ওদের ভীষণ খিদে

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

সুনন্দ সোম নিজের অফিসের চেম্বারে বসেছিলেন, একা।

ওনার কোম্পানির নাম থেকে ব্যবসার চরিত্রটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। একটু হেঁয়ালির মতন নাম—'এলিমিনেটর'। অর্থাৎ কিনা যে সরিয়ে দেয়, হঠিয়ে দেয়।

কিন্তু কী সরিয়ে দেয়? কাদের হঠিয়ে দেয়?

ওয়ার্ল্ড কাউন্সিলের কয়েকজন নেতা এবং খুব উঁচু পজিশনের চার-পাঁচজন অফিসারের বাইরে ব্যাপারটা আর কেউ জানে না। 'এলিমিনেটর' সরিয়ে দেয় অন্য গ্রহ থেকে আসা অবাঞ্ছিত অতিথিদের। হঠিয়ে দেয় পৃথিবীর শত্রুদের। 'এলিমিনেটর' মানে 'এলিমিনেটর অফ হার্মফুল এলিয়্যান্স'। বিপজ্জনক ভিনগ্রহীদের ঘাড় ধরে পৃথিবীর বাইরে বের করে দেওয়াটাই তার কাজ। এই কাজের জন্যে 'এলিমিনেটর' ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল থেকে মোটা টাকার কনট্র্যাক্ট পায়।

কাজটায় একটা আলাদা রকমের দক্ষতা লাগে, কারণ তুমি যাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামছ তারা মানুষ নয়। তারা তোমার চেয়ে কতটা বেশি বুদ্ধি কিম্বা শক্তি ধরে তার কিছুই তোমার জানা নেই। সুনন্দ সোমের সেই দক্ষতা রয়েছে।

স্যার, একটু কথা বলার সময় হবে?

মহিলাকণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে সোমসাহেব দরজার দিকে তাকালেন। পাল্লা-দুটো অল্প একটু ফাঁক করে কুণ্ঠিত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে রিখিয়া মিত্র, সোমসাহেবের সেক্রেটারি।

কী ব্যাপার রিখিয়া? ভেতরে এসো। সোমসাহেব সামনের চেয়ারটা দেখালেন।

চেয়ারে বসে রিখিয়া ওর ছোট্ট রুমালটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। সোমসাহেব চট করে একবার এ.সি. মেশিনের ডিসপ্লে বোর্ডের দিকে তাকালেন। না, রিখিয়া গরমে ঘামছে না। অন্য কোনো কারণ আছে। তিনি আবার জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার? শরীর-টরির ঠিক আছে তো?

হ্যাঁ স্যার। মানে...আপনাকে ওই বাচ্চাগুলোর ব্যাপারে একটা কথা বলার ছিল।

বাচ্চা! ওহো। ওই সিঙ্গালিলা রেঞ্জ থেকে যাদের নিয়ে এসেছিলাম? হ্যাঁ, কী হয়েছে ওদের? বেঁচে আছে তো?

না স্যার। মানে হ্যাঁ স্যার। মানে অত খারাপ কিছু নয় স্যার। আসলে ওরা পাগলের মতন খেয়ে যাচ্ছে। ওদের ভীষণ খিদে। বিনতাদি বলছিলেন, ওদের খাওয়া থামাতে পারছেন না।

সোমসাহেব রিখিয়ার মুখের দিকে চুপ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসি থামিয়ে চোখের কোণ থেকে জল মুছতে মুছতে বললেন, এটা কি আমাকে বলার মতন একটা সমস্যা হল রিখিয়া? বাড়ন্ত বয়সের বাচ্চারা খাবে না? এলিমিনেটরের টাকাপয়সার অবস্থা কি এতটাই খারাপ যে, দশটা বাচ্চাকে খাওয়াতে পারবে না? আর কিছু বলবে?

না স্যার। অপ্রস্তুতভাবে হেসে রিখিয়া মিত্র ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দুই

রিখিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরে সুনন্দ সোম আর কাজে মন বসাতে পারলেন না। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পনেরোদিন আগের সিঙ্গালিলা রেঞ্জের সেই অপারেশনের ছবি। অপারেশন নীলকণ্ঠ।

একটা মাঝারিমাপের অনুপ্রবেশকারী মহাকাশযানকে ধাওয়া করে তারা ওখানে পৌঁছেছিলেন। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল স্পেস-শিপটাকে। পাইনবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চোখে বায়নাকুলার লাগিয়ে ওটার চেহারাটা ভালো করে দেখেই সোমসাহেব আর তার সঙ্গী চারজন এলিয়্যান-শিকারি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। সেকেন্ড জেনারেশনের একটা পুরোনো স্পেসশিপ। দেখলেই বোঝা যায় মানুষের থেকে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে বেশ অনেকটাই পেছিয়ে রয়েছে। কাজেই ওদের কব্জা করতে খুব একটা অসুবিধে হবার কথা নয়।

ভুল ভেবেছিলেন সোমসাহেবরা।

আত্মসমর্পনের ডাক দেওয়া মাত্র স্পেসশিপটার ভেতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট ছুটে এসেছিল। বুলেট বলেই রক্ষে। উন্নত প্রযুক্তির কোনো মারণাস্ত্র হলে ওখানেই হয়তো বডি ফেলে আসতে হত। সঙ্গে সঙ্গেই রিট্যালিয়েট করেছিলেন ওনারা। প্রায় ঘণ্টাখানেক গোলাগুলি চলার পরে সুনন্দ সোম স্ট্র্যাটেজি বদলালেন। আগেকার দিনে যেভাবে দুর্গ অবরোধ করা হত সেইভাবে স্পেসশিপটাকে অবরোধ করে বসে রইলেন।

একদিন কেটে গেল, দুদিন। তিনদিনের দিন মাঝরাতে ওরা বেরোল।

ওঃ, সে কি বীভৎস চেহারা এলিয়্যানগুলোর। গত কুড়ি বছরের প্রফেশনাল লাইফে কম কিসিমের গ্রহান্তরের জীব দেখেননি তিনি। কিন্তু এই সিঙ্গালিলার এলিয়্যানসদের দেখে যেরকম গা শিরশির করে উঠেছিল সেরকম আর কখনো হয়নি।

অ্যালিয়েনসদের চেহারা যদি একেবারেই অমানুষিক হয় তাহলে সমস্যা হয় না। চৌকো প্রাণী দেখেছেন তিনি, গোল প্রাণী দেখেছেন। সবুজ জেলির মতন জীব দেখেছেন আবার কোয়ার্টজের কোষ দিয়ে তৈরি প্রাণীও দেখেছেন, যাদের দেখলে ঝাড়লণ্ঠনের কথা মনে পড়ে। অমন সব প্রাণীদের তাড়িয়ে দিতে মনখারাপ হয় না। নিতান্ত প্রয়োজন পড়লে মারতেও হাত কাঁপে না। আলপিন ফুটিয়ে বেলুন ফাটাতে কি কারুর খুব একটা মনখারাপ হয়? হয় না, কারণ বেলুনকে দেখলেই বোঝা যায় যে, সে মানুষ নয়।

কিন্তু সেদিন মাঝরাতে ওই ভিনগ্রহের মহাকাশযান থেকে যারা নেমেছিল তাদের আকার আকৃতি সবই ছিল মানুষের মতন। শুধু ওদের সারা গা শক্ত খয়েরি রঙের আঁশে ঢাকা ছিল আর পিঠে ছিল ডানা। পাখির মতন ডানা নয়, পোকার মতন ডানা। স্বচ্ছ, শিরা-উপশিরায় ভরা একজোড়া করে ডানা।

ওরা সেই ডানায় ভর করে আকাশে উড়েছিল।

তারপর যেটা হয়েছিল সেটা মনে করতে সুনন্দ সোমের ভালো লাগছিল না। উনি পারতপক্ষে প্রাণীহত্যা করতে চান না। কিন্তু তাই বলে ভিনগ্রহীদের যথেচ্ছভাবে পৃথিবীময় ছড়িয়ে যেতেও তো দেওয়া যায় না।

জ্যোৎস্নাভরা আকাশে ওরা ছিল খুব সহজ টার্গেট। চাঁদের সামনে দিয়ে একটা একটা করে কালো সিল্যুয়েটের শরীর উড়ে যাচ্ছিল আর ওঁদের মধ্যে একজন কেউ ফায়ার করছিলেন। সকালবেলায় ওরা মোট ষোলোটা বডি খুঁজে পেয়েছিলেন। স্পেস-শিপের ভেতরেও আর কোনো জনপ্রাণী ছিল না। কাজেই 'মিশন কমপ্লিট' এইরকম একটা রিপোর্ট পাঠিয়ে ওনারা ফেরার পথ ধরেছিলেন।

ফেরার পথে ওরা স্রেফ কৌতূহলের বশে ঢুকেছিলেন পুরোনো এক বৌদ্ধ গুম্ফায়। আর সেই গুম্ফার উঠোনে পা দিয়েই ওই পোকা-মার্কা এলিয়্যানস-গুলোকে মারার জন্যে মনের মধ্যে যেটুকু খুঁতখুঁতুনি ছিল সেটা কেটে গিয়েছিল। একা সোমসাহেবের নয়, ওনাদের পাঁচজনেরই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল। হাতের মুঠো নিশপিশ করছিল মরা পোকাগুলোকে আরেকবার মারবার জন্যে।

গুম্ফার উঠোনে অসহায়ের মতন পড়েছিল তিনজন লামার মৃতদেহ। ওদের কারা খুন করেছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি, কারণ, উঠোনে যে বুলেটের খোলগুলো ছড়িয়ে ছিল, সেগুলো সুনন্দ সোমের খুব চেনা। ওই একই খোল পাইনবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা স্পেস-শিপটার চারপাশে খুঁজলে অনেক পাওয়া যাবে। তাছাড়া কাদার ওপর ওই লম্বা নোখওলা আঙুলের ছাপ, সে-ও তো ভুল হবার নয়।

মৃতদেহগুলোর সৎগতি করে ওনারা যখন গুম্ফা থেকে বেরিয়ে আসছেন ঠিক তখনই পাঁচজনের কানে একসঙ্গে পৌঁছেছিল শিশুর কান্নার আওয়াজ। ওনারা আবার দৌড়ে গুম্ফার ভেতরে ঢুকেছিলেন। অনেক কষ্টে কান্নার আওয়াজ অনুসরণ করে যেখানে পৌঁছেছিলেন সেখানে কোনো মানুষের পক্ষে এমনিতে যাওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। গুম্ফার ঢালু চুড়োর নীচে একটা কাঠের ফলস সিলিং ছিল। চুড়ো আর সেই সিলিং-এর মাঝখানে একটা অন্ধকার কুঠুরির মধ্যে জড়াজড়ি করে পড়েছিল দশটা বাচ্চা। ওদের মধ্যেই কোনো একটা বাচ্চা কেঁদে উঠেছিল।

সোমসাহেবের অনেক অভিযানের সঙ্গী তারাপদ মৃধা। কঠিন মনের সেই মানুষটার মুখও দৃশ্যটা দেখে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছিল। অস্ফুট স্বরে তারাপদ বলেছিল—আহারে। রাক্ষসগুলোর হাত থেকে বাচ্চাগুলোকে বাঁচানোর জন্যে লামারা কত কষ্ট করেছিল দেখুন। কিন্তু নিজেরাই বাঁচল না। ভগবানের অনেক দয়া যে, আমরা এসে পড়েছিলাম। নাহলে বাচ্চাগুলোও বাঁচত না।

তারপর ওরা স্পেস-কারে চেপে কলকাতায় ফিরেছিলেন। হ্যাঁ, অবশ্যই বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে।

এলিমিনেটরের একটা বিশাল প্রপার্টি রয়েছে জোকায়। সুনন্দ সোম সেখানে একটা গরিবদের স্কুল আর অনাথ আশ্রম চালান। চারিদিকে সবুজ বাগান আর সব্জিখেতের মধ্যে তিন চারটে বাড়ি। তাছাড়া গোয়াল, পোলট্রি এসবও রয়েছে।

বিনতা নামে এক অবিবাহিতা দশাসই মহিলা পুরো ব্যাপারটাকে সামলান। মহিলার শরীরটা যদি তরমুজের মতন হয় তাহলে মাথার ঘিলুটা কড়াইশুটির দানা। তবে বোকাসোকা হলেও বিনতার মনটা খুব নরম, আর বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে বুদ্ধির চেয়ে হৃদয়টাই বেশি দরকার হয়। সেই বিনতা ম্যাডামই সোমসাহেবের কাছে খবর পেয়ে দশটা বাচ্চাকে খুশি মনে জোকার অনাথ আশ্রমে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তারাপদ মৃধা একবার পুলিশকে ইনফর্ম করার কথা বলেছিল। তাতে সুনন্দ সোম জবাব দিয়েছিলেন, দাঁড়াও, বাচ্চাগুলো একটু ধকল সামলে নিক। আর আমিও কাল দশদিনের জন্যে ইওরোপ যাচ্ছি। ফিরে এসে ওসব ফর্মালিটিস মেটাব।

তিন

সোমসাহেব ফিরেছেন সবে আজ সকালেই। আর সন্ধেবেলায় রিখিয়া এসে এই অদ্ভুত কথা বলে গেল। বাচ্চাগুলো না কি পাগলের মতন খেয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতন খাওয়া মানে কী?

সোমসাহেব একবার ভাবলেন, তখনই জোকা থেকে ঘুরে আসবেন। কিন্তু লম্বা ট্যুরের পর শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল। তাই ভিডিও-ফোনটা অন করে বিনতা ম্যাডামকে ধরলেন।

হ্যাঁ, স্যার। বলুন।—স্ক্রিনের ওপর বিনতা বেশ বড় একটা হাই তুলল।

খবর সব ঠিক আছে?

এতদিন অবধি কোনো কথা বলার আগে বিনতাকে দুবার ভাবতে দেখেননি সোমসাহেব। আজ দেখলেন। একটুক্ষণ ভুরু কুঁচকে কী যেন ভেবে নিয়ে বিনতা বললেন, হ্যাঁ, এমনিতে সব ঠিকই আছে। কিন্তু আপনি বলুন তো স্যার, বাচ্চারা কি প্রতিদিন বাড়ে?

মানে!

মানে ওই সিঙ্গালিলার দশটা বাচ্চা—গত দশদিনে একেকজনের কুড়ি কেজি করে ওয়েট বেড়েছে। ওরা ভালো করে নড়াচড়া করতে পারছে না স্যার। খাচ্ছে আর মোটা হচ্ছে।

আমাকে আগে জানাননি কেন? রাগে ফেটে পড়লেন সুনন্দ সোম। একজন ডাক্তার তো ডাকতে পারতেন। আপনি ওদের ঘরে ক্যামেরাটা ট্র্যান্সফার করুন তো।

ভিডিওস্ক্রিনে যে ছবিটা ফুটে উঠল সেটা অনেকদিক থেকেই অস্বাভাবিক। প্রথমত এর আগে বাচ্চাদের এমন আলসেমি করতে কখনও দ্যাখেননি সোমসাহেব। দশটা বাচ্চাই মেঝের ওপর ঢিমেতালে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। হাঁটতে পারছে না, বসতে পারছে না। বিশাল মোটা শরীর নিয়ে ওরা বুকে হেঁটে মেঝের এদিক থেকে ওদিকে যাতায়াত করছিল। ওদের চলাফেরার মধ্যে কেমন যেন একটা থলথলে কিলবিলে ভাব।

দ্বিতীয়ত...। সোমসাহেব চাপাগলায় বললেন, ম্যাডাম, আমি কি ঠিক দেখছি? ওরা কি কাঁচা বাঁধাকপি খাচ্ছে?

নির্বোধ মহিলার গলায় কোনো তাপ-উত্তাপ দেখা গেল না। তিনি বললেন, হ্যাঁ স্যার। স্টোরে আর কিছু নেই। ক'টা বাঁধাকপি পড়েছিল, তাই এনে দিলাম। না দিলে ভয়ঙ্কর ছটফট করছে। মেঝেতে মাথা ঠুকে ঠুকে মনে হচ্ছে মাথাগুলো ফাটিয়েই ফেলবে।

কিছুক্ষণ থম হয়ে ভিডিও-স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সুনন্দ সোম বললেন, আমি কাল ভোরবেলায় আপনার ওখানে পৌঁছচ্ছি।

পরদিন ভোরে সোমসাহেবকে স্পেস-কার থেকে নামতে দেখেই আলুথালু পোশাকে দৌড়ে এলেন বিনতা ম্যাডাম। ভদ্রমহিলাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছেন। সুনন্দ সোম জিগ্যেস করলেন, কী হল?

স্যার, স্যার! বাচ্চাগুলো পালিয়েছে।

কী যা তা বকছেন? ওদের বাইরে ছেড়ে রেখেছিলেন না কি, যে পালাল?

না স্যার। ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিলাম। তাও পালাল। দেখুন, দেখে যান! সোমসাহেবের হাত ধরে টানতে টানতে বিনতা ম্যাডাম তাকে একটা একতলা ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন। এই ঘরটার ছবিই কাল রাতে ভিডিওতে দেখেছিলেন সোমসাহেব। মেঝের ওপর টানা বিছানা পাতা। সারা ঘর নোংরা খাবারের টুকরোয় ভর্তি। কিন্তু দুটো জানলাতেই মোটা গরাদ দেওয়া আছে।

সোমসাহেব গর্জন করে উঠলেন, গরাদ তো ভাঙেনি। বাচ্চাদের পক্ষে ভাঙা সম্ভবও না। তাহলে পালাল কেমন করে? ম্যাডাম, এবার কিন্তু আমি আপনাকে চাকরি থেকে তাড়াব।

বিনতা ম্যাডাম কান্না চেপে ফোঁসফোঁস করতে করতে ছাদের স্কাইলাইটের দিকে দেখালেন।

না, উনি মিথ্যে বলেননি। ঘরের ভেতরে ঢুকে আলো জ্বেলে সোমসাহেব দেখলেন, বারো ফুট উঁচু দেয়াল জুড়ে ছোট ছোট হাত পায়ের নোংরা ছাপ। নোংরা হাতপায়ের ছাপ ঘরের সিলিং-এও। সিঙ্গালিলার বাচ্চারা মাছির মতন দেয়াল বেয়ে, সিলিং বেয়ে হেঁটে গেছে। তারপর স্কাইলাইট গলে লাফ মেরেছে বাইরে। সুনন্দ সোম ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে বেরোলেন।

চার

ঘরটার পেছনদিক থেকেই ঘাসজমি শুরু হয়েছে। জমির মাঝামাঝি জায়গায় মাথার সিঁথির মতন লম্বা লাইন ধরে জমির ঘাস দেবে গেছে। ওখান দিয়েই বুকে হেঁটে চলে গেছে ওই দশটা বাচ্চা। দশটা ভারী বাচ্চা। দশটা অলস বাচ্চা। একজনের পেছনে একজন, এইভাবে এগিয়ে গেছে ওরা।

ওই লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সুনন্দ সোম আর যেতে যেতে দুপাশে তাকাচ্ছিলেন। এক রাতের মধ্যেই ওরা বিনতা ম্যাডামের সাধের বাগান চৌপাট করে দিয়েছে, ওই দশটা লোভী বাচ্চা। টমেটো আর কপির খেতে একটা গাছেও পাতা নেই। সারা রাত পেট ভরে খেয়েছে ওরা। কিন্তু তারপর? ওরা কোথায় লুকিয়ে পড়ল?

সুনন্দ সোমের মতন অভিজ্ঞ শিকারিও ওদের ট্রেল হারিয়ে ফেললেন। একটা বিরাট পুকুর আর তাকে ঘিরে দু-বিঘের আমবাগান। ওইখানে পৌঁছিয়েই ভারী শরীরের ছাপ হারিয়ে গেল। ওইখান থেকেই বাচ্চাগুলো যেন স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল, আর কোথাও ওদের খুঁজে পাওয়া গেল না। মাটিতে না, গাছে না, এমনকী সবথেকে খারাপ সম্ভাবনার কথাটা ভেবে সোমসাহেব পুকুরেও জাল ফেলিয়েছিলেন। কিন্তু সেই জালেও মাছ ছাড়া আর কিছু উঠল না।

সুনন্দ সোম কলকাতায় ফিরে এলেন। কেটে গেল আরো পনেরোটা দিন। এই পনেরোদিনে সুনন্দ সোম তার প্রতিদিনের রুটিন মেনে স্পেস-শিপেদের ওপর নজরদারী চালিয়েছেন। ফাইলে সই করেছেন। লেজার-গানের লেন্স পরিষ্কার করেছেন। ওয়ার্ল্ড কাউন্সিলে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। কিন্তু সব কাজের মধ্যে তার মন পড়ে থেকেছে জোকার সেই খামারবাড়িটার দিকে। বাচ্চাগুলো গেল কোথায়?

পনেরোদিনের মাথায় তিনি অফিসে ঢুকতেই রিখিয়া ডেস্কের ওপর খুলে রাখা একটা বই চটপট ড্রয়ারে লুকোতে গিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। সুনন্দ সোম মুচকি হেসে বইটা মেঝে থেকে তুলে রিখিয়াকে ফেরত দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। রিখিয়ার একটা বারো বছরের মেয়ে আছে তিনি জানেন। এটা তারই স্কুলের জীবনবিজ্ঞানের বই। রিখিয়া সকালের এই ফাঁকা সময়টায় মেয়ের পড়ার বই পড়ছিল, অনেক মা-ই যেমন পড়ে। বাড়ি ফিরে নিশ্চয় হোম-টাস্ক করতে মেয়েকে হেল্প করবে। কিন্তু বইটার মলাটে এটা কিসের ছবি?

সোমসাহেবের মাথার মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এত বোকা তিনি! এত সময় লাগল তার ব্যাপারটা বুঝতে! পকেট থেকে সেলফোন বার করে তারাপদ মৃধাকে ডাকলেন—তারাপদ, পাঁচমিনিটের মধ্যে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াও। জোকা যাব। সঙ্গে বন্দুকটা নিও।

পনেরো মিনিট বাদে আবার সেই আমবাগান। বাচ্চাগুলোকে খুঁজে পেতে আর কোনো অসুবিধে হল না। কারণ সোমসাহেব এবারে জানতেন তিনি কোথায় খুঁজবেন, কী খুঁজবেন।

তিনি আর তারাপদ বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গুনতে শুরু করলেন—এক, দুই, তিন, চার। পাঁচ,ছয়, সাত, আট। নয়, দশ। হ্যাঁ, দশটাই আছে। না দশটা বাচ্চা নয়। দশটা গুঁটি। পাশবালিশের মতন বড় আর ঘন সবুজ রঙের দশটা গুঁটি আমগাছের সবুজ পাতার সঙ্গে রং মিলিয়ে ঝুলছে।

ওরা চুপ করে একটা গাছের নীচে বসে রইলেন।

একটু বাদেই ওদের সামনের গাছ থেকে ঝুলতে থাকা গুঁটিটা নড়তে শুরু করল। ওটা নড়ছে, মোচড় খাচ্ছে। নড়ছে, মোচড় খাচ্ছে। তারপর হঠাৎ গুঁটির খোলশটা ফেটে গেল আর সেই ফাটা খোলশের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো একটা পা। ঘন খয়েরি রঙের আঁশে ডাকা মানুষের পায়ের মতন একটা পা। তারপর আরেকটা পা। তারপর আঁশে ঢাকা পিঠ। স্বচ্ছ শিরা-উপশিরায় ভরা ডানা।

সোমসাহেবের শরীরের মধ্যে দিয়ে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল। তাঁর মনে পড়ে গেল গুম্ফার ছাদের কাছে সেই অন্ধকার কুঠুরির মেঝেতে অনেক ডিমের খোলা পড়ে ছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন সুনন্দ সোম। ডাকলেন, চলো তারাপদ। সময় হয়ে গেছে।

ওরা একটার পর একটা গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালেন। সব গাছের নীচে নয়, শুধু সেই গাছগুলোর নীচে যেগুলোর ডাল থেকে সবুজ পাশবালিশের মতন গুঁটি ঝুলছিল। প্রত্যেকটা গুঁটির মধ্যে তখন সেই খোলশ ফাটিয়ে বাইরে বেরোনোর অস্থিরতা। প্রতিটা গুঁটিই নড়ছে, মোচড়াচ্ছে। দশটা গুঁটির প্রত্যেকটার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে শক্ত আঁশে ঢাকা পা। পিঠ। ডানা।

দুজনে মিলে ঠিক দশবারই ওনারা ফায়ার করলেন।

ফেরবার পথে তারাপদ মৃধা আর সুনন্দ সোমের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় হলই না। একবার শুধু তারাপদ জিগ্যেস করেছিল—তাহলে ওই বাচ্চাগুলো এলিয়্যানসদের লার্ভা?

সুনন্দ সোম বললেন, হুঁ।

অ্যাডাল্টগুলোর থেকে এত আলাদা দেখতে!

অবাক হচ্ছ কেন? শুঁয়োপোকা আর প্রজাপতির মধ্যে কোনো মিল আছে? যদি ভুলে গিয়ে থাকো, রিখিয়ার কাছ থেকে ওর মেয়ের জীবনবিজ্ঞানের বইটা একটু চেয়ে নিও। ওটার মলাটে প্রজাপতির জীবনচক্রের ছবি আছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%