অপূর্ব একা

জয়দীপ চক্রবর্তী

অন্তত কয়েকটা দিন একা থাকাটা খুব জরুরি। খুবই জরুরি।

সাইড লোয়ারে সিট পড়ায় একদিক দিয়ে সুবিধেই হয়েছে। জানলা দিয়ে একমনে বাইরে তাকিয়ে থাকা যায়। আরও পাঁচজন মানুষের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে থাকার হ্যাপা পোয়াতে হয় না। সকালে মনে হয়েছিল একবার, আপার বাংকের মোটা মতন লোকটা যদি ঝপ করে নীচে নেমে আসে তাহলে তার অপূর্ব একাকীত্ব ভেঙে যেতে পারে। উল্টোদিকে সে এসে বসলে ভালো লাগত না প্রবালের। সামনে তাকালেই মানুষের মুখ।

প্রবাল মানুষের ভিড় থেকে দূরে পালিয়ে যেতে চাইছে এখন প্রাণপণে। ঘরে-বাইরে নিরন্তর ব্যবহৃত হতে হতে বড় ক্লান্ত লাগছে তার। এমনকী নিজের দিকে তাকালেও গা ঘিনঘিন করে উঠছে মাঝে মাঝে।

দিন কয়েক আগে মানস, ওরই অফিসে কাজ করত একসময় যে ছেলেটা, মেট্রোয় দেখা হতে অফিসের বসু আর মিত্রের খবর জিগ্যেস করছিল বার বার। ওকেও তো বেশ কিছুদিন সামলাতে হয়েছিল এই কুখ্যাত ডুয়োকে। কাজেই, সেও হাড়ে-হাড়েই চেনে এই হারামি দুটোকে। সব শুনে টুনে প্রবালের পিঠে চাপড় মেরে মানসবলেছিল, 'প্রবালদা, তুমি মানুষ নও গুরু, মানুষের মতন দেখতে এক আজব জীব তুমি। ভগবান-টগবানও হতে পারো ছদ্মবেশে। নইলে বসু আর মিত্তিরকে টানা পনেরো বছর ধরে সামলে চলা কোনও সাধারণ ছা-পোষা আত্মসম্মানবোধযুক্ত মানুষের পক্ষে সম্ভবই নয়।'

প্রবাল প্রতিবাদ করেনি। হালকা হেসেছিল শুধু। আসলে মানসের এই কথাটায় প্রতিবাদ করা যায় না। প্রাইভেট কোম্পানির মাঝারি মাইনের চাকরি টিকিয়ে রাখতে গেলে মালিক পক্ষের আনুকূল্য লাগে। তার জন্যে তাদের বশংবদ হতে হয় অনেক সময়।

মানস ব্রাইট ছেলে। কেরিয়ার তৈরি করার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী এবং পরিশ্রমী। তাছাড়া এমনিতেও যথেষ্ট বিত্তবান বাবার একমাত্র ছেলে সে। সে এসব বরদাস্ত করেনি। পরোয়াই করেনি কাউকে। শোনা যায় মিত্তির একদিন নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়ে দীপাবলিতে বাড়ি সাজানোর জন্যে চাঁদনি থেকে কিছু চিনে আলো কিনে এনে দেবার আবদার করেছিল মানসের কাছে। মানস রাজি না-হয়ে সটান বলেছিল, 'অফিস ছুটির পরে আমার অন্য কাজ থাকে স্যার...'

'আমারও থাকে,' পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসেছিল মিত্তির, 'অথচ তোমার বউদি বলছিল...কাকে আর বলি...ভাবলাম তোমরা যখন আছ...'

'আমরা মানে?' চোখ কুঁচকে বলেছিল মানস, 'আমার সঙ্গে আর কাউকে নিয়ে যাব নাকি?'

'অফিস ছুটির পরে ঘুরতে ঘুরতে যেতেই তো পারো। প্রবালকে বলো না, ভারি ভালো ছেলে। তোমার সঙ্গে যাবে'খন...'

'আমায় দিয়ে হবে না স্যার। আমার বাড়ি উল্টোদিকে। চাঁদনি থেকে আলো কিনে আপনার বাড়ি দিয়ে আসার মতন সময় আমার নেই...'

'তবে সহেলীকেই নিয়ে যাও না-হয়', চোখ সরু করে তাকিয়েছিল মিত্তির, 'মাঝেমধ্যে ওর সঙ্গে তো অফিস ছুটির পরে এদিক-সেদিক বেরোও-টেরোও বলে শুনেছি...'

'আপনি এসব খবরও রাখেন?' বিরক্ত হয়ে বলেছিল মানস। গলায় একটু বাড়তি শ্লেষ এনেই বলেছিল।

'খবর তো রাখতেই হয় ভাই', শ্লেষটা গায়েই মাখেনি মিত্তির, 'খবর না রাখলে অফিস-কাছারি সব এতদিনে যে ব্রোথেল হয়ে যেত। যা করে বেড়াচ্ছ তোমরা কেউ কেউ...'

'শাট আপ!' চিৎকার করে উঠেছিল মানস। 'আপনার বিরুদ্ধে থানায় যাব আমি। যে ভাষায় এই অফিসে কর্মরত মহিলাদের সম্পর্কে কথা বলছেন আপনি...'

'সে যেও না হয় সময় সুযোগ মতন', খুব ঠান্ডা গলায় বলেছিল মিত্তির, 'আপাতত আমার ওই আলোগুলো...'

'নির্লজ্জ স্কাউন্ড্রেল একটা!' দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল মানস। তারপর মিত্তিরের ঘর থেকে বেরিয়ে রেজিগনেশন লেটারটা লিখেছিল সে কম্পিউটারে টাইপ করে।

প্রবাল দেখেছিল তাকে চিঠি লিখতে। সে যখন রাকিবুলকে দিয়ে চিঠিটা মিত্তিরের কাছে পাঠিয়েছিল তখনও প্রবাল সেখানেই ছিল। দেখছিল চুপ করে। তার নিজের হাতও নিশপিশ করছিল অমন একখানা চিঠি নিজের জন্যেও লিখে ফেলার জন্যে। চিঠিটা অবশ্য লেখা হয়ে ওঠেনি তার।

মানস চলে যাবার পরে সহেলীর চাকরিটাও থাকেনি অবশ্য। থাকবার কথাও ছিল না। সেই ঘটনার পর থেকে মানসের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি আর প্রবালের। সহেলীর সঙ্গেও নয়। যোগাযোগ রাখার কোনও তাগিদই বোধ করেনি প্রবাল। বরং ভয় পেয়ে গিয়েছিল মনে মনে। মানসের মতন মানুষেরা খুব বিপজ্জনক। এদের সংস্পর্শে বেশি থাকলে তার মনের মধ্যে থেকেও নিশ্চিত প্রতিবাদী আর একটা প্রবাল বেরিয়ে আসতে পারে। সেই প্রবালকে ভয় পায় এই প্রবাল। সে প্রতিবাদ-টতিবাদ করতে পারে না। সবকিছু মুখ বুজে মেনে নিতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। এই অভ্যাসের বাইরে বেরিয়ে আসা বাস্তবিকই বড় মুশকিল তার পক্ষে।

মিত্তিরের বাসা সাজানোর সেই আলো প্রবালই এনে দিয়েছিল। কষ্ট হয়েছিল। তবু এনেছিল। একটা সান্ত্বনা ছিল তার। এই কাজের জন্যে কিছুটা দেরি করে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল সে। অফিসের পরে বসের বেগার খাটতে এইজন্যেই মূলত আপত্তি করে না প্রবাল।

এতদিন পরে মানসকে দেখে একবার সহেলীর কথা জিগ্যেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল প্রবালের। জানার আগ্রহ হয়েছিল সহেলীকে সত্যিই বিয়ে করেছে কিনা মানস। কিন্তু কথাটা জিগ্যেস করতে গিয়েও কেমন যেন গুটিয়ে গেল প্রবাল। ভয় করতে লাগল। বিয়ে শব্দটা বড় গোলমেলে মনে হল নিজের কাছেই।

একটা সময় কবিতা লিখত প্রবাল। এই কথাটা মনে আসতেই নিজের মনে মনেই অবাক হয়ে গেল সে। সত্যিই লিখত কি? কোনওকালে? নাকি কবিতা লেখার ব্যাপারটা শুধুমাত্রই তার অবচেতনে? তবে ঝিলিকের মুখটা দিব্বি মনে আছে তার। সে ঝিলিককে কবিতা শোনাত। মানে সে যদি সত্যিই কবিতা লিখে থাকে একসময়, সে কবিতা ঝিলিককে শোনানোর জন্যেই সে লিখত সম্ভবত।

ঝিলিক তাকে ভালোবাসতো কি? কে জানে...ভালো করে বোঝার মতন সময় পাবার আগেই হুড়মুড় করে ঝিলিককে মাড়িয়ে তার ওপরে জবরদস্তি মালিকানা কায়েম করে নিয়েছিল ঋতি। ঝিলিককে ছক্কা মেরে উড়িয়েই দিয়েছিল সে একেবারে। ঝিলিক প্রবালকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি।

ঋতি ঝিলিকের থেকে বেশি সুন্দর ছিল ওপরে ওপরে। স্মার্ট। অনেক ছেলেই তার জন্যে পাগল ছিল। প্রকাশ্যে তার জন্যে হ্যাংলাপনারও অভাব ছিল না তাদের। প্রবাল জানত ঋতি তার মতন অতি সাধারণের জন্যে নয়। ঋতির দিকে সাহস করে চোখ তুলে তাকায়ইনি সে তাই কোনওদিন। কেন যে তবু জোর করে তার জীবনে ঋতি ঢুকে পড়েছিল অমন করে বুঝতেই পারেনি প্রবাল। তাকে প্রতিহত করতেও পারেনি। বাড়ির অমতেই প্রবালকে বিয়ে করেছিল সে। তখনও এই চাকরিটা পেয়েও ওঠেনি প্রবাল।

প্রবালের বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ঋতি খুশি হয়। প্রবাল জানে। ঋতি আরও খুশি হয় অফিসের কাজে প্রবাল দু-চারদিন বাইরে থাকলে। এই দিনগুলোয় ঋষভ আসে ঋতির কাছে। দুজনে একসঙ্গে থাকার সুযোগ পায় তখন অনেকখানি সময় ধরে। কাছাকাছি আসার সুযোগও বাড়ে। প্রথম প্রথম প্রবাল ভাবত ঋতি নিশ্চিত ভাবে সে এসব জানে না কিছু। তাদের এই গোপন অভিসারের কথা কিছুই বুঝতে পারে না প্রবাল। কিন্তু প্রবাল পরে বুঝেছে ঋতি আসলে তার জানা না জানাটাকে কেয়ারই করে না। এবং তার এই কেয়ার না করাটা প্রবালকে সচেতনভাবেই কাজেকর্মে বুঝিয়ে দিতে চায় সে।

গেল বছরের এপ্রিলের গোড়ায় টুরে কাটছাঁট করে দিন দুই আগে ফিরে এসেছিল প্রবাল। আসার সময় ঋতিকে জানায়নি কিছু। ভেবেছিল সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু দুম করে বাড়ি ফিরে আসাতে ঋতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল। চোখ পাকিয়ে বলেছিল, 'এমন ছেলেমানুষি আর বোকামি কেউ করে নাকি? এই মাঝরাত্তিরে এখন আমায় আবার রান্না বসাতে হবে তোমার জন্যে।'

সেদিন দুপুরে ঋষভ এসেছিল। বাথরুমের ডাস্টবিনে তখনও কন্ডোমের প্যাকেট পড়েছিল। কাচের টি টেবলের ওপরে রাখা অ্যাশট্রেতে সিগারেটের পোড়া অবশেষ। ঋতি সেগুলো সরানোর জন্যে বিশেষ তাড়াহুড়ো দেখায়নি। তাকে দেখে খুব একটা অপ্রস্তুতও মনে হয়নি সেদিন প্রবালের। ঋতি হড়বড় করে বলেছিল, 'স্লিভলেসনাইটি পরে বাইরে বেরোতে পারব না। চট করে সামনের দোকান থেকে ঝটপট কয়েকটা ডিম নিয়ে এসো। অমলেট আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নেবে আজ।'

প্রবাল মাথা নীচু করে দোকানে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে অবশ্য দেখেছিল ডাস্টবিনের কন্ডোম আর অ্যাশট্রের সিগারেট সরিয়ে ফেলেছে ঋতি। দুদিন আগে বাড়ি ফেরার জন্যে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছিল সেদিন প্রবালের। এমন ভুল দ্বিতীয়বার আর করেনি সে তারপর থেকে।

ঋতি প্রবালের চেয়ে ভালো চাকরি করে। সরকারি চাকরি। ফ্ল্যাটটাও তারই টাকায় কেনা, তার নামেই। এবাড়িতে তার মুখের ওপরে কথা বলার মতন সাহস প্রবাল দেখাতে পারে না। দেখানোটা আহাম্মকিই বোধহয়। প্রায় বিনা পয়সায় এই বাজারে এমন একটা ফারনিশড ফ্ল্যাটে থাকতে পাওয়া মুখের কথা নয়। মনে হয় এবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিয়ে ঋতি তাকে কৃতজ্ঞই করেছে। তাছাড়া এই ঋতিই মাঝেমধ্যে এক-আধ দিন বিছানায় নিজে থেকেই নগ্ন হয়। প্রবালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, 'এসো...'

ঋতির ফর্সা মেদহীন নগ্ন শরীর খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু তবু ঋতিকে দেখে কেন কে জানে শরীর জাগে না প্রবালের। ঋষভের কথা মনে আসে। তার পুরুষাঙ্গ শিথিলতর হয়ে যায়। আগে এতটা ছিল না, কিন্তু ইদানীং এই অপারগতা যেন ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। প্রবাল উপলব্ধি করতে পারে। আর এই কারণেই পরশু রাতে ভয়ানক রেগে গিয়ে মানসেরই মতন ঋতিও তাকে এই কথা বলেছিল, 'তুমি মানুষ নয়...তুমি একটা...একটা নিড়বিড়ে অপদার্থ ইমপোটেন্ট জীব...তোমাকে দেখে আমার গা ঘিনঘিন করছে...।'

সেদিন ঘনিষ্ঠতা চেয়েছিল ঋতি। সরু সরু আঙুল দিয়ে প্রবালের বুকের লোমের মধ্যে বিলি কাটছিল সে। পাগলের মতন চুমু খাচ্ছিল তার ঘাড়ে ঠোঁটে, কানের লতিতে। ঋতির নিঃশ্বাসে আগুন জ্বলছিল। নিজের অনাবৃত ভারি বুকদুটো বার বার ঠেসে ধরছিল প্রবালের শরীরের সঙ্গে। ঋতির মৃদু শীৎকার বাতাসের মতন প্রবালের কানের মধ্যে দিয়ে মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই প্রবালের শরীর সাড়া দিতে চাইছিল না সেদিন। ঋতির খোলা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মেসেঞ্জারে ঋষভের মেসেজগুলো মাথার মধ্যে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল ক্রমাগত। অসাবধানে লগ আউট করতে ভুলে গিয়েছিল ঋতি। খাবার গরম করতে রান্না ঘরে গিয়েছিল ল্যাপটপটা বিছানায় রেখে। প্রবাল দেখে ফেলেছিল।

তার অনুত্তেজিত পুরুষাঙ্গের দিকে চেয়ে বিচ্ছিরি হিক্কা তোলার মতন আওয়াজ করছিল ঋতি। দেখে মনে হচ্ছিল এক্ষুনি ঋতি বোধহয় বমি করে ফেলবে বিছানার ওপরে। মনে মনে বেশ পরিতৃপ্তি অনুভব করছিল প্রবাল। ঋতির ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পেরেছে তার শরীর এইজন্যে শ্লাঘা বোধ করছিল সে। আর ঋতির ইচ্ছা অমান্য করতে পারার সেই আনন্দঘন মুহূর্তেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় প্রবাল কয়েকদিন ঋতির থেকে দূরে, একেবারে একা, নিজের সঙ্গে নিজে থাকাটা খুব প্রয়োজন তার।

অফিস থেকে আর বাড়ি ফেরেনি কাল। প্রস্তুতি সে নিয়েই এসেছিল। অফ সিজন বলে টিকিট পেতেও অসুবিধা হয়নি তেমন। জানলার বাইরে আলুয়াবাড়ি স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে তখন তার ট্রেন।

ঘড়ি দেখল প্রবাল। ঘণ্টা দুই লেট। পকেট থেকে সেলফোন বের করে পিন্টুর নাম্বারে কল করে প্রবাল। সময়মতন সে যেন গাড়ি নিয়ে এনজেপি স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।

পিন্টু ছেলেটা ভারি ভালো। এর আগেও প্রবালকে স্টেশন থেকে নিয়ে গেছে সে কয়েকবার। কেন কে জানে, প্রবালকে ছেলেটা পছন্দ করে। দাদা দাদা করে খাতির করে খুব।

এবারে কাজের চাপ তেমন নেই। রাস্তায় একটা ছোট্ট কাজ আছে অফিসের। ব্যস। ওই কাজটুকু সেরে নিতে পারলেই প্রগাঢ় অবসর। দিন তিন-চার চুপ করে এক জায়গাতেই পরম আলস্যে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে সময় কাটাবে প্রবাল। অনেক বলে কয়ে এই ক'দিনের ছুটি আদায় করে নিয়েছে প্রবাল বোস সাহেবের কাছ থেকে।

অফিসের কাজ সেরে মাদারি হাটের রিসর্টে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। মূল রাস্তা থেকে বেশ খানিক ভেতরে অনেকখানি জায়গা নিয়ে এই রেসর্ট। সাজানো গোছানো, গাছপালায় বোঝাই নির্জন এই জায়গাটায় এলেই মন ভালো হয়ে যায় প্রবালের। সামনেই বিস্তৃত চা বাগান। কটেজগুলো পেরিয়ে রেসর্টের মস্ত ডাইনিং এবং কিচেন। তারপরেই পার্ক, বাগান। বাগানের সীমান্ত বরাবর জলদাপাড়ার জঙ্গল শুরু।

আগে কয়েকবার এখানে এসে থাকার জন্যে ম্যানেজার আশিস গুপ্ত প্রবালের চেনা। ভদ্রলোক রিসেপশনের বাইরের সবুজ ঘাসে ঢাকা লনের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রবাল পিন্টুর গাড়ি থেকে নামতেই হাত নেড়ে প্রবালের দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন।

'আশিসবাবু, ঘরদোর পাওয়া যাবে তো, নাকি সব বুকড?' গাড়ি থেকে নিজের পিঠব্যাগটা নামাতে নামাতে জিগ্যেস করল প্রবাল।

'কী যে বলেন মিস্টার মিত্তির' গুপ্ত আন্তরিক হাসেন, 'আপনার সঙ্গে কি সেই সম্পর্ক? রুম না-থাকলেও আপনার জন্যে কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিকই করে দিতাম।'

'আপাতত তাহলে কী ব্যবস্থা?'

'এখন অফ সিজন। বোর্ডারের চাপ নেই। আপনি এলেন। আর একটা ফ্যামিলি আসছে। হাসব্যান্ড ওয়াইফ। তিলাবাড়ি থেকে বিভিন্ন স্পট ঘুরে আসছেন। এইমাত্র ফোন করলেন মিনিট দশেকের মধ্যে ঢুকবেন। তিনদিনের বুকিং আছে ওনাদের। ১০২ নম্বর কটেজ।' বলেই একটা ছেলেকে হাঁক পাড়লেন, 'সুনীল, প্রবালবাবুর ব্যাগটা ১০৩-এ পৌঁছে দে।'

'ফাঁকা আছে যখন রিল্যাক্স করে থাকুন ওই ঘরে। ভাড়া আমি অ্যাডজাস্ট করে নেবখন। কাইন্ডলি এ সি চালাবেন না...'প্রবালের দিকে তাকিয়ে বললেন আশিসবাবু।

'না না, ঠিক আছে। এ সি লাগবেও না আমার...'

'ওকে। রেস্ট নিন। সন্ধেবেলা ডাইনিং হলে চলে আসুন। কমপ্লিমেন্টারি স্ন্যাক্স কফি দিয়ে দিচ্ছি আজ আর রাতে চিকেন। ডিনার দশটায়। দেরি করবেন না যেন...'

সন্ধেবেলা স্ন্যাক্স আর চা ঘরেই আনিয়ে নিয়েছিল প্রবাল। আলস্য জড়িয়ে ছিল শরীরে। সঙ্গে অবসাদ। ঋতিকে নিয়ে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। সিদ্ধান্ত একটা নিতেই হবে তাকে। এভাবে জীবন চলে না। কতদিন ঋতির কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবে সে। সত্যিই কি এইভাবে পালিয়ে থাকা যায়? সিদ্ধান্ত নেবার কথা মনে আসতেই অহেতুক ক্লান্তি আসে প্রবালের। চা খেয়ে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে।

দশটার কিছুক্ষণ আগেই ডাইনিং হলে পৌঁছে গেল প্রবাল। টানা বেশ খানিকটা ঘুম হবার পরে শরীর এখন অনেকখানিই ঝরঝরে লাগছে। ডাইনিং হলে মৃদু আলো। কাঠ, বাঁশ আর পাটকাঠির রুচিসম্মত সজ্জায় ঘরটা অপূর্ব লাগছিল। আশিস গুপ্ত এই ঘরেই ছিলেন। প্রবাল ঢুকতেই হাত বাড়িয়ে চেয়ার দেখিয়ে দিলেন, 'বসুন মিত্তিরবাবু। আমি ১০২-এর বোর্ডারদেরও ডেকে নিই বরং।'

প্রবাল খুশি হল না। অন্য মানুষের সংস্পর্শ তার ভালো লাগে না আজকাল। একা থাকবার জন্যেই তার এতদূরে চলে আসা। প্রবাল মাথা নীচু করে বসে রইল চুপ করে।

টেবিলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই সে দিব্বি তার সহআবাসিকের অস্তিত্ব বুঝতে পারল। মহিলা ঘরে ঢুকতেই একটা অসম্ভব সুন্দর গন্ধ পাক খেতে শুরু করল ঘরের মধ্যে। প্রবালের মাথার মধ্যে কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। এই গন্ধটা তার চেনা। এই পারফিউমের গন্ধ আগে অনেকবার আদর করে তাকে জড়িয়ে নিয়েছে তাকে। সে? সে-ই এল তবে? এত দিন পরে? নাকি আবার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা শুরু করল সে?

ঘোরের মধ্যেই মাথা উঁচু করল প্রবাল। আর দুটো টেবিল পরেই তাকে দেখতে পেল সে। প্রবাল চমকে উঠল। বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। ঝিলিক আগের থেকে মুটিয়েছে একটু। তখনকার থেকে আরও ফর্সা হয়েছে। প্রবালের হাতের তালু ঘামছে। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হচ্ছে ক্রমাগত। ঝিলিকের পরনে লং স্কার্ট এবং জংলি রঙের টপ। গুপ্ত এগিয়ে গেলেন তার দিকে। পেশাদারি আন্তরিকতায় জিগ্যেস করলেন, 'স্যার এলেন না?'

'ওরটা পার্সেল হবে। বলে দিন। আমি নিয়ে যাব।'

ঝিলিক মাথা নীচু করে খাচ্ছে। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হল দু-বার। মুখ নামিয়ে নিল ঝিলিক। ওর চোখ মুখের কোনও রূপান্তর হল বলে মনে হল না। ঝিলিক কি চিনতে পারছে না তাকে? নাকি চিনেও কথা বলবে না তার সঙ্গে। ঝিলিকও ঘেন্না করে হয়তো তাকে। সেটাই তো স্বাভাবিক। যেভাবে ঝিলিককে ছেড়ে...ঝিলিককে বোঝানোর অবকাশই তো পেল না প্রবাল যে সে ঝিলিককেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। কিন্তু ঋতির তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সে। সাঁতার জানে না বলে হাবুডুবু খেয়ে নাকাল হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। ঋতি তাকে মেরে ফেলছে শ্বাস রোধ করে...।

ঝিলিক উঠে চলে গেল। প্রবাল বাইরের বাগানে একা একা পায়চারি করল খানিক। সিগারেট খেল। ওদিকে জলদাপাড়ার জঙ্গল কালো হয়ে আছে। চা বাগানের ওপরে চাঁদের আলো এসে আছড়ে পড়ছে। এইদিকটা নির্জন। রাতে এদিকে আসে না কেউ। কাল রাতেই এদিকের নীচু কাঁটা তারের বেড়ার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল হাতির দল। মাঝে মাঝে চিতা বাঘও চলে আসে। তবু দাঁড়িয়েছিল প্রবাল। সিগারেটের ধোঁয়া কুয়াশার মতন ঘিরে ধরছিল তাকে আর ফুঁ দিয়ে দিয়ে সেই কুয়াশার জাল ছিঁড়ে বার বার বেরিয়ে আসছিল প্রবাল। খেলাটা খেলতে খেলতে ক্রমশই যেন নেশা লেগে যাচ্ছিল তার। সাধারণত খুব বেশি সিগারেট প্রবাল খায় না, তবু একটা সিগারেট শেষ হতেই আজ আরও একটা ধরিয়ে ফেলল প্রবাল।

সন্ধেবেলা ঘুমিয়েছে বলে রাতে ঘুম আসছিল না প্রবালের। তার কটেজের ড্রয়িং রুমের সোফায় পা ছড়িয়ে বসেছিল সে। একা থাকার পক্ষে কটেজগুলো অনেকই বড়। তবু প্রবালের খারাপ লাগছিল না। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে একটানা। অনেক দূরে কোথায় পটকা ফাটছে। ক্ষীণ আওয়াজ আসছে কানে। নিশ্চিত হাতি বেরিয়েছে ওদিকে। সেই আওয়াজের বাইরে আরও একটা শব্দ কানে আসতেই সোফার ওপরে সোজা হয়ে বসল প্রবাল।

ঠিক শুনেছে তো, নাকি মনের ভুল? তখনই আবার শব্দটা শোনা গেল। প্রবালের দরজায় খুব মৃদুসাবধানি একটা আওয়াজ। কলিং বেল না বাজিয়ে এই মধ্যরাতে কে দরজায় নক করছে এইভাবে? তবে কি...ভাবতে-ভাবতেই সোফা থেকে উঠে দরজা খোলে প্রবাল। দরজা খুলতেই সেই পরিচিত মাতালকরা গন্ধটা ঝাঁপিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জ্যোৎস্নার আলোয় বাইরের ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল ঝিলিক।

'তুই! এত রাতে! ওখানে তোকে দেখে মনে হয়েছিল তুই আমাকে চিনতেই পারিসনি!' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে প্রবাল।

'ঘরের ভেতরে আসতে দে আগে গাধা' চাপা গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলে ওঠে ঝিলিক।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে প্রবাল। সোফার ওপরে ধপ করে বসে পড়ে। প্রবাল বলে, 'চা খাবি?'

'ধুস।'

'এখানে তো আছে সব...'

'জানি। কিচ্ছু লাগবে না। তুই বোস। অহেতুক নার্ভাস হোস না হাঁদারাম...'

সেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা থেকে কলেজের পরীক্ষার সময় পর্যন্ত এমনি করেই ওকে ভরসা জোগাত ঝিলিক। প্রবাল বসে পড়ল। ঝিলিকের দিকে চেয়ে বলল, 'তোর বর...'

'চিন্তা নেই', ঝিলিক হাসে, 'কাল সকালে অন্তত আটটার আগে হুঁশে আসবে না। সন্ধে থেকে নাগাড়ে মদ গিলে এখন ফ্ল্যাট...'

'ও', এই কথার উত্তরে কী বলা যায় বুঝতে না পেরে চুপ করে যায় প্রবাল।

'বাদ দে', ঝিলিকই কথা বলে আবার, 'কেমন আছিস? ঋতি কেমন রেখেছে তোকে বল।'

'এই তো', হাসার চেষ্টা করে প্রবাল।

'কবিতা লিখিস এখনও?'

'কবিতা?' যেন কোনও অচেনা শব্দ শুনছে এমন মুখ করে ঝিলিকের মুখের দিকে তাকালো প্রবাল।

'লিখিস না আর?'

'নাহ।'

'কেন?'

'কবিতা হারিয়ে গেছে রে।'

'কেন?'

'কে জানে...'

'ঋতিকে আনিসনি কেন?'

'এমনিই।'

'ছেলেপুলে হয়েছে তোর?'

'ধুস।'

'ধুস কী রে, বাচ্চা নিয়ে নে এবার। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।' বলে ডান হাতে প্রবালকে জড়িয়ে নেয় ঝিলিক।

'আমায় দিয়ে হবে না।'

'কেন? তুই কি ইম্পোটেন্ট?'

'হুঁ।'

'কবে থেকে?' বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে ঝিলিক, 'ঋতি বলেছে?'

চুপ করে থাকে প্রবাল। ঝিলিক তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বিলি কেটে দেয় চুলে। কপালে চুমু খেয়ে বলে, 'ঋতিটা অমনই। চিরকাল। ভালোবাসা ব্যাপারটা বোঝেই না তেমন। শুধু বোঝে রিভ্যালরি। যাকে পছন্দ করি না তাকে দুমড়ে দাও এই হচ্ছে ওর নীতি...'

প্রবাল চুপ করেই থাকে। মানুষের থেকে দূরে থাকার জন্যে মাদারিহাটের এই নির্জন বাংলোয় পালিয়ে এসেছিল সে, কিন্তু ঝিলিকের সান্নিধ্য মন্দ লাগছে না তার এখন। ঝিলিকের হাত তার সারা শরীরে খেলা করে বেড়াচ্ছে এখন। প্রবাল বুঝতে পারছিল দীর্ঘদিন পরে তার শরীর আবার জেগে উঠছে। ঝিলিক বলে চলেছে, 'আমাকে পছন্দ করত না ঋতি। পরীক্ষায় আমার কাছে হেরে যেতে যেতে যখন বুঝল ওখানে আমাকে হারানো অসম্ভব, শুধুমাত্র আমার বিরুদ্ধে এক জায়গায় অন্তত জিতে যাবার নেশায় তোকে টার্গেট করল ও, আর তুইও চিরকেলে গর্ধভ...।

প্রবালের শরীর গরম হয়ে উঠছিল। পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে ঝিলিকের নিজস্ব গন্ধ এসে লাগছে এখন ওর নাকে। দু-হাতে প্রাণপণে ঝিলিককে আঁকড়ে ধরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায় প্রবাল। ঝিলিক আলতো করে প্রবালকে সরিয়ে দিল। তারপর মিষ্টি করে হেসে বলল, 'পিলু, বাইরে তাকিয়ে দেখেছিস কী তীব্র জ্যোৎস্না উঠেছে আজ?'

'হুঁ।'

'শুধুই হুঁ?'

'আজ চমৎকার লাগছে বাইরেটা। আমাদের বারান্দার ওদিকের চা বাগানটা যেন ভেসে যাচ্ছে একেবারে।'

'ঠিক বলেছিস', বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে বলে ঝিলিক, 'যাবি বাইরে?'

'এখন?'

'হুঁ।'

'বলিস কী রে? এই রাত্তিরে? জানিস কাল এখানে হাতি বেরিয়েছিল?'

'কাল বেরিয়েছিল। আজ তো নয়।'

'আজও যদি বেরোয়?'

'বেরোক গে', উঠে পড়ে ঝিলিক। প্রবালের হাত ধরে টান দেয়, 'আয় পিলু। আয় না...'

'যদি কেউ দেখে ফেলে?'

'কেউ দেখবে না। আর দেখলেই বা কী?' দরজা খুলে ফেলে ঝিলিক, 'ভীতু কাঁহিকা।'

স্নিগ্ধ উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় দুটো তৃপ্ত নগ্ন শরীর ধুয়ে যাচ্ছিল। প্রবাল ফিসফিস করে বলল, 'কী হবে ঝিনি?'

'কীসের কী হবে?' চা গাছের গুঁড়িতে আটকে থাকা জংলা রঙের টপটা টেনে নিয়ে নিজের শরীরের জ্যোৎস্নাভেজা চাঁদদুটোকে ঢেকে নিতে নিতে বলে ওঠে ঝিলিক।

'আমরা কেউই যে কোনও প্রোটেকশন নিইনি...'

'চল ওঠ', বলে প্রবালকে হালকা ঠেলা মারে ঝিলিক।

চা বাগানের সরু পথ ধরে সেই নীরব রাতে রেসর্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঝিলিক বলতে থাকে, 'আমি বাচ্চা খুব ভালোবাসি রে পিলু। কিন্তু শিমুল প্রতিদিন রাতে এতটাই বেসামাল হয়ে যায় যে ওর আমার মধ্যে ঢোকার ক্ষমতাই থাকে না আর। অথচ মজাটা হল এই কথাটা পরদিন সকালে কিছুতেই মানতে চায় না ও। উল্টে আমাকেই আজকাল বলে ডাক্তার দেখাতে। আমার নাকি সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নিশ্চিত কোনও ডিফর্মিটি আছে।' ঝিলিক হেসে ওঠে।

হঠাৎ প্রবালের হাত জড়িয়ে ধরে বলে, 'তোর বসার ঘরের টি-টেবলে একটা টুকরো কাগজে আমার ফোন নম্বর লিখে রেখে এসেছি। যোগাযোগ করিস। নেক্সট মান্থে পিরিয়ড মিস করলে তোর ফোন কিন্তু আর ধরব না। ফোন না-ধরলেই তুই বুঝে যাবি সব। তখন প্লিজ আর যোগাযোগ রাখিস না পিলু। পিরিয়ড মিস না করলে তোকে জানাবো। সময় আর সুযোগ মতন আবার ডেকে নেব তোকে। আসিস। এখানেও আরও কিছুদিন তো আছিস তুই, ম্যানেজার বললেন। আমরাও আরও দিন দুই আছি এখানে। রাতে আসব আমি আবার পিলু। এখন সময়টা ঠিকঠাক। ঠিক কনসিভ করে যাব দেখিস...ঋতি আমাকে হারিয়ে দিতে চেয়েছিল না...আমিই হারিয়ে দিলাম ওকে। তোকে নিজের শরীরের মধ্যে নিয়ে নিলাম আমি। আমার সন্তানের মধ্যে দিয়ে তোকে নিয়েই কাটাব সারা জীবন...'

ঝিলিকের কথা আর কানে ঢুকছিল না প্রবালের। ঋতির সঙ্গে থাকলে দেহে মনে যে অস্বস্তিটা হয় সেটাই মনের মধ্যে ফিরে আসছে আবার।

১০২ নম্বর কটেজের একটু দূরে এসে প্রবালকে চাপা গলায় গুড নাইট জানিয়ে ঝিলিক বলল, 'পিলু তুই এগিয়ে যা।'

নিজের ঘরে এসে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল প্রবাল। ব্যাগটা দ্রুত গুছিয়ে নিল। হাত ঘড়িতে প্রায় তিনটে বাজে তখন। প্রবাল সোফার ওপরেই বসে রইল। ঘণ্টা দেড়েক বাদে ফোন করতে হবে পিন্টুকে। আরও কয়েকদিন থাকার ইচ্ছে ছিল এখানে, কিন্তু উপায় নেই। ভালো করে ভোর হবার আগেই বেরিয়ে পড়তে হবে এখান থেকে। মানুষের থেকে দূরে সরে যেতে হবে যে করেই হোক। একলা হওয়া খুব খুব দরকার এখন তার।

বসার ঘরের টি-টেবিলের ওপরে অ্যাশট্রের নীচে একটা কাগজে নিজের সেল নম্বর লিখে রেখে গেছে ঝিলিক। কাগজটা হাতে তুলে নিল প্রবাল। একবার সংখ্যাগুলোর দিকে চোখ বুললো আলগোছে। তারপর কাগজটাকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে পিষে দলা পাকিয়ে ছুড়ে দিল ঘরের কোণে রাখা ডাস্টবিনটার দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%