সৈকত মুখোপাধ্যায়

পাঁকালকাকার কথা তোমাদের আগেও বলেছি বোধহয়। আরে না না। মাছ কেন হবেন? মাছকে কেউ কাকা বলে ডাকে নাকি? আমি কি পাগল? উনি দিব্যি মানুষ, পণ্ডিত মানুষ। ভালো নাম পঙ্কজলাল মিত্র। ডাকনাম পাঁকাল।
আমাদের পাড়ায় একটা পুরোনো আমলের লাইব্রেরি আছে। জমিদারদের প্রতিষ্ঠা করা লাইব্রেরি—নাম সারস্বত সম্মেলন। এককালে লাইব্রেরিটার খুব সুখ্যাতি ছিল, কিন্তু এখন জরাজীর্ণ দশা। পাঁকালকাকা ওই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। লাইব্রেরির পেছনে একটা ছোট ঘরে কাকা একাই থাকেন। ওনার তিনকূলে আর কেউ নেই।
সারাদিন গল্পের বইয়ের মধ্যে বসে থাকেন বলেই কিনা জানি না, পাঁকালকাকা ভয়ঙ্কর বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারেন। এমনিতে গল্প কিছু খারাপ জিনিস নয়। গল্পের বই পড়ার জন্যেই তো আমরা সারস্বত সম্মেলনে যাই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, পাঁকালকাকা ওনার বানানো ঘটনাগুলোকে কিছুতেই গল্প বলে স্বীকার করবেন না। বলেন, সবই নাকি ওনার জীবনের অভিজ্ঞতা।
ওনার কথা বিশ্বাস করলে মেনে নিতে হয়, যা কিছু উনি ব্যবহার করেন সবই হয় ঐতিহাসিক, না হলে প্রাগৈতিহাসিক। ওনার পাঞ্জাবির বোতামগুলো ডায়নোসরের ডিমের খোলা দিয়ে বানানো, যদিও সাদা চোখে আমরা প্লাস্টিকের বোতামের সঙ্গে কোনো তফাত খুঁজে পাই না। যে ভাঙা পেতলের স্টোভটায় উনি রান্না করেন, সেটাতেই নাকি মাদাম কুরি পিচ-ব্লেন্ড জ্বাল দিয়ে রেডিয়াম বার করেছিলেন।
আমি, শমী, বিশু আর পাপ্পু—আমরা চার বন্ধু সার কথা বুঝে গেছি। পাঁকালকাকা নামেও পাঁকাল, কাজেও পাঁকাল। ওনাকে চেপে ধরা আমাদের ক্ষমতায় কুলোবে না; উনি ঠিক পিছলে বেরিয়ে যাবেন। তার চেয়ে ওনাকে খোঁচা মেরে মুখ থেকে কিছু আজগুবি গল্প বের করে নেওয়া অনেক ভালো।
আমরা তক্কে-তক্কে থাকি, কখন পাঁকালকাকাকে একটু খোঁচা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
কদিন বাদেই এসে গেল সেরকম একটা সুযোগ, মানে যাকে বলে একেবারে সুবর্ণ সুযোগ। তখন সন্ধে ছ'টা বাজে। আকাশে মেঘ জমে অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। পাঁকালকাকাকে একটু আগেই দেখে এসেছি, নিজের ঘরে খাতা কলম-টলম গোছাচ্ছেন। একটু বাদেই লাইব্রেরি খুলবেন। আমরা চারজন লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে আড্ডা মারছি আর অপেক্ষা করছি কখন পাঁকালকাকা আসেন। উনি এলে পুরনো বই ফেরত দিয়ে নতুন বই ইস্যু করিয়ে নিয়ে যাব।
এমন সময় কালবৈশাখীর ঝড় উঠল। সামান্য সময়ের ঝড়, তাতে কিছুটা ধুলো আর শুকনো পাতা উড়ল ঠিকই, কিন্তু বড় কোনো বিপদ ঘটল না। শুধু কোথাও বোধহয় তার-টার ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে, তাই এদিকের পুরো পাড়াটায় লোডশেডিং হয়ে গেল। লাইব্রেরির চত্বরটাও ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল, আর তার মধ্যেই পাঁকালকাকার নাকি সুরে আর্তনাদ শুনতে পেলাম—ওরে, তোরা কেউ আছিস নাকি রে? তোদের কাছে কি টর্চ আছে, টর্চ? একটু দেখা না বাবা এদিকে। পায়ের ওপর দিয়ে সড়াৎ করে কী যেন একটা চলে গেল বলে মনে হচ্ছে।
আমরা চার বন্ধু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পাঁকালকাকার ঘরের দিকে দৌড়লাম। বিশুদ্ধ টর্চ আমাদের কারুর কাছেই ছিল না, কিন্তু একটা করে স্মার্টফোন সবার পকেটেই ছিল। আর সেসব ফোনের ফ্ল্যাশলাইট-মোড মানে টর্চের বাবা। অতএব একটু বাদেই চারটে ফোনের ফ্ল্যাশলাইটে পাঁকালকাকা আলোর বন্যায় ভেসে গেলেন। উনি ভারি অপ্রস্তুত মুখে বললেন, আহা, তোরা কি আমাকে হিরো বানিয়ে বায়োস্কোপের শ্যুটিং করছিস নাকি? মুখ থেকে আলো সরা। এইদিকে আলো দেখা, এই চৌকির তলায়। চটিটা কোথায় গেল? এই তো, পেয়েছি। দাঁড়া, দরজায় তালা-টা লাগাই। চল, এবারে লাইব্রেরির দিকে যাই।
পাঁকালকাকার সঙ্গে লাইব্রেরির দিকে যেতে-যেতেই পাপ্পু কুটুশ করে মোক্ষম চিমটি-টা কাটল। বলল, পাঁকালকাকা। আপনার ঘর ভর্তি এত দামি দামি জিনিস। আগ্নেয়গিরির লাভা দিয়ে আপনি দাঁত মাজেন। একটা তিরিশো টাকার টর্চ কিনতে পারেন না? আজ যদি আমরা না থাকতাম কী বিপদেই পড়তেন বলুন তো।
তখনো কারেন্ট আসেনি। লাইব্রেরি-ঘর খোলা আর না খোলা সমান। সেইজন্যেই বোধহয় পাঁকালকাকা ফুঁ দিয়ে ধুলো সরিয়ে সিঁড়ির ওপরেই বসে পড়লেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, শেষবার টর্চলাইট ব্যবহার করেছিলাম ইন দা ইয়ার নাইনটিন ফরটিটু। আন্দামানের সেলুলার জেলে। তখন আমার মাত্র তেইশ বছর বয়েস।
তারপর থেকে অন্য কোনো টর্চলাইট হাতে নিতে করুণা হয়, বুঝেছিস? করুণা। যে-হাত একবার কালো আলোর টর্চ হাতে ধরেছে, সেই হাত ধরবে তোদের ওই তিন-ব্যাটারির ছেলে ভোলানো খেলনা! ছোঃ!
এরপর আমাদেরও আর বসে না পড়ে উপায় কী বলো? বিশু একবার শুধু শুকনো গলায় বলেছিল, কালো আলোর টর্চ? যাঃ, কী সব আজগুবি কথা বলেন বলুন তো। আলো আবার কালো হয় নাকি?
কাকা কুঁতকুঁতে চোখদুটো তুলে বিশুকে ভস্ম করে দিয়ে বললেন, যাদের জগতটা ছোট তাদের কাছে আজগুবিই লাগবে। তবে আমি তার একটু আগেই জেলের কুঠুরির মধ্যে বসে জেরাল্ড আর্চারের 'থিয়োরি অফ স্ট্রেচেবল টাইম' পড়েছি। আমার কাছে অতটা আজগুবি লাগেনি।
আমি বিনীতভাবে প্রশ্ন করলাম জেরাল্ড আর্চার কোনদেশের বৈজ্ঞানিক পাঁকালকাকা?
শমী জিগ্যেস করল, 'থিয়োরি অফ স্ট্রেচেবল টাইম' বইটা কি এখনো পাওয়া যায়?
কাকা একটা বিড়ি ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, দাঁড়া। আগে মানিকের প্রশ্নটার উত্তর দিই। শোন। জেরাল্ড আর্চার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হবার জন্যে জন্মেছিল, কিন্তু হয়ে উঠতে পারেনি। তার জন্যে কিছুটা তোদের এই পাঁকালকাকাই দায়ী। খোদ ব্রিটেনের প্রাইম-মিনিস্টার চার্চিল সাহেব একটা স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে আর্চারকে আন্দামানে নিয়ে এসেছিলেন। সেটা কী পরে বলছি।
আর্চারের বয়স তখন আমারই মতন হবে, মানে ওই তেইশ কি চব্বিশ। ছিপছিপে চেহারা, তীক্ষ্ন নাক আর চওড়া কপাল। বুদ্ধিদীপ্ত দুই চোখের তারায় যেন সারাক্ষণ প্রাইমাস স্টোভের নীল শিখা জ্বলছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পার্টিকল-ফিজিক্স বিভাগের উজ্জ্বলতম ছাত্র ছিল জেরাল্ড। উইনস্টন চার্চিলের নির্দেশে এ দেশে চলে এসেছিল।
এমনিতে ওর সঙ্গে আমার মতন রাজনৈতিক কয়েদির দেখা হওয়ার কথা নয়। ওর তো আর কয়েদি ঠ্যাঙানোর কাজ ছিল না। তবু যে হল, তার কারণ আমার অঙ্কের খাতাগুলো।
জেলের কুঠুরিতে বসে অন্যান্য বন্দিরা যখন গীতা-টিতা পড়ত কিম্বা ভারতমাতার উদ্দেশে কবিতা লিখত, আমি তখন আমার মাস্টারমশাই সত্যেন্দ্রনাথ বোস মশাইয়ের দেখিয়ে দেওয়া রাস্তায় গ্র্যাভিটন বলে একটা কণার অস্তিত্ব অঙ্ক কষে প্রমাণ করার চেষ্টা করতাম। গ্র্যাভিটির টান ব্যাপারটা বুঝিস বোধহয়। সেদিন যদি অঙ্কটা মেলাতে পারতাম তাহলে ওই টানের ব্যাপারটা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ছকের মধ্যে চলে আসত। আগেই বলে দিই, অঙ্কটা আজ অবধি কেউ মেলাতে পারেনি।
যা বলছিলাম। তোরা জানিস বোধহয়, সেই পরাধীনতার যুগে জেলখানার মধ্যে বন্দিরা যা কিছু লিখত বা আঁকত সবই জেলখানার সাদা-চামড়ার অফিসারেরা খুলে খুঁটিয়ে দেখে নিত। দেখে নিত, তার মধ্যে সিডিসাস মানে দেশদ্রোহিতামূলক কোনো ব্যাপার আছে কিনা। বিপ্লবীদের মধ্যে সিংহভাগই বাঙালি ছিল বলে সেলুলার জেলে যেসব সাহেবের পোস্টিং হত তাদের বাংলাটা ভালো করেই শিখতে হত। গীতার ভাষ্য কিম্বা কবিতা-টবিতা বুঝতে ওদের বিন্দুমাত্র অসুবিধে হত না। কিন্তু যেটা ওরা কিছুতেই স্থির করতে পারত না সেটা হল আমার অঙ্কখাতার জটিল ইকুয়েশনগুলো আদতে বোমার মশলার ফর্মূলা কিনা। তাই জেরাল্ড আর্চার যখন অক্সফোর্ড থেকে আন্দামানে উড়ে এলো তখন জেলের অফিসারেরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এবং এক-দিস্তে ওরকম অঙ্ক খাতা আর্চারের টেবিলে ফেলে দিয়ে বলল, প্লিজ চেক দেম।
যা শুনেছি, চেক করতে জেরাল্ড আর্চারের খুব বেশি সময় লাগেনি। এই দিন দশেক মাত্র। তার পরেই একদিন সেই ইয়ং জিনিয়াস আমার সেলের গরাদের সামনে এসে কোমরে দুহাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ইংরিজিতে যে প্রশ্নটা করল সেটাকে বাংলা করলে দাঁড়ায়—এই কালা আদমি। গ্র্যাভিটনের এই অঙ্কগুলো কোন ইওরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে চুরি করেছিস?
আমি গরাদের ভেতর থেকেই সমান তেজে উত্তর দিলাম বিজ্ঞানের ইতিহাসটা আগে ভালো করে পড়ে এসো। গ্র্যাভিটন হচ্ছে 'বোসন-কণা' পরিবারের এক কাল্পনিক সদস্য। আর বোসন কণার ধারণাটা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনি ছিলেন আমার মাস্টারমশাই, শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ বোস। আমার মতোই কালা আদমি। আর একটা কথা শুনে রাখো। মাথার বাইরের চামড়াটা সাদা, কালো, হলুদ যা ইচ্ছে হতে পারে। তার জন্যে ভেতরের ঘিলুর কোনো তফাত হয় না। এটাও বৈজ্ঞানিক সত্য।
আমার কথাগুলো শুনে জেরাল্ড আর্চার গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল। যাবার আগে গরাদের মধ্যে দিয়ে হাত গলিয়ে আমার খাতাগুলো ফেরত দিয়ে বলল, জেলের অশিক্ষিত অফিসারগুলো যদি তোমাকে খাতা-পেন্সিলের ঠিক মতন সাপ্লাই না দেয় তাহলে আমাকে বোলো। আর আমি অর্ডার দিয়ে যাচ্ছি, তোমার সেলে একটা ভালো টেবিল-ল্যাম্প দিয়ে দেবে আর সন্ধে হলেই আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার নিয়মটা আজ থেকে আর তোমার ক্ষেত্রে খাটবে না। আমি নিজেও একটু-আধটু অঙ্ক কষি তো। এটা বুঝি যে, ডিসিপ্লিনের মধ্যে অঙ্ক হয় না।
ও চলে যাবার পরে ফিরিয়ে-দেওয়া খাতাগুলো উলটে পালটে বুঝলাম, অঙ্ক জিনিসটা ও আমার চেয়ে একটু হলেও বেশি বোঝে। কারণ যে দু-একটা জায়গায় আমি আটকে গিয়েছিলাম সেগুলোর মধ্যে কয়েকটাকে অচেনা এক হস্তাক্ষর দিব্যি টেনে নিয়ে গিয়ে শেষ করেছে। জেরাল্ড আর্চার ছাড়া ওগুলো আর কার হাতের লেখা হবে?
পরের দু-মাসে আমার আর জেরাল্ডের মধ্যে ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল। আমরা দুজনেই দুজনের গুণের কদর করতাম। কিছু কিছু আটকে যাওয়া অঙ্ক দুজনেই দুজনকে দেখিয়ে নিতাম। তবে একটা কথা ঠিক, আমি কীসের পেছনে পড়ে আছি সেটা ও জানলেও, ও যে কী নিয়ে রিসার্চ করছে সেটা কোনোদিনই আমাকে বলেনি। না বলে দিলে আমার পক্ষে বোঝা সম্ভবও ছিল না। কারণ ওর রিসার্চের অনেকটাই ছিল মেশিনপত্রের ব্যাপার। খাতার অঙ্কের হাতে-কলমে প্রয়োগ। শুধু ইক্যুয়েশন দেখে সে ব্যাপারে কোনো আইডিয়া করা ছিল অসম্ভব।
তবে প্রতিদিন সকালে যখন জেলের সামনের পাঁচিল-ঘেরা মাঠে কয়েদিদের ড্রিলে অংশ নিতাম, তখনই দেখতে পেতাম সেলুলার জেলের ওই বিশাল পাঁচিলে ঘেরা জমির অন্য এক কোণে খুব দ্রুত মাথা তুলছে ঝাঁ-চকচকে বিশাল এক ল্যাবরেটরি। বন্দরের দিক থেকে গড়াতে গড়াতে ওদিকে চলে যেত ষোলোচাকা আঠেরোচাকার সব মিলিটারি-ট্রাক। সমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়ায় তাদের আচ্ছাদন সরে গেলে দেখতে পেতাম অত্যাধুনিক সব যন্ত্রাংশ—টারবাইন, আর্মেচার, ক্যাপাসিটর, আরো অনেক কিছু, যাদের নামও জানি না—সব ওই জেরাল্ড আর্চারের ল্যাবরেটরিতে ঢুকে যাচ্ছে।
কৌতূহল হত, খুবই কৌতূহল হত। কিন্তু যতক্ষণ না জেরাল্ড নিজের মুখে কিছু বলছে ততক্ষণ তো ওকে জিগ্যেস করতে পারি না যে, ওই ল্যাবরেটরিতে কী নিয়ে গবেষণা চলছে। তা সে যতই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকুক না কেন। তাছাড়া জেরাল্ডও নিশ্চয় যুদ্ধকালীন গোপনীয়তার কথাই ভাবত। হাজার হোক, আমি একজন স্বদেশী বিপ্লবী। যদি কোনোদিন ছাড়া পেয়ে বাইরে যাই...যদি ফাঁস করে দিই সেলুলার জেলের পাঁচিলের আড়ালে বেড়ে ওঠা এক ব্রিটিশ প্রোজেক্টের কথা? সেইজন্যেই পিওর ম্যাথামেটিক্স ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আমরা কখনোই আলোচনা করতাম না।
তারপর হঠাৎই একদিন সমস্ত গোপনীয়তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেল। কলকাতা হাইকোর্টে আমাকে নিয়ে যে বিচার-বিচার খেলাটা চলছিল, সেই মামলার রায় বেরোল। শুনলাম আমার ফাঁসির অর্ডার হয়েছে।
শুনে আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলাম না। কেনই বা হব? সেদিন আমার এক চোখে যদি ছিলেন সত্যেন বোস, তাহলে অন্য চোখে অরবিন্দ ঘোষ। তিনি তখনো ঋষি হননি। আমার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা তো তাঁর হাতেই। কাজেই যেমন দিন কাটাচ্ছিলাম তেমনই কাটাতে লাগলাম।
আমি বিচলিত না হলে কী হবে? জেরাল্ড আর্চার ভয়ঙ্কর মুষড়ে পড়ল। আগে এক-দুদিন ছাড়া ছাড়া আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। সেদিনের পর থেকে দু-বেলাই এসে অনেকক্ষণ করে আমার সঙ্গে সময় কাটিয়ে যেতে লাগল। কথায় মন বসত না। গরাদের এপাশ থেকে আমি ওর দিকে আমার অঙ্কখাতা বাড়িয়ে ধরতাম। বলতাম, দ্যাখো তো জেরাল্ড। এই জায়গাটায় একটু আটকে গেছি। ও সেই খাতায় গরাদের ওপাশে বসে আঁকিবুঁকি কাটত আর দীর্ঘশ্বাস ফেলত। বলত, আমি ভাবতে পারছি না পঙ্কজ, তোমার মতন এমন একজন প্রতিভা ফাঁসির দড়িতে জীবন শেষ করবে। পৃথিবীকে তোমার এখনো কত কিছু দেওয়ার ছিল।
আমি বলতাম, তোমরা আমাদের স্বাধীনতা দাও। তাহলেই দেখবে, আমি না থাকলেও আমার ভাইবোনেরা পৃথিবীকে অনেক কিছু দিয়ে যাবে। ও তাই শুনে কেমন যেন অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। তারপর বলত, সত্যি পঙ্কজ, যে-জেরাল্ড আর্চার লন্ডন থেকে এখানে পা রেখেছিল, তাকে তুমি একেবারে বদলে দিয়েছ। আমি প্রথমদিনে তোমাকে 'কালা আদমি' বলে সম্বোধন করেছিলাম ভাবলে নিজের ওপরেই আমার ঘৃণা হয়।
দেখতে দেখতে সেই দিনটা চলে এল। রাত ফুরোলেই আমার ফাঁসি। আমাকে এতদিনের চেনা সেলটা থেকে সরিয়ে, অনেক দূরের একটা একলা কুঠুরিতে ট্র্যান্সফার করে দিল। সেরকমই নিয়ম। সেখানে বসেই শুনতে পাচ্ছিলাম, আমার সম্মানে মূল বাড়িতে আমার বিপ্লবী বন্ধুরা গান ধরেছে—যায় যাবে জীবন চলে, বন্দেমাতরম বলে। কিম্বা, এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী। আমিও তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গুনগুন করে গান গাইছিলাম।
সন্ধে পেরিয়ে রাত হল। সেদিন সারাদিনের মধ্যে জেরাল্ড একবারের জন্যেও আমার সামনে আসেনি। ওর জন্যে আমার মায়া হচ্ছিল। বড্ড ভালোবাসত বেচারা আমাকে। কেমন করে সামনে আসবে?
ওকে চিনতে পারিনি, বুঝলি। যখন রাত আরো একটু বাড়ল, চারিদিক যখন শান্ত হয়ে এল, তখন জেরাল্ড এসে আমার সেলের সামনে নাইটগার্ডের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল। বলল, পঙ্কজ! ফাঁসির আসামীকে জিগ্যেস করতে হয় তার শেষ ইচ্ছে কী? পারলে সেই ইচ্ছে পূরণ করতে হয়। আমিও তোমাকে জিগ্যেস করছি—তোমার শেষ ইচ্ছে কী?
আমি মুচকি হেসে বললাম, তুমি ভালোই জানো আমার শেষ ইচ্ছের কথা। রাখতে পারবে?
জেরাল্ড বলল, জানি। আমার প্রোজেক্টের কথা জানতে চাও, তাই তো। এখন আর বলার অসুবিধে কোথায় পঙ্কজ? এই সেল থেকে দু-পা হেঁটে গেলেই ফাঁসিকাঠ। ঠিক ছ-ঘণ্টা বাদে তুমি ওইটুকু রাস্তাই হেঁটে যাবে। এর মধ্যে আর কার কাছেই বা গল্প করবে?
বলব। তার আগে এতদিন ধরে আমার যে টুকরো-টাকরা অঙ্কগুলো দেখেছ, তাদের একসঙ্গে মেলালে কী হয় দ্যাখো। এই বলে কাঁধের ক্যানভাসের ব্যাগ থেকে একটা সুন্দর টাইপ-করা পাণ্ডুলিপি বার করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলে। সেটার মলাটের ওপর ইংল্যান্ডের রাজবংশের মোহরছাপ। তার নীচে লেখা টপ সিক্রেট।
আমি পাণ্ডুলিপিটা খুলে টেবিল-ল্যাম্পের আলোর নীচে রেখে পড়তে বসলাম।
মানুষের মন এক অদ্ভুত জিনিস, বুঝলি মানিক? কোথায় গেল ফাঁসির চিন্তা? কোথায় গেল বাড়ির স্মৃতি আর মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন? মুহূর্তের মধ্যে আমি ডুবে গেলাম অঙ্কের পর অঙ্ক গেঁথে বানিয়ে তোলা এক সুন্দর প্রাসাদের মধ্যে, যার নাম 'থিয়োরি অফ স্ট্রেচেবল টাইম' কিম্বা 'নমনীয় সময়ধারার সূত্র'। দেখলাম, সেই সূত্র নির্ভুলভাবে প্রমাণ করছে—যেভাবে একটা বস্তুকে বাঁকানো যায়, টেনে লম্বা করা যায় কিম্বা চেপে ছোট করা যায়—সময়কেও ঠিক সেইভাবে দলে মুচড়ে টেনে বাঁকিয়ে দেওয়া যায়।
সত্যিকারের প্রতিভাবানেরা যখন কোনো কিছু প্রমাণ করেন, তাঁরা খুব বেশি জায়গা নেন না। জেরাল্ড আর্চারের 'থিয়োরি অফ স্ট্রেচেবল টাইম'-ও বড়জোর পঁচিশ-পাতার লেখা। আমার পুরোটা পড়তে এবং বুঝতে মাত্র দেড়-ঘণ্টা সময় লেগেছিল।
খাতাটা জেরাল্ডের হাতে ফেরত দিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে বললাম, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে তোমার সৌজন্যে এক মহান সৌন্দর্য দেখে গেলাম। মানুষের মেধার সৌন্দর্য। থ্যাঙ্ক ইউ জেরাল্ড। কিন্তু এর সঙ্গে তোমার প্রোজেক্টের সম্পর্ক কী?
শুনবে? কিন্তু তাহলে যে মৃত্যুর আগে তোমাকে মানুষের কুৎসিত দিকটাও দেখে যেতে হয়।
আমি বললাম, তা হোক। তুমি বলো।
আমার এই স্ট্রেচেবল টাইম বা নমনীয় সময়কে কাজে লাগিয়ে কী করা যায় ভেবে দেখেছ? একটা উদাহরণ দিই। ধরো ওই দূরের সমুদ্রে একঝাঁক জার্মান যুদ্ধজাহাজ দেখা দিয়েছে। তারা এগিয়ে আসছে আমাদের এই আন্দামানের বৃটিশ ঘাঁটি ধ্বংস করতে। এমনিতে তখন আমাদের বোমারু বিমান নিয়ে উড়ে যেতে হত এবং আমাদেরও জলে নামাতে হত যুদ্ধজাহাজ। তাতে কে জিতত, কে হারত বলা যায় না। কিন্তু এটুকু বলা যায় দু-পক্ষেই হতাহত হত অনেক। খরচও কম পড়ত না।
এবার ভাবো তো, ওই জাহাজের সারি যে স্পেশটুকু ধরে এগিয়ে আসছে, সেই স্পেশের ওপরের সময়টুকুকে যদি কোনোরকমে টেনে সরিয়ে দিতে পারি? তখন সেই সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে ওই জার্মান নৌবহরও তো সরে যাবে, তাই না? ভেসে উঠবে অন্য কোনো কালের সমুদ্রে। হয়তো অতীতে ... হয়তো ভবিষ্যতে। যাই-ই হোক, বর্তমানের সমুদ্র থেকে জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে যাবে জার্মান নৌবহর। আন্দামানের বৃটিশ ঘাঁটি তিন তুড়িতে যুদ্ধ জিতে যাবে।
আমি জিগ্যেস করলাম, কিন্তু বাস্তবে সেটা কি সম্ভব?
জেরাল্ড উত্তর দিল, ছ-মাস আগে আমি নিজেও জানতাম না, সম্ভব কিনা। কিন্তু গত ছ-মাসে পৃথিবীর সেরা কয়েকজন বৈজ্ঞানিক আর টেকনোলজিস্ট আমার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে আজ ব্যাপারটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছেন, যাতে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, হ্যাঁ সম্ভব। যদিও এখন আমরা সময়কে সরাতে পারছি খুব অল্প একটু স্পেশে। এফেক্টটাও খুব একটা স্থায়ী হচ্ছে না। বড়জোর মিনিট খানেক; তার পরেই টেনে রাখা ইলাস্টিককে ছেড়ে দিলে সেটা যেমন ছিটকে আগের জায়গায় ফিরে আসে, সেইভাবে সরিয়ে দেওয়া সময় আবার তার আগের জায়গায় ফিরে আসছে।
মজার কথা কি জানো পঙ্কজ? গত ছ-মাস ধরে আমরা নানান ভাবে 'টাইম-স্ট্রেচার' বানানোর চেষ্টা করে গেছি। নানা মাপের লেন্স, নানা শক্তির কন্ডেনসার, কয়েল, ম্যাগনেট আর অ্যাকসিলারেটরকে নানান সাইজের খোলের মধ্যে ভরে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করে দেখেছি, কোন কম্বিনেশনটা কাজ করে। শেষ অবধি যে যন্ত্রটা সময় বাঁকানোর কাজটা করে ফেলল, সেটা এতই ছোট আর সরল যে, চোখে না দেখলে তুমি বিশ্বাস করবে না। এটা মাত্র গতকালের কথা।
আমি জিগ্যেস করলাম, এবার কী করবে?
এবার আমার সহকর্মীরা ওই সফল যন্ত্রটা কেন সফল হল, সেটা খুঁজে বার করবেন। তারপর সেটাকেই আরো বড় স্কেলে কপি করবেন—যাতে যুদ্ধজাহাজ কিম্বা সাঁজোয়াগাড়ির বহর ভ্যানিশ করা যায়। তবে আমি আর এই প্রোজেক্টের মধ্যে নেই। যুদ্ধ আমাকে আর টানছে না। আমি শান্তির খোঁজে একলা কোথাও বেরিয়ে পড়ব।
সেলুলার জেলের পেটা-ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল জেরাল্ড। তারপর গরাদের মধ্যে দিয়ে হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি ওর দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বললাম, আমাদের দুজনের মধ্যে কেউই তো পরজন্মে বিশ্বাস করি না বন্ধু। তাই বলতে পারছি না, আবার দেখা হবে। তবে এ জন্মে তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভারি ভালো লাগল। বিদায়।
জেরাল্ড চলে গেল। নাইট গার্ড এসে ভারি নরম গলায় বলল, এবার শুয়ে পড়ুন বাবু। ঘুম হয়তো আসবে না। তবু বসে থেকেই বা কী করবেন? আমি ঠিক সময়মতন আপনাকে ডেকে দেব। এই বলে সেলের সামনের বারান্দার বাল্বটা নিভিয়ে দিয়ে চলে গেল।
মেঝের ওপরে কম্বলটা পেতে শুতে গিয়েই চোখে পড়ল, গরাদের ঠিক ওপাশে, যেখানে একটু আগে জেরাল্ড বসেছিল, সেখানে মেঝের ওপরে কী যেন একটা জিনিস গড়াগড়ি খাচ্ছে। জিনিসটা অন্ধকারের মধ্যেও মাঝে মাঝে চকচক করে উঠেছিল বলেই আমার চোখে পড়েছিল। আমি হাত বাড়িয়ে ওটাকে কাছে টেনে এনে দেখলাম, একটা টর্চ।
কিম্বা টর্চের মতন দেখতে একটা কিছু।
সাধারণ টর্চের মতন সেটার পেতলের বডি নয়। কঠিন আর কালো একটা কোনো মেটিরিয়াল দিয়ে টর্চটার বডি তৈরি। সামনের কাচটাও সাধারণ কাচ নয়, দেখে মনে হচ্ছিল হিরের মতন শক্ত কোনো পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে ওই লেন্সটাকে। আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, জিনিসটা হাতে নিলে একটা কাঁপুনি টের পাওয়া যাচ্ছে।
আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। ঘরের এক কোনায় রাখা জলের কুজোটার দিকে তাক করে টর্চটার বোতামে চাপ দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে একটা আলকাতরার মতন ঘন কালো আলোর বিম লেন্সের মধ্যে থেকে বেরিয়ে কুজোটাকে আপাদমস্তক জড়িয়ে ধরল। বোতাম থেকে হাত সরিয়ে নেওয়ার পরে দেখলাম, কুজোটা নেই। অর্থাৎ জেরাল্ড যা বলেছিল—ভ্যানিশ।
মনে মনে এক থেকে ষাট গোনার মধ্যেই অবশ্য কুজোটা আবার আগের জায়গায় ফিরে এল।
ফাঁসির আসামির সেলের মধ্যে জিনিসপত্রের বড় অভাব। তবু হাতের সামনে যে-ক'টা জিনিস পেলাম, তাদের ওপরেই সাবধানে পরীক্ষা করে দেখলাম সেই কালো-আলোর টর্চের ক্ষমতা। একবারও পরীক্ষা ব্যর্থ হল না। কম্বল, গীতা, খাবারের থালা সবই কালো আলোর খপ্পরে পড়ে এক-মিনিটের জন্যে ভ্যানিশ হয়ে আবার যথাস্থানে ফিরে এল।
কালো আলোর টর্চটা যে আসলে কী, সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। এটাই সেই জেরাল্ডের নব-আবিষ্কৃত টাইম-স্ট্রেচার। ও তো বলেইছিল, জিনিসটা অদ্ভুতরকমের সরল আর ছোট।
আমি, পাপ্পু বিশু আর শমী একসুরে বলে উঠলাম—তারপর?
তারপর আর কী? পাঁকালকাকা উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন। একমিনিট অনেক লম্বা সময়। একমিনিটের জন্যে আমার পায়ের শেকল হারিয়ে গেল। সেটা যখন আবার সেলের মধ্যে ফিরে এল ততক্ষণে আমি খালিপায়ে সেলের বাইরে। কারণ গরাদের তালাটাও ইতিমধ্যে একমিনিটের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিল। হাতের বন্দুকটাকে ভ্যানিশ হয়ে যেতে দেখে নাইট গার্ডটা এতই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, আমি যখন ওরই রুমাল দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ওরই পাগড়ি দিয়ে ওকে পিছমোড়া করে বাঁধলাম, ততক্ষণ ও টুঁ-শব্দও করল না। তারপর কীভাবে যে জেলেদের নৌকা চুরি করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বার্মায় গিয়ে উঠেছিলাম, সেকথা ভাবলে এখনো অবাক লাগে।
চল, কারেন্ট এসে গেছে। তোদের বইগুলো ইস্যু করে দিই।
বিশু হাউমাউ করে উঠল—পাঁকালকাকা, একটু দাঁড়ান। সেই যে জেরাল্ড আর্চার, তাঁর কী হল?
শুনেছি ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধ-অপরাধী হিসেবে তাঁর খোঁজে বহু খানাতল্লাশি করেছিল। স্বাভাবিক। ওই টর্চটা হারিয়ে যাবার ফলে চার্চিল সাহেবের কোটি টাকার প্রোজেক্টটাই বরবাদ হয়ে গিয়েছিল কিনা। কিন্তু তাকে আজ অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আমি বললাম, আর সেই কালো আলোর টর্চ? সেটা কোথায়?
পাঁকালকাকা বললেন, ওসব সাংঘাতিক জিনিস কেউ সঙ্গে রাখে নাকি? ডাঙায় পা দেবার আগেই ছুঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলাম।
এবার বোধহয় বুঝলি, কেন আমি তারপর থেকে টর্চলাইট ব্যবহার করি না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন