জহ্নু

সৈকত মুখোপাধ্যায়

প্রাণহীন পৃথিবীর পথে-পথে সেই নবীন কিশোর একা ঘুরে বেড়ায়, যার নাম জহ্নু।

জহ্নুর দীর্ঘ বাহুদুটি লম্বিত অবস্থায় তার জানু ছোঁয়। তার কটি থেকে কাঁধ অবধি শরীরের গঠন একটি উলটানো ত্রিভুজের মতন সুঠাম, সুন্দর। চাঁচর কেশের দু-একটি গুচ্ছ মরুভূমির হাওয়ায় উড়ে এসে পড়ে তার টানাটানা দুই চোখের ওপরে। হাত দিয়ে সেই অবাধ্য চুলের গুছিকে সরিয়ে দিয়ে জহ্নু রাতের আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকায়।

যে বাতাসে জলবাষ্পের একটি অনুও নেই, সেখানেই বুঝি দেখা সম্ভব তারাদের এমন পাগল-করা ঔজ্জ্বল্য। তারা নয়, যেন কোনো জাদুকরের কালো কিংখাবের আলখাল্লার ওপরে গাঁথা সোনা-রুপোর পদকের রাশি। সারারাত তারার আগুন দপদপ করে, ছটফট করে। হঠাৎ হঠাৎ উল্কা ছুটে যায় আকাশের এ মাথা থেকে ও মাথায়। মুগ্ধচোখে জহ্নু তাকিয়ে থাকে সেইসব স্পন্দন আর চলাচলের দিকে। স্পন্দন মানে প্রাণ। চলাচল মানে জীবন। এই পৃথিবীর পোড়ামাটিতে আর প্রাণ নেই, জীবন নেই। তাই কিশোর জহ্নু একটু প্রাণের ছোঁয়া পাবার জন্য সারারাত আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।

হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে ওঠে জহ্নু। সে আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে চারিপাশে তাকায়। কোথাও কি একটা শব্দ হল? কিট কিট কিট কিট কিট। সত্যিই কি কোনো কীট কি ওই শব্দের মধ্যে দিয়ে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে?

কোনো ফড়িং? কোনো মাছি?

আচ্ছা, ফড়িং কিম্বা মাছির মতন অত বিশাল কোনো জীবের প্রয়োজন নেই। ঘুনপোকা। সামান্য একটা ঘুনপোকাও যদি এই পোড়ামাটির গ্রহের বুকে ফিরে আসে! যদি কোনো শুকনো বৃক্ষের কন্দর থেকে কিট কিট কিট কিট শব্দে আবার ডেকে ওঠে সেই নগণ্যের থেকে নগণ্য প্রাণ!

জহ্নু তার পাথরের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ওই শব্দের উৎসের দিকে। তারপর হতাশ হয়ে নিজের কপালে করাঘাত করে। কোথায় প্রাণ, কোথায় পতঙ্গ? রাতের হাওয়ায় বালিয়াড়ির স্তূপ বেয়ে ছোট ছোট নুড়িপাথর গড়িয়ে পড়ছে আর তাদের পারস্পরিক সংঘাতে বেজে উঠছে ওই প্রতারক জপমালা।

জহ্নু আবার মাথা তুলে তাকায় আকাশের ঈশানকোণে এক রাশিচক্রের দিকে। অনেকটা মানুষের চোখের আকৃতির সেই নক্ষত্রসজ্জার ঠিক কেন্দ্রে চোখের মণির মতন উজ্জ্বল নীল তারাটির নাম ন্যগ্রোধ। ওই ন্যগ্রোধ গ্রহের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে হাহাকার করে ওঠে জহ্নু—

পিতা, আপনি আমাকে একা রেখে কেন চলে গেলেন ওই গ্রহে? আমার মনকেমন করে, বড় মনকেমন করে। আপনাকে একবার চোখের দেখা দেখার জন্যে প্রাণ কাঁদে আমার। ইচ্ছে করে, আবার সেই খেলাগুলো খেলি, যেগুলো আপনি আমার সঙ্গে খেলতেন। ইচ্ছে করে আবার সেই পুঁথির পাঠগুলি নিই, যে পাঠগুলি আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন।

পিতা, আমার বড় অসহায় লাগে। কত দিন, কত মাস, কত বছর আমি এই মৃত-পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। নগরীতে নগরীতে প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ, বন্দরে বন্দরে জীর্ণ মহাকাশযান। শুধু সৌরবিদ্যুতে চালিত স্বতঃশ্চল পথগুলি এখনো কোথাও-কোথাও নির্বোধের মতন ঘুরে চলেছে। ঘুরবেও, যতদিন তাদের তড়িৎকোষ নিঃশেষিত না হচ্ছে।

এই গ্রহে জীবিত প্রাণী বলতে আমি একা।

না, ভুল বললাম। আর রয়েছে বালি। সাদা, ধূসর, লাল, পিঙ্গল—নানা রঙের বালি, যা সারাদিন হাওয়ার সঙ্গে শিস দিয়ে ওড়ে। মনে হয় ওই বালুরাশিও জীবন্ত। আর সেইজন্যেই সে আমাকে সহ্য করতে পারে না। সে ভাবে, কেন এই জহ্নু আমাদের পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে?

সেই কারণেই বালি আমার সঙ্গে শত্রুতাসাধন করে।

ভাঙা প্রাসাদের ছাদ থেকে হঠাৎ গুপ্তঘাতকের মতন আমার কাঁধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লাল-বালির পাহাড়। প্রতি রাতে ঘুমের মধ্যে আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার চেষ্টা করে ওই জীবন্ত বালির স্তূপ। আমি ভোর হলে শরীরের ওপর থেকে বালি সরিয়ে পথে নামি। একদিন হয়তো আর ওই পাহাড়প্রমাণ বালি সরিয়ে জেগে ওঠার ক্ষমতা থাকবে না আমার। সেদিনও কি আপনি ওই দূরের তারায় বসে আপনার সন্তানের মৃত্যুদৃশ্য প্রত্যক্ষ করবেন পিতা?

আপনি কি আপনার কাঙ্খিত সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে না পারলে আমাকে আর দেখা দেবেন না? সেই কি আমার শাস্তি?

পিতা, আমি পারব। আমি পারব সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে। তখন আপনার অগ্নিময় রথে আপনি ন্যগ্রোধ গ্রহ থেকে ফিরে আসবেন। আবার আমাদের পিতাপুত্রে মিলন হবে।

আপনার কাছে করুণা চাইব না। এই নির্জন পৃথিবী থেকে আমার উদ্ধার আমি অর্জন করে নেব, পিতা।

সকাল হয়। জহ্নু সেইসব শুকিয়ে যাওয়া নদীখাতের তীর ধরে হাঁটে, যেখানে একদিন জল ছিল। এখন গভীর খাতের নীচ থেকে জলচর প্রাণীদের তীব্র শুভ্র কঙ্কাল রৌদ্রে ঝিলিক মারে।

একদিন এই গ্রহে মানুষ থাকত। শিশুমানুষেরা এইসব নদীর জলে সাঁতার কাটত। দৃশ্যটা কল্পনা করেই জহ্নুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। খাতের তীরে এক জায়গায় এখনো কিছু মুথাঘাসের শুকনো পাতা কুঁকড়ে রয়েছে। জহ্নু দুচোখে কৌতূহল নিয়ে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর কাঁধ থেকে খননের যন্ত্র নামিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে সেখানকার মাটি খুঁড়তে শুরু করে।

জহ্নু খননকার্যে পটু। তার খননের যন্ত্রগুলিও অসামান্য। মনে হয়, যন্ত্রগুলিরও নিজস্ব বোধশক্তি রয়েছে। দেখতে দেখতে মুথাঘাসের ঝোপ অদৃশ্য হয়ে, সেখানে জেগে ওঠে পাতালপ্রমাণ এক গহ্বর। কিন্তু সে গহ্বর শুধুই গহ্বর। শুধুই নুনের স্তর ছাড়িয়ে মাটি, মাটির স্তর ছাড়িয়ে শিলা। শিলার পরে শুধুই শিলা। আর কিছুই নেই।

পরবর্তী কোনো এক ঋতুতে জহ্নুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অন্য এক মহাদেশের শুকিয়ে যাওয়া এক হ্রদের কেন্দ্রে। সেদিন ভোরবেলায় জহ্নু ওখানে কুয়াশার মতন কিছু একটা দেখেছিল। নিশ্চয় চোখেরই ভুল, তবু কিছুটা আর্দ্রতা যেন দেখেছিল জহ্নু। জহ্নুর শক্তিশালী খনিত্র গুপ্তধনের খোঁজে হ্রদের শুকনো বুক খুঁড়ে নেমে যায় প্রায় পাতালে।

কিন্তু আবার ব্যর্থতা, আবারও হতাশা। খনিত্রের গায় উঠে আসে মানুষের প্রাচীন বসতির চিহ্ন, নৌকার কাঠামো, ধাতুর তৈরি মাছ ধরার সরঞ্জাম, এমনকী একটি স্বর্ণমুদ্রার কলস অবধি। শুধু গুপ্তধনেরই কোনো হদিশ মেলে না।

হতাশ জহ্নু উঠে দাঁড়ায়। আবার তার ভ্রমণ শুরু হয়। সেই ভ্রমণ উদ্দেশ্যহীন নয় মোটেই। মনে হয় সে এক এমন মানচিত্রকে অনুসরণ করে হেঁটে চলেছে যে মানচিত্র খালিচোখে দেখা যায় না। হয়তো সেই মানচিত্র অঙ্কিত রয়েছে জহ্নুর করোটির ভেতরে কোথাও। কিম্বা হৃদয়ে।

মনে হয় জহ্নুর নিজেরও ক্ষমতা নেই সেই পথ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার। তার ক্ষমতা নেই খনন বন্ধ করার। এক শাপভ্রষ্ট দেবদূতের মতন জহ্নু শুষ্ক পৃথিবীর এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পরিভ্রমণ করে।

সে যেখান দিয়ে চলে যায়, পিছনে ফেলে রেখে যায় গহ্বরের পর গহ্বর। এক অলৌকিক গুপ্তধন-সন্ধানীর অভ্রান্ত পদচিহ্ন।

বৎসর কেটে যায়, যুগ। জহ্নু এখনো একইরকম নবীন। তার দেহ নির্মেদ, চুল কৃষ্ণবর্ণ, চোখে কিশোরের অনুসন্ধিৎসা। তবু খুব খেয়াল করলে দেখা যায়, তার শরীরে কোথাও কোথাও যেন সময়ের ছাপ পড়েছে। তার ত্বক যেন আগের চেয়ে অনুজ্জ্বল। তার অঙ্গগুলি আর আগের মতন তড়িৎগতিতে নড়াচড়া করে না। গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে শিথিলতা।

জহ্নুর সেই অসামান্য খনন-যন্ত্রগুলিও যেন তাদের আগের ধার হারিয়েছে। এখন গুপ্তধনের খোঁজে যখন জহ্নু গহ্বর খনন করে, তখন আগের থেকে সময় লাগে অনেক বেশি।

এখনো জহ্নু প্রতিরাতে অন্তত একবারের জন্যেও ন্যগ্রোধ গ্রহের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে ভাবে, এ জন্মে আর নিঃসঙ্গতা বুঝি কাটল না আমার। গুপ্তধন বুঝি আর পেলাম না। পিতা বলেছিলেন, একমাত্র তোমার সেই গুপ্তধনই আমাদের পৃথিবীতে ফিরে আসার পথ তৈরি করতে পারে। কী জানি, কী সেই হেঁয়ালির মানে? এখনই বা পিতার অগ্নিরথের আসতে বাধা কোথায়?

সকাল হলেই জহ্নুর আর এসব চিন্তার অবকাশ থাকে না। অভিমানের জায়গা দখল করে নেয় তার অন্তর্গত মানচিত্র।

ধূসরের মধ্যে নীল ছোপ দিয়ে আঁকা সেই মানচিত্রের সমস্তটাই প্রায় অতিক্রম করে ফেলেছে জহ্নু। বাকি রয়েছে এমন একটুকরো জায়গা, যেখানে পার্থিব সভ্যতার আড়াই লক্ষ বছরের ইতিহাসে কোনোদিনই মানুষ বাস করেনি। জায়গাটা চিরকালই ছিল পাথুরে, বন্ধ্যা। আজও যেমন, আড়াইলক্ষ বছর আগেও তাই।

লাভ আছে কিছু?—মনে মনে ভাবল জহ্নু। তবু ভেতরের তাড়নায় সে পিঠ থেকে নামিয়ে নিল যন্ত্রের স্তূপ। গোঁওও গোঁওও শব্দ করে ঘুরে উঠল খনিত্রের হিরে-বসানো ফলা। পাথরের টুকরো আর আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।

যখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু তখন জহ্নু খুঁজে পেল গুপ্তধন। পাতাল গহ্বর থেকে ফোয়ারার মতন লাফ দিয়ে উঠে এলো স্নিগ্ধ, শীতল, সুপেয় জলের ধারা।

জহ্নুর মুখে এতদিনে হাসি ফুটল। ততক্ষণে ঈশান আকাশে ফুটে উঠেছে ন্যগ্রোধ। জহ্নু সেই জ্যোতিষ্কের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—পিতা, দেখতে পাচ্ছেন? দেখতে পাচ্ছেন পিতা? গুপ্তধন। গুপ্তধন খুঁজে বার করেছি আমি। এবার আপনি আসবেন তো? এবার আমাকে নিয়ে বসবাস করবেন তো এই পৃথিবীর বুকে?

বহুবছর পরে জহ্নুর মাথার ভেতরে কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ল তার পিতার কণ্ঠস্বর। ন্যগ্রোধ থেকে অদৃশ্য তরঙ্গ পরিবাহিত হয়ে, সেই স্বর ছড়িয়ে পড়ল জহ্নুর মস্তিষ্কের কোষে কোষে—আসব, সন্তান আমার। কিন্তু তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।

কেন? বিস্ময়ে গলায় স্বর ফুটছিল না জহ্নুর, যদিও সে জানে তাতে কিছু এসে যায় না। ক্ষীণ-কণ্ঠ তো বটেই, এমনকী তার প্রতিটি চিন্তাও তরঙ্গপ্রবাহিত হয়ে পিতার কাছে পৌঁছিয়ে যায়।

আবারও জহ্নু প্রশ্ন করল—কেন পিতা? দেখা হবে না কেন?

বহু আলোকবর্ষ পেরিয়ে এসেও পিতার গলার কঠোরতা ধারালো খনিত্রের মতন জহ্নুর বুকে বিঁধে গেল—কারণ, তুমি তখন আর থাকবে না, জহ্নু।

আমি...আমি কোথায় যাব? হয় এই পৃথিবী, নাহলে ন্যগ্রোধ। এছাড়া আর কোথাও যাবার কথা ছিল কি আমার?

কোনো উত্তর এল না। জহ্নু হঠাৎ বুঝতে পারল, তার সঙ্গে আর পিতার কোনো যোগাযোগ নেই। এতবছর ধরে জ্বলতে থাকা তার চোখের মণিদুটো হঠাৎই নিভে গেল। মাথার ভেতর থেকে মুছে গেল কতদিনের চেনা মানচিত্র। হাত থেকে খসে পড়ে গেল বহুবছরের সঙ্গী খনিত্রের বোঝা। প্রবল আতঙ্কে দিশাহারা জহ্নু চিৎকার করে ওঠে—পিতা! পিতাআআ! আপনি কোথায় পিতা? আমি চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন? কেন এত নৈঃশব্দ্য চারিদিকে? বালিঝড় কি থেমে গেল? আকাশে কি মেঘ ঘনাল?

সমস্ত ইন্দ্রিয় অসাড় হয়ে যাওয়ার পরেও জহ্নুর স্পর্শের অনুভূতি বেঁচে ছিল। মনে হয়, সেই বেঁচে থাকাটাও কারুর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্ধ-বধীর জহ্নু প্রবল ভয়ে দিশাহারা হয়ে এদিক ওদিক দৌড়োতে দৌড়োতে পায়ের নীচে শীতল স্পর্শ পেল। তার মনে হল এই গুপ্তধনের স্রোতে গা ডুবিয়ে বসে থাকলে হয়তো সমস্ত জ্বালা জুড়োয়। জহ্নু ধীরে ধীরে তিরতির করে বইতে থাকা জলধারাটির বুকের মধ্যে শুয়ে পড়ল।

তখনই ঘটে গেল এক আশ্চর্য ঘটনা। যেভাবে দোপাটিগাছের পাকা-ফল অজস্র টুকরোয় ফেটে গিয়ে চারিদিকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক সেইভাবে জহ্নুর শরীরটা পরতে পরতে ফেটে গিয়ে অজস্র বৃক্ষ, গুল্ম, লতা এবং ঔষধীর বীজ ছড়িয়ে পড়ল সেই সদ্যোজাত জলধারায় সিঞ্চিত কোমল মৃত্তিকার বুকে।

জলধারার টানে জহ্নুর কোমল কালো কেশের গুচ্ছটি শুধু আরো কতক্ষণ মরুভূমির ভিতর দিয়ে বয়ে চলল। সেই নওল কিশোরের চেনা শরীরের আর কিছুই রইল না।

গ্রহের নাম 'নিউ গ্রোথ'। নামটা পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে-যাওয়া মানুষদেরই দেওয়া—যারা পঞ্চাশবছর আগে ওখানে উপনিবেশ বানিয়েছিল। সেই উপনিবেশেরই এক কোণে ভারি ঝাঁ-চকচকে এক অবজার্ভেটরির ভেতরে সেই মুহূর্তে বসেছিলেন চারজন বৈজ্ঞানিক। একজন অতি বৃদ্ধ। বাকি তিনজন প্রৌঢ়। ওদের কথোপকথন শুনে বোঝা যাচ্ছিল, বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক হলেন শিক্ষক। বাকি তিনজন তাঁর ছাত্র।

এতক্ষণ তাঁরা চারজনেই একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন দেয়ালজোড়া ভিসিস্কোপটার দিকে। ত্রিমাত্রিক ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, মরুভূমির বুক ফুঁড়ে উঠে আসছে মাটির নীচের মিষ্টি জল আর জলের বুকে পড়ে আছে একটা ভাঙাচোরা অ্যান্ড্রয়েড রোবট। এতদিন রোবটটাকে মানুষের মতোই দেখতে ছিল। এখন অবশ্য শুধুই সেরামিক অ্যালয়ের কাঠামো আর কার্বন ন্যানো টিউবের ছেঁড়াখোঁড়া চামড়া।

তিনজন ছাত্রের মধ্যে একজন মন্তব্য করলেন, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি এখনো সত্যিই পৃথিবীর মাটির নীচে কোথাও জল থাকতে পারে। আপনি যে ভেবেছিলেন, এর জন্যেই আপনি জিনিয়াস, স্যার।

আরেকজন ছাত্র বলে উঠলেন, তাছাড়া স্যারের এই আইডিয়াটার কথাও ভাবো। যে ইনস্ট্রুমেন্ট জল খুঁজে বার করবে তাকে দিয়েই গাছের বীজ ছড়ানোর কাজটাও করিয়ে নেওয়া হবে। একটা দামি মেশিনের একটা কণাও যেন অপচয় না হয়।

তৃতীয়জন বললেন, আশা করা যায় এবার আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির এক কোণে আবার সবুজ পাতারা মাথা চাড়া দেবে। খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে তারা, ডেকে আনবে বর্ষার মেঘ। মাটির নীচের জলের ভাণ্ডার আবার ভর্তি হয়ে উঠবে।

হ্যাঁ। আমরা না পারি, আমাদের পরের জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা যেন একশো কি দুশো বছর পরে আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে। ওরা যেন পানীয় জলের অভাবে আর কষ্ট না পায়।

এরপর তিনজনেই একসঙ্গে উঠে এসে প্রবীণ শিক্ষকের সঙ্গে করমর্দন করলেন। ভিসিস্কোপটা কেউ ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছিল। অন্ধকার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সেই প্রবীণ বৈজ্ঞানিক অন্যমনস্কভাবে ওনাদের তিনজনের সঙ্গে হাত মেলালেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন জিগ্যেস করলেন—আপনার আনন্দ হচ্ছে না স্যার? এত বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট...

অ্যাঁ? যেন চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন সেই বৃদ্ধ। তারপর অল্প হেসে বললেন, না না। আনন্দ হচ্ছে। খুবই আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য কী জানো। ওই রোবটটার জন্যে বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত কষ্ট টের পাচ্ছি। আমিই ওর নাম রেখেছিলাম জহ্নু। ওকে শিখিয়েছিলাম আমাকে পিতা বলে ডাকতে।

জহ্নু খুব ভালোবাসত আমাকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%