সৈকত মুখোপাধ্যায়

ভালো নাম পঙ্কজলাল মিত্র। ডাকনাম পাঁকাল। পঙ্কজ মানে যদি পদ্মফুল হয় তাহলে সে নামটা পাঁকালকাকাকে একেবারেই মানায় না, কিন্তু ওনার ডাকনামটা ভয়ঙ্কর সার্থক। তার কারণ, পাঁকালকাকার গায়ের রং কুচকুচে কালো, শরীরটা রোগা হিলহিলে। মাথায় টাক, ভুরুতে চুল নেই এবং গোঁফদাড়ি যেটুকু আছে তা দেখলে চিনেম্যানেও লজ্জা পাবে। ওই চেহারায় যখন কাকা তার ঘন কালো চোখের মণিদুটো তুলে আমাদের মুখের দিকে তাকান, তখন মনে হয়, অবিকল একটি পাঁকাল মাছ যেন ডোবা-র কাদায় শুয়ে, গামছা হাতে বাচ্চা ছেলের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে—ধরবি আমাকে? আয়, চেষ্টা করে দ্যাখ। দ্যাখ, কেমন সুড়ুৎ করে সিলিপ কেটে পালাই।
হ্যাঁ, শুধু নামে কিম্বা চেহারায় নয়, স্বভাবেও পাঁকালকাকা ঠিক পাঁকাল মাছের মতন পিছল। ওনার পেছনে লাগার বহু চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি নিজের সম্পর্কে ওনার লম্বা-চওড়া কথাগুলো যে ডাঁহা গুল সেটা প্রমাণ করার। কিন্তু আজ অবধি সাকসেস পাইনি।
আমাদের পাড়ায় একটা পুরনো-আমলের লাইব্রেরি আছে। জমিদারদের প্রতিষ্ঠা করা লাইব্রেরি—নাম সারস্বত সম্মেলন। এককালে লাইব্রেরিটার খুব নামডাক ছিল, কিন্তু এখন জরাজীর্ণ দশা। পাঁকালকাকা ওই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। লাইব্রেরির পেছনে একটা ছোট ঘরে কাকা একাই থাকেন। ওনার তিনকূলে আর কেউ নেই। সারাদিন গল্পের বইয়ের মধ্যে বসে থাকেন বলেই কিনা জানি না, পাঁকালকাকা ভয়ঙ্কর বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারেন। সেই সব গুলগল্পের হিরো হচ্ছেন স্বয়ং শ্রীপঙ্কজলাল মিত্র।
ওনার মতে, ওনার ব্যবহৃত প্রত্যেকটি জিনিস হয় ঐতিহাসিক, নয় প্রাগৈতিহাসিক। ওনার পাঞ্জাবির বোতামগুলো নাকি ডায়নোসরের ডিমের খোলা দিয়ে বানানো, যদিও খালিচোখে আমরা পুরনো প্লাস্টিকের বোতামের সঙ্গে কোনো তফাত খুঁজে পাই না। যে ভাঙা পেতলের স্টোভটায় ওনাকে ভাত ফোটাতে দেখেছি সেটাতেই নাকি একসময়ে মাদাম কুরি পিচ-ব্লেন্ড জ্বাল দিয়ে রেডিয়াম বার করেছিলেন। একদিন বিশু বলে ফেলেছিল—এহে, পাঁকালকাকা! আপনার চশমার কাচটা তো দেখছি অনেকটা ফেটে গেছে। তাই শুনে পাঁকালকাকা গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, এটা কাচ নয়। বিশুদ্ধ অ্যাম্বার। অর্থাৎ ফসিল হয়ে যাওয়া গাছের আঠা। আর ফসিলে তো একটু ফাটাফুটি থাকবেই।
তাই শুনে আমরা আর দ্বিতীয় কথাটি বলার সাহস পাইনি।
তবে কাল সন্ধেবেলায় মনে হয়েছিল, এতদিনে বোধহয় পাঁকালকাকাকে একটু বেকায়দায় পেয়েছি।
তখন সাতটা বাজে। আমি, বিশু, শমী, আর পাপ্পু, আমরা এই চার বন্ধু ছাড়া লাইব্রেরিতে সেই মুহূর্তে আর কোনো মেম্বার ছিলেন না। পাঁকালকাকা বাঁহাতের মুঠোয় ধরে রাখা একটা সিগারেটে টান দিতে দিতে, ডান হাতে আমাদের বই ইস্যু করছিলেন। লাইব্রেরির মোটা খাতাটায় বইয়ের নাম, সিরিয়াল নম্বর এইসব লিখতে লিখতেই তিনি একটা টোকা মেরে সিগারেটের শেষ অংশটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলতে গেলেন, কিন্তু সেটা জানলার গরাদে ধাক্কা খেয়ে আবার ঘরের মধ্যেই এসে পড়ল। পাঁকালকাকা তাড়াতাড়ি উঠে টুকরোটাকে মেঝে থেকে কুড়িয়ে আবার বাইরের বাগানে ফেলে দিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসতে না বসতেই পাপ্পু কুটুশ করে একটু কথার চিমটি কেটে দিয়ে বলল—কাকা! আপনার কাছে মাদাম কুরির স্টোভ রয়েছে, ডায়নোসরের ডিমের বোতাম রয়েছে, আর একটা সামান্য অ্যাশট্রে রাখতে পারেননি? কোনদিন লাইব্রেরির মধ্যে অগ্নিকাণ্ড হয়ে যাবে যে।
ভেবেছিলাম কাকা উত্তর দিতে গিয়ে আমতা-আমতা করবেন। যে-জিনিস নেই, তাকে নিয়ে তো আর গল্প ফাঁদা যায় না। কিন্তু পাঁকালকাকা যে অন্য ধাতুতে তৈরি, সে-কথা বুঝতে তখনো আমাদের বাকি ছিল। উনি আমাদের হাতে-হাতে বইগুলো ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, 'রাখতে পারিনি' নয়, ইচ্ছে করেই রাখিনি। সেই শিসমপুরার ঘটনার পর থেকেই অ্যাশট্রে জিনিসটাকে ভীষণ ভয় পাই। অন্য কারুর টেবিলেও ওই জিনিস দেখলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
আমরা সকলেই বুঝলাম, পাঁকালমাছ আবার হড়কে পালাবার চেষ্টা করছে। তাই তাড়াহুড়ো করে বললাম, সেকি! কিসের ভয়? অ্যাশট্রে বার্স্ট করে কেউ কখনো মরেছে বলে তো শুনিনি। নাকি কসমপুরা না কী যেন বলছেন, সেখানে অ্যাশট্রে থেকে আপনার কাপড়ে আগুন লেগে গিয়েছিল?
পাঁকালকাকা তখুনি কোনো জবাব না দিয়ে ধীরেসুস্থে লাইব্রেরির দরজা-জানলা বন্ধ করলেন। তারপর বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ির সবচেয়ে উঁচু ধাপটায় বসে আরাম করে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, কসমপুরা নয়, শিসমপুরা। নাঃ, সেখানে আগুন-টাগুন কিছু লাগেনি। শুধু একটা আস্ত স্টেডিয়াম আর পাঁচজন লোক রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
যদিও সন্ধে পেরিয়ে গিয়েছিল, জানতাম এর পর বাড়িতে ঢুকলে আমাদের চারজনকেই প্রচণ্ড বকুনি খেতে হবে, তবু তখন আর শিসমপুরার ঘটনা না শুনে চলে যাওয়া যায় না। আমরা পাঁকালকাকার মুখোমুখি সিঁড়ির নীচের ধাপগুলোয় বসে পড়লাম। বললাম, আচ্ছা বেশ, শিসমপুরাই না হয় হল। কিন্তু সেটা কোথায়? আর স্টেডিয়াম ভ্যানিশের ব্যাপারটাই বা কী?
পাঁকালকাকা বলতে শুরু করলেন—
এসব নাইনটিন সেভেনটির কথা। মধ্যপ্রদেশের শিসমপুরায় ভারত-সরকারের একটা বন্ধ অভ্রখনি খুব সস্তায় লিজ নিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল ওখানেই একটা ব্যবসা শুরু করব।
অভ্রই যেখানে শেষ হয়ে গেছে, সেই খনিতে আবার কিসের ব্যবসা পাঁকালকাকা?—আমি জিগ্যেস করলাম।
পাপ্পুটা একটু বেশি ফক্কর। দুম করে বলে বসল, ওরকম খনির সুড়ঙ্গের মধ্যে অনেক বাদুড় থাকে। কাকা বোধহয় বাদুড়ের মাংস রপ্তানি করতেন।
পাঁকালকাকা উদাসমুখে বললেন, না। বাদুড়-টাদুড় কিছু নয়। সুড়ঙ্গের কথাটা অবশ্য ঠিকই বলেছিস। শিসমপুরার অভ্রখনির ভেতরে একটা কুড়ি কিলোমিটার লম্বা আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ ছিল। ওই সুড়ঙ্গে পার্টিকল-অ্যাকসিলারেটর বসিয়ে অ্যান্টি-ম্যাটার তৈরি করার প্ল্যান ছিল আমার। একটা ফ্রেঞ্চ মালটিন্যাশনালের সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে গিয়েছিল। যদি সস্তায় অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করে ওদের হাতে তুলে দিতে পারতাম, তাহলে ওরা আমাকে বছরে দশহাজার কোটি টাকা আর ভূমধ্যসাগরে একটা দ্বীপ দিতে রাজি ছিল। তাতেও অবশ্য ওদের লাভ থাকত অনেক। ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটারের কলিশনে যে অকল্পনীয় এনার্জি তৈরি হত, তার থেকে জলের দরে বিদ্যুৎ তৈরি করে বেচত কিনা।
আমাদের চারজনের গলা থেকেই একসঙ্গে একটা জোরালো আর্তনাদ বেরিয়ে এল। শমী বলল, পাঁকালকাকা, সবে দুহাজার-আট সালে ইউরোপের লার্জ হেড্রন কোলাইডার যে কাজটা শুরু করল, সেটা আপনি আরো আটত্রিশ বছর আগে...মধ্যপ্রদেশের একটা অভ্রখনিতে...না, মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে।
পাঁকালকাকা স্নেহমাখা গলায় বললেন, আমার পড়াশোনা বেশি দূর নয় ঠিকই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ব্যাপারে যে সময়ের থেকে পঞ্চাশবছর এগিয়ে থাকি, সেটা ভুলে যাস কেন বল তো শমী? যে মুহূর্তে খিদিরপুর ডকের বাইরে প্রফেসর আকিও মুরাকামির সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেই মুহূর্তেই স্থির করে ফেলেছি এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। বিশ্বের প্রথম অ্যান্টিম্যাটার ব্যাঙ্ক তৈরি হবে এইখানে, এই ইন্ডিয়ায়। আর সেই প্রোজেক্ট সুপারভাইজ করব আমি, শ্রীপঙ্কজলাল মিত্র।
আকিও মুরাকামি আবার কে? জিগ্যেস করতে বাধ্য হলাম।
সেকি! জানিস না? খুব অবাক গলায় বললেন পাঁকালকাকা। মুরাকামি ছিলেন জাপানের সবচেয়ে প্রতিভাবান পার্টিকল ফিজিসিস্ট, মানে কণা-বিজ্ঞানী। তবে খুব বেশিরকম প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে যা হয়, প্রফেসর মুরাকামির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। ওনার সমসাময়িক বৈজ্ঞানিকেরা ওনার কাজের ধরন বুঝতে না পেরে ওনাকে পাগল বলে প্রচার করে দিল। টোকিও মডার্ন ফিজিক্স ল্যাবরেটরির কর্তৃপক্ষও এমন অবিবেচক যে, সেই কথা বিশ্বাস করে প্রফেসর মুরাকামিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিল।
ওনার মাথাটা একটু খারাপ ছিল ঠিকই। নাহলে কিয়োটো বন্দর থেকে আর কোথাও না গিয়ে কলকাতার জাহাজেই বা উঠে বসবেন কেন? আমি যখন খিদিরপুর ডকের বাইরে ওনাকে চিনতে পেরে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম, তখন ওনার হাতে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে স্রেফ দেড়-কিলো জাপানি শুঁটকিমাছ আর পকেটে মাত্র দুশো ইয়েন। এছাড়া অতবড় বিজ্ঞানীর আর কোনো সম্বল নেই। ভাবতে পারিস? আমিই একটা ফুটপাথের হোটেলে ডাল-ভাত খাইয়ে ওনার প্রাণ বাঁচালাম। উনিও কথা দিলেন আমার জন্যে অ্যান্টিম্যাটার বানিয়ে দেবেন। তবে তার জন্যে অন্তত সতেরো কিলোমিটার লম্বা একটা সুড়ঙ্গ আর কম করে লাখ দশেক টাকার যন্ত্রপাতি চাই।
আমার পকেটে তখন ঠিক দশলাখ টাকাই পড়েছিল। তার আগের মাসেই অ্যাটলান্টিকের নীচে একটা খাদ থেকে কিছু সোনার 'নাগেট' তুলে এনেছিলাম, তারই দাম আর কি। অভ্রখনিটা আগেই একটা এক্সপিডিশনে গিয়ে দেখে এসেছিলাম। কাজেই ওই উনিশশো সত্তরের জানুয়ারি মাস থেকেই আমি, প্রফেসর মুরাকামি, আর আমাদের দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, কানাই আর ঝড়ু, ওই বন্ধ অভ্রখনির পাশেই একটা পরিত্যক্ত কোয়ার্টার সাফ-সুতরো করে নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। সারাদিন সুড়ঙ্গের মধ্যে তার খাটাই, ম্যাগনেট বসাই। যে কম্পিউটারটা প্রোটন পজিট্রন কলিশনের ব্যাপারটা মনিটর করবে, সেটা প্রফেসর মুরাকামি নিজেই বানিয়ে নিয়েছিলেন। সারাদিনের শেষে ফিরে আসি নিজেদের কোয়ার্টারে।
শমী এইখানে পাঁকালকাকার কথার মধ্যে বাধা দিয়ে বলে ফেলল, ইয়ে ...ওরকম একটা কম্পিউটার বানাতে লার্জ হেড্রন কোলাইডারের সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের পাঁচবছর লেগেছিল বলে শুনেছি।
পাঁকালকাকা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন, তাহলে বুঝতেই পারছিস, তারা সেরা ছিলেন না। সেরা ছিলেন প্রফেসর মুরাকামি। উনি বলেছিলেন, যে রিসার্চ-পেপারটার জন্যে ওনাকে পাগল বলে টোকিও-ল্যাবরেটরি থেকে বার করে দিয়েছিল, সেটাও নাকি ছিল যুগান্তকারী। উনি যে-কোনো জিনিসকে অবিশ্বাস্য রকমের ছোট করে ফেলার সূত্র ধরে দিয়েছিলেন ওই রিসার্চ-পেপারের মধ্যে। কিন্তু পৃথিবীর আর কোনো বৈজ্ঞানিক ওনার অঙ্কগুলো বুঝতেই পারেননি।
যাইহোক, শিসমপুরায় আমাদের কাজ খুব স্মুদলি শুরু হয়েছিল। মনে হয়েছিল পরের বছর জুলাইয়ের মধ্যে দশগ্রাম মতন অ্যান্টিম্যাটার বানিয়ে ফেলতে পারব, যার দাম ওই—দশহাজার কোটি টাকা।
কিন্তু সব গন্ডগোল হয়ে গেল মিথিলা দুসাদ, তার ছেলে মতিন দুসাদ আর মতিনের ক'টা বদমাশ সাঙ্গোপাঙ্গর জন্যে।
আমি একবার লুকিয়ে লুকিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখলাম। সাতটা কুড়ি বাজে। বাড়ি থেকে ফোন এল বলে। কিন্তু এদিকে পাঁকালকাকার গল্পে নতুন-নতুন ক্যারেকটার ঢুকছে। তাই বলেই ফেললাম, পাঁকালকাকা! অ্যাশট্রে আর কতদূর?
অ্যাশট্রে! ও,হ্যাঁ। আসলে পুরনোদিনের কথা বলতে গেলে মনটা যে কতদিকে চলে যায়। যা বলছিলাম। মিথিলা দুসাদ ছিল শিসমপুরার পঞ্চায়েতের মোড়ল। পুরোদস্তুর মাফিয়া ডন। ওর ইশারা না পেলে ওখানে গাছ থেকে একটা পাতাও খসে পড়ত না। বেআইনি অভ্র খাদান চালানো, জঙ্গলের চোরাই কাঠ পাচার করা, রেলের ওয়াগন ব্রেকিং সবরকমের বদ কাজের মাথা ছিল মিথিলা দুসাদ। তবে এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়, ও নিজে থাকত আড়ালে। দেখে কেউ বুঝতে পারবে না লোকটা কতবড় বদমাইশ। পরণে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, খাড়া নাকের নীচে মোটা গোঁফ। বিশাল চেহারা। সারাক্ষণ ডানহাতের আংটি-মোড়া আঙুলের ফাঁকে দামি সিগারেট জ্বলছে। কথাবার্তা আচার আচরণে খুব ভদ্র।
ওর হয়ে খুন জখম বোমাবাজি সবকিছুই করত ওর বড় ছেলে মতিন দুসাদ আর তার গ্যাং।
এই মতিন দুসাদ আর তার চ্যালা-চামুণ্ডারাই এমন একটা জায়গায় একটা স্টেডিয়াম বানাতে শুরু করল, যেটা একেবারে আমাদের মেইন অ্যাকসিলারেটরের মাথায়। ভাবিস না যেন ওরা খেলাধুলো ভালোবাসত। আসলে মিথিলা দুসাদ তার পঞ্চায়েত এলাকায় খেলাধুলার উন্নয়নের জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে কয়েক কোটি টাকার একটা গ্র্যান্ট পেয়েছিল। সেটাকেই যেভাবে হোক খরচা দেখিয়ে দেবার জন্যে সস্তায় একটা বিকট গোল স্ট্রাকচার বানাচ্ছিল। বাকি টাকা ওদের পকেটে যেত। কাজের সুপারভাইজ করছিল মতিন দুসাদ আর তার গ্যাং।
মুশকিল হল, ওরা যেখানে স্টেডিয়ামটাকে বানাচ্ছিল ঠিক সেইখান দিয়েই পাহাড় ফুঁড়ে আমাদের কেবল-লাইন বেরোবার কথা।
প্রথমে মতিনকে আমাদের সমস্যার কথা বললাম। সে তো পাত্তাই দিল না। তখন একদিন মিথিলা দুসাদের বাড়ি গেলাম।
বিনয়ের অবতার মিথিলা আমার সব কথাই মন দিয়ে শুনল। অজস্রবার কপালে হাত ঠেকিয়ে আমাকে প্রণামও করল। বলল, কত সৌভাগ্য যে আমার পঞ্চায়েত এলাকায় আপনাদের পায়ের ধুলো পড়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি জানেন স্যার? জনগণের কাজ বন্ধ করা যায় না।
আমি বাধা দিয়ে বললাম, বন্ধ করার কথা তো বলিনি দুসাদ সাহেব। বলছি, স্টেডিয়ামটাকে অন্য কোথাও বানান। শিসমপুরার চারিদিকে ফাঁকা জমির তো অভাব নেই।
না স্যার? বিশাল চেহারার মানুষটা দুদিকে ঘাড় নাড়ল। স্টেডিয়াম ওখানেই হবে। আপনারা অন্য কোথাও দিয়ে তার বার করুন।
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমাদের কোয়ার্টারের দিকে হাঁটা দিলাম। ওখানে যেতে গেলে স্টেডিয়ামের পাশ দিয়েই যেতে হয়। দেখলাম চাঁদের আলোয় স্টেডিয়ামের গোল স্ট্রাকচারটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইট আর কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এরপর চেয়ার বসবে, মাঠ তৈরি হবে। কিন্তু আমার পার্টিকল অ্যাকসিলারেটর আর তৈরি হবে না।
স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে আসার সময় ভেতর থেকে তুমুল হইহল্লার আওয়াজ পেলাম। অবাক হলাম না, কারণ জানতাম, প্রতি রাতেই মিথিলার ছেলে মতিন আর তার দলবল ওখানে ওই স্টেডিয়ামের ভেতরে আড্ডা জমায়। নেশাভাং করে, তাস খেলে। লোকের চোখের আড়ালে ওইসব নোংরা কাজ করার জন্যে অসমাপ্ত স্টেডিয়ামটা বেশ উপযুক্ত জায়গা।
ঘরের ভেতরে কম্পিউটারের সামনে বসে মন দিয়ে কাজ করছিলেন প্রফেসর মুরাকামি। আমাকে ঢুকতে দেখে মুখ তুলে তাকালেন। আমি হতাশভাবে দুদিকে মাথা নাড়লাম।
উনি হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, আমি একবার মতিনের সঙ্গে কথা বলে দেখি। আমি বিদেশি। হয়তো আমার কথা শুনতেও পারে।
আমারও মনে হল প্রফেসর মুরাকামির কথাটায় যুক্তি আছে। আমিও ওনার সঙ্গে স্টেডিয়ামে গেলাম। সাবধানে সিমেন্টের বস্তা, বালি, স্টোনচিপস, রড সবকিছু বাঁচিয়ে একসঙ্গেই ঢুকলাম স্টেডিয়ামের ভেতরে।
মতিন দুসাদ যে ঠিক কোনখানটায় বসে রয়েছে বুঝতে পারছিলাম না, যদিও ওদের গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম ঠিকই। আমরা চারিদিকে তাকালাম। আমাদের ঘিরে একটা বিরাট কুঁয়োর দেয়ালের মতন উঠে গেছে স্টেডিয়ামের স্ট্রাকচার। মাথার ওপরে জ্যোৎস্নায় ধোয়া আকাশের একটা গোল টুকরো দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ আমাদের পেছনের একটা ঘরের দরজা খুলে মতিন আর তার চার সঙ্গী বেরিয়ে এসে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়াল। বুঝতে পারছিলাম, ওরা সকলেই নেশায় চুর হয়ে রয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। জড়ানো গলায় মতিন জিগ্যেস করল, কেয়া হুয়া, এ বাংগালি? হুয়া কেয়া?
এত নোংরা ওর কথার ভঙ্গি যে মাথায় রক্ত চড়ে গেল। তবু যেহেতু মাথা গরম করলে কার্যসিদ্ধি হবে না, তাই নরম গলাতেই বললাম, ইনি বিখ্যাত জাপানি বৈজ্ঞানিক প্রফেসর মুরাকামি। আপনাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চান।
জাপানি? কিছুক্ষণ প্রফেসর মুরাকামির ছোটখাটো চেহারাটার দিকে তাকিয়ে থাকল মতিন। তারপর জিগ্যেস করল, ব্যাং খাও, ব্যাং?
তারপর নিজেদের রসিকতায় নিজেরাই হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল পাঁচ মাতাল।
অসামান্য প্রতিভাবান সেই বিজ্ঞানী শিসমপুরায় ছমাস কাটিয়েই ওখানকার স্থানীয় ভাষা শিখে নিয়েছিলেন? ওদের কথায় তাই প্রফেসর মুরাকামির ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল। তবু তিনি বেশ নম্রভাবেই বললেন, না, আমি নিরামিশাষী। কোনো মাংসই খাই না। তবে এখন আমি খাওয়ার কথা বলার জন্যে আসিনি। বলতে এসেছি আপনাদের এই ধোঁকাবাজির কারবারটা যদি অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়ে যান, তাহলে পৃথিবীটা এক ধাক্কায় অনেকটা উন্নত হয়ে যায়।
ধোঁকাবাজি? মতিনের চোখদুটো সরু হয়ে গেল। ধোঁকাবাজি কাকে বলছেন সাহেব? শিসমপুরার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায় উন্নতি করুক, সেটা আপনি চান না?
প্রফেসর মুরাকামি মতিনের চোখ থেকে চোখ না সরিয়ে জবাব দিলেন—আপনারাই তা চান না। যদি চাইতেন তাহলে শহরের কাছাকাছি কোথাও স্টেডিয়াম বানাতেন। দশ-কিলোমিটার দূরে এই পাহাড়ের মাথায় বানাতেন না। ভাবুন তো, ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা এখানে পৌঁছবে কেমন করে? খেলা তো অনেক দূরের কথা।
হঠাৎই মতিন দুসাদের মুড বদলে গেল। হাসতে হাসতে বলল, চিন্তা করবেন না জাপানি-সাহেব। এখানে খেলা হবে, স্পোর্টস হবে। জরুর হবে। আর আজকে আপনার মতন একজন বড় মাপের মানুষের হাতেই সেই খেলাধুলোর উদ্বোধন হবে। এই তিলুয়া! এই সর্বেশ!
আমি কিছু বলবার আগেই মতিন দুসাদের চোখের ইশারায় তার দুই শাগরেদ আমার রগের দুদিকে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মতিন দুসাদ প্রফেসর মুরাকামিকে বলল—নিন, স্যার শুরু করুন। দৌড় শুরু করুন এই স্টেডিয়াম ঘিরে। বেশি নয়, দশ-পাক। থামলেই এই বাংগালির বাচ্চার কপালে দানা পুরে দেব।
তারপর যেটা ঘটল সেটা ভাবলে আজও আমার বুকে যন্ত্রণা শুরু হয়। আমার অতিথি সেই বিদেশি বৈজ্ঞানিক, সেই আধপাগল বৃদ্ধ, একবার শুধু আমার মুখের দিকে চেয়ে দৌড়োতে শুরু করলেন। তখনো তো স্টেডিয়ামের জমিতে ঘাস গজায়নি। চারিদিকে বিল্ডিং মেটিরিয়ালের স্তূপ। পেরেক, কাচ, লোহা। উঁচুনিচু জমি আর পাথর। তার মধ্যে দিয়েই প্রফেসর মুরাকামি শুরু করলেন তাঁর দৌড়।
নিস্তব্ধ পৃথিবী। শুধু একটা পিউ কাঁহা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে উঠছিল। তারই মধ্যে প্রফেসর মুরাকামির জুতোর থপথপ শব্দটা দূর থেকে কাছে আসছিল, কাছ থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। উনি স্টেডিয়ামের সাতশো মিটার পরিধি ধরে দৌড়োচ্ছিলেন।
আড়াই পাকের পরে ওনার দৌড়টা আর দৌড় রইল না। রগের দু-পাশে ঠান্ডা নলের ছোঁয়া নিয়ে আমি দেখছিলাম উনি জোরে হাঁটছেন। চার পাকের পরে সেই জোরটাও হারিয়ে ফেললেন। তখনও উনি টলতে টলতে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
ততক্ষণে মতিন আর তার চ্যালাদের হাসিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওরাও অবাক হয়ে দেখছিল প্রফেসরের একগুঁয়ে আচরণ। পাঁচ পাকের মাথায় প্রফেসর হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর বৃদ্ধ শরীরটাকে কোনো রকমে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে চললেন স্টেডিয়ামের একদিক থেকে আরেকদিকে। কিন্তু পারলেন না। হঠাৎই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন ধুলোকাদার ওপরে।
আমিও আর পারলাম না, বুঝলি শমী। মাথার মধ্যে কী যে হয়ে গেল। দুহাতের ঝটকায় রিভলভার দুটো কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে গেলাম প্রফেসরের কাছে। কোলে করে তুলে নিলাম ওনার হালকা শরীরটা। তারপর আর কোনোদিকে না তাকিয়ে স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে হাঁটা লাগালাম আমাদের বাড়ির দিকে। কানাই আর ঝড়ু আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছিল। ওরাও হাত লাগাল। আমরা সবাই মিলে ধরাধরি করে প্রফেসরকে বাড়ি নিয়ে এলাম।
না, মতিন গুলি চালায়নি। ওরাও বোধহয় বুঝতে পেরেছিল, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। আফটার অল, প্রফেসর বিদেশী নাগরিক। তার ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে ওরা সহজে ছাড়া পেত না।
প্রফেসরের যখন জ্ঞান ফিরল তখন রাত্রি ন-টা বেজে গেছে। উনি চোখ খুলে তাকালেন। সেই দৃষ্টি আমি জীবনে ভুলব না। যেন একরাশ কালো আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোচ্ছিল ওনার ঘন কালো দুই চোখের তারার মধ্যে থেকে। উনি সটান উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হঠাৎ সেই চিরসঙ্গী ক্যাম্বিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দরজার দিকে এগোলেন। জানতাম ওটার মধ্যেই ওনার টোকিও বাসের সময়কার প্রিয় কিছু যন্ত্রপাতি থাকে।
আমি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন প্রফেসর?
উনি উত্তর দিলেন, তেমন কোথাও না। মাথাটা কেমন করছে। একটু ঠান্ডা হাওয়া লাগিয়ে আসি।
বললাম, ঝড়ু কিম্বা কানাই সঙ্গে যাক। আপনার শরীরের ওপর আজ অনেক ধকল গিয়েছে।
কোনো দরকার নেই। বেশি দূরে যাব না। আসলে আমি একটু একা থাকতে চাই। এই বলে প্রফেসর মুরাকামি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। আমিও আর কিছু বললাম না, কারণ, পাহাড়ের মাথায় এই জায়গাটায় বন্ধ অভ্রখনি, নির্মীয়মান স্টেডিয়াম আর আমাদের ওই কোয়ার্টার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। চোর-ডাকাতের দায় পড়েনি এদিকে আসতে।
প্রফেসর ফিরেও এলেন অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি। সব মিলিয়ে বোধহয় একঘণ্টা বাইরে ছিলেন। বাকি রাত আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
হয়তো আগের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলেই পরদিন ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। ড্রইং-রুমে বেরিয়ে এসে দেখি প্রফেসর দিব্যি খোশ মেজাজে একটা সিগারেট ধরিয়ে জানলার ধারে বসে বই পড়ছেন। সামনে চায়ের কাপ আর অ্যাশট্রে। আমাকে দেখে বললেন গুড মর্নিং মিস্টার মিত্র। সকালটা খুব সুন্দর, তাই না?
আমি ব্রাশে মাজন লাগাতে লাগাতে বললাম, হ্যাঁ, সুন্দর তো বটেই। তবে আমার এখন অনেক কাজ। সৌন্দর্য দেখবার সময় নেই।
প্রফেসর মুচকি হেসে বললেন, কেন কেন? কাজ কেন?
আমি বললাম, ডেরাডান্ডা গোটাতে হবে না? যত কিছু জড়ো করেছিলাম সব আবার খুলে, প্যাক করে, কলকাতায় ফিরতে হবে না? লাখ-দশেক টাকা জলে গেল।
কেন? অ্যান্টিম্যাটারের দরকার নেই?
উত্তর দিলাম, কাল যা হয়ে গেল তারপর এখানে আর একমুহূর্ত থাকতে আমার মন চাইছে না প্রফেসর।
প্রফেসর মুরাকামি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলা হল না। কারণ, ঠিক সেই মুহূর্তে এক বিকট ধাক্কায় আমাদের কোয়ার্টারের সামনের দরজাটা প্রায় উড়িয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল মিথিলা দুসাদ। তার চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। এদিক ওদিক তাকিয়ে সে সোজা প্রফেসর মুরাকামির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাজ পড়ার মতন গলায় প্রশ্ন করল, স্টেডিয়ামটা কোথায় গেল সাহেব? আমার ছেলে মতিন আর তার বন্ধুরা কোথায় গেল?
এমন অদ্ভুত প্রশ্ন আমি জীবনে শুনিনি। ছেলে আর তার বন্ধুরা রাতে বাড়ি না ফিরলে সে কথা কাউকে জিগ্যেস করাই যায়, যদিও প্রফেসর মুরাকামিকে জিগ্যেস করবে কেন সেটা একটা রহস্য। কিন্তু স্টেডিয়ামটা কোথায় গেল, এটা কি একটা প্রশ্ন হল?
কী মনে হতে আমি পায়ে পায়ে বাড়ির পিছনের দিকের দরজাটা খুলে বাইরে তাকালাম। এই দরজায় দাঁড়িয়ে কাল রাত অবধি পাহাড়ের ঢালে বিশাল স্টেডিয়ামটাকে দেখতে পেয়েছি। কিন্তু সেদিন ভোরে দেখলাম, জায়গাটা ফাঁকা। এই আমার মাথার টাকের মতন ফাঁকা। পুরো জায়গাটা জুড়ে এক কুচি ঘাস অবধি নেই।
হতবাক অবস্থায় পায়ে পায়ে ড্রইং রুমে ফিরে গেলাম। সেখানে তখনো প্রফেসর মুরাকামি হাসি হাসি মুখে সিগারেট টানছেন আর তাঁর মুখোমুখি একইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিথিলা দুসাদ। আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে মিথিলা বলল, কাল সারারাত মতিন বাড়ি ফেরেনি বলে আমি আজ ভোরবেলায় ওকে খুঁজতে স্টেডিয়ামে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখছি আস্ত স্টেডিয়ামটাই গায়েব। এই ভৌতিক কাণ্ড আপনিই ঘটাতে পারেন, একমাত্র আপনি। বলুন সাহেব, স্টেডিয়ামটা কোথায়? আমার ছেলে কোথায়?
এইবার প্রফেসর কথা বললেন। খুব শান্ত গলায় বললেন, আপনার ছেলে আর তার বন্ধুরা কাল রাতে আমাকে যে অপমান করেছে, তার জন্যে ওদের শাস্তি পেতে হবে মিথিলাবাবু। চরম শাস্তি।
এত টেনশনের মধ্যেও এই কথায় মিথিলার মধ্যে থেকে হিংস্র জানোয়ারটা বেরিয়ে এল। সে মারমুখী ভঙ্গিতে প্রফেসরের দিকে দু-পা এগিয়ে এসে বলল, কে শাস্তি দেবে? এই শিসমপুরার মাটিতে দাঁড়িয়ে মিথিলা দুসাদের ছেলেকে কে শাস্তি দেবে? এত বড় হিম্মত কার?
আপনি দেবেন। আপনি নিজের হাতে নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া ছেলেকে চরম শাস্তি দেবেন, মিথিলা দুসাদ!
মিথিলা কথাটার মানে বুঝবার জন্যে চোখ সরু করে প্রফেসারের মুখের দিকে তাকাল। চিন্তা করতে করতেই হাতে ধরে থাকা দামি সিগারেটটা তুলে ঠোঁটে ঠেকাতে গেল, কিন্তু পারল না। দেখলাম ওর হাতদুটো থরথর করে কাঁপছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মিথিলা বলল, শুনুন সাহেব! বাংগালিবাবু, আপনিও কান খুলে শুনুন। ঠিক একঘণ্টা সময় দিচ্ছি। তার মধ্যে যদি আমার ছেলে সহি-সলামৎ ফিরে না আসে, তাহলে আপনাদের সকলকে এই বাড়ির মধ্যেই জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেব। এই বলে হাতের প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা প্রফেসরের সামনে টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেটার মধ্যে গুঁজে দিল।
সঙ্গে সঙ্গেই এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল যেটা বলতে গিয়ে এত বছর পরেও আমার হাতের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। হল কি, অ্যাশট্রেটার মধ্যে থেকে একটা খুব সরু কিন্তু তীক্ষ্ন আর্তনাদ একবার উঠে এসেই আবার থেমে গেল। যেন অ্যাশট্রের ভিতর থেকে মৃত্যু-যন্ত্রণায় কঁকিয়ে কেঁদে উঠল কয়েকটা মানুষ।
আমি চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসতে যাচ্ছিলাম। সেই শব্দ শুনে ওইখানেই জমে গেলাম। মিথিলা দুসাদ হাতটা অ্যাশট্রের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে ভুলে গেল। আর্তনাদটা কানে যাওয়া মাত্র সে-ও পাথর হয়ে গিয়েছে।
হ্যাঁ, আর্তনাদই যে তাতে কোনো ভুল নেই। এবং মানুষের গলার আর্তনাদ। একজন নয়, কয়েকজন মানুষের।
প্রফেসরের মুখটা দেখলাম কি যেন এক মানসিক যন্ত্রণায় কুঁচকে গিয়েছে। এটাও মনে আছে, কখনো যা করেন না সেই মুহূর্তে প্রফেসর তাই করলেন। নিজের শেষ হয়ে আসা সিগারেটটাকে তিনি ওই অ্যাশট্রেটাতে না ফেলে খোলা জানলা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিলেন।
ততক্ষণে মিথিলা দুসাদ টেবিলের ওপর থেকে প্রফেসর মুরাকামির অ্যাশট্রেটা হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে শুরু করেছে। যতই দেখছে, ততই তার চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে যাচ্ছে। তার মুখটা বীভৎস এক ভয়ে আর যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে যাচ্ছে। আমিও তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। দেখছিলাম ওই খুদে গোল অ্যাশট্রেটার সঙ্গে শিসমপুরার অসমাপ্ত স্টেডিয়ামের কোনো তফাত নেই। ভালো করে দেখলে গোল হয়ে উঠে যাওয়া দেয়ালের ভেতরের গায়ে সারিসারি চেয়ার বসানোর খোপ, নীচের দিকে বড় বড় গেট, নীচ থেকে উপরে উঠে যাওয়ার সিঁড়ি—সবকিছু দেখতে পাওয়া যায়।
একটু বাদে অ্যাশট্রের ভেতর থেকে নীলচে ধোঁয়ার একটা সুতো পাক খেতে খেতে বেরিয়ে এল, আর সঙ্গে বয়ে নিয়ে এল মাংস পোড়ার গন্ধ। যেরকম গন্ধ শ্মশানে পাওয়া যায়।
ঠিক তখনই আমাদের বুক কাঁপিয়ে দিয়ে মিথিলা দুসাদ হাত থেকে অ্যাশট্রেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। পাগলের হাসি।
বুঝলি শমী, তার নিজের সিগারেটের আগুনে কী সর্বনাশ ঘটে গেল সেটা বোঝামাত্রই সেদিন মিথিলা দুসাদ পাগল হয়ে গিয়েছিল। আর কোনোদিন সে সেরে ওঠেনি। আমিও সেই মুহূর্তেই শিসমপুরা ছেড়ে একবস্ত্রে পালিয়ে এসেছিলাম। এখনো সেই পরিত্যক্ত অভ্রখনির মধ্যে পড়ে রয়েছে পৃথিবীর প্রথম পার্টিকল অ্যাকসিলারেটর আর আমার সফল না হওয়া একটা স্বপ্ন।
কথা শেষ করে পাঁকালকাকা তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটাকে একটা টুসকি মেরে অন্ধকার বাগানের মধ্যে উড়িয়ে দিল।
আমরা কেউই কিন্তু বলতে পারলাম না, পাঁকালকাকা, একটা অ্যাশট্রে রাখেন না কেন?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন