সৈকত মুখোপাধ্যায়

ভাঙাচোরা পুরনো মডেলের ট্রেকারটায় শেষ অবধি একজন মাত্র প্যাসেঞ্জার রয়ে গেল। স্যমন্তক সেনগুপ্ত।
যখন তেজু থেকে ট্রেকারটা ছেড়েছিল, তখন ওটার চেহারাটা ছিল ঠিক পিঁপড়ে ধরা দানাদারের মতন। ছাদে বাম্পারে মাডগার্ডে সব জায়গায় এত মানুষ ঝুলছিল যে, গাড়িটার বডি দেখা যাচ্ছিল না। শুধু মানুষই নয়, স্যমন্তকের ঠিক পায়ের কাছে একটা ছোট পাঁঠাও বসেছিল। পাঁঠাটা মাঝে মাঝেই ওর প্যান্টের ক্রিজটাকে চিবোবার চেষ্টা করছিল আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিহি গলায় ম্যাঁ ম্যাঁ আওয়াজ ছাড়ছিল। বোধহয় ওর চারটে ঠ্যাং কেন বেঁধে রাখা হয়েছে সেই ব্যাপারেই অভিযোগ জানাচ্ছিল।
স্যমন্তক নিজে অবশ্য কারুর কাছেই কোনো অভিযোগ জানায়নি। সে চুপচাপ ওই ভিড়ের ঠেলা, ছাগলের বাঁদরামি, সব কিছু সহ্য করছিল। সাপ্তাহিক সংবাদপত্র সীমান্তরেখায় যেদিন থেকে সে চাকরি করতে ঢুকেছে সেদিন থেকেই স্যমন্তক বুঝে গেছে জীবন থেকে 'আরাম' শব্দটা উধাও হয়ে গেল। চিফ রিপোর্টার অমিত গাঙ্গুলি প্রথমদিনেই বলেই দিয়েছিলেন, জুনিয়ার করেসপন্ডেন্টের জীবনটা সৈনিকের জীবন। ওনার কাছে কখনো কষ্ট-টষ্টের কথা বলতে গেলেই উনি নিজে চীন-ভারত যুদ্ধের স্টোরি করতে গিয়ে কমবয়সে কীভাবে এক সপ্তাহ শুধু বুনো কলা খেয়ে বেঁচেছিলেন সেই গল্প শুরু করেন।
টিফিনের সময় ভদ্রলোকের বিরিয়ানি কিম্বা মোগলাই-পরোটা খাওয়ার ধরন দেখে অবশ্য স্যমন্তকের মনে হয় সবটাই বানানো গল্প।
যাই হোক, সেসব নিয়ে স্যমন্তক কিছু মাইন্ড করে না। একটা ব্যাপারে অমিত গাঙ্গুলিকে শ্রদ্ধা করতেই হয়—সেটা হল ভদ্রলোকের নিউজের নাক। গুয়াহাটির অফিসে নিজের চেম্বারে বসে যেন গন্ধ শুঁকেই উনি বুঝতে পারেন, নর্থ-ইস্টের কোথায়, কোন কোনায়, বেশ মুচমুচে একটা খবর দানা বেঁধে উঠছে। সঙ্গে সঙ্গে স্যমন্তককে তলব। 'যাও তো হে ক্ষপণক, একবার চট করে শিলং-এর অর্কিড হোটেল থেকে ঘুরে এসো। একজন বোর্ডার খুন হয়েছে, যার পকেটে জাল নোট ছিল। দ্যাখো, জাল নোটের সোর্স খুঁজে পাও কিনা। কী হল দাঁড়িয়ে রইলে যে?'
স্যমন্তক বলে, 'সে না হয় যাচ্ছি। কিন্তু স্যমন্তক নামটা কী এমন কঠিন যে, আপনি সারাক্ষণ আমাকে ক্ষপণক, যমদত্ত, অধমর্ণ এমনকী স্তোকবাক্য বলে অবধি ডাকবেন?'
'স্যরি, স্যরি।' বলে মুচকি হেসে আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন অমিতদা।
কিন্তু এবারে, মানে পরশুদিন, অমিতদা আর সেরকম কিছু করেননি। তাকে বেশ পরিষ্কার উচ্চারনে 'স্যমন্তক' বলেই ডেকেছিলেন। তখনই সে একটু অবাক হয়েছিল, কিন্তু এখন কারণটা বেশ পরিষ্কার বুঝতে পারছে। অমিতদা ভালো করেই জানতেন, এই অ্যাসাইনমেন্টটার জন্যে তাকে পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একশো সত্তর কিলোমিটার অত্যন্ত হ্যাজার্ডাস জার্নি করতে হবে। সেইজন্যে আর নতুন করে তার মেজাজ বিগড়ে দেননি আর কি।
উনি শুধু বলেছিলেন, 'ভাই স্যমন্তক, রাঙাবাড়ির আকাশে ফ্লাইং-সসার দেখা গেছে।'
স্যমন্তক তেতো গলায় জিগ্যেস করল, 'রাঙাবাড়িটা কোন চুলোয়?'
'অরুণাচল প্রদেশ আর চায়নার বর্ডারে। আমাদের যখন বয়স কম, মানে এই ধরো তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে, ওখানে সিয়াং নদীর ওপর একটা ছোটখাটো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়েছিল। মানে বাংলায় যাকে বলে হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্ট। অবশ্য অনেকদিন হল সেটা বন্ধও হয়ে গেছে, কারণ নদীটাই নাকি অন্যদিকে সরে গেছে।
'প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে গেলেও সিকিউরিটি গার্ড তো রাখতেই হয়, যাতে সরকারি সম্পত্তি চুরি না হয়ে যায়। ওই নাইট-গার্ডদের মধ্যে একজন আবার আমার ড্রাইভারের শালা। নাম পবন থাপা। পবন গত সপ্তাহে আমার কাছে এসেছিল। ওর কাছেই ফ্লাইং-সসারের গল্প শুনলাম। শুনে আমি তো তাজ্জব। নাকি, গোরুর গাড়ির চাকার মতন বিশাল আলোর চাকতি নিঃশব্দে নেমে এসেছে লেকের তীরে। জঙ্গলের আড়ালে ল্যান্ড করেছে।'
স্যমন্তক বলল, 'এইসব গাঁজাখুরি গল্পে আপনি বিশ্বাস করেন?'
অমিত গাঙ্গুলি চিন্তিত মুখে স্যমন্তকের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বিশ্বাস করি না বলেই তো তোমাকে যেতে বলছি। আমাদের আর্মি তো আর বর্ডারের সব জায়গায় নজর রাখতে পারে না। দ্যাখো গিয়ে হয়তো চায়না-ই সুযোগ বুঝে ড্রোন-ফোন নামিয়ে দিল। সেটাকেই পবনরা বলছে অন্য গ্রহের ইয়ে...মানে স্পেশ-শিপ।'
স্যমন্তক মনে মনে আরেকবার অসিত গাঙ্গুলির বুদ্ধিকে স্যালুট করল। হ্যাঁ, এরকম হতেই পারে। কে জানে, এই নিউজটা ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে গেলে সে দিল্লির কোনো বড় কাগজে চাকরি পেয়ে যাবে কিনা। দেশের সিকিউরিটি নিয়ে কথা। নতুন উৎসাহ নিয়ে সে জিগ্যেস করল, 'রাঙাবাড়ি কেমন করে যেতে হয় অমিতদা?'
'এই তো, প্রথমে গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে তিনসুকিয়া। তারপর তিনসুকিয়া থেকে বাসে অরুণাচল প্রদেশের তেজু। তারপর তেজু থেকে...এইরে, তেজু থেকে কীভাবে যেতে হয় সেটা তো আর জিগ্যেস করিনি। যা হোক, গিয়েই দ্যাখো না। কিছু একটা পেয়ে যাবে ঠিক।'
তেজু থেকে ওই ট্রেকারটাই পেয়েছিল স্যমন্তক। তেজু আর রাঙাবাড়ির মধ্যে ওটা দিনে তিনটে ট্রিপ মারে। লোকাল লোকেদের হাটবাজার করা, মেলায় বেড়ানো, ডাক্তার দ্যাখানো সব কিছুর জন্যে ভরসা ওই ট্রেকার। এগারোটার সময় স্যমন্তক যখন মাঝখানের সিটটায় উঠে বসেছিল তখন গাড়িতে লোক ছিল পাঁচজন। পঁচিশনম্বর প্যাসেঞ্জারকে স্টেপনির ওপর বসিয়ে সেই গাড়ি ছাড়ল দুপুর বারোটায়।
ভাঙাচোরা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে টাল খেতে খেতে সেই ট্রেকার চলল তো চললই। দু-পা যায় আর একটা করে পাহাড়ি গ্রামে দাঁড়ায়। এতে সময় অনেক বেশি লাগল ঠিকই কিন্তু ভিড়টা হালকা হল। মাজিয়া বলে একটা জায়গায় পৌঁছে স্যমন্তক দেখল মাঝের সিটে শুধু সে আর ছাগলওলা। রিপোর্টারদের যেরকম দস্তুর, লোকটার হাতে একটা চুইংগাম গুঁজে দিয়ে স্যমন্তক গলা নামিয়ে জিগ্যেস করল, 'এদিকে ফ্লাইং সসার-টসার দেখা যাচ্ছে না কি?'
লোকটা মুখ ভেটকে বলল, 'যাচ্ছে না মানে? পোকাগুলোর জ্বালায় এবছর টমেটো আর ফুলকপি লাগাতেই পারলাম না। কোনো বিষে মরছে না ব্যাটারা।'
স্যমন্তক একটা হেঁচকি তুলে মুখে কুলুপ আঁটল।
তারপর সেই লোকটাও কমলাবাড়ি বলে একটা জায়গায় তার পাঁঠা নিয়ে নেমে গেল আর দশমিনিট বাদেই পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরেই স্যমন্তক দেখতে পেল পায়ের কাছে নীল জলের বিশাল লেক। লেকের তিনদিকে পাহাড়ের ন্যাচারাল পাঁচিল আর একদিকে মানুষের তৈরি দশতলা বাড়ির সমান উঁচু ড্যাম। ড্যামের মাথার ওপর চওড়া রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে ড্যাম পেরিয়ে ড্রাইভার একটা নির্জন মাঠের মধ্যে গাড়ি থামালো। বলল, 'এই হল রাঙাবাড়ি। আপনি নেমে যান। গাড়ি ঘোরাব।'
নামার পর একদম সামনেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের প্রথম যে নোটিশ-বোর্ডটা স্যমন্তকের নজরে পড়ল সেটার গায়ে লেখা ছিল, 'এখান দিয়ে বুনো হাতি রাস্তা পেরোয়। গাড়ি আস্তে চালান।'
স্যমন্তক দুহাত তুলে অনেক চিৎকার, টিৎকার করে ট্রেকারটাকে ফেরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেটা ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে। মোবাইল বার করে অমিতদাকে বলতে গেল, 'মিশন ক্যানসেল, কারণ চারিদিকে যেরকম বেঘো জঙ্গল দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে ফ্লাইং সসার কেন, হিরের খনির খোঁজেও ঢুকতে পারব না।' কিন্তু মোবাইলের টাওয়ার নেই। অগত্যা স্যমন্তক ব্যাকপ্যাকটা পিঠের ওপর তুলে হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্টের টাউনশিপের দিকে পড়িমড়ি করে হাঁটা লাগাল। অমিতদা বলে দিয়েছিলেন রাঙাবাড়িতে পৌঁছে সেই ফ্লাইং সসারের খবরটার সোর্স, পবন থাপার খোঁজ করতে। দরকার পড়লে থাপাজি নিজের বাড়িতেই স্যমন্তকের দু-এক রাত্তির থাকার ব্যবস্থাও করে দেবেন।
টাউনশিপের মরচে পড়া বিরাট লোহার গেটের গায়ের ছোট পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকে স্যমন্তক দেখল, চারিদিক খাঁ খাঁ করছে। এককালে যারা রাঙাবাড়ি পাওয়ার প্রোজেক্টে কাজ করতেন তাদের থাকবার জন্যে তৈরি হয়েছিল এই টাউনশিপ। এখন সুন্দর সুন্দর বাংলোগুলোর জানলা-দরজার পাল্লা ভেঙে পড়েছে। বাগানের বেড়া ছেয়ে গেছে জংলি লতায়। ভেতরেও বড়-বড় ঝোপঝাড়। যে পিচ-রাস্তাটা পাক খেতে খেতে টাউনশিপের মধ্যে দিয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে সেটারও হাল খুব খারাপ।
গেটের সবচেয়ে কাছে যে বাড়িটা সেটা দেখলেই অবশ্য বোঝা যায় ভেতরে এখনো মানুষজন বাস করে। আলো টালোও জ্বলছিল। স্যমন্তকের ডাক শুনে ওখান থেকেই পবন থাপা বেরিয়ে এলেন। মাঝবয়সি মানুষটার আচার-আচরণ ভীষণ ভদ্র। স্যমন্তককে যে কোথায় বসাবেন, কেমন করে আপ্যায়ন করবেন, ভেবেই পাচ্ছিলেন না।
পরের আধঘণ্টার মধ্যে স্যমন্তক গরম জলে হাত-মুখ ধুয়ে, থাপাজির বউয়ের বানানো গরম গরম মোমো আর আদা চা খেয়ে একদম ফ্রেশ হয়ে গেল। উপরন্তু থাপাজি যখন তার ছেলে রনি-কে দেশি মুরগি আনবার জন্যে নীচের গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন, তখন স্যমন্তকের মনে হল রিপোর্টারের চাকরিটা নেহাত খারাপ না।
তারপর থাপাজির কোয়ার্টারের বারান্দায় বেতের চেয়ারে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে ওনার কাছে রাঙাবাড়ির হালচাল শুনতে শুরু করল স্যমন্তক।
সব শুনে সে যা বুঝল, তা হল, গত পনেরো বছর ধরে এই প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। সিয়াং নদীর আসল স্রোতটা না কি অন্যদিকে ঘুরে গেছে। এখন সারাবছর নদীতে যেটুকু জল থাকে তাতে ওই রিজার্ভয়ার, মানে কৃত্রিম জলাধার ভর্তি হয় না।
প্রোজেক্ট তৈরি হওয়ার আগে এসব জায়গা সিয়াং ভ্যালির জঙ্গলেরই অংশ ছিল। এখন, মানুষজন না থাকার ফলে, জঙ্গল আবার তার হারানো সাম্রাজ্য দখল করে নিচ্ছে।
'আমরা যে কজন এখানে আছি তারা সবাই সারাক্ষণ খুব ভয়ে ভয়ে থাকি সাহেব।' বললেন পবন থাপা। 'গত সপ্তাহেই আমার একটা ছাগলকে চিতাবাঘে টেনে নিয়ে গেছে। হ্যাঁ সাহেব, ওই উঠোন থেকে। তাছাড়া একটু নীচের দিকে নামলে হাতির ভয় তো আছেই। তবু এইসব জানোয়ারের চালচলন বোঝা যায়। কিন্তু এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি ভয় ওই নীল আলোর চাকতিকে। রাতে টাউনশিপের রাস্তায় টহল দিতে দিতে আমিই ওটাকে দেখি। আশেপাশের গ্রামের কয়েকজনও দেখেছিল। জিনিসটার কি স্পিড সাহেব আপনাকে কী বলব! ভালো করে বোঝার আগেই আকাশের একদিক থেকে আরেকদিকে ছুটে গিয়ে মিলিয়ে যায়।'
'শব্দ হয়েছিল?' জিগ্যেস করল স্যমন্তক।
'নাঃ, একফোঁটা শব্দ ছিল না। সেইজন্যেই তো জিনিসটাকে আরো ভুতুড়ে লাগে।'
সম্যন্তক একটু চিন্তা করে বলল, 'থাপাজি, আমি যদি ওই জঙ্গলে, যেদিকে জিনিসটা নেমেছিল বলছেন, ওদিকে একটু ঘুরতে যাই তাহলে আমার সঙ্গে যাবেন?'
পবন থাপা হাতজোড় করে বললেন, 'না বাবুজি। আমি কেন, কেউ যাবে না। আমাদের অত সাহস নেই। তবে আপনি যদি বিজিতবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন তাহলে অনেক খবর পেয়ে যাবেন। বিজিতবাবু আজকেই জঙ্গলে ঢুকেছিলেন।'
'বিজিতবাবু মানে? কোন বিজিতবাবু?'
'বিজিত মজুমদার। এই প্রোজেক্টেরই ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন উনি। আমরা চাকরি করতে এসে দেখেছি ওনাকে। প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও বছরে একবার অন্তত রাঙাবাড়িতে আসেন। রাতটুকু আমার এখানেই কাটান, কিন্তু সারাদিন ওই সিয়াং ভ্যালির জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। কতবার জিগ্যেস করেছি, বাবু, কেন ওই ভয়ানক জঙ্গলে ঢোকেন? কী খোঁজেন ওখানে?
'শুনে হাসেন। কখনো বলেন, এই ফুল-টুল দেখি। কখনো কোনোই উত্তর দেন না। এইবারেও এসেছিলেন। অন্যান্যবারের চেয়ে অনেক বেশি মালপত্তর সঙ্গে ছিল। খুব খুশিও দেখাচ্ছিল। বললেন, মনে হচ্ছে এইবার ওর দেখা পেয়ে যাব, বুঝলি পবন?
'আমি বললাম, ওই জঙ্গলে আবার কার দেখা পাবেন? তো কিছু বললেন না। আমার সন্দেহ হয়, মজুমদার সাহেবের মাথাটা একটু গন্ডগোল হয়ে গেছে। আজ সকালে যখন জঙ্গলের দিকে চললেন, তখন দেখি পিঠে সেই বিরাট ব্যাগটা নিয়ে যাচ্ছেন। আমি বললাম, এ কি সাহেব! অত বড় ব্যাগটা নিয়ে কেন হাঁটতে যাচ্ছেন? ওটা আমার ঘরেই রেখে যান না। তাতে উনি বললেন, না রে পবন। আমি ওদিক দিয়েই ফিরে যাব।
'ফিরেই গেছেন নিশ্চয় বিকেলের ট্রেকার ধরে। এদিকে ভুল করে একটা খাতা ফেলে রেখে গেছেন। গত দুদিন ধরে ওই খাতাটাতে একমনে কীসব যেন লিখছিলেন। আমি তো বাংলা পড়তে জানি না। আপনি একটু দেখবেন? যদি খাতার মধ্যে ওনার ফোন নম্বর কিম্বা ঠিকানা পান তাহলে ওনার সঙ্গে কথা বলে নেবেন। খাতাটা ফেরতও দিয়ে দিতে পারবেন ওনাকে।'
স্যমন্তক থাপাজির এনে দেওয়া ছোট চারনম্বর একসারসাইজ বুকটার পাতা ওলটাল। দেখল পুরো খাতাটা ভর্তি করে একটা গল্প লেখা হয়েছে। না গল্প নয়, স্মৃতিকথা। এই রাঙাবাড়ির হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্টেরই প্রথম দিকের ঘটনা দিয়ে লেখাটা শুরু হয়েছে। তবে বিজিত মজুমদারের ঠিকানা কিম্বা ফোন-নম্বর চোখে পড়ল না।
স্যমন্তক একমনে লেখাটা পড়তে শুরু করল।
আমার নাম বিজিত মজুমদার। জন্ম থেকে বড় হওয়া, সবই কলকাতায়। শ্যামবাজারে।
শিবপুর থেকে সিভিল-ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পাশ করার পর এন.এইচ.পি.ডি.সি-র কুমায়ুঁ সেক্টরে বছর পাঁচেক কাজ করেছিলাম। তারপর দুম করে আমাকে ট্র্যান্সফার করে দিল অরুণাচল প্রদেশ আর চীনের সীমান্তঘেঁষা একটা জায়গা, রাঙাবাড়িতে। সালটা নাইনটিন এইট্টিওয়ান, আমার বয়স তখন তিরিশ বছর।
এইসব জায়গা তখন যে কি ভীষণ ট্রেচারাস ছিল তা আজ কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। শুনেছি আমাদের প্রথম টিমটাকে মালপত্র নিয়ে এখানে পৌঁছবার জন্যে হাতি ভাড়া করতে হয়েছিল। উপায় কী? রাস্তাঘাট তো আর ছিল না।
আমি যখন এসে পৌঁছলাম, তখন অবশ্য প্রোজেক্টের গোড়াপত্তনের কাজটা হয়ে গেছে। সিয়াং নদীর উঁচু পাড়ে বেশ বড়সড় একটা ক্যাম্প তৈরি হয়ে গেছে। লেবারদের জন্যে কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি সারি সারি ঘর। কিছুটা দূরে বাংলো প্যাটার্নের অফিস-বিল্ডিং আর আমাদের মতন একটু উঁচুতলার অফিসারদের জন্যে কোয়ার্টার। সব ঘরেরই কাঠের দেয়াল আর টিনের ছাদ।
আমি এখানে পৌঁছনোর ক'দিনের মধ্যেই গুচ্ছের ক্রেন চলে এল, বুলডোজার এল, রোলার এল। মানে রীতিমতন একটা কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল।
কর্মযজ্ঞ না বলে ধ্বংসলীলাও বলা যায় অবশ্য। করাতের টানে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে বড় বড় গাছ। মাঝে মাঝেই ডিনামাইট ব্লাস্টিং-এর শব্দ। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ। সন্ধের পর সেই ধুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জেনারেটরের বুক-জ্বালানো কালো ধোঁয়া।
যে মেয়েটা মাথায় করে পাথর বয় সে থেকে শুরু করে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ভার্গব সাহেব অবধি সকলেই উদয়াস্ত দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। স্বাভাবিক। একে তো হাতে সময় মাত্র তিন বছর। তার ওপর সবাই জানে, বর্ষা এলেই কাজ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ, তখন সিয়াং নদীতে বন্যা নামে।
ড্যাম তৈরির কাজের সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিল না শুধু মৃণালদার। মৃণাল গোস্বামী, আমাদের কোম্পানির সার্ভেয়ার। মৃণালদা আমার থেকে বছর তিনেকের বড় ছিলেন। আমি তাই ওনাকে দাদা বলেই ডাকতাম। উনি আমাকে বিজিত তুমি বলে কথা বলতেন।
রাঙাবাড়িতে আসার আগে কখনো ওনাকে চোখে দেখিনি। তার কারণ, ওনার বাড়ি শিলিগুড়িতে আর কাজ করেছেন বরাবর নর্থ-ইস্টের রাজ্যগুলোতে, মানে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুণাচলপ্রদেশ এইসব জায়গায়।
আমরা দুজনে একটাই কোয়ার্টারের পাশাপাশি দুটো ঘরে থাকতাম। ওনার ঘরটা পুরোটাই প্রায় বইয়ে ঠাসা ছিল। যতক্ষণ ঘরে থাকতেন, দেখতাম কিছু না কিছু পড়ছেন। কথা বললেই বোঝা যেত নানা বিষয়ে ওনার গভীর জ্ঞান। তার মধ্যে পশুপাখি আছে, ইতিহাস আছে, দর্শন আছে। আবার ওনার নিজের সাবজেক্ট জিওলজিও বাদ নেই।
মৃণালদার সার্ভের কাজ আমরা আসার অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। ওনার টিমের অন্য লোকেরা আমরা এখানে পৌঁছনোর আগেই ফিরে গিয়েছিল, কিন্তু উনি তখনো এখানেই থেকে গিয়েছিলেন। শুনেছি যেখানে ড্যাম তৈরি হবে তার আশেপাশের জমি সেই কনস্ট্রাকশনের চাপ নিতে পারবে কি না, উনি তাই নিয়ে একটা রিপোর্ট বানাচ্ছিলেন।
উনি একদিন কথায় কথায় আমাকে বলেছিলেন, এখানকার পাহাড়গুলো না কি লাইম স্টোনে তৈরি। বেশিরভাগ জায়গায় সেগুলো একেবারে মৌচাকের মতন ফোঁপড়া। পাথরের নীচ দিয়ে জল বয়ে গিয়ে অজস্র গুহা আর অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। কাজেই ওপরের ড্যামে জল জমিয়ে রাখলে সেই জলের ওজনে জমি ধসে পড়ার একটা চান্স থেকেই যায়।
কিন্তু মৃণালদা কীভাবে জমির নীচের সেই ম্যাপ বানাচ্ছিলেন কে জানে! একা একা কি এসব কাজ করা যায়? সকাল হলেই পিঠে রুকস্যাক আর পকেটে কম্পাস নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সারাদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে, ফিরতেন সন্ধের ঠিক মুখে।
যেদিনের কথা বলছি সেদিন কিন্তু মৃণালদার ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছিল। ন্যাচরালি, চিন্তা হচ্ছিল খুব। ভাবছিলাম, হাতি কিম্বা চিতাবাঘের সামনে পড়ে গেলেন না তো? এইসব ভাবতে ভাবতেই দেখি মৃণালদা আমার ঘরের ভেজিয়ে রাখা দরজা খুলে উঁকি মারলেন। খুব উদ্বিগ্ন মুখে ডাকলেন —'বিজিত, একবার আমার ঘরে আসবে কাইন্ডলি?'
মৃণালদার পেছন পেছন ওনার ঘরে ঢুকলাম। সিলিং থেকে একটা নাইট-ল্যাম্প ঝুলছিল। সেই অল্প আলোয় দেখলাম, চৌকির ওপর দশ-বারো বছরের একটা ছেলে শুয়ে আছে। মৃণালদা একটা চাদর দিয়ে ওর গলা অবধি ঢেকে দিয়েছিলেন, তাই মুখটুকুই শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখলাম ছেলেটা অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
আমি মৃণালদাকে জিগ্যেস করলাম, 'একে কোথায় পেলেন?'
বলতে গিয়ে মৃণালদা শিউরে উঠলেন। বললেন, 'কপালজোরে আমি ওখানে পৌঁছিয়ে গিয়েছিলাম বিজিত, না হলে ছেলেটা বাঁচত না।'
মৃণালদার কথা থেকে বুঝতে পারলাম, উনি সেদিন হাঁটতে হাঁটতে সিয়াং ভ্যালির সবচেয়ে উত্তরদিকে চলে গিয়েছিলেন। উনি ছাড়া আর কেউ কখনো ওদিকে গেছে বলে মনে হয় না, এমনকী লোকাল লোকেরাও নয়। কারণ, ওখানে রাস্তাঘাট বলতে কিছুই নেই। যেদিকেই তাকাও একইরকম গাছ, একইরকম ঝোঁপে। পাহাড়ি ঝোরাগুলো অবধি এমন যে, একটার থেকে আরেকটাকে আলাদা করা যায় না।
অন্য যে কেউ ওখানে গেলে আধঘণ্টার মধ্যে জঙ্গলের ভুলভুলাইয়ায় হারিয়ে যেত। কিন্তু মৃণালদা ছিলেন সার্ভেয়ার। যে সব জায়গায় আগে কখনো মানুষের পা পড়েনি, সেসব জায়গাতেই ওনাদের কাজ। তাই মৃণালদার পথ হারানোর কোনো ভয় ছিল না।
যেদিনের কথা বলছি, সেদিনও মৃণালদা মাটির চরিত্র বুঝতেই বোধহয়, ওই জঙ্গলে ঘুরছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটা কাতরানির শব্দ শুনতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখেন, ওই বাচ্চা ছেলেটা একটা পাহাড়ি ঝোরার বাঁকে দুটো বোল্ডারের মধ্যে আটকে পড়ে রয়েছে আর কয়েকটা শেয়াল পাড়ে দাঁড়িয়ে খুব নিবিষ্টমনে ওকে লক্ষ করছে।
মৃণালদা ছেলেটাকে ঝোরা থেকে তুলে, উল্টো করে ঝুলিয়ে, পেট থেকে জল বার করেন। তারপর শুকনো পাতা-টাতা জ্বেলে আগুনের তাপ দিয়ে ওকে একটু চাঙ্গা করেন। অনেকক্ষণ ধরে সিয়াং-এর বরফগলা জলে পড়ে থাকার জন্যেই নিশ্চয় ছেলেটার গায়ের চামড়া একেবারে ফ্যাকাসে সাদা হয়ে গিয়েছিল।
ছেলেটা কোনোরকমে উঠে বসেছিল, কিন্তু ক্লান্তিতে চোখ মেলতে পারছিল না।
তারপর মৃণালদা ওইখানে দাঁড়িয়েই অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করে ডাকাডাকি করেছিলেন—কে আছোওও! এদিকে এসোওও! কে আছোওও!'
না, কোনোদিক থেকেই তিনি কোনো মানুযের সাড়া পান নি। ওদিকে সন্ধে হয়ে আসছিল। অগত্যা ছেলেটাকে একরকম পিঠে করে বয়ে নিয়েই উনি এখানে চলে এসেছেন।
পুরো ঘটনাটা আমাকে শোনানোর পর মৃণালদা জিগ্যেস করলেন, 'আমি কি ছেলেটাকে এখানে নিয়ে এসে ভুল করলাম, বিজিত?'
আমি বললাম, 'একদম ঠিক কাজ করেছেন মৃণালদা। এ ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল? ও এখন এখানেই থাক। যদি আশেপাশের কোনো গ্রামের ছেলে হয়, তাহলে দু-একদিনের মধ্যে ওর বাবা-মা খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসবে। আমাদের লেবারদের মধ্যে যারা লোকাল লোক আছে তাদেরও বলে দেব খবর নিতে।'
মৃণালদাকে বললাম, 'ওকে এখন জাগানোর দরকার নেই। যতক্ষণ পারে ঘুমোক। তাতেই ওর উপকার। রাতে কোনো দরকার হলে ডাকবেন।'
রাতে নয়, মৃণালদা আমাকে ডাকলেন একেবারে পরদিন সকালে। তখন সাতটা বাজে। জিগ্যেস করলাম, 'আপনার পুঁচকে গেস্টের খবর কী?'
মৃনালদা বললেন, 'এই একটু আগে ঘুম থেকে উঠল। সেইজন্যেই তোমাকে ডাকলাম। এসো, ভেতরে এসো।'
ভেতরে ঢুকে দেখি, বাচ্চাটা হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বিছানার ওপর বসে আছে। পিঠটা যেভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে, তাতে বুঝতে পারলাম ও কাঁদছে।
আমি ওর কাছে গিয়ে পিঠে হাত দিলাম। বললাম, 'কেঁদো না। তোমাকে আমরা বাড়ি পৌঁছিয়ে দেব।'
ও মুখ তুলে তাকাল। কাল রাতে ছায়া ছায়া ঘরটার মধ্যে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়েছিল বলে ওকে ভালো করে দেখতে পাইনি। এখন দেখলাম।
কিন্তু এ কেমন দেখতে ছেলেটাকে!
মৃণালদা আমার মুখ দেখে মনের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। চাপা স্বরে বললেন, 'কেমন পিকিউলিয়ার দেখতে, তাই না?'
সত্যিই পিকিউলিয়ার। মানে, কেমন যেন অন্যরকম। আমাদের সমতলের লোকেদের থেকে অন্যরকম তো বটেই, পাহাড়ি মানুষদের মধ্যেও এরকম চেহারা দেখিনি।
ছেলেটার চোখদুটো অদ্ভুত। চোখের সাদা অংশটা প্রায় নেই-ই, শুধু বিরাট বড় বড় দুটো মনি। অনেক সফট-টয়ের চোখের জায়গায় যেমন দুটো কালো বোতাম সেলাই করে লাগানো থাকে ওর চোখ দেখে ঠিক সেরকমই মনে হচ্ছিল। বোঁচা নাক। মাথায় ভাল্লুকের লোমের মতন কুচি কুচি ঠাসা চুল। সব চেয়ে আশ্চর্য ছেলেটার কানের পাতাদুটো। ওরকম গোল গোল বড় বড় কানের পাতা কোনো মানুষের হতে পারে বলে জানা ছিল না। কিন্তু সব মিলিয়ে মুখটা খুব মজাদার আর মিষ্টি।
ওকে দেখলে যে কারুর একজনের কথাই মনে পড়তে বাধ্য। মিকি মাউস।
জিগ্যেস করলাম, 'তোমার নাম কী?'
ও মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু উত্তর দিল না।
'বাড়ি কোথায়?'
এবারও চুপ।
মৃণালদা ওকে একই প্রশ্ন এখানকার দুয়েকটা লোকাল ভাষাতেও করলেন। এদিকে অনেক বছর কাজ করেছেন বলে ওরকম বেশ কয়েকটা ভাষা ওনার জানা ছিল। ছেলেটা কিন্তু ফ্যাল ফ্যাল করে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝলাম এর মধ্যে কোনো ভাষাটাই ওর জানা নেই। ভারি বিপদে পড়া গেল তো। একে নিয়ে এখন কী করব?
মৃণালদা বললেন, 'বিজিত, ওসব পরে ভাবা যাবে। আপাতত ওকে কিছু খাওয়াই। কাল থেকে না খেয়ে রয়েছে।'
আমি ওকে ডাকলাম—'মিকি, এই মিকি! ওঠ, ওঠ!'
মৃণালদা একগাল হেসে বললেন, 'দারুণ নাম দিয়েছ তো। আমারও ওকে দেখেই মনে হচ্ছিল আগে কোথায় যেন দেখেছি। রাইট। একদম মিকি মাউস। মিকি, খাট থেকে নেমে এসো। চলো, বাথরুমে গিয়ে মুখ-টুখ ধুয়ে নাও।'
এইভাবেই ছেলেটার নাম হয়ে গেল মিকি।
পরের আধঘণ্টায় মিকিকে হাত ধরে ধরে আমরা মুখ-হাত ধোয়ালাম, খাওয়ালাম। ওর ছেঁড়াখোড়া জামাকাপড় পালটে নতুন জামাকাপড় পরালাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, আমাদের পক্ষে মিকির মতন একটা অসহায় বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। ওকে যদি সারাদিন দেখাশোনা করতে হয়, তাহলে ড্যাম বানানোর কাজ করব কখন?
কী করব, কী করব, ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল ভানুভাইয়ের কথা। আমাদের ক্যাম্পে যে দুয়েকজন কর্মচারী ফ্যামিলি নিয়ে আছে তাদের মধ্যে একজন ভানুভক্ত তেওয়ারি। ওর বউ কমলাভাবি খুব ভালো মানুষ। ক্যাম্পে যে কারুর বিপদ-আপদে অসুখ-বিসুখে একেবারে প্রাণ দিয়ে সেবা করে। আমরা কমলাভাবির হাতে মিকিকে তুলে দিলাম। ভানুভাইকে বললাম, মিকির খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাকের জন্যে ভেব না। আমরা সব খরচা দিয়ে দেব।
কমলাভাবির নিজের ছেলেমেয়ে ছিল না। মিকিকে পেয়ে ও তো ভারি খুশি। তখনই ঘরে নিয়ে চলে গেল।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই ওদের সেই খুশির সঙ্গে অনেকখানি দুঃখ মিশে গেল। ভানুভাই একদিন করুণ মুখে আমাকে জানাল, মিকি কথা বলতে পারে না। ও বোবা।
শুনে আমারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ভানুভাইকে জিগ্যেস করলাম, 'কেমন করে বুঝলে?'
ও বলল, 'এইটুকু বুঝব না সাহেব? একটা দশ বছরের বাচ্চাকে যদি বলি, বলো 'বাবা', বলো 'মা', তো সে বাবা-মা বলতে পারবে না? ও বলবার চেষ্টাও করে। কিন্তু গলা দিয়ে শুধু ইঁদুরের কিচমিচের মতন একটা আওয়াজ বের হয়। মনে হয় জিভে কিম্বা গলায় কোনো গড়বড় আছে।'
ভানুভাইকে কথা দিলাম, একটু ফুরসত পেলেই মিকিকে গুয়াহাটি নিয়ে গিয়ে কোনো বড় ডাক্তার দেখাব। ভানুভাই সেদিনের মতন চলে গেল।
ফিরে এল আবার দিন দশেক বাদে। একা নয়, সঙ্গে কমলাভাবিও ছিল। দুজনেরই মুখে কেমন যেন একটা ধাঁধা লেগে যাওয়ার ভাব। আমি ঘরে বসে মন দিয়ে একটা খুব জটিল ড্রইং দেখছিলাম। ওদের দুজনকে দেখে একটু বিরক্তই হলাম। বললাম, 'আবার কী হল?'
ভানুভাই বুঝতে পারল, এখন আমায় কিছু বলা যাবে না। হাতজোড় করে বলল, 'মিকির ব্যাপারে একটা কথা ছিল। মেহেরবানি করে একবার সন্ধের পর যদি আমার ঘরে আসেন।'
কথা দিলাম, যাব। নিজের ব্যবহারের জন্যে বেশ লজ্জিতও হলাম। সত্যিকথা বলতে কি, কমলাভাবি আর ভানুভাই মিকির দায়িত্ব নিয়েছে বলে আমি অনেক ঝঞ্ঝাট থেকে বেঁচে গিয়েছি। এখন যদি ওদের পাশ থেকে সরে যাই সেটা কেমন হবে?
আমাদের ক্যাম্পে কয়েকজন ছোটখাটো ঠিকেদারের যাতায়াত ছিল। কেউ কিচেনের সব্জি, মাছ-মাংস সাপ্লাই দিত, কেউ অফিসের পেন, ফাইল, কাগজপত্র এইসব সাপ্লাই দিত। ওরা সকলেই তিনসুকিয়ার লোক। ওরা ছিল বলেই আমাদের কথায় কথায় কাজ ফেলে তিনসুকিয়ায় দৌড়োবার দরকার পড়ত না। যখন যা প্রয়োজন, অর্ডার দিয়ে দিলে, ওরাই নিয়ে চলে আসত।
খোঁজ নিয়ে দেখলাম সেদিন ওরকমই একজন ঠিকেদারের তিনসুকিয়া থেকে রাঙাবাড়িতে আসার কথা। তার নাম গোপেন টোপ্পো। গোপেন টোপ্পো লোকটার বয়স তখন তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর হবে। ধুতি আর চেককাটা হাফশার্ট পরত। বেঁটেখাটো, চালাকচতুর চেহারা। সারাক্ষণ কচরমচর করে পান আর কাঁচা সুপুরি চিবিয়ে চলেছে। গোপেন আমাদের সাইটে পাথুরে কয়লা সাপ্লাই দিত।
পাথুরে কয়লা আমাদের রান্নবান্নার কাজে অল্পস্বল্প লাগত, কিন্তু বেশিটাই লাগত রোড-রোলারের জ্বালানি হিসেবে। আমাদের স্টোর-ম্যানেজার তারক মিশ্রার মুখে গোপেনের প্রশংসা শুনেছি। ও নাকি খুব ভালো কোয়ালিটির মেঘালয়ের কয়লা সাপ্লাই দিত।
গোপেন টোপ্পোকেই সেদিন টেলিফোনে ধরলাম। তারপর তাঁকে দিয়ে মিকির জন্যে তিনসুকিয়া থেকে নতুন জামা-প্যান্ট, কয়েকটা ভালো খেলনা আর নানারকমের চকোলেট, বিস্কুট আনালাম।
এই সবকিছু নিয়ে আমি আর মৃনালদা সেদিন সন্ধেবেলায় ভানুভাইয়ের ঘরে গিয়ে হাজির হলাম। গোপেনও চলল আমাদের পেছন পেছন। বলল, জামা প্যান্টগুলো ফিট করছে কিনা দেখে যাবে। না হলে সেদিনই আবার তিনসুকিয়ায় ফেরত নিয়ে গিয়ে পালটে আনবে।
মিকি আমাদের গলার আওয়াজ শুনে ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল, কিন্তু গোপেনকে দেখেই চটপট আবার কমলাভাবির পেছনে গিয়ে লুকোল, যেন কমলাভাবিই ওর মা। কমলা ভাবিও ওকে মায়ের মতনই দু-হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলল, 'ভয় কী মিকি বেটা? উনি তোমার নতুন একটা চাচা হন তো।'
আশ্চর্য ব্যাপার, যে মিকি পনেরোদিন আগেও আমাদের একটা কথাও বুঝতে পারেনি, সে মনে হল কমলাভাবির এই কথাগুলো দিব্যি বুঝতে পারল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল আমাদের দিকে।
আমার অবাক হওয়ার ভাবটা নিশ্চয় মুখে ফুটে উঠেছিল। তাই দেখে ভানুভাই বলল, 'সাচ মজুমদারসাব। বাচ্চার দারুণ তেজ দিমাগ। এই কদিনেই আমাদের হিন্দি বোলি বেশ সমঝে নিয়েছে।'
মিকি টুকটুক করে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে জিনিসগুলো নিল, যে কোনো বাচ্চার মতনই গিফট পেয়ে একগাল হাসল, তারপর খাটের ওপর বসে প্যাকেটগুলো খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খেলনাগুলোর মধ্যে একটা জিগ-স পাজল ছিল। ওটা নিয়ে বেচারা কী করবে বুঝতে পারছিল না।
মৃণালদার বোধহয় তাই দেখে মায়া হল। উনি মিকির পাশে বসে পাজলের একটা টুকরোর সঙ্গে আর একটা টুকরো জুড়ে দেখিয়ে দিলেন কেমন করে পুরো ছবিটা তৈরি করতে হয়। বেশিক্ষণ বোঝাতে হল না। মিকি তাড়াতাড়ি মৃণালদার হাত থেকে বাক্সটা টেনে নিয়ে নিজেই টুকরোগুলোকে জুড়তে শুরু করে দিল। আমি চোখের ইশারায় মৃণালদা আর গোপেনকে ডেকে নিলাম। তারপর পাশের ঘরে গিয়ে ভানুভাইকে জিগ্যেস করলাম, 'কী ব্যাপার?'
'মজুমদারসাব!' ভানুভাই ফিসফিস করে বলল, 'মিকি অন্ধকারে দেখতে পায়।'
মৃনালদা আর আমি একসঙ্গেই বলে উঠলাম, 'কি যা তা বকছ?'
ভানুভাই বলল, 'একদম সাচ বলছি সাব। প্রথম থেকেই দেখছি, ও দিনের বেলায় বেশি ঘুমোয়, রাতে ঘুমটা কম। আজকাল রাতে উঠে একা একা এদিকে-ওদিকে ঘুরে বেড়ায়। একদম অন্ধকার ঘর। তার মধ্যে, দেখছেন তো, এত বাক্সপ্যাটরা, এত ফার্নিচার? ওর কিন্তু কোথাও একটুও ঠোকা লাগে না। তড়বড় করে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, যেন সবকিছু চোখে দেখতে পাচ্ছে।'
কমলাভাবি বলল, 'আমার কেমন যেন ডর লাগে সাব। মিকি কি ঠিকঠাক ইনসান?'
আমি আর মৃনালদা কমলাভাবির ওই কথা শুনে হেসে ফেললাম। এত সুন্দর স্বাভাবিক একটা বাচ্চা—খাচ্ছেদাচ্ছে, ফেলে আসা ঘরবাড়ির জন্যে মাঝে মাঝে কাঁদছে, গিফট পেলে হাসছে। সে মানুষ নয় তো কী? ভূত?
মিকির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। ও তখনো এক মনে জিগ-স পাজলের টুকরো জুড়ে যাচ্ছে। ছবিটার অর্ধেক টুকরো গায়ে গায়ে জোড়া লেগে গেছে আর বাকি অর্ধেক ওর পাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে।
হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল। হাত বাড়িয়ে আলোর সুইচটা অফ করে দিলাম।
আলো নেভানো মাত্র ঘরটা গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল। ভেবেছিলাম, মিকি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠবে।
না, ওর দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। বরং আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গোপেন টোপ্পো ভয়ের চোটে 'আঁক' করে একটা আওয়াজ করে উঠল।
এক মিনিট কেটে গেল, দু-মিনিট। আমার রিস্ট-ওয়াচের রেডিয়াম ডায়াল দেখে ঠিক পাঁচমিনিট বাদে আবার আলোটা জ্বেলে দিয়েই মিকির দিকে তাকালাম। দেখলাম, ও ঠিক একই ভঙ্গিতে পাজলের বাক্সটার ওপর ঝুঁকে পড়ে টুকরোর সঙ্গে টুকরো গেঁথে যাচ্ছে। যখন আলো জ্বাললাম তখন বোধহয় এক দুটো টুকরোই জুড়তে বাকি ছিল। সে দুটোকে ঠিকঠাক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে মিকি মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকাল। ওর মুখে ঝর্ণার জলে ঠিকরোনো রোদের মতন খুশির হাসি।
আমরা পাঁচজনেই তখন নিশ্চয় একই কথা ভাবছিলাম। যে অন্ধকারে নিজের হাতটাও ভালো করে দেখা যায় না সেই অন্ধকারের মধ্যে মিকি কেমন করে পাজলটা কমপ্লিট করল!
মিকি কি সত্যিই নিশাচর?
কমলাভাবি দাঁতের ফাঁকে আঁচল কামড়ে ধরে কান্না-ভেজা গলায় আবার বলল, 'মজুমদারসাব, মিকির ওপর কোনো দেও-দানো ভর করেনি তো?'
এবার কিন্তু আমি, মৃণালদা কিম্বা গোপেন, কেউই প্রশ্নটা শুনে হাসতে পারলাম না।
কেটে গেল আরো কয়েকটা মাস। এর মধ্যে আমরা প্রথম বর্ষাটা পার করেছি। সেই তুমুল বৃষ্টির দিনগুলোতে শুধু যে সমস্ত কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাই-ই নয়, আগে যতটা কাজ শেষ করেছিলাম তারও কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই ক্ষতি পূরণ করার জন্যে বর্ষার পরে শরৎকালটায় আমাদের তিন শিফটে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ শুরু করতে হল।
দিনের মধ্যে আঠেরো ঘণ্টা হেলমেট মাথায় এই বোরিং-এর জায়গা থেকে ওই পাইলিং-এর জায়গায় ছুটোছুটি করে বেড়াই। যখন সময় পাই নিজের ঘরে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় ফেলে দিই।
এই ভয়ঙ্কর ব্যস্ততার মধ্যেও দু-পাঁচ মিনিটের জন্যে মিকির সঙ্গে দেখা করে আসতাম। ইতিমধ্যে ওর সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। মজাদার বাচ্চাটা আমাকে কি যেন এক মায়ায় জড়িয়ে ফেলছিল।
ভানুভাইয়ের ঘরে বেশিরভাগ সময় যেতাম সন্ধেবেলায়, যখন কাজের চাপ একটু কম থাকত। যেহেতু তখন ঘরের মধ্যে কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলত, তাই মিকি থাকত একদম স্বাভাবিক। আমি ঘরে ঢোকা মাত্র আমার হাত ধরে ঝুলে পড়ত; টিউনিকের পকেট হাতড়ে খুঁজে দেখত ওর জন্যে কী এনেছি।
দিনের বেলায় অল্প কয়েকবারই গেছি। তখন মিকি একেবারে অন্যরকম। দেখতাম, হয় মুখে চাদর চাপা নিয়ে ঘুমোচ্ছে আর না হলে এককোণে একটু ছায়া খুঁজে নিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। ওর মনের সব ফুর্তি তখন উধাও। যদিও এই মেঘের মুলুকে লোকে একটু রোদের জন্যে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকে, তবু, শুধু ওর কথা ভেবেই কমলাভাবি অনেক সময় দিনের বেলাতেও ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ করে রাখত।
দিনের বেলায় মিকি যে একেবারে নড়াচড়া করত না তা নয়, তবে করত খুব সাবধানে। বাইরে বেরোতোই না, বড়জোর এঘর থেকে ওঘর অবধি হেঁটে যেত। আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম, এরকম যাতায়াতের সময় মেঝেয় একটা বাসন কিম্বা কাপড় পড়ে থাকলেও ও কিন্তু ঠিক সেটার পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কক্ষনো সেটার সঙ্গে ধাক্কা খেত না। দেখলে মনে হত যেরকম সরু একটা লাঠি সামনে বাড়িয়ে ধরে অন্ধরা চলাফেরা করে, ওর হাতেও সেরকম একটা অদৃশ্য লাঠি আছে। সেই লাঠিটার ডগায় কোনো কিছু ঠেকলেই ও সেদিক থেকে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু সত্যিকারে তো আর ওর হাতে লাঠি-টাঠি কিছু থাকত না। তাহলে কেমন করে ও ওইসব বাধাবিপত্তি টের পেত?
মিকির আশ্চর্য ক্ষমতার পুরো পরিচয় তখনো পাইনি। সেটা পেলাম আরো মাসখানেক বাদে।
মিকির ইতিমধ্যে কিছু বন্ধুবান্ধব হয়েছিল। ওরই বয়সি আরো চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে, তাদের কারুর নাম পেমা, কারুর নাম হাসি, কেউ আবার গেনিয়া কিম্বা মঙ্গল। সব ওই কনস্ট্রাকশন-সাইটের লেবারদেরই ছেলেমেয়ে।
ওরা ভানুভাইয়ের ঘরে ঢুকে মিকির সঙ্গে খেলাধুলো করত। ওরা ঘরের বাইরেও খেলতে চাইত, কিন্তু তাতে দুটো অসুবিধে ছিল। এক, মিকি দিনের বেলায় বেরোতে চাইত না। আর দুই, মিকি কথা বলতে পারত না।
কিন্তু সবাই জানে, বাচ্চারা নিজেদের মতন করে সব সমস্যার সমাধান করে নেয়। তাই একদিন সিয়াং-এর উঁচু পাড় ধরে ঘরে ফেরার সময় দেখলাম, মিকি ওদের সঙ্গে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেই খেলছে।
অসুবিধে ছিল না, কারণ তখন রাত। জ্যোৎস্না রাত। ঘড়ি দেখলাম, আটটা বাজে।
সিয়াং নদীর জল তখন প্রায় শুকিয়ে এসেছে। ধু ধু সাদা বালির চর চাঁদের আলোয় ফটফট করছে। সেই বালির চরে ওরা দৌড়োদৌড়ি করে যে খেলাটা খেলছে, সেই খেলাটা আমিও ছোটবেলায় খেলেছি। হয়তো আমার বাবা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবাও খেলেছেন। খেলাটার নাম কানামাছি।
গোপেন টোপ্পো তখন হঠাৎই খুব ঘন ঘন আমাদের সাইটে আসতে শুরু করেছিল। সে দেখলাম একপাশে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে ওদের খেলা দেখছে।
আমিও মজা পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। ভালোই করলাম, কারণ না হলে সেই একদম একপেশে খেলাটা আমার দেখাই হত না। অন্য যে কোনো বাচ্চার চোখে রুমাল বেঁধে ছেড়ে দিলে তার আরেকজনকে ছুঁয়ে দিতে সময় লাগছিল। যে চোর হচ্ছিল সে পা টিপে টিপে, দু-হাত দিয়ে হাওয়ায় হাতড়াতে হাতড়াতে, আস্তে আস্তে চলাফেরা করছিল। সেটাই তো অন্যদের কাছে মজার।
কিন্তু মিকির ব্যাপার দেখলাম আলাদা। ওকে চোর বানিয়ে কোনো মজা নেই। ওর চোখে রুমাল বেঁধে ছেড়ে দেওয়া মাত্র ও তিরবেগে দৌড়ে গিয়ে যে কোনো একজনকে ছুঁয়ে দিয়ে আসছিল। চোখদুটো রুমাল দিয়ে বাঁধা —সেই অবস্থাতেই পাথরের চাঁই, গাছের ডাল, অন্য লোকজন, সবকিছুকে কাটিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড়চ্ছিল মিকি। নির্ভুলভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছিল যে কোনো একজন খেলার সঙ্গীকে।
ফলে একটু বাদেই যা হবার তাই হল। বাকি বাচ্চারা মিকির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তুই জোচ্চুরি করছিস। নিশ্চয়ই রুমালের ফাঁক দিয়ে তুই সব দেখতে পাচ্ছিস।
বেচারা মিকি প্রাণপণে ঘাড়টাড় নেড়ে, হাত ঝাঁকিয়ে অস্বীকার করবার চেষ্টা করল ওদের সেই অভিযোগ। কিন্তু অন্য বাচ্চাগুলো তা মানবে কেন? ফলে একটু পরেই খেলা থেকে মিকি বাদ গেল।
মিকি মাথা নীচু করে ঘরের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। বুঝতেই পারছিলাম, ওর মন খুব খারাপ। হয়তো একটু একটু কাঁদছিলও ; সেইজন্যেই খেয়াল করেনি, ওর ফেরার রাস্তার পাশেই আমি দাঁড়িয়ে আছি।
কাছাকাছি আসতেই আমি ডাকলাম—'মিকি!'
আমাকে দেখেই মিকির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একদৌড়ে আমার কাছে এসে ওর সেই অদ্ভুত কিচির মিচির শব্দে আমার কাছে নিশ্চয় বন্ধুদের সম্বন্ধে নালিশই করতে শুরু করল। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, 'ছাড়ো ওদের কথা। তুমি আমার সঙ্গে একটা খেলা খেলবে?'
মিকি তো খুব খুশি। অ্যাতো বড় করে ঘাড় হেলাল।
আমি বললাম, 'আমার এই পেনটাকে আমি লুকিয়ে রাখব, তুমি খুঁজে বার করবে। ঠিক আছে?'
ও আবার ঘাড় হেলাল। তারপর পেনটাকে হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে আমাকে ফেরত দিয়ে দিল।
একটা প্রায় একতলা বাড়ির সমান উঁচু পাথর দেখিয়ে মিকিকে বললাম, ওই পাথরটা হল বুড়ি। তুমি ওটার ওপাশে গিয়ে দাঁড়াও। আমি 'কু' দিলেই বেরিয়ে আসবে।
মিকি এক দৌড়ে পাথরটার অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
রিভার বেডের এক জায়গায় একটা বন্যায় ভেসে আসা গাছের গুঁড়ি পড়েছিল। আমি হাঁটতে হাঁটতে সেটার কাছে গিয়ে অনেকখানি বালি খুঁড়ে আমার ডটপেনটাকে চাপা দিয়ে দিলাম। তারপর খুব ভালো করে গর্তটাকে আবার বালি দিয়ে বুজিয়ে দিলাম, যাতে আশেপাশের জায়গা থেকে আলাদা করা না যায়।
তারপর বুড়ি পাথরটার কাছে ফিরে এসে আমি মুখ দিয়ে 'কু' শব্দ করা মাত্র মিকি দৌড়ে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। চারদিকে ঘুরে ঘুরে ওর ওই বড় বড় কানদুটো পেতে কী যেন শোনবার চেষ্টা করল।
হ্যাঁ, আমার ঠিক তাই মনে হয়েছিল। দেখবার নয়, মিকি কিছু একটা শুনবার চেষ্টা করছে। অথচ সেদিন সেই নদীর চরে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দই ছিল না। কিছুক্ষণ ওইভাবে কান পেতে থেকে, তারপর হঠাৎই মিকি তিরবেগে দৌড়ে গেল সেই মরা গাছের গুঁড়িটার দিকে। হাঁটু গেড়ে বসে বালি খুঁড়ে তুলে আনল আমার পেনটা।
পর পর তিন বার একইভাবে ওকে পরীক্ষা করে দেখলাম। প্রত্যেকবারই আরো দূরে, আরো গভীরে পুঁতে রেখে এসেছিলাম জিনিসগুলো। কলমের পর একবার আমার রুমালটা, আরেকবার একটা চাবির গোছা। প্রত্যেকবারই মিকি আগে একবার ভালো করে জিনিসগুলো হাতে নিয়ে দেখে নিয়েছিল। তারপর অনায়াসে সেগুলোকে খুঁজে বার করেছিল।
বুঝলাম, মিকি শুধু অন্ধকারেই দেখতে পায় না, চোখ বাঁধা থাকলেও দেখতে পায়। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, ও মাটির নীচের জিনিসও দেখতে পায়।
আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। গোপেন টোপ্পো আমার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরছিল। সেও কেমন যেন ভূতে পাওয়া মানুষের মতন বিড়বিড় করে কীসব বলতে বলতে নিজের মোটরবাইকের দিকে হাঁটা লাগাল।
মিকি বোধহয় আরেকটু খেলতে চাইছিল। আমি বললাম, না রে বাবু। আজ বাড়ি যা। পরে আবার খেলব।
ওই ক্যাম্পে এসব কথা বলার মতন লোক আমার একজনই ছিলেন—মৃণালদা। সেদিন সদ্য সদ্য মিকির অমন কেরামতি দেখেছিলাম বলেই বোধহয় আমি খুব অন্যমনস্ক ছিলাম। মিকির কথা ভাবতে ভাবতেই আমি ভেজিয়ে রাখা দরজাটায় টোকা না দিয়েই মৃণালদার ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম।
মৃণালদা নিশ্চয় আমার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন একটা কিছু হয়েছে। জিগ্যেস করলেন, 'কী হয়েছে বিজিত?'
আমি ওনাকে সব ঘটনাই খুলে বললাম। কেমন করে মিকি রুমালচোর খেলায় চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তীরবেগে দৌড়ে ওর খেলার সঙ্গীদের ছুঁয়ে দিচ্ছিল। নদীর চরে ওকে নিয়ে আমার এক্সপেরিমেন্টের কথাও বললাম। ভেবেছিলাম, মৃণালদা আমার কথা অবিশ্বাস করবেন। নিজে অন্তত একবার দেখতে চাইবেন সত্যিই মিকির চোখের নজর মাটির গভীরেও পৌঁছিয়ে যায় কি না।
আমি এর আগে অনেকবার মৃণাল গোস্বামীর বৈজ্ঞানিক মনের পরিচয় পেয়েছি। প্রমাণ ছাড়া উনি কিছুই বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু সেদিন সব শোনার পরেও মৃণালদা কোনো অবিশ্বাসের চিহ্ন দেখালেন না। বরং দু-হাতের ভাঁজের মধ্যে মাথাটাকে হেলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম, উনি গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে গেছেন। অস্বস্তি লাগছিল। কিছুক্ষণ বাদে আর না পেরে জিগ্যেস করলাম, 'মৃণালদা, কী মনে হয় আপনার? বাচ্চাই হোক বা বড়, কোনো মানুষের পক্ষে কি এসব সম্ভব?'
মৃনালদা ছাদের দিক থেকে চোখ নামিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন। দেখেই বুঝতে পারছিলাম, ওনার মনের মধ্যে একটা লড়াই চলছে। কোনো একটা কথা আমাকে বলবেন কি বলবেন না, এই নিয়ে লড়াই।
শেষ অবধি উনি দ্বিধা কাটিয়ে বলে উঠলেন, 'বিজিত, আমি অনেকদিন ধরে একটা জিনিস খুঁজছিলাম। পরশু সেটা খুঁজে পেয়েছি। আমার সেই আবিষ্কার আর তোমার আজকের আবিষ্কারের মধ্যে একটা রিলেসনশিপ আছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ। দুটোর মধ্যে যোগাযোগ আছে। আমি নিশ্চিত।'
কথা বলতে বলতেই মৃণালদা আধশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসেছিলেন। ওনার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিল। আমার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে মৃণালদা বললেন, 'তোমাকে আমি সব কথা বলতে চাই বিজিত। তুমি শুনবে? তুমি আমাকে পাগল ভাববে না তো?'
আমি বললাম, 'কী বলছেন মৃণালদা? আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আপনি বলুন, কী বলবেন। আমি শুনছি।'
মৃণালদা বললেন, 'বছর দুয়েক আগে যখন এই রাঙাবাড়িতে সার্ভের কাজ শুরু হল, তখন গুয়াহাটির আরামের পোস্টিং ছেড়ে দিয়ে এক কথায় আমি এখানে চলে এলাম। তার কারণ, এদিকটায় আগে কখনো আসার সুযোগ পাইনি। ভাগ্যিস এসেছিলাম। না এলে জীবনের সব চেয়ে বড় রহস্যটার মুখোমুখি হতে পারতাম না।'
আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, 'রহস্য? আপনি কি মিকির কথা বলছেন মৃণালদা?'
মৃণালদা বললেন, 'মিকি সেই রহস্যের একটা অংশ। শুরুটা কিন্তু হয়েছিল সেই ভাঙা বি-টোয়েন্টিফোর বম্বার প্লেনটা থেকে।
'দাঁড়াও, আরেকটু আগে থেকে শুরু করি। নাহলে বুঝতে পারবে না।
'এই রাঙাবাড়িতে কাজে যোগ দেবার আগে অভ্যেসমতন জায়গাটা নিয়ে একটু পড়শোনা করেছিলাম। তখনই দেখেছিলাম, জায়গাটার একটা কুখ্যাতি আছে, যদিও মিলিটারি-ওয়ার্ল্ডের বাইরে খুব কম লোকেই সেই কুখ্যাতির ব্যাপারটা জানে। মনে হয় গভর্মেন্টের নানান অফিস থেকে কিছুটা ইচ্ছে করেই ব্যাপারটাকে চেপে রাখা হয়েছে।
'ব্যাপারটা কী জানো? ওই যে সিয়াং ভ্যালির ওপাশে পাহাড়ের পাঁচিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওই পাঁচিল টপকেই আমেরিকান-আর্মির প্লেন ইন্ডিয়া থেকে ওদিকে যেত। অন্য কোনো রাস্তা ছিল না। কারণ, মায়ানমারের ওপর দিয়ে যে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ রুট—সেটা তখন জাপানিদের দখলে।
'আমেরিকান এয়ারফোর্সের পাইলটরা ওই পাহাড়গুলোর নাম দিয়েছিল ''ডেভিলস হাম্প''—''শয়তানের কুঁজ''।
'পুরো সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের ইতিহাসে অত বেশি সংখ্যায় প্লেন আর কোথাও ভেঙে পড়েনি। যুদ্ধের দিনগুলোতে সব মিলিয়ে প্রায় সাতশো প্লেন ভেঙে পড়েছিল ওই পাহাড়তলির জঙ্গলে।
'কেন অত বিপজ্জনক ছিল ডেভিলস হাম্প? অনেক বইপত্র ঘেঁটেও সে ব্যাপারে বেশি কিছু জানতে পারলাম না। সব জায়গাতেই দেখলাম একই কথা লেখা আছে। ঘন কুয়াশায় দিক ভুল করে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়েই নাকি ভেঙে পড়ত প্লেনগুলো।
'এই ব্যাখ্যাটা মানতে আমার বেশ কষ্ট হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বি-টোয়েন্টিফোর সারা পৃথিবীর আকাশে উড়ে বেরিয়েছে। আর কোথাও কোনো পাহাড় ছিল না? আর কোথাও কুয়াশা জমত না? তাহলে কেন শুধু আমাদের এই রাঙাবড়ির উত্তরের ওই ডেভিলস হাম্পের জঙ্গলেই তারা ভেঙে পড়ত?
'বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল নিয়ে সারা পৃথিবীতে কত হইচই, কত বই, কত থিয়োরি। অথচ ফ্লোরিডার ওই সমুদ্রে যত প্লেন হারিয়েছে, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি প্লেন হারিয়ে গেছে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই কয়েকশো বর্গ কিলোমিটার অরণ্যে। তাই নিয়ে কোথাও ''টু'' শব্দ নেই।
'যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর মাঝে মাঝেই ইউ. এন. ও. কিম্বা আমেরিকান আর্মি থেকে অনুসন্ধানকারীর দল এসে ওই জঙ্গলে প্লেনগুলোর খোঁজ চালিয়েছে। কারণ, চিরকাল তো কোনো সৈনিককে ''নিখোঁজ'' বলে চালানো যায় না। সে বেঁচে আছে কি মরে গেছে সেটা তার আত্মীয়স্বজনকে জানাতেই হবে আর তার জন্যে প্রমাণ চাই।
'কিন্তু এত খানাতল্লাসীর পরেও দু-একটা ছাড়া কোনো প্লেনের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলোও এতই টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙেছিল যে, তার থেকে অ্যাক্সিডেন্টের কারণ খুঁজে বার করা মুশকিল। এসব কথা আমি শুনেছি লালসিং নামে তিনসুকিয়ার এক পোর্টারের মুখ থেকে। লালসিং ওরকম বেশ কয়েকটা সার্চ পার্টিতে অংশ নিয়েছিল।'
আমি বললাম, 'তারপর?'
'যে কাজ ইউ. এন. ও. কিম্বা আমেরিকান আর্মির বিশ-পঁচিশজনের দল হাজার রকম যন্ত্রপাতি, তাঁবু, নৌকা, জিপগাড়ি, রক-ক্লাইম্বার নিয়ে করতে পারেনি, সেই কাজ আমি শুরু করলাম—একা। খুঁজতে শুরু করলাম হারানো প্লেনের রহস্য। তোমার কাছে লুকোব না, ওই জমির স্ট্রেংথ পরীক্ষা করার ব্যাপারটা এখানে থেকে যাওয়ার একটা বাহানা। আসলে গত একবছর ধরে আমি ওই কাজটা নিয়েই পড়ে আছি।
'লোকে জানলে হয়তো বলত উন্মাদ। কিন্তু আমি জানতাম, ওই সব বড় বড় টিমের থেকে আমার একটা সুবিধে রয়েছে বেশি। এই জঙ্গলকে আমি ওদের থেকে অনেক বেশি চিনি। এখানে আমার পেনিট্রেশন-পাওয়ার ওদের থেকে অনেক বেশি। আমি একা এমন-এমন জায়গায় পৌঁছে যেতে পারব, বাইরের দলগুলো যেসব জায়গার কথা কোনোদিন জানতেই পারেনি।
'পুরো ভ্যালিটাকে মনে মনে কয়েকটা সেক্টরে ভাগ করে নিয়ে একটা একটা করে সেক্টরে চিরুনি-তল্লাসি শুরু করলাম। সেইরকমই এক ঘোরাঘুরির মধ্যে খুঁজে পেলাম মিকিকে, সে তো তুমি জানোই।
'আর তারপর, বিজিত, তুমি বললে বিশ্বাস করবে না, গত পরশু পেয়ে গেলাম একটা বি টোয়েন্টিফোর ফাইটারের ধ্বংসাবশেষ।'
'বলেন কী?' আমি চমকে উঠলাম। মনে পড়ে গেল, পরশু সত্যিই মৃণালদার ঘরে ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল।
'হ্যাঁ বিজিত।
'পরশু আমি একটা রিভার-বেড ধরে হাঁটছিলাম। এটাই সেই নদীটা, যেটার স্রোতে মিকি ভেসে এসেছিল।
'আমার ডানদিকে ছিল সেই নদী আর বাঁদিকে পাহাড়। হঠাৎই ভাঙাচোরা প্লেনটাকে দেখতে পেলাম। নদীর ধারে কয়েকটা বিশাল বোল্ডারের মাঝখানে পড়েছিল বলেই নিশ্চয় ওপর থেকে ''সার্চ-পার্টি''-র কেউ ওটাকে দেখতে পায়নি।
'তখনো আকাশে ভালোই দিনের আলো ছিল। পরিষ্কার দেখতে পেলাম রিভার-বেডের বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেই প্লেন। পড়ে আছে চল্লিশ বছর ধরে। চল্লিশ বছরের রোদ-জল-হাওয়ার দাপটে তার রং জ্বলে গেছে। টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ককপিটের কাচ। কিন্তু ফিউজিলেজের কাছে আমেরিকান এয়ার ফোর্সের নক্ষত্রের লোগোটা কি জানি কেমন করে এখনও টিকে রয়েছে। তার নীচে প্লেনের রেজিস্ট্রেশন নাম্বারটাও পরিষ্কার পড়া যাচ্ছিল—''ডব্লিউ এম টি- জিরো ফাইভ জিরো''।
'আমার রাকস্যাকে সবসময়েই হারিয়ে যাওয়া ছশো উননব্বইটা প্লেনের একটা লিস্ট থাকে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমেরিকান ওয়ার ডিপার্টমেন্টের অফিস থেকে এটা আনিয়েছিলাম। লিস্টটা বার করে মেলালাম। হ্যাঁ, ''ডব্লিউ এম টি- জিরো ফাইভ জিরো'' প্লেনটা উনিশশো চুয়াল্লিশের বারোই জানুয়ারি ডেভিলস হাম্পের ওপর দিয়ে বর্ডার ক্রস করবার সময় হারিয়ে গিয়েছিল।
'ওই লিস্ট থেকেই জানতে পারলাম, প্লেনটা চালাচ্ছিলেন ফ্লাইট লেফটেনান্ট টিম সন্ডার্স। তাছাড়া প্লেনটায় দুজন গানার ছিলেন। 'গানার' মানে যারা প্লেনের পেটের কাছে বসে মাটির নিশানার দিকে গুলি-টুলি চালায় আর কি। তাদের এক জনের সারনেম ছিল মর্গান আর একজনের ক্রুশো।
'প্লেনটার ভেতরে ঢুকবার আগে বাইরে থেকে ওটাকে ভালো করে দেখলাম। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, নদীর চরার ওপর দিয়ে অনেকখানি ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে এসে, তারপর ওটা ওইখানে স্থির হয়েছে। অর্থাৎ প্লেনটা ভেঙে পড়েনি, বেলি-ল্যান্ডিং করেছিল, এমার্জেন্সি-সিচুয়শনে যেরকম করে। সেইজন্যেই ওটা টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি কিম্বা আগুন ধরে যায়নি। তবে যা হয়েছে তাও কম নয়। ডানা দুটো তুবড়ে ভাঁজ হয়ে গেছে। পাথুরে মাটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে গেছে গানারসনেস্ট। সামনের দুটো প্রপেলারের মধ্যে একটা খুলে পড়ে আছে প্রায় আধকিলোমিটার দূরে। ওই প্লেনে যারা ছিল তাদের পক্ষে এই অ্যাকসিডেন্টের পর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম।
প্লেনটার বডির অ্যালুমিনিয়ামের কাভার অনেক জায়গাতেই উড়ে গিয়েছিল, পড়ে ছিল শুধু স্টিলের ফ্রেম। সেই ফ্রেম দু-হাতে আঁকড়ে ধরে যখন প্লেনের ভেতরে পা দিলাম, তখন নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম।
'তোমার কাছে লুকোব না, আমি একদম নিশ্চিত ছিলাম যে, ভেতরে ঢুকে প্রথমেই দেখতে পাব তিনটে কঙ্কাল। মাটির ওপর আছড়ে পড়া একটা প্লেনের ভেতরে দুর্ঘটনার চল্লিশ বছর পরে যে পা রাখছে, তার কপালে ওরকম একটা দৃশ্যই পাওনা হয়।
'অবাক হলাম ভেতরে কোনো কঙ্কাল দেখতে না পেয়ে।
'এর তো একটাই মানে দাঁড়ায়। ক্র্যাশের পরেও ওই প্লেনের ক্রু-রা বেঁচে ছিল।
'যদি বেঁচেই থাকে, তাহলে তারা কোথায় গেল? সভ্যজগতে ফিরে যে যায়নি সে কথা নিশ্চিত। ধরা যাক তারা এই জঙ্গলেই শিকার-টিকার করে বেঁচেছিল। সেক্ষেত্রেও তারা তো প্রথমেই এই প্লেনটাকেই সারিয়ে সুরিয়ে বসবাসের উপযোগী করে তুলবে। কিম্বা চেষ্টা করবে এই রেক্সিনের সিট-কাভার, অ্যালুমিনিয়ামের পাত, কাঠের ফ্রেম—এ গুলোকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোথাও একটা আস্তানা বানাবার। কিন্তু তার তো কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সবই তো মনে হচ্ছে এই প্লেনের ভেতরেই পড়ে পড়ে নষ্ট হয়েছে।
'তার মানে ওরা এই জঙ্গলেও বেশিদিন স্ট্রাগল করেনি।
'জঙ্গলেও থাকেনি, সভ্যজগতেও ফিরে যায়নি—লোকগুলো তাহলে গেল কোথায়? উত্তর খুঁজে পাবার আশায় আমি আবার প্লেনের ভেতরেই ঢুকলাম। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করলাম কোথাও তিন সৈনিকের অন্তর্ধান রহস্যের ব্যাপারে আলো ফেলতে পারে এমন কিছু পাওয়া যায় কি না।
'অবশেষে যা খুঁজছিলাম তা পেয়ে গেলাম। ককপিটে ঠিক যেখানে পাইলটের সিট, তার ডান দিকে মেঝের ওপরে পড়েছিল এই স্টেইনলেস স্টিলের বাক্সটা।'
মৃণালদা কথা থামিয়ে উঠে গেলেন। তারপর ওনার আলমারি খুলে একটা বাক্স এনে আমার হাতে দিলেন। জিনিসটা দেখতে অনেকটা বড়সড় একটা টিফিন-কৌটোর মতন। রোদে জলে বাক্সের বাইরের দিকটা কালো হয়ে গেছে, কিন্তু জিনিসটা যারা বানিয়েছিল, তাদের প্রশংসা করতেই হয়—এত বছরেও বাক্সটার কোথাও এতটুকু ভাঙেনি কিম্বা চিড় ধরেনি।
মৃণালদা বললেন, 'ওটা খোলো। দ্যাখো, ভেতরে কী আছে।'
আমি বাক্সের ডালাটা খুলে ফেললাম। দেখলাম, ভেতরে প্রায় খাপে খাপে বসে আছে একটা মোটা খাতা। কালো চামড়া দিয়ে বাঁধানো মলাটের ওপর সাদা রঙে লেখা সেই ভাঙা এয়ারোপ্লেনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর—' ডব্লিউ এম টি- জিরো ফাইভ জিরো''।
'এটা কী?'—আমি জিগ্যেস করলাম।
'প্লেনের লগবুক। তবে প্লেন ক্র্যাশ করার পরে লেফটেনান্ট টিম সন্ডার্স এটাকে ডায়েরি হিসেবে ইউজ করেছিলেন। শেষের দিকের পাতাগুলো তাই বলছে। রাঙাবাড়ির জঙ্গলে উনি মাত্র ছ'দিন বেঁচেছিলেন। প্রথমদিন কিছু লেখেননি। এটা বাকি পাঁচদিনের ডায়েরি। পড়ে দ্যাখো।'
মৃণালদার ঘরের কোনায় রাখা ক্যানভাসের চেয়ারটার ওপরে বসে সেই লগবুক কিম্বা ডায়েরিটার পাতা ওলটালাম। প্রথম পাতার এন্ট্রির তারিখ দেখে বুঝলাম, 'জিরো ফাইভ জিরো' প্রথম আকাশে উড়েছিল উনিশশো তেতাল্লিশের ফেব্রুয়ারি মাসে। অর্থাৎ এক বছরেরও কম আয়ু ভোগ করেছিল বেচারা প্লেনটা।
পরের পাতাগুলোও চটপট উলটে গেলাম, কারণ ওসব পাতায় যেসব টেকনিকাল খুঁটিনাটি ছিল তাতে আমি দাঁত ফোটাতে পারতাম না। ওলটাতে ওলটাতে একদম শেষদিকের একটা পাতায় এসে আমার হাত থেমে গেল। পাতাটার ওপরে তারিখ তেরোই জানুয়ারি, উনিশশো চুয়াল্লিশ। অর্থাৎ যেদিন প্লেনটা ক্র্যাশ করেছে, ঠিক তার পরের দিন। সময়ের বিষে হলুদ হয়ে আসা রুল টানা মোটা পাতার ওপরে পেন্সিলে লেখা প্রথম লাইনটা পড়েই চমকে উঠলাম :
'মর্গান আর ক্রুশ মারা গেছে।'
বাকি লেখাটা আমি একটানা পড়ে শেষ করে ফেললাম।
১৩ জানুয়ারি, ১৯৪৪—মর্গান আর ক্রুশ মারা গেছে। ঈশ্বরের অশেষ দয়া, আমার দুই প্রিয় বন্ধুকে কোনো যন্ত্রণা পেতে হয়নি। ওদের মৃত্যু হয়েছে মুহূর্তের মধ্যে। মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় প্রথম যে ধাক্কাটা, সেটা পুরোটাই পড়েছে গানারসনেস্টের ওপর। জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া একটা খালি দেশলাই বাক্সের মতন চেপটে গিয়েছে মর্গান আর ক্রুশের বসার জায়গা।
কিন্তু আমার ভাগ্য ওদের মতন অত ভালো নয়। আমার দুটো পা-ই হাঁটুর কাছ থেকে ভেঙে গেছে। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। বুকের ওপর ভর দিয়ে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে কোনোরকমে একবার প্লেনের পেছনদিকে গিয়েছিলাম। ওদের দুজনকে একবার দেখে নিয়ে, আবার ফিরে এসেছি নিজের সিটে। বাইরে বেরোনোর কোনো মানে হয় না। বাইরে হাড় জমিয়ে দেওয়া ঠান্ডা।
কপালের ডানদিকে একটা বড় ক্ষত হয়েছে দেখছি। কীভাবে কখন লাগল কে জানে। সমানে রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। নিজেই যেটুকু পারি ড্রেস-টেস করে নিয়েছি, কিন্তু তাতে কি আর রক্ত আটকায়? এখনই যদি একটা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারতাম, তাহলে হয়তো বেঁচে যেতাম। কিন্তু হিমালয়ের এই গভীর জঙ্গলে কোথায় হাসপাতাল? মানুষই বা কোথায়? আপাতত নিজেই দুটো কাঠের টুকরোর সঙ্গে বেঁধে পা-দুটোকে কোনোরকমে সোজা করে রেখেছি।
গতকাল বিকেল তিনটের সময় আমাদের প্লেনটা ভেঙে পড়ল, আর আজ এখন ঘড়িতে বাজছে সন্ধে সাড়ে পাঁচটা। তার মানে চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এই চব্বিশ ঘণ্টায় শুধু কয়েক চুমুক ক্যানড স্যুপ খেয়েছি। আর কিছু খেতে ইচ্ছেই করছে না। সারাক্ষণ গা-টা কেমন যেন গোলাচ্ছে। জ্বর এসেছে মনে হয়।
যদি এই আঘাত সামলাতে পারি, যদি সেরে উঠি, তাহলেও কি বেঁচে থাকব? কাল সারারাত খুব কাছেই কোথাও নেকড়ের ডাক শুনেছি। যতক্ষণ হাতে রিভলভারটা তুলে নেবার শক্তি থাকবে ততক্ষণ ওদের নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু সেই শক্তিটাও যদি একসময় হারিয়ে ফেলি?
১৪ জানুয়ারি, ১৯৪৪—যন্ত্রণা বাড়ছে। দুটো পা-ই বীভৎসভাবে ফুলে উঠেছে। নিজেকে একটু অন্যমনস্ক রাখার জন্যেই আজ কন্ট্রোল-প্যানেলটা পুরোটাই খুলে ফেলেছিলাম। ওর জন্যে তো বেশি নড়াচড়া করার দরকার পড়ে না। সারাদিন তো কন্ট্রোল-প্যানেলের সামনেই বসে আছি।
সারাবার জন্যে ওটাকে খুলিনি। এ প্লেন যে জীবনে আর মাটি ছেড়ে উঠবে না, সে আমি ভালোই জানি। ওই তো, জানলা দিয়েই দেখতে পাচ্ছি ডানদিকের প্রপেলারটা রিভার-বেডের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সারাবার জন্যে নয়, আমি আসলে বুঝতে চাইছিলাম, পরশু ওরকম হঠাৎ করে সবক'টা যন্ত্র একসঙ্গে বিদ্রোহ করল কেন? এতঘণ্টার ফ্লাইট-এক্সপেরিয়েন্স আমার—কোনোদিন এরকম ভূতুড়ে কাণ্ড দেখিনি।
সেই সময়টার কথা কোনোদিন ভুলব না। স্পিডোমিটার স্থির, অলটিমিটার অনড়। শুধু কম্পাসের কাঁটা পাগলের মতন বাঁইবাঁই করে ঘুরছে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, একটা কি যেন ফোর্স আমার প্লেনটাকে মাটির দিকে টেনে নামাবার চেষ্টা করছে। প্রথমে ভেবেছিলাম এয়ার-পকেটের মধ্যে পড়েছি। কিন্তু ক্রমশ নীচের দিকে নেমে যাচ্ছি দেখে সে ভুল ভেঙে গেল। জয়স্টিকের ওপর চাপ দিয়ে দিয়ে হাতে ব্যথা হয়ে গেল, কিন্তু ডানার একটা ফ্ল্যাপকে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারলাম না।
সেই দৈত্যের মুঠির টান যতক্ষণে আলগা হল, তখন মাটি থেকে আর বড় জোর দুশোফুট ওপরে রয়েছি। শেষমুহূর্তে যেটুকু করা যায় তাই করলাম। ডাইরেক্ট পাহাড়ের গায়ে গোঁত্তা খাওয়াটা বাঁচিয়ে এই রিভার-বেডে বেলি-ল্যান্ডিং করলাম।
ভালো কথা। কন্ট্রোল-প্যানেল পুরোপুরি খুলে ফেলেও কোনো গন্ডগোল ধরতে পারিনি। অনেকগুলো মেশিন এখনো চমৎকার কাজ করছে। সবকিছু আবার স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে যথাস্থানে লাগিয়ে দিয়েছি। শুধু রেডিও ট্র্যান্সমিটারটা একেবারেই কাজ করছে না। অথচ এই মুহূর্তে ওই যন্ত্রটাই আমাকে বাঁচাতে পারত। বুঝতে পারছি, আমার কপালটাই খারাপ।
১৫ই জানুয়ারি, ১৯৪৪—আজ সকালে একবার জমিতে পা দিয়েছিলাম। 'পা দিয়েছিলাম' না বলে 'হামাগুড়ি দিয়ে নেমেছিলাম' বলাই ভালো। পায়ের অবস্থা মোটেই মাটির ওপর খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর মতন নয়।
কোনোরকমে বেশ কিছু পাতা জড়ো করে নদীর চরে আগুন জ্বেলেছিলাম। আগুন নয়, আমি চেয়েছিলাম ধোঁয়া। এমন ধোঁয়া যা আকাশ থেকে দেখা যাবে। অন্য প্লেন থেকে দেখা যাবে।
তা ধোঁয়া হয়েছিল বটে। এখনো শিশিরে ভেজা কাঁচা পাতা থেকে গলগল করে ধোঁয়া উঠছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না। হবেও না, আমি জানি। কাল রাতেই সেক্সট্যান্ট বার করে মোটামুটিভাবে কোথায় রয়েছি সেটা দেখে নিয়েছি। দেখে মনটা খুব দমে গেছে। আমরা যেখানে এসে পড়েছি, এই জায়গাটা আমাদের নর্মাল ফ্লাইট-রুটের অনেক বাইরে। এখানকার আকাশ দিয়ে কোনো প্লেন যাবে না, কেউ আকাশ থেকে দেখতে পাবে না আমার দুর্গতি।
কাল রাতে হঠাৎ খুব কাছ থেকে ভেসে আসা নেকড়ের গর্জনে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। যদিও সন্ধে থেকেই এই ভাঙা প্লেনের চারিদিকে অ্যাভিয়েশন ফিউয়েল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম, তবু ওই মাংসাষী জানোয়ারগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। বুঝতে পারছিলাম, ওরা অপেক্ষা করে আছে, কখন আগুনের বেড়াজালে ছোট্ট একটা ফাঁক তৈরি হয় তার জন্যে। মাথার কাছ থেকে রিভলভারটা তুলে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই আন্দাজে দুটো বুলেট চালিয়ে দিলাম। শয়তানগুলোর পরের ডাকটা ভেসে এল অনেক দূর থেকে। সেই ডাকের মধ্যে পরিষ্কার হতাশা মিশেছিল।
এত ভয়, এত যন্ত্রণা, এত টেনশনের মধ্যেও চোখ জুড়ে আসছিল। সেটা নিশ্চয় জ্বরের জন্যেই হবে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার আগে হঠাৎ জানলা দিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। দেখলাম, একজনের পেছনে একজন, এইভাবে লাইন দিয়ে প্রায় সাত-আটজন লোক পাহাড়ের নীচ দিয়ে হেঁটে চলেছে। সকলেই একইরকমের বেঁটে, সবারই কানগুলো খাড়া খাড়া। ওদের ঠিক সার্কাসের ক্লাউনের মতন দেখতে লাগছিল। আমি চিৎকার করলাম—হেইই! ওরা শুনতে পেল কিনা বুঝতে পারলাম না। আবার চিৎকার করলাম—হেল্প! হেল্প! লোকগুলো একবার মনে হল থেমে দাঁড়াল। তারপর চোখের পলকে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
ওরা কারা? মানুয না প্রেতাত্মা? নাকি আমার জ্বরের ঘোরে দেখা হ্যালুসিনেশন?
এরপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
১৬ জানুয়ারি, ১৯৪৪— না, স্বপ্ন ছিল না। ওরা সত্যিই আমার কাছে এসেছিল।
কাল ঘুম এসেছিল অনেক দেরিতে। শীতে কাঁপছিলাম বলেই নিশ্চয় অনেকক্ষণ জেগে শুয়েছিলাম। তারপর কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘুম ভাঙল একটা গরগর শব্দে। দেখলাম জানলায় একটা নেকড়ের মুখ। কেবিনে ঢোকার ভাঙা দরজাটার মুখে দাঁড়িয়েছিল আরো তিনটে। ওদের পেছনে ছিল উজ্জ্বল জ্যোৎস্না, তাই নেকড়েগুলোকে মনে হচ্ছিল কালো পিজবোর্ড কেটে বানানো ছবির মতন। কিন্তু ছবি ওরা ছিল না। জানলা দিয়ে প্রায় কেবিনের ভেতরে ঢুকে এসেছিল যে নেকড়েটা, সেটা আরেকবার গর্জন করে উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গেই সেটার দাঁতগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। কোনো ছবির দাঁত অমন ঝিলিক দেয় না।
মাথার কাছে হাত বাড়ালাম। রিভলভারটা পেলাম না। মনে পড়ল, ওটাকে ড্যাস-বোর্ডের মধ্যে রেখেই শুয়ে পড়েছি। শেষ একটা লড়াই দেবার জন্যে হাতে একটা লোহার স্প্যানার তুলে নিয়ে তৈরি হলাম, যদিও সে লড়াইয়ের ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।
তবে লড়াইটা করার দরকার পড়ল না। হঠাৎ কেবিনের জানলা দিয়ে উঠে আসছিল যে নেকড়েটা সেটার গলা দিয়ে একটা যন্ত্রণার আওয়াজ বেরিয়ে এল। পরমুহূর্তেই নেকড়েটা জানলা থেকে খসে পড়ল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটের মধ্যে যেটা কেবিনের একটু বেশি ভেতরে ঢুকে এসেছিল সেটাও ঠিক একইভাবে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল। বাকি নেকড়েগুলো তিরবেগে ছুট লাগাল রিভারবেড পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে।
হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগল। তারপর ভাঙা পা নিয়ে কোনোরকমে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম...পরিষ্কার দেখলাম... চারজন লোক হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিক থেকে এগিয়ে আসছে। ওরাই নিশ্চয় আমার রক্ষাকর্তা।
চিনতে ভুল হল না। কালকের সেই লোকগুলো। আজ আরো অনেক কাছ থেকে ওদের দেখলাম।
ওদের চারজনেরই মুখে চাঁদের আলো পড়েছিল। মানুষের কি ওরকম চোখ হয়? চোখের জায়গায় ঠিক যেন দুটো করে বড় কালো বোতাম সেলাই করা রয়েছে। চারজনেরই নাক বলে প্রায় কিছুই নেই, আর সবচেয়ে আশ্চর্য ওদের কান। মাথার দুপাশে ডিমের মতন আকৃতির কানদুটো অনেকখানি করে বাইরে বেরিয়ে আছে।
চারজনকেই দেখতে একেবারে একরকম—জোকারের মতন। কিম্বা মিকি মাউসের মতন।
আমার প্লেনটাকে পেরিয়ে ওরা পাহাড়ের দিকে চলে গেল।
১৭ জানুয়ারি, ১৯৪৪—আমার দুটো পায়েই গ্যংগ্রিন সেট করে গেছে। পচন ছড়িয়ে পড়ছে হাঁটু থেকে পায়ের পাতার দিকে। তার সঙ্গে ধূম জ্বর। আমিও নিজেও জানি না, যা দেখছি তা সত্যি, না কি জ্বরের ঘোরে দেখা অলীক ছবি।
কাল ওরা কেবিনের ভেতরে ঢুকে এসেছিল, ওই মিকি মাউসের মতন দেখতে মানুষগুলো। ওরা যখন এসেছিল তখনও চাঁদ ওঠেনি। আমার মাথার কাছে জ্বালিয়ে রাখা ব্যাটারির আলোটা নিজে থেকেই নিভে গিয়েছিল না ওরাই নিভিয়ে দিয়েছিল বলতে পারব না। শুধু এইটুকু জানি যে, হঠাৎই কারুর ছোঁয়ায় যখন আমার ঘুমটা ভেঙে গেল তখন ঘন অন্ধকারে আমার এই কেবিন ডুবে আছে।
ওদের কিন্তু তাতে কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। অন্ধকার কেবিনটার মধ্যে ওরা এমনভাবে হাঁটাচলা করছিল যে, এত ছড়িয়ে রাখা জিনিসের একটার সঙ্গেও একবারও ঠোক্কর লাগছিল না। মনে হচ্ছিল ওরা অন্ধকারেও দেখতে পাচ্ছে।
আমাদের সভ্যতার এমন শিক্ষা যে প্রথমেই খারাপটা ভেবে নিই। আমিও ভাবলাম, ওই জোকারগুলো প্লেনের জিনিসপত্র লুঠ করবার জন্যে ঢুকেছে। হাত বাড়িয়ে মাথার কাছ থেকে যখন রিভলভারটা তুলে নিলাম তখনও মনে পড়ল না যে, সবেমাত্র আগের রাতেই ওরা আমাকে নেকড়ের কবল থেকে বাঁচিয়েছে। ভুলটা ভাঙল যখন ওরা আমার পায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ল। বুঝলাম ওরা চেষ্টা করছে কোনো ভাবে পা দুটোকে সারিয়ে তুলতে। কিছু মলমটলম মাখাচ্ছিল মনে হয়।
না, তাতে কোনো উপকার হয়নি। বুঝতে পারছি আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। তবু ওই অচেনা বন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ওরা ওদের সাধ্যমতন চেষ্টা তো করেছে।
ও হ্যাঁ, ওরা আরেকটা কাজ করেছে। আগে কেন চোখে পড়েনি কে জানে! মর্গান আর ক্রুশকে ওরা সমাধি দিয়েছে। কেবিনের জানলা দিয়েই দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ের পায়ের কাছে পাশাপাশি দুটো মাটির ঢিপি। পাশে আরো কিছুটা সমতল জায়গা রয়েছে। আজকালের মধ্যেই ওখানে আরো একটা ঢিপি গজিয়ে উঠবে।
মনটা ক্রমশ শান্ত হয়ে আসছে। চিরকালের মতন একটা বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়ার পক্ষে হিমালয়ের এই পাহাড়তলির থেকে সুন্দর জায়গা আর কী হতে পারে? কত পাখি ডাকছে, কত ফুল ফুটেছে। ওই নদীটার নাম জানা হল না। কিন্তু পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতের কি মিষ্টি শব্দ!
ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আর লিখতে পারছি না। এবার ঘুমোই।
ডায়েরিটা মৃণালদার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, 'মৃণালদা! মিকি তার মানে সৃষ্টিছাড়া এক বাচ্চা নয়? চল্লিশ বছর আগে ফ্লাইট লেফটেনান্ট টিম সন্ডার্স ওর মতনই আরো কয়েকজনকে সিয়াং ভ্যালির জঙ্গলে দেখেছিল। কারা ছিল তারা?'
মৃণালদা বললেন—'এলিআনস। অন্য গ্রহের প্রাণী। আমাদের মিকিও তাই। এলিআন।'
সেদিন অনেক রাত অবধি মৃণালদার ঘরে বসে ওনার মুখ থেকে একের পর এক আশ্চর্য কাহিনি শুনেছিলাম।
মৃণালদা সেদিন বলেছিলেন সম্পূর্ণ অন্য এক ধরনের ভিনগ্রহীদের কথা। তারা সাব-টেরেনিয়ান। অন্য গ্রহের প্রাণী, যারা আমাদের এই পৃথিবীর মাটির নীচে বসবাস করে।
পৃথিবী জুড়ে বহু জায়গায় সাব-টেরেনিয়ানদের বসবাসের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেছে। খুঁজে পাওয়া গেছে মাটির নীচে মাকড়শার জালের মতন বিছিয়ে থাকা সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধা। পাওয়া গেছে আট-তলার সমান গভীর এক শহর, যার হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা দেখলে তাক লেগে যায়। কখনো এক অজানা সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোনো অভিযাত্রী সেরকম কোনো গুহাশহরে পৌঁছে গেছেন। কখনো একদল খনিশ্রমিক মাটি কাটতে কাটতে চমকে উঠেছে মাটির গভীরে শহরের চিহ্ন দেখে। সবই পরিত্যক্ত যদিও।
স্থানীয় লোকেরা জানে, তাদের পূর্বপুরুষেরা ওসব তৈরি করেনি। কেনই বা করবে? মানুষ চিরকালই আলো ভালোবাসে। ভালোবাসে মাথার ওপরে খোলা আকাশ। কোন দুঃখে তারা মাটির নীচে বাসা বানাতে যাবে?
তবে নানান দেশের আদিবাসীদের পুরাণকথায় যেমন আগুনের রথে চড়ে আকাশ থেকে নেমে আসা দেবতাদের গল্প আছে, তেমনি মাটির তলার বাসিন্দাদের গল্পও রয়েছে। সংখ্যায় কম, তবুও আছে। যেমন কলোরাডোর হোপি আদিবাসীরা বলে তাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মাটির নীচের পিঁপড়ে- মানুষদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। পাতালপুরীর কল্পনা তো আমাদের হিন্দুদের পুরাণেই রয়েছে। সেখানে না কি যক্ষদের সোনার শহর। যক্ষরা আসলে সাব-টেরেনিয়ান নয় তো?
আমি বললাম, 'মৃণালদা, যাদের বিজ্ঞান এতটাই উন্নত যে, স্পেস-শিপে চেপে মহাশূন্যে পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছোতে পারে, তারা কোন দুঃখে বছরের পর বছর ওই জঙ্গলের মধ্যে মাটির নীচে পশুর মতন জীবন কাটাচ্ছে? ফিরে যাচ্ছে না কেন নিজেদের গ্রহে?'
মৃণালদা বললেন, 'জাহাজডুবির পরে ভাঙা জাহাজের নাবিকেরা যখন সাঁতরে কোনো দ্বীপে গিয়ে ওঠে তারপর তারা কি আর ইচ্ছে করলেই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে?'
'তার মানে?'—আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
'আমার বিশ্বাস, মিকির পূর্বপুরুষরা পৃথিবীতে আসবার জন্যে মহাকাশযাত্রা শুরু করেনি। অন্য কোথাও যাচ্ছিল ওরা। 'ওরা' মানে অন্য গ্রহের কয়েকজন নভোচারী। তাদের মধ্যে পুরুষ ছিল, নারীও ছিল। যাওয়ার পথে ওদের স্পেস-শিপে নিশ্চয় বড় রকমের কোনো গন্ডগোল দেখা দিয়েছিল। সিয়াং-এর জঙ্গলে ভেঙে পড়েছিল সেই স্পেস-শিপ। সে কত হাজার কিম্বা কত শো বছর আগের ঘটনা, তা বলতে পারব না।'
'তারপর?'
'দ্বীপে বন্দী নাবিকরা যেমন দ্বীপের আদিবাসীদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে চায় সেইরকমই রাঙাবাড়ির সাব-টেরেনিয়ানরাও মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু কতদিন এমন বিশ্রী জীবন কাটাবে? কতদিন ভালো লাগে এমন বন্দী জীবন কাটাতে? তাই ওরা মাটির নীচের শহর থেকে সারাক্ষণ সিগন্যাল পাঠিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে। এই আশায় যে, যদি কোনোদিন ওদের নিজেদের কোনো স্পেসশিপ সেই সিগন্যাল রিসিভ করে।'
আমি উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলাম—'মৃণালদা, প্লেন-ক্র্যাশ।'
'ঠিক ধরেছ।' মুচকি হেসে বললেন মৃণালদা। 'সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় যখনই কোনো হতভাগ্য প্লেন সাব-টেরেনিয়ানদের পাঠানো সেই অজানা তরঙ্গের মধ্যে গিয়ে পড়েছে, তখনই তার দশা হয়েছে সন্ডার্সের প্লেনের মতন। সব মেশিনপত্র বিগড়ে গিয়ে আছড়ে পড়েছে মাটির ওপরে। দোষ হয়েছে শয়তানের। জায়গাটার নাম হয়ে গেছে 'ডেভিলস হাম্প'।
'অপেক্ষা করতে করতে ওদের কত প্রজন্ম কেটে গেছে কে জানে। সেই প্রথম নভোচারীরা, যারা স্পেস-শিপ নিয়ে সিয়াং ভ্যালিতে নেমেছিল, তারা নিশ্চয় অনেকদিন আগেই মারা গেছে। কিন্তু তাদের সন্তান-সন্ততিরা রয়ে গেছে। ওদের সুড়ঙ্গশহরে নতুন শিশুদের জন্ম হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন হল আমাদের মিকি।
'একটা জিনিস আমার মনে হয় বিজিত, মিকিদের নিজেদের যে গ্রহ, সেই গ্রহের মাটিতে নিশ্চয় বেঁচে থাকা যায় না। হয়তো ওদের যে সূর্য, সেই সূর্যের রেডিয়েশন মাটির ওপরের সবকিছুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেয়। সেইজন্যে সেই গ্রহে প্রাণের বিকাশ হয়েছে মাটির নীচে—ঠান্ডায়, অন্ধকারে। মিকিদের শরীরের বিকাশও সেইভাবেই হয়েছে।
'অবশ্য এই পৃথিবীর কোনো কোনো প্রাণীর শরীরেও ওরকম অভিযোজন দেখতে পাওয়া যায়। তুমি ''ইকো-লোকেশন'' বলে কোনো শব্দ শুনেছ বিজিত?'
আমি বললাম, 'শব্দটা শোনা শোনা লাগছে। ঠিক মনে করতে পারছি না।'
'বাদুড় কেমন করে অন্ধকারে ওড়ে জানো তো?'
এইবার আমার মনে পড়ে গেল। ওড়ার সময় বাদুড় মুখ দিয়ে সামনের দিকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির সাউন্ড ওয়েভ ছুড়ে দেয়। সেই সাউন্ডওয়েভ যখন কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে ফিরে আসে, তখন সেই প্রতিধ্বনি থেকে বাদুড় জিনিসটাকে চিনে নেয়।
মৃণালদাকে সেই কথা বলতেই মৃণালদা বললেন, 'ঠিক। এত নিখুঁতভাবে চিনে নেয় যে বলবার কথা নয়। হাজারটা জিনিসের মধ্যে থেকে এক এক প্রজাতির বাদুড় তাদের নির্দিষ্ট খাবারটাকে ঠিক আলাদা করে নিতে পারে ওই ইকো-লোকেশনের সাহায্যে। কেউ খুঁজে নেয় পাকা ফল, কেউ উড়ন্ত মথ।
'শুধু যে বাদুড়েরই এই ক্ষমতা আছে তা নয়, কয়েক জাতের তিমি আর ডলফিনদেরও আছে। ডলফিনরাও ওরকম হাই-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে লুকিয়ে থাকা মাছেদের খুঁজে বার করে। তাছাড়াও গুহার অন্ধকারে বাসা বানায় একজাতের সুইফট পাখি, তাদেরও রয়েছে ইকো-লোকেশনের ক্ষমতা। একজাতের ছুঁচোরও রয়েছে।
'মিকি আর ওর আত্মীয়স্বজনের নিশ্চয় এই ইকোলোকেশনের ক্ষমতা রয়েছে। তুমি বলছিলে না, মিকিকে যে-কোনো জিনিস খুঁজে আনতে বললে ও আগে জিনিসটাকে ভালো করে হাতে ধরে দেখে নেয়। ও আসলে তখন জিনিসটার শেপটাকে চিনে রাখে।
'তারপর ও চারিদিকে ছুঁড়তে থাকে শব্দোত্তর তরঙ্গ। সে তরঙ্গ তোমার আমার অনুভুতিতে ধরা পড়ে না। নানান জিনিসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যখন ফিরে আসে তখন সেই তরঙ্গ মিকির মাথায় সেই সব জিনিসের নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তোলে। জিগ-স পাজলের টুকরোর ছবি, ওর খেলার সঙ্গীদের ছবি। কমলাভাবির ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা আসন কিম্বা বাসনের ছবি। নদীর চরে পুঁতে রাখা তোমার চাবি কিম্বা কলমের ছবি।
'বাকিটা তো সহজ। ও যেটাকে এড়িয়ে যাওয়ার, এড়িয়ে যায়। যেটাকে চেপে ধরার, চেপে ধরে।
'বিজিত, এইজন্যেই আমি তোমার কথা শুনে অবাক হইনি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে মিকিকে নিয়ে আমরা কী করব? ওকে কি দুনিয়ার সামনে বার করে দেব? ভেবে দ্যাখো, সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দুজনে পৃথিবীবিখ্যাত হয়ে যাব। কিন্তু তারপর মিকির কী হবে জানি না। মিকির আত্মীয়স্বজনের কী হবে তাও জানি না।'
বিজিতদা কথাগুলো বলামাত্র আমার চোখের সামনে মিকির সরল নিষ্পাপ মুখটা ফুটে উঠল। পেমা, মঙ্গল, হাসি কিম্বা গেনিয়ার থেকে মিকি মনের দিক থেকে একটুও আলাদা নয়। হয়তো ওর চেহারাটা একটু আলাদা। হয়তো ওর এমন কিছু কিছু ক্ষমতা নেই যা পেমা বা হাসিদের আছে। যেমন মিকি কথা বলতে পারে না, মিকি দিনের বেলায় চোখে দেখতে পায় না। তেমনি আবার মিকিরও এমন কিছু ক্ষমতা রয়েছে যা ওদের নেই। কিন্তু তাতে কী আসে যায়?
মিকি তো ওদেরই মতন খেলা করে, ওদেরই মতন বিশ্ব সংসার ভুলে রঙিন বইয়ের পাতা উলটে যায়। হারিয়ে যাওয়া বাবা-মা-র জন্যে কাঁদে, নতুন মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায়। যে-কোনো মানবশিশুর মতনই মিকির সব কিছুতেই ভীষণ আগ্রহ। রাত্তিরে যখন পে-লোডার কিম্বা বুলডোজারগুলো কাজ করে তখন কতদিন দেখেছি পেমা, হাসি, গেনিয়াদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মিকিও হাঁ করে সেই বিরাট মেশিনগুলোর নড়াচড়া দেখছে।
জানি না মিকির রক্তের রং লাল না সবুজ। জানি না মিকির হৃদপিণ্ড বুকের বাঁদিকে না ডানদিকে। কিন্তু এইটুকু ভালো করেই জানি ও ঠিক একটা দশবছরের মানবশিশুর মতনই সরল, অভিমানী আর ওই বয়সের বাচ্চাদের থেকে শারীরিকভাবেও অনেক বেশি দুর্বল। যে কষ্ট পেমা বা হাসিরা সহ্য করতে পারে না, সে কষ্ট মিকিও সহ্য করতে পারবে না।
তাহলে কেন মিকিকে যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দেব? কেন ওকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাটাছেঁড়া করবে? কেন সিয়াং ভ্যালি তোলপাড় করে পাহাড়ের নীচ থেকে ওর সাব-টেরেনিয়ান আত্মীয়স্বজনকে তুলে আনা হবে? কেন? ওরা তো কোনোদিন মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি। বরং টিম সন্ডার্সের ডায়েরি থেকে একটা কথা পরিষ্কার, মানুষ না হয়েও ওরা মানুষের থেকে বেশি মানবিক।
মৃণালদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি ওনার চোখে চোখ রেখে বললাম, 'মৃণালদা, কাউকে কিছু বলব না। দরকার নেই বিখ্যাত হয়ে। মিকিকে আমরা ওর গুহাবাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসব। কালকেই। জানি কমলাভাবির খুব কষ্ট হবে। কিন্তু এছাড়া আর উপায় নেই।'
মৃণালদার মুখটা হাসিতে ভরে গেল। বললেন, ''জানতাম তুমি ঠিক এই কথাটাই বলবে। একদম আমার মনের কথা। চলো, তাহলে কাল সকালেই ওই প্লেন-ক্র্যাশের জায়গাটায় ওকে নিয়ে যাই, কেমন? তারপর দেখি কী হয়। আমার মনে হয় ওখানে একবার পৌঁছতে পারলে তারপর মিকি নিজেই নিজের বাড়ি চিনে নিতে পারবে।'
পারলাম না মিকিকে ওর বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। মিকি হারিয়ে গেল।
পরদিন সকালে আমি আর মৃণালদা ভানুভাইয়ের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখতে পেলাম বাড়ির সামনে বেশ কিছু মানুষের জটলা। বাড়ির দাওয়ার একদিকে বসে কমলাভাবি আকুল হয়ে কাঁদছে আর তাকে কয়েকজন প্রতিবেশী মহিলা সামলাবার চেষ্টা করছেন। আমাদের দেখে ভানুভাই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল। বলল, 'দেখুন সাহেব, কি সর্বনাশ হয়ে গেল। মিকি বেটাকে সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না।'
'খুঁজে পাচ্ছি না মানে?' মৃণালদা ধমকে উঠলেন। 'ভালো করে চারদিক দেখেছ?'
'দেখেছি স্যার।' কাঁচুমাচু মুখে বলল ভানুভাই। 'আমি আর কমলা প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। সেই পাঁচটা থেকেই ওকে খুঁজে যাচ্ছি। এখন সাড়ে এগারোটা বাজল। তারপর ফিসফিস করে বলল, আপনি তো জানেন, মিকি প্রায় সারা রাতই জেগে থাকে। কখনো কখনো বাইরের দাওয়াতে গিয়েও বসে। কিন্তু কখনোই পাঁচিলের ওপাশে যায় না। আজ কেন একা একা বেরিয়ে পড়ল?'
এইসব কথা যখন হচ্ছে তখনই এদিক ওদিক থেকে চার-পাঁচজনের এক একটা দল ফিরে আসছিল। বুঝলাম, ওরা ভানুভাইয়ের বন্ধুবান্ধব। একেকটা দল একেক দিকে মিকির খোঁজে দৌড়েছিল। সবক'টা দলই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল।
বাধ্য হয়েই আমরা রাজীব ছেত্রীর শরণাপন্ন হলাম। উনি এই প্রোজেক্টের সিকিউরিটি-অফিসার। একটা বাচ্চা হারিয়ে গেলে ওনাকে তো জানাতেই হবে।
রাজীব ছেত্রীকে মিকির হারিয়ে যাওয়ার কথা বললাম, কিন্তু ও যে আসলে কে তা বললাম না। সে কথা শুধু আমার আর মৃণালদার মধ্যেই রইল। আমরা চেয়েছিলাম, মিকি যেখানেই থাক, মানুষের পরিচয়েই থাক। তাতে ওর বিপদ কম হবে।
একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, রাজীব ছেত্রী মিকিকে খোঁজার ব্যাপারে চেষ্টার কোনো কসুর করেননি। আশেপাশের সমস্ত থানাকে ইনফর্ম করেছিলেন। সমস্ত রেল স্টেশন আর বাস-টার্মিনাস, এমনকী গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে অবধি মিকির বিবরণ দিয়ে বিজ্ঞাপন পড়ে গিয়েছিল। শুধু ওর ছবি কোথাও দেওয়া যায়নি, কারণ মিকির কোনো ছবি আমাদের কাছে ছিল না।
এতসব করেও কিন্তু কোনো ফল হল না। কেউ মিকির কোনো খবর দিতে পারল না। আমার আর মৃণালদার তো পাগল হয়ে যাবার মতন অবস্থা। আমার পক্ষে অবশ্য চিন্তা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। কারণ, তখন বাঁধের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এখানে বর্ষা নামে মে-মাসের শেষদিকে। আমাদের হিসেব ছিল এক-দু মাসের মধ্যে সিয়াং নদীর জলে রিজার্ভয়ার ভরে উঠবে। তারপরেই আগস্টের মাঝামাঝি উদ্বোধন হবে রাঙাবাড়ি হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্টের। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হচ্ছিল দিল্লিতে। আর আমরা প্রোজেক্টের কর্মীরা দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করে যাচ্ছিলাম, ডেট-লাইনের মধ্যে ড্যামের কাজ শেষ করার জন্যে।
সেইজন্যেই আমার ক্যাম্প ছেড়ে নড়ার উপায় ছিল না। মৃণালদা কিন্তু পুলিশের ওপর ভরসা না করে নিজেই বেরিয়ে পড়ছিলেন। একদিন, দুদিন, কখনো কখনো তিন-চার দিন বাইরে কাটিয়ে যখন ফিরে আসতেন তখন ওনার চেহারা দেখে ভয় লাগত। এত ক্লান্ত, এত বিধ্বস্ত লাগত ওনাকে যে, মনে হত একটু ধাক্কা দিলেই উনি মাটিতে পড়ে যাবেন। ফিরে এসে উনি আমাকে বলতেন, কোথায় কোথায় মিকিকে খুঁজে এলেন। শুধু আশেপাশের গ্রাম শহরগুলোতেই নয়, মিকির খোঁজে উনি সিয়াং ভ্যালির জঙ্গলও তোলপাড় করে ফেলেছিলেন—একাই।
আমি একদিন ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে বলেছিলাম, 'মৃণালদা, মিকি মনে হয় নিজের লোকেদের কাছেই ফিরে গেছে। ও আবার ওদের সেই মাটির নীচে সুড়ঙ্গ শহরে ঢুকে পড়েছে।'
মৃণালদা স্থিরদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বিজিত, শুধু অন্য গ্রহের জীব বলেই কি মিকিকে তুমি এত ক্ষমতাবান ভেবে ফেললে? তুমি জানো না, কমলাভাবির হাত না ধরে ও এই ক্যাম্প-সাইটের বাইরে কোথাও যেতে পারত না? কেমন করে ভাবলে যে, ও ওই ঘন জঙ্গল পেরিয়ে, একের পর এক খাদ, নদী, চোরাবালির জলা পেরিয়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারবে?'
আমি লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিয়েছিলাম। বলেছিলাম, 'স্যরি মৃনালদা।'
মিকি হারিয়ে যাবার পরে এইভাবে দুটো মাস কেটে গেল। তারমধ্যে ভানুভাই অনেকটা সামলে উঠেছিল, কিন্তু কমলাভাবির মুখের দিকে তাকানো যেত না। যখনই ক্যাম্পের সামনে দিয়ে যেতাম দেখতাম কমলাভাবি উদাসমুখে বাইরের উঠোনে বসে আছে। চোখে চোখ পড়লেই মনে হত বলছে—মিকিকে খুঁজে এনে দিন সাহেব, যেভাবেই হোক আমার মিকিকে খুঁজে এনে দিন। আমি মুখ নামিয়ে কোনোরকমে ভানুভাইয়ের ঘরটা পেরিয়ে চলে যেতাম। কিন্তু মৃণালদাকে এড়িয়ে যাব কেমন করে? তিনি তো আমার ঘরেই থাকেন।
মৃণালদার কষ্টটা মনে হত কমলাভাবির থেকে এক ফোঁটাও কম নয়। মিকিকে যেহেতু উনিই জঙ্গল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন সেইজন্যে ওনার বোধহয় নিজেকে অপরাধী মনে হত। মিকি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ওনার পড়াশোনা লেখালেখি সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যতক্ষণ ঘরে থাকতেন, ততক্ষণই গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকতেন।
এরকমই একদিন উনি হঠাৎ আমাকে জিগ্যেস করলেন, 'আচ্ছা বিজিত, মিকির অদ্ভুত ক্ষমতার কথা তুমি, আমি, কমলাভাবি আর ভানুভাইয়ের বাইরে আর কে জানে বলো তো?'
আমি বললাম, 'দেখুন মৃণালদা, মিকির সঙ্গে যে বাচ্চাগুলো খেলা করত, তারা সকলেই ওকে চোখ বেঁধে দৌড়তে দেখেছিল। কিন্তু ওই ব্যাপারটাকে কোনো আশ্চর্য ক্ষমতা বলে বোঝার মতন বুদ্ধি তো ওদের নেই।'
তারপরেই আমার একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল। বললাম, 'দাঁড়ান, দাঁড়ান। আরেকজন তো দেখেছিল। সে মিকিকে অন্ধকারের মধ্যে জিগ-স পাজল কমপ্লিট করতে দেখেছিল। সে মিকিকে বালির নীচে লুকিয়ে রাখা জিনিস খুঁজে আনতেও দেখেছিল। গোপেন টোপ্পো।'
'ঠিক, ঠিক তো!' উত্তেজনায় মৃণালদা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। বললেন, 'বিজিত, তুমি খেয়াল করেছ, মিকি হারিয়ে যাবার পর থেকে গোপেন টোপ্পোকে আর সাইটে দেখা যাচ্ছে না? চলো তো এক্ষুনি একবার তারকবাবুর কাছে গিয়ে জিগ্যেস করি, ওর ব্যাপারটা কী?'
স্টোর-ম্যানেজার তারক মিশ্রার কাছে সেই রাতেই আমরা দুজন গোপেনের খবর আনতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, ঠিকই। গোপেন টোপ্পো বেপাত্তা। আমাদের কোম্পানির কাছে ও কয়লার দাম বাবদ ছ না সাতহাজার টাকা পেত, সেটাও নিতে আসেনি। তারকবাবু ওর খোঁজে তিনসুকিয়ায় লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা খবর এনেছে, গোপেন যে ঘরটা ভাড়া নিয়ে থাকত সেটা ভাড়া মিটিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর ও কোথায় গেছে সে কথা কেউ জানে না।
তখনই আবার আমরা দুজন ছুটলাম সিকিউরিটি অফিসার রাজীব ছেত্রীর অফিসে। ওনাকে বললাম সব কথা। উনি সব শুনে বললেন, 'এ তো বড় তাজ্জব কি বাত! নিজের এরকম রমরমা ব্যবসা ছেড়ে একটা ইঁদুর-মার্কা বাচ্চাকে নিয়ে ভাগবে কেন গোপেন?'
কেন যে ভাগবে সে কথা তো আর ওনাকে বলতে পারছি না, কিন্তু বুঝতে পারছি আমরা দুজনেই।
কিছুক্ষণ গোঁফে তা দিয়ে রাজীব ছেত্রী আবার জিগ্যেস করলেন, 'গোপেনের অরিজিনাল বাড়ি কোথায় জানেন?'
মৃণালদা বললেন, 'তারক মিশ্রাজির কাছে শুনলাম মেঘালয়ের তুরায়।'
'ওরে বাবা। না মৃণালবাবু, এখন আমি মেঘালয়ে গিয়ে সার্চ শুরু করাতে পারব না। জানেন তো, আর বারোদিন পরেই আমাদের ড্যামের ইনগুরেশন? দুজন সেন্ট্রাল মিনিস্টার আসছেন। অরুণাচল প্রদেশের চিফ মিনিস্টারও আসতে পারেন। ওদিকে দিল্লি থেকে গোয়েন্দারা কেবলই খবর পাঠাচ্ছে— স্যাবোটেজ হতে পারে, স্যাবোটেজ হতে পারে। আমি যে কি চাপের মধ্যে আছি, তা আপনাদের বোঝাতে পারব না। আপনারা প্লিজ ইনগুরেশনটা মিটে যাওয়া অবধি আমাকে সময় দিন। তারপর আমি নিজেই মেঘালয়ে যাব।'
কিছুতেই ওনাকে রাজি করাতে পারলাম না। সিকিউরিটি অফিসারের অফিস থেকে আমাদের কোয়ার্টারে হতাশ হয়েই ফিরে এলাম। তবে ঘরে ফিরে বুঝতে পারলাম, আমি একাই হতাশ হয়েছি, মৃণালদা নন। কারণ মৃণালদা ওই অত রাতেই ওনার ছোট স্যুটকেসটা গোছাতে বসলেন।
আমি জিগ্যেস করলাম, 'কী ব্যাপার মৃণালদা?'
'কাল সকালের বাসে তিনসুকিয়া যাচ্ছি। ওখান থেকে তুরা।'
আমি বললাম, 'মৃণালদা, আপনি একা এভাবে যাবেন? মেঘালয়ের নোটরিয়াস কোল-মাফিয়াদের কথা তো আপনি জানেন। ওরা আপনাকে খুন করে ফেলবে।'
মৃণালদা কোনো জবাব না দিয়ে আলমারির ভেতর থেকে একটা সেমি অটোমেটিক লুগার রিভলভার বার করে এনে স্যুটকেসের জামাকাপড়ের তলায় ঢুকিয়ে রাখলেন। মৃণালদার যে ফায়ার আর্মস আছে, এক ছাদের নীচে থেকেও তা কোনোদিন বুঝতে পারিনি। অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। আমার মুখের অবস্থা দেখে মৃণালদা মুচকি হেসে বললেন, 'আমি গোঁসাই ঠিকই, তবে পুরোপুরি অহিংস নই।'
তারপর স্যুটকেসের ডালাটা চাবি দিয়ে বন্ধ করে বললেন, 'বিজিত, আমি একটা কথা ভেবে দেখলাম। মিকিকে খুঁজে বার করার ব্যাপারটা আমাদের হাতে রাখাই একদিক দিয়ে ভালো। তোমার কি মনে হয়, পুলিশ যদি একটা হারানো বাচ্চাকে খুঁজে বার করে তাহলে বাবা-মা ছাড়া অন্য কারুর হাতে সেই বাচ্চাকে তুলে দেবে? তাছাড়া মেডিকাল-এগজামিনেশন তো হবেই হবে। তখনই মিকি কাগজের হেড-লাইন হযে যাবে।''
আমি বললাম, 'সবই তো ঠিক আছে মৃণালদা। কিন্তু আমি এখন আপনার সঙ্গে যাই কেমন করে?'
মৃণালদা বললেন, 'তোমাকে যেতে হবে না। তুমি এখানেই থাকো। যদি আমি কোনো বিপদে পড়ি তাহলে তুমি আমাকে সাপোর্ট দিতে পারবে। দুজনে একসঙ্গে বিপদের মুখে গিয়ে পড়ার কোনো মানে হয় না।'
মৃণালদা পরদিন ভোরবেলায় মিকির খোঁজে বেরিয়ে গেলেন। আমার হাত দিয়ে অফিসে একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে গেলেন, বাবা খুব অসুস্থ, তাঁকে দেখতে শিলিগুড়ি যাচ্ছেন বলে। আসল কথাটা জানলাম শুধু আমি।
মৃণালদা আর মিকিকে নিয়ে হাজারটা দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্যে সেই দিনগুলোতে আমি নিজেকে আরো বেশি করে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। মনে আছে, অমনই একদিন ড্যামের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম,বারুদ রঙের কালো মেঘে আকাশ ঢাকা। তার সামনে ওই অত উঁচু পাহাড়গুলোও যেন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার পায়ের নীচে সিয়াং ভ্যালি বর্ষার জল পেয়ে সবুজে সবুজ। কোথাও এতটুকু অন্য কোনো রং নেই। শুধু সবুজ প্লেটের ওপর পড়ে থাকা একটুকরো নুডলসের মতন এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে সিয়াং নদী।
দেখলাম, আমাদের ড্যামের সবক'টা স্লুইস-গেট বন্ধ। নদীর জল বেরোতে না পেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রের মতন বিশাল ওই রিজার্ভয়ারে। ভরে উঠছে রিজার্ভয়ার। একটু একটু করে বেড়ে উঠছে ওয়াটার-লেভেল। মনে মনে হাইড্রলিক-ইঞ্জিনিয়ারদের তারিফ করলাম। ওনাদের হিসেব নির্ভুল। মোটামুটি ওই ইনগুরেশনের সময়েই কানায় কানায় ভরে উঠবে রিজার্ভয়ার। তারপর কোনো এক ভি.আই.পি. সুইচ টিপে খুলে দেবেন সেই বিশাল ঢালু টানেলটার মুখ, যার মধ্যে দিয়ে প্রবলবেগে জলের তোড় আছড়ে পড়বে টারবাইনের ওপর। তৈরি হবে রাঙাবাড়ির প্রথম বিদ্যুৎ।
কিন্তু একইসঙ্গে আমি অন্য একটা কথাও ভাবছিলাম। কত শতাব্দী ধরে কে জানে, ওই ফাঁপা পাহাড়গুলোর পেটের মধ্যে বসতি গড়ে তুলেছে একদল এলিয়্যানস। ক'দিন পরেই রিজার্ভয়ারের জল বাড়তে বাড়তে ওই পাহাড়গুলোর পায়ের কাছে আছড়ে পড়বে। হয়তো হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করবে মাটির নীচের সুড়ঙ্গগুলোর মধ্যে। কী হবে তখন সেই দূর অতীতের নভোচারীদের? কী করবে তখন মিকির বাবা-মা ভাইবোনেরা? মিকিকেই বা তখন কোথায় ফিরিয়ে নিয়ে যাব?
সেদিনই বিকেলের দিকে অফিসে ফিরে একটা রেজিস্ট্রি-চিঠি পেলাম। খামের ওপরের লেখা দেখে বুঝলাম চিঠিটা পাঠিয়েছেন মৃণাল গোস্বামী, মেঘালয়ের জোয়াই বলে কোনো জায়গা থেকে। তখনই খামটা খুলে চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম :—
ভাই বিজিত,
যা বলার, হয়তো অফিসের ফোনেও তা বলতে পারতাম। কিন্তু ঠিক ভরসা পেলাম না। ছেত্রী সাহেবের কল্যাণে কোন ফোন যে কোথায় ট্যাপ করা হচ্ছে তা তো বলা যায় না। তার চেয়ে রেজিস্ট্রি-চিঠিই ভালো।
গোপেন টোপ্পো যে কয়লার ব্যবসা করে এটা কেন মাথায় ছিল না কে জানে! তার ওপরে আবার মেঘালয়ের কয়লা। জানো নিশ্চয়ই, দেশের অন্যত্র কয়লাখনিগুলো সরকার নিয়ে নিলেও, মেঘালয় নাগাল্যান্ডের মতন জায়গাগুলোতে এখনো জমি যার, জমির নীচের কয়লাও তার। আর সে কয়লার কোয়ালিটিও দারুণ। শুধু মাটি খুঁড়ে তোলো আর বিক্রি করে লাল হয়ে যাও।
সমস্যা একটাই—মাইলের পর মাইল ধু ধু ফাঁকা জমি কিম্বা ঘন জঙ্গলের নীচে ঠিক কোথায় যে কয়লার লেয়ার লুকিয়ে আছে সেটা খুঁজে বার করা। সরকারি ব্যাপার হলে সরকারি পয়সাতেই লোকলস্কর যন্ত্রপাতি লাগিয়ে খোঁজাখুঁজির কাজটা চালানো হয়। শুনেছি, অনেক সময় ওই কাজের জন্যে কোটি টাকা দামের মেশিন কাজে লাগানো হয়। সেই মেশিন মাটির নিচে শব্দ তরঙ্গ পাঠিয়ে তার রিফ্লেকশন থেকে বার করে কোথায় কয়লা আছে, কোথায় পেট্রোলিয়াম। যাকে বলা হয় seismik survey। কিন্তু নাগাল্যান্ড বা মেঘালয়ের একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে তো আর সেই মেশিন ভাড়া করা সম্ভব নয়।
গোপেন টোপ্পো তাদের জন্যে নিয়ে এসেছে জ্যান্ত মেশিন। জ্যান্ত এবং সস্তা। লোকে যেভাবে লরি ভাড়া খাটায়, কিম্বা ট্রাক্টর, ঠিক সেইভাবে গোপেন এখন মিকিকে ভাড়া খাটাচ্ছে। মিকি মাটির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে দিচ্ছে কোথায় মাটির নীচে কয়লা রয়েছে আর কোথায় শুধুই পাথর। তুমি জানো, এ কাজে মিকি কোনো ভুল করবে না।
এখানে আসার পর থেকেই আমি এক অলৌকিক বালকের খবর পাচ্ছিলাম। খবর পাচ্ছিলাম সেই বালকের পিতার। পিতার হাত ধরে সেই বালক হেঁটে চলে, আর মাত্র দু-হাজার টাকার বিনিময়ে বলে দেয় কার জমির নীচে কোথা থেকে কোথা অবধি কয়লার স্তর লুকিয়ে আছে। গত পাঁচদিন ধরে সেই খবরের পেছনে ঘুরে ঘুরে, আজ সকালে আমি দূর থেকে দেখলাম মিকি আর গোপেনকে।
বেচারা মিকি, ও তো কথা বলতে পারে না। তাই কোনোদিন কাউকে জানাতে পারবে না যে ও কিডন্যাপড হয়েছে।
গোপেন ভেকটা ভালোই ধরেছে। মিকিকে পরিয়েছে একটা লাল ধুতি আর হলুদ পাঞ্জাবি। গলায় ধুতরোর মালা, মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল। হাতে আবার একটা ছোট ত্রিশূল ধরিয়ে দিয়েছে। নিজেও পরেছে ওরকম একটা পোশাক। মানে, পুরো ব্যাপারটাকেই একটা অলৌকিকের ঘেরাটোপে ঢেকে দিয়েছে।
কিন্তু বিজিত, আমি স্পষ্ট দেখেছি, মিকির চোখে জলের দাগ। দেখেছি ও রোগা হয়ে গেছে খুব। হয়তো ওই হলুদ পাঞ্জাবি খুললে ওর পিঠে মারের দাগও দেখতে পাব।
মিকিকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার এই পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই বিজিত, কারণ ও এই পৃথিবীর কেউ নয়। গোপেনকে আজ রাতে আমি সেই কথাটাই ভালো করে বুঝিয়ে দেব।
গোপেনের ডেরায় সবসময় দুটো গুন্ডা পাহারা দেয়, কিন্তু ওরা আমাকে আটকাতে পারবে না। লুগার রিভলভারটা দিয়ে কয়েকবছর আগেও আমি বুলসআই হিট করেছি। মিকিকে নিয়ে আমি খুব শিগ্গিরি রাঙাবাড়িতে ফিরছি। তারপর ওখান থেকে সিয়াং ভ্যালির সেই পাহাড়ে, যেখানে পড়ে আছে টিম সন্ডার্সের প্লেন। তার আগে আমার ছুটি নেই। ভালো থেকো।
ইতি মৃণালদা।
মৃণালদার ওই চিঠি পাওয়ার পর থেকে আমার মনের অবস্থা যে কীরকম হয়েছিল তা তো বলে বোঝাতে হবে না। আমাদের সবার আদরের মিকি —সে ওইভাবে মাঠে ঘাটে রোদে জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে? রোদে বেরোলে মিকির যে কি কষ্ট হয় সে তো আমি জানি। কিন্তু মৃণালদার চিঠি পড়ে বুঝতে পারছি, গোপেন টোপ্পো ওকে রোদ্দুরের মধ্যে দিয়েই মাইলের পর মাইল টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কি কষ্টই না পাচ্ছে বেচারি মিকি! আর ওর সেই কষ্টের বদলে টাকা লুটছে গোপেন।
বোধহয় মিকির যন্ত্রণার কথা ভোলার জন্যেই আমি যত পারি কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। এরকমও হয়েছে চব্বিশঘণ্টার মধ্যে একবারও ঘরে ফিরিনি। শরীর যখন একেবারেই চলত না, তখন কোনো ডাম্পারের ড্রাইভারের সিটে শুয়ে এক-দুঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতাম। এই অমানুষিক পরিশ্রমের জন্যেই আমি তখন হঠাৎ করে সিনিয়র সুপারভাইজার জ্ঞান সিং সাহেবের চোখে পড়ে গিয়েছিলাম। উনি আমাকে খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন। বিশ্বাস করে এমন অনেক কথা আমাকে বলতেন যেসব কথা আমার সিনিয়ররাও জানতেন না।
এরকমই একদিন উনি আমাকে হাতের ইশারায় কনস্ট্রাকশন-সাইট থেকে ডেকে নিলেন। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন নদীর তীর ধরে দূরের মাঠটার দিকে। আমি তো অবাক। ওদিকে যে কোনো কাজ থাকতে পারে তা মাথায় ঢুকছিল না। যাই হোক, কোনো প্রশ্ন না করে ওনার পেছন পেছন চললাম।
বেশ খানিকটা যাওয়ার পর যখন চারিপাশে আর কোনো মানুষজনের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছিলাম না, তখন উনি হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি জিগ্যেস করলেন, 'আচ্ছা মজুমদার, তোমাকে যদি বলি এই ক্যাম্প অফিসে একজন বিশ্বাসঘাতক রয়েছে, একজন বিদেশি রাষ্ট্রের চর, যে এই ড্যামটাকে উড়িয়ে দিতে চাইছে—তাহলে তুমি কি তাকে খুঁজে বার করতে পারবে?'
আমি হতবাক হয়ে সিং সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু তারপরেই আমার মনে পড়ে গেল, সিকিউরিটি অফিসার রাজীব ছেত্রীর মুখে ঠিক এরকম কথাই শুনেছি।
আমি বললাম, 'হঠাৎ আমাকে এ কথা জিগ্যেস করছেন কেন স্যার?'
'মৃনাল গোস্বামী অ্যাকচুয়ালি কোথায় গেছেন?'—জ্ঞান সিং সাহেবের গলায় যেন মেঘ ডেকে উঠল।—'আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, উনি শিলিগুড়ি যাননি। ওনার বাবার অসুস্থ হওয়ার খবরটাও মিথ্যে। তুমি বলো মজুমদার, তোমাকে বলতেই হবে মৃণাল কোথায়?'
আমি বললাম, 'শুনুন স্যার, মৃণাল গোস্বামী কোথায় গেছেন তা আমি আপনাকে বলতে পারব না। কিন্তু একটা কথা আমি দায়িত্ব নিয়ে আপনাকে বলছি—উনি স্পাই নন। ওনাকে আমি নিজের ভাইয়ের চেয়েও ভালো করে জানি। উনি অন্য জগতের লোক।'
'বেশ!' সিং সাহেব জুতোর হিলের ওপর ভর দিয়ে চোঁ করে ঘুরে দাঁড়ালেন। 'তাহলে আমি তোমাকেই দায়িত্ব দিলাম—ফাইন্ড আউট দা ম্যান। দা স্পাই। আগামী তিনদিন তোমার আর অন্য কোনো কাজ নেই। তিনদিন বাদেই ইনগুরেশন। আমার কাছে আজ সকালেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা থেকে একটা সিক্রেট ইনফর্মেশন এসেছে—বর্ডারের ওপাশের ওই লোকগুলো ইনগুরেশনের সময় এই ড্যাম উড়িয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে। মিনিস্ট্রি থেকে এই প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেছিল। আমি হাতে-পায়ে ধরে থামিয়েছি। তার বদলে যেটা করিয়েছি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছ—আমার যতরকম ইনফ্লুয়েন্স আছে সমস্ত কাজে লাগিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের আরো তিন ব্যাটেলিয়ন জওয়ানকে আনিয়ে এখানে কাজে লাগিয়েছি।'
জ্ঞান সিং-এর এই কথাটা মিথ্যে নয়। গতকাল থেকেই আমাদের রাঙাবাড়ি কনস্ট্রাকশন সাইটের চেহারাটা দাঁড়িয়েছে ঠিক যুদ্ধক্ষেত্রের মতন। যেদিকেই তাকাচ্ছি দেখছি জলপাই রঙের উর্দি পরে হাতে মেশিনগান নিয়ে একজন জওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। বাউন্ডারি ওয়াল বরাবর লোক দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে। ড্যামের দেয়ালের ওপর যেখানে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে সেখানে বম্ব-স্কোয়াডের কুকুর আর মাইন-ডিটেক্টর নিয়ে টহল দিচ্ছে অন্তত ছ থেকে সাতজন লোক। আর এইসবের মধ্যেই রাজীব ছেত্রী তার জিপে চড়ে পুরো এলাকায় চরকিবাজির মতন পাক খেয়ে বেড়াচ্ছেন।
এতক্ষণ ভাবছিলাম, এসব বুঝি ভি. আই. পি.-দের আসার আগে স্বাভাবিক সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট। কিন্তু এখন সিং সাহেবের কথা শুনে বুঝলাম, এর পেছনে স্যাবোটেজের ভয় কাজ করছে।
যাই হোক, সিং সাহেবের ওই কথায় মনের মধ্যে কেমন যেন একটা জেদ চেপে গেল। একবারও ভাবলাম না আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার, গোয়েন্দা নই। এক্সপ্লোসিভ বলতে শুধু ডিনামাইটের স্টিক চোখে দেখেছি, আর কিছু নয়। মনে পড়ল না, এই সাইটের নব্বইভাগ লোক সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। আমি স্রেফ পায়ে হেঁটে সাইটের এদিক থেকে ওদিক ঘুরতে শুরু করলাম। যেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেই দেখতে পাব একদল কালো মুখোশ পরা লোক কোদাল আর গাঁইতি নিয়ে মাটি খুঁড়ে বারুদের পিপে লুকিয়ে রাখছে। সত্যি, এখন ভাবলে হাসি পায়।
কিন্তু ওইভাবে হাঁটতে হাঁটতেই তিনদিন পরে আমি ছড়িয়ে রাখা বিরাট একটা জালের এক কোনায় একটা সুতো দেখতে পেয়েছিলাম। সেই সুতোটা ধরে টানতে টানতে পুরো জালটা আমার হাতে উঠে এসেছিল। কপাল ছাড়া এটাকে আর কী বলব?
দিনটা এই প্রোজেক্টের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁরা কেউই বোধহয় ভুলবেন না, কারণ ওইদিনই এই প্রোজেক্টের উদ্বোধন হয়েছিল। পনেরোই অগাস্ট, উনিশশো চুরাশি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আমি দেখিনি, কিন্তু ওই দিনটাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আমারও আছে। স্মৃতিগুলো এখনো আমাকে জ্বালিয়ে খায়।
মূল-অনুষ্ঠান অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর হাতে টারবাইনের উদ্বোধনের সময় ঠিক করা ছিল সন্ধে সাতটায়। অনেক আলোচনা করেই এই সময়টা ঠিক করা হয়েছিল। আসলে রাঙাবাড়ি হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্টে তৈরি প্রথম বিদ্যুতের ছোঁয়ায় মিশকালো অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ চারিদিকের ঘরবাড়ি, টাউনশিপ, রাস্তার আলোর মালা সব ঝলমল করে উঠল—এই দৃশ্য তো রাত্তিরবেলা ছাড়া দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। সেইজন্যেই দিনের বদলে রাতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।
তার অনেক আগে, বিকেল সাড়ে চারটায়, হুটার বাজিয়ে আট ন'টা গাড়ির কনভয় এই টাউনশিপে ঢুকে পড়ল।
কনভয়টাকে দেখেছিলাম অনেক দূর থেকে। আমি তখন এই টিলার পায়ের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাবছিলাম, সেই চার বৌদ্ধ লামা কোথায় গেলেন, যাদের আজ দুপুরেই দেখেছিলাম কনস্ট্রাকশন সাইটের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে।
সত্যি, বেশ অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম দৃশ্যটা দেখে। যখন আইডেনটিটি কার্ড ছাড়া একটা মাছিকে অবধি ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না, তখন ওই চার সন্ন্যাসী কেমন অনায়াসে পাহারাদারদের বাধা-টাধা পেরিয়ে ঢুকে পড়লেন! শুধু ঢুকেই পড়লেন না, নিশ্চিন্তমনে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন এই কনস্ট্রাকশনের সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গাটার দিকে, মানে টারবাইন হাউসের দিকে। আমি তখনই সিকিউরিটি অফিসার রাজীব ছেত্রীকে জিগ্যেস করেছিলাম—'এটা কেমন হল?'
রাজীব ছেত্রী মুখে বেশ বিরক্তি ফুটিয়ে জবাব দিয়েছিলেন, 'সন্ন্যাসীদেরও সন্দেহ করব? তাহলে মানুষ হয়ে জন্মেছি কেন?'
আমি নাছোড়বান্দার মতন বলেছিলাম, 'কিন্তু ওনাদের এখানে কী কাজ?'
'স্বস্ত্যয়ন' কথাটার সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে মিস্টার মজুমদার? যে কোনো শুভ কাজের আগে ঈশ্বরের আশীর্বাদ চেয়ে নিতে হয়। শুধু আমার নয়, এই ক্যাম্প-সাইটে যত লোক এত বছর ধরে কাজ করছে তাদের বিশ্বাসও তাই। তাদের অনুরোধেই আমাকে এই ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ওই চার লামা আসছেন আমাদের তাওয়াং মনাস্ট্রি থেকে। ওনারা এখন পূজাপাঠ করবেন যাতে এই ড্যাম চিরকাল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।'
আমি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু রাজীব ছেত্রী আমার মুখের ওপর জিপের ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
ঠিক আছে, লামারা না হয় পূজাপাঠ করলেন। কিন্তু তারপর তাঁদের কোথাও না কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে তো। অথচ গত দু-ঘণ্টা ধরে আমি ওই চারজনের টিকি, স্যরি, টুপিও তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম টারবাইন-হাউসের সামনেটায়। ওখানে এখন ভয়ঙ্কর ব্যস্ততা। একবার উঁকি দিয়ে দেখলাম, কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে সার দিয়ে বসে আছেন আমার সহকর্মীরা। না, এখানে ওই লামাদের খুঁজে লাভ নেই। ওঁরা এখানে থাকবেন না। তাহলে কোথায়? কোথায় থাকতে পারেন?
ঘড়ি দেখলাম, পাঁচটা বাজে। সন্ধে নেমে গেছে। বহুদূরে ড্যামের কংক্রিট-ওয়ালের ওপর থেকে দেশাত্মবোধক গানের ক্ষীণ সুর ভেসে আসছে। ওখানেই, ড্যামের ঠিক মাথায়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে। আর ঠিক দেড়ঘন্টা বাদে ওখানেই উপস্থিত হবেন মন্ত্রী, আমলা, সিকিউরিটি আর সংবাদমাধ্যমের লোক থেকে শুরু করে আমার গত তিনবছরের অনেক সহকর্মী। ওই ড্যামের ওপাশে এখন কানায় কানায় ভরা রিজার্ভয়ার আর এপাশে আমার পায়ের কাছে প্রায় শুকনো নদীখাত। আর দেড়ঘণ্টা বাদে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুইচ টেপার সঙ্গে সঙ্গে টানেলের বন্ধ মুখের গেট খুলে যাবে। রিজার্ভয়ারের জল টানেলের মধ্যে দিয়ে টারবাইন-রুমে আছড়ে পড়বে, ঘুরিয়ে দেবে প্রকান্ড টারবাইনের ব্লেডগুলোকে। তারপর টানেলের অন্যপ্রান্তের খোলামুখ দিয়ে সেই জল নদীর ডাউনস্ট্রিমে গিয়ে পড়বে।
প্রোজেক্টের ডায়াগ্রামটা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে যেন মনে পড়ে গেল জল বেরিয়ে যাওয়ার টানেলের খোলা মুখটার কথা। এতক্ষণ মনে পড়েনি কেন কে জানে? ওই জায়গাটাই তো এই মুহূর্তে রাঙাবাড়ির সবচেয়ে নির্জন জায়গা। ওখানে কারুর থাকার দরকার নেই, কারণ ওখানে কোনো মেশিনপত্রের ব্যাপার নেই। ওই টানেলের খোলা মুখের সামনে শুধু শূন্য নদীখাত, আর কিছুই নেই। আগামী দেড়ঘণ্টা লুকিয়ে থাকার পক্ষে ওটাই সবচেয়ে ভালো জায়গা।
আমি এক লাফে রিভারবেডে নেমে পড়লাম। তারপর বালি আর নুড়ির ওপর পা ফেলে যত জোরে পারা যায় হাঁটা লাগালাম জল বেরোনোর টানেলটার মুখটাকে লক্ষ করে। মিনিট দশেক বোধহয় লেগেছিল টানেলের খোলা মুখটার কাছে পৌঁছোতে।
গত কয়েকমাসে কতবার এসেছি এখানে। বলতে গেলে আমার চোখের সামনেই একটার পর একটা ইঁট গেঁথে, ইঞ্চি ইঞ্চি কংক্রিট ঢালাই করে ওই টানেল তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সব দিনগুলোতে আমার সঙ্গে ছিল শয়ে শয়ে লোক, মেশিনপত্র, ফ্লাড-লাইটের আলো। আজ এই অন্ধকার বর্ষার রাতে একা ওই তিনতলা বাড়ির সমান উঁচু টানেলের অন্ধকার মুখটার সামনে দাঁড়িয়ে আমার কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল। আমার মনে হল পৃথিবীর যত অশুভ শক্তি সব যেন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ওই টানেলটার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে।
ঠিক সেই সময়েই আকাশের এদিক থেকে ওদিক অবধি ছড়িয়ে গেল বিদ্যুতের নীল শেকড়। একবার নয় বার বার। আর সেই চোখ ধাঁধানো আলোয় আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম টানেলের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে চারজন লোক। চার লামা। তাদের মাথার ওই তিনকোনা টুপি আর গায়ের আলখাল্লা ভুল হবার নয়। ওদের হাতে আর প্রেয়ার-হুইল নেই, রয়েছে শাবল আর গাঁইতি। দুজনের কাঁধে তারের বান্ডিল। ওরা যদি লামা হয় আমি তাহলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
সবে চিৎকার করার জন্যে মুখটা হা করেছি, ঠিক তখনই কে যেন পেছন থেকে বলল, 'লামাদের ব্যাপারে আপনার কৌতূহলটা বড় বেশি মিস্টার মজুমদার। কী লাভ হল বলুন?'
ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম, গলাটা চিনতে ভুল করিনি। কর্নেল রাজীব ছেত্রী। ওনার হাতের রিভলভারটা আমার কপালের ঠিক মাঝ বরাবর তাগ করা রয়েছে। ট্রিগারের ওপর আঙুলটা আস্তে আস্তে চেপে বসছে। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
হঠাৎ রাজীব ছেত্রী বলে উঠলেন, 'নাঃ'। তারপরেই শুনলাম রিভলভারের সেফটিক্যাচটা যথাস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্লিক শব্দ। চোখ খুলে দেখলাম রাজীব ছেত্রী তার আগ্নেয়াস্ত্রটিকে আবার কোমরের খাপে ঢুকিয়ে রাখছেন।
'নাঃ', আবার বললেন রাজীব ছেত্রী। 'বড় শব্দ হয় এই যন্ত্রটা থেকে। এটাকে এখন ব্যবহার করা যাবে না। আর বুলেট খরচ করার দরকারই বা কী?'
খেয়াল করিনি কখন সেই চারটে লোক আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওদের মধ্যেই দুজন হঠাৎ আমার হাতদুটোকে মুচড়ে পিঠের কাছে চেপে ধরল। আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম। ওইটুকু চিৎকারে অবশ্য রাজীব ছেত্রীর কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ, নদীর এদিকে কোনো জনপ্রাণী নেই।
তারপর ওরা আমাকে টানেলের ভেতর টেনে নিয়ে গেল। আমাকে পিছমোড়া করে বাঁধল দেয়ালের গা থেকে বেরিয়ে আসা একটা লোহার আংটার সঙ্গে। ওদের কাছে দড়ি ছিল না, তাই আমাকে বাঁধবার জন্যে রাজীব ছেত্রী নিজের কোমরের সার্ভিস নাইফ দিয়ে একটা লোকের কাঁধে ঝোলানো তারের বান্ডিল থেকে বড় এক টুকরো তার কেটে নিলেন। এত যন্ত্রণার মধ্যেও আমি খেয়াল করলাম ওটা সাধারণ তার নয়, ডিটোনেটরের তার। যেরকম তার আমরা ডিনামাইট ব্লাস্টিং করানোর সময় ব্যবহার করি।
নকল লামাদের নিয়ে রাজীব ছেত্রী চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার নিস্তব্ধতার ভারী চাদরে ঢাকা পড়ে গেল রিভার-বেড আর টানেল। এতই জমাট সেই নিস্তব্ধতা যে আমি আমার রিস্ট-ওয়াচের টিকটিক শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। জানি অসম্ভব, তবু আমি প্রত্যেকটা শব্দের সঙ্গে একটা করে সেকেন্ড হিসেব করতে শুরু করলাম। ষাট সেকেন্ডে এক মিনিট। ষাট মিনিটে এক ঘণ্টা। ওরা যখন আমাকে টেনে হিঁচড়ে এখানে নিয়ে এল, তখন বোধহয় সাড়ে পাঁচটা বেজেছিল। তার মানে আর দেড় ঘণ্টাই আমার আয়ু।
মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছিলাম না। ভয় পাচ্ছিলাম মৃত্যু যন্ত্রণাকে। ঠিক সাতটার সময় মন্ত্রীমশাই সুইচে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশি রাশি হিম জল হু হু করে ছুটে আসবে এই টানেল দিয়ে। যে জলস্রোত একটা লোহার তৈরি বিশাল টারবাইনকে বাচ্চাদের হাতের চরকির মতন বাঁই বাঁই করে পাক খাইয়ে দিতে পারে, আমার শরীরটাকে নিয়ে সেই জলস্রোত কী করতে পারে ভেবে আমি আতঙ্কে পাগল হয়ে উঠলাম। আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম—কে আছ? বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও।
চিৎকার করতে করতে আমার গলা চিরে গেল। আমি হতাশ হয়ে আস্তে আস্তে মেঝের ওপরে বসে পড়লাম। লোহার আংটার সঙ্গে বেঁধে রাখা দুহাতের মধ্যে মুখ গুঁজে অপেক্ষা করতে লাগলাম সেই শেষ মুহূর্তটার জন্যে। সেকেন্ডের কাঁটার এক ঘর থেকে অন্য ঘরে পা ফেলার টিকটক শব্দে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছিল।
একটা ছোট্ট শরীর, একটা নরম শরীর, আমাকে হঠাৎ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আমি ভাবলাম স্বপ্ন। কিন্তু তারপরেই একেবারে কানের কাছে বেজে উঠল আমার খুব চেনা সেই কিচির-মিচির উল্লাসধ্বনি। মিকি আমার কাঁধের ওপরে থুতনি রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখে আনন্দ আর গর্ব একসঙ্গে খেলা করছে। আমাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, আমাকে খুঁজে বার করার গর্ব।
মৃণালদাও এগিয়ে এসে আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর ওনার রুক-স্যাক থেকে একটা ছুরি বার করে আমার হাতের বাঁধন কাটতে কাটতে বললেন, 'কি ভয়ই যে পেয়ে গিয়েছিলাম বিজিত, সে তোমাকে কী বলব? ক্যাম্প অফিসের কেউ দুপুরের পরে তোমাকে আর দ্যাখেনি। জ্ঞান সিংকে জিগ্যেস করলাম। উনি তো প্রথমে আমাকে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠলেন। বললেন, সে কি, আপনি ফিরে এসেছেন?
'আমি বললাম, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? চাকরির জায়গায় ফিরব না?
'উনি তখন আমার কাছে অনেক ক্ষমা-টমা চাইলেন। বললেন, আমার সম্বন্ধে উনি একেবারেই ভুল ধারণা করে বসেছিলেন। ওনার কাছেই শুনলাম, তুমি না কি স্পাইদের খোঁজে গত তিনদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছ। কিন্তু তাই বলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময়ও বাইরে থাকবে? অবিশ্বাস্য লাগল ব্যাপারটা। বুঝলাম, তুমি নিশ্চয়ই বড় রকমের কোনো বিপদে পড়েছ। মিকিকে কোথায় রেখে যাব? তাই ওকে সঙ্গে নিয়েই তোমায় খুঁজতে বেরোলাম।
'সারা কনস্ট্রাকশন-সাইট তন্ন তন্ন করেও যখন তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না, তখনই মিকি হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল। আমরা তখন পাওয়ার-হাউসের পেছন দিকে দাঁড়িয়েছিলাম। মিকি কেবলই ইশারা করে পায়ের নীচে দ্যাখায় আর আমার হাত ধরে টানে। প্রথমে তো অনেকক্ষণ বুঝতেই পারছিলাম না, ব্যাটা কী বলতে চাইছে। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল, আরে। এখান দিয়েই তো মাটির নীচের টানেলটা গেছে। তাহলে কি ওই টানেলের মধ্যেই তুমি কোনোভাবে আটকে পড়েছ? মিকির হাত ধরে রিভার-বেড বরাবর দৌড়োতে দৌড়োতে এসে তোমাকে এইখানে পড়ে থাকতে দেখলাম।'
আমার হাতের বাঁধন কাটা হয়ে গিয়েছিল। আমি, মৃণালদা আর মিকি যত তাড়াতাড়ি পারি টানেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে রিভার-বেডে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু ওখানেও থামলাম না, একেবারে নদীর পাড় বেয়ে উঁচু জায়গায় উঠে এলাম। কারণ, ড্যাম থেকে জল ছাড়া শুরু হলে এই শুকনো নদীখাতও আর শুকনো থাকবে না, হঠাৎ ছুটে আসা বন্যায় ভেসে যাবে।
টানেলের ঘন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে এই প্রথম আমি মিকির মুখ দেখতে পেলাম। শিউরে উঠলাম ওকে দেখে। এ কি চেহারা হয়েছে ওর? রোগা হয়ে গেছে খুব। চামড়া যেন পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ও-ও আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। যেন বলতে চাইছিল, আর আমাকে হারিয়ে যেতে দেবে না তো? আমাকে ভালো করে আগলে রাখবে তো?
আমি আর আবেগ চেপে রাখতে পারলাম না। ওই বালি-পাথরের ওপরেই হাঁটু মুড়ে বসে দুহাতে মিকির ভাল্লুকের মতন চুলে ঠাসা মাথাটা জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম। বললাম, 'না রে মিকি, আর তোকে হারিয়ে যেতে দেব না। আজ তুই না থাকলে আমিও তো একটু বাদেই হারিয়ে যেতাম, তাই না? তোকে এবার তোর বাবা মার কাছে ফেরত দিয়ে আসব।'
মিকি আমাদের সমস্ত কথা বুঝতে পারে। আমার কথা শুনে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু তারপরেই ও খুব চিন্তিত মুখে তাকাল সিয়াং ভ্যালির জঙ্গলের দিকে। মৃনালদা ফিসফিস করে বললেন, 'মিকির মতন বুদ্ধিমান বাচ্চা আমি আর দেখিনি বুঝলে? ও কেবলই আকার ইঙ্গিতে আমাকে বোঝাচ্ছে, ড্যামের জলে ওর আত্মীয়স্বজন সবাই ভেসে যাবে। তুমি বাবা-মার কথা বলা মাত্র ওর মনে সেই দুশ্চিন্তা ফিরে এসেছে। কিন্তু ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আগে বলো তো বিজিত, তোমাকে কারা এইভাবে মারতে চেয়েছিল।'
আমি মৃণালদাকে পুরো ঘটনাটাই খুলে বললাম। রাজীব ছেত্রী যে স্যাবোটেজ-চক্রের সঙ্গে জড়িত সে কথা শুনে মৃণালদা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যেই উনি আবার আগের সেই মৃণাল গোস্বামীর চেহারায় ফিরে এলেন—যে মৃণাল গোস্বামী কথার থেকে কাজে বেশি বিশ্বাস করেন।
ব্যাক-প্যাকটা এক ঝটকায় কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে মৃণালদা বললেন, 'চলো। আর একদম সময় নেই। আমি নিশ্চিত, ওরা ড্যাম উড়িয়ে দেবার কথাই ভাবছে। আর সত্যিই যদি তাই করে, তাহলে তার পক্ষে সন্ধে সাতটার থেকে ভালো সময় আর নেই?'
চলতে চলতেই মৃণালদা আমাকে বুঝিয়ে বললেন, ঠিক ইনগুরেশনের সময় যদি ড্যাম উড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মিডিয়ার দৌলতে সারা পৃথিবীর মানুষ দেখবে এক সর্বনাশের লাইভ-টেলিকাস্ট। দেখবে ভেঙে পড়া ড্যামের মধ্যে দিয়ে বিরাট এক জলস্তম্ভ স্লো-মোশনে এগিয়ে যাচ্ছে সমতলের দিকে।
দেখবে সেই জলস্তম্ভের মাথায় আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে শয়ে শয়ে মানুষের শরীর। খড়কুটোর মতন ভেসে যাচ্ছে তিল তিল করে বানিয়ে তোলা রাঙাবাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ইট কাঠ লোহার কনস্ট্রাকশন। হয়তো কাল সকালের মধ্যেই দেখতে পাবে সিয়াং-এর ডাউনস্ট্রিমে গড়ে ওঠা একটার পর একটা শহর গ্রামের ধ্বংসস্তূপ আর মৃতদেহের মিছিল। সারা দুনিয়ার কাছে ভারতের মাথা হেঁট করে দেওয়ার এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর কী আছে?
'ছবিটা বদলে দেওয়ার জন্যে আমাদের হাতে ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় রয়েছে। চলো বিজিত। মিকি, চল।'—মৃণালদা পাকা রাস্তায় উঠেই দৌড়োতে শুরু করলেন। পেছন পেছন আমি আর মিকি।
পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ড্যামের যেদিকে পাওয়ার হাউস, তার উল্টোদিকে। যেদিকে রিজার্ভয়ারের কালো জলের বুকে আরো কালো মেঘের ছায়া থম মেরে রয়েছে। মাথা তুলে দেখলাম প্রায় দেড়শো ফিট ওপরে ড্যামের কংক্রিট-ওয়ালের মাথায় সার সার আলো। ঠিক মাঝখানে চৌকোনা উজ্জ্বল আলোর টুকরোটাই অনুষ্ঠানের মঞ্চ। এখনো দেশাত্মবোধক গানের সুর ভেসে আসছে। আমি জানি আর ঠিক পনেরো মিনিট বাদে, মানে পৌনে সাতটায় টাউনশিপের গেস্ট হাউস থেকে ভি.আই.পি.-দের কনভয় সরাসরি এসে দাঁড়াবে ওই মঞ্চের সামনে। মঞ্চে আসন গ্রহণ করবেন অতিথিরা। শুরু হয়ে যাবে অনুষ্ঠান।
হঠাৎ মৃণালদার কথায় আমার চমক ভাঙল। মৃণালদা আমাকে জিগ্যেস করলেন, 'বিজিত, তুমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এটা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে। এই ড্যামের সবচেয়ে দুর্বল অংশ কোনটা? তোমাকে যদি একটা এক্সপ্লোসিভ রাখতে বলা হত, তুমি ঠিক কোথায় সেটাকে প্ল্যান্ট করতে?'
উত্তর দেওয়ার জন্যে আমাকে ভাবতে হল না। আমি বললাম, 'মৃণালদা, যতটা সম্ভব ওপরের দিকেই রাখতাম। কারণ ওপরের দিকে ড্যামের দেয়াল কম পুরু। কিন্তু কখনোই জলের লেভেলের ওপরে নয়। জলের নীচেই বোমা রাখতে হত।'
মৃনালদা বললেন, 'কেন? জলের নীচে কেন?'
আমি বললাম, এক নম্বর কারণটা তো নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। জলের লেভেলের ওপরে কোথাও যদি ড্যামের গায়ে ফাটল ধরে তাহলে তো আর রিজার্ভয়ারের জল সেখান দিয়ে বেরিয়ে যাবে না, তাই ফ্লাডও হবে না।
আর দুনম্বর কারণ?
'শক-ওয়েভ। জলের নীচে বিস্ফোরণ হলে যে বিরাট শক-ওয়েভ এসে ড্যামের দেয়ালের গায়ে ধাক্কা মারবে সেটা হাওয়ার মধ্যে বিস্ফোরণ হলে হবে না। ওই শক-ওয়েভের ধাক্কায় এমনকী পুরো ড্যামটাই ভেঙে পড়ে যেতে পারে।'
মৃণালদার গলায় এতক্ষণে হতাশার সুর ফুটে উঠতে দেখলাম। বিড়বিড় করে বললেন, 'এক কিলোমিটার লম্বা ড্যাম; তার পায়ের কাছে এক কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জল। এর মধ্যে ঠিক কোথায়, জলের কত গভীরে রাজীব ছেত্রী বোমা রেখে গেছে, কেমন করে বুঝব?'
হঠাৎ আমাদের দুজনেরই শার্টের কোনায় টান পড়ল। তাকিয়ে দেখি মিকি মহা উত্তেজিত ভঙ্গিতে আমাদের দুজনের জামা ধরে টানছে আর আঙুল তুলে দেখাচ্ছে পাড়ে বেঁধে রাখা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের একটা রাবার বোটের দিকে। ওই বোটটায় চড়েই সিকিউরিটির লোকেদের মাঝেমধ্যে রিজার্ভয়ারের জলে টহল দিতে দেখেছি।
মৃণালদার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, 'বিজিত, মিকি সব বুঝতে পেরেছে। ও বোমা খুঁজে বার করার দায়িত্ব নিচ্ছে। সত্যি, কেন যে ওর ক্ষমতার কথা বারবার ভুলে যাই কে জানে!'
আমরা তিনজন লাফিয়ে উঠলাম বোটের মধ্যে। দাঁড়ের ওপর মৃণালদার জোরালো হাতের কয়েকটা টানেই আমাদের নৌকা ড্যামের দেয়ালের কাছে পৌঁছে গেল। এবার দেয়াল বরাবর আমরা এ-পাড় থেকে ও-পাড়ের দিকে এগিয়ে চললাম। এর মধ্যেই কোনো এক জায়গায় নিশ্চয় রাজীব ছেত্রী আর তার লোকেরা বোমা লুকিয়ে রেখে গেছে। ঘড়ি দেখলাম, সাতটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি।
সাতটা বাজতে আঠেরো। মিকি উত্তেজিত হয়ে মুখে শব্দ করতে শুরু করল। বারবার হাত তুলে দেখাতে লাগল জলের ওপর একটা বিশেষ জায়গার দিকে।
সাতটা বাজতে ষোলো। মৃণালদা মিকির দেখানো জায়গাটার ওপরে বোটটাকে স্থির করে দাঁড় করালেন। আমি বোটের মেঝেতে রাখা লম্বা লগিটা তুলে নিলাম। এটা বোধহয় আর্মির লোকেরা বোটটাকে জেটির সঙ্গে লাগানোর কাজে ইউজ করে। তাই এটার মাথায় একটা বড় লোহার হুক লাগানো আছে। আমি হুকটাকে জলের নীচে ডুবিয়ে ধরে একটু নাড়তেই হুকের গায়ে তারের ছোঁয়া পেলাম। আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম—থ্রি চিয়ার্স ফর মিকি মাউস। হিপ হিপ...।
হঠাৎ টাউনশিপের দিক থেকে ভেসে আসা পরপর বিস্ফোরণের শব্দে আমার উল্লাস চাপা পড়ে গেল। অন্ধকার আকাশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল একটার পর একটা আলোর ফুল। মনে পড়ে গেল ভি.আই.পি.দের মঞ্চে ওঠার সময় আতশবাজি পোড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন জ্ঞান সিং সাহেব। ঘড়িতে এখন ঠিক পৌনে সাতটা। সেই আতশবাজি পোড়ানো শুরু হয়েছে। আলোয় আলো হয়ে উঠেছে রাঙাবাড়ির আকাশ।
যে কথা আমার মাথায় আসেনি সেটা মৃণালদার মাথায় এসেছিল। দাঁত কিড়মিড় করে উনি বলে ওঠলেন, 'ওঃ, গড। এইটাই বাকি ছিল।' আমি হুকের ডগায় তারটাকে টানতে টানতে মৃণালদার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। বললাম, 'কী হল?'
মৃণালদা হাতের মধ্যে ওনার সেই ভয়ঙ্কর লুগার রিভলভারটাকে ধরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন। আমার প্রশ্ন শুনে বললেন, 'বিজিত, উই আর ব্যাডলি এক্সপোজড। যারা বোমাটাকে এখানে রেখে গেছে, যারা বোমাটাকে ফাটানোর জন্যে ওই তীরের জঙ্গলের কোথাও ফিউজের সুইচে হাত রেখে অপেক্ষা করছে, তারা এই আতশবাজির আলোয় আমাদের পরিষ্কার দেখতেও পাচ্ছে। বিজিত, দে উইল রেজিস্ট আস।'
মৃণালদার কথা ভালো করে ফুরোনোর আগেই আরেকবার বাজির শব্দে কেঁপে উঠল রাঙাবাড়ির আকাশ। আরেকবার আমরা আলোয় ভেসে গেলাম। সেই বাজির শব্দের প্রতিধ্বনি পাহাড় থেকে পাহাড়ে ঘুরতেই ঘুরতেই তার সঙ্গে মিশে গেল আরো একটা ছোট্ট বিস্ফোরণের শব্দ।
আর কেউ নিশ্চয় সেই শব্দটাকে বাজির শব্দের থেকে আলাদা করে বুঝতেও পারল না। কিন্তু আমি আর মিকি পারলাম। কারণ, তার একটু আগেই নৌকার মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছেন মৃণালদা। তীর থেকে ছুটে আসা যে বুলেটটা মৃণালদার বুক ফুঁড়ে দিয়ে চলে গেল, সেটারই ফায়ারিং-এর শব্দ ছিল ওটা।
মৃণালদার উপুড় হয়ে পরার ওই ভঙ্গির মধ্যেই এমন কিছু ছিল যে আমি আর মিকি দুজনেই বুঝতে পারলাম মৃণালদার প্রাণটা বেরিয়ে গেল। আমরা দুজনেই আর্তনাদ করে উঠলাম।
এই প্রথম জানলাম, মিকিও আর্তনাদ করতে পারে। ঠিক মানুষেরই মতো।
আকাশের বাজিগুলো যেমন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল, তেমনই হঠাৎ করেই আবার নিভেও গেল। আবার অন্ধকারে ডুবে গেল রাঙাবাড়ি। ডুবে গেল পাহাড়, বন, আর সেই বিশাল লেক যার ওপরে মোচার খোলার মতন ছোট্ট নৌকায় আমরা ভাসছি। কিন্তু আমি জানতাম, এই স্বস্তি কয়েক মুহূর্তের জন্যে। আবার বাজি উঠবে আকাশে, আবার আলোয় ভেসে যাবে এই লেক, আর রাজীব ছেত্রী ঠিক পরপর দুবার তার বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দেবেন। একবার আমার জন্যে, আর একবার মিকির জন্যে। ওঁর মতন ক্র্যাক-শটের কাছে যে আমরা কত সহজ টার্গেট তার প্রমাণ আমাদের নৌকার খোলেই পড়ে রয়েছে। মৃণালদার মৃতদেহ।
একবার মনে হয়েছিল, রাজীব ছেত্রী গুলি না ছুড়ে এক্সপ্লোসিভের ফিউজে চাপ দিচ্ছেন না কেন? তাহলে তো সব কাজ একসঙ্গেই মিটে যায়। উত্তরটাও সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় এল। উনি আসলে মাহেন্দ্রক্ষণটুকুর জন্যে অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছেন, কখন ড্যামের দেয়ালের ওপর উঠে আসে মন্ত্রীদের কনভয় আর সাধারণ মানুষের ঢল। সেই সময়টুকু অবধি বোমাটা যাতে ঠিকঠাক থাকে সেটা নিশ্চিত করার জন্যেই উনি আমাদের খুন করবেন।
আমার চোখ পড়ল মৃনালদার শুয়ে থাকা শরীরটার দিকে। এই অন্ধকারেও বুঝতে পারলাম,ওনার শার্টের পিঠের কাছটা রক্তে লাল হয়ে গেছে। আমার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আমি এই সাময়িক অন্ধকারের সুযোগে প্রাণপণে হুকটাকে এদিক থেকে ওদিক ঘুরিয়ে খুঁজতে লাগলাম এক্সপ্লোসিভটাকে। হ্যাঁ, এই তো! এইতো কি যেন আটকালো হুকের মাথায়। একটা লোহার জাল। আমি জালটাকে টেনে তুলতে শুরু করলাম। উঃ, এ যে শেষ হয় না। কত গভীরে ডোবানো রয়েছে এই জালটা!
মিকি দেখলাম অদ্ভুত সাহস নিয়ে বৈঠা ধরে বসে আছে। ও বুঝতে পারছে নৌকাটাকে এখন এক জায়গায় স্থির রাখাটা খুব জরুরি। ও সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে।
জলের মধ্যে যে জালটাকে হালকা লাগছিল, জল থেকে একটু ওপরে উঠতেই বুঝলাম সেটা ভীষণ ভারী। সাধে কি আর চারজন সন্ন্যাসীর প্রয়োজন হয়েছিল এটাকে বয়ে আনতে? তবু দাঁতে দাঁত চেপে জাল গোটাতে থাকলাম। একটু বাদেই নৌকার কানার কাছে উঠে এল জালের মধ্যে শোয়ানো টর্পেডো আকারের বোমাটা। আর এক মিনিট সময় পেলেই ওটাকে নৌকার খোলের মধ্যে তুলে এনে ডিফিউজ করে দিতে পারি। কিন্তু সেই সময়টা বোধহয় আর পেলাম না। অনেক দূর থেকে সাইরেনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। তার মানে গেস্ট-হাউস থেকে রওনা হল ভি.আই.পি.-দের কনভয়। আর সেইসঙ্গেই দুম দাম শব্দ করে আকাশে উড়ে গেল আতশবাজির আরেকটা দঙ্গল। আতঙ্কে আমার হাত অসাড় হয়ে গেল।
আমি মিকির মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম ও চোখ বন্ধ করে কান পেতে রেখেছে পাড়ের পাহাড়ের দিকে। বুঝতে পারলাম ওর অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। আমি এগিয়ে আসা মৃত্যুকে শুধু অনুভব করছি, কিন্তু ও সেই মৃত্যুকে চোখে দেখতে পাচ্ছে। ওর বায়ো-সোনারের তরঙ্গ ছুটে যাচ্ছে ওই পাহাড়ের দিকে। ফিরে আসছে রাজীব ছেত্রীর ছবি বয়ে নিয়ে। ও হয়তো দেখতে পাচ্ছে, রাজীব ছেত্রী এই মুহূর্তে রাইফেলের সেফটি-ক্যাচ অন করলেন। এবার চোখের সামনে সাইট-টাকে একটু অ্যাডজাস্ট করলেন। ওনার আঙুলটা আস্তে আস্তে ট্রিগারের ওপর চেপে বসছে।
হঠাৎ মিকি গলায় এমন একটা আওয়াজ করে উঠল, যেটাকে খুশির প্রকাশ বলে চিনতে অসুবিধে হয় না। দেখলাম ও চোখ খুলে ফেলেছে। ও তাকিয়ে আছে পাড়ের ওই পাহাড়টার দিকে।
ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও ওদের দেখতে পেলাম। মিকির আত্মীয়দের। ওরা সার বেঁধে পাহাড়ের ওপর দিক থেকে দ্রুত পায়ে নেমে আসছে নীচের একটা ঝোপের দিকে। আকাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র ফানুসের ফ্যাকাশে আলোয় ওই দশ-বারোজন এলিয়্যানসের রোগা লম্বা শরীর, ওদের মাথার খুলির সঙ্গে চেপে বসে থাকা চুল, খাড়া কান সব কেমন যেন ভৌতিক লাগছিল।
একটু বাদেই ঝোপটার মধ্যে থেকে পর পর কয়েকবার মৃত্যুচিৎকার ভেসে এল।
সেই চিৎকার কানে যেতেই কেমন করে যেন আমার হাতের আঙুলে আবার সাড় ফিরে এল। আমি একটানে বোমাটাকে নৌকার খোলের ভেতরে তুলে ওটার গা থেকে তারের প্রান্তগুলোকে টান মেরে ছিঁড়ে ফেললাম। এতক্ষণ বাদে অবসাদ জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। নৌকার কানায় হেলান দিয়ে বসে পড়লাম।
ঠিক তখনই সপ্তমসুরে বেজে উঠল দেশাত্মবোধক গানের সুর। বর্ষার ভিজে হাওয়ার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল রাঙাবাড়ির আনাচে কানাচে। বনে বনে, পাহাড়ে পাহাড়ে। 'অ্যায় মেরে প্যারে বতন, অ্যায় মেরে বিছড়ে চমন, তুঝপে দিল কুরবান।' টারবাইন-হাউসের দিক থেকে ভেসে এল একশো কোটি ভ্রমরের ডানার গুণগুণানি আর চারিদিকের পাহাড়ি গ্রামগুলোয় একসঙ্গে দপ করে জ্বলে উঠল হাজার হাজার ইলেক্ট্রিক বাল্ব। রাঙাবাড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম সাফল্যের আলো।
আমি উঠে বসলাম। দাঁড় টেনে নৌকা বেয়ে নিয়ে চললাম পাড়ের দিকে। একসময় পাড়ে নৌকা লাগল। মিকি নৌকা থেকে লাফ মেরে নেমে ছুটতে লাগল তীর বরাবর সেইদিকে, যেদিক থেকে দুজন এলিয়ানস দৌড়ে আসছে। একজন নিশ্চয় ওর বাবা, আরেকজন মা। মিকি ওদের বুকে লাফিয়ে পড়ল।
অন্যদিক থেকেও ছুটে আসছিল কিছু লোক। আমাদের সিকিউরিটি গার্ডেরা। ওরা বোধহয় ড্যামের ওপর থেকেই দেখতে পেয়েছিল আমার নৌকাটাকে। ওরা স্যাবোটেজের ভয়ে বন্দুক উঁচিয়ে ধরে দৌড়ে আসছে। আমি চিৎকার করে ওদের বলতে চাইছিলাম—'আর ভয় নেই। আর ভয় নেই।' কিন্তু আমার মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বেরোচ্ছিল না।
আমি পাথরের মতন পাড়ের ওপর বসেছিলাম আর দেখছিলাম মিকিরা চলে যাচ্ছে। অন্ধকারের ভেতরে আরো ঘন অন্ধকার দিয়ে গড়া বারো-তেরোটা ছায়াশরীর। শুধু তাদের মধ্যে যে শরীরটা ছোট্ট সে যেন যেতে চাইছিল না। সে বারবার পিছিয়ে পড়ছিল। সে বারবার হাত নাড়ছিল আমার দিকে।
এইভাবেই ওরা অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
একটু পরে আর্মির লোকজন এসে পৌঁছোল। ওদের মধ্যে কয়েকজন নৌকার খোলের মধ্যে থেকে মৃণালদার মৃতদেহ আর সেই বিশাল বোমাটাকে ধরাধরি করে তীরে নিয়ে এল। আরো কয়েকজন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামিয়ে আনছিল রাজীব ছেত্রী আর চার বিদেশীর মৃতদেহ। আমাকেও ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন সেনা জওয়ান। তারা আমাকে কত কিছু জিগ্যেস করছিল, কিন্তু আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না। আমি তখনো পাগলের মতন বিড়বিড় করে বলছিলাম, 'যা, মিকি যা। অনেক কষ্ট করেছিস। এবার তুই তোর নিজের জায়গায় ফিরে যা। তুই যেন আর কাঁদিস না মিকি। আবার দেখা হবে তোর সঙ্গে। ঠিক দেখা হবে। আমি জানি।'
এইখানেই বিজিত মজুমদারের লেখা শেষ হয়েছে। কিন্তু স্যমন্তক পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, গল্পটা তখনো শেষ হয়নি। গল্পের শেষটা দেখবার জন্যেই বিজিত মজুমদার প্রত্যেকবছর রাঙাবাড়িতে ফিরে আসতেন। খুঁজে বেড়াতেন মিকিকে।
মনে হয় উনি সফল হননি। রাঙাবাড়ির ফাঁপা পাহাড়ের নীচে এলিয়্যানসদের যে শহর ছিল, সেই শহর ছেড়ে ওরা নিশ্চয় অনেক দূরে কোথাও চলে গিয়েছিল। সেরকম সম্ভাবনার কথা তো বিজিতবাবুর লেখার মধ্যেই রয়েছে। লেখার মধ্যেই একজায়গায় উনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন না, ড্যামের জলে সুড়ঙ্গগুলো ডুবে যাবে?
আজ এতদিন পরে মিকির নিজের গ্রহের মহাকাশযান রাঙাবাড়িতে ফিরে এসেছে। বিজিতবাবু সেই খবর জানতে পেরে আর বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি। উনি দৌড়ে এসেছেন ওনার অনেকদিনের পুরোনো এক বন্ধুকে সি-অফ করতে।
কিন্তু তারপর কী হল? উনি আর ফিরলেন না কেন? জঙ্গলে পথ হারালেন? না কি মিকি তার বন্ধুকে নিয়ে গেল নিজের দেশ দেখাতে?
এইসব ভাবতে ভাবতেই স্যমন্তক দেখল, আকাশ দিয়ে একটা নীল আলোর চাকা নিঃশব্দে উড়ে গেল। চোখের পলক ফেলার আগেই সেই ইউ এফ ও কোটি কোটি তারার ভিড়ে হারিয়ে গেল।
পাশ থেকে থাপাজি ফিসফিস করে বললেন, 'দেখলেন? দেখলেন সাহেব?'
স্যমন্তক বলল, 'দেখলাম। মিকি পৃথিবী ছেড়ে নিজেদের দেশে ফিরে গেল।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন