মডেল চাঁদের খুদে ডাক্তার

সৈকত মুখোপাধ্যায়

আমার ভালোনাম অর্কপ্রভ মিত্র, ডাকনাম আকুল। ভারতী বিদ্যানিকেতনে ক্লাস এইটে পড়ি। সেকশন এ, রোলনম্বর থ্রি। আমার জীবনে একটা ভারি আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেছে। সেটাই তোমাদের বলছি। ব্যাপারটা এতই অদ্ভুত যে, তোমরা যদি বিশ্বাস না করো তো আমার কিছু বলবার নেই। সত্যিকথা বলতে কি গত দুদিনে আমার নিজের ঘরে যা-যা ঘটে গেল সেগুলো আমার নিজেরই এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।

চৌঠা নভেম্বর হচ্ছে আমাদের স্কুলের ফাউন্ডেশন-ডে, মানে ওইদিন স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেইজন্যে প্রতি বছর চৌঠা নভেম্বর আমরা ছাত্রছাত্রীরা নানা ধরনের অনুষ্ঠান করি। নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি সবই হয়। তবে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট হল সায়েন্স-এগজিবিশন। সন্ধে থেকে রাত অবধি ওই এগজিবিশন দেখবার জন্যে কত লোক যে আমাদের স্কুলে আসেন সে তোমাদের বলে বোঝাতে পারব না।

গত দুবছরে আমি ওই এগজিবিশনে দুটো মডেল জমা দিয়েছিলাম। একবার বানিয়েছিলাম অ্যান্টার্কটিকা। শ্বেতভাল্লুক, ইগলু, এসকিমো সবকিছু ছিল সেই মডেলে। আর গতবছর বানিয়েছিলাম উইন্ডমিল। সত্যিকারেই সেই ছোট্ট উইন্ডমিলের পাখা ঘুরছিল। তৈরি হচ্ছিল বিদ্যুত আর জ্বলে উঠছিল টুনিবাল্ব। দুটো মডেলই খুব প্রশংসা পেয়েছিল, আর সেইজন্যেই বোধহয় আমাদের সায়েন্স টিচার জয়দীপবাবুর নজরে পড়ে গিয়েছিলাম। কদিন আগে তিনি আমাকে টিচার্স রুমে ডেকে বললেন, কীরে অর্ক, এবার কিসের মডেল বানাচ্ছিস?

মাথার মধ্যে আইডিয়াটা আগে থেকেই ঘুরছিল। তাই সটান বলে দিলাম—স্যার, এবার আমি চাঁদের মডেল বানাব।

জয়দীপবাবুর ভুরু কুঁচকে গেল। তাই দেখে আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না স্যার। আমাদের এখান থেকে যেমন রুপোর থালার মতন চাঁদ দেখা যায়, সেরকম নয়। চাঁদের মাটিতে পা রেখে অ্যাস্ট্রোনটরা যেভাবে চাঁদকে দেখেন আমি সেইরকম একটা কিছু বানাব।

এইবার জয়দীপবাবুর চোখেমুখে কৌতূহল ফুটে উঠল। তিনি টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করলেন, তাই? একটু এক্সপ্লেন কর তো।

আমি উৎসাহ পেয়ে গড়গড় করে বলে চললাম, স্যার, পুরো মডেলটা জুড়েই থাকবে চাঁদের মাটি। এবড়ো খেবড়ো, বড় বড় পাথরে ভর্তি। কোথাও উল্কার ঘায়ে তৈরি গভীর খাদ, কোথাও পাহাড়। তারই মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে পৃথিবী থেকে পাঠানো রকেট আর এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবে একটা ছোট্ট জিপগাড়ির মতন চন্দ্রযান। সত্যি করেই ঘুরে বেড়াবে স্যার। আমি সেইভাবেই মডেলটা বানাব।

বাঃ! দারুণ হবে। বললেন জয়দীপবাবু। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, উনিও ওনার মনের চোখে মডেলটাকে দেখতে পাচ্ছেন। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, বুঝলি অর্ক, পারলে দু-একজন স্পেস-স্যুট পরা অ্যাস্ট্রোনট কে ওই চন্দ্রযানে বসিয়ে দিস।

আমি বললাম, নিশ্চয় দেব স্যার।

আর ব্যাকগ্রাউন্ডে এঁকে দিবি চাঁদের আকাশ। সেই আকাশের এক কোনায় পৃথিবীকে দেখা যাচ্ছে—আমাদের এই নীলগ্রহকে। ঠিক যেরকম চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে অ্যাস্ট্রোনটেরা দেখেন। ভালো হবে না?

আমি বললাম, দারুণ হবে স্যার।

তারপরেই তেড়েফুঁড়ে মডেল তৈরি করতে শুরু করে দিলাম।

না, একটু ভুল বললাম। গত দুবছরের মতন এবারে আর ঠিক অতটা মন দিয়ে কাজ করতে পারছিলাম না। মন কেবলই চলে যাচ্ছিল বোনটুর দিকে।

বোনটু আমার বোন। ডাকনাম বকুল। আকুলের বোন বকুল। কিন্তু আমি ওকে বোনটু বলেই ডাকি। বোনটু ক্লাস থ্রিতে পড়ে। এমনিতে খুব গুন্ডা আর নোখে খুব ধার। আমাকে প্রায়ই খিমচে দেয়। কিন্তু ভালোও বাসে খুব। কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি একটা চকলেট পায়, সেটাকেই হাতের মুঠোয় লুকিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে আসে। দাঁতে কামড়ে অর্ধেক করে আমাকে দিয়ে তবে নিজে খায়। আর তাছাড়া বোনটুই হল আমার একনম্বর চ্যালা। আমার সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্টগুলো ওর থেকে বেশি মন দিয়ে কেউ দেখে না। আমাকে ও প্রায় আইনস্টাইন কিম্বা স্টিফেন হকিং ভাবে।

বোনটুর সবথেকে বেশি উৎসাহ আমার মডেলগুলো নিয়ে। গত দুবারই যতক্ষণ আমি মডেল বানিয়েছি, ও পুরো সময়টাই চোখ গোলগোল করে আমার পাশে বসে থেকেছে। কম খাটিয়েছি নাকি ওকে? এই বোনটু, মায়ের কাছ থেকে কাঁচিটা নিয়ে আয়। বোনটু, শিগ্গিরি যা, বাবার সিগারেটের প্যাকেট থেকে রাংতা খুলে আন। এই নোংরা জলের বাটিটা বেসিন থেকে ধুয়ে নিয়ে আয়তো বোনটু। যখন যা বলেছি, বোনটু সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজটা করে দিয়েছে।

এবার আর বোনটু আমার পাশে নেই।

ওর খুব অসুখ, সারাক্ষণ মাথায় যন্ত্রণা হয়। সবে গতকালই বাইপাশের ধারে একটা বড় নার্সিং হোমে বোনটুকে ভর্তি করতে হয়েছে। কাল থেকে মা-তো সারাক্ষণই নার্সিং হোমে পড়ে রয়েছে। বাবাও রাতটুকু শুধু বাড়িতে ফিরেছিল। এখন কদিন এইভাবেই চলবে মনে হয়। এমনিতে তাতে কোনো অসুবিধে নেই, কারণ দাদু আর ঠাম্মা তো বাড়িতেই আছেন। ওনারাই আমার স্কুলে যাওয়ার সময় চানের জল গরম করে দেন। ভাত বেড়ে দেন। ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করিয়ে রাখেন। এমনকী মডেল তৈরির জন্যে যত মেটিরিয়াল দরকার সব দাদুই নিউ-মার্কেট থেকে কিনে এনে দিলেন।

তবু আমার অমন গুন্ডা বোনটা যদি মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকে তাহলে মনখারাপ হবে না, বলো? সেইজন্যেই এবারে যেন কিছুতেই আমার মডেল তৈরির কাজ এগোতে চাইছিল না।

এগজিবিশনের যখন আর মাত্র তিনদিন বাকি তখন আমার চাঁদের মাটি তৈরি শেষ হয়ে গেল। নিজের মুখে বলা বোধহয় ঠিক নয়, কিন্তু সত্যি বলছি—দারুণ হল। একদম ছবিতে যেমন দেখা যায়—সেই এবড়োখেবড়ো জমি, উল্কার গর্ত, ছোট ছোট পাহাড়—সব কিছু ছোট মাপে আমার মডেলে ধরা রইল। কিন্তু তখনো আসল জিনিসটাই যে তৈরি করা বাকি। কী বলো তো? স্পেস-ক্যাপসুল।

স্পেস-ক্যাপসুল মানে রকেটের ডগায় যে তিনকোনা চেম্বারটা থাকে,যেটার মধ্যে অ্যাস্ট্রোনটসরা বসে থাকেন—সেই ঘরটা। চাঁদে তো আর পুরো রকেটটা নামে না। আসল রকেট চাঁদকে ঘিরে আকাশে চক্কর খায়, আর রকেট থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে স্পেস-ক্যাপসুলটা নেমে আসে চাঁদের মাটিতে। তারপর অ্যাস্ট্রোনটসদের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে স্পেস-ক্যাপসুল আবার রকেটের মাথায় চেপে বসে। রকেট তখন সবশুদ্ধু পৃথিবীতে ফিরে আসে।

আমার ইচ্ছে ছিল, শুধু স্পেস-ক্যাপসুল নয়, স্পেস-ক্যাপসুলের পেট থেকে বেরিয়ে চাঁদের মাটিতে গুড়গুড় করে ঘুরে বেড়ায় যে স্পেশাল জিপগাড়ি, সেটাও বানাব। এমনকী ছোট ছোট অ্যাস্ট্রোনটসও বানাব—একদম স্পেস-স্যুট পরা অ্যাস্ট্রোনটস।

সেসব কিছুই এখনো হল না। আর কি হবে?

আমার কাজের ঘর কিম্বা ল্যাবরেটরিটা দোতলার ছাদের কোণে, যাকে বলে চিলেঘর। ওখানেই আমি পড়াশোনা করি। ওই ঘরেই আমার কম্পিউটার আর গল্পের বইয়ের আলমারিও রাখা আছে। অনেক ছোটবেলা থেকেই আমার ওখানে একা থাকার অভ্যেস। আমার ভয় করে না, বরং নিরিবিলি ঘরটায় ভালোই লাগে।

সেদিন রাত দশটা নাগাদ হঠাৎ ছাদের দিকে জানলার কাচে একটা বেগুনি আলোর আভা ফুটে উঠল। আলোটা প্রথমে বেশ জোরালো ছিল, কিন্তু আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সেটা নিস্তেজ হতে হতে নিভেও গেল। পুরো ঘটনাটা ঘটতে সময় লাগল বড় জোর পাঁচ সেকেন্ড।

আরো একটা জিনিস হল। কিছুক্ষণ ধরেই প্রেশার-কুকারের সিটির মতন একটা শব্দ আমার কানে আসছিল। বেগুনি আলোটা নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দটাও থেমে গেল।

দরজা খুলে ছাদে বেরিয়ে এলাম। টর্চের আলোয় একটু খোঁজাখুঁজি করতেই চোখে পড়ল এককোনায় কী যেন একটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, ছোট স্নো-এর কৌটোর সাইজের একটা চকচকে জিনিস। তার একটা দিক ছুঁচলো।

যদিও পাঁচদিন আগে কালিপুজো ছিল, তবু এখনো রাতের দিকে মাঝেমধ্যে কেউ কেউ আকাশে আতসবাজি ছাড়ে। জিনিসটাকে দেখে মনে হল, এটা ওরকমই কোনো ফেটে যাওয়া আতশবাজির খোল—আমাদের ছাদে এসে পড়েছে। একটা কিক মেরে বাজির খোলটাকে ডাস্টবিনের দিকে সরিয়ে দিতে গিয়েও হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল। ওটাকে হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সত্যি, একেই বোধহয় বলে ভাগ্য। জিনিসটার এমনই সাইজ আর শেপ যে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলে অনায়াসে আমার মডেলের স্পেস-ক্যাপসুল হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। আর তাহলে আমার কাজও হয়ে যায় অর্ধেক।

পরদিন ছিল রোববার। আমি সারাদিন বসে সেই বাজির খোল, মানে স্পেস-ক্যাপসুলটাকে চাঁদের মাটিতে ঠিকমতন ফিট করে দিলাম। একটা জিনিস অদ্ভুত লাগছিল। জিনিসটাকে যতবারই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম, দেখছিলাম ওটা যেন বেশ গরম হয়ে রয়েছে।

সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, অসংখ্য ডেঁয়ো পিপড়ে আমার মডেলের চারপাশে মরে পড়ে আছে। পিপড়েগুলো মডেলটার কাছে এসেছিলই বা কেন, আর মরলোই বা কেমন করে, ঠিক বুঝতে পারলাম না। যাই হোক, আমার কম্পিউটার পরিষ্কার করার ছোট বুরুশটা দিয়ে মডেলের ওপর থেকে পিঁপড়েগুলোকে সরিয়ে দিলাম। তারপর প্রতিদিনের মতন চানখাওয়া সেরে স্কুলে চলে গেলাম।

বিকেলে স্কুল থেকে বাড়িতে ঢুকেই বুঝতে পারলাম আবহাওয়া থমথমে। বাবা আর দাদু বারান্দায় দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছেন। দুজনেরই মুখ গম্ভীর। ঠাম্মা আমাকে দেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, উনি কাঁদছিলেন। আমি কোনোরকমে জুতোটা খুলেই আমাদের শোবার ঘরে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম বোনটু হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছে। ও এখন বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে। পাশে পাথরের মূর্তির মতন মা বসে আছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাবাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে বাবা?

বাবা আমাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল, বোনটুকে চেন্নাই নিয়ে যেতে হবে রে আকুল। এখানকার ডাক্তারবাবুরা কিছু করতে পারবেন না বলেছেন।

আমি জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে বোনটুর?

বাবা বলল, ওর মাথার মধ্যে এমন জায়গায় একটা টিউমার হয়েছে যেখানে অপারেশন করা যায় না। দেখা যাক, চেন্নাইয়ের হাসপাতালে কিছু করতে পারে কিনা।

হঠাৎ ঘরের মধ্যে বাঁশির মতন গলায় ডাক ভেসে এল—দাদামণি!

বোনটুর ঘুম ভেঙে গেছে। বোনটু আমায় ডাকছে। আমি দুই লাফে ঘরে ঢুকে পাগলের মতন ওকে জড়িয়ে ধরলাম। বোনটুও আমাকে রোগা রোগা দুটো হাতে জড়িয়ে ধরল। বুঝতে পারলাম টানা দশদিন আমাকে দেখতে না পেয়ে ওর কষ্ট আমার চেয়ে কিছু কম হয়নি। মা আমাদের ভাইবোনের পাগলামি দেখে হেসে ফেলল, আর অমনি আমারও মনে হল, দূর! এত চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।

জড়িয়ে ধরা হাতদুটো আমার গলা থেকে সরিয়ে বোনটু প্রথমেই জিগ্যেস করল, তোর মডেল বানানো হয়ে গেছে?

জানতাম, ঠিক এই কথাটাই ও বলবে। আমি মাথা চুলকে বললাম, হ্যাঁ, মানে ইয়ে, মানে একটু বাকি আছে।

বোনটু পাকা বুড়ির মতন চোখ পাকিয়ে বলল, কেন? এখনো বাকি আছে কেন? পরশু না তোর এগজিবিশন?

কেমন করে বলি, তোর চিন্তাতেই আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে নারে বোনটু। সেইজন্যেই আমি কাজ করতে পারছি না। চুপ করে ওর হাতটা ধরে বসে রইলাম। ও কী বুঝল কে জানে, বলল, দাদামণি। একবার মডেলটা নিয়ে আসবি? আমি দেখব।

আমি সঙ্গে সঙ্গে চিলেঘর থেকে মডেলটা নিয়ে এসে ওর পাশে রেখে দিলাম। মা বলল, আকুল, তুই একটু বোনের কাছে বসবি? আমি তোর জলখাবারটা তৈরি করে আনি।

আমি ঘাড় হেলিয়ে বললাম, যাও। আমি ওকে দেখছি।

বোনটু ততক্ষণে মডেলের মধ্যে ডুবে গেছে। বালিশে হেলান দিয়ে বসে মন দিয়ে সবকিছু দেখছে আর মাঝে মাঝেই বলছে কী সুন্দর! কী সুন্দর!

একটু বাদে ও বলল, সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে মাটির ওপর অ্যাস্ট্রোনটসদের পায়ের ছাপগুলো। এত ছোট ছোট ছাপ কেমন করে আঁকলি রে দাদামণি?

পায়ের ছাপ! আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। পায়ের ছাপ আবার কখন আঁকলাম? মডেলটা চোখের কাছে এনে ভালো করে দেখলাম। যা দেখলাম তাতে আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। স্পেস-ক্যাপসুলের আশেপাশে, চাঁদের কালচে মাটির ওপর, পরিষ্কার জুতোর ছাপ। এক-একটার সাইজ হবে এক-একটা মৌরি-লজেন্সের মতন। কিন্তু ওগুলো যে জুতোরই ছাপ তাতে সন্দেহ নেই।

মা ঘরে ঢুকে বলল, হাতমুখ ধুয়ে নে আকুল। ডিনার-টেবিলে তোর খাবার রেখে এসেছি। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, এইটুকু পরিশ্রমেই বোনটু নেতিয়ে পড়েছে। ওর চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছে। আমি মডেলটা বিছানার পাশের টেবিলে নামিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

সেই যে বেরোলাম, ঢুকলাম আবার রাত সাড়ে ন'টায়। কারণ, হাতমুখ ধুয়ে জলখাবার খেয়েই আমাকে চলে যেতে হয়েছিল ম্যাথসের ট্যুইশনে।

মনটা বোনের দিকেই পড়েছিল। তাই পিঠ থেকে ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে পা টিপে টিপে ঢুকে পড়লাম শোবার ঘরে। ঘরে তখন আর কেউ ছিল না। মা আর ঠাম্মার গলা পাচ্ছিলাম রান্নাঘরের দিক থেকে। ঘরের মধ্যে নীল নাইট-ল্যাম্প জ্বলছিল। মশারির মধ্যে পাশ ফিরে শুয়ে বোনটু ঘুমোচ্ছিল। তাই দেখে আমি পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ বোনটু একদম পরিষ্কার গলায় ডাক দিল—এই বদমাশ।

তার মানে মুখপুড়িটা ঘুমোয়নি। মটকা মেরে পড়ে আছে আর দেখছে আমি কী করি। আমি মশারিটা তুলে ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে দিলাম। বললাম, বদমাশ বলছিস কেন রে? কী করেছি?

তুই বলিসনি কেন, ওরকম অটোমেটিক জিপগাড়ি বানিয়েছিস?

কী আবোলতাবোল বকছিস? প্ল্যান ছিল বানানোর, কিন্তু সময় পেলাম কই?

বোনটু ফেঁসে করে উঠল। ইসস। একটু আগেই দেখলাম স্পেশ-ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে এসে গুড়গুড় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইটুকুনি ছোট্ট। পেনসিল কাটার কলের মতন দেখতে। একটু বাদে আবার স্পেস-ক্যাপসুলের ভেতর ঢুকে গেল। তুই বানাসনি তো ওটা কে বানিয়েছে? ভূতে?

আমি ওর কথার আর কোনো উত্তর না দিয়ে মডেলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নাইট-ল্যাম্পের অল্প আলোতেও দেখতে কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না—আমারই ছড়িয়ে দেওয়া কালো বালির ওপরে সরু সরু অজস্র গাড়ির টায়ারের দাগ। একটার ওপর আরেকটা। যেন একটাই গাড়ি, কোনদিকে যাবে বুঝতে না পেরে এদিকে-ওদিকে এলোমেলো ঘুরে বেরিয়েছে।

আমি আর কিছু বলার সময় পেলাম না। কারণ ঠিক তখনই বোনটু হঠাৎ 'আঃ' বলে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেই দুহাতে কপালটা টিপে শুয়ে পড়ল। আমিও চেঁচিয়ে উঠলাম, বাবা-মা শিগ্গির এসো, বোনটু কেমন করছে।

তারপর তো মহা হুলুস্থুল। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বোনটুকে নিয়ে মা আর বাবা রওনা হয়ে গেল বাইপাশের ধারে সেই হাসপাতালের দিকে। আমি একা শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, আমার বোনটা মরে যাবে না তো? আমিও তাহলে বাঁচব না। কিছুতেই বাঁচব না। আমার গালের ওপর দিয়ে কেবলি জল গড়িয়ে পড়ছিল। নিজেকে কত বোঝাচ্ছিলাম আমি ক্লাস এইটে পড়ি। বড় হয়ে গেছি। বড়দের কাঁদতে নেই। কিন্তু কী করব? চোখের জল কথা শুনছিল না।

ওইভাবেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। হঠাৎ কিড়কিড় করে একটা হালকা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দটা আসছিল পাশে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা মডেলটার দিক থেকে। আমি পাশ ফিরে দেখলাম, আমার সেই স্পেস-ক্যাপসুলের গায়ে বেগুনি আলো ঝলসে উঠছে। কিসের টানে যেন থরথর করে কাঁপছে পুরো স্পেস-ক্যাপসুলটা।

আমি বিছানা ছেড়ে মডেলটার পাশে গিয়ে বসলাম। তারপর ফিসফিস করে বললাম, তোমরা কারা আমি জানি না। কিন্তু তোমাদের কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। এই পৃথিবী তোমাদের দেশ নয়। তবু রকেট খারাপ হয়ে গেছে বলে তোমাদের এখানে বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে।

সেই রাগী রাগী বেগুনি আলোটার বদলে একটা স্নিগ্ধ গোলাপি আলোয় স্পেশ-ক্যাপসুলটা ভরে উঠল। কিড়কিড় করে আওয়াজটাও থেমে গেল। মনে হল ভেতর থেকে কারা যেন মন দিয়ে আমার কথা শুনছে।

আমি বললাম, আমার কাছে অনেক পুরোনো ট্র্যানজিসটার, ব্যাটারি, মাইক্রো-চিপস, সার্কিট এইসব রয়েছে। আমি তোমাদের সবকিছু এনে দিচ্ছি। তোমরা তাই দিয়ে নিশ্চয়ই তোমাদের এই স্পেসশিপকে সারিয়ে তুলতে পারবে।

দপদপ করে দুবার হলুদ আলো জ্বলে উঠল। ওরা আমার কথা বুঝতে পারছে।

আমি আবার বললাম, শোনো এলিয়্যানস। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভালোবাসি আমার বোনকে। ওর মাথার মধ্যে এমন জায়গায় একটা টিউমার হয়েছে যে আমাদের মানুষের যন্ত্রপাতি সেখানে পৌঁছচ্ছে না। কিন্তু তোমরা তো খুব ছোট। তোমাদের জুতোগুলো মৌরি-লজেন্সের মতন ছোট। ডেঁয়ো পিপড়েরা তোমাদের খেতে আসে। তোমাদের অপারেশনের যন্ত্রপাতি নিশ্চয়ই বোনটুর মাথার মধ্যে পৌঁছে যাবে।

হঠাৎ আমারই হাতে তৈরি সেই মডেলের আকাশে কান্নার মতন একটা শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। বোনটুর কষ্টে তাহলে আমি একাই কাঁদছি না! এলিয়্যানসরাও কাঁদছে!

বোনটুকে পরদিন হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন কিছু করার নেই। তার আগেই আমি আমার যত স্পেয়ার পার্টস সব সাজিয়ে রেখে এসেছিলাম মডেলের মাটিতে। ওরা তার মধ্যে কোন কোন জিনিস কাজে লাগিয়েছিল জানি না।

বাবা-মা অনেক রাত অবধি চেন্নাই যাবার জন্যে লাগেজ গুছিয়েছিল। কিন্তু আমার মন বলছিল তার দরকার হবে না। আর হলোও ঠিক তাই।

পরেরদিন ভোর না হতেই বোনটু ডেকে উঠল মা, মা! দাদামণি!

আমরা ধড়মড় করে উঠে বসলাম। মা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, কী হয়েছে সোনা? আবার কষ্ট হচ্ছে?

বোনটু বলল, না মা। আর একটুও কষ্ট নেই। আমার যন্ত্রণা একদম সেরে গেছে। শোন না দাদামণি। কি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম ছোট ছোট মানুষরা আমার কপালের ওপর দিয়ে হেটে বেড়াচ্ছে। তারপর তারা তোর ওই মডেলের স্পেস-ক্যাপসুলের দিকে...দাদামণি। তোর স্পেস-ক্যাপসুলটা কোথায় গেল? হঠাৎ উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল বোনটু।

না, নেই। আমিও দেখেছি। ছাদে কুড়িয়ে পাওয়া সেই স্নোয়ের কৌটোর মতন জিনিসটা আর নেই। আমার ছড়িয়ে দেওয়া কালো বালিগুলো পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে।

এবারে আমার আর এগজিবিশনে মডেল জমা দেওয়া হল না। তবে তার জন্যে একটুও দুঃখ নেই। বাবা একটু আগে হাসপাতাল থেকে বোনের সিটি স্ক্যানের প্লেট নিয়ে বাড়ি ফিরল। হাসতে হাসতে বলল, কী আশ্চর্য ব্যাপার ভাবো। বকুলের টিউমার একবারে হাওয়া।

এর পরেও কি দুঃখিত হয়ে বসে থাকা যায়?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%