়েছিল রুচিরার। মুখ দেখতে পাচ্ছে না বলে। এবারেও হল। ভাস্করকে হোটেলে পৌঁছেই বলেছিল, 'এই মূর্তিটাকে দেখলেই আমার মনের মধ্যে অস্বস্তি হয়।'
'কেন?'
'ওর মুখ দেখতে পাই না বলে।'
'নাই বা দেখলে।'
'মুখের দিকে না তাকালে একটা মানুষকে চিনতে অসুবিধা হয়।'
'মুখের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে থেকেও কি একটা মানুষকে চেনা যায় ঠিক মতন?' ভাস্কর হেসেছিল, 'ঠিক আছে, কাল সকালে আমরা হাঁটতে হাঁটতে পার্ক থেকে ঘুরে আসব দুজনে। আগেরবার যেতে পারিনি। কী প্রবল বৃষ্টি ছিল সেবার...'
'মনে আছে তোমার?'
'আছে। তুমি ভুলে গেছিলে নিশ্চয়ই?'
'কী মুশকিল, আমিই বা ভুলে যাব কেন?'
ভাস্কর আর উত্তর দেয়নি সে কথার।
ঘরের বিছানাটা বড়সড় ছিল। গভীর রাতে বৃষ্টি নেমেছিল। ভাস্কর ঘনিষ্ঠতা চেয়েছিল। রুচিরাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিল দু-হাত দিয়ে। রুচিরা শান্ত গলায় গলায় বলেছিল, 'না।'
ঘরের হালকা নীল আলোয় রুচিরা দেখল ভাস্করের মুখে সেই মৃদু হাসিটা খেলা করছে আবার যেটা বেড়াতে আসার শুরু থেকে মাঝেমধ্যেই ফুটে উঠছে তার মুখে। খুব অচেনা আর রহস্যময় সেই হাসি। ভাস্কর একবারও জোর করল না। হাত সরিয়ে নিল। রুচিরা অস্ফুটে বলল, 'এখন না। অসুবিধা আছে।'
'কী অসুবিধা', একবারও জিগ্যেস করল না ভাস্কর।
পরিমল ঘোষ আবার জিগ্যেস করলেন, 'গাড়ি কখন লাগাব বলুন? লাঞ্চের পরে?'
'উঁহু', দুদিকে মাথা নাড়ায় ভাস্কর, 'অতটা দেরি করতে চাইছি না। ওয়েদার খারাপ হচ্ছে ক্রমাগত। জুন মাসের আগেই মেঘে ঢেকে গেছে এবারে সিকিমের পাহাড়। বেলা গড়িয়ে গেলে রাস্তায় বৃষ্টি এসে যেতে পারে। আমি বৃষ্টি নামার আগে হোটেলে পৌঁছে যেতে চাই।'
'হোটেল আপার পেলিং-এ নাকি লোয়ারে?'
'আপার।'
'আচ্ছা। ক'টায় গাড়ি বলব তাহলে বলুন।'
'দশটা থেকে সাড়ে দশ।'
'ওকে।'
'রাস্তার কন্ডিশন কেমন পরিমলবাবু?' রুচিরা জিগ্যেস করে, 'খুব বেশি জার্কিং হবে কী?'
'না না, এদিকে রাস্তা খুবই খুবই ভালো। আরামসে পৌঁছে যাবেন। তবে ওখানে গিয়ে যদি খেচিপেরি লেক টেকের দিকে ঘুরতে যান তাহলে একটু এবড়োখেবড়ো রাস্তা পেতে পারেন।' পরিমল মাথা নেড়ে বলেন।
'আচ্ছা।' রুচিরাও মাথা নাড়ে।
'যাবেন তো লোকাল স্পট ঘুরতে?' জিগ্যেস করেন পরিমল।
'দেখা যাক।' রুচিরা হাসে। ভাস্করও।
পেলিং পৌঁছে খুব মন খারাপ হয়ে গেল রুচিরার। ভাস্করের দিকে চেয়ে সে বলল, 'চারদিকে কী মেঘ দেখো। কাঞ্চনজঙ্ঘা একটুও দেখা যাচ্ছে না।'
'হুঁ।' ছোট্ট করে জবাব দেয় ভাস্কর।
'মেঘ কি কাটবে মনে হয়?'
'এত মেঘ' গলা কেঁপে যায় ভাস্করের, 'এই জমাট মেঘ কি সহজে কাটে রুচিরা?'
রুচিরা ভাস্করের গলা শুনে চমকে ওঠে। তাকে রুচিরা বলে কেন ডাকছে ভাস্কর? সে তো তাকে রুচিরা বলে না? সে তো রুচি বলে ডাকে তাকে। তাহলে? আবার আকাশের দিকে তাকায় রুচিরা। প্রাণপণে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুঁজতে থাকে সে। কিন্তু মেঘ বড্ড জমাট। সত্যিই স্তরের পর স্তর মেঘ জমে মেঘের পাহাড় তৈরি হয়েছে যেন আজ। সেই ঘন মেঘের আড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুঁজে বের করা অসম্ভব!
কেন কে জানে, বুকের মধ্যে কান্না জমছিল রুচিরার। সে জানে এই সময় এতখানি মন খারাপ বয়ে বেড়ানো ঠিক নয়, তবু নিজেকে সামলাতে পারছিল না সে। সামনে ক্রমশ নীচের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে কেবলই মনে হচ্ছিল তার কী একটা যেন ঘটতে চলেছে তার জীবনে। কী একটা যেন তার অজান্তেই এই ঢালু রাস্তা দিয়ে গড়াতে গড়াতে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত। রুচিরা সেই গড়িয়ে দূরে আরও দূরে চলে যাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, বেশ বুঝতে পারছিল মনে মনে।
টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ফ্যাকাশে রঙের মেঘ তার শরীর ভিজিয়ে দিয়ে উড়ে উড়ে অন্ধকার করে দিচ্ছে আশপাশ। রুচিরা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সামনের আকাশ আরও অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা আরও অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।
ভাস্কর রুচিরার হাতে আলতো হাত ছুঁইয়ে বলল, 'চলো ঘরে যাই। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। জোরে বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে এইবার। আমার শীত করছে।'
ঘরের এক দিকে মস্ত কাচের জানলা। জানলার পাশেই দুদিকে সোফা সেট। মাঝখানে টি টেবিল। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখানে বসেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়। আজ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভাস্কর রুচিরার দিকে চাইল, 'চা বলি?'
'হুঁ।' মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে রুচিরা।
'দাঁড়াও নীচে গিয়ে বলে আসি।' অন্যমনস্ক গলায় বলে ভাস্কর। তারপর নীচে নেমে যায় সিঁড়ি বেয়ে।
নীচে মকবুল নামে একটি ছেলে আছে। রান্নাবান্না করে। উত্তর চব্বিশ পরগনায় বাড়ি। খুব চটপটে। মিলুক মিশুকও। ভাস্কর তার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ফিরল। মকবুল ফর্সা ধপধপে দুটো কাপে যত্ন করে চা ঢেলে টি টেবিলে রাখল। দুধ, চিনি রাখল আলাদা করে। রুচিরার দিকে চেয়ে বলল, 'স্ন্যাক্স কিছু লাগবে?'
'উঁহু।' দুদিকে মাথা নাড়ায় রুচিরা।
'বিস্কুট?'
'না লাগবে না। আমার ব্যাগে আছে। আপাতত সেগুলোর সদগতি করি।' রুচিরা হাসে।
মকবুল ফিরে গেলে ভাস্কর রুচিরার উল্টোদিকের সোফায় বসে। রুচিরা তখন মাথা নীচু করে চায়ে দুধ চিনি মিশিয়ে চামচ দিয়ে গুলছিল। ভাস্কর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, 'সেবারেও তোমাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাতে পারিনি। তুমি বলেছিলে আর একবার এখানে আসবে আমার সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখবার জন্যে। কিন্তু দেখো এবারেও হল না। আমাদের দুজনের একসঙ্গে ওই সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড়ানো এ জন্মে আর হল না রুচিরা।'
'এমন করে কেন বলছ?'
'দেখো এখনও সব কেমন মেঘে ঢেকে আছে!'
'মেঘ সরে যাবে।'
'কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যাবে যে! আমাদের যে অপেক্ষা করার মতন পর্যাপ্ত সময় হাতে নেই...'
'কাল সকালটাও তো হাতে আছে আমাদের।'
'সকালে মেঘ কাটবে কী?' ভাস্কর ম্লান হাসে, 'এ মেঘ ক্রমশ আরও অনেক গাঢ় হবে বলেই মনে হচ্ছে আমার। এ মেঘ কাটবার নয়।'
'তোমাকে যেন কেন আমার অন্যরকম লাগছে।' ভাস্করের দিকে স্থির চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে রুচিরা।
'কেন?'
'জানি না।'
'তুমি আমার দিকে এখনও এমন করে তাকাও? আমার মধ্যের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো এখনও চোখে পড়ে তোমার?'
'মানে?'
উত্তর না দিয়ে রুচিরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ভাস্কর।
ভাস্করের চোখদুটো কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে রুচিরার। সে ভেবেছিল আজ ভাস্করকে খবরটা জানাবে। এই ক'মাস জানায়নি ইচ্ছে করে। প্রথমে ভেবেছিল ভাস্কর নিজেই বুঝবে। তারপর খুব অভিমান হয়েছিল ওর ওপরে। আজ এই মেঘলা পাহাড়ে ভাস্করকে ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করল রুচিরার। কিন্তু ভাস্করের এই চোখের দিকে চেয়ে সে থমকে গেল। ভয় করে উঠল। মনে হল এই ভাস্করকে এসব কথা বলা যায় না।
রুচিরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম আসছিল না ভাস্করের। খুব অস্থির লাগছিল তার। মনে হচ্ছিল এতটা শাস্তি সত্যিই কি দেওয়া উচিত রুচিরাকে? নাকি এবারের মতন ক্ষমা করে দেবে তাকে? রুচিরাকে সে তো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাতে পারেনি। অথচ ভাস্কর কথা দিয়েছিল শুয়ে থাকা বুদ্ধমূর্তির মতন দেখতে কাঞ্চনজঙ্ঘার রং-বেরঙের চূড়া সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখাবে রুচিরাকে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কাল যদি সত্যিই রুচিরা মরে যায় তাহলে সে সারা জীবনের মতন মিথ্যেবাদী হয়ে থাকবে রুচিরার কাছে। মিথ্যেকে বড় ঘেন্না ভাস্করের। আর সেইজন্যেই, শুধু সেইজন্যেই রুচিরার জন্যে মৃত্যুদণ্ড স্থির করেছে সে।
রুচিরাকে কখনও সন্দেহ করার কথা মনেই হয়নি ভাস্করের। সে তাকে অনন্ত স্বাধীনতা দিয়েছিল। কিন্তু সে স্বাধীনতার মর্যাদা রাখেনি রুচিরা। অফিসে তার ব্যস্ততা গত বছর খানেক ধরেই ভয়ংকর রকমের বেড়েছে। আর শেষ মাস ছয়েক তো বলতে গেলে দম ফেলবারই ফুরসত পায়নি সে। আর সেই সুযোগেরুচিরা...।
গত মাস চারেক ধরে ওর স্কুলের কলিগ রাজন্য সেনের সঙ্গে রুচিরার মাখামাখিটা বড্ড বেড়েছে। রুচিরা তাকে লুকিয়ে প্রায়ই রাজন্যর সঙ্গে বেরোচ্ছে আজকাল। যেদিন ওকে খবরটা প্রথম দিয়েছিল ওর পাড়ার শৈলেনদা, বিশ্বাস করেনি ভাস্কর। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছে শৈলেনদা মিথ্যে বলেনি। ভাস্কর বাড়িতে না থাকাকালীন কেন আসে রাজন্য? তাকে লুকিয়ে রুচিরা কোথায় যায় রাজন্যর সঙ্গে?
মাথা ভারী হয়ে আসে ভাস্করের। গত তিন-চার মাস বিছানায় ক্রমাগত ভাস্করকে প্রত্যাখ্যান করেছে রুচিরা। কেন? সে কি রাজন্যর মতন অতখানি সুখ দিতে পারে না রুচিরাকে?
মাথার মধ্যেটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
রুচিরা ঘুমোচ্ছে। কম্বল সমেত তার ভারী বুক ওঠা নামা করছে প্রশ্বাস ও নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে।
'কাল তুমি হয়তো এ সময় আর বেঁচে থাকবে না রুচিরা', আপন মনেই বলে ওঠে ভাস্কর, 'কাল সকালে যদি রোদ ওঠে, আর মেঘের চাদর ফুঁড়ে একবার অন্তত যদি উঁকি মারে কাঞ্চনজঙ্ঘা...'
সকালে আকাশ ঝলমলে রোদে ভরে গেল। তবে পাহাড়ের মাথায় এখনও মেঘ। আশা করা যায় আর একটু বেলা বাড়লে কাঞ্চনজঙ্ঘা মুখ দেখাবে ঝলমলে সৌন্দর্য বিছিয়ে।
রুচিরা বলছিল যাবে না।
'কেন?' জিগ্যেস করল ভাস্কর।
'এবড়োখেবড়ো রাস্তায় বড্ড ঝাঁকুনি। আমার কষ্ট হবে।'
'তাতে কী? আর কবে আসতে পারব এখানে কে জানে!'
'না আসার কী আছে?' রুচিরা অবাক হয়ে তাকায় ভাস্করের দিকে, 'এলেই তো হয়।'
ভাস্কর মুখ টিপে হাসে। বলে, 'অন্তত খেচিপেরি লেক পর্যন্ত ঘুরে আসি চলো। বড় ভালো জায়গা।'
অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়িতে উঠছিল রুচিরা। ওঠার সময়েই ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছিল, 'সাবধানে চালাবেন ভাই। খারাপ রাস্তা এড়িয়ে যাবেন যতটা সম্ভব।'
গাড়িতে ওঠার আগে একটা জলের বোতলে ওষুধটা ঢেলে দিয়ে গুলে নেয় সে সন্তর্পণে। সাবধানে এটা রুচিরার হাতের কাছে রাখতে হবে। ওষুধটা মারাত্মক। অনেক কসরত করতে হয়েছে ওটা জোগাড় করার জন্যে। ওষুধ মেশানো জলটা খেলে দ্রুত অসাড় হতে থাকবে রুচিরার স্নায়ু। দুর্বল হয়ে যাবে শরীর। সেই সময়, সুযোগ বুঝে আলতো ঠেলায় কোনও একটা খাদে ফেলে দিলেই হল। দুর্ঘটনা বলে খুনটাকে চালিয়ে দিতে অসুবিধা হবার কথা নয়।
একটা লোহার সাঁকো পেরিয়ে ডানদিকে বেঁকে কিছু পথ এগিয়ে গাড়ি থেমে গেল। এখান থেকে একটু তফাতেই রাস্তার বাঁদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত। নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে তীব্র শব্দে ক্রমশ নীচের দিকে লাফিয়ে পড়ছে নীলচে সাদা জলের প্রচণ্ড স্রোত।
রাস্তাটা নির্জন। গাড়িঘোড়া মানুষজন বিশেষ নেই। পাশে মৃত্যু লিখে রাখা খাদ। ওই তো বাঁ-দিকের দরজা খুলে রুচিরা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে রাস্তার ওপরে। হ্যাঁ, পরিকল্পনা মতনই এগোচ্ছে সবকিছু। নীচে নামবার সময় তার পাশে গাড়ির সিটের ওপরে শুইয়ে রাখা জলের বোতলটাকে হাতে তুলে নিয়েছে সে।
মনে মনে উত্তেজনা বোধ করলেও মুখে স্বাভাবিক উদাসীন ভাবটা ধরে রাখল ভাস্কর। এই মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। সামান্য ভুলে নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই জড়িয়ে পড়তে পারে সে, ভাস্কর জানে।
রুচিরা এগিয়ে যাচ্ছে। ভাস্কর গাড়ি থেকে নামতে নামতেই টের পেল জিন্সের পকেটে রাখা সেল ফোনটা বেজে উঠেছে। একটু বিরক্ত হল সে। এই সময় আবার কে ফোন করছে? এখন ফোন টোন রিসিভ না করাই ভালো ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে একটু থমকে গেল ভাস্কর। ডক্টর ব্যানার্জি। বাবার আমল থেকেই ওদের হাউজ ফিজিশিয়ান। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ডক্টর ব্যানার্জি বলতে গেলে তাদের পরিবারেরই একজন।
'হ্যাঁ বলুন', ভাস্কর ফোন রিসিভ করে।
'তোমরা ঠিকঠাক আছ তো? বউমার কোনও অসুবিধা হয়নি তো পাহাড়ি রাস্তার জার্নিতে?'
'না না, অসুবিধা কেন হবে?' ভাস্কর অস্বস্তি বোধ করে মনের মধ্যে।
'না মানে, এই সময়টা তো সাবধানে থাকতে হয়...ইন ফ্যাক্ট এই আর্লি প্রেগন্যান্সি স্টেজে...'
'হোয়াট?' চিৎকার করে ওঠে ভাস্কর।
'তুমি এখনও জানো না? বউমা তো ঠিকই বলেছিল তবে। অফিস ছাড়া আর কিছুই তোমার প্রায়োরিটির মধ্যে পড়ে না আজকাল। রুচিরা ইজ ক্যারিং, নিয়ারলি ফোরটিন উইকস!'
'আসলে গত কয়েক মাস...'
'এটা কোনও এক্সকিউজ হতে পারে না ভাস্কর, যতই রাজন্য সঙ্গে করে তাকে রুটিন চেক আপ করিয়ে আনুক।'
'আপনি রাজন্যকে চেনেন?'
'ইয়েস! হি ইজ আ গুড গাই। আমার ভাগ্নে হয় সম্পর্কে। ভারি রেসপন্সিবল ছেলে। প্রথম দিন বউমা যখন আমার কাছে এল, ওকে একা দেখে খারাপ লেগেছিল আমার। ওর মুখেই তোমার ব্যস্ততার কথা শুনে আমি রাজন্যকে বলি ওকে নিয়ে ডক্টর নস্করের কাছে যেতে। আপাতত রুচিরাকে উনিই দেখছেন। আমার সঙ্গে ওঁর নিয়মিত কথা হয়।'
ভাস্করের কানে আর কোনও কথা ঢুকছিল না। রুচিরা অনেকখানি এগিয়ে গেছে। জলের বোতলটা সঙ্গে আছে ওর। সময় দ্রুত কমে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে খেয়াল করল ভাস্কর সকালে আকাশ যতই ঝকমকে দেখাক এখন আবার সামনের পাহাড়ে মেঘ জমছে। এক্ষুনি অন্ধকারে ঢেকে যাবে চারদিক।
ভাস্কর প্রাণপণে পা বাড়ালো সামনের দিকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা না দেখে কিছুতেই যাওয়া হতে পারে না রুচিরার...।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।