জয়দীপ চক্রবর্তী

ছোট্ট লঞ্চটা দু'বার দোলা খেয়ে থেমে গেল। সুহৃদ বলল, 'চল নামব।'
ঋষভ মাথার ওপরে দু'হাত তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলল, 'সে কী রে, এসে গেলাম এর মধ্যে?'
সৃজিতা ওর দিকে চেয়ে মুখ বেঁকালো, 'বাব্বাহ, আমার তো কখন থেকেই মাটিতে পা ছোঁয়ানোর জন্যে প্রাণ আইঢাই করছে! সেই কখন লঞ্চে চেপেছি, তারপর থেকেই তো শুধু জল আর জল। পথ যেন ফুরোতেই চায় না!'
প্রীতি ওর কথা শুনে হেসে উঠল, 'ছেলেমানুষের মতো কথা বলছিস সৃজি। সুন্দরবনে এসে নদীনালা দেখবি না, গাছপালা মোড়া ছায়া ছায়া দ্বীপগুলোর গভীরতা ফিল করবি না, তো করবিটা কী?'
সৃজিতা ওর দিকে চেয়ে হাসল। তারপর ঋষভের দিকে চেয়ে চোখ মটকে বলল, 'ব্যাপার কী প্রীতি, তুই যে হঠাৎ এমন রোম্যান্টিক হয়ে উঠলি! আমাদের সুহৃদ যে তোকে মানুষ করে ফেলল রে!'
প্রীতি চোখ পাকালো, 'এই কী ভাবিস রে তোরা আমায়? ওই আনরোম্যান্টিক সুহৃদটাকে বেমক্কা অমন টপে তুলছিস কেন? আমি চিরকালই রোম্যান্টিক। জানিস, স্কুল ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা লিখতাম আমি?'
সুহৃদ রেগে যাবার ভান করল, 'একটু আগে তুই না মাঝ নদীতে জল দেখে ভয় পেয়ে কেঁদেই ফেলছিলি আর একটু হলে।'
'আমি! কই?' প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল, 'সৃজিতাই তো বরং...'
'ওমনি আমার দোষ হয়ে গেল?' সৃজিতা প্রীতির দিকে চেয়ে চোখ পাকায়, 'বেশিক্ষণ জল দেখতে অনেকেরই ভাল্লাগে না। মনে নেই, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত মোর হয়েছে বিকল...'
'অনেক কাব্যি হয়েছে কাকা', ঋষভ তাড়া লাগাল, 'চলো জয় দুগগা বলে নেমে পড়া যাক এইবার।'
সুচিন্তন চুপ করে বসেছিল। এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি সে। আর চুপ করে বসেছিল ঋতিকা। ঋতিকার এই টুরে আসার ইচ্ছে ছিল না। সুচিন্তন অত জোরাজুরি না করলে আসতও না। ওর বাড়ির লোকেরা একেবারে টিপিক্যাল বাঙালি মধ্যবিত্ত। এতগুলো চ্যাংড়া ছেলের সঙ্গে এই বয়েসের একটা মেয়েকে একলা ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি ছিল তাঁদের।
ঋতিকা নিজেও ভয় পাচ্ছিল। সুচিন্তনই বুঝিয়েছিল ওকে, 'অমন বোকার মতো বিহেভ করছিস কেন ঋতি? জলে তো পড়ছিস না। প্রিতি, সৃজিতাও তো সঙ্গে যাচ্ছে। আর ঋষভ, সুহৃদকে নিয়ে নিশ্চিত তোর মনে কোন ভয় নেই? তাছাড়া, আমি নিজেও তো আছি। আমার ওপরে কি এখনও ভরসা করতে পারিস না তুই ঋতি?'
এ কথার কী উত্তর দেবে ঋতিকা? এ কথার সত্যিই কি উত্তর হয়? আসলে এই পোড়া দেশে এখনও, এমনকী একবিংশ শতাব্দীতেও মেয়েদের যে কত সমস্যা আর কত রকমের ভয় নিয়ে পথে চলতে হয় ছেলেরা যদি তা বুঝত।
সৃজিতা আর প্রীতি দুজনেই ওর বাড়িতে গিয়েছিল। প্রীতিই বুঝিয়েছিল ঋতিরমা-কে, 'একটুও ভেবো না কাকিমা, আমরা তো সঙ্গে আছি। তাছাড়া লঞ্চ থেকে নামলেই তপনকাকু রিসিভ করে নেবেন আমাদের। তপনকাকু বাবার বিশেষ পরিচিত। থাকার ব্যবস্থা উনিই করে রাখবেন। এমনকী আমাদের দেখভালের দায়িত্বও ওঁর। বাবা বার বার করে কাকুকে বলে দিয়েছেন।'
'তপনকাকু না থাকলে আমাকেও ছাড়ত না বাড়ি থেকে।' সৃজিতা প্রীতির সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল, 'একটাই তো রাত কাকিমা, ঋতিকে ছেড়ে দাও না প্লিজ।'
এখন ব্রিজ-ট্রিজ হয়ে গিয়ে জলপথের অনেকটাই এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সুহৃদরা আপত্তি করল, 'গাড়িতে তো নিত্য দু-বেলা চড়ছি। এখানে যতটা সম্ভব লঞ্চেই যাব।' তাই এই দীর্ঘ লঞ্চজার্নি।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও সকলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হইচই করছিল ঋতিকা। মাঝেমধ্যে লঞ্চের সারেঙ এবং তার সহকারীর সঙ্গেও বকবক করছিল হাসিমুখে। দূরের দ্বীপগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে ঋতিকা জিগ্যেস করছিল, 'আচ্ছা ওই দ্বীপগুলোয় বাঘ আছে?'
'আছে।' সারেঙ হাসেন।
'আর ওই দিকে?' ঋতিকা নদীর অন্য পারের দিকে হাত দেখায়।
'ওদিকে তো মানুষের বসতি দিদিমণি' সারেঙের শাগরেদ উত্তর দেয়, 'ওদিকে বাঘ থাকে না।'
'থাকে না ঠিকই', ঋতিকাদের দিকে না তাকিয়েই বলেন সারেঙসাহেব, 'কিন্তু এসে পড়তে পারে ইচ্ছে করলেই। আসেও মাঝেমধ্যে।'
ঋতিকা অবাক হয়ে বলে, 'বলেন কী! এত বড় নদী পেরিয়ে আসে কী করে?'
'সুন্দরবনের বাঘের কাছে এ নদী কিছুই নয়', আপন মনে হাসেন সারেঙসাহেব, 'তাছাড়া, খিদে যে বড় মারাত্মক জিনিস দিদিমণি, সে কি কোনও বাধা মানে? ক্ষুধার্ত বাঘ যা খুশি করতে পারে।'
'এখানকার মানুষের তো তাহলে সবসময়েই মাথার ওপরে মস্ত বিপদ!' চোখ গোল গোল করে বলে ঋতিকা।
'বিপদ কার নেই বলেন দেখি?' আড়চোখে ঋতিকার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলেন তিনি, 'আপনাদের শহরে বিপদ নেই? আসলে বিপদ গ্রাম শহর সব খানেতেই আছে। শুধু তাদের ধরনটা জায়গায় জায়গায় আলাদা। বিপদ কি মানুষের পিছু ছাড়ে দিদি? মানুষকে চোখ কান খোলা রেখে সজাগ থাকতে হয় সর্বক্ষণ। যাতে বিপদের গন্ধটা ঠিক সময়ে নাকে এসে পৌঁছয়...'
'গন্ধ?' অবাক হয়ে বলে ঋতিকা।
'হ্যাঁ দিদিমণি, গন্ধ।' সারেঙ মাথা নাড়েন, 'বাঘের গায়ে একটা বিচ্ছিরি বোঁটকা গন্ধ আছে। বাঘ কাছে এলেই সে গন্ধ টের পাওয়া যায়। আর আমরাও তখন সাধ্যমতো সতর্ক হয়ে যাই।'
'সবসময় কি সময়মতন বিপদের গন্ধ নাকে এসে পৌঁছয় সারেঙদাদা?'
'না দিদি।' বলে একটুক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে মুখ করে থাকেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, 'কিছু বাঘ সত্যিই বড় চালাক। তাদের গতিবিধি কিছুতেই আঁচ করা যায় না। সাবধান হবার সময়টুকু অব্দি দেয় না। তাই তো আমার সোমত্ত মেয়েটা...নৌকোয় বসে এস্টোভে ভাত রান্না করছিল আমার জন্যে। আমি ছাউনির নীচে বিড়ি টানছিলুম ওর দিকে পিছন করে বসে। নিঃশব্দে কখন যে এসে টেনে নিয়ে গেল টেরটিও পেলাম না...'
'কি বলছেন! আপনার মেয়েকে বাঘে নিয়ে গিয়েছিল?' ঋতিকা বলার আগেই প্রিতি, সৃজিতা, সুহৃদ বলে উঠল সমস্বরে।
'হুঁ', ওপর নীচে মাথা দোলান সারেঙ সাহেব।
'বাঁচেনি?' নরম গলায় বলে ওঠে সুচিন্তন।
'উঁহু।'
'ইশ', বলে মাথাটাকে বুকের ওপরে নামিয়ে আনে ঋতিকা। চোখ থেকে জল ঝরে পড়ে তার।
সুচিন্তন আলতো করে হাত রাখে তার কাঁধে। মুখটাকে ওর কানের কাছে নামিয়ে এনে কী একটা বলতে যায়। আর তখনই নাক মুখ সিঁটকে বলে ওঠে ঋতিকা, 'কী বিচ্ছিরি একটা গন্ধ পাচ্ছি রে আমি। তোরা পাচ্ছিস না?'
'কীসের গন্ধ?' অবাক হয়ে বলে সুচিন্তন, 'কই আমি তো কোনও বাজে গন্ধ পাচ্ছি না!'
'সত্যিই পাচ্ছিস না? একটা বিচ্ছিরি বোঁটকা গন্ধ?' বলে অন্যদের মুখের দিকে তাকায় ঋতিকা, 'তোরাও না?'
'কই না...' অন্যরাও দুদিকে মাথা নাড়ে।
'বিশ্বাস কর, আমি মিথ্যে কথা বলছি না।' ঋতিকা হালকা কেঁপে ওঠে, 'গন্ধটা সত্যি পাচ্ছি আমি। নিশ্চিত আশেপাশে বাঘ আছে এখানে কোথাও...'
'তোর মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি রে ঋতি? তখন থেকে কী সব আবোলতাবোল বকছিস?' বলে হো-হো করে হেসে উঠল ঋষভ। তার সঙ্গে যোগ দিল অন্যরাও।
সুহৃদ বলল, 'এই, তুই কি ইচ্ছে করে আমাদের ভয় খাইয়ে দিতে চাইছিস নাকি?'
ঋতিকা কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে গেল। আর একটাও কথা বলল না।
সুচিন্তন ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল খানিক। সুহৃদ, ঋষভরাও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। ঋতিকা একেবারে স্পিকটি নট। বেচারা সুচিন্তনটাও গুম মেরে গেল তারপর থেকেই।
সারেঙের সঙ্গী লোকটা লঞ্চ থামতেই লঞ্চ বেঁধে জেটি থেকে লঞ্চ পর্যন্ত একটা সরু কাঠের তক্তা ফেলে দিল। তারপর একগাল হেসে বলল, 'বাবু, আপনারা এবারে সাবধানে নেমে আসুন এক এক করে। ভয় নেই আমি আছি।'
তপনকাকু পাড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। লঞ্চ থেকেই দেখা যাচ্ছিল তাঁকে। তপনকাকু সারেঙের পরিচিত। এ অঞ্চলে অনেকেই তাঁকে চেনে বোঝা গেল। পথে আসতে আসতে সারেঙ সাহেবও বলছিলেন, 'তপনবাবুকে কে না চেনে। তিনি এ অঞ্চলের রহিস মানুষ...'
পাড় থেকে তপনকাকু হাঁক মারলেন, 'মতি মিয়াঁ, আব্দুলকে বলো আর একজন কাউকে সঙ্গে নিয়ে পাটার পাশে বাঁশ ধরতে। শুধু পাটা ফেলে এদের নামিও না। অভ্যেস নেই। ব্যালেন্স হারিয়ে জলে পড়লে কেলেংকারির একশেষ হবে।'
তপনকাকুর বন্দোবস্তের সত্যিই কোনও তুলনা নেই। বাংলোটা আক্ষরিক অর্থেই ছবির মতো। তিন চারটে বড়বড় ঘর। ঘরে পরিপাটি করে বিছানা পাতা আছে পাশাপাশি রাখা সিঙ্গল খাটের ওপরে। একটা লম্বাটে ডাইনিং রুম। সাজানো গুছনো। রান্নাঘর খানিকটা তফাতে। তার পাশে কেয়ারটেকারের থাকার জায়গা। বাংলোর সামনে অনেকখানি খোলা জমি। সেখানে নানান রকমের গাছপালা লাগানো আছে যত্ন করে।
পাশাপাশি লাগানো ঝোপের মতো এক ধরনের গাছ দেখিয়ে তপনকাকু বললেন, 'এগুলোই হেঁতাল গাছ। সুন্দরবনের বাঘেদের খুব প্রিয় আস্তানা এই হেঁতালের ঝোপ। গাছের কালারটা দেখেছ তো? ওর মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকতে বাঘ বাবাজির খুব সুবিধা।'
গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ঋতিকার গা ছমছম করে উঠল। দমকা হাওয়ায় সেই গন্ধটা আবার উড়ে এল তার নাকে। ঋতিকা সন্তর্পণে অন্যদের মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিল একবার। না, কারো মুখেই কোনও বাড়তি অভিব্যক্তি নেই। তার মানে এবারেও ওরা কেউ গন্ধটা পাচ্ছে না।
তপনকাকু ততক্ষণে আর একটা গাছের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, 'এই হচ্ছে সুন্দরবনের গ্রেট সুন্দরি গাছ। তোমরা নাম শুনেছ নিশ্চয়ই। এই গাছ নিয়ে একটা মিষ্টি গান আছে। আগে রেডিয়োতে খুব বাজত।'
ওদেরকথার মাঝেই একজন কালো দীর্ঘদেহী সুঠাম মানুষ তপনকাকুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম জানালো।
লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েই বুকের মধ্যেটা ছ্যাঁৎ করে উঠল ঋতিকার। প্রীতি আর সৃজিতার চোখে মুখেও আতংকের ভাবটা চাপা থাকল না। এমনকী সুহৃদ, সুচিন্তন, ঋষভরাও মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল নিজেদের মধ্যে।
ওদের মুখের দিকে চেয়ে তপনকাকু হালকা হাসলেন। বললেন, 'পরিচয় করিয়ে দিই, এর নাম বকুল। আমার এই অতিথিনিবাসের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার। অসম্ভব সাহসী এবং পরিশ্রমী। বলতে গেলে সরকারি বেসরকারি অতিথিদের কাছে এই গেস্ট হাউজের যে বিপুল ডিম্যান্ড তার অনেকটাই বকুলের সৌজন্যে।'
বকুল নামের লোকটার মুখে লাজুক হাসি খেলে গেল।
তপনকাকু সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাত তুললেন। ঘড়ি দেখলেন একবার। তারপর বললেন, 'বেলা অনেকই হল। আমাকে যেতে হবে এইবার। আমার তো থাকার উপায় নেই। ফিরতে হবে আজই। তোমাদের দেখভালের জন্যে বকুল রইল। যা প্রয়োজন ওকে বলতে হেজিটেট কোরো না। যে-কোনও সমস্যায় বকুল তোমাদের পাশে থাকবে।'
তপনকাকু বকুলের কাঁধে আলতো চাপড় মারলেন একটা, 'এদের যত্নে রেখো। আমার মান-সম্মান তোমার হাতে গচ্ছিত রেখে গেলাম।'
তপনকাকু চলে যাবার পরেই সুহৃদদের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল বকুল, 'দিশি মোরগের ঝোল আর ভাত করতে বলেছি দুপুরে। সঙ্গে আলুর চোকা আর পেঁয়াজ ফোড়ন দেওয়া মুসুরির ডাল। আর কিছু লাগবে? মাছ বা চিংড়ি? তাহলে আনাতে হবে আবার...'
'না না, আবার কী লাগবে বকুলদা! এলাহি আয়োজন করেছ তো' ঋষভ বলল, 'মেনু বাড়তি হলে কোনও আইটেমই জুত করে খাওয়া যায় না।'
'যা বলেছিস!' বলে মেয়েদের দিকে চাইল সুহৃদ, 'তোদের কী বক্তব্য?'
'আমাদের আর আলাদা করে কী বলার থাকবে?' সৃজিতা বলে, 'ঠিকই তো আছে। আর কী চাই?'
প্রীতি সুহৃদের দিকে তাকিয়ে বলল, 'বরংরাতে যদি স্পেশাল কিছু খাবার ইচ্ছে থাকে এখন থেকে বকুলদাকে বলে দে।'
'হরিণের মাংস পাওয়া যাবে বকুলদা?' সুহৃদ বলে। ঋষভও তাল দেয় ওর সঙ্গে।
ঋতিকা বিরক্ত বোধ করে, 'তোরা কী রে! হরিণের মতন অমন কিউট একটা প্রাণীকে খাওয়ার কথা মনে আসে কী করে তোদের?'
বকুল হাসে, 'ক'জনই আর আপনার মতো করে ভাবে বলুন? মানুষের লোভ কত পশু পাখিকেই তো শেষ করে দিল দুনিয়া থেকে। হরিণেরও সেই দশা হবে হয়তো। আইন করে হরিণ মারা বন্ধ হয়েছে কাগজে কলমে। কিন্তু মানুষ সে কথা কি শুনছে?'
'হিংস্রতায় মানুষে আর বাঘে একটুও পার্থক্য নেই', ঋতিকা বলে।
'ঠিকই।' মাথা নাড়ে বকুল। তারপর হেসে বলে, 'যাক গে। বাদ দিন। আর হ্যাঁ, রাতে আপনাদের হরিণ খাওয়াতে পারব না ঠিকই, কিন্তু আমাদের দীনবন্ধুর রাঁধা কচি পাঁঠার ঝোলের বন্দোবস্ত করা যেতে পারে। খেয়ে দেখবেন, মুখে লেগে থাকবে একেবারে...'
'দীনবন্ধু...?' জিগ্যেস করে ঋষভ।
'এই গেস্ট হাউজের রান্নার লোক। দারুণ রান্নার হাত। একবার খেলে ভুলতে পারবেন না।'
বাঁ-হাত কনুই থেকে ভাঁজ করে ঘড়ি দেখে বকুল। তারপর বলে, 'আপনারা রিল্যাক্স করুন। আমি ততক্ষণ দীনবন্ধুর কাছে ওদিকের ব্যবস্থা-বন্দেজ কদ্দুর কী এগুলো খোঁজ নিয়ে আসি...'
বকুল চলে যেতে হাত মুখ ধুয়ে চেঞ্জ করে ঘরে এসে বসল সকলে আরাম করে। প্রীতি বড় করে শ্বাস ছেড়ে বলল, 'উঃ বাঁচা গেল। এই বকুলদা লোকটার দিকে না তাকাতেই পারছিলাম না ভালো করে।'
'যা বলেছিস!' প্রীতির কথায় সমর্থন জানায় সৃজিতা, 'মানুষকে যে এমন ভয়ংকর দেখতে হতে পারে এ লোকটাকে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। এত লোক থাকতে একেই যে কেন কাজে বহাল করলেন তপনকাকু কে জানে বাপু!'
'লোকটার মুখে কী বীভৎস রকমের কাটাছেঁড়া দেখলি?' সুহৃদ বলে।
ঋষভ বলল, 'চোখটাও যেন ঝুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে মুখ থেকে। দেখে মনে হচ্ছে চপারের কোপ খেয়েছিল নিশ্চিত...'
'নির্ঘাত ডাকাত ছিল লোকটা' গম্ভীর গলায় বলে সুচিন্তন, 'এ অঞ্চলে জলদস্যুর তো অভাব ছিল না কিছুদিন আগে পর্যন্তও।'
'এমন একটা লোকের ওপরে আমাদের দেখাশুনোর ভার দেবার কী দরকার ছিল তপনকাকুর?' ঋতিকার দিকে চেয়ে গজগজ করতে থাকে সৃজিতা, 'আবার রাতেও নাকি লোকটা এই গেস্ট হাউজেই থাকবে। যাই বলিস তোরা, আমার কিন্তু একটুও সুবিধের মনে হচ্ছে না লোকটাকে। হেবি রাগ হচ্ছে আমার তপনকাকুর ওপরে। জানে আমরা মেয়েরা থাকব, অমন একটা ডাকাতকে আমাদের সঙ্গে ভিড়িয়ে দেবার কী দরকার ছিল?'
'অত ভাবিস না তো', সুচিন্তন বলে, 'আমরা সঙ্গে আছি, কেউ কিছু করতে পারবে না তোদের।'
ঋতিকার নাকে আবার সেই গন্ধটা আসছে খোলা জানলা দিয়ে। গন্ধটা বাঘেরই গায়ের। ছোটবেলায় সার্কাসে বাঘের খেলা দেখার সময় এই গন্ধটাই পেত সে। চিড়িয়াখানাতেও বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়ালে ঠিক এই গন্ধটাই নাকে আসে। না কোনও ভুল হচ্ছে না তার। মনে মনে ভারি অস্বস্তি হতে লাগল ঋতিকার। কেন যে বার বার তার নাকে এসে লাগছে গন্ধটা? সত্যিই কি এখানে বাঘ আছে আশেপাশে? তাহলে অন্যেরা গন্ধটা পাচ্ছে না কেন?
কাউকে কিছু না বলে সবাইকে অবাক করে দ্রুত উঠে গিয়ে বাগানের দিকের জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে আসে ঋতিকা।
দীনবন্ধুর হাতের রান্না সত্যিই চমৎকার। সকলে মিলে চেটেপুটে খেল তৃপ্তি করে। সুহৃদ বলল, 'দীনবন্ধুর কাছ থেকে রেসিপিগুলো শিখে নিলে পারতিস সৃজি। বাড়ি ফিরে মাঝেমধ্যে নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে পারিস আমায়।'
'ইল্লি আর কী! তুই ছাড়া আর যেন লোক নেই পৃথিবীতে। তোর মতো বিশ্ববখাটেকে বাড়ি ডেকে খাওয়াতে বয়েই গেছে আমার...', ঠোঁট উল্টে বলে সৃজিতা, 'তবে তোর প্রথম প্রোপোজালটা নেওয়া যেতেই পারে। দিনবন্ধুদা রাজি থাকলে ওর কাছে রান্না শিখতে আমার আপত্তি নেই।'
দীনবন্ধু খাওয়া বাসনপত্র তুলতে তুলতে ওদের কথা শুনছিল আর মিটি মিটি হাসছিল। দীনবন্ধুদা মানুষটি বেশ। ভারি আন্তরিক। আর সবসময় হাসি লেগেই আছে মুখে। বকুল সে তুলনায় অনেক গম্ভীর। নিজেকে কেমন যেন একটা আবরণের আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে সর্বক্ষণ।
অন্ধকার নামবার পর থেকে বকুলকে আর এদিকে দেখা যায়নি। লোকটা যে কোথায় গেল কে জানে! এমনকী খাবার সময়েও একবারও খোঁজ নিতে এল না এদিকে। সেই সন্ধেবেলা একবার এসেছিল। তখনও সূর্যের আলো পুরোপুরি মরে যায়নি। সুহৃদের দিকে খান দুই হ্যারিকেন বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিল, 'রেখে দিন। কাজে লাগতে পারে। আর হ্যাঁ, রাতে খাওয়াদাওয়া সারতে বেশি দেরি করবেন না। এখানে সোলার এনার্জিতে আলো জ্বলে। রাত এগারোটার পরে সে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়।'
মরে আসা আলোয় বকুলকে অদ্ভুত রহস্যময় আর ভূতুড়ে লাগছিল তখন। ওর ক্ষতবিক্ষত মুখ আর ঝুলে থাকা চোখটার দিকে চোখ পড়তেই ঋতিকার গা ছমছম করে উঠল। প্রীতি, সৃজিতাও মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল অন্যদিকে।
বকুল মাথা নামিয়ে, পিছন ফিরে চলে গিয়েছিল। আর আসেনি।
ঋষভ বলল, 'দীনবন্ধুদা, বকুলদা কোথায় বলো তো?'
'দরকার ওর সঙ্গে? খবর দিতে হবে কিছু?' দীনবন্ধু জিগ্যেস করল।
'না, আসলে দেখছি না অনেকক্ষণ...'
'নিজের ঘরেই আছে। এই সময়টা ও একটু একা থাকতেই পছন্দ করে', বলে একটুক্ষণ চুপ করে রইল দীনবন্ধু। তারপর নীচু গলায় বলল, 'এ সময় খুব দরকার ছাড়া ওকে বিরক্ত না করাই ভালো।'
'কেন?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে সুচিন্তন।
'এ সময়টা ও ঠিক সুস্থ থাকে না।' বলে মাথা নীচু করে দীনবন্ধু, 'তপনবাবুও জানেন, বকুল এমনিতে খুবই ভালো, কিন্তু সন্ধের পর থেকে...'
'সন্ধের পর থেকে কী দীনবন্ধুদা?' ভয় পাওয়া গলায় বলে প্রীতি।
'একটু নেশা টেশা করে। বুঁদ হয়ে ঢুকে থাকে নিজের মধ্যেই। নিজের সঙ্গে কথা বলে। আর রোজ এই সময় ওর কাছে মালতী আসে। কথা কয় বকুলের সঙ্গে।'
'মালতী কে?' জিগ্যেস করে সুহৃদ।
'বকুলের মরা বউ।' প্রায় ফিসফিস করে বলে দীনবন্ধু, 'এই বাংলোর বাইরের জঙ্গল থেকেই বছর কয়েক আগে মেয়েটাকে বাঘে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।'
'ধ্যাৎ, তাই আবার হয় নাকি?' ঋষভ বলে, 'বাঘে টেনে নিয়ে যাওয়া মরা বউ রোজ কথা বলতে আসে বকুলদার সঙ্গে?'
ঋষভের কথায় কান না দিয়ে বলে চলল দীনবন্ধু, 'বুড়ো বাঘ ছিল। শিকার করতে পারত না ঠিক মতন। সাঁতরে নদী পেরিয়ে এসে ঘাপটি মেরে বসে ছিল চুপ করে। সুযোগ পেয়েই একেবারে মালতীর ঘাড়ের ওপরে লাফিয়ে পরে টুঁটি কামড়ে ধরে...দেখতে পেয়ে ছুটে এসে মেয়েটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল বকুল, পারেনি। থাবা মেরে ওর মুখের একদিকটা একেবারে নামিয়ে দিয়েছিল শয়তানটা। সেই থেকে সন্ধের পর বকুলটা কেমন যেন পালটে যায়...'
'তুমি কি এইসব গল্প বলে ভূতের ভয় দেখাতে চাইছ নাকি আমাদের, দীনবন্ধুদা?' সুচিন্তন বলল।
'ভয় দেখানো নয়। আপনারা বকুলের কথা জিগ্যেস করলেন বলে এতগুলো কথা বললুম।' বাসন নিয়ে উঠে পড়ে দীনবন্ধু, 'চলি। কাল দেখা হবে আবার। আপনারা বেশি রাত না করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বেন কিন্তু। বকুল বলেছে নিশ্চয়ই, এগারোটার পরে আর আলো থাকে না এ তল্লাটে...' বলতে-বলতেই যাবার জন্যে পা বাড়ায় দীনবন্ধু।
দীনবন্ধু চলে যেতেই কাঁপা গলায় প্রীতি বলে উঠল, 'আমার সত্যি সত্যিই খুব ভয় করছে রে।'
'আমারও ভীষণ গা ছমছম করছে', সৃজিতাও বলে।
'ন্যাকা নাকি রে? একটা মাতাল ধুমকির মধ্যে তার মরা বউকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে কথা কইছে আর সেই শুনে তোরা অমনি ভয়ে ভিরমি খেতে শুরু করলি! পারিসও মাইরি তোরা। নে, এক কাজ কর, তোরাও বরং এক দু'পেগ করে চড়িয়ে দে।' বলে ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে সুহৃদ।
ঋষভ জাগের পাশে রাখা জলের বোতল আর গ্লাসগুলো নিয়ে আসে। ঋতিকা হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বিরক্ত হয়ে বলে, 'তোরা এখন এইসব করতে বসবি নাকি?'
সৃজিতাও প্রতিবাদ করে ওঠে, 'তোরা এখানে এসে বেলেল্লাপনা করবি এমন কথা তো ছিল না! এমন জানলে আমি কিছুতেই আসতাম না তোদের সঙ্গে।'
'তোরা একেবারে মাস্টারনির মতো কথা বলতে শুরু করলি তো রে!' গলায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে ঋষভ, 'এমন মারকাটারি পরিবেশে এইটুকু এনজয়ও যদি না করতে পারি তাহলে আর লটবহর নিয়ে এত দূরে আসা কেন?'
'যা বলেছিস।' সায় দেয় সুহৃদ।
সুচিন্তন শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে ওদের, 'ফালতু ফালতু এত পিউরিটানদের মতো আচরণ কেন করছিস বস। আমরা তো আর কেউ মাতাল হবার মতো খাচ্ছি না।'
প্রীতিও নাকি সুরে বলে উঠল, 'কাম অন বেবি। ছেড়ে দে না। ওরা একটু এনজয় করতে চাইছে করুক না। একটা রাত্তিরেরই তো ব্যাপার।'
ঋতিকা তর্ক করল না। ক্লান্ত গলায় বলল, 'ঠিক আছে তোরা তোদের মতো করে এনজয় কর। আমি ঘরে যাচ্ছি।'
সৃজিতা বলল, 'আমিও যাব। চল।'
ঋষভ বোতলের মুখ খুলে গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলল, 'বসতে পারতিস। বসলেই তো আর খেতে হবে না। জাস্ট টু গিভ আস একমপ্যানি।'
'আমার ভালো লাগছে না। গন্ধটা নিতে পারছি না আমি।' বলে বারান্দার দিকে পা বাড়ায় ঋতিকা।
'ডিজগাস্টিং!' বলে সৃজিতাও ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ঋতিকার সঙ্গে।
প্রীতি হাত নাড়ে ওদের দিকে, 'গুড নাইট। আমি একটু ওদের সঙ্গে থাকছি রে, অ্যাঁ?'
সৃজিতা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চাপা গলায় বলে ওঠে, 'আ বিচ। ঠিক জানতাম, সুহৃদকে ছেড়ে কিছুতেই আসবে না ও।'
নিজেদের ঘরে ঢুকেও গজগজ করতে থাকে সৃজিতা, 'বেড়াতে এসে মদের বোতল নিয়ে বসে পড়াটা একদম মেনে নিতে পারছি না আমি।'
'ছাড় না।' ঋতিকা বলল, 'আমাদের কথা যখন ওরা শুনবেই না, খামোখা ঘরে বসে রাগ দেখিয়ে লাভ কী?'
'সুহৃদটার মাত্রাজ্ঞানের খুব অভাব' দাঁতে দাঁত চেপে বলে সৃজিতা, 'ওকে একটুও বিশ্বাস করি না আমি।'
'কী বলতে চাইছিস সৃজি?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে ঋতিকা।
'প্রীতি ওদের সঙ্গে না থাকলেই পারত।'
'ও তো ছেলেমানুষ নয়। নিজের ভালো নিশ্চয়ই বুঝবে ও।'
'বাদ দে। চল শুয়ে পড়ি।' লম্বা হাই তোলে ঋতিকা।
'আমি শুতে পারছি না ঋতি, ঘুম আসছে না আমার!' বলেই হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সৃজিতা। ঋতিকা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। তারপর দু'হাতে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে নরম গলায় জিগ্যেস করল, 'কী হয়েছে তোর সৃজি?'
সৃজিতা ডুকরে কেঁদে উঠল, 'আই লাভ দ্যাট গাই, বাট প্রীতি...'
'হোয়াট? তুই সুহৃদকে ভালোবাসিস?'
'হুঁ', মাথা নামিয়ে বলে সৃজিতা।
'কিন্তু ঋষভ?'
'ঋষভের সঙ্গে আমি একটা খেলা শুরু করেছিলাম ঋতি, অনলি টু মেক সুহৃদ জেলাস।'
'খেলায় জিততে কি পারলি?'
'আমি গো হারান হেরে গেছি ঋতি।' কান্নায় ভেঙে পড়ে সৃজিতা, 'আমি সর্বস্ব খুইয়ে বসে আছি এখন।'
'তুই ঋষভকেই ভালোবাসার চেষ্টা কর সৃজি এ ছাড়া আর কোনও ওয়ে আউট নেই তোর কাছে।' বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় ঋতিকা।
'কোথায় যাচ্ছিস?' সৃজিতা ওর হাত টেনে ধরে।
'ঘরের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।' ঋতিকা বলে, 'আমি বরং বাইরে খোলা আকাশের নীচে গিয়ে দাঁড়াই খানিক।
'একা?'
'হুঁ।'
'ঘরে একা থাকতে ভয় করছে আমার ঋতি।'
'কাকে ভয়?'
'ওই বকুল লোকটা যদি আমাকে একা পেয়ে...প্রথম দেখা থেকেই লোকটাকে একটুও সুবিধের মনে হয়নি আমার। কে জানে কোথায় অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে আছে। সুযোগ পেলেই বাঘের মতো লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ের ওপরে!'
'তুই বরং ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখ ভেতর থেকে।'
'তুই যে একা বেরোচ্ছিস, তাইতেই কি নিশ্চিন্তে থাকতে পারব মনে করিস?' সৃজিতাও উঠে দাঁড়ায়, 'আমরা দুজনে একসঙ্গেই বেরোই চল'
সৌর বিদ্যুতের আলো নিভে গেছে। চাঁদের আলোয় অদ্ভুত মায়াবী লাগছে চারপাশ। একটু দূরে বকুলের ছোট্ট ঘরটার খোলা জানলা দিয়ে হ্যারিকেনের আবছা আলো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে এসে চাঁদের আলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ভীষণ মিষ্টি একটা গন্ধ ঘিরে রেখেছে ঘরের চারপাশটা। মনের গভীর পর্যন্ত ঢুকে গিয়ে সেই গন্ধ যেন একেবারে আকুল করে তুলছে মন।
সৃজিতা বলল, 'একবার ঘরটার দিকে যাবি?'
'কী করবি গিয়ে?'
'দেখব।'
'কী?'
'এত রাতে এমন মিষ্টি গন্ধের মধ্যে ডুবে থেকে কী করছে লোকটা।'
'যদি বিপদে পড়ি? আমাদের একা পেয়ে লোকটা যদি!...'
'চলই না। আমাদের উপস্থিতি ওকে বুঝতে না দিলেই তো হল।'
পায়ে পায়ে বকুলের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় ওরা। খোলা জানলায় চোখ রাখে। একজন কম বয়েসি মহিলার বাঁধানো ছবি। মাথায় মোটা সিঁদুর। সামনে বাতি জ্বলছে। ধূপ জ্বলছে। সামনে চুপ করে বসে আছে বকুল। চোখ বন্ধ।
সৃজিতা ফিসফিস করে বলল, 'বকুলের স্ত্রীর ছবি।'
'হুঁ', মাথা নাড়ে ঋতিকা।
'বকুলদা তার বউকে কী ভালোবাসে এখনও, বল।'
'হুঁ', আবারও সায় দেয় ঋতিকা।
সৃজিতার দুটো ঠোঁট তিরতির করে নড়ছে। ঋতিকার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে সে বলল, 'এমন করেও তো তাহলে ভালোবাসতে পারে মানুষ। ভালোবাসা তো যায়...'
ঋতিকা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সৃজিতার মুখের দিকে। তারপর নরম গলায় বলে, 'চল, আমরা ফিরে যাই সৃজি।'
সৃজিতা আর ঋতিকা পিছু ফিরতেই বড় ঘরটার দরজা খুলে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে প্রীতি। ওর পা টলমল করছে। ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল আর একজন। এক হাত বাড়িয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে নিল প্রীতিকে। ঋতিকা, সৃজিতা দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সুহৃদ নয় প্রীতির ভারসাম্যহীন শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরে বারান্দা পেরিয়ে ছোট ফাঁকা ঘরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঋষভ।
সৃজিতা ঋতিকার হাত চেপে ধরল শক্ত করে। ওকে টেনে নিয়ে সরে গেল একটা ঝুপসি গাছের আড়ালে। সেখানে দাঁড়িয়েই দুজনে দেখল ঋষভ প্রীতিকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
সৃজিতার সারা শরীর কাঁপছে। ঋতিকার দিকে ফিরে ঠান্ডা, হিসহিসে গলায় সে বলে উঠল, 'আমার ঘুম পাচ্ছে ঋতি। আমি ঘরে যাচ্ছি। ঋষভকে পরে কোনও সময় মনে করিয়ে দিস, আয়্যাম ক্যারিং হিজ বেবি। অ্যান্ড হি টোল্ড মি দ্যাট হি উড টেক মি সামহোয়্যার টু অ্যাবর্ট ইট ইন দ্য নেক্সট উইক...'
সৃজিতা আর কোনও দিকে না তাকিয়ে হনহন করে হাঁটা লাগালো ঘরের দিকে।
ঋতিকা গোল করে বাঁধানো একটা গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। শরীরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে। জিভেও কেমন যেন একটা অজানা আড়ষ্টতা। নদীর দিক থেকে এখন একটানা হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় বকুলের ঘর থেকে ধূপের গন্ধ এসে লাগছে নাকে। একটানা হাওয়ায় গাছের পাতায় পাতায় ডালে ডালে সরসর মরমর আওয়াজ উঠছে।
ঋতিকার মনটা ভারী হয়ে উঠল।
চাঁদের ওপর দিয়ে মাঝে-মাঝেই খণ্ড-খণ্ড মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আলো আর ছায়ার লুকোচুরি চলছে আকাশ জুড়ে।
ঋতিকা জানে সৃজি এখন বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদছে। কাঁদুক। হালকা হোক খানিক। আরও কিছুক্ষণ একা থাকুক মেয়েটা, ভেবে বাইরে খোলা আকাশের নীচে আবছা অন্ধকারের মধ্যে একা একাই দাঁড়িয়ে রইল ঋতিকা।
হঠাৎ বকুলের ঘর থেকে আসা ধূপের গন্ধ ছাপিয়ে সেই বিচ্ছিরি বোঁটকা গন্ধটা আবার নাকে এসে লাগল ঋতিকার।
গন্ধটা ক্রমশই যেন আরো, আরও তীব্র হচ্ছে। শুকনো পাতার ওপরে মনে হল যেন সাবধানী পায়ের হালকা খসখস শব্দ হল। সত্যিই কি তাহলে বাঘটা খুব কাছে চলে এসেছে তার?
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ঋতিকার। চুপিসারে কখন যে বাঘটা রক্ত মাংসের লোভে এত কাছে চলে এল সে বুঝতেই পারেনি। বোঁটকা গন্ধটা এত তীব্র এখন যে নাক বন্ধ হয়ে আসছে।
কী করবে এখন সে? কী করা উচিত? ভাবতে-ভাবতেই পিছন দিক থেকে একটা অনাত্মীয় থাবা এসে পড়ল তার কাঁধের ওপরে। লোভী থাবাটা কাঁধ থেকে গড়িয়ে নীচে নামছে ক্রমাগত।
ঋতিকা বুঝতে পারল, আর একটু দেরি করলেই বাঘটা তাকে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দেবে। হিংস্রতার বিরুদ্ধে তার কোনও প্রতিরোধই আর কাজ করবে না তখন। বাঘটা তার টুঁটি কামড়ে ধরার ঠিক আগে শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় এনে চিৎকার করে উঠল সে, 'বকুলদা-আ-আ-আ'।
ঋতিকার দুচোখ থেকে জল পড়ছিল টপ টপ করে। বকুল সামনে এসে দাঁড়াল। হাসল মিষ্টি করে। তারপর খুব নরম গলায় বলল, 'প্লিজ কাঁদবেন না। মহিলারা কেউ চোখের জল ফেললে কষ্ট হয় আমার। তাছাড়া আর তো ভয় নেই। বাঘটা তো চলে গেছে।'
'যদি আমাকে একা পেয়ে আবার ফিরে আসে? এখান থেকে ফিরে যাবার পরে তো সেই বাঘের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে আপনি থাকবেন না বকুলদা?'
'শহরে ফিরে আমার প্রয়োজন হবে না আপনার...' বকুল আবার হাসে।
'কী করে বুঝলেন?'
'আপনি তো সময়মতন গন্ধ পান। চিনে নিতে পারেন বাঘের গায়ের গন্ধ। আপনার ভয় নেই। ঠিক সময়ে সাবধান হয়ে যেতে পারবেন আপনি।'
'আর আজকের বাকি রাতটুকু? আমাকে অরক্ষিত দেখে আবার যদি আমার কাছে আসতে চায় বাঘটা?'
'আর আসবে না। নিশ্চিন্তে ঘরে গিয়ে ঘুমোন আপনি। আমি আছি। আপনাকে পাহারা দিয়ে রাখব বাকি রাত...'
না, ঋষভ, সুচিন্তন, সুহৃদ, প্রীতি, সৃজিতা কারুর কানেই ঋতিকার আর্তনাদ পৌঁছয়নি। তারা এই রাত্রির গভীরতায় নিজেদেরকে ডুবিয়ে দিয়েছে।
বকুলের কাটা ছেঁড়া মুখটা চাঁদের আলোয় হিংস্র বাঘের চেয়েও ভয়ংকর লাগবার কথা। তার ঝুলে পড়া চোখ বুকের গভীরে কাঁপন জাগাবে, ঘেন্না জাগাবে এটাই হয়তো স্বাভাবিক। তবু ঋতিকা তার দিকে পূর্ণ চোখে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। বকুলকে আর তার একটুও কুৎসিত মনে হচ্ছে না এখন। বাঘের গায়ের সেই বোঁটকা গন্ধ ছাপিয়ে বকুলের ঘরে জ্বলা ধূপের মিষ্টি গন্ধটা আবার ঋতিকার নাকে এসে পৌঁছল হাওয়ায় ভর করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।