অন্ধ সাধক

সৈকত মুখোপাধ্যায়

আজ দুপুরেই পুরুলিয়ার অ্যাস্ট্রোনটস ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব শেষ হল।

দু-হাজার চল্লিশ সালে অযোধ্যা গিরিশ্রেণীর একটা ছোট পাহাড়ের মাথায় মাত্র দু-একর জমি নিয়ে যে কলেজ স্থাপিত হয়েছিল, আজ পঞ্চাশ বছর বাদে দু-হাজার নব্বই সালে, সেই কলেজই পৃথিবীর প্রথম দশটা এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। এখান থেকে যারা পাশ করে বেরোয় তারা সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অন্য নক্ষত্রমণ্ডলীর দিকে মহাকাশযান চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র পায়।

প্রাক্তন ছাত্র এবং দেশ-বিদেশের অতিথি অভ্যাগত মিলিয়ে প্রায় হাজার দুয়েক মানুষ গত তিনদিন ধরে কলেজ ক্যাম্পাস সরগরম করে রেখেছিলেন। আজ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সকলেই যে যার জায়গায় ফিরে গেছেন। যেহেতু আগামী একমাস কলেজ ছুটি, তাই নিতান্ত কয়েকজন মেইনটেনান্স-স্টাফ বাদে বর্তমান ছাত্র ও শিক্ষকরাও প্রায় সকলেই কলেজ ছেড়ে চলে গেছেন। রয়ে গেছে শুভ্র ব্যানার্জি, অতুল সাক্সেনা আর নন্দিনী মিত্র। ওরা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রছাত্রী। সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল ওরা তিনজন, তাই ওদের এক্ষুনি বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। পাওনাদারদের টাকাপয়সা দেওয়া, হিসেবনিকেশ মেটানো, এসব করতে আরো দিন তিনেক লাগবে। তারপর ওরা বাড়ি ফিরবে।

আর একজন ওদের সঙ্গে রয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি শুভ্র, অতুল, নন্দিনীরা জোর করেই তাঁকে ধরে রেখেছে। তাঁর নাম নীলেশ সান্যাল। তিনি এই কলেজের বহু ছাত্র-ছাত্রীর প্রাণের বন্ধু, যদিও তাঁর মাথার সব চুল সাদা এবং বয়স একাত্তর। নীলেশ সান্যাল ছিলেন পুরুলিয়া অ্যাস্ট্রোনটস ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের স্টুডেন্ট। চাকরি-জীবনে নানান রকমের মহাকাশযান নিয়ে মহাশূন্যের এ-কোণ থেকে সে-কোণ দাবড়ে বেরিয়েছেন। অবসর নেবার পর তাঁর ব্যস্ততা যেন আরো বেড়ে গেছে। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মহাকাশচারীদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো থেকে ঘন ঘন তাঁর কাছে ডাক আসে, তিনি যেন গেস্ট-লেকচারার হিসেবে নিজের বিপুল অভিজ্ঞতা ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শেয়ার করে নেন।

নীলেশ সান্যাল আর কোথাও যান বা না যান, পুরুলিয়ায় তাঁর নিজের কলেজের ডাক তিনি কখনোই ফেরান না। এই কলেজ সম্বন্ধে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর একটা মায়া রয়ে গেছে। এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তিনি একেবারে বন্ধুর মতন মিশে যেতে পারেন। এক ঝাঁক তরুণ-তরুণীর মধ্যে বসে সাদা চুলের এক বৃদ্ধ হই-হই করে আড্ডা মারছেন—এটা পুরুলিয়ার এই কলেজ- ক্যান্টিনের খুব পরিচিত একটা দৃশ্য।

তাই শুভ্র, অতুল, নন্দিনীরা সমাপ্তিভাষণের পর প্রথমেই প্রফেসর সান্যালের ব্রিফকেসটা লুকিয়ে ফেলল। বলল, না স্যার। আপনাকে এখন যেতে দিচ্ছি না। আপনি তিনদিন বাদে আমাদের সঙ্গেই ফিরবেন।

মুখে কিছুক্ষণ তর্জন-গর্জন করলেও প্রফেসর সান্যাল কাজে খুব একটা আপত্তি দেখালেন না। প্রায় জনশূন্য কলেজের লনে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, সবুজ ঢেউয়ের মতন অযোধ্যা পর্বতশ্রেণীর পেছনে ভারি রঙিন একটা সূর্যাস্ত হচ্ছে। কাছে দূরে জঙ্গল থেকে শেষবারের মতন ডেকে উঠছে ময়ূর আর বনমুরগির দল। এর মধ্যেই কোনো রানির নেকলেসের লকেটের মতন বিশাল আর উজ্জ্বল সন্ধ্যাতারা উঠে এসেছে আকাশের গায়ে। এই শান্ত সৌন্দর্য ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি মহানগরীর ব্যস্ত জীবনে ফিরে যেতে তাঁরও ইচ্ছে করছিল না।

তাই গলায় নকল গাম্ভীর্য এনে তিনি বললেন—ঠিক আছে। আগে ব্রিফকেসটা ফেরত দাও। ধরাচুড়োগুলো ছেড়ে পাজামা-পাঞ্জাবিটা পরি। তারপর চলো নদীর দিকে একটু হেঁটে আসা যাক। বহু বছর ওদিকটায় যাইনি।

শুভ্র অতুল নন্দিনীরা সমস্বরে বলল, হুররে!

কয়লা, পেট্রোলিয়ামের মতন জৈব জ্বালানির ভাণ্ডারগুলো শেষ হয়ে যাওয়াটা একদিক থেকে পৃথিবীর পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছে। বায়ুমণ্ডল এখন অনেক শুদ্ধ, অনেক নির্মল। সেই নির্মল বায়ুমণ্ডলের জন্যেই আকাশের তারাগুলোকে দেখাচ্ছিল হাতের মুঠোর মতন বড়। তারার আলোতেই দিব্যি সাদা নুড়ি বিছানো পথটা দেখা যাচ্ছিল। সেই বনপথ ধরে নন্দিনী, শুভ্র, অতুল আর তাদের প্রিয় সান্যাল স্যার নদীর দিকে হেঁটে চলেছিলেন।

নীলেশ সান্যাল আপনমনে গুনগুন করে একটা গান গাইছিলেন—যে ফুল ঝরে, সেই তো ঝরে, ফুল তো থাকে ফুটিতে...। বাতাসে সত্যিকরেই শালফুলের মাতাল করা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল।

হঠাৎ শুভ্র বলে উঠল, এই নন্দিনী, এটা আবার কোন রাস্তা ধরলি? এটা কি মানুষ চলার পথ না হাতিদের প্যাসেজ?

নন্দিনী বলল, এইরে! ঠিক বলেছিস তো। স্যারের গান শুনতে শুনতে ভুল রাস্তায় চলে এসেছি মনে হচ্ছে। তাই ভাবছি, পথের ওপর এত ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠল কেমন করে?

অতুল নার্ভাস গলায় বলল, এখন কী করবি?

নীলেশ সান্যাল ওদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। পুরো পাহাড়টাই তো নদী দিয়ে ঘেরা। যে-কোনো রাস্তা ধরে নীচের দিকে নামলেই নদী পেয়ে যাব আর যখন ফিরবার ইচ্ছে হবে, ওপর দিকে তাকিয়ো। যে-কোনো জায়গা থেকেই ইনস্টিটিউটের লঞ্চিং-প্যাডের লাল আলো দেখতে পাবে। ওই আলোর নিশানা দেখে আমরা ফিরে যাব।

শুভ্র বলল, একদম ঠিক বলেছেন স্যার। চলুন এখন নদীর তীরে বসে একটু আড্ডা মারি। তারপর ফেরার কথা ভাবা যাবে।

শুভ্র আর নীলেশ সান্যালের কথায় অতুল আর নন্দিনীর মনের টেনশন বোধহয় কেটে গেল। কারণ, নীলেশ সান্যাল যেখানে গানটা থামিয়েছিলেন, নন্দিনী ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু করল—বাতাস তারে উড়িয়ে নে যায়, মাটি মেশায় মাটিতে...

এবার বাধাটা এল স্বয়ং সান্যাল স্যারের কাছ থেকে। তিনি হঠাৎ অস্ফুট গলায় বলে উঠলেন—আরে! ওটা কী?

কী স্যার? গান থামিয়ে ভয় ভয় গলায় নন্দিনী জিগ্যেস করল। সে ভেবেছিল সাপ বা বাঘ কিছু একটা হবে।

না, সে সব কিছু নয়। নীলেশ সান্যালের হাতের ইঙ্গিত লক্ষ করে ওরা দেখল গাছপালায় ঢাকা একটা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। বাড়িটা বড় নয়, একতলা। কোনোদিন হয়তো চারিদিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। এখন সবই ভেঙে পড়েছে। ঘন জঙ্গলের মুঠির মধ্যে ঢাকা পড়ে গেছে সেই বাড়ির প্রায় সবটাই।

বেশ কিছুক্ষণ সম্মোহিতের মতন বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন নীলেশ সান্যাল। তারপর মাথাটা দুদিকে ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন—ক্ষমা কোরো। ক্ষমা কোরো আলোকসাধু। তোমার কথাও ভুলে যেতে পারলাম!

নন্দিনী জিগ্যেস করল, আলোকসাধু কে স্যার? তিনি এই বাড়িতে থাকতেন? আপনি চিনতেন তাকে?

নীলেশ সান্যাল বললেন, আমি একা নই। একদিন এই অঞ্চলের সমস্ত লোক তাঁকে চিনত। তাঁর জন্যে একদিন মানুষজাতি বড় এক বিপদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। অথচ আমরা কত অকৃতজ্ঞ দ্যাখো, তাঁর আশ্রমটাই আজ ধুলোয় মিশে গেল।

এই জঙ্গলের মধ্যে বাস করে তিনি মানুষজাতিকে বাঁচিয়েছিলেন?—অতুলের গলায় স্পষ্ট অবিশ্বাসের সুর। তিনি কে ছিলেন স্যার? সায়েন্টিস্ট? পলিটিশান?

না, না। অত বড় মাপের কেউ ছিলেন না তিনি। তিনি ছিলেন...আচ্ছা আমরা তো প্রায় পৌঁছেই গেছি। চলো ওনার কাহিনীটা ওই রিভার-বেডে বসেই তোমাদের শোনাচ্ছি।

আর কিছুটা রাস্তা পেরোতেই ওদের মাথার ওপর থেকে জঙ্গলের আচ্ছাদন সরে গেল। ওরা দেখল উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে নদীর চর। সেই চরের সাদা বালির ওপর পা ছড়িয়ে বসে ওরা নীলেশ সান্যালকে বলল, এবার বলুন স্যার।

হ্যাঁ, বলছি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বোধহয় নিজের স্মৃতিকেই ঝালিয়ে নিলেন তিনি। তারপর বলতে শুরু করলেন—

এখন তো সবাই এই জায়গাটাকে রকেট-কলেজ বলে জানে। পঞ্চাশ বছর আগে, আমরা যখন পড়তে এলাম, তখন কিন্তু জায়গাটার নাম ছিল মোহনশিলা। এই জঙ্গলের মধ্যে তখনো মোহনশিলা, পলাশবাড়ি, শ্যামডুংরি এরকম কয়েকটা ছোট ছোট গ্রাম ছিল। যে ঘটনাটার কথা বলছি, তার পরেই ওই গ্রামগুলোকে নিরাপত্তার কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় গ্রাম ছিল মোহনশিলা। ওই যেখানে একটু আগে আলোকসাধুর ভাঙা আশ্রম দেখলে, তার কাছেই ছিল সেই গ্রামটা।

আমরা কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই একটা ভয়ঙ্কর খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। পৃথিবীর স্যাটেলাইট-নিরাপত্তা-বলয় ভেদ করে একটা অন্য গ্রহের মহাকাশযান পৃথিবীর আকাশে ঢুকে পড়েছে। আজ থেকে পঞ্চাশ-বছর আগের কথা তো। তখনো নিরাপত্তা-বলয়ে অনেক ফাঁক-ফোকর ছিল। সেই মহাকাশযান শুধু ঢুকেই পড়েনি, নির্বিঘ্নে বেরিয়েও গেছে। আর বেরিয়ে যাবার আগে নামিয়ে দিয়ে গেছে বেশ কয়েকজন ভিনগ্রহের বাসিন্দাকে।

জানো নিশ্চয়, কোথাও যুদ্ধ শুরু করার আগে সেখানে গুপ্তচর পাঠানো হয়। এটা চিরকালের নিয়ম। সেই গুপ্তচরেরা শত্রুদেশের লোকজনের মধ্যে মিশে গিয়ে নানারকম খবর সংগ্রহ করে। কোথায় প্রতিরক্ষা সবচেয়ে দুর্বল, দিনের মধ্যে কোন সময়ে শত্রুরা সবচয়ে অপ্রস্তুত থাকে, এইসব আর কি। আমাদের কারুরই বুঝতে বাকি রইল না যে,অন্য গ্রহের মহাকাশযান তাদের যে বাসিন্দাগুলিকে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেছে তারাও আসলে যুদ্ধের আগে খোঁজখবর নিতে আসা গুপ্তচর। তাদের ধরতে না পারলে কী হবে সে ব্যাপারেও আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না।

খবরের পরের অংশটা ছিল আরো মারাত্মক। সেই অন্য গ্রহের মহাকাশযানকে দেখা গেছে আমাদের এই ইনস্টিটিউটের আকাশে।

সেটা হতেই পারে। একটা নিশানা ছাড়া কোনো মহাকাশযানকেই চালানো যায় না। আর ভেবে দ্যাখো, নতুন তৈরি হওয়া ইনস্টিটিউটের রাডার-সঙ্কেতের থেকে সহজ নিশানা আর কী হতে পারে? নিশানা রয়েছে, অথচ প্রহরা নেই। সবাই স্বীকার করল, কাজটা বোকার মতন হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে।

জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে গিয়েছিল মোহনশিলার কয়েকজন নারীপুরুষ। তারা দেখল জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসের চিহ্ন। হরিণ, ময়ূর, হাতি—ভিনগ্রহীদের আক্রোশ থেকে রক্ষা পায়নি কেউই। স্রেফ হত্যার আনন্দেই যেন তারা হত্যা করে গেছে। নিরীহ পশুগুলোকে দুর্দান্ত কোন মারণাস্ত্র দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সেই বনবাসী লোকগুলো আরো দেখেছিল ধুলোর ওপরে বিশাল কোনো পোকার হেঁটে যাওয়ার চিহ্ন। আসলে পোকা নয়, অন্য গ্রহের জীব।

সকলেই বুঝতে পারলাম, অন্য গ্রহ থেকে যারা এই মোহনশিলার মাটিতে নেমেছে, তারা চেহারায় চরিত্রে সব দিক দিয়েই অমানুষ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা সংখ্যায় কতজন? কোথায় লুকিয়ে রয়েছে তারা? এরপর তারা কোনদিক দিয়ে, কীভাবে আঘাত হানবে?

তখন আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ওকুরা নাসাতাসি। বহুদর্শী লোক। তিনি একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার কথা বললেন। তিনি বললেন আমাদের থেকে উন্নত ভিনগ্রহের প্রাণীরা অনেকেই ইচ্ছেমতন চেহারা বদলাতে পারে। অনেক জায়গাতেই না কি তারা প্রথমে যে গ্রহকে আক্রমণ করছে সেই গ্রহের বাসিন্দাদের চেহারা ধারণ করে তাদের মধ্যে মিশে যায়। তারপর সময় বুঝে মোক্ষম মারটা মারে। এখানেও ওরা সেই চালটা চালতে পারে। কাজেই সকলেরই উচিত হবে দল বেঁধে থাকা। একলা বনে-জঙ্গলে না ঘোরা।

প্রফেসর নাসাতাসির কথায় আমাদের ইনস্টিটিউটে আর জঙ্গলের ওই গ্রামগুলোয় কারফিউ ঘোষণা হয়ে গেল। মহাশূন্যে সমস্ত সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দিলাম। প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোকেদের সঙ্গে আমরা কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীও গ্রামে গ্রামে ঘুরে গ্রামবাসীদের বললাম, তারা যেন ঘর থেকে না বেরোয়। যেন সন্ধের পরে আলো না জ্বালে।

সবাই কথা শুনল। শুনলেন না শুধু আলোকসাধু।

আলোকসাধু কে ছিলেন সেটা একটু সংক্ষেপে বলে নিই। ছোটখাটো চেহারার গৌরবর্ণ মানুষ। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি আর উত্তরীয়। কাঁধ পর্যন্ত লুটিয়ে পরা বাবরি চুল আর বুক অবধি লুটিয়ে পড়া দাড়ি। দুটোই কুচকুচে কালো। তার মানে তার বয়স তখন ত্রিশ-বত্রিশের বেশি ছিল না।

ক্লাস-টাস না থাকলে আমি প্রায়ই তাঁর আশ্রমে ঢুঁ মারতাম। ভারি সুন্দর পরিবেশ ছিল সেই আশ্রমের। আলোকসাধু ওখানে একাই থাকতেন, কিন্তু তাই বলে লোকের আনাগোনার বিরাম ছিল না। কারণ, তিনি ছিলেন খুব বড় মাপের বৈদ্য। গাছগাছড়া দিয়ে চিকিৎসা করতেন, আর সে চিকিৎসা ছিল একেবারে অব্যর্থ। আমিও একবার তার পরিচয় পেয়েছিলাম। একদিন ল্যাবরেটরিতে কি একটা কেমিক্যালের টেস্ট-টিউব হাতের ওপর ফেটে গিয়ে আমার হাতটা অনেকখানি পুড়ে গিয়েছিল। ইনস্টিটিউটের ডিসপেন্সারির ওষুধে সে ঘা সারছিল না। আলোকসাধুর একটা পাতা থেঁতো করা মলমে দুদিনের মধ্যে সেই ঘা শুকিয়ে গিয়েছিল।

আলোকসাধুকে জপতপ করতে কখনো দেখিনি। ঘরে ঠাকুর-দেবতার মূর্তি বা ছবিও ছিল না। বোধ হয় মানুষকেই তিনি ভগবান মেনেছিলেন—এই জঙ্গলের গরীব মানুষদের। তাদের সেবাতেই তাঁর দিন কেটে যেত।

আর এই সবকিছুই তিনি করতেন দুটো অন্ধ চোখ নিয়ে।

হ্যাঁ, আলোকসাধু ছিলেন অন্ধ। দুটো চোখের মণির জায়গাটা ছিল সাদা।

অথচ আশ্চর্য ব্যাপার—তাঁর চলাফেরা, কথাবার্তায় কখনো মনে হত না যে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নেই। এই জঙ্গলের জটিল রাস্তায় হাতে একটা লাঠি অবধি না নিয়ে হন হন করে হেঁটে যেতেন। বহুবার চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি, উনি আমার উপস্থিতি ঠিক টের পেয়ে গেছেন। একগাল হেসে বলেছেন, আরে নীলেশবাবু যে। অত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কাছে আসুন।

একে অলৌকিক ক্ষমতা ছাড়া আর কী বলব জানি না।

আলোকসাধুর উঠোনে একটা পেল্লায় উঁচু বাঁশের মাথায় একটা লন্ঠন সারা রাত জ্বালানো থাকত। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে যারা রুগি নিয়ে আসত তারা ওই আলোর নিশানা দেখে ঠিক তাঁর আশ্রমে পৌঁছে যেত। জঙ্গলে পথ হারাত না। বোধহয় ওই আলোর নিশানা থেকেই লোকে তাঁর নাম দিয়েছিল আলোকসাধু। না হলে তার জগতটা তো আসলে অন্ধকারেই ঢাকা ছিল।

কী যেন বলছিলাম? ও হ্যাঁ। আলোকসাধু আমাদের কথা শুনলেন না। সারাক্ষণ তাঁর মুখে যে মিষ্টি হাসিটা লেগে থাকত সেটা একটুও ফিকে হল না, কিন্তু ওইভাবে হাসতে হাসতেই তিনি আমাদের জানিয়ে দিলেন আশ্রমের উঠোনের আকাশপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ওই আলো না থাকলে কোথা থেকে কোন লোক যে জঙ্গলে পথ হারিয়ে মরবে তার ঠিক কী?

আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কিন্তু আপনার নিজের নিরাপত্তার কথাটা ভাববেন না? জঙ্গলের মধ্যে একলা থাকেন। আপনি তো ওদের সবচেয়ে সহজ টার্গেট। নিজের উপস্থিতি এইভাবে ওদের বুঝিয়ে দেবেন?

এখনো পরিষ্কার মনে পড়ে আমাদের এই কথা শুনে আলোকসাধু কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন। এক মুহূর্তের জন্যে তাঁর মুখ থেকে হাসি মুছে গিয়েছিল। অন্ধ চোখ দুটো আকাশের দিকে তুলে তিনি বলেছিলেন, আমার মন বলছে আমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। তবে সে চলে যাওয়া ব্যর্থ হবে না। ঈশ্বর মঙ্গলময়।

এই ছিল তাঁর শেষ কথা।

পরেরদিন সকালে দুটো লোক হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের ইনস্টিটিউটের উঠোনে এসে ঢুকল। অনেক দূর থেকে একটা খবর নিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে এসেছে তারা। সেই খবর শুনেই আমাদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। শুধু ইনস্টিটিউটের সিকিউরিটির লোকেদের দিয়ে হবে না বুঝে আমাদের প্রিন্সিপাল তক্ষুনি পুরুলিয়া থেকে নতুন করে ফোর্স আনালেন। তারপর সেই দুই গ্রামবাসীর দ্যাখানো পথ ধরে গেরিলা যুদ্ধের কায়দায় তারা পৌঁছে গেল এই জঙ্গলের মধ্যে একটা জায়গায়। পেছন পেছন নিরাপদ দূরত্ব রেখে আমরা কয়েকজন ছাত্রও গিয়েছিলাম। গাছের আড়ালে লুকিয়ে দূর থেকে আমরা সেই পাঁচজন লোককে দেখলাম, যাদের দেখেই ওই দুই গ্রামবাসী আমাদের খবর দিতে গিয়েছিল।

না, তাদের গায়ের রং সবুজ নয়, পায়ের পাতা হাঁসের পায়ের মতন চ্যাপ্টা নয়। তাদের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি কোথাও মানুষের সঙ্গে তফাত নেই।

তবু আমরা সকলেই এক নজরে বুঝতে পারলাম তারা মানুষ নয়।

কারণ, তাদের পাঁচজনেরই চোখের মণি নেই। মণির জায়গাটা সাদা।

আর তবুও তারা লাঠি ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে জঙ্গলের পথ ধরে হেঁটে চলেছে। লাফ দিয়ে নালা পেরোচ্ছে। রোদের হাত থেকে বাঁচতে একেবারে নির্ভুলভাবে গাছের ছায়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সেন্ট্রিদের বুলেট যখন তাদের বুক ফুঁড়ে গেল, যখন তাদের মানুষের চেহারাগুলো আমাদের চোখের সামনে আস্তে আস্তে কিছুটা বিছে, কিছুটা বাঁদর মেশানো এক কদাকার চেহারায় বদলে গেল, তখনো বোধহয় তারা ভেবে যাচ্ছিল যে, ছদ্মবেশ নিতে ভুল হল ঠিক কোথায়?

কোথায় ভুল হয়েছিল ওদের?

উত্তরটা প্রথম আমার মাথাতেই এসেছিল। আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম—আলোকসাধু। স্যার, শিগ্গির আলোকসাধুর আশ্রমে চলুন। ওনার খুব বিপদ। বলতেই বলতেই আমি দৌড়েছিলাম। আমার পেছন পেছন প্রিন্সিপাল, সেন্ট্রির দল, অন্যান্য ছাত্র, গ্রামবাসী সবাই। কিন্তু আমাদের দেরি হয়ে গিয়েছিল।

আশ্রমে ঢোকার মুখেই, ওই একটু আগে যে জঙ্গলে ঢাকা উঠোনটা দেখলে, ওইখানেই সেদিন আলোকসাধুর মৃতদেহটা পড়েছিল। তখনো তাঁর ঠোটের কোণে অল্প হাসি লেগেছিল। তখনো তাঁর চোখের সাদা মণিদুটো আকাশের দিকে চেয়েছিল। দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না, তবু ওই অন্য গ্রহের জীবগুলো কেমন করে যেন তাঁর প্রাণটা বের করে দিয়েছিল।

উনিই ছিলেন ভিনগ্রহীদের সামনে প্রথম মানুষ। ভিনগ্রহীরা ভেবেছিল সব মানুষই বোধহয় এরকমই হয়। তাদের চোখের রং হয় সাদা, আর সেই মণিহীন চোখেই তারা সবকিছু দেখতে পায়। আলোকসাধুকে মডেল ধরেই সেই অন্য গ্রহের গুপ্তচরেরা নিজেদের রূপ বদলে ফেলেছিল। চেয়েছিল মানুষের মধ্যে মিশে যেতে।

ওদের দোষ নেই। ওরা কেমন করে জানবে এই পৃথিবীতে একজনই মাত্র আলোকসাধু ছিলেন?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%