টিলা ও লোকটা

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মোটাসোটা গুঁড়িওলা একটা বড়ো গাছের আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল লোকটা৷ চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল, সন্ধ্যের অন্ধকার ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে৷ বড়ো বড়ো উঁচু গাছগুলোর আগায় শেষ সূর্যের অবশিষ্ট আলো৷

নীচের ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়, আগাছায় ইতিমধ্যেই গাঢ় অন্ধকারের লুকোচুরি খেলা৷ ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির ক্রমে স্তব্ধ হয়ে আসছে৷ এখন শুধু কিছু ডানা ঝাপটানোর শব্দ৷ এই সময় দিনের আওয়াজ ক্রমশ কমতে থাকে আর রাতের জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ বেড়ে উঠতে থাকে৷

যদিও এটা ভয় পাবার মতো তেমন কোনো জঙ্গল নয়, কারণ সেরকম কোনো ভয়ংকর বন্যজন্তুর কথা শোনা যায় না৷ তবু জঙ্গল মানেই একটা গা-শিরশিরানো ব্যাপার বই কী! তাই খুব সাবধানেই চলাফেরা করতে হবে, ভাবল লোকটা৷ অথচ এই সন্ধ্যে বা রাত্রি ছাড়া এ কাজের জন্য উপযুক্ত সময়ও তো নেই৷ তাই বাধ্য হয়েই এ সময়টা বেছে নিতে হয়েছে ওকে৷

সকলের চোখ এড়িয়ে গোধূলির পড়ন্ত আলোয় এই টিলার ওপরে উঠে এসেছে সে৷ বড়ো একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যে হওয়ার অপেক্ষা করেছে৷

একটু উঁচুতেই শুরু হয়েছে ঘন জঙ্গল৷ সেই জঙ্গলের মুখে গা-ঢাকা দিয়ে চারিদিকে নজর রাখতে হয়েছে৷ পথচলতি ছুটকো- ছাটকা কেউ যদি এদিকে এসে পড়ে আর কোনোভাবে তার নজরে পড়ে যেতে হয়, এই আশঙ্কা ওকে সাবধান করেছে৷ তাই কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে সে অপেক্ষা করেছে, করতে বাধ্য হয়েছে৷

এবার, এই অন্ধকার যখন একটার পর একটা কালো ছোপে ঢেকে দিচ্ছে প্রকৃতির অন্য সব রং, তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে লোকটা তার কাজে নামার উদ্যোগ নিল৷

শাল, সেগুন, বট, পাকুড়, শিমুল-হাজার রকমের বড়ো বড়ো গাছের এই জঙ্গলে পথ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর৷ কিন্তু এর আগে দু-দিন এসে একটু একটু করে হালহদিশ নিয়ে গেছে সে, তাই তার মনে মনে চিহ্নিত করা পাকুড় গাছের পাশ দিয়ে সে হেঁটে ভিতরে ঢুকল৷

এখান দিয়ে গিয়ে শাল গাছের একটা সারি পড়বে, তার বাঁ-দিক দিয়ে এগিয়ে উত্তর দিকে যেতে থাকলে বিশাল একটা কদম গাছ, সেটাই ওর নিশানা৷ আশেপাশে আরও অনেকগুলো ছোটো গাছের মধ্যে ওই বড়ো গাছটাকে অনায়াসে চেনা যায়৷ ওর পিছনে ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটা পাথরের স্তূপ যেখানে ঢাকা পড়ে আছে, আসলে সেটাই হয়তো ওর সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হয়ে থাকবে৷

ভাবতেই কেমন একটা শিহরণ জাগল ওর গায়ে৷ ও ছাড়া আর কেউই এখন পর্যন্ত এর সন্ধান জানে না৷ এমনকী ও নিজেও জানে না আদৌ এটাই ওর লক্ষ্যস্থল কি না৷ তবে আজ আর শেষ না দেখে ও ফিরবে না, এটাই ও মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে৷ আজ ওকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতেই হবে৷

ভাবতে ভাবতেই ওর গা গরম হয়ে ওঠে৷ চারিদিকে তাকিয়ে দেখে, সন্ধ্যের অন্ধকার এখন আরও জমাট বাঁধা৷ এখান থেকে টিলার নীচেটাও আর দেখা যাচ্ছে না৷ কারণ ওর চারপাশেই এখন গাছের ঘেরাটোপ৷

সুতরাং নিশ্চিন্ত হয়ে বুকপকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বার করে সে৷ প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে আসে ছোট্ট একটা টর্চ৷ টর্চ জ্বেলে কাগজটা একবার পড়ে নেয় সে৷ তারপর টর্চটা জ্বেলেই শাল গাছের সারির পাশ দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকে৷

দিন চারেক আগে শেষ যেবার এখানে এসেছিল, তখন ওই পাথরের স্তূপের আড়ালে একটা রহস্যময় ইঙ্গিত আবিষ্কার করেই ওকে থেমে যেতে হয়েছিল৷ কারণ সেদিন আর হাতে সময় ছিল না একদম৷ তবু যেটুকু দেখেছিল, তাতেই একটা অজানা অভাবিত প্রত্যাশায় বুকটা নেচে উঠেছিল৷ আর সেই থেকে আরও অদম্য কৌতূহলে মনের ভেতরটা শুধুই ছটফট করেছে৷ অভীষ্টসিদ্ধির কাছে পৌঁছেও তাকে ছুঁতে না পারলে যেমন কষ্ট হয়, তেমনই এক অস্থিরতা এই ক-দিন ওকে কুরে কুরে খেয়েছে৷

সেদিন ছোট্ট শাবলটা আর সে ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি, গুঁজে রেখে গিয়েছিল পাশেই একটা ঝোপের ভেতর৷ আর তারপর থেকেই সে সুযোগ খুঁজছিল বারবার৷ অবশেষে আজ সেই সুবর্ণ সুযোগ৷ অনেকদিন ধরে, অনেক কষ্ট সহ্য করে সে এই দিনটার অপেক্ষা করেছে৷ অনেক রাত্রি তার না ঘুমিয়ে কেটেছে৷ আর সময় নেই৷ আজ তাকে লক্ষ্যে পৌঁছোতেই হবে৷ ভাবতে ভাবতেই তার হাঁটার গতি দ্রুত হয়৷

আরও প্রায় কুড়ি মিনিট হেঁটে সে এসে পৌঁছোল সেই কদম গাছের নীচে৷ এর আগে যে দু-বার এখানে এসেছে, দুটোই ছিল দুপুর বেলা৷ আজ একে সন্ধ্যের গাঢ় অন্ধকার, তার ওপর ঝোপঝাড় আগাছায় ভরা জঙ্গলে পথ করে করে এগোতে হয়েছে ওকে৷ তবু শেষ পর্যন্ত কদম গাছটার কাছে এসে ও একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল৷

এতক্ষণের পরিশ্রমে রীতিমতো ঘাম বেরোচ্ছে৷ পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘাম মোছে৷ টর্চটা তো জ্বালানোই ছিল৷ এবার আর একবার সেই কাগজটা বার করে সে৷

এই ছোট্ট কাগজটাই ওর একমাত্র আশা ভরসার স্থল৷ এটাই হয়তো ওকে সারাজীবনের মুক্তির সন্ধান জানিয়ে দেবে৷ ভাবতেই ওর মুখ-চোখ সহসা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে৷ তারপরেই হঠাৎ কী একটা উদ্বেগে যেন বিহ্বল হয়ে ওঠে৷ তড়িঘড়ি টর্চের আলোটা ঘুরিয়ে কদম গাছের পেছন দিকটায় আলো ফেলে৷ আর তখনই নিশ্চিন্ত হয় সে৷ নাঃ, ঠিকই আছে৷ ওই তো সেই তার চেনা পাথরের স্তূপ৷ অন্ধকারেও ঠিক জায়গাতেই এসেছে ও৷ যাক বাবা, নিশ্চিন্ত৷

এবার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সে সেই কদম গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে৷ পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে কাগজটা খুলে টর্চের আলো ফেলে৷ আর একবার ভালো করে পড়ে নিতে হবে ব্যাপারটা৷ তারপর শুরু হবে আসল কাজ৷

আর ঠিক সেই মুহূর্তে-

তীব্র একটা ফোঁসফোঁসানি শব্দের সঙ্গেসঙ্গে ও একবার শুধু অনুভব করল, ওর ছড়ানো ডান পায়ের ওপর কে যেন প্রবল গায়ের জোরে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ চেপে ধরল৷ পরমুহূর্তেই বিভীষিকার মতো কালো রঙের একটা বিদ্যুৎকে উঠে দাঁড়াতে দেখল ওর মুখের সমান উচ্চতায়৷

একটু দূরে দাঁড়িয়ে অন্ধকার আবছায়াতে মোটা একটা লাঠির মতো বাঁ-দিকে-ডান দিকে ধীরে ধীরে দুলছে-কী ওটা? ওর মাথার কাছটা দুগগাবাড়ির পঞ্চপ্রদীপের মতো মেলে ধরা-তাতে ভয়ংকর একটা চিহ্ন আঁকা, যে চিহ্নটা ওর পরিচিত, খুবই পরিচিত৷

এ তো গোখরো সাপ!

চিহ্নটা পলকের মধ্যে ওর রক্ত হিম করে দিল৷ শরীর থেকে নিমেষের মধ্যে যেন সমস্ত রক্ত বের করে নিল, আর ওর গলা চিরে সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এল একটা মরণান্তিক আর্তনাদ৷ যদিও সে আর্তনাদ শোনার মতো ধারে-কাছে কেউই ছিল না, শুধু সেই আর্তনাদ শুনে সাপটা যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ফণা গুটিয়ে নিয়ে সরসর সরসর করে এঁকেবেঁকে মিলিয়ে গেল দুর্ভেদ্য জঙ্গলের অন্ধকারে৷

আর লোকটা-আতঙ্কে, যন্ত্রণায়, ভাবনায় পাগল হয়ে যাওয়া লোকটা তার ক্লান্ত চোখ তুলে সেই চলে যাওয়াটা দেখল৷

ওর শরীরে এখন আর একফোঁটাও জোর নেই৷ ও শুধু অনুভব করছে, ওর পা থেকে কোমর বেয়ে শরীরের উপরিভাগে একটা অসাড় ভাব উঠে আসছে খুব দ্রুত৷ ওর জিভ, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ গলা দিয়ে একটুও আওয়াজ বেরোচ্ছে না৷

টর্চটা হাত থেকে ছিটকে দূরে পড়ে গিয়েও জ্বলছে৷ সেই আলোয় ও হাত বাড়িয়ে বাড়িয়ে পাশে কিছু একটা ধরার চেষ্টা করল৷ মাথা তুলে অন্ধকারের মধ্যে যেন কাউকে খুঁজে দেখতে চাইল৷ প্রচণ্ড একটা তৃষ্ণায় ওর বুকের ভেতরটা এখন ফেটে যাচ্ছে৷ শুকনো ঠোঁটটা জিভ দিয়ে চেটে নিল দু-বার৷ বার কয়েক হেঁচকি তুলল৷ তারপর মাথাটা এলিয়ে দিল পিছন দিকে, প্রাচীন কদম গাছটার মাটির ওপরে ছড়ানো শিকড়গুলোর ওপর৷

হঠাৎ কনকনে ঠান্ডা একটা হাওয়া বইতে শুরু করল উত্তর দিক থেকে৷ জঙ্গলের প্রত্যেকটা গাছের পাতায় পাতায় শিরশির করে বইতে বইতে সেই হাওয়া যেন সকলকে সতর্ক থাকার হুঁশিয়ারি দিয়ে গেল৷

আর তখন লোকটা অনুভব করল, সেই হাওয়া যেন ওর যন্ত্রণাময় শরীরটাতেও হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ছোটোবেলার মায়ের মতো আদর করে করে ঘুমপাড়ানি গান গাইছে, আর তা শুনতে শুনতে ওর ক্লান্ত দু-চোখ জুড়ে নেমে আসছে পরম শান্তির ঘুম৷

Cov3
অধ্যায় ১ / ১১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%