ধূমাবতী

সৈকত মুখোপাধ্যায়

তিনটি কমবয়েসি বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, বদ্রিনাথ থেকে পায়ে হেঁটে সতোপন্থ তাল যাব বলে। ওই পথ ধরেই না কি বহুযুগ আগে পাণ্ডবেরা স্বর্গে গিয়েছিলেন। আমাদের অবশ্য স্বর্গ অবধি যাওয়ার প্ল্যান ছিল না। সতোপন্থ তাল থেকেই ফিরে আসতাম, যেরকম সবাই আসে।

বদ্রিনাথ পেরিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর স্বর্গ ব্যাপারটাকে আর ঠিক কাল্পনিক বলে মনে হচ্ছিল না। চারিদিকে যা সৌন্দর্য তাতে মনে হচ্ছিল, স্বর্গ যদি সত্যিই কোথাও থাকে তাহলে ওই রাস্তার শেষেই তা আছে।

সতোপন্থ 'তাল' কিম্বা সতোপন্থ হ্রদকে নিয়ে অনেক গল্প শুনেছিলাম। সেই হ্রদের স্বচ্ছ বরফগলা জলে না কি আজও দেবতারা স্নান করতে আসেন। কেউ নাম জানে না এরকম এক ঝাঁক পাখি সেই জলের বুকে একটা শুকনো পাতা কিম্বা কাঠিও পড়তে দেয় না; তক্ষুনি ঠোঁটে করে তুলে নিয়ে চলে যায়। ওরা না কি পাখি নয়, ছদ্মবেশী গন্ধর্ব। হ্রদের ধারে দাঁড়ালে দেখা যায়, একদম হাতের নাগালে ঝলমল করছে তিনটে বরফ-ঢাকা পিক—নীলকণ্ঠ, কুবের আর স্বর্গারোহিণী। ওই স্বর্গারোহিণীর চড়াই ভাঙতে ভাঙতেই অনেক বছর আগে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় চার ভাই আর দ্রৌপদীকে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছিলেন।

লৌকিক, অলৌকিকে মেশানো এইসব গল্প আর গাড়োয়াল হিমালয়ের স্বর্গীয় সৌন্দর্যের টানে ট্রেকিং শুরু করেছিলাম।

কিন্তু সে যাত্রায় আমার আর সতোপন্থ তাল যাওয়া হল না।

বদ্রিনাথ থেকে মানাগ্রাম হয়ে বাণধার অবধি পৌঁছে বুঝতে পারলাম এই অবধিই আমার লিমিট। তেরো হাজার ফিট অবধি উঠেই বুকে বেশ চাপ লাগছে। সতোপন্থ তালের অলটিচ্যুড সেখানে ষোল হাজার ফিট। আশিস, শুভময় আর কল্লোলকে বললাম, তোমরা ঘুরে এসো, ব্রাদার। আমি এই বাণধারের ট্রেকারস-হাটে তোমাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রইলাম।

পারবেন না, গাঙ্গুলিদা?—ওদের মুখগুলো একটু শুকিয়ে গেল।

না রে ভাই। ষাট বছর বয়েস হল। তার ওপর জানোই তো, হার্টটাও গন্ডগোলের। এই অবধি যে আসতে পারলাম সেই ঢের। পাণ্ডবদের স্বর্গে যাওয়ার পথ দেখতে গিয়ে নিজে স্বর্গযাত্রা করার ইচ্ছে আমার একটুও নেই।

ওরা আর খুব বেশি জোরাজোরি করল না। কারণ ওরা জানে, সত্যিই সামনের রাস্তা ভীষণই টাফ।

অতএব পরদিন ভোরে পোর্টার, টেন্ট, খাবার দাবার নিয়ে ওরা তিনজন ধনো গ্লেসিয়ারের দিকে রওনা হয়ে গেল। আমি বাণধারেই রয়ে গেলাম, গাইড গুলাব সিং-এর হেফাজতে।

একটা পাহাড়ঘেরা ছোট্ট উপত্যকার মাঝখানে এই বাণধার গ্রামের ট্রেকারস-হাট। চারিদিকে তার সবুজ চারণভূমি, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে 'বুগিয়াল'। সেই বুগিয়ালের মধ্যে দিয়ে পায়ে-হাঁটা পথ এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে আরো ওপরের দিকে। গুলাব সিং জানাল ওখানেই কোনো এক গুহায় বসে না কি ব্যসদেব গনেশজিকে মহাভারতের ডিকটেশন দিয়েছিলেন। এটাও বেশ বিশ্বাসযোগ্য মনে হল। মহাকাব্য লিখতে হলে এরকম নির্জন আর সুন্দর জায়গায় বসেই লেখা উচিত।

ট্রেকারস-হাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, আমার তিন বন্ধু আর তাদের দুই পোর্টার ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। আমার সামনে গাঢ় নীল আকাশের গায়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে নীলকন্ঠ, চৌখাম্বা, স্বর্গারোহিণীর মতন আকাশছোঁয়া সব স্নো-পিক। বুগিয়াল জুড়ে নানা রঙের ঘাসফুলের মেলা। অ্যাজেলিয়ার ঝোপের ওপর নীল ডানার ঝিলিক তুলে একজোড়া ব্লু-ম্যাগপাই এসে বসল।

আমি বারান্দায় বসে এইসব দেখতে দেখতে চারটে দিন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু বাদ সাধল গুলাব সিং।

ও আমাকে বলল, চলুন বাবুজি, কাল এক বহুত আনোখা জায়গা থেকে আপনাকে ঘুরিয়ে আনি।

আমি অবাক হয়ে বললাম আরেঃ! ঘুরতে পারব না বলেই তো আমি ওই দাদাদের সঙ্গে গেলাম না।

তাই শুনে গুলাব সিং বলল, না, বাবুজি। আপনার কোনো পরেশানি হবে না। একদম প্লেন রুট ধরে যাব আসব। কসম সে।

কিন্তু কোথায় যেতে চাইছ সেটা তো একটু বলো।

গুলাব সিং তড়বড় করে তার দেশী জবানে যা বলল, বাংলায় তার অর্থ দাঁড়ায়, সে নাকি ভারি আশ্চর্য আর পবিত্র এক জায়গা। এমনিতে গড়পড়তা ট্রেকারদের সেই জায়গার কথা ওরা জানায় না। কিন্তু গুলাব সিং-এর আমাকে ভারি পছন্দ হয়েছে। ও খেয়াল করে দেখেছে, আমি স্থানীয় লোকেদের রীতিনীতিকে ইজ্জত দিই। তাছাড়া, ছোটখাটো জিনিস দেখেও খুশি হতে জানি। তাই ও আমাকে সেখানে নিয়ে যাবার কথা ভাবছে। ও আমাকে নিয়ে যাবে ধূমাবতীর মন্দির।

জিগ্যেস করলাম, কী আছে সেখানে?

কাঁচাপাকা দাড়ির ফাঁকে মুচকি হেসে গুলাব সিং বলল, ওই যে বললাম, দেবীমায়ের মন্দির আছে। আর কি রয়েছে সেটা এখন নাই বা বললাম। আগে থেকে জেনে গেলে চমকটা থাকবে না।

বললাম, বেশ, তাই হোক।

পরদিন খুব ভোরেই আমরা দুজন রওনা হয়ে গেলাম। গুলাব সিং সঙ্গে নিয়ে নিল চাল, ডাল, আলু আর দু-চারটে রান্নার বাসন। ওখানেই দুপুরে খিচুড়ি রেঁধে খাব। বেশ একটা পিকনিকের মতন ব্যাপার হবে।

পথের সৌন্দর্যের কথা বেশি বলব না, কারণ সে সৌন্দর্যের বর্ণনা করি এমন ভাষা আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি এই আট কিলোমিটার পথের মধ্যে যতরকম ফুল দেখলাম, যতরকমের পাখি দেখলাম—সারা জীবন হিমালয়ে ঘুরে বেড়িয়ে তা দেখিনি। হয়তো মানুষের চলাচল কম বলেই প্রকৃতির ভাণ্ডার এখানে এমন অক্ষত রয়েছে। মনে মনে ভাবলাম পথের শেষে কী আছে তাতে আমার আর আগ্রহ নেই গুলাব সিং। এই পথের মধ্যে যা পেলাম তাতেই আমার মন ভরে গেছে।

তখনো জানতাম না, কি বিস্ময় আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে ধূমাবতীতে।

দু-আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর জিগ্যেস করলাম, আর কতদূর গুলাব সিং?

ব্যাস, এসেই গেছি বাবুজি। সামনের বাঁকটা পেরোলেই...

কিছুক্ষণ থেকে নাকে একটা ঝাঁঝালো গন্ধ এসে লাগছিল। গুলাব সিংকে সে কথা বললামও একবার। ও কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল। আমরা পাকদণ্ডী পথের একটা বাঁক ঘুরলাম। আর ঘোরা মাত্র আমার পা-দুটো আপনা থেকেই মাটিতে গেঁথে গেল। যে দৃশ্য দেখলাম তার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। সামনে ওটা কী? কোনো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ?

এখান থেকেই পথটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে; শেষ হয়েছে একটা ছোটখাটো ফুটবলমাঠের সাইজের জায়গায়। আসলে সেটা অন্য একটা ছোট পাহাড়ের চূড়া। আমরা ঠিক পাশেই অপেক্ষাকৃত উঁচু একটা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছি বলে পায়ের নীচে দেখতে পাচ্ছি ওই চূড়াটাকে। তবে চূড়া বলতে যে শঙ্কু আকৃতি মাথায় আসে, এটা সেরকম নয়। অনেকটাই সমতল। আর সেই সমতলের মাঝখানে একটা জায়গা থেকে গলগল করে উঠে আসছে রাশি রাশি ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কী অদ্ভুত সেই ধোঁয়ার রং! গাঢ় খয়েরির মধ্যে সোনালির আভা। কোথায় যেন দেখেছি এরকম ধোঁয়া? একটু চিন্তা করতেই মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পাশে একটা স্যাকরার দোকান ছিল। তারা মাঝে মাঝে দোকানের বাইরে অ্যাসিড দিয়ে সোনা গলাত। এ সেই সোনা গলানো ধোঁয়ার রং।

চলুন বাবুজি। ওই হল ধূমাবতী।

গুলাব সিং-এর কথায় সম্মোহিতের মতন পা চালালাম বাকি রাস্তাটুকু পেরিয়ে ওখানে পৌঁছবার জন্যে। তবে একবারের জন্যেও ওই ধোঁয়ার উৎস থেকে আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। এর আগে নানান জায়গায় হট স্প্রিং দেখেছি—হিমাচল প্রদেশের জ্বালামুখিতে, মণিকরণে, সিকিমের জোরথাং-এর কাছে, এমনকি ঘরের পাশে বক্রেশ্বরেও। কিন্তু সে সব জায়গায় মাটির গহ্বর থেকে যা উঠে আসে তা মূলত গরম জল আর বাষ্প। এখানেই প্রথম দেখলাম মাটি ভেদ করে উঠে আসছে গন্ধকের ধোঁয়া।

হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই, গন্ধক। সালফার। তার গন্ধ এতক্ষণে বেশ স্পষ্ট।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় সেই কুণ্ডের ধারে পৌঁছে গিয়েছি। একটা লোহার রেলিং দিয়ে কুণ্ডের চারিপাশটা ঘেরা। আমি রেলিং-এ হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ভেতরে নজর চালালাম। দেখলাম, পাথরের দেয়াল ঢালু হয়ে নেমে গেছে পাতালের দিকে। কতদূর নেমেছে ওই গর্ত ? পৃথিবীর পেটে নিশ্চয়ই। একজন মানুষ ওই এবড়োখেবড়ো পাথর ছড়ানো ঢালু পথ দিয়ে অনেকদূর অবধি নেমে যাতে পারত,যদি না চোখ বুক জ্বালিয়ে দেওয়া ধোঁয়ার হলকাটা থাকত। ওই ধোঁয়ার জন্যেই ওখানে নামা দূরে থাক, বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর কথাও কেউ ভাবতে পারবে না।

বাবুজি, মন্দির দর্শন করে যান—গুলাব সিং-এর ডাক শুনে এগিয়ে গেলাম ছোট্ট মন্দিরটার দিকে। ভেতরেও ঢুকলাম। মূল ঘরটার সামনে লোহার গরাদের দরজায় তালা লাগানো। গরাদের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্রতিমাকে। একটা ব্যাপার একটু অবাক লাগল। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, দেবী ধূমাবতীর রূপ এক বৃদ্ধার। গতবার আমাদের পাড়ার কালিপুজোয় দশমহাবিদ্যার মূর্তি তৈরি করেছিল। সেখানেও দেখেছিলাম, ধবধবে সাদা এলো চুল আর নীল গায়ের রঙে ধূমাবতীর ভয়াল মূর্তি। কিন্তু এখানে প্রতিমার রূপ এক সাধারণ কিশোরীর মতন। এবং কোনো ভয়াল ব্যাপার নেই। বেশ স্নিগ্ধ মুখশ্রী।

গুলাব সিংকে সে কথা বলতে সে বলল, আমার তো অত পড়ালিখা নেই বাবুজি। তবে এটুকু জানি, ওই মূর্তি তৈরি হয়েছে কুণ্ডের মধ্যে যে দেবী বাস করেন, ওনারই সুরত দেখে। সেই দেবীর উমর অনেকই কম। দেখতে লাগে আঠারা কি উনিশ সাল।

আমি অনেকক্ষণ হাঁ করে গুলাব সিং-এর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। গাঁজা এদিকে জনপ্রিয় নেশা, তবে গুলাব সিং-কে কখনো খেতে দেখিনি। এখন মনে হল, লুকিয়ে-চুরিয়ে টান দেয় নিশ্চয়।

গুলাব সিং আমার চোখের ভাষা পড়তে পেরেছিল। বলল, নেশা করিনি বাবুজি। সাচ বলছি। অনেকেই ওই কুণ্ডের কিনারায় দেবী মাকে উঠে আসতে দেখেছে। এখানে যিনি পুরোহিত আছেন, তিনি তো অনেকবার দেখেছেন। 'ধূম' মানে জানেন তো বাবুজি? ধোঁয়া। ধোঁয়ার মধ্যে থেকে উঠে আসছেন বলেই ওনাকে এখানকার লোক ধূমাবতী বলে। ওনার দর্শন পাবার পরেই এই মন্দির তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আগে তো এখানে কিছুই ছিল না।

তা ছাড়া বাবুজি, একটা ঘটনা শুনলে আপনি আমার কথা মেনে যাবেন। ওই কুণ্ডের মধ্যে দু-বেলা দড়ির মাথায় থালি বেঁধে ভোগ নামিয়ে দেওয়া হয়। যখন থালি তুলে আনা হয়, তখন দেখা যায় সেই ভোগ কেউ খেয়ে গেছেন। দেবীমা ছাড়া কোন ইনসানের ক্ষমতা আছে ওই কুণ্ডের মধ্যে দু-মিনিটের বেশি বেঁচে থাকার? আপনিই বলুন।

গুলাব সিং-এর একটাও কথা বিশ্বাস করলাম না। করবার কারণও নেই। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি পাতাল থেকে কালচে ধোঁয়া পাক খেতে খেতে উঠে আসছে। গুঁড়ো গুঁড়ো গন্ধক জমতে জমতে কুণ্ডের চারিধারে পাথর হয়ে গেছে, হলুদ পাথর। ওখানে দেবী, দানবী, মানবী কারুর পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তবে আমি প্রতিবাদ বা তর্ক-বিতর্কে গেলাম না। মানুষের বিশ্বাস বড় কঠিন জিনিস। সহজে যে তাকে টলানো যায় না সে কথা ভালো করেই জানতাম।

ঘুরতে ঘুরতে আবার গিয়ে দাঁড়ালাম কুণ্ডের ধারে, একাই। সারা তল্লাটে আর কেউ ছিল না। পুরোহিত নাকি ভোরবেলাতেই এসে পুজোপাঠ করে, ভোগ দিয়ে নীচের গ্রামে চাষআবাদের কাজ দেখতে চলে গেছেন। আবার আসবেন বিকেল বেলায়। গুলাব সিং-ও একটু দূরে কয়েকটা বড় পাথর দেখে সেদিকে পা চালাল। ওখানে হাওয়ার দাপট কম। তাই রান্নার চুলা সাজাতে সুবিধে হবে। আমি একাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম মাটির বুক থেকে ভলকে ভলকে উঠে আসা ঘন ধোঁয়ার স্তম্ভকে।

অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে ওই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে আমার চোখ জ্বলছিল। তাই উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। রেলিং-এ হেলান দিয়ে তাকালাম আমার চারপাশে। মনে হল আমার চোখের জ্বলুনিকে যেন কেউ ঠান্ডা গোলাপজল দিয়ে ধুইয়ে দিল। এখানে আকাশটা যেন নীল ভেলভেটে মোড়া গয়নার বাক্স, আর তার ওপরে হিরের মালার মতন সাজানো রয়েছে গাড়োয়াল হিমালয়ের তুষারশৃঙ্গগুলো। পায়ের নীচে নাম না জানা এক বনভূমি রডোডেনড্রনের আগুনে লাল হয়ে রয়েছে। আমার গলা থেকে নিজের অজান্তেই গান বেরিয়ে এল, 'নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে, তারি মধু কেন মনমধূপে খাওয়াও না'?

আপনি বাঙালি?

নারীকণ্ঠে প্রশ্নটা ভেসে এল আমার পেছনদিক থেকে, আর সেটা বুঝতে পারামাত্র আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হৃদপিণ্ডটা হঠাৎ-ই এত জোরে ধকধক করে উঠল যে মনে হল সেটা বুঝি বুকের খাঁচাটাকে ফাটিয়ে বেরিয়ে আসবে। তবু সমস্ত সাহস একত্র করে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালাম। গন্ধকের ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক নারী মূর্তি।

ধূমাবতী।

আপনি বাঙালি? আবার প্রশ্ন করল মেয়েটি।

হ্যাঁ, মেয়েই বলি। কারণ ওই আটপৌরে শাড়ি পরা আঠেরো-উনিশের কিশোরীটির চেহারায় দেবীত্বের ছিটেফোঁটাও নেই।

আমি ওপর নীচে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লাম। নাড়তেই নাড়তেই খেয়াল করলাম মন্দিরের মূর্তির সঙ্গে ওর চেহারার মিল।

মেয়েটা নিজের মনেই বলল, অবশ্য বাঙালি না হলে রবীন্দ্রসংগীত গাইবেন কেন?

এত সাধারণভাবে কথা বলছিল মেয়েটা যে, একটু আগের অলৌকিকের ভয়টা আমার একেবারেই কেটে গিয়েছিল। তার জায়গা নিয়েছিল সীমাহীন বিস্ময়। অজস্র প্রশ্ন জাগছিল মনে।

বুঝতেই পারছি, ওকে দেখেই ধূমাবতীর গল্প তৈরি করেছে এখানকার গাঁয়ের মানুষেরা। কিন্তু ওর আসল পরিচয় কী?

ও অমন বীভৎস জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে কেন?

সবচেয়ে বড় কথা, ওখানে ও বেঁচে আছে কেমন করে?

আমাকে এর কোনো প্রশ্নটাই করার সুযোগ না দিয়ে ও-ই বরং আরেকটা প্রশ্ন করে বসল —আচ্ছা, ময়দানে এখনো বঙ্গসংস্কৃতি-সম্মেলন হয়? দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা ওনারা গান গাইতে আসেন সেখানে? অখিলবন্ধু ঘোষ?

মানুষের অবাক হবার একটা সীমা আছে। তারপরে বোধহয় আর কেউই অবাক হতে পারে না। বুঝতে পারলাম, সেই সীমা আমি পেরিয়ে এসেছি। কারণ দেখলাম বেশ শান্ত স্বরেই উত্তর দিলাম—যাঁদের নাম করলেন তাঁরা কেউই আর ইহলোকে নেই। বহুদিন আগে মারা গেছেন। আর বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের খোলা মঞ্চের সামনে বসে ওনাদের গান শোনার অভিজ্ঞতাও তো আপনার থাকার কথা নয়। কারণ ও অনুষ্ঠান শেষবার হয়েছে বোধহয় পঁয়ত্রিশ বছর আগে। আপনি তখনো জন্মাননি।

না, জন্মেছিলাম। তখন আমি কলেজে পড়ি, লেডি ব্রেবোর্নে। কলেজের শেষে বন্ধুরা মিলে চলে যেতাম ময়দানে, গান শুনতে।

মনে মনে ভাবলাম মেয়েটা দেবী না হলেও পাগল তো বটেই। এইমাত্র যা বলল তাতে এখন ওর বয়েস হওয়া উচিত পঞ্চান্নর আশে পাশে। কিন্তু মাঝে মাঝে হাওয়ার টানে ধোঁয়ার পর্দা সরে গেলে তার মধ্যে দিয়ে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ওর টানটান চামড়া, কাকের পালকের মতন একপিঠ কালো চুল, ঝকঝকে দাঁতের সারি। কুড়ি বছরের থেকে ওর বয়েস একদিনও বেশি নয়।

কী ভাবছেন? আমি পাগল?

না, না,...।

মেয়েটা আমার মনের কথা বলে দিয়েছে, তাই প্রবল অস্বস্তিতে পড়লাম। তারপর বললাম, আপনি এদিকে চলে আসুন না। ওখানে কেমন করে দাঁড়িয়ে আছেন জানি না, কিন্তু এবার অসুস্থ হয়ে পড়বেন যে।

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, অসুস্থ হয়ে পড়ব? দেবী ধূমাবতী যে ধূমের মধ্যেই অধিষ্ঠান করেন সে কথা শোনেননি? বরং এই কুণ্ডের বাইরে বেরোলেই আমি মারা পড়ব।

মেয়েটা ধীরেসুস্থে কুণ্ডের দেয়ালের গা থেকে বেরিয়ে আসা একটা পাথরের ওপর বসল। ওর সঙ্গে আমার ব্যবধান বড়জোর কয়েক হাত, তাই ওর কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু বিষাক্ত ধোঁয়ার রাশি ওর চেহারাটাকে বেশিরভাগ সময়েই আমার চোখ থেকে আড়াল করে রেখেছিল।

আপনিও একটু বসুন না। মেয়েটা বলল। আপনাকে আমার দুঃখের গল্প শোনাই। কতদিন বাদে কোনো বাঙালির দেখা পেলাম।

দেবী নই, বুঝলেন? আমি আসলে একটা গিনিপিগ। মেয়েটা বলল।

আমার বাবা নিজের গবেষণায় আমাকে গিনিপিগ বানিয়েছিলেন। কী বলছেন? তাঁর নাম? না, নামটা বলব না। হেরে যাওয়া মানুষের নাম জানতে নেই। নাম জানতে হয় কৃতি মানুষদের। তবে এইটুকু বলতে পারি যে ভারতের প্রথম পাঁচজন জেরানটোলজিস্ট-এর মধ্যে বাবা ছিলেন একজন। 'জেরানটোলজি' মনে জানেন তো? জরাবিজ্ঞান।

জরাকে কিম্বা বার্ধক্যকে জয় করবার স্বপ্নটা বোধহয় মানুষের সবচেয়ে পুরনো স্বপ্নগুলোর মধ্যে একটা। যযাতীর গল্প জানেন নিশ্চয়? আমার বাবা সেই গল্পকে সত্যি করার কাজে নেমেছিলেন। অবশ্যই বিজ্ঞানের পথ ধরে।

বাবাই আমাকে বলেছিলেন তাঁর কাজের মূল সূত্রটুকুর কথা। যেটুকু মনে আছে আপনাকে বলি। আমাদের শরীরকে, শুধু আমাদের কেন, সমস্ত প্রাণীর শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে একটি মৌল। সেই আবার তাকে জীর্ণ-ও করে। পালন আর সংহার একই ঈশ্বরের কাজ। সেই মৌলিক ঈশ্বরের নাম কী জানেন? অক্সিজেন।

অক্সিজেন আমাদের খাদ্যকে ভেঙে শক্তি তৈরি করে। মানে খাদ্যকে জারিত করে। জারন মানে অক্সিডেশন, পড়েছেন তো ছোটবেলায়? কিন্তু সেই অক্সিজেনই আবার অতি উৎসাহে সেমসাইড গোল করার মতন আমাদের শরীরের কোষগুলোকেও ভেঙে ফেলে। তখন আমাদের দাঁত নড়ে যায়, চুল পেকে যায়। সোজা কথায়, আমরা বুড়ো হয়ে যাই।

আমার বাবা ভাবলেন, যদি অক্সিজেনের বদলে খাদ্য জারনের কাজটা অন্য কোনো মৌলকে দিয়ে করানো যায়, যার উৎসাহ অক্সিজেনের মতন অত বেশি নয়? কেমন হয় তাহলে? প্রকৃতিতে জারক মৌলের তো অভাব নেই। বাতাসেই রয়েছে সালফার, মনে গন্ধক। ভালো জারক, তবে বেশ ঢিমে তালে কাজ করে। অক্সিজেন যেখানে এক অণু অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে আটত্রিশ ইউনিট শক্তি তৈরি করে, সেখানে সালফার করে মাত্র দু-ইউনিট।

বাবা ভাবলেন, হোক না একটু কম শক্তি তৈরি, ক্ষতি কী ? না হয় প্রথম দিকে যাদের গায়ে-গতরে খাটতে হয় না তারাই এর উপকারটা পাবে। পরে দেখা যাবে ব্যবস্থাটার উন্নতি করা যায় কি না।

প্রথম পরীক্ষাটা বাবা চালালেন আমার উনিশ বছরের শরীরটার ওপর। আমার শরীরের একটা স্টেমসেলকে বদলে দিলেন। তারপর সেই সেলটাই অন্য কোষগুলোকে বদলে দিল। আমি হয়ে গেলাম এমন এক প্রাণী, যে অক্সিজেনের বদলে প্রশ্বাসে গন্ধক টেনে নিয়ে বাঁচে। সাফল্যের গৌরবে আমার পিতৃদেবের তো মাটিতে পা পড়ে না।

কিন্তু সেই উচ্ছাস বেশিক্ষণ রইল না।

ল্যাবরেটরির টেস্ট-চেম্বারের ভেতরে তো বাবা ঠেসে সালফার গ্যাস ঢুকিয়েছিলেন। সেখানে দিব্যি ছিলাম। কিন্তু সেই চেম্বার থেকে আমাকে বাইরের বাতাসে বার করেই তিনি বুঝতে পারলেন বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। আমার দেহের কোষগুলো সালফার নেওয়ার জন্যে তৈরি, কিন্তু আমার রেসপিরেটরি-সিস্টেম,আমার শ্বাসনালি, ফুসফুস এরা কেউই তো তৈরি নয়। তারা তো বাইরের বাতাসে মিশে থাকা ওই অল্প সালফারকে টানতে পারছে না।

ডাঙায় তোলা মাছের মতন খাবি খেয়ে মরে যাই আর কি।

বিপদ বুঝতে পেরেই বাবা আমাকে আবার ল্যাবরেটরির গন্ধকের বাষ্পে ভর্তি কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দিলেন। শরীরটা বেঁচে গেল, কিন্তু মরে গেল আমার মনটা। চারিদিক বন্ধ একটা ছোট্ট চেম্বারের মধ্যে আমি একটা উনিশ বছরের মেয়ে, ভাবতে পারছেন? আমার বন্ধুবান্ধব, কলেজ, লাইব্রেরি, গান, নাটক আত্মীয়স্বজন সব হারিয়ে গেল। আমি চেম্বারের ভেতর থেকে চিৎকার করতাম, বাবা, আমাকে বাইরে নিয়ে যাও! বাবা, একটু আকাশ দেখাও!

বাবা অনেক চেষ্টা করলেন আমার রেসপিরেটরি-সিস্টেমকে সালফার নেওয়ার মতন করে পালটে ফেলতে। পারলেন না। এদিকে চিরকাল ল্যাবরেটরির চোর-কুঠুরিতে যে একটা মেয়েকে বন্দি করে রাখা যায় না, সেটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। অবশেষে তাঁর মাথায় এল এই ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। আমাকে নিয়ে চলে এলেন এই গন্ধক কুণ্ডে।

যা হারিয়েছিলাম তার কিছুই আর ফিরে পেলাম না, মাথার ওপরের আকাশটুকু ছাড়া।

আর কয়েকবছর কেটে যাওয়ার পরে বুঝতে পারলাম সবকিছু হারিয়ে তার বদলে একটা দারুণ জিনিস পেয়েছি। কী বলুন তো?

চিরযৌবন।

অক্সিজেনে শ্বাস নিই না বলে কোনোদিন আমার চুল পাকবে না, দাঁত নড়বে না। আমার গায়ের চামড়া চিরকাল টান টান থাকবে। সেইজন্যেই পঞ্চান্ন বছরের এই মহিলাকে দেখে আপনি ভাবছেন 'টিন-এজার'। মরবও না বোধহয় সহজে। কিন্তু কী করব বলুন তো এই অনন্ত পরমায়ু নিয়ে?

তারপর? আমি রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলাম।

তারপর আর কী? বাবা যখন দেখলেন পাহাড়ি লোকেদের কল্পনায় আমি দেবী হয়ে গেছি, আমার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আর চিন্তা নেই, তখন তিনি আবার কলকাতায় ফিরে গেলেন। কাজপাগল লোক তিনি, কতদিন কাজ ছাড়া বসে থাকবেন?

আগে বছরে দু-তিনবার করে আসতেন। বছর দশেক হয়ে গেল তিনি আর আসেন না। মারা গেছেন নিশ্চয়ই।

যখন থেকে গন্ধকে নিশ্বাস নিচ্ছি, তখন থেকেই আমার শরীরে আর শীত-গ্রীষ্মের বোধ নেই। অসুখ-বিসুখ তো নেই-ই। পুরুতমশাই দেবীমায়ের নামে দুবেলা ভোগ দিয়ে যান। তাই খাই। সব মিলিয়ে এই কুণ্ডের মধ্যে বেঁচে থাকতে কোনো অসুবিধে নেই। তবে, বেঁচে থাকা, শুধুই বেঁচে থাকা, বুঝলেন? যেভাবে একটা বটগাছ কিম্বা একটা ভাইরাস বছরের পর বছর বেঁচে থাকে, ঠিক সেইরকম।

কে ডাকছে বলুন তো? আপনার সঙ্গে কি কেউ এসেছিল? আপনি কি চলে যাচ্ছেন?

শুনুন, যাবার আগে একটা কথা রাখবেন? ওই গানটা শেষ করে যান না, প্লিজ, ওই যেটা তখন গাইছিলেন। নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%