প্রচেত গুপ্ত

বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠল বিজন সরখেলের। লোকটা এসব কী বলছে! এবাড়িতে ভূত আছে! শুধু আছে না, কে ভূত তাও নাকি জানা নেই! মানুষের ছদ্মবেশে লুকিয়ে রয়েছে। এসব কথার মানে কী? লোকটা কি তাকে ছেলেমানুষ ভেবেছে?
'তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ কাসু? আমি কি ক্লাস এইটে পড়ি?'
কাসু নামের লোকটা নিচু গলায় বলল, 'আপনাকে আমি ভয় দেখাতে যাব কেন? আমিই তো আপনাকে এখানে নিয়ে এলাম।'
কথাটা সত্যি। এই লোকই বিজনবাবুকে খবর দিয়ে এখানে এনেছে। জায়গাটা শহর থেকে কম দূর নয়। সেই ভোরবেলা রওনা দিতে হয়েছে। বাস, নৌকো, ভ্যান-রিকশতে চেপে শেষ পর্যন্ত এই বিকেল গড়িয়ে সন্ধের মুখে এসে পৌঁছোনো গেল। শিরশিরে বাতাস বইছে। বোঝা যাচ্ছে, রাত বাড়লে, ঠান্ডাও বাড়বে। পথ অনেকটা। তবে জায়গাটা দেখে মন ভরে গিয়েছে বিজনবাবুর। একেবারে শুনশান। ধারেকাছে কোনও বাড়িঘর নেই। মানুজন চোখে পড়ে না। একপাশে ধূ-ধূ প্রান্তর, অন্যপাশে বড় বড় গাছ জঙ্গলের মতো ঘন হয়ে রয়েছে।
কাসু বলেছে, ওই হালকা জঙ্গলের পিছনে নাকি একটা ছোট নদী আছে। বিজনবাবু খুব খুশি। এমন স্পট চট করে মেলা সহজ কথা নয়। বাড়ি মনের মতো হয় তো, জায়গা পছন্দ হয় না। আবার জায়গা ভালো তো বাড়িতে গোলমাল থাকে। এ একেবারে সোনায় সোহাগা। সাজিয়েগুজিয়ে নিলে এই পোড়োবাড়ি একটা দারুণ টুরিস্ট স্পট হয়ে যাবে। এমন একটা জায়গায় খোঁজ দেওয়ার জন্য অফিসে যে খুশি হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দোতলা হলেও বাড়িটা বড় আর ছড়ানো। আগেরকার দিনের জমিদার বাড়ি যেমন হত। সামনেও জায়গা অনেকটা। নিশ্চয় একসময়ে ফুলের বাগান ছিল। গাছ লাগিয়ে সে ফুলের বাগান আবার ফিরিয়ে আনা যাবে। জমিদারের ঘোড়ায় টানা গাড়িও এখানে এসে দাঁড়াত বোধহয়। কোম্পানি চাইলে এখানে বেড়াতে আসা লোকজনের জন্য আবার ঘোড়ার গাড়ি ব্যবস্থা করতে পারে। নদীর ধারে হাওয়া খেতে যাবে।
বিজনবাবু মনের খুশি ভাব চেপে রেখেছেন। বেশি পছন্দ হয়েছে জানতে পারলে দাম বাড়িয়ে দেবে। তবে কাজ ঠিকমতো হলে কাসু লোকটাও ভালো টাকা পাবে। খবর দেওয়ার পারিশ্রমিক। এই কাজে খবরটাই আসল। খবর 'ভালো' হওয়া চাই। কিন্তু লোকটা এখন এসব কী বলছে!
বিজনবাবু নিজেকে সামলে নিয়ে রাগ রাগ গলায় বললেন, 'আমাকে যখন তুমি নিয়েই এলে তখন ভূত-টূতের কথা বলে গোলমাল পাকাতে চাইছ কেন?'
বাড়ির মুখে মস্ত লোহার গেট। তবে নামেই 'গেট'। এখন আর গেট নড়তে চড়তে পারে না। ভেঙে, মরচে পড়ে, গোড়ায় জঙ্গল হয়ে মাটির সঙ্গে আটকে গিয়েছে। 'হা-হা' করছে। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে দেখবার কেউ নেই। এই পোড়োবাড়িতে কেউ থাকে নাকি? পথে কাসু জানিয়েছে, সে ছাড়া আরও দুজন থাকে। জগদীশ আর বিল্ব।
বিজনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, 'ওরা আবার কারা? জমিদারের বংশধর নাকি? লতাপাতায় এরকম অনেকে থাকে। বাড়ি বিক্রিবাটার সময় টাকাপয়সা চায়।'
কাসু বলল, 'না, ওরা জমিদারের বংশধর নয়, তবে ওই বাড়ির কর্মচারীদের বংশধর। জগদীশের পূর্বপুরুষ ছিলেন
এবাড়ির রাঁধুনি আর বিল্বরা আট পুরুষ আগে মালির কাজ করতেন।'
বিজনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, 'সে তো অনেককাল আগের কথা। এখনও এবাড়িতে থাকে কেন?'
কাসু একটু চুপ করে থাকে। তারপর খানিকটা নিজের মনেই বলল, 'যাবে কই? মায়া কাটিয়ে যাওয়া কি সহজ কথা?'
বিজনবাবু বললেন, 'আর তুমি? তুমি এবাড়ির কে?'
কাসু তার নস্যি রঙের মাফলারটা ভালো করে জড়াতে জড়াতে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, 'শুনেছি, একসময়ে নাকি আমার পূর্বপুরুষরা জমিদারবাড়ি পাহারা দিত। পাহারাদার ছিল।'
বিজনবাবু গোড়া থেকেই লক্ষ্য করছেন, লোকটার গলা ফ্যাসফ্যাসে। তিনি বললেন, 'ও, তুমিও ওদের মতো এখানে রয়ে গেছও?'
কাসু মাথা নামিয়ে বলল, 'আর ভালো লাগছে না। অনেকদিন হয়ে গেল। তাই তো বাড়িটা বেচে দেওয়ার চেষ্টা করছি। জমিদারের বংশধরেররা বাইরে থাকেন। আপনি রাজি হলে কথা বলিয়ে দেব।'
বিজনবাবু বিরক্ত গলায় বললেন, 'সে তো বুঝলাম। কিন্তু ওই দুজন আবার ফ্যাকড়া না তোলে। ওই যে কী নাম বললে যেন? জগদীশ আর কী যেন...।'
কাসু বলল, 'ফ্যাকড়া তুলবে কেন? বাড়ি কি ওদের? তবে একজন একটু গোলমেলে।'
বিজনবাবু ভুরু কুঁচকে বলেন, 'গোলমেলে! কে গোলমেলে?'
কাসু গলা খাকাড়ি দিয়ে বলল, 'এইটাই তো বোঝা মুশকিল। বাইরের কেউ তো পারেই না।'
এসব কথা আসবার সময় পথে হয়েছে। তখন 'গোলমাল' বলেই চুপ করে গিয়েছিল, এখন বাড়িতে পৌঁছে সেই গোলমালের কথা বলল। আর তাতেই বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠেছে বিজনবাবুর। কাসুকে প্রায় ধমকই দিলেন।
কাসু খোলা লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকতে ঢুকতে গলা নামিয়ে বলল, 'উদ্ভট কথা হবে কেন? যা জানি তাই বললাম। পরে বলতে পারবেন না, আমি কিছু লুকিয়েছি। এবাড়িতে যারা এখন থাকে তাদের মধ্যে একজনের গোলমাল রয়েছে। লোকে বলে সে নাকি মানুষ নয়।'
বিজনবাবু দাঁত কিড়িমিড় করে বলল, 'মানুষ নয় তো কী? ভূত? পোড়োবাড়ির ভূত?'
কাসু বলল, 'অত জানি না স্যার। লোকে যা বলে তাই বললাম। দেখলেন তো যে লোকটা ভ্যান চালিয়ে বড় রাস্তা থেকে নিয়ে এল, সেও কতটা দূরে নামিয়ে চম্পট দিল?'
বিজনবাবু গোড়া থেকেই লক্ষ্য করে দেখছেন, কাসু লোকটার গলার স্বর যেমন খ্যাসখ্যাসে, কথাবার্তাও ক্যাটক্যাটে।
রাখঢাক নেই। ক'দিন আগে টেলিফোনে যখন প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল তখনও একই ভাবে কথা বলছিল। ফোন এসেছিল বেশি রাতে। বিজনবাবু রাতের খাওয়া সেরে ঘুমোতে যাচ্ছিলেন এমন সময় মোবাইল বাজল।
'স্যার, আপনিই তো বিজন সরখেল? পুরোনো বাড়ি কেনাবেচার ব্যাপারে কথা বলব।'
রাতে ফোন আসায় বিজনবাবু বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু কাজের ব্যাপার বলে কথা। বেশি বিরক্ত হওয়া যায় না। গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, 'আপনি কে?'
টেলিফোনের ওপাশের লোকটা বলল, 'আমার নাম কাসু। আমাকে আপনি করে বলবেন না। বয়েসে ছোট। স্যার তো পোড়োবাড়ির ব্যবসা করেন?'
বিজনবাবু বললেন, 'আমি করি না, আমি যে অফিসে কাজ করি তারা করে। পছন্দ হলে এই ধরনের বাড়ি কেনে।'
ওপাশের ফ্যাসফ্যাসে গলা বলল, 'জানি স্যার, আপনি ওই কোম্পানির পোড়োবাড়ি ডিপার্টমেন্টে আছেন।'
'পোড়োবাড়ি ডিপার্টমেন্ট' কথাটা শুনতে কেমন যেন লাগে। আসলে বিজনবাবু যে কোম্পানিতে নতুন চাকরি করছেন, তারা সস্তায় বেশ কিছু পুরোনো, ভেঙে পড়া বাড়ি কিনে নিচ্ছে। এধরনের বাড়িকে মুখে মুখে 'পোড়োবাড়ি'ই বলা হয়। কোনওটা রাজাদের বাড়ি ছিল, কোনওটা ছিল জমিদারদের, কোনওটা আবার ব্রিটিশ আমলে গোড়ার দিকে তৈরি। বহু বছর কেউ থাকে না। জানলা দরজা ভেঙে গেছে। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে। বট অশ্বথ গাছ ডালপালা মেলছে। 'সিংহ দরজা'র 'সিংহ' উধাও। বাড়ি ঘিরে এখন শুধুই ঝোপ জঙ্গল। ভিতরের সিঁড়ি, বারান্দা, বড় বড় ঘরগুলোর ভগ্নদশা। এই বাড়িগুলোর দিকে বিজনবাবুর অফিসের নজর। শর্ত একটাই, বাড়ি হতে হবে লোকালয় থেকে দূরে। নির্জন নদীর ধারে, ছমছমে জঙ্গলের পাশে, অথবা টিলার কাছে। এইসব বাড়িগুলো হয় ভেঙে, নয় মেরামত করে হোটেল, গেস্ট হাউস তৈরি করা হবে। শহরের মানুষ বেড়ানোর জায়গা পেয়ে যাবে। কিছু বাড়ি আবার রেখে দেওয়া হবে সিনেমার শ্যুটিং-এর জন্য। বিজনবাবুর কাজ হল, ঘুরে ঘুরে জুতসই পোড়োবাড়ির খোঁজ করে বেড়ানো।
সেদিন রাতে কাসু বলেছিল, 'আমার কাছে পুরোনো বাড়ি আছে। কম করে দুশো বছরের পুরোনো। নেবেন?'
বিজনবাবু বললেন, 'বাড়ি পছন্দ হলে, দরদামে পোষালে আর মালিকানায় ঝামেলা না-থাকলে নেওয়া হবে।'
লোকটা টেলিফোনের ওপাশ থেকে বলল, 'দেখতে যাবেন? দেখলে ঠিক পছন্দ হবে। পাশে নদী, জঙ্গল দুটোই রয়েছে।'
বিজনবাবু একটু চুপ করে রইলেন। পোড়োবাড়ি গছাবার জন্য অনেকেই বানিয়ে অনেক কিছু বলে। সব বিশ্বাস করলে চলে না।
বিজনবাবু বললেন, 'কতদূর?'
কাসু বলল, 'দূর আছে। এক রাত থাকতে হবে। ওই বাড়িতেই ব্যবস্থা করে দেব। রাতে থাকলে সবটা ভালো বুঝতে পারবেন না। এরকম বাড়ি চট করে পাবেন না। আপানার অফিস খুশি হবে।'
বিজনবাবু কড়া গলায় বললেন, 'আমার কোম্পানি খুশি হবে কিনা তোমাকে বুঝতে হবে না। রাতে থাকতে বলছ কেন?'
কাসু একটু চুপ করে থেকে বলল, 'রাত ছাড়া কোনও জায়গারই সবটা বোঝা যায় না। আপনার কি স্যার রাতে থাকতে ভয় করছে?'
বিজনবাবু সেদিনই বুঝেছিলেন, লোকটা যা মুখে আসে বলে দেয়। আজ আবার বুঝতে পারলেন। ভূতের ভয় দেখানোর আগে তো একটু ভাববে।
'তুমি ভূতে বিশ্বাস করো।'
কাসু যেন হালকা বিরক্ত হল। বলল, 'আমার বিশ্বাস করা না করায় কী আসে যায়? আমি ইনফরমেশন দিলাম। চলুন, ভিতরে ঘুরে সব দেখে নিন। এরপর আলো পড়ে যাবে। তবে আমি এখন চললাম। বাকি দুজনে সব ব্যবস্থা করে দেবে।'
কথা শেষে মুখ ফিরিয়ে হনহনিয়ে হাঁটা দিল কাসু।
বিজনবাবু ভূতের ভয় পান না। তিনি যে কাজ করেন তাতে ভূত, সাপ খোপ, বাদুড়, পেঁচা কোনও কিছুরই ভয় পেলে চলবে না। এই বাড়ি তার এখনই পছন্দ হয়েছে। ভূতের গল্প তাকে ঘাবড়াতে পারবে না। কিন্তু কাসু তাকে এসব বলছে কেন? লোকটার কি কোনও অভিসন্ধি রয়েছে? নাকি নিজে ভীতু? আবার এমনও হতে পারে, হয়তো পরীক্ষা করে দেখছে। ভয় পেয়ে পালায় কিনা। নিশ্চয় তার মতো আগেও কয়েকজনকে এনেছিল সে। ভূতের গল্প শুনে পালিয়েছে। লোকটা চালাক আছে। বিজন সরখেল মনে মনে হাসলেন। এই বাড়ির একটা বন্দোবস্ত না করে তিনি এখান থেকে যাচ্ছেন না।
দোতালার দক্ষিণদিকে একটা খুব বড় ঘরে বিজনবাবুর থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। ঘরটা মোটের ওপর ঠিকঠাক। দরজা জানলাগুলো অন্তত আস্ত রয়েছে। ভিতর থেকে শক্ত করে আটকানো যায়। একটা সেগুন কাঠের মস্ত খাট রয়েছে। অনেক উঁচু সিলিঙে লোহার করিবরগা। জগদীশ এসে পরিপাটি করে বিছানা পেতে দিল। একটা কম্বলও দিল। ব্যবস্থা দেখে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন বিজনবাবু। রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। জগদীশ মানুষটা বয়স্ক। এখনই ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে গিয়েছে। মাঙ্কি ক্যাপ পরা। তার ওপর গায়ের মোটা চাদরটাকে টেনে নিয়েছে থুতনি পর্যন্ত। মুখ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। প্রশ্ন করলে 'হু, হাঁ'— এর বেশি জবাব দিচ্ছে না। বিজনবাবু গায়ে পড়ে কথা বলতে গেলেন। যদি বাড়ি সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়। শুধু কাসুর কথা শুনলেই তো হবে না।
'তুমি এখানে অনেক বছর আছ।'
জগদীশ বলল, 'হু।'
বিজনবাবু বললেন, 'এই বাড়ি আরও অনেকে কিনব বলে দেখে গিয়েছে না?'
জগদীশ বলল, 'হাঁ।'
বিজনবাবু বললেন, 'কেনেনি কেন? দামে পোষায়নি? নাকি গোলমাল আছে?'
জগদীশ বলল, 'জানি না।'
বিল্ব লোকটার বয়স অত বেশি নয়। পায়জামার ওপর ফুলহাতা সোয়েটার পরেছে। কেমন একটা অস্থির অস্থির ভাব। চোখে ভয়। কাকে ভয়? ঘন ঘন এদিক-ওদিকে তাকায়। চমকে চমকে ওঠে। যেন আশেপাশে কেউ রয়েছে। বিল্বই ঘুরিয়ে বাড়ি দেখাল। তাকেও একই প্রশ্ন করলেন বিজনবাবু।
'বাড়িতে গোলমাল কিছু আছে?'
বিল্ব চাপা গলায় বলল, 'আছে।'
'কী গোলমাল?'
বিল্ব চারপাশ দেখে আরও চাপা গলায় বলল, 'এখানে একজন আছে বাবু।'
বিজনবাবু বললেন, 'একজন আছে! কে আছে?'
বিল্ব একথার উত্তর না দিয়ে বলল, 'আপনি তাড়াতাড়ি বাড়ি দেখেন। অন্ধকার নামছে। ঠান্ডা বাড়ছে।'
আলো থাকতে থাকতে চট করে বাড়িটা ঘুরে দেখে নিলেন বিজনবাবু। মস্ত ছাদ, লম্বা বারান্দা। বড় বড় গাছ ডালপালা নিয়ে বারান্দার ওপর এসে পড়ছে। এখানে মানুষের ছদ্মবেশে ভূত ঘুরে বেড়ায় এই গল্পটা যতই আজগুবি হোক, বাড়িটা সত্যি গা ছমছমে। এই বাড়িতে অতি চমৎকার হোটেল বা গেস্ট হাউস বানানো যাবে। বেশ একটা রোমাঞ্চকর বেড়ানোর জায়গা হবে। মোবাইলে অফিসের বসকে সব জানালেন বিজনবাবু। বাড়ির পাশের জঙ্গল, নদীর কথাও বললেন।
'আর একটা মজার বিষয় আছে স্যার।'
অফিসের বস বললেন, 'কী মজা?'
বিজনবাবু এদিক-ওদিক দেখে হেসে বললেন, 'এখানে নাকি ভূতও রয়েছে।'
বস বললেন, 'মানে!'
বিজনবাবু বললেন, 'সেই ভূত নাকি মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়, দুজন মানুষের মধ্যে একজন। চট কেউ চিনতে পারে না। গিয়ে সব বলব।'
বস উত্তেজিত গলায় বললেন, 'এই বাড়ি আমাদের চাই বিজনবাবু। উইথ ভূত। একবারে ভূতশুদ্ধু চাই। পোড়োবাড়ির ভাবটা নষ্ট করব না। শুধু খানিকটা অংশ মেরামত করে নেব। বিজনবাবু, দরকার হলে একদিনের বদলে আরও একদিন থেকে আসুন। কে ভূত জেনে ফিরবেন। তাকে এই বাড়িতে পাকা চাকরি দিয়ে দেব। আমাদের বানানো এই টুরিস্ট স্পটের নাম হবে, ভূতের সঙ্গে একই বাড়িতে। কেমন হবে? এত চাহিদা হবে যে ঘর দিতে পারব না।'
ফোন রেখে বিজনবাবুও বসের মজায় একচোট হেসে নিলেন। তবে দু'দিন লাগল না, প্রথম রাতেই বিজন সরখেলের ভূত চেনা হয়ে গেল।
আটটা বাজাতে না বাজতে খাবার রাতের খাবার দিয়ে গেল জগদীশ। রুটি আর ঝাল ডিমের ঝোল। ঘন ঠান্ডার মধ্যে অতি উপাদেয়। খেতে খেতে হাসি পেল বিজনবাবুর। জগদীশ যদি ভূত হয়, তাহলে বলতে হয়, ভূতদের রান্নার হাত খুবই ভালো। বিল্ব এল আর একটু পরে। খাটের পাশে জলের জগ, মোমবাতি, দেশলাই রাখল। তার ছটফটানিটা যেন একটু বেড়েছে।
বিজনবাবু বললেন, 'কাসু কোথায়? সেই যে আমাকে পৌঁছে গেল আর তো দেখতেই পাচ্ছি না।'
বিল্ব রাগ রাগ গলায় বলল, 'সন্ধের পর ও এখানে আসতে চায় না। ভয় পায়। সব আমাদের করতে হয়।'
বিজনবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'ভয় পায়! কাকে ভয় পায়?'
বিল্ব দরজার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, 'জানি না। রাতে আমরা নিজের ঘরে দরজায় খিল দিয়ে থাকি।'
বিজনবাবু হেসে বললেন, 'আমি জানি। ও তোমাকে আর জগদীশকে ভয় পায়। চিনতে পারে না কোনওজন...।'
কথাটা বলে জোরে হেসে উঠলেন বিজনবাবু। বিল্ব তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যেন পালাল। বিজনবাবু ঘরের দরজায় খিল তুলে, ওপর নিচে দু-দুটো ছিটকিনি এঁটে খাটে উঠে এলেন। পুরোনো দিনের খাট অনেকটা উঁচু। দেরি না করে গায়ে মোটা কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লেন বিজনবাবু। ঠান্ডা খুব। কাল সকালে কাসুর সঙ্গে ফাইনাল কথা বলে নিতে হবে। সেরকম বুঝলে এখান থেকেই না-হয় বাড়ির মালিকের কাছে চলে যাওয়া যাবে। এসব কাজ ফেলে রাখতে নেই। সারদিনের ক্লান্তিতে দ্রুত চোখ জুড়িয়ে এল তার।
বিজন সরখেলের ঘুম ভাঙল শিরশিরে ঠান্ডায়। কোথা থেকে যেন বরফের কুচির মতো ঠান্ডা বাতাস আসছে। ধড়ফড় করে উঠে বসলেন বিজনবাবু। ঘর অন্ধকার। কেউ যেন শিশি থেকে একগাদা কালি ফেলে দিয়েছে। সেই অন্ধকারেই বিজনবাবু দেখতে পেলেন, দরজা হাট করে খোলা। কীভাবে খুলল? কে খুলল? খোলা দরজার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে! কেউ নয়, জমাট বাঁধা খানিকটা কুয়াশা। একটা অবয়বের মতো। পরনে খাটো ধুতি, গায়ে আলোয়ান, মাথায় পাগড়ি। একটা লাঠিও ধরা রয়েছে। কে ও? মানুষ? মানুষ হলে চোখ, মুখ, হাত, পা কোথায়? কিছুই দেখা যাচ্ছে না। না, কিছু নেই, সব শূন্য। ভয়ে শরীর জমে গেল বিজনবাবুর। তিনি কোনওরকমে কাঁপা গলায় বললেন, 'কে? কে ওখানে?'
ফ্যাসেফ্যাসে চাপা স্বর বলল, 'ভয় পাবেন না স্যার। আমি কাসু। আমার পূর্বপুরুষ এবাড়ি পাহারা দিত। এখন আমি দিই। বহু বছর হয়ে গেল। মরে যাওয়ার পর ভেবেছিলাম ছুটি পাব। পাইনি স্যার। ক্লান্ত লাগে। রোজ সকাল হলে ভাবি চলে যাব। বাড়িটা বিক্রির জন্য লোক ডেকে আনি। কিন্তু রাত হলে এই বাড়ির মায়া, স্মৃতি সব আবার ফিরে আসে। পূর্বপুরুষরা ফিসফিস করে বলেন, ছিঃ কাসু, তোর না বাড়ি পাহারা দেবার কথা, আর তুই নিজেই বাড়িটা বিক্রি করে দিতে চাস! ছিঃ-ছিঃ। তখন বুঝি, পারব না স্যার। মায়া কাটাতে পারব না। কাল সকালে হলে চলে যাবেন। দরজা খোলা বলে ভয় পাবেন না, আমি বাইরে পাহারায় রইলাম।'
কথা শেষ করে চোখ—মুখহীন কুয়াশার অবয়ব পিছন ঘুরল। বিজনবাবু হাড় কাঁপানো ঠান্ডাতেও দরদর করে ঘামতে ঘামতে শুনতে পেলেন, লাঠির আওয়াজ 'ঠক-ঠক' করে দূরে চলে যাচ্ছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন