সৈকত মুখোপাধ্যায়

পাথরের ইট সাজিয়ে তৈরি ঘরের দেয়াল। পাথরের টালি দিয়ে ছাওয়া সেই ঘরের ছাদ। ঘরের মাঝখানে একটা লোহার কড়াইয়ে পাইনকাঠের আগুন জ্বলছিল ধিকিধিকি। সেই আগুনকে ঘিরে বসেছিল নীলেশ, নানকু, নানকুর দাদু আর নানকুর ছোট ভাই তিলকা।
নানকুর মা আর দিদিমা পেছনের একটা ঘরে রাতের খাবার বানাচ্ছিলেন। নীলেশ আজ এ বাড়িতে অতিথি, তাই শুধু ডাল আর চাপাটি বানালে চলবে না। একটু আগে উঠোনের ছাউনির নীচে ঝুলিয়ে রাখা মাটির কলসির ভেতরে হাত গলিয়ে তিলকা চারটে পায়রা বার করে এনেছিল। এখন সেই পায়রার মাংস রান্নার লোভনীয় গন্ধ রান্নাঘর থেকে নীলেশের নাকে ভেসে আসছিল।
আগুনের তাপ পোয়াতে পোয়াতে নানকুর দাদু গল্প বলছিলেন। বলছিলেন, দেওধুরা-তালে না কি স্বর্গের রথ নেমেছিল। সে অনেক...অনেক বছর আগেকার কথা। আকাশ তখন আগুনের মতন লাল হয়ে উঠেছিল, আর বাতাস হয়ে উঠেছিল দাবানলের হলকার মতন গরম। নানকুদের পূর্বপুরুষেরা দুহাত দিয়ে কান চাপা দিয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিল, না হলে কানের পর্দা ফেটে যেত। এমনই ভয়ঙ্কর ছিল আকাশ থেকে সেই রথের নেমে আসার আওয়াজ।
'নেমে আসার' আওয়াজ নয়, 'ভেঙে পড়ার' আওয়াজ। একযোগে দাদুর কথা শুধরে দিয়েছিল নানকু আর তিলকা। বোঝাই যায়, জন্ম থেকে এই কাহিনি তারা অনেকবার শুনেছে। শুনতে শুনতে সমস্ত খুঁটিনাটি তাদের মুখস্থ হয়ে গেছে।
নানকুর দাদু কথাটা সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নিলেন। বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভেঙে পড়ার আওয়াজ। ভেঙেই পড়েছিল দেবতাদের সেই রথ। যেখানে পড়েছিল সেখানে অ্যাত্তো বড় গর্ত হয়ে গিয়েছিল। পরে সেই গর্তে বরফ-গলা জল জমল। তখন তৈরি হল ওই দেওধুরা-তাল।'
নীলেশ কম দিন হিমালয়ে ঘুরছে না। সে জানে, 'তাল' মানে হ্রদ। যেমন নৈনি তাল, নওকুচিয়া তাল। তেমনি দেওধুরা তাল। আজ বিকেলে পাহাড়ের মাথা থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে প্রথমবার ওই দেওধুরা তালের সৌন্দর্য দেখে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নীলেশের। এত সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে থাকতে পারে! সবুজ ঘাসে ছাওয়া ছোট্ট একটা উপত্যকার ঠিক মাঝখানে নীল জলের হ্রদ। তীরে পাইনের বন। পাহাড়ের মাথায় নানকুদের গ্রাম। সেই গ্রামের নাম রিখিরূপা।
নীলেশ তখন নানকুর হাতটা মুঠোর মধ্যে ধরে বলেছিল, ধন্যবাদ নানকু। তুমি জোর না করলে এমন সুন্দর জায়গাটা অদেখাই থেকে যেত।
সত্যিই তাই। কলকাতার ছেলে নীলেশ নানকুকে গাইড হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারের পথে ট্রেকিং করতে গিয়েছিল। ফেরবার পথে নানকু বলেছিল, 'সাহেব, আপনার শরীর তো বেশ জোরালো। যদি কষ্ট করতে রাজি থাকেন, তা হলে আমার সঙ্গে আমার গ্রাম রিখিরূপায় চলুন। এখান থেকে চারদিনের রাস্তা। চড়াইও আছে বেশ। তবে আপনার পরিশ্রম পুষিয়ে যাবে।'
'কী আছে তোমার গ্রামে?' জিগ্যেস করেছিল নীলেশ।
'গ্রামে কিছু নেই। তবে যে পাহাড়ের চুড়োয় আমার গ্রাম, তার পায়ের কাছেই একটা অপূর্ব উপত্যকা আছে। সুন্দর একটা হ্রদ আছে। অমন সুন্দর দৃশ্য সারা হিমালয়ে কোথাও আপনি পাবেন না।' বলেছিল নানকু।
রাজি হয়ে গিয়েছিল নীলেশ। তারপর টানা চারদিন শুধু পাহাড়ি চড়াই ভেঙে উঠেছে ওরা দুজনে। রাতের কনকনে ঠান্ডায় মেষপালকদের ছেড়ে যাওয়া ঝুপড়ির মধ্যে কাঠকুটোর আগুন জ্বেলে ঘুমিয়েছে। নানকু বলেছিল, 'এইজন্যেই আমাদের গ্রামে কোনো বাইরের লোক নিয়ে আসি না সাহেব। আমি এত লোককে গাইড করি। আমার এমন সুন্দর জন্মভূমিতে তাদের কাউকে আসতে বলি না। শুধু আপনাকে দেখে মনে হল আপনি পারবেন। তাই আপনাকে নিয়ে এলাম।'
নীলেশ আবার বুকে জড়িয়ে ধরেছিল নানকুকে। বলেছিল, 'ভাগ্যিস এনেছিলে।'
নানকু তখনই নীলেশকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিল, 'দেওধুরা-তালকে দূর থেকেই দেখতে হবে কিন্তু। ওই হ্রদের জল আসলে দেবতাদের চোখের জল। ওনারা অভিশপ্ত ছিলেন কি না। তাই স্বর্গ থেকে এখানে তাঁদের রথ ভেঙে পড়েছিল।'
এসব সেই বিকেলের কথা। এখন রাত্রিবেলায়, আগুনের পাশে বসে নীলেশ নানকুর দাদুকে প্রশ্ন করল, 'রথ যদি ভেঙেই পড়েছিল, তাহলে দেবতাদের কী হয়েছিল?'
'সে তো জানি না। তখন তো এখানে কোনো মানুষ থাকত না। ওই যে বললাম আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা, তাঁরা থাকতেন অনেক দূরের সব গ্রামে। দশ মাইল বিশ মাইল দূরে। সেখান থেকেই জ্বলন্ত রথের ভেঙে পড়ার ঘটনা তারা দেখেছিলেন। কাজেই দেবতারা তারপর কোথায় গেলেন তা আর কেউ বলতে পারে না।'
'কিন্তু পরেরদিন তো গ্রামের লোকেরা আসতে পারত। প্লেন ভেঙে পড়লে যেমন পিল পিল করে লোক ছুটে আসে।'—বলল নীলেশ।
'কী যে বল বাবা। এরোপ্লেন আর দেবতাদের রথ কি এক হল? পাঁচশো বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে মুখে একটা গল্প চলে আসছে। সেটা হল, যে-ই ওই দেওধুরা-তালের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করত, তারই গায়ে এত বড় বড় ফোসকা পড়ে যেত। একশো, দুশো, তিনশো বছর পরেও ওই দেওধুরা-তালের ওপরের আকাশ দিয়ে পাখি অবধি উড়ে যেত না। তাদের চোখ অন্ধ হয়ে যেত।'
নীলেশ মনে মনে বলল, 'স্বাভাবিক। একটা মহাকাশযান যদি ভেঙে পড়ে, তার পারমাণবিক জ্বালানিটা কোথায় যাবে? রেডিয়েশন তো সেই জায়গাটাকে পুড়িয়ে খাক করে দেবেই।'
ওদিকে নানকুর দাদু বলে চলেছেন—'তারপর মাত্র একশো বছর আগে একটা ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ি ঝোরা দিক বদলে ওই উপত্যকার বুকে নেমে এল। ঝোরার জলে দেওধুরা-তালের বিশাল গহ্বর ভরে উঠল, জায়গাটার বিষও কেটে গেল। এখন তো দেখি হরিণ-টরিণও চরে ওখানে। আমরা যদিও কেউ যাই না ওদিকে। দেবতারা হয়তো ওখানেই আছেন। কী লাভ তাদের শান্তি নষ্ট করে?''
রাতে খড়ের বিছানায় মোটা কম্বল পেতে নীলেশের শোয়ার সুন্দর ব্যবস্থা করে দিল নানকু। তবু সারা রাত নীলেশের ঘুম এল না। বহু বছর আগে এখানে একটা ফ্লাইং-সসার ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু তারপর তার আরোহীদের কী হল? কী হল সেই অন্য গ্রহের আগন্তুকদের? তারা সকলেই কি মারা পড়েছিল?
যদি কোনোরকমে সেই দুর্ঘটনার পরেও তারা বেঁচে গিয়ে থাকে? আজ তাহলে তারা কোথায়, কেমন অবস্থায় রয়েছে?
এরকম কত কল্প-বিজ্ঞানের কাহিনী পড়েছে নীলেশ। পৃথিবীর মানুষদের থেকে অনেক উন্নত যাদের বিজ্ঞান তারা মোটেই হারিয়ে যায় না। তারা মাটি কিম্বা সমুদ্রের নীচে নগরী গড়ে তোলে। মাঝে মাঝে তাই মাটির নীচ থেকে গুম গুম শব্দ শোনা যায়। শান্ত সমুদ্রে হঠাৎই মাথা তোলে জলস্তম্ভ, ভাসিয়ে নিয়ে যায় জাহাজকে।
রাত থাকতেই বিনিদ্র নীলেশ বিছানা ছেড়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সামনে যে পাহাড়টা দাঁড়িয়ে রয়েছে, তারই নীচে রয়েছে সেই সবুজ উপত্যকা, সেই নীল হ্রদ— যার নাম দেওধুরা-তাল।
দেওধুরার জলের নীচে কি আজও বাস করছে সেই অন্য গ্রহের আগন্তুকেরা?
করতেই পারে। পাঁচশো বছর ধরে ওই উপত্যকায় কোনো মানুষের পা পড়েনি। সেদিন যে ভিনগ্রহীরা বেঁচে গিয়েছিল, তাদের বংশধররা নিশ্চয় সবার চোখের আড়ালে আজও ওখানে বসবাস করছে। কেমন তাদের দেখতে? কেমন তাদের ভাষা?
যারা পাঁচশো বছর আগে মহাকাশযানে চেপে মহাশূন্যে যাত্রা করেছিল, তাদের বিজ্ঞান আজ কোন উচ্চতায় পৌঁছেছে?
ভাবতে ভাবতে হাতের মুঠি শক্ত হয়ে আসে নীলেশের। কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসীদের বাইরে সেই-ই প্রথম শিক্ষিত মানুষ, যে দেওধুরায় পৌঁছেছে; যে বুঝতে পারছে দেবতার রথের গল্পের পেছনে কোন সুদূর অতীতের সত্য ঘটনার ছায়া লুকিয়ে রয়েছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। দেওধুরা-তালের উপত্যকায় তন্ন তন্ন করে দেবতাদের খুঁজে, তবে সে এই গ্রাম ছাড়বে। তার আগে নয়।
প্রচণ্ড শীত। তবু তারই মধ্যে নীলেশ ধীরে-ধীরে বাইরে বেরিয়ে এল। ব্যাক-প্যাক থেকে উলেন সোয়েটার, জ্যাকেট, কানঢাকা টুপি, জুতো সমস্ত বার করে একে একে শরীরে চাপিয়ে নিল। সব শেষে হাতে গ্লাভস পরে নিয়ে রওনা দিল গ্রামের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা টিলাটার দিকে। নানকুদের পোষা পাহাড়ি কুকুরটা শুধু তাকে দেখে একবার ঘুমচোখে ভুক করে ডেকে উঠল। আর কেউ দেখল না নীলেশের গৃহত্যাগ।
টিলাটায় চাপতেই যা একটু সময় লেগেছিল। উতরাই পথে নামতে একদমই সময় লাগল না। নানকুদের বাড়ি ছেড়ে বেরোবার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নীলেশ সেই হ্রদের তীরের ঘাসজমিতে পৌঁছিয়ে গেল। গতকাল বিকেলে টিলার মাথা থেকে যে পাইনবনকে দেখেছিল নীলেশ, তারই নীচে এখন সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভোরের প্রথম আলোয় পাইনগাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো হিরের মতন ঝলকাচ্ছে। হাজার পাখির গানে গানে পুরো উপত্যকাটাই অবিরাম পিয়ানোর মতন বেজে উঠছে। নীলেশ ঠিক করল সরাসরি হ্রদের দিকে না গিয়ে আগে পাড়ের এই পাইনবনের ভেতর দিয়ে জায়গাটাকে একটা চক্কর মেরে দেখবে। তাতে সুবিধে হবে এই যে, যদি বিপজ্জনক কিছু থাকে সেটা সে আগেই ধরে ফেলতে পারবে।
প্রথম যে জিনিসটা নীলেশের চোখে পড়ল, সেটাকে তার আদৌ বিপজ্জনক কিছু বলে মনে হল না। একটা কুঁড়েঘর। অনেকটা নানকুদের বাড়ির মতনই—পাথরের দেয়াল, পাথরের টালি বসানো ছাদ। শুধু এই বাড়িটা খুব জরাজীর্ণ। হয় তো কেউ থাকে না।
কিন্তু নানকুর বাবা যে বলেছিলেন, দেওধুরা-তালের আশেপাশে মানুষের পা পড়ে না। তাহলে এখানে কুঁড়েঘরটা এল কোথা থেকে? নীলেশের কৌতূহল বাধা মানল না। সে পায়ে-পায়ে পৌঁছে গেল কুঁড়েঘরটার উঠোনে। আর তখনই সে দেখতে পেল মানুষের বসবাসের চিহ্ন। উঠোনে কয়েকটা আপেল গাছ। পেছনে ভুট্টার খেত। এমনকি উঠোনের একপাশে এক ঝাঁক মুরগি অবধি চরে বেড়াচ্ছে, যেগুলো একেবারেই পৃথিবীর মুরগি। গ্রহান্তরের জীবের কোনো লক্ষণই নেই তাদের মধ্যে।
একটু হতাশই হল নীলেশ। যাঃ! অন্যগ্রহের জীব দেখবার স্বপ্ন এখানেই শেষ। এরকম নিরুপদ্রবে যেখানে মানুষ বাস করছে, সেখানে কি ভিনগ্রহীরা থাকে? সে ভাবছিল ফিরেই যাবে। কিন্তু তখনই নীলেশকে এগিয়ে আসতে দেখে মুরগিগুলো ডানা ঝাপটে বিচ্ছিরিরকম চিৎকার করে উঠল, আর সেই চিৎকারের কারণ দেখতেই বোধহয় ভাঙা কুঁড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দুই বুড়োবুড়ি।
বুড়োবুড়ি যখন দেখল তাদের মুরগিগুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে শেয়াল আসেনি, বরং চমৎকার পোশাক-আশাক পরা একটি ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তখন তাদের ফোকলা মুখ হাসিতে ভরে উঠল। নীলেশকে তারা ইশারায় ঘরের ভেতরে আসবার জন্যে ডাক দিল।
কী আর করে? নীলেশ গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরের দাওয়ায় বিছিয়ে দেওয়া ছেঁড়া কার্পেটের ওপরে বসল। তারপর টুকটাক কথাবার্তা আরম্ভ হল। বুড়োবুড়ি দুজনেই ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতে পারে। নীলেশের যে ব্যাপারটায় প্রচণ্ড কৌতূহল হচ্ছিল, সেটাই সে প্রথমে জিগ্যেস করল।—'আপনাদের ভয় করে না এখানে থাকতে?'
'ভয়? কিসের ভয়?'—উল্টে প্রশ্ন করল বুড়ো মানুষটি।
'ওই যে, দেবতাদের। যাদের রথ এখানে ভেঙে পড়েছিল। যাদের অভিশাপে এখানে পা রাখলে গায়ের চামড়া পুড়ে যায়।'
'কি জানি বাবা। আমার তো প্রায় নব্বই বছর বয়স হল। সত্তর বছরের ওপর এখানে ঘর বানিয়ে আছি। দেবতা দানব কিছুই কখনো চোখে পড়েনি।'
একটু ভেবে নীলেশ দ্বিতীয় প্রশ্নটা করল—'আপনারা যে এখানে থাকেন তা তো পাহাড়ের ওপরের লোকেরা জানে না। আপনারা কারুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না?'
এই প্রশ্ন শুনে বুড়ির মুখটা একটু ম্লান হয়ে গেল। বুড়ি বলল, 'না বাবা। সভ্য মানুষকে বড় ভয় পাই আমরা। সত্তর বছর আগে তোমার ওই বুড়োকে মিথ্যে চুরির অপবাদ দিয়ে খুন করতে এসেছিল গ্রামের লোকেরা। তখনই তো প্রাণের ভয়ে এই উপত্যকায় এসে লুকিয়েছিলাম। জানতাম, এখানে আমাদের খোঁজাখুঁজি করতে কেউ সাহস পাবে না।
'তারপর দেখতে দেখতে সত্তর বছর কেটে গেল। ভগবান আমাদের ছেলেপিলে দেননি। দুজনের জন্যে যা দরকার সব এই উপত্যকার মধ্যে থেকেই পেয়ে যাই। আর এখন তো শরীরের এমন অবস্থা হয়েছে, ইচ্ছে থাকলেও পাহাড় ভেঙে কোথাও যেতে পারব না।'
হতাশ নীলেশ শেষবারের মতন জিগ্যেস করল, 'তাহলে অদ্ভুত কিছুই দ্যাখেননি, না?'
'না গো ছেলে। আমরা ছাড়া রয়েছে শুধু পাখি, খরগোশ, হরিণ, বাঁদর। সব জাযগাতেই যা থাকে।'
বুড়ির দেওয়া ভুট্টাভাজা কয়েক দানা মুখে পুরে ফিরেই আসছিল নীলেশ। হঠাৎই তার চোখ পড়ল বুড়োর গায়ের চাদরটার দিকে। বাইরে ঠান্ডা হাওয়ায় বোধহয় শীত করছিল। তাই বুড়ো ঘরের ভেতর থেকে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু এ কিসের চাদর? সোনার?
নীলেশ নিজেকে সামলাতে পারল না। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে চাদরটা ছুঁয়ে দেখল। না, সোনার কাঠিন্য তো এতে নেই। একেবারেই উলের চাদরের মতন নরম সুন্দর। কিন্তু কোনো উলের কি এরকম রং হয়? এ যে সোনার মতন ঝলমল করছে। তাহলে কি সুতোতে সোনালি রং করা হয়েছে?
অভদ্রতা হচ্ছে জেনেও নীলেশ চাদরটার এক দুটো সুতো হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। না, রং করা তো নয়। এই অদ্ভুত উলের নিজস্ব রঙই এরকম ঝলমলে সোনালি। কিন্তু কোনো ভেড়ার লোমের রং কি এমন সোনালি হয়?
বুড়ো-বুড়ি দুজনেই অবাক হয়ে নীলেশের কাণ্ড দেখছিল। মুখে কিছু বলছিল না। নীলেশই তাদের জিজ্ঞেস করল, 'এই উল আপনারা কোত্থেকে পেলেন?'
বুড়ি একগাল হেসে বলল, 'পাব আবার কোথায়? আমি নিজের হাতে বুনেছি।
'হ্যাঁ, সে তো বুঝলাম। কিন্তু লোমটা কিসের?'
'লোমটা? লোমটা তো বাঁদরের। আমাদের পোষা বাঁদরগুলোরই লোম। দেখবে ওদের? চলো।'
বুড়ো-বুড়ির পেছন-পেছন সম্মোহিতের মতন নীলেশ পৌঁছে গেল কুঁড়েঘরটার পেছনে একটা ছোট খোঁয়াড়ের সামনে। খোঁয়াড়টার সামনের দিকটা শক্ত কাঠের বেড়া দিয়ে ঢাকা। আর তার ভেতরে বসে রয়েছে অনেকটা বাঁদরের মতন দেখতে কয়েকটি প্রাণী। অবশ্য তাদের লেজ নেই। নাকগুলোও বাঁদরের মতন চ্যাপ্টা নয়, বেশ টিকালো। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য তাদের গায়ের লোম। বিশাল লম্বা লম্বা সোনার তারের মতন লোমে জীবগুলোর আপাদমস্তক ঢাকা।
শুকনো গলায় নীলেশ জিগ্যেস করল, 'এদের কোথায় পেলেন?'
'কেন? এখানেই তো ছিল। সত্তর বছর আগে যখন এসেছিলাম তখনই এদের পেয়েছিলাম। তখন সাকুল্যে গোটা কুড়ি ছিল। মরতে মরতে এখন ওই আটটায় ঠেকেছে। তবু ওই ক'টা আছে বলে শীতের জামাকাপড়টা ঘরেই বুনে নিতে পারি। ওরা কিন্তু ভারি বুদ্ধিমান, আমাদের সব কথা বুঝতে পারে। মজা দেখবে? এই লালু, এদিকে আয়। জিভ দ্যাখা, জিভ।'
একটা প্রাণী উঠে এসে জিভ বার করে দ্যাখাল। সবুজ জিভ।
আর বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়ায়নি নীলেশ। নানকুদের গ্রামের দিকে ফিরতে ফিরতে সে ভাবছিল, কল্পবিজ্ঞান তাহলে সত্যি কথা বলে না!
শুধু কল্পবিজ্ঞানের দোষ কী? সে নিজেও তো আগে ভেবে দ্যাখেনি—একটা অন্য গ্রহের মাটিতে রকেট ভেঙে পড়ার পরে কতদিন আর নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ধরে রাখা যায়? বিশেষত যখন হাতে না আছে যন্ত্রপাতি, না আছে নিজেদের গ্রহের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়। যখন চারিদিকে মানুষ নামে এক ভয়ঙ্কর জীব পাহারা দিয়ে বসে আছে, যারা তাদের দেখতে পেলেই পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলবে। এক পুরুষ...দুপুরুষ...তিন পুরুষ। তার পর আস্তে আস্তে সব ভুলে গিয়ে আবার আদিম অবস্থাতেই তো ফিরে যাওয়ার কথা।
যেরকম ফিরে গিয়েছে দেওধুরা-তালের দেবতারা।
বুড়ির কাছে যাদের দাম এখন শুধু তাদের সুন্দর সোনালি পশমের জন্যে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন