দিম্মা ড্রাইভ

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

একটু আগেই দিম্মা আমাকে একটা গল্প বলছিল। দিম্মার সেই গল্প আমার কপালের দুপাশে আটকানো দুটো টার্মিনাল দিয়ে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের আকারে ছড়িয়ে পড়ছিল ব্রেনের আনাচে কানাচে।

দিম্মাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। স্পেসশিপের একদম কেন্দ্রীয় এলাকায় সবচেয়ে সুরক্ষিত চেম্বারের মধ্যে রয়েছে দিম্মা আর আমি একেবারে ডগায় কন্ট্রোল রুমে।

যদিও পুরো স্পেসশিপে আমরা দুজনেই শুধু আছি, তবু দুজনের চোখাচোখি হওয়ার সুযোগই নেই। দিম্মা মনে-মনে গল্প বলছে আর আমি মনে-মনেই সেই গল্প শুনতে পাচ্ছি।

'মন' কথাটা নেহাত অভ্যেসের বশেই বলে ফেললাম। আসলে ব্রেন। দুটো ব্রেনের মধ্যে নিউরোন-পালসের আদান-প্রদান। ওই হচ্ছে গল্প বলা, ওই হচ্ছে গল্প শোনা।

আমাদের এই স্পেসশিপটার নাম 'মনপবনের নাও'। নামটা আমারই দেওয়া। স্টেশন-ডিরেক্টর বিজিত চ্যাটার্জি এই নামকরণের ব্যাপারে কড়া আপত্তি জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এত বড় নাম, তাও আবার বাংলার মতন একটা আঞ্চলিক ভাষায়—এসব বিজ্ঞানী সমাজে ঠিক মানায় না। ইংরিজি কিম্বা ল্যাটিনের মধ্যে থেকে নাম খোঁজো।

আমিও গোঁ ধরে বসেছিলাম। বলেছিলাম, স্যার, আপনি একবার শুধু নামটার মানে সবাইকে জানিয়ে দিন। বলে দিন 'মনপবনের নাও' মানে যে-নৌকা মনের হাওয়ায় পাল ফুলিয়ে ছুটে চলে। দেখবেন, তুরস্ক থেকে টাঙ্গানিকা, মেলবোর্ন থেকে ম্যানচেস্টার, এই প্রোজেক্টে যত মানুষ জড়িত আছেন সকলেই নামটাকে মেনে নেবেন।

হলও ঠিক তাই। শুধু মেনেই নিলেন না, সবাই বেশ প্রশংসাও করলেন। বিজিত চ্যাটার্জি চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, তুমি কেমন করে জানলে সৌম্য এরকমটাই হবে?

আমি বললাম, স্যার, সবটাই দিম্মার কল্যাণে জেনেছি। উনিই আমাকে একবার বলেছিলেন পৃথিবীর যত পুরনো-গল্প, সবই নাকি একছাঁচে ঢালা।

এক্সপ্লেইন ইট।

স্যার, আজ থেকে কয়েকহাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমেরিকার কোনো যোগাযোগ ছিল না, আমেরিকার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ ছিল না ইওরোপের। তবু নানান মহাদেশের আদিম গাঁওবুড়োরা সন্ধের পর আগুনের কুণ্ডের সামনে বসে যে গল্পগুলো বলতেন তার সবক'টাতেই সেই বন্দিনী রাজকন্যা আর তাকে খুঁজে আনতে যাওয়া রাজপুত্র, সেই বুড়োর ধাঁধা আর ধাঁধার উত্তর বলতে পারলেই গোপন পাতালপুরীর দেউড়ি খুলে যাওয়া, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী আর পক্ষীরাজের মতন দয়ালু সব জীবজন্তু কিম্বা সোনার কাঠি রুপোর কাঠি আর এই মনপবনের নাওয়ের মতন নানারকমের ম্যাজিক-যন্ত্রের কথা ঘুরেফিরে আসে।

স্যার, আমার দিম্মা তো একজন ফোকলোরিস্ট। তিনি পৃথিবীর হরেক কোনা থেকে চল্লিশটা উপজাতির ওরকম আড়াইশো উপকথা, মানে ফোকলোর খুঁজে বার করে কম্পেয়ার করে দেখেছিলেন—তাদের স্ট্রাকচার একেবারে এক।

বিজিত চ্যাটার্জির কপালের ভাঁজগুলো আরো একটু গভীর হল। তিনি বললেন, তাতে কী প্রমাণিত হল?

আমি বললাম, প্রমাণিত হল যে, রূপকথার গল্প মানুষ বানায় না। বুকের ভেতর নিয়েই জন্মায়। সেইজন্যেই যে-চিনেম্যান কোনোদিনও ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শোনেনি, তার কাছেও মনপবনের নাও-কে ভীষণ চেনা ঠেকেছে।

বিজিত চ্যাটার্জির ভুরুর ভাঁজগুলো মুছে গিয়ে মুখটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠল। বললেন, টু টেল ইউ দা ট্রুথ সৌম্য, আই অলসো লাইকড দা নেম। যদিও ওই ঠাকুরমার খুলি না কী যেন বলছিলে, ওটা পড়া হয়ে ওঠেনি।

অ্যাস্ট্রো-নিউরোলজিস্টদের নিয়ে এই এক সমস্যা। মাথার খুলিটুলির বাইরে খুব বেশি শব্দ ওনাদের ডিকশনারিতে থাকে না।

যাই হোক। আপাতত সেই মনপবনের নাওয়ের কন্ট্রোলরুমেই বসে আছি। 'কন্ট্রোলরুম' বলতেই যে অসংখ্য ডায়াল, সুইচ আর গিয়ারওলা ঘরটার কথা মনে পড়ে—এই কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। চারপাশে তাকালে মনে হচ্ছে, একটা বিস্কুটের কৌটোর নীচে নিঃসঙ্গ শেষ বিস্কুটটার মতন পড়ে আছি আমি। আমার চারিদিকে টিনের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল কার্বন-ন্যানোটিউবের দেয়াল ছাদ অবধি উঠে গেছে। সেই দেয়ালে জানলা নেই, দরজা নেই। এমনকী মহাশূন্যে চোখ মেলার জন্যে বিখ্যাত সেই পোর্টহোলটা অবধি নেই।

আবার বলতে গেলে সবই আছে। এই যেমন আমি মনে মনে ভাবলাম, আকাশ দেখব। অমনি উজ্জ্বল দেয়ালের গায়ে ফুটে উঠল পোর্টহোল। দেখলাম, কালির মতন কালো মহাশূন্যের বুকে ধকধক করে জ্বলছে গ্রহ-নক্ষত্রের মালা। লাল আগুনের বামন নক্ষত্র, মুক্তোর মতন স্নিগ্ধ সুপারনোভা। অনেক দূরে হেমন্তের মাঠে জমে থাকা সাঁজালের ধোঁয়ার মতন মিল্কি-ওয়ে গ্যাল্যাক্সি। ওই সাঁঝের মাঠেই হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবী নামে একটা পুঁচকে বাচ্চা, তার গায়ে নীলজামা।

পৃথিবীর কথা একটু মন দিয়ে ভাবতেই পোর্টহোল বন্ধ হয়ে গিয়ে সেই জায়গায় ফুটে উঠল এই মুহূর্তের পৃথিবীর ছবি। রাতের দিকটাই শুধু দেখতে পাচ্ছি, কারণ রাতের কথাই ভাবছিলাম। দেখতে পাচ্ছি কালো পটভূমির ওপরে রাশি-রাশি আগুনের ফুলের মতন ছড়িয়ে রয়েছে শহর-বন্দর। তার মধ্যে থেকে কিছু কিছু ফুল আবার ঝড়ের হাওয়ায় ওড়াউড়ি করছে। ওগুলো আসলে এরোপ্লেন আর স্পেস-শাটলস। সংখ্যায় কয়েক লক্ষ হবে। মহাশূন্যে না এলে বোঝা যায় না, পৃথিবীতে বাসযোগ্য জায়গার কত অভাব। সেইজন্যেই নতুন জায়গা খুঁজতে চলেছি, অন্য গ্যালাক্সিতে।

ইতিহাসে এই প্রথমবার মানুষের ইন্টার-গ্যালাক্সি ট্র্যাভেল। শুরু তো হয়েছে ঠিকঠাক কিন্তু শেষ হবে কিনা জানি না।

এই মুহূর্তে যেখান দিয়ে চলেছি সেখানে আগে কখনো কোনো স্পেসশিপ আসেনি। সেইজন্যেই এই অঞ্চলটায় ঠিক কত উল্কা ছুটে বেড়াচ্ছে, পাক খাচ্ছে কত গ্রহাণু, কেউ তা জানত না। শুধু টেলিস্কোপে দেখে তার আন্দাজ করতে পারেনি কেউ।

অথচ এখন দেখছি মেশিনগানের গুলির মতন তারা ছুটে আসছে আর সেইজন্যেই আমার ভীষণ ভয় করছে। ভয়ের চোটে আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে আর আমার দু-হাতের পাতায় ঘামের বিজবিজে রেণু একে অপরের সঙ্গে জুড়ে পাতলা দস্তানার মতো আস্তরণ তৈরি করছে স্পেসশিপের হালকা অভিকর্ষের পরিবেশে।

আর ঠিক তখনই আমার কানে আসছে দিম্মার গলার গুনগুনানি। দিম্মা গল্প বলছে—রূপকথার গল্প। আর আমার মন শান্ত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এই ইন্টার-গ্যালাক্সি ট্র্যাভেল মিথ্যে, উল্কার আঘাতে স্পেসশিপ ফুটো হয়ে যাওয়ার ভয় মিথ্যে। সত্যি শুধু আমার সেই সুন্দর ছোটবেলাটা।

সেই ছোটবেলা—যখন আমার কম্যান্ডার-বাবা স্পেসশিপ নিয়ে টানা ছ-মাস কিম্বা একবছরের জন্যে একেকটা জার্নিতে বেরিয়ে পড়তেন আর তিনি বেরোলেই পেছন পেছন আমি আর মা একটা বেবি-রকেট ডেকে আর্থ-স্টেশন-ফাইভের মামার বাড়িতে রওনা দিতাম। সেখানে সন্ধে হলেই কাচের কলোনির স্বচ্ছ গম্বুজের নীচে আমি আর দিম্মা ম্যাগলেভের মাদুর পেতে পাশাপাশি ভেসে পড়তাম। অমন ম্যাগনেটিক লেভিয়েশনের মাদুর আজকাল আর পাওয়া যায় না। আমাদের মাথার ওপরে চাক ভাঙা মৌমাছির মতন ছড়িয়ে পড়ত কোটি কোটি তারা। মাটিতে বসে মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত তিনু আর খোকন—দুটো ডোমেস্টিক রোবট। ওরাও দিম্মার গল্প শুনতে খুব ভালোবাসত কিনা।

শোয়ার আগে দিম্মা সিমুলেটিং-মেশিনে একেকদিন একেক ঋতুর গন্ধ সিমুলেট করে দিয়ে আসত। কোনোদিন হেমন্তের হিমে ভেজা ঘাসের গন্ধ, কোনোদিন চৈত্রের রোদে পোড়া মাটির ওপরে প্রথম বৃষ্টিফোঁটার গন্ধ। তবে রূপকথা শুনবার সময় আমার সবচেয়ে ভালো লাগত বর্ষার বাতাবি ফুলের গন্ধ।

এই মুহূর্তে দিম্মার গপ্প শুনতে শুনতে আমার নাকে সেই লেবুফুলের গন্ধ ভেসে এল। বিজিত চ্যাটার্জি একবার বলেছিলেন বটে অ্যামিগডালার কথা। ব্রেনের ছোট্ট একটা পার্ট, বড়জোর একটা বাদামের মতন বড়। কিন্তু যে-কোনো একটা স্টিমুলেশন পেলে ওই অ্যামিগডালাই পারে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে। তখন আমরা বারুদের গন্ধে ভয় পাই, লেবুফুলের গন্ধে খুশি হয়ে উঠি। বুঝতে পারছিলাম, মনপবনের নাওয়ের মধ্যে স্টিমুলেশন হিসেবে কাজ করছে দিম্মার রূপকথা। অ্যামিগডালা রূপকথার সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে লেবুফুলের গন্ধ আর আমার শৈশবের নিশ্চিন্ততাকে। আমি ভুলে যাচ্ছি স্পেস ট্র্যাভেলের আতঙ্ক। আমার প্রত্যেকটা চিন্তা হয়ে উঠছে নিখুঁত আর সেই নিখুঁত চিন্তাকে কাজে পরিণত করছে টেনথ জেনারেশনের একটা ব্রেন-কম্পিউটার, স্পেশালি এই জার্নির জন্যেই পৃথিবীর ছটা দেশের বিজ্ঞানীরা মিলে যে কম্পিউটারকে বানিয়েছেন।

দুই

সেই ভয়ঙ্কর উল্কা আর অ্যাসটারয়েড ভরা জায়গাটা নির্বিঘ্নে পেরিয়ে এসেছি। একা পারতাম না, তা সে আমার যত ঘণ্টাই ওড়ার এক্সপেরিয়েন্স থাক না। দিম্মা ছিল বলেই পারলাম। দিম্মা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মহাশূন্যের যত অজানা আতঙ্ককে রূপকথা করে দিচ্ছিল। উল্কাগুলোকে করে দিচ্ছিল রাজকুমারীর হাতের চুপড়ি থেকে ঝরে পড়া রুপোর খই সোনার খই। আর আমি যেন তার মধ্যেই উড়ে বেড়ানো এক বিয়ের প্রজাপতি। ভয় করবে কেন? এই সবই তো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান।

ঠিক তেমনই, বিশাল অ্যাসটারয়েডগুলোর অভিকর্ষের টান ছিল যেন ডাইনির নিশিডাক আর আমাদের স্পেসশিপ এক আশ্চর্য রাখাল, যে বাঁশির শব্দে সব নিশিডাক কে কাটান দিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছিল বন্দিনী রাজকন্যার খোঁজে।

আমি নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এত নির্ভয়ে, এত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত আমি শেষ কবে নিয়েছি মনে পড়ছিল না।

ভিসিপোর্টের স্ক্রিনে কখনো কখনো বিজিত চ্যাটার্জির ভীতু মুখ ভেসে উঠছিল। শুকনো গলায় বলছিলেন, টেরিফিক চালাচ্ছ সৌম্য! ইউ আর পারফর্মিং আ ক্রেজি ফ্লাইট। তার মানে আমাদের প্ল্যানটা ক্লিক করে গেছে, কী বলো?

আমার হাসি পেয়ে গেল। হাসি চেপে রেখেই বললাম, 'হ্যাঁ স্যার।'

উনি কেমন করে বলেন 'আমাদের প্ল্যান!' এটা অ্যাবসল্যুটলি আমার প্ল্যান।

মাত্র দু-মাস আগেই সারা দুনিয়ার যত পণ্ডিত, ইনক্লুডিং বিজিত চ্যাটার্জি, আমার প্ল্যান শুনে হা হা করে উঠেছিলেন। একটা বুড়িকে নিয়ে এইরকম ইন্টার-গ্যালাক্সি এক্সপিডিশন! পাগল নাকি? আরে, তোমাকে হেল্প করার জন্যে তো ব্রেন-কম্পিউটার বানিয়েই দিয়েছি। এখন অবধি মানুষের টেকনোলজিতে সেরা যা দেওয়ার দিয়ে দিয়েছি তো ওই মনপবনের খোলে। আবার দিম্মা ফিম্মা কেন?

তারপর ঝাড়া একটা মাস ধরে আমি এগারোটা শহরে পনেরোটা মিটিং অ্যাটেন্ড করেছিলাম শুধু ওনাদের এইটুকু বোঝানোর জন্যে যে, ব্রেন-কম্পিউটার নামে সেই সুপার-ইনটেলিজেন্ট মেশিন তো না-হয় আমার ব্রেনের নিউরোন-পালস বুঝে, আমার আশা আকাঙ্ক্ষা আবেগ অনুভূতিকে বুঝে, সেইভাবে স্পেসশিপকে চালাবে। কিন্তু আমার ব্রেনকে চালাবে কে?

ওই মহাশূন্যের হিম নৈঃশব্দের মধ্যে আলোর গতিকে প্রথমবার ধরে ফেলার অজানা চাপে যখন আমার আশা আকাঙ্ক্ষা আবেগ অনুভূতি এটসেটরা এটসেটরা সব তালগোল পাকিয়ে যাবে, তখন ব্রেন-কম্পিউটার নিজেও কি তালগোল পাকিয়ে যাবে না?

বৈজ্ঞানিকেরা বলেছিলেন, দেন? হোয়াট ইজ দা সল্যুশন?

আমি বলেছিলাম, আমার সঙ্গে আমার দিম্মা যাবেন, যিনি আমার মনকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন। এই পৃথিবীতে যাঁর সঙ্গে আমার বন্ধন সবচেয়ে জোরালো। যিনি ঠিক যেভাবে তিনবছরের কাঁদুনে সৌম্যকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ভাত খাইয়ে দিতে পারতেন, সেই একইরকমভাবে তিরিশবছরের রাগি সৌম্যকে একদিনের মধ্যে সিগারেট ছাড়িয়ে দিতেও পেরেছিলেন।

যিনি আমার মনকে খোলা বইয়ের মতন পড়তে পারেন সেই দিম্মা, হেমপ্রভা মুখার্জি, যাবেন আমার সঙ্গে।

কনফারেন্স রুমের অন্তত বারোজন বৈজ্ঞানিক তৎক্ষণাৎ বিষম খেয়েছিলেন, ইনক্লুডিং এই বিজিত চ্যাটার্জি। তবে শেষ অবধি আমার জেদ এবং যুক্তির কাছে হারও মেনেছিলেন। অস্বীকার করব না, তারপরে অ্যাস্ট্রো-নিউরোলজিস্ট বিজিত চ্যাটার্জি যেটা করেছিলে সেটাও মিরাক্যুলাস। দিম্মার জন্যে স্পেসশিপের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করা, দিম্মার স্মৃতি আর কল্পনার সঙ্গে আমার স্মৃতি আর কল্পনাকে জুড়ে দেওয়া—নাঃ! শুধু এইজন্যেই ওনাকে মানুষের মনে রাখা উচিত।

সবই তো হল। কিন্তু শেষের সেই ভয়ঙ্কর সময়টা যে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ওয়ার্ম হোলের মধ্যে দিয়ে সেই লাফ—যখন আলোর গতিকে ছুঁয়ে ফেলবে মনপবনের নাও।

স্থান-কালের সম্মিলিত চতুর্মাত্রা কুঁচকে ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যাবে। বাড়তে বাড়তে অসীম হয়ে যাবে আপেক্ষিক ভর। কিন্তু আমরা বুঝতে পারব না কিচ্ছু—কারণ সেই অসীম ভর তখন রূপান্তরিত হয়ে যাবে অনন্ত কাইনেটিক এনার্জিতে। যতক্ষণ আলোর গতিতে ছুটবে এই স্পেসশিপ ততক্ষণ আমি, দিদিমা, কার্বন ন্যানোটিউবের দেয়াল—আমরা কেউ থাকব না। কিছুই থাকবে না।

বিজ্ঞান তাই বলছে।

শরীর যদি না থাকে তাহলে কোথায় থাকবে আমার চেতনা? আমার স্মৃতি? আমার বুদ্ধি? সব মিলিয়ে বলতে গেলে—শরীর না থাকার সময়টাতে কোথায় থাকবে আমার আত্মা? কাকে আশ্রয় করে সে বাঁচবে?

স্পেসশিপের গতি কমে আসার পরে আত্মাকে ফেরাব কেমন করে? আদৌ পারব কি ফেরাতে?

জানি না। এখনো অবধি কেউই জানে না, কারণ, কোনো মানুষ এর আগে আলোর গতিতে ছোটেনি।

হঠাৎ মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। চোখের সামনে দুলে উঠল জিপসি-মেয়ের ঘাঘরার মতন লাল নীল সবুজ আলোর ঢেউ। ইচ্ছে করল একবার দেখি, ঠিক কত জোরে আমাদের স্পেসশিপ ছুটে চলেছে ওয়ার্ম-হোলের দিকে। কিন্তু কোথায় গেল আমাদের মনপবনের উজ্জ্বল দেয়াল? এ তো দেখছি চোখের সামনে আলোর পর্দা ধূসর থেকে ধূসরতর হয়ে উঠল। তাহলে কি শেষ অবধি ব্রেন-কম্পিউটার জবাব দিল?

দিম্মা, দিম্মা! আমি তোমার সোমু। শুনতে পাচ্ছ দিম্মা? দিম্মা, এত জল কেন চারিদিকে? হঠাৎ এত রাশি রাশি নীল জল এল কথা থেকে?

তিন

কিসের গল্প শুনবি সোমু?

রাজপুত্রের।

শোন তাহলে। তারপর তো সরোবরের তীরে গিয়ে দাঁড়াতেই রাজপুত্তুরের হাতে ধরে থাকা সাপের মাথার মণি থেকে একটা সবুজ আলোর ফলা বেরিয়ে ঢেউকে ছুঁল আর জল সরে গিয়ে দেখা গেল শ্বেতপাথরের সিঁড়ি। সেই অতল বেতল সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে রাজপুত্তুর দেখেন কি, তার চারিদিকে জলের ভেতরে অদ্ভুত কিম্ভুত গাঁটওলা সব মাছেরা নাচানাচি করছে।

ওমা, মাছ কোথায়? ভালো করে ঠাহর করে রাজপুত্তুর দেখলেন, মাছ তো নয়! তাদের লেজের বালাই নেই আর মুড়োর জায়গায় বড় বড় নখ। ও মা! এ যে দশটা কালো কুলো আঙুল। রাজপুত্তুর বুঝতে পারলেন, এ সেই দুষ্টু ডাইনির হাতের আঙুল। ডাইনি যেই না রাজকন্যার নৌকার ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে হাত বাড়িয়েছিল, অমনি মাঝিভাই আঁশবটি দিয়ে তার আঙুলগুলো ঘচাৎ করে কেটে ফেলেছিল তো। তখন ডাইনিবুড়ি 'হাউমাঁউ কোথায় যাঁউ, অ্যান্টিসেপটিক কোথায় পাঁউ' বলে দৌড়ে পালিয়েছিল আর তার আঙুলগুলো জলের মধ্যে কিলবিল করে লুকিয়ে পড়েছিল।

এখন রাজপুত্তুরকে ভালোমানুষের পো বুঝতে পেরে আঙুলগুলো নড়েচড়ে তাকে ডাকতে শুরু করল।

রাজপুত্তুর বললেন, কোথায় যাব?

আঙুলগুলো বলল, কোথায় যেতে চাও?

জানো না? 'অজানি দেশের না জানি কী' খুঁজতে বেরিয়েছি যে।

'অজানি দেশের না জানি কী'? এমন অদ্ভুত বস্তুর নাম শুনিনি তো কখনো। কী হয় সে জিনিস পেলে?

মানুষের দুঃখ ঘোচে। পাওয়া যায় না, তাই মানুষের দুঃখও ঘোচে না। তোমরা জানো কি, জলের ভেতর কোথায় আছে সেই অজানি দেশে যাওয়ার পথ?

কড়ে আঙুল গাঁট মটকে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। আংটির আঙুল রাজপুত্তুরের চুলের ভেতর ঢুকে তার মাথা চুলকে দিল। মাঝের আঙুল রাজপুত্তুরের থুতনিতে মাথা ঠেকিয়ে মন দিয়ে ভাবতে বসল। বকার আঙুল সবাইকে বকে দিয়ে বলল—চোওওপ। খবরদার গোলমাল করিস না। ভাবতে দে। শেষ অবধি বুড়ো আঙুল তার চ্যাপটা নোখটা রাজপুত্তুরের চোখের সামনে মেলে ধরে বলল, এই দ্যাখো নখদর্পণ। দেখো দেখি, এর মধ্যে তোমার সেই অজানি দেশের রাস্তার হদিশ পাওয়া যায় কিনা?

রাজপুত্তুর মন দিয়ে নখদর্পণ দেখতে বসলেন। দেখেই চললেন আর দেখেই চললেন। সময়ের কোনো হুঁশই রইল না রাজপুত্তুরের।

ওদিকে রাজপুত্তুরের মনপবনের নাও অনেকক্ষণ রাজপুত্তুরকে না দেখে ভারি উচাটন হয়ে উঠল। সেই নৌকো এতদিন ডাঙায় চলছিল, বাতাসে ভাসছিল। এবারে সে সরোবরের জলে নেমে, রাজপুত্তুরের খোঁজে মুখ নীচু করে গোঁত্তা লাগাল; তারপর শনশনিয়ে জল ভেঙে নামতে লাগল তো নামতেই লাগল।

যতই নামে ততই তার কাঠের শরীর গলে জল হয়ে যায়। মনপবনের মন হায় হায় করে ওঠে। কোথায় সেই ফুলে ফলে ঘাসে ফোয়ারায় সাজানো রাজপুরী, কোথায় রাণীমা-র বীণা বাজিয়ে মধুর সুরে গান, কোথায় রাজামশাইয়ের ধনুর্বানের টঙ্কার? এ যে এক হিম জলের দেশ। এখান থেকে কি আর ফেরা যাবে?

ওদিকে অনেকক্ষণ ধরে নখদর্পণের মধ্যে তাকিয়ে থেকে থেকে চোখ ব্যথা হয়ে গেলে পর রাজপুত্তুর একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বললেন, কই, কিছুই তো দেখিনে। শুধু জল আর জল।

আঙুলেরা ফটফট শব্দে তুড়ি বাজিয়ে বলল, তাহলে জলেই নেমে যাও। জল হও। জল হও। জল হও।

বলতে না বলতেই রাজপুত্তুর দেখলেন, তার শরীর গলে যাচ্ছে। মিশে যাচ্ছে জলের স্রোতে। হারিয়ে যাচ্ছে সিঁড়ি। রাজপুত্তুর ডুবতে ডুবতে দেখলেন তার পাশ দিয়ে মনপবনও তলিয়ে যাচ্ছে। তাকে দেখলে আর মনপবন বলে চেনা দায়। শুধু গলুই আর মাস্তুলটুকুই বাকি রয়েছে, আর সব জল হয়ে জলে মিশে গেছে।

রাজপুত্তুর আকুল গলায় ডাক দিলেন—মনপবন, তুমি ছিলে আমার কতদিনের সুখদুঃখের সাথী। তোমাকে হারিয়ে আমি বাঁচব কেমন করে?

মনপবন বাতাসের মতন ফিসফিসে গলায় বলল, ফিরব রাজপুত্তুর। সবাই ফিরব। জল থেকে আবার শরীর ফিরে পাব।

কখন মনপবন? কেমন করে?

প্রবালদ্বীপের বুড়ি জানে ফিরিয়ে আনার মন্ত্র।

তাকে পাব কোথায়?

কেন? সে তো তোমার ভেতরেই রয়েছে। ভুলে গেছ, তুমি যে তার বংশের পিদিম?

কখন সে আসবে?

যখন অজানি দেশে পৌঁছবে।

কত দিন, কত বছর, কত যুগ কেটে গেল কে জানে। জলের দেশে জল হয়ে মিশে রইল মনপবনের নাও আর রাজপুত্তুর। তারপর একদিন রাজপুত্তুরের চেতনা ফিরল। তিনি দেখলেন, লাল প্রবালের এক অদ্ভুত পিণ্ড নীল জলের ঠিক মাঝখানটাতে ভেসে রয়েছে। সেই পিণ্ডের সারা গায়ে আঁকিবুঁকি, ঝিরিঝিরি, কাটাকুটি রেখা।

যেভাবে শরবতের গেলাসের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা একটুকরো মিছরিকে ঘিরে চিনির দানা জমতে জমতে বড় মিছরি হয়ে যায়, সেইভাবে সেই প্রবালের পিণ্ডকে ঘিরে তার, মানে রাজপুত্তুরের, শরীর তৈরি হচ্ছে। প্রথমে তৈরি হল চোখ। তারপর নাক, কান, গলা। বুক, পেট, উরু। দেখতে দেখতে সর্বাঙ্গসুন্দর রাজপুত্তুর গা থেকে জল ঝেড়ে সরোবরের তীরে উঠে এলেন। দেখলেন ঝলমলে মনপবনের নাও আগে থেকেই সেখানে প্রস্তুত। দেখলেন, অজানি দেশের জমি ঘাসে ফুলে ঝর্ণায় পাখিতে ভরপুর। এবার শুধু নতুন করে রাজত্ব বানিয়ে নিলেই হয়।

রাজপুত্তুর ভাবলেন, কিন্তু সেই প্রবালের পিণ্ডটা কোথায় গেল, যাকে ঘিরে আমি নতুন করে জন্ম নিলাম? সেটাকে অমন চেনা চেনা ঠেকছিল কেন?

মনপবন চোখ মটকে বলল, তুমি সত্যিই বোকা রাজপুত্তুর। এখনো তাকে চিনতে পারোনি? যাও দেখি একবার আমার খোলের ভেতরে। দ্যাখো তো তাকে দেখতে পাও কিনা।

চার

আমার দিম্মা হেমপ্রভা মুখার্জি শুধু ফোকলোরিস্ট ছিল না। সে ছিল একজন প্রথমসারির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। ইন্টার-গ্যালাকটিক জাম্পের কথা ভেবে যখন আমি মুখ শুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন দিম্মাই আমাকে ডেকে সব সমস্যার কথা শুনেছিল। তারও মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন হঠাৎ আমাকে নিজের ঘরে ডাকল। দেখলাম ফোকলা দাঁতের সেই চওড়া হাসি আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে।

আমি জিগ্যেস করলাম, কী হল বুড়ি? হঠাৎ এত হাসি যে।

দিম্মা বলল, প্রবলেম সলভড। আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি। এই বলে আমার হাতে একটা বায়োপসি-রিপোর্ট ধরিয়ে দিল। দিম্মার নিজের কোলন টিউমারের রিপোর্ট। পজিটিভ।

আমার পায়ের নীচের মাটি দুলে উঠেছিল। আমি আর্তনাদ করে উঠেছিলাম—দিম্মা!

বোকা ছেলে। দিম্মা সরু সরু ঠান্ডা আঙুলগুলো আমার চুলের মধ্যে চালিয়ে দিয়ে বলল, আমি তো বেঁচেই থাকব রে সোমু। তবে বোঝা হয়ে বাঁচব না। যাতে কাজে লাগি সেই ব্যবস্থাটা তুই কর।

তারপর দিম্মা আমাকে আস্তে আস্তে খুলে বলেছিলেন 'দিম্মা ড্রাইভ'-এর প্ল্যান। পুরো প্ল্যানটাই দিম্মার। কাউকে বলিনি, কারণ কেউ বিশ্বাস করত না। নিজের নামে আমি সেই প্ল্যান স্যাংশন করিয়েছিলাম।

প্ল্যান যে সাকসসেসফুল সে তো বোঝাই যাচ্ছে। ইন্টার গ্যালাকটিক জাম্পের শেষে আমি এই তো দিম্মার কেবিনের পোর্টহোলে মুখ রেখে দেখছি বাইরের সবুজ গ্রহ। আগামী কয়েকবছরে ঝাঁকে ঝাঁকে স্পেসশিপ এসে নামবে এই গ্রহের মাটিতে। তাদের প্রত্যেকের ভেতরে থাকবে 'দিম্মা ড্রাইভ'। আলোর গতিকে ছোঁয়ার পরেও কেমন করে নিজের শরীরে ফিরে আসা যায়, সে কথা হয় তো বিজ্ঞান এখনই ব্যাখ্যা করতে পারবে না, কিন্তু তার প্রয়োজনই বা কী? নিউটন তাঁর অভিকর্ষের অঙ্ক কষার অনেক বছর আগে থেকেই কি মানুষ গাছের তলা থেকে আপেল কুড়িয়ে খায়নি?

আমি ঘাড় ফিরিয়ে কেবিনের মাঝখানে রাখা প্লাটফর্মটার দিকে তাকালাম। স্বচ্ছ কাচের জারের ভেতরে টলটলে নীলাভ ইলেক্ট্রোলাইটিক দ্রবণের মধ্যে লাল প্রবালের পিণ্ডের মতন ভেসে রয়েছে দিম্মার ব্রেন। তার থেকে অজস্র তার ছড়িয়ে পড়েছে মনপবনের কোনায় কোনায়। ওই তারের জাল শেষ হয়েছে দুটো টার্মিনালে—যে টার্মিনাল দুটোকে আপাতত রেখে এসেছি কন্ট্রোলরুমের ডেস্কের ওপরে। ফেরার পথে আবার কপালে পরে নেব।

এখান থেকে ফেরার পথে যখন আমার শরীর থাকবে না, সময় থাকবে না, তখনো ক্যানসারের আক্রমণে মৃতা হেমপ্রভা মুখার্জির রূপকথারা থাকবে। আলোর গতিতে ছুটে যেতে যেতে আমি শুনব সেই সব রূপকথা।

তারাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমার আত্মাকে আবার আমার শরীরে ফিরিয়ে আনবে।

অধ্যায় ১২ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%