জয়দীপ চক্রবর্তী

বটতলায় দাশু মণ্ডলের চায়ের দোকানের সামনে আসতেই চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল নন্দিনীর। ছেলেগুলো আজও বসে আছে রাস্তার দিকে চেয়ে। সব মিলিয়ে জনা ছয়েক। রুখাসুখা, চোঁয়াড়ে চেহারা, চোখের দৃষ্টিতে লোভ চকচক করে। বেশ কয়েকবার ওদের মধ্যেরই একটা ছেলে ঠারেঠোরে কু-প্রস্তাব দিয়েছে নন্দিনীকে। রাজি না হওয়ায় ছেলেটা, মানে পল্টন বিচ্ছিরি নোংরা কথাও শুনিয়েছে একদিন ওকে। পানপরাগ চিবোতে-চিবোতে বলেছে, 'পঞ্চাটা তো মাল খেয়ে খেয়ে ধসে গেছে। ব্যাটা নিজেই দাঁড়াতে পারে না ভালো করে। ওরটা আর দাঁড়াবে কী করে...আমার সঙ্গে চল, পেটের খিদেও মিটবে আর অন্যদিকেও পুষিয়ে দেব তোকে।'
'ছিঃ', সত্যি-সত্যিই পল্টনের কথা শুনে গা গুলিয়ে উঠেছিল নন্দিনীর।
'বাব্বা, আমার সামনে যে একেবারে সতী সেজে গেলি রে নন্দা।' বিকেলের মরে আসা আলোয় কালচে দাঁত বের করে খুব খানিক হাসে পল্টন। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে থাকে, 'আধবুড়ো খ্যাপাটে লোকটার সঙ্গে শুতে পারিস, আর আমার বেলায় দোষ? আমি হয়ত আধ-দামড়াটার মতন অত পড়াশোনা করিনি কোনওদিন, মানছি লোকটার টাকা-পয়সাও অঢেল...জমিদার বাড়ির কত্তা বলে কথা...কিন্তু আমিও খুব খারাপ নই রে নন্দা...'
'খবরদার পল্টন, দাদাবাবাবুর নামে মিথ্যে কলঙ্ক রটাবি না বলে দিচ্ছি!' ফুঁসে ওঠে নন্দিনী, 'ভদ্দর লোক উনি। ওনার নামে এসব কথা বাজারে রটলে খুব অসম্মান হবে মানুষটার...'
'পারি না পারি না', বিচ্ছিরি একটা মুখভঙ্গি করে হেসে ওঠে পল্টন। 'তলে তলে তো তাইলে অনেক দূর রে নন্দা। রমেন চৌধুরীর মানসম্মান নিয়ে এত দুশ্চিন্তা তোর?'
'আবার বলছি পল্টন, ওই মানুষটাকে নিয়ে অমন কথা বলিস না।' নন্দিনী গলা চড়ায়।
'কেন, রমেন চৌধুরী কি ধোয়া তুলসি পাতা? শুনেছি মাল ফালও তো টানে লোকটা।'
'বাড়িতে বসে কে কী করে তা নিয়ে তোর দরকার কী? রাস্তায় বেরিয়ে কোনওদিন তো মাতলামি করেনি। কারো পাকা ধানে মইও লাগাতে যায়নি।'
'একটা আইবুড়ো লোক একা বাড়িতে তোর মতন একটা ডবকা মেয়েছেলের পায়ে কি ধান-দুব্বো দেয় রোজ নন্দা? আমাকে কি ধুর ঠাউরেছিস তুই? সে যাক গে, রমেনের সঙ্গে যা খুশি করগে যা তুই। আমার তাতে আপত্তি নেই। লোকটা পয়সাওলা। সেখান থেকে শরীর বেচে যদি কিছু আদায় করতে পারিস তুই, আমার আর কী ক্ষতি হবে তাতে। আমি তো আর তোকে নিয়ে ঘর বাঁধতে যাচ্ছি না। কিন্তু আমার প্রস্তাবটা মাথায় রাখিস। নইলে পঞ্চা যদি আবার রমেনের সঙ্গে তোর আসল সম্পর্কটা জানতে পারে তাহলে খানিক ফালতু ঝামেলা পোয়াতে হতে পারে তোদের। তোর পিরিতের দাদাবাবুর মানসম্মানের কথাটাও হাজার হোক জড়িয়ে রয়েছে ব্যাপারটার সঙ্গে...' নন্দিনীর রাস্তা ছেড়ে দেয় পল্টন।
পল্টনের প্রস্তাবে রাজি হয়নি নন্দিনী। রাজি হবার কথাও নয়। এর মাঝে দুদিন পল্টন আবার ওর পথ আটকেছিল। তারপর একদিন হঠাৎই রাতে কাজ করে বাড়ি ফেরার পর পঞ্চা বেধড়ক মারে তাকে। পঞ্চা প্রকৃতিস্থ ছিল না। কোনওদিনই থাকে না। কিন্তু এর আগে কখনও নন্দিনীর গায়ে হাত তোলেনি সে। ভালো করে দাঁড়াতে পারছিল না লোকটা, কিন্তু চোখ থেকে অদ্ভুত একটা ঘৃণা ঝরে পড়ছিল তার সেদিন। রমেন চৌধুরীর নামেও যা নয় তাই বলে যাচ্ছিল মাতালটা।
সেই শুরু। তারপর প্রায় দিনই নন্দিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে পঞ্চা। অতিরিক্ত চোলাই খাওয়ার ফলে শরীর পুরোপুরি ভেঙে গেছে। মুখের গালদুটো অস্বাভাবিক ফুলে গেছে ইদানীং। সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেলেও পায়ে শক্তি পায় না ঠিকঠাক। কিন্তু পেটে ওই রাক্ষুসে তরলটা পড়লেই একেবারে যেন বাঘ হয়ে যায় সে। আর সেই সময় নন্দিনীই একমাত্র শিকার তার।
নন্দিনী প্রথমটা বোঝাতে চেয়ে বিফল হয়েছে। প্রতিবাদ করলে চিৎকার চেঁচামেচি এমন বাড়িয়েছে পঞ্চা যে পাশের বাড়ির লোকেরা পঞ্চায়েতে নালিশ করার হুমকি দিয়ে গেছে বাড়ি এসে। তারপর থেকে সমস্ত অত্যাচার নীরবে সহ্য করার চেষ্টা করেছে নন্দিনী।
আজ ভরপেট মদ খেয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে তাকে এবং রমেন চৌধুরীকে বহুক্ষণ ধরে অকথ্য খিস্তি করেছে পঞ্চা। তাদের সম্পর্কের কথা যা মুখে এসেছে খুল্লামখুল্লা জানিয়েছে এলাকার মানুষজনকে। রাস্তার মোড়েও কিছু মানুষ আরও তাতিয়েছে পঞ্চাকে। পল্টনের দলের ছেলেরাও ছিল সেই দলে।
নন্দিনী বাড়িতেই ছিল তখন। কাজে বেরোয়নি তখনও। খবরটা কানে এসে পৌঁছতে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল সে। রমেনদাদাবাবুর বাড়িতে যেতে পা সরেনি ওবেলায়। ফোন করে জানিয়েছিল আজ দুপুরটা হোটেল থেকে খাবার এনে চালিয়ে দিতে।
পঞ্চা যখন বাড়িফিরল, দুপুর গড়াতে শুরু করেছে। ঘরের দাওয়ায় ফাইবারের একটা চেয়ার পেতে চুপ করে বসেছিল নন্দিনী। টলোমলো পায়ে পঞ্চা বাড়ি ফিরতেই মাথায় আগুন জ্বলে উঠল তার। পঞ্চার দুর্বল কাঁধদুটো দু-হাতে খিমচে ধরে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল নন্দিনী, 'রাস্তার মোড়ে ওই নোংরা নাটকটা কেন করে এলে তুমি?'
'বেশ করেছি', জড়ানো গলায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে পঞ্চা, 'তুই করে বেড়াতে পারিস, আর আমি বললে দোষ?'
'কী করে বেড়িয়েছি আমি?' আবার চিৎকার করে ওঠে নন্দিনী। রাগে অপমানে কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছে তার। মনে হচ্ছে চোখের সামনের নোংরা অপদার্থ মানুষটাকে একেবারে খুনই করে ফেলে।
'তুই একটা নষ্ট মেয়েছেলে! ওই লোকটার সঙ্গে কী সম্পর্ক তোর বল?'
'তোমাকে বলতে যাব কেন', ফুঁসে ওঠে নন্দিনী, 'তুমি তো পুরুষ মানুষই নও।'
'আমি পুরুষ মানুষ কিনা দেখবি?' বলেই ঠাস করে নন্দিনীকে চড় কষায় পঞ্চা। লাথি মারে পায়ের গোছে।
আজ প্রতিবাদ করে নন্দিনী, 'পুরুষ মানুষ হিসেবে এই ক্ষমতাটুকুই তো আছে তোমার। আর তো মুরোদ নেই কোনও কিছুর।'
'তোকে মুরোদ দেখানোর দরকার নেই আমার। কোনও বাজারে মেয়ের শরীরে আমি যাই না', বলে আবার নন্দিনীকে মারতে যেতেই পঞ্চার গায়ে এক ঠেলা মারে নন্দিনী। টাল সামলাতে না পেরে মাটির ওপরে চিৎ হয়ে পড়ে যায় পঞ্চা।
হিসহিসে গলায় বলতে থাকে নন্দিনী, 'তুমি যখন পারো না, বেশ করব আমি অন্য লোকের সঙ্গে শোবো। যা খুশি করব আমি...'
নন্দিনীর এই চেহারা আগে কখনও দেখেনি পঞ্চা। ভয়ে চুপ করে যায় সে।
ঘরে ঢুকে শাড়ি পাল্টাল নন্দিনী। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং টিপ পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক বুলিয়ে নিজের ছোট্ট ব্যাগটা কাঁধে গলিয়ে দপদপে পায়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। এতদিন নিজেকে বাঁচিয়েই চলেছে সে। কিন্তু আজ আর তেমন কোনও তাগিদ সে বোধ করল না। মনে হল এই জীবন, এই শরীর শুধু তারই। একটা অকর্মণ্য অক্ষম মাতালের জন্যে সে তার দেহ মনকে কেন ঠকাতে যাবে সারা জীবন? কিছু না করেও রমেনদাদাবাবুর সঙ্গে জড়িয়ে তাকে যখন নষ্ট মেয়েমানুষের বদনাম নিতে হয়েছে আজ...রমেনদাদাবাবু চাইলে সত্যি-সত্যিই আজ নষ্ট হয়ে যাবে সে।
দাশু মণ্ডলের দোকানের দিক থেকে তীব্র সিটির আওয়াজটা উড়ে আসতেই সেদিকে একবার আগুন চোখে তাকিয়ে নিয়ে শব্দ করে রাস্তার পাশে থুতু ফেলল নন্দিনী। মনে মনে ভাবল থুতুটা আজ সত্যি সত্যি হয়তো পল্টনের মুখের ওপরে ফেলা গেল না, কিন্তু হিসেবটা তোলা রইল ওর জন্যে।
শেষ শ্রাবণের আকাশ মুখ ভার করে রেখেছিল অনেকক্ষণ থেকেই। এখন শিরশিরে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে কাছেপিঠে কোথাও। এখানেও বৃষ্টি নামবে এক্ষুনি। দাশু মণ্ডলের দোকানের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত রমেন চৌধুরীর বাড়ির দিকে পা চালালো নন্দিনী।
জমিদারিপ্রথা লুপ্ত হবার পরে ক্রমশ জৌলুস কমেছে চৌধুরী বাড়ির। দেখভালের অভাবে মস্ত প্রাসাদের মতন বাড়িটা এখন হানাবাড়ি হয়ে ভেঙেচুরে দাঁড়িয়ে আছে কোনওক্রমে। বাড়ির অধিকাংশ বাসিন্দাই গ্রাম ছেড়ে শহরে বাড়ি করে উঠে গেছে। কর্মসূত্রে কেউ কেউ রাজ্য এবং দেশের বাইরে গিয়েও থিতু হয়েছে। রমেনবাবুরা দুই ভাই এবাড়িতেই ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু বেশ ক'বছর হল রমেনবাবুর ভাইও কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছেন।
কলকাতা যাবার সময় অকৃতদার দাদাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রমেনবাবু রাজি হননি। ভাইয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে তিনি বলেছিলেন, 'আমাকে সঙ্গে জড়িয়ো না। তাছাড়া আমিও চলে গেলে এখানকার জমি-জিরেত, পুকুর-দোকান থেকে যা আয় হয়, তা আর আদায় হবে না কোনওদিন। বারো ভূতে লুটেপুটে খেয়ে নেবে সব কিছু।'
সেই থেকে বলতে গেলে নন্দিনীরই তত্ত্বাবধানে রয়েছেন রমেন চৌধুরী। সকালবেলা পঞ্চার জন্যে একমুঠো রেঁধে রান্নাঘরে চাপা দিয়ে রেখে চলে আসে সে এবাড়িতে। তারপর থেকে সারাদিন এখানেই থাকে নন্দিনী। রান্নাবান্না করে, সংসারের বাকি কাজকর্মও তারই দায়িত্ব। রাতের রান্না করা শেষ হলেতার ছুটি। নিজের এবং পঞ্চার রাতের খাবার টিফিন কৌটোয় ভরে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে সে।
রমেন চৌধুরী মানুষটি বড় অদ্ভুত। এতবড় বাড়িটায় একা থাকেন ভূতের মতন। ঘর ভর্তি বই। সেই বইয়ের পাহাড়ে ডুব দিয়ে থাকেন অধিকাংশ সময়। কখনও কখনও নিবিষ্টমনে লিখে যান। এইসময় ভারি সুন্দর দেখতে লাগে তাঁকে। নন্দিনী শুনেছে রমেনদাদাবাবুর এইসব লেখা নাকি নানান কাগজে ছাপা হয়।
রমেনদাদাবাবু মদ খান। নন্দিনী জানে। একেকদিন সকালে দাদাবাবুর টেবিলে খালি মদের বোতল দেখেছে সে। রমেনদাদাবাবু সেসব লুকনোর চেষ্টা করেননি কখনও। কিন্তু নন্দিনীর সামনে কখনও মদ খাননি তিনি আজ পর্যন্ত। কাজকর্মের ফাঁকে নন্দিনী দেখেছে রমেনদাদাবাবু মাঝেমধ্যেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন তার দিকে। চাউনিটা অদ্ভুত। সে চোখের দৃষ্টি পড়তে পারেনি কখনও নন্দিনী। তার সঙ্গে চোখাচোখি হলে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। তখন মনে মনে খুব আফশোস হয়েছে নন্দিনীর। মাঝেমধ্যে চা দেবার সময় রমেনদাদাবাবুর হাতে হাত ঠেকেছে। শিহরিত হয়েছে সে। কিন্তু উনি এগিয়ে আসেননি কখনও।
একা একা অনেক ভেবেছে নন্দিনী, এই মানুষটা কি সন্ন্যেসী? নারীদেহের প্রতি সত্যিই কি কোনও টান নেই লোকটার?
নন্দিনী বাড়ির উঠোনে ঢুকতে না-ঢুকতেই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল। এক দৌড়ে ঘরে ঢুকল সে। ঢুকতে-ঢুকতেই ভিজে গেল খানিক। রমেন তাঁর ঘরে চুপ করে বসেছিলেন। বাইরের আকাশের মেঘের রং লেগেছে যেন আজ তাঁর মুখে। সেই মুখের দিকে চেয়ে বুক কেঁপে উঠল নন্দিনীর। টেবিলের দিকে চেয়ে আরও চমকে উঠল সে। মদের বোতলটা রাখা রয়েছে লেখার খাতার পাশে। গ্লাসের নীচে তখনও খানিকটা তরল পড়ে রয়েছে।
এখন মদ খাচ্ছেন কেন দাদাবাবু? তবে কি পঞ্চার ঘটানো কীর্তি কানে এসেছে তাঁর?
'দুপুরে খেয়েছিলেন কিছু?' ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল নন্দিনী।
'হুঁ', ছোট্ট উত্তর দিয়েই নন্দিনীর দিকে তাকালেন রমেন, 'তুমি ভিজেছ নন্দিন?'
নন্দিন ডাকটার মধ্যে এমন কিছু ছিল আজ যে নন্দিনীর বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। রমেনের মুখের দিকে তাকালো সে। দাদাবাবুর চোখদুটো সামান্য লালচে লাগছে আজ।
'চা করি?' প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে জিগ্যেস করল সে।
'তুমি খেলে বানিয়ে নাও। ভিজে গেছ। গরম চা খেলে ভালো লাগবে। আমি আজ আর চা খাব না।'
নন্দিনী আর কথা না বাড়িয়েপাশের ঘরে গেল। কাপড় ছেড়ে গা-হাত-পা মুছে নিল। বৃষ্টি পড়েই চলেছে এক নাগাড়ে। এই বৃষ্টি সহজে থামবার নয়। সম্ভবত সারারাত বৃষ্টি চলবে আজ। বাইরে দ্রুত অন্ধকার নামছে। মেঘলা আকাশে আজ তাড়াতাড়ি সন্ধে নামছে। ঠাকুর ঘরে গিয়ে ধুপ জ্বালিয়ে শাঁখে ফুঁ দিল নন্দিনী। চা বানালো না আর। রান্নাঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি রাতের রান্না চাপিয়ে দিল।
রান্না সেরে রমেনদাদাবাবুরঘরে এসে দেখল তিনি তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছেন। বোতলের মদ আরও একটু কমেছে ততক্ষণে। নন্দিনী খানিক অবাকই হল। এমন তো করেন না কখনও মানুষটা।
'এইসময় তো আপনি খান না ওসব। আজ খাচ্ছেন যে?' রমেনের কাছে সরে এসে নীচু গলায় জিগ্যেস করল নন্দিনী।
'আজ ইচ্ছে করছে।'
'কেন?'
'মনটাকে বাগে আনার চেষ্টা করছি।'
'মন ভালো নেই, তাই না?'
'হুম।'
'মাতাল লোকটা কী সর্বোনাশ করে দিল আজ!আমি আমাকে নিয়ে ভাবি না, কিন্তু আমার জন্যে আপনাকে শুধু-শুধু অপমানিত হতে হল...'
উত্তর না দিয়ে রমেন মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। নন্দিনী তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থতমত খেয়ে গেল। সেই অদ্ভুত বুঝতে না পারা দৃষ্টিটা ফিরে আসছে আবার মানুষটার চোখে। সেদিকে তাকিয়ে অবুঝের মতন জিগ্যেস করল, 'আপনি হাসছেন?'
'কী করব বলো নন্দিন?'
'আপনার রাগ হচ্ছে না? ইচ্ছে করছে না ওই নষ্ট পুরুষ মানুষটাকে মেরে মাটিতে পিষে দিতে?'
'না।'
'সত্যিই ইচ্ছে হচ্ছে না?'
'সত্যিই হচ্ছে না।'
'আপনি মানুষ না দেবতা?'
'দেবতা নই আমি নন্দিন। দেবতা হলে এত কষ্ট থাকত না আমার।'
'কী এত কষ্ট আপনার। আর আজই বা...'
'কী করে তোমায় বলি নন্দিন, আর বললে কীই বা করবে তুমি...' রমেনের কথা জড়িয়ে আসছে ক্রমশ। মাথা ঝুঁকে পড়ছে বুকের দিকে। কষ্ট করে মাথা তুলে তিনি বললেন, 'রাত হচ্ছে নন্দিন। রান্না শেষ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও আজ। বৃষ্টি বেড়েই চলেছে ক্রমাগত...'
'আজ বাড়ি ফিরব না আমি', রমেনের দিকে সোজা চোখে তাকায় নন্দিনী। ওই বাড়িতে ওর সঙ্গে থাকা যায় না। আমি এখানেই থাকব।'
'কতদিন?'
'যতদিন ইচ্ছে।'
'তা কি হয় নন্দিন?'
'আপনি ভয় পাচ্ছেন? আর ভয় পেয়ে কী লাভ? বদনাম যা হবার তা তো হয়েই গেছে দাদাবাবু। কথা তিরের চেয়েও জোরে ছোটে। যারা আজ শোনেনি, কাল তারাও শুনবে। বিশ্বাস করবে। কানাকানি করবে এই নিয়ে...'
'ভয় আমি পাচ্ছি না নন্দিন। আসলে বিশ্বাস করতে পারছি না তোমার কথা।'
'কী কথা?'
'সত্যি তুমি থাকবে আজ?'
'সত্যি থাকব।'
'আঃ', পরম স্বস্তিতে হাতের গ্লাস টেবিলে নামিয়ে রাখলেন রমেন। তারপর উত্তেজিত গলায় বললেন নন্দিনীকে, 'আজ যদি তোমার কাছে কিছু চাই, আমায় দেবে নন্দিন?'
'নিশ্চয়ই দেব', আবেগে গলা কেঁপে উঠল নন্দিনীর, 'দাদাবাবু, আজ আপনি যা চাইবেন, সব, আমার সমস্ত কিছু আপনাকে দেব বলে আমি তৈরি হয়েই এসেছি।'
'বেশ। তাহলে রান্না সেরে দ্রুত কিছু মুখে দিয়ে এসো।'
'আপনি খাবেন না?'
'নাহ।'
'তাহলে আমিও খাব না কিছু।'
'আহ, তর্ক কোরো না নন্দিন। মনে রেখো আজ তুমি কথা দিয়েছ আমি যা বলব সব শুনবে তুমি'...স্খলিত, অসহিষ্ণু গলায় বলে ওঠে রমেন।
নন্দিনী ঘর থেকে বেরোনোর সময় নিজের বুকের মধ্যের স্পষ্ট ধুকপুক আওয়াজ শুনতে পেল আজ। সারা শরীর জুড়ে আজ এক অন্য রকমের অনুভূতি। শুধু আনন্দেরই নয়। প্রতিশোধেরও। পঞ্চা, পল্টন, সক্কলের দেওয়া অপমান যেন ফিরিয়ে দেবার এক আশ্চর্য সুযোগ আপনা থেকেই আজ হাতের মধ্যে চলে এসেছে তার।
এই বৃষ্টির আবহাওয়ায় প্রকৃতি শীতল হয়ে আছে। তবু অনেকক্ষণ ধরে সাবান মেখে স্নান করল নন্দিনী। এই রাত্রিবেলাতেও। নিজের ব্যাগ খুলে সুগন্ধীর কোটো খুলে স্প্রে করল ঘাড়ে, বগলে, স্তন সন্ধির গভীর খাঁজে। তারপর ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল রমেনের ঘরে। তার লেখার টেবিলের সামনে।
রমেন টেবিলের ওপরে মাথা নুইয়ে বসেছিলেন। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে আজ একটু বেশিই নেশা হয়ে গেছে তাঁর। নন্দিনী মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, 'দাদাবাবু।'
বেশ কষ্ট করেই মাথা তুললেন রমেন চৌধুরী। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, 'এসেছ নন্দিন?'
'এই তো এসেছি আমি, বলুন কী করতে হবে?' নিজের গলার স্বরে নিজেই চমকে উঠল নন্দিনী। মনে হল আজ যেন তার মধ্যে থেকে অন্য কোনও নন্দিনী কথা বলে উঠল।
রমেনের তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল, তবু তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নন্দিনীর দিকে। বাইরে তখনও ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। সেই শব্দের মধ্যে থেকেই যেন ভেসে এল রমেনের অস্পষ্ট ডাক, 'নন্দিন।'
'বলুন।'
'এই নাও চাবি', রমেন তাঁর লেখার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চাবি বের করে বাড়িয়ে দিলেন নন্দিনীর দিকে, 'এই চাবিটা ওই কাঠের পুরোনো আলমারিটার', রমেন হাত বাড়িয়ে ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আলমারিটা দেখিয়ে দেন তাকে, 'আলমারি খুললে দেখবে ওর মধ্যে কিছু পুরোনো শাড়ি, শায়া আছে। আর একটা পাথরের বাক্সে আছে কিছু গয়না। তুমি ওগুলো পরে এসো আজ। ওগুলো পরার পরে তোমাকে কেমন লাগে আমি দেখতে চাই...'
'ওগুলো কার?'
'আমার মায়ের।'
'আমি ওগুলো এখন পরব কেন দাদাবাবু?'
'আহ, তুমি বড্ড প্রশ্ন করো নন্দিন। হাতে সময় বেশি নেই। বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে আমার। তাড়াতাড়ি করো তুমি...আর হ্যাঁ, শাড়ির নীচে ব্লাউজ পরার দরকার নেই আজ।'
শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল নন্দিনীর। দ্রুত হাতে চাবি ঘুরিয়ে আলমারির পাল্লা হাট করে খুলে ফেলল সে। পছন্দসই শাড়ি বের করল একখানা। লাল টুকটুকে বেনারসি। সঙ্গে লম্বা সোনার মটরদানা হার, কঙ্কণ, নথ...
আয়নায় চোখ পড়তে নিজেই নিজেকে চিনতে পারল না নন্দিনী। রমেনও হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে।সেই দৃষ্টির সামনে কেমন যেন নিজেকে অবশ লাগছিল নন্দিনীর। রমেন সম্মোহিতের মতন বলে উঠলেন,'ওই বিছানায় উঠে বোসো নন্দিন, পা দুখানা সামনে ছড়িয়ে।'
তাই বসল নন্দিনী। রমেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। এগিয়ে আসছেন নন্দিনীর দিকে। পা টলছে। মাথা নুইয়ে পড়ছে। তবু এগিয়ে আসছেন তিনি। নন্দিনীর বুকের মধ্যে দামামা বাজছে। নিজের শরীরটাকে কোনওমতে টেনে হিঁচড়ে বিছানায় তুললেন রমেন। অশক্ত শিথিল হাতে নন্দিনীর হাত জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, 'কেন তোমাকে এত পছন্দ করি জানো নন্দিন?'
কেন?' রমেনের মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে জিগ্যেস করে নন্দিনী।
তার আঁচল ক্রমশ কাঁধ থেকে পিছলে নেমে আসছে। ঘরের মৃদু আলোয় ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে তার নিটোল এবং ভারী বুকদুটি। নন্দিনী আঁচল কাঁধে তুলে নেবার চেষ্টা করল না। বরং আদর করে রমেনের মুখটাকে টেনে আনল সেই বুকের ওপরে। দু-হাত দিয়ে চেপে ধরল তার খোলা বুকের ওপর।
কিন্তু রমেনের মুখ এখন ক্রমশ সেই উন্মুক্ত বুক থেকে গড়িয়ে নেমে আসছে তার কোলের দিকে। আর কোন স্বপ্নের দেশে তলিয়ে যেতে যেতে মগ্নস্বরে বলে চলেছেন তিনি, 'তোমার মুখের আদল, বুকের গড়ন ঠিক যেন আমার মায়ের মতন নন্দিন। যখন আট বছর বয়েস তখন মা চলে গিয়েছিলেন, আজকেরই দিনে। এমনই এক আঠাশে শ্রাবণের বর্ষণমুখর রাত্রিবেলা। সেই থেকে আমার মায়ের স্নেহস্মৃতি আগলে পড়ে আছি আমি এই ঘরে। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখলাম নন্দিন, মনে হল আমার সেই মা বুঝি ফিরে এসেছেন তোমার মধ্যে দিয়ে...আজ আমার মায়ের মতন করে সাজিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল তোমায়। সাজিয়ে দেখলাম তুমি সত্যিই আমার মা। আমার ছোট্টবেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই মা-ই...'
রমেনের কথা আর শোনা যাচ্ছিল না। নন্দিনীর কোলে মাথা রেখে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছেন মানুষটা। বুকের মধ্যে তোলপাড় করা ঝড় থেমে গিয়ে দু-চোখে প্লাবন ডাকা কান্না নেমে এল নন্দিনীর। স্খলিত আঁচলের তলায় থাকা তার ঈষৎ আনত বুকদুটির দিকে একটু তাকিয়ে রইল নন্দিনী। তারপর আঁচল দিয়ে ধীরেসুস্থে নিজেকে ঢেকে নিল সে আবার।
নন্দিনী মা হয়নি কখনও। তবু এই আশ্চর্য বৃষ্টির রাতে সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল, আঁচলের নীচে তার দুই স্তন যেন দুধে ভরে উঠছে আজ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।