উৎসারিত আলো

জয়দীপ চক্রবর্তী

ছন্দাবউদিকে না দেখলে মালতি জানতেই পারত না। মালতি ভাবত শহরের এইসব পটের বিবির মতন বিস্তর পড়াশোনা করা আর সাজুগুজু করা মালকিনরা সকলেই মিত্তিরবউদির মতন গেরামভারী মানুষ।

যখন প্রথম কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে এল তখনই যমুনামাসি শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছিল। পইপই করে বলে দিয়েছিল, 'শোন মা মালতি, কাজ যদি টিঁকিয়ে রাখতে চাস তাহলে বাবুদের একটু সমঝে চলিস। আর বাবুদের থেকেও সমঝে চলবি বাড়ির বউদিগুলোকে। ওরা সব পয়সাওলা মানুষ। তাছাড়া বিস্তর পড়াশোনা করে চাকরি-বাকরি করা মেয়েমানুষ। জানবি ওদের সারা মাসের পাউডার লিপিস্টিকের খরচায় আমাদের আস্ত সংসার চলে যায়। আর হ্যাঁ, ওদের কাছে তুই আমি হলুম গিয়ে চোরের জাত। ঘর থেকে একটা সুতো হারালেও সন্দেহ করবে আমাকে, তোকে। কাজেই বুঝেশুনে না চললেই এক্কেবারে পস্তে যাবি বলে দিলুম। আর একটা কথা, পয়সা যা নিজের পেরাপ্য বলে মনে করবি, পাওনা গণ্ডা বুঝে নিবি ভালো করে। খবরদার মিষ্টি কথায় ভুলবি না! জানবি কাজের বাড়ির বাবু-বউদিরা কক্ষনও নিজের লোক হয় না। যত পিরিত ওই ওপরে ওপরেই।'

যমুনামাসির কথা শুনে খানিক হাসিই পেয়েছিল সেদিন মালতির। মনে হয়েছিল মানুষটার বয়েস হয়ে বড্ড খিটখিটে হয়ে গেছে। মায়া-টায়া শুকিয়ে এসেছে ভেতর থেকে। সব মানুষই কি আর একরকম হয়! তবে যমুনামাসিকে এসব বলেনি। শুধু হেসে বলেছে, 'ঠিক আছে গো, ঠিক আছে। তুমি যেমনটি বলে দিলে তেমনই চলব। দেখে নিও।'

'চললেই ভালো। না চললে তোরই মরণ, আমার আর কী? আমার তো তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। কার জন্যেই বা আটকে থাকব বেশিদিন। স্বামী কোন ছেলেবেলায় অন্য মাগি নিয়ে ভেগে পড়েছে। একটা ছেলে ছিল। লোকের বাড়ি গতর খেটে, চেয়েচিন্তে খেয়ে না খেয়ে মানুষ করলুম সেটাকে। কিন্তু হলে কী হবে, ওই বাপেরই তো ছেলে! কাজেই ডানাটি গজালো যেই, উড়ে গেল। আমার খোঁজটিও আর নেয় না। শুনেছি ব্যারাকপুরের দিকে নাকি বাড়ি করেছে। চাকরি করে কিনা, ঝি-মায়ের পরিচয় দিতে তার লজ্জা করবে না! কী বল?' আঁচলে চোখের জল মুছতে শুরু করে যমুনামাসি।

মালতির খুব কষ্ট হয় যমুনামাসিকে কাঁদতে দেখলে। মনে মনে সে ভাবে, হাতে কিছু টাকা এলে যমুনামাসিকে একখানা ভালো শাড়ি কিনে দেবে সে। আরও টাকা হলে মাসিকে বলবে, 'অনেক তো হল। আর কাজ করতে হবে না তোমায়। আমি তো আছি। এবার বিশ্রাম নাও তুমি।'

আসলে যমুনামাসির ওপরে তার বড় মায়া। যখন তার বছর ছয়েক বয়েস, বাবা মরে গেল। বছর পনেরো-ষোলো বয়েস হতেই দাদা বউদি পয়সার বিনিময়ে একটা দোজবরে মাতালের গলায় ঝুলিয়ে দিতে চাইল তাকে।

মালতি রাজি হয়নি বলে সে এক তুলকালাম কাণ্ড। মা বেঁচে ছিল বলে সে যাত্রা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল সে। কিন্তু মা মরতেই বুঝে গিয়েছিল মালতি যে দাদার সংসারে ঠাঁই হবে না তার।

সে সময় যমুনামাসি পাশে না দাঁড়ালে ভেসে যেত সে। এই বস্তিতে যমুনামাসিই নিজের ঘরে এনে তুলেছিল তাকে। কাজে ঢুকিয়েছিল এক রিটায়ার্ড ইস্কুল মাস্টারের বাড়িতে।

কাজ করতে-করতেই মালতি বুঝল যমুনামাসি খুব মিথ্যে কিছু বলেনি। হাজার হোক এত বছরের অভিজ্ঞতা এই লাইনে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি মন দিয়েই কাজ করত মালতি। নিজের ভেবেই। তাদের ছেলেটাকে কখনও পর মনে হয়নি তার। আর ছেলেটাও কচি গলায় পিমা পিমা করে যখন তার গলা জড়িয়ে ধরত দু-হাত দিয়ে, মালতির সারা জগৎ আলো হয়ে উঠত একেবারে।

তখনও যমুনামাসি সাবধান করেছিল তাকে। বলেছিল, 'পরের ছেলেকে নিজের ভাবতে যাসনি যেন। ছেড়ে চলে আসার সময় কষ্ট সইতে পারবি না।' এবারেও যমুনামাসির কথা শোনেনি মালতি। আর শোনেনি বলেই অমন অপমানটা হজম করে চলে আসতে হল তাকে মাথা নীচু করে।

দাদা বেরিয়ে গিয়েছিলেন ইস্কুলে রোজ যেমন যান। বউদি কোন বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিল সেদিন বাবুকে মালতির কাছে রেখে। ফিরে এসেই বউদি চিলচিৎকার জুড়ে দিল, 'মালতি ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে আমার হারটা কোথায় গেল?'

'আমি তো জানি না বউদি' খুব স্বাভাবিক গলাতেই বলেছিল মালতি।

কিন্তু বউদি শুনল না। আরও রুক্ষ স্বরে চেঁচিয়ে উঠে বউদি বলল, 'তুমি না জানলে জানবেটা কে শুনি? আর কে ছিল বাড়িতে সারাদিন? ভালোয় ভালোয় বের করে দাও হারটা, নইলে আমি তোমাকে পুলিশে দেব বলে রাখলাম। যদি ভাবো আমার হার নিয়ে পালিয়ে যাবে, সে গুড়ে বালি। যেখানে গিয়েই লুকোও, পুলিশ তোমাকে ঠিক খুঁজে বার করবে, জেনে রেখো!'

কী জ্বালা! হারের খবর কী করেই বা জানবে মালতি। মাথা নীচু করে সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছিল সে। মনে বিস্তর ভয়। সত্যিই যদি হারটা বউদি খুঁজে না পায় তাহলে কী হবে তার? থানা পুলিশের নামে বেজায় ভয় তার।

কপাল ভালো সেদিন রাতেই বউদি হারটা পেয়ে যায়। নিজেই আলমারির লকারে ঢুকিয়ে ভুলে মেরে দিয়েছিল।

পরদিন মালতি মাথা নীচু করে কাজে ঢুকতেই এক গাল হেসে ওকে খবরটা দিয়েছিল বউদি। তারপর সোহাগ করে বলেছিল, 'কিছু মনে কোরো না মালতি, রাগের মাথায় কী বলতে কী বলেছি। সোনার জিনিস বলে কথা! তোমার দাদা কাল রাতে খুব বকেছে আমায়। আমিও তো জানি, কত বিশ্বাসী তুমি। অমন কাজ তুমি করতেই পারো না...'

মালতি কোনও কথা বলেনি। মুখ বুজিয়ে কাজ করে গেছে সারাদিন। সন্ধেবেলা বাড়ি আসার পথে বাবুর জন্যে কিনে আনা জামাটা বউদির হাতে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আর যায়নি পরের দিন থেকে। দাদা-বউদি বস্তিতে এসেছিলেন তার খোঁজে। মালতি দেখা করেনি।

ছন্দাবউদিরা তেমন নয়। দাদা তো বাড়িতে থাকলে কথাই বলে না তেমন। যখন একটু-আধটু কথা বলে, মনে হয় নিজের বড় দাদাই যেন কথা বলছে। আর বউদি তো মানুষ নয়। মালতির মনে হয় স্বর্গের কোনও দেবীই বোধহয় নেমে এসেছে মাটিতে বউদির রূপ ধরে। নইলে শুধু মানুষ নয়, জন্তু-জানোয়ারের জন্যে এমন দরদ ক'টা লোকের থাকে! মালতি অবাক হয়ে ভাবে, রাস্তার জন্তু-জানোয়ারদেরও এত ভালোবাসা যায়!

বিস্ময়টা ছিলই, তারপরে তো মালতি একদিন খবরের কাগজেও দেখল একজন ফিলিমের নায়িকাও রাস্তার কুকুর বেড়ালদের কী সেবা যত্নই না করছে। টিভিতে এই নায়িকার অনেক বই দেখেছে সে। সিলিম ফিগার। একেবারে পান পাতার মতন মুখ। আর হেব্বি নাচে। ওকে দেখলেই বুকের ভেতরটা একেবারে তোলপাড় করে ওঠে মালতির। আবার কষ্টও হয় খানিক। কেন যে ছন্দাবউদি সিনেমায় নামল না কে জানে?

ইদানীং ছন্দাবউদির কাজের চাপ খুব বেড়েছে। বাড়িতে সময়ই দিতে পারছে না। মালতিকে গত ক'মাস ধরেই জপাচ্ছে, 'যা টাকা লাগে বল মালতি। তুই আমার বাড়িতেই থাক। সকাল বেলা আসবি, নিজের সংসারের মতন রাঁধবি বাড়বি খাবিদাবি। সন্ধেবেলা দাদা বাড়ি ফিরলে চলে যাস। কোনওদিন আমি যদি আগে ফিরে আসি তাহলে আগেই ছুটি তোর।'

ছন্দাবউদির কথা মালতি ফেলতে পারল না। আসলে ফেলতে পারে না সে ছন্দাবউদির কথা। মনে মনে কী চোখে যে বউদিকে দেখে সে মুখ ফুটে বলতে পারে না মালতি। টিভি-র সেই নায়িকারই মতন ধপধপে ফর্সা রঙ বউদির। আঁটোসাঁটো চোখে লাগার মতন চেহারা।

বউদি যখন টিপটপ সেজেগুজে বাড়ি থেকে বের হয়,বউদির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে মালতি। সেই কথাটা তখন আবার মনে হয় তার কেন যে সিনেমায় নামল না বউদি! নিদেন টিভির সিরিয়াল ফিরিয়ালেও তো সুযোগ নিয়ে দেখতে পারত একটা। আজকাল কত খেঁদিপেঁচি মেয়ে-বউরা সব সিরিয়ালে চান্স পেয়ে যাচ্ছে। তেমন হলে মালতিরও এলাকায় কদর বেড়ে যেত। বউদির দেখতায় তার নিজেরও হয়তো কোনও বই-টইতে মুখ দেখাবার সুযোগ এসে যেত। ওঃ যা হতো না তাহলে! মনে মনেই দু-পাক নেচে নিল মালতি। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নাহ, কিছুই হল না। গর্ব করার মতন কিছুই ঘটল না তার জীবনে। একটাই সান্ত্বনা, এই ছন্দাবউদিও তার সেই স্বপ্নের নায়িকার মতনই পশুপ্রেমী। তাদের খাওয়াদাওয়া, রোগ বালাই এমনকীবেশি ছানাপোনা না-হয় যাতে, সেজন্যে পুরুষ কুকুরগুলোকে যে কী সব করে দেয় সরকারি বাবুরা এসে, বউদির সংস্থা নাকি তারও বিরুদ্ধে।

কুকুরদের ভালো করতে কত খরচ করে এই সংস্থা, একদিন মালতিকে বলেছে ছন্দাবউদি। মালতির চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল শুনে। ছন্দাবউদি কত কি অদ্ভুত কথা শুনিয়েছিল সেদিন। বলেছিল এই পৃথিবীটা সকলের। আমরা মানুষেরা অন্যদের বাঁচতে না-দিয়ে কীভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি এই পৃথিবী।ছন্দাবউদি বলেছিল, 'নিজের মনটা বড় কর মালতি, দেখবি কী মজা তখন বেঁচে থাকবার...' শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। মালতি ভাবে একদিন সেই নায়িকারই মতন বউদির ছবিও খবরের কাগজে বেরোবে। সেদিন মালতিও বউদির পাশে দাঁড়িয়ে পড়বে সুযোগ থাকলে। তারপর কাগজে ছবিটা যেদিন বেরোবে, বাড়ি ফেরার সময় সোজা নিখিলের মুখের ওপরে ছুড়ে দেবে কাগজখানা।

নিখিল অটো চালায়। অন্যের অটো। তবে নিজের অটো কিনবে শিগগিরই। নিখিল খুব ভালো। খুব ভালোবাসে ওকে। মালতিকে ও বিয়ে করবে বলেছে। আর একটু গুছিয়ে নিয়েই। কাজ থেকে ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিন দেখা করে ওরা বটতলায় অথবা পারুলদিঘির পাশে। বউদিকে বলেছে ওর কথা।বউদি বেজায় খুশি। তবে সাবধানও করে দিয়েছে ওকে। বলেছে, 'মালতি, বাইরে থেকে দেখে মানুষকে চেনা কিন্তু বড় কঠিন। খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিবি। বিয়ে কিন্তু হেলাফেলার জিনিস নয়...' বলেই মুখটাকে গম্ভীর করে নিয়েছিল বউদি, 'কদ্দূর এগিয়েছিস? সবটুকু দিয়ে বসে আছিস নাকি?'

'ধুস কী যে বলো বউদি' লজ্জায় লাল হয়ে পালিয়েছিল মালতি। বউদিকে কি বলা যায় এসব? বলা যায় নিখিল বলেছে, 'শরীরটা ক'দিনের মালতি, মনটাই আসল। এমন কিছু কাজ বিয়ের আগে করা ঠিক নয় যা নিয়ে পরে একবারও মনে হতে পারে কাজটা ঠিক করিনি।' নিখিল সত্যিই বড় ভালো। তার থেকেও ঢের ঢের ভালো। মনে মনে ভাবে মালতি।

বউদি বেরোচ্ছিল। মালতিকে বলল, 'সাবধানে থাকিস.'

'হ্যাঁ বউদি', মালতি উত্তর দেয় বউদির মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে।

'কী দেখছিস রে অমন হাঁ করে?' বউদি হাসে। বউদির দাঁতগুলো ভারি সুন্দর।

'তোমাকে।'

'যাহ', ছন্দার মুখে লালচে আভা ছড়িয়ে যায়।

'তোমাকে বড্ড ভালো দেখতে বউদি। দাদার খুব সৌভাগ্য তোমাকে বিয়ে করতে পেরেছে।' আজ বেশ সাহসীই হয়ে উঠল মালতি।

'হয়েছে হয়েছে', বউদি বলে, 'বেল বাজলেই দুম করে দরজা খুলে দিস না।'

'তোমার কি ফিরতে দেরি হবে?'

'হতে পারে। জরুরি মিটিং আছে একটা। পশু-পাখিদের নিরাপত্তা বিষয়ে। মালতি কী বলি তোকে, আমরা যে মানুষ এটা ভাবতে লজ্জা করে মাঝে মাঝে। আমাদের থেকে যারা দুর্বল তাদের ওপরে কত অত্যাচার করি আমরা ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়.'

'সকলে কি আর তোমার মতন করে ভাবে গো'

'বাদ দে। কেউ কেউ তো ভাবছে তবু। পৃথিবীটাকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব সকলে না নিলে কাউকে কাউকে নিতে হয়। হাতের পাঁচটা আঙুলই সমান নয়, আর সমাজের এত মানুষ কী করে একরকম হবে বল...' বলতে বলতে বউদি বেরিয়ে পড়ে।

দরজার কড়া খটখট করে নড়ে উঠতে প্রথমটা চমকেই গিয়েছিল মালতি। কলিং বেলের সুইচ না টিপে দরজা খটখটায় কে এমন অসময়ে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মালতি দেখল একটা বাজতে দশ। মালতি আটা মাখছিল। আটা মাখতে মাখতেই চিৎকার করে উঠল, 'কে?'

'আমি মা।' ক্লান্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল মালতি বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে। মালতি চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি দরজার কাছে গিয়ে আই হোলে চোখ রাখল সে। সামনের দিকে খানিক ঝুঁকে ক্লান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলা। হাতে বেশ বড় ব্যাগ একটা। বয়েস হয়েছে। ব্যাগটা বইতে বেশ কষ্টই হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাঁপাচ্ছিলেন। মানুষটার শরীরের ভাবগতিকও খুব একটা সুবিধের মনে হল না। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল মালতি। বলল, 'এসো, এসো।'

মহিলা ক্লান্ত পায়ে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ফ্যালফেলে চোখে খানিক এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপরে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'অপু অফিসে গেছে?'

'হ্যাঁ মাসিমা।'

'বউমা?'

'বউদিও বেরিয়েছে একটু। কাজ আছে।'

'কখন ফিরবে?'

'তা তো জানি না।'

'ও', বলে একটু কী ভাবলেন মহিলা। তারপরে অসহায়ের মতন বললেন, 'আমার বড় খিদে পেয়েছে।'

'ইশ, সত্যিই তো সেই কোন সকালে বেরিয়েছ...আমারই দোষ গো মাসিমা। নাও চোখে মুখে জল দাও। আমি ভাত বাড়ছি।'

'ভাত পাবি কোথায়?'

'ও তোমায় ভাবতে হবে না।'

'তোর ভাত?'

'ওসব তোমায় ভাবতে হবে না।'

'তুই বড্ড ভালো মেয়ে রে মালতি। খুব ভালো হবে তোর দেখিস।'

মালতি তার কথার জবাব দেয় না। রান্নাঘরের দিকে এগোয়। যা ভাত তরকারি আছে ভাগযোগ করে দুজনের হয়ে যাবে টেনেটুনে। মনে মনে ভাবে একদিন আধপেটা খেলে কী আর এমন ক্ষতি...কতদিনই তো আগে ভরপেট জোটেনি তার।

মাসিমা দাদার কেমন যেন মাসি হন সম্পর্কে। ছোটবেলায় এই মাসির খুব নেওটা ছিল নাকি দাদা। মাসি করেওছে তখন দাদাদের জন্যে। মানুষটার সারা জীবনই কষ্টের। কম বয়েসের বিধবা। শ্বশুর বাড়িতে কদর নেই। বাপের বাড়িতেও কেউ পৌঁছে না। এসব দাদার কাছেই শোনা। এর আগে একবার এসেছিলেন মাসিমা এই বাড়িতে। মালতি আসার পর পরই। দিন তিনেক ছিলেন। তখনই দাদার মুখে শোনা এসব কথা। চলে যাবার সময় মাসিমার হাতে শ'তিনেক টাকা দিয়ে দাদা বলেছিল, 'এটা রাখো। কিনে কেটে খেয়ো কিছু যা প্রাণ চায়। আর ইচ্ছে হলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো। তোমার আর কেউ না থাকতে পারে, কিন্তু আমি আছি। ছোটবেলার কথা আমি এখনও ভুলিনি ইন্দুমাসি।'

মাসিমা কী খুশি হয়েছিলেন সেদিন। দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করেছিলেন দাদা-বউদিকে।

মালতি জিগ্যেস করল, 'থাকবে তো ক'দিন?'

'দেখি', বলে আকাশের দিকে চাইল ইন্দুমাসি।

'দেখি মানে?'

'ইচ্ছে তো তোর দাদা-বউদির সঙ্গে জীবনের বাকি সময়টার পুরোটাই কাটিয়ে দিই। তাছাড়া তুই আছিস। তোকে দেখলে মনে বড্ড ভরসা পাই।'

'কেন?'

'কে জানে...।'

খাবার পর ইন্দু মাসিকে জিগ্যেস করল মালতি, 'মাসিমা পান খাবে?'

'পান?' মাসির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, 'আছে?'

'থাকবে আর কোথায়? তুমি খেলে এনে দেব।'

'তবে খাওয়া মা একখানা। পারলে একটু দোক্তা দিয়ে আনিস, আর গুঁড়ো সুপুরি। দাঁত নেই তো, সুপুরির কুচি বড় হলে চিবুতে পারি না।'

পান কিনতে নীচে নেমে নিজের মোবাইল থেকে বউদিকে একটা ফোন করল মালতি। ইন্দুমাসি আসার খবর দিল। জিগ্যেস করল কোন ঘরে থাকার ব্যবস্থা হবে। রাতের রান্নাই বা কী হবে। বউদি অবশ্য স্পষ্ট করে বলল না কিছু। অদ্ভুত ঠান্ডা গলায় বলল, 'এক্ষুনি কিছু করতে হবে না আগ বাড়িয়ে। আমি যাই। তারপর ভাবা যাবে। এখন ব্যস্ত আছি। রাখছি। আমি যতটা তাড়াতাড়ি পারি বাড়ি ফিরছি।'

দাদা-বউদি দুজনেই একসঙ্গে ফিরল। এমন হয় না সাধারণত। দুজনকেই খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল। কী নিয়ে তর্ক করছিল যেন দুজনে। মালতি দরজা খুলে দাঁড়াতেই থেমে গেল। বউদি চাপা গলায় মালতিকে জিগ্যেস করল, 'ইন্দুমাসি কই?'

'ঘুমিয়ে পড়েছে।' মালতি ড্রয়িং রুমের সরু ডিভানটার দিকে দেখায় ডান হাতের তর্জনির ইশারায়। 'একটু আগেও তো গল্প করছিল আমার সঙ্গে। আমি হাতের কাজ সারতে রান্নাঘরে গিয়েছিলাম। এসে দেখছি ঘুমিয়ে পড়েছে। আসলে বুড়ো মানুষ, শরীর ক্লান্ত। তাছাড়া শরীরটা খুব ভালো বলেও মনে হল না।'

'হুঁ', বলে ঘরে ঢোকে বউদি। দাদার দিকে চেয়ে জিগ্যেস করে, 'কী করবে তাহলে এখন?'

মালতি বুঝতে পারে মাসিমাকে নিয়ে দাদা-বউদির কিছু একটা কথা চলছে খানিকক্ষণ ধরেই। বউদিই কি তাহলে দাদাকে ডেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল তার ফোন পাবার পর? কিন্তু কেন? কী এমন সমস্যা ইন্দুমাসির এখানে আসা নিয়ে?

ছন্দা প্রমিতকে জিগ্যেস করে, 'শিবেন ঠিক কী বলেছিল তোমাকে?'

শিবেন কে মালতি জানে না। দাদা-বউদির টিফিন তৈরি করতে করতেই আজ কান খাড়া করে বউদির ঘর থেকে দাদা-বউদির কথা শোনার চেষ্টা করছিল মালতি। কেন যে করছিল কে জানে? এমন করা ঠিক নয়। করেও না সে কখনও। তবু আজ কেন যেন মনে হচ্ছে কথাগুলো শোনা খুব জরুরি। দাদা-বউদির শোবার ঘর রান্নাঘরের কাছেই। তবু স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না সব। উনুনে খাবার চাপিয়ে দাদার ঘরের ভারী পর্দার এপারে এসে দাঁড়াল মালতি। দাদা বলছে, 'শিবেনের কথা সত্যি হলে ইন্দুমাসির শ্বশুরবাড়ির ঠাঁই নড়বড়ে হয়ে যাবার কথা।'

'তাহলে? ইন্দুমাসি কি পাকাপাকি এখানেই এসে উঠল নাকি?'

'কে জানে?'

'কে জানে মানে?' চাপা গলায় হিসহিসিয়ে উঠল ছন্দা, 'ওই মহিলাকে এই বাড়িতে অ্যালাও করবে তুমি?'

'আমার মাথায় আসছে না কিছু।'

'তোমার আদিখ্যেতার অন্ত নেই!'

'আমি আবার কী করলাম? আমি কি ডেকে এনেছি ইন্দুমাসিকে?'

'আগেরবার যখন এসেছিল তুমিই তো বলেছিলে ইচ্ছে হলেই তোমার কাছে চলে আসতে। ইন্দুমাসির আর কেউ না থাকুক তুমি আছ?'

'তাই বলে সত্যিই উঠে আসবে কী করে বুঝব?'

'যে করেই হোক কাটিয়ে দাও। উরিব্বাস রে, আগের বারে তিন দিনেই আমার হাড় কালি করে দিয়েছিল। কমোড ইউজ করতে পারে না। নোংরা করে ইশ। ছিঃ...মানুষটার গা হাত-পাও কেমন...কতদিন সাবান পড়ে না কে জানে? তাছাড়া আমার এনজিও-টা সবে পাকছে। কত তাবড় লোকজন বাড়িতে আসবে। তারমধ্যে এই বুড়ি যদি থাকে...আগেরবারে খাওয়াদাওয়া নিয়েও কী বিচ্ছিরি কাণ্ড! ইনকরিজেবল...।'

'তাহলে কি কোনও হোমে টোমে।' দুর্বল গলায় বলে প্রমিত।

'লাখ টাকার গল্প। এমনি এমনি তোমার ইন্দুমাসিকে কারা পুষবে শুনি আজীবন?' ছন্দার গলা ক্রমশ কর্কশ হয়ে উঠছে।

মালতি রান্নাঘরে ফেরে। খাবার পুড়ে যাবে আর দেরি করলে। যাবার আগে আড়চোখে তাকায় ইন্দুমাসির দিকে। বউদির ঘরের ঠিক বাইরেই ডিভানে শুয়ে আছে ইন্দুমাসিমা। না ঘুমোচ্ছেন। মুখে চোখে প্রশান্তির ঘাটতি নেই। তাহলে মাসিমা নিশ্চিত শুনতে পায়নি কিছু। রান্নাঘরে টিফিন তৈরি করে দাদা-বউদির জন্যে ট্রে-তে করে সাজিয়ে নিয়ে আসে মালতি। মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি টের পায় সে। যে বউদিকে সিরিয়ালের সবচেয়ে সুন্দরী নায়িকার চেয়েও সুন্দর দেখতে মনে হত এতদিন, তাকে আজ তেমন ভালো লাগছে না তো দেখতে! মনে মনে ভারি অবাক হয় মালতি। এমন হয়? হতে পারে? মালতি খাবার দেবার সময় দাদা জিগ্যেস করলেন, 'ইন্দুমাসি ক'দিন থাকবে কিছু বলেছে তোমায়?'

'কই না তো।' এই প্রথম দাদার সামনে মিথ্যে বলল মালতি। এবং কী আশ্চর্য বলে একটুও অনুতাপ হল না তার।

ইন্দুমাসি ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ঘড়ির দিকে চেয়েই চমকে উঠল। তড়িঘড়ি ডিভান থেকে নেমে পড়ে চোখেমুখে জল দিতে দিতে বলল, 'ইশ, বড্ড দেরি হয়ে গেল যে! এ যে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল রে মালতি।'

'কীসের দেরি তোমার ইন্দুমাসি?' প্রমিত অবাক হয়ে বলে।

'ওমা বাড়ি যেতে হবে না?' ইন্দুমাসি হাসেন।

'বাড়ি যাবেন?' ছন্দার গলার বিস্ময় চাপা থাকে না, 'আজই তো এলেন! এক-আধদিন থেকে যেতে পারতেন...।'

'না বউমা, আমাকে আর আটকে রেখো না।'

'মালতি চা বসিয়েছে। এক কাপ চা খেয়ে বেরোন না-হয়।' ছন্দা বলেন প্রমিতের দিকে চেয়ে।

'নাহ।' ইন্দুমাসি ব্যাগটা কাঁধে তোলে, 'এমনিই দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করলে চলবে না গো। তোমরা ভালো থেকো মা। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন।'

ইন্দুমাসি বেরিয়ে গেলেন। যে ডিভানের ওপরে একটু আগে শুয়ে ছিল ইন্দুমাসি, ছন্দা মালতিকে তার ওপরের কভারটা বদলে দিতে বলল।

আজ একটু দেরিই হয়ে গেল মালতির। রাস্তা দিয়ে একটু দ্রুত হাঁটছিল সে। আজ আর নিখিলের সঙ্গে দেখা হবে না তার। নিখিল দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তার বেরোতে দেরি হবে শুনে চলে গেছে। কাজ আছে ওর। তাছাড়া এই সময়ে ভাড়ার চাপ বেশি থাকে। সময় নষ্ট করলে ইনকামে ঘাটতি।

মালতির মনটাও আজ ভালো নেই। ইন্দুমাসি কেউ নয় তার, তবু মানুষটার জন্যে কষ্ট হচ্ছে তার। ছন্দাবউদি তার কাছে দেবী ছিল এতদিন। সেই ছন্দাবউদির জন্যেও কে জানে কেন আজ কষ্ট হচ্ছে তার। বউদির বাড়ি থেকে সে যে বস্তিটায় থাকে তার দূরত্ব কম নয়। তবু নিখিল অটোয় পৌঁছে না দিয়ে এলে সে হেঁটেই যায়। আজও যাচ্ছিল মালতি। দুটো মোড় পেরিয়ে রাস্তাটা যেখানে সরু হয়ে ডান দিকে ঢুকে গেছে সেই রাস্তায় একটু এগিয়েই ঝাঁকড়া পাকুড় গাছের নীচে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।

রাস্তার পুরোনো বালবের লালচে অনুজ্জ্বল আলো। তবু ইন্দুমাসিকে চিনে নিতে অসুবিধে হল না মালতির। দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ইন্দুমাসির নুয়ে পড়া মাথার ওপরে হাত রাখে মালতি। চমকে মাথা তুলেই মালতিকে দেখে অবাক হয়ে যায় ইন্দুমাসি। দুর্বল গলায় বলে, 'তুই?'

'মাসিমা তুমি বাড়ি যাওনি?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে মালতি।

'বাড়ি?' আকাশের দিকে চেয়ে বলে ইন্দুমাসি, 'বাড়ি তো নেই।'

'তবে যে ওখানে বলে এলে!'

'কী করতুম ভাই' ইন্দুমাসি হাসে, 'বুড়ো হলে শতেক জ্বালা রে মালতি। শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবনা আসে শুধু, ঘুম আসে না। আজও আসেনি। ভাগ্যিস আসেনি। সবকিছুরই জগতে ভালোমন্দ দুই দিক থাকে জানিস তো...আজ বুঝুলুম আমার ঘুম না হবার কত উপকারিতা। ঘুমিয়ে পড়লে আমায় নিয়ে তোর দাদা-বউদির কত সমস্যা জানতেই পারতুম না। বোকার মতন ওখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার অন্যায় স্বপ্ন দেখে ফেলতুম...।'

'মাসিমা তুমি আমার সঙ্গে চলো।'

'কোথায়?'

'আমার বাড়ি।'

'দূর পাগলি।'

'আপত্তি কীসের?'

'তোর অসুবিধে হবে।'

'কিচ্ছু অসুবিধে নেই। চলো। যা রোজগার করি দুজনে ভাগ করে খেয়ে ঠিক চলে যাবে। তাছাড়া নিখিল আছে...।'

'নিখিল কে রে মালতি? আমার জামাই?'

'হবে' লজ্জায় রাঙা হয়ে মাথা নামায় মালতি।

'সে যদি রাগ করে?'

'করবে না। আমি তাকে চিনি।'

'সত্যি চিনিস?'

'চিনি গো চিনি।'

'মানুষ চেনা কিন্তু ভারি কঠিন রে মালতি...।'

'তবু তাকে চিনি। আগে চিনতে অসুবিধে হত ঠিকই। এখন মনে হচ্ছে আর চিনতে অসুবিধে নেই।' বলেই ইন্দুমাসিকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দেয় মালতি। 'অনেক হয়েছে। চলো এবার!'

আলো-আঁধারি ছায়া ছায়া রাস্তা মাড়িয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে থাকে ইন্দুমাসি আর মালতি। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। এদিকের আকাশে বিজলিবাতির সাজানো আলো নেই বলে চাঁদটাকে চমৎকার দেখায়। আঁধার আড়ালে থাকা আকাশ আলোর উৎসারে একেবারে ঝলমল করতে থাকে যেন।

নিখিল আগে বহুবার বলেছে মালতিকে, সিনেমায় বা সিরিয়ালে মানুষকে যত সুন্দর লাগে সে সৌন্দর্য সবসময় সত্যি নয়। তার পিছনে মেকআপ আর পালিশের কারসাজি থাকে। মালতির বিশ্বাস হত না। এখন মনে হল নিখিল কথাটা ঠিকই বলেছিল। মনে মনে খুব তৃপ্তি পেল মালতি। মনে হল আজ ওইজন্যেই বউদিকে অতটা ভালো লাগছিল না বোধহয়। দাদাকেও। ওদের মেকআপ আর পালিশের কারসাজিটা ঠিকমতন কাজ করেনি তখন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%