সৈকত মুখোপাধ্যায়

সন্ধে নেমে এসেছে। তাঁবুর বাইরে পেতে রাখা একটা ক্যানভাসের ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে গা এলিয়ে দিলেন বিখ্যাত প্রত্নতাত্বিক ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যাল। গত একমাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আজকেই প্রথম বিশ্রামের কথা ভাবতে পারছেন তিনি। কারণ যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এখানে এসেছিলেন, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। তিনদিন আগে তিনি গিরিনাভি পর্বতশ্রেণীর এক গুহার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন পনেরো হাজার বছরের প্রাচীন গুহাচিত্র।
তারপর গত তিনদিন ধরে তিনি আর তার সহকারী সুমন্ত বসু মিলে সেই সব গুহাচিত্রকে ক্যামেরাবন্দী করেছেন, গুহার মাপজোখ নিয়েছেন। ডক্টর সান্যালের নোটবুক ভরে উঠেছে সেই আশ্চর্য গুহার নানান বৈশিষ্ট্যের কথায়। আজকেই সেই কাজ শেষ হল। এবার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পালা। সারা পৃথিবীর পণ্ডিতমহলের সামনে এই নতুন আবিষ্কারকে তুলে ধরার পালা। ভাবতে ভাবতেই ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যালের মুখে একটা ম্লান ছায়া পড়ল। গুহাচিত্রের আবিষ্কারককেই তো সবাই প্রশ্ন করবে, ওই ছবির মধ্যে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধরা আছে, তার মানে কী? যারা মারছে তারা কারা? যাদের মারছে তারাই বা কে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে লোকগুলো মার খাচ্ছে তাদের পায়ের পাতায় আঙুলের বদলে অমন চামড়ার পর্দা কেন? কোন কল্পনা থেকে পনেরো হাজার বছর আগের শিল্পীরা মানুষের শরীরে অমন হাঁসের মতন পা এঁকেছিল?
এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ডক্টর সান্যাল গত তিনদিন মাথা খুঁড়ছেন। তাঁর ক্লান্ত মাথা এখন একটু বিশ্রাম চাইছে। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে খালি কাপটাকে তিনি মাটিতেই নামিয়ে রাখলেন। তারপর মাথার ওপরের আকাশটার দিকে চাইলেন। নভেম্বরের নির্মেঘ আকাশে কোটি কোটি তারা জ্বলজ্বল করছে। শহরে বাস করলে এত তারা দেখতে পাওয়া যায় না। ধোঁয়া, ধুলো আর বিজলিবাতির ছ'টায় সব তারা ঢাকা পড়ে যায়।
শহুরে সভ্যতা থেকে অনেক দূরে ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যালের এই গিরিনাভি উপত্যকার ক্যাম্প-সাইট। এখান থেকে যে-কোনো দিকে একশো কিলোমিটার পাড়ি দিলেও কোনো লোকবসতি পাওয়া যাবে না। সত্যি কথা বলতে কি উঁচু পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট্ট উপত্যকাটায় তিনিই বোধহয় প্রথম বহিরাগত।
এর আগে কোনো সভ্য মানুষের পা পড়েছিল কি এখানে? ডক্টর সান্যালের তা মনে হয় না। ঘন জঙ্গলে ঢাকা বিশাল উঁচু পাহাড় টপকে এই উপত্যকায় ঢোকা অসম্ভব। একমাত্র যেখানে পাহাড় চিরে কুশাবতী নদী বেরিয়ে এসেছে, সেই খাত ধরে এই উপত্যকায় পৌঁছনো যায়। ঘন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই নদীখাতটাকে ডক্টর সান্যালই খুঁজে বার করেছেন।
চেয়ারে বসেই বাঁদিকে ঘাড় ঘোরালেন ধ্রুবেশ সান্যাল। ওই যে, তারার আলোয় চিকমিক করছে কুশাবতীর কালো জল। পাথরের ওপর দিয়ে জলস্রোত বয়ে চলার ঝিরঝির ঝরঝর শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। পাহাড়ের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়া ওই নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতেই ঠিক একমাস আগে তারা এখানে পৌঁছেছিলেন—তিনি নিজে, তার সহকারী সুমন্ত আর পনেরোজন স্থানীয় কুলি।
সুমন্ত এখন তার নিজের তাঁবুর ভেতরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। ও-ও আজ সারাদিন খুব উত্তেজিত। স্বাভাবিক। এমন একটা সফল প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত হলে কোন যুবক না খুশি হবে?
আরো কিছুটা দূরে বুনো গাছের পাতায় ছাওয়া বড় ঝুপড়িটার ভেতর থেকে কুলিদের নীচু গলায় হাসি গান কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে। রান্নার বাসনপত্রের ঠুংঠাং আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। ওরাও আঁচ পেয়েছে যে বাড়ি ফেরার সময় এগিয়ে এসেছে। ওরাও তাই আজ খুব খুশি।
আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যাল এবার তার দৃষ্টিকে সোজা সামনের দিকে প্রসারিত করে দিলেন। ঘন অন্ধকারের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে, বহুদূরে, গিরিনাভি পর্বতশ্রেণীর এক ঢালে কয়েকটা আলো টিমটিম করে জ্বলছে। ওগুলো একটা আদিবাসী গ্রামের আলো। তার দলের সতেরো জন লোক ছাড়া একমাত্র ওই লোকগুলোই এখানে রয়েছে, এই গিরিনাভির গহন অন্তঃপুরে। তফাত হল, তারা যেমন এসেছেন, তেমনই আবার ফিরেও যাবেন। আর ওই আদিবাসীরা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। কত যুগ ধরে ওরা এখানে রয়েছে কে জানে? ওদেরই পূর্বপুরুষেরা কি ওই গুহাচিত্রগুলো এঁকেছিল?
ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো হত—ভাবলেন ধ্রুবেশ সান্যাল। গুহাচিত্রগুলোর মধ্যে যে ধাঁধা রয়েছে, তার অন্তত একটা চলনসই ব্যাখ্যা ছাড়া সেগুলোকে সমালোচকদের সামনে ফেলে দেওয়াটা যে বোকামি হবে সেটা ডক্টর সান্যাল দিব্যি বুঝতে পারছিলেন। আর সেই উত্তরটা হয় তো ওরাই দিতে পারত, ওই পাহাড়ি গ্রামের লোকগুলো। কিন্তু ওরা কি সামনে আসবে?
ফিল্ডে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে ডক্টর সান্যালের। গত চল্লিশ বছরে সারা ভারতের বহু আরণ্যক জায়গায় তিনি দিন কাটিয়েছেন, মিশেছেন ভারতের প্রায় সবক'টা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। তিনি খুব চট করে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলতে পারেন। সব জায়গাতেই, কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি মন দিয়ে শুনেছেন আদিবাসীদের গান, তাদের গাঁওবুড়োদের মুখের রূপকথা। ওইসব গান আর গল্পের মধ্যে থেকেই কতবার তিনি খুঁজে পেয়েছেন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া কোনো পাতা।
এই গিরিনাভিতে এসেই ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যালের বন্ধুত্ব পাতানোর ইচ্ছে প্রথমবারের জন্যে ধাক্কা খেল। কি জানি কেন, ওই গ্রামের লোকগুলো খরগোশের থেকেও ভীতু। এর আগে যতবারই ওই পাহাড়ি গ্রামের দিকে গেছেন, ততবারই দেখেছেন গ্রাম জনশূন্য। অথচ তারা পৌঁছনোর খানিকক্ষণ আগেও যে ঘরগুলোয় মানুষ ছিল সে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় নি। কোথাও তখনো উনুনের ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে, কোথাও উঠোনে একটা কাপড়ের দোলনা অল্প অল্প দুলছে।
বোঝাই যায়, ওদের আসতে দেখেই গ্রামের লোকগুলো আশেপাশের ঘাসের জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়েছে।
প্রতিবারেই ডক্টর সান্যাল আর তার সঙ্গীসাথীরা সেই খালি উঠোনে দাঁড়িয়ে নানান ভাষায় চিৎকার করে বলেছেন—আমরা শত্রু নই, বন্ধু। তোমাদের কোনো ভয় নেই। বেরিয়ে এসো।
কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা। গ্রামের একটা বাচ্চা অবধি লুকোনোর জায়গা ছেড়ে বেরোয়নি।
আস্তে আস্তে ঠান্ডা বাড়ছিল। চেয়ারের পিঠে নামিয়ে রাখা জ্যাকেটটা গায়ে গলাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালেন ডক্টর সান্যাল। ঘুরে দাঁড়ালেন। আর তখনই তাঁর চোখে পড়ল, একটু দূরে একটা লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গাছের ডালে টাঙিয়ে রাখা হ্যাজাকবাতির আবছা আলোতেও ডক্টর সান্যালের বুঝতে অসুবিধে হল না, এ তার নিজের দলের লোক নয়। এত শীতেও এর গায়ে একটা পাতলা চাদর ছাড়া কিছু নেই। তার নীচে লুঙ্গির মতন করে পরা একটা রংচঙে কাপড়। সেটা প্রায় মাটি অবধি লুটোচ্ছে।
ডক্টর সান্যাল পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, লোকটা ওই পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। ঠিক যে মুহূর্তে তিনি ওদের কথা ভাবছেন, সেইসময়েই ওদের একজনের আবির্ভাব তাকে খুব অবাক করল। তিনি ইশারায় লোকটাকে কাছে ডাকলেন। ইশারাতেই তাকে উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বলে নিজেও আগের জায়গায় বসলেন।
লোকটার ছিপছিপে চেহারা, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা খুব মোটা লোকেদের মতন থপথপে। দুলুকি-চালে এগিয়ে এসে লোকটা ডক্টর সান্যালের দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসল। তারপর কোনোরকম ভূমিকা না করেই মোটামুটি সহজ হিন্দিতে বলল, যখন দেখলাম আপনি গুহার খোঁজ পেয়েই গেছেন, তখনই বুঝলাম, আর পালিয়ে বাঁচা যাবে না। এখন তো এসেছেন আপনারা সতেরো জন। এর পরে আসবেন সতেরো হাজার। চারিদিকের বন-পাহাড় ট্যুরিস্ট আর সরকারি অফিসারদের পায়ে পায়ে লন্ডভন্ড হবে। তখন লুকোব কোথায়? তাই আপনার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। এখান থেকে ফিরে গিয়ে এই উপত্যকার কথা, ওই গুহাচিত্রের কথা আপনি বাইরের জগতের কাউকে বলবেন না।
কেন?—অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন ডক্টর সান্যাল।
আমরা তাহলে শেষ হয়ে যাব। আমরা আর অল্প কজনই বেঁচে আছি। তারাও আর থাকব না।
একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন ডক্টর ধ্রুবেশ সান্যাল। এর উদ্বেগটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। অন্যান্য অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীর মতন এরাও সভ্য পৃথিবীকে ভয় পায়। এদের তো গাড়ি, ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র কিছুই নেই। ভাবে শহরের মানুষেরা এসে ওদের তাড়িয়ে ওদের জমি-জায়গার দখল নেবে। তিনি চেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়ে লোকটার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরলেন। খুব আন্তরিক স্বরে বললেন, ভয় পেও না। তোমাদের সুরক্ষার দায়িত্ব সরকার নেবে। তোমরাও তো ভারতের নাগরিক।
না, আমরা ভারতের নাগরিক নই। আমরা বাইরের লোক। লোকটা একইরকম বিষণ্ণ গলায় বলল।
এ ব্যাটা পাগল নয় তো? মনে মনে ভাবলেন ধ্রুবেশ সান্যাল।
আমাকে পাগল ভাবছেন?
ধ্রুবেশ সান্যাল চমকে উঠলেন। লোকটা মন পড়তে জানে না কি? লোকটার ঠোঁটে একটা মজা পাওয়ার হাসি। হাসতে হাসতেই সে বলল, জানি, যুক্তি দিয়ে না বোঝাতে পারলে আমার অনুরোধ আপনি রাখবেন না। আপনি তো ওই গুহার দেয়ালে আঁকা ছবিগুলো দেখেছেন?
ডক্টর সান্যাল নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লেন।
দেখেছেন নিশ্চয়ই, একদল লোককে আরেক দল লোক নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে।
দেখেছি।
যাদের হত্যা করা হচ্ছিল আমরা তাদেরই বংশধর। আমাদের অল্প কয়েকজন পূর্বপুরুষ ওই পাহাড়ে, জঙ্গলে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাই তাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন।
আর যারা তোমাদের মারছিল? তারা কারা?
তারাই ছিল এই উপত্যকার আদি বাসিন্দা। আমরা বাইরে থেকে এসেছিলাম। সেইজন্যেই ওদের অত রাগ ছিল আমাদের ওপর।
তারা এখন কোথায়?
শুনেছি হাজার তিনেক বছর আগে অদ্ভুত এক মহামারী দেখা দিয়েছিল এই উপত্যকায়। সেই মহামারীতেই ওরা সবাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। একজনও বাঁচেনি।
তোমরা বাঁচলে কেমন করে?
পৃথিবীর অসুখে আমাদের কিছু হবে কেন? আমরা তো বাইরের লোক।
লোকটার যুক্তি ডক্টর সান্যালের বোধগম্য হল না। তবে তার আগের কথার সূত্র ধরে তিনি বললেন, পনেরো হাজার বছর আগে যা হয়েছিল সেই ঘটনা আবার ঘটবে বলে ভাবছ কেন তুমি? আমরা তো সভ্য লোক। তোমাদের মারতে যাব কোন দুঃখে? বরং ওই গুহার টানে জায়গাটা যদি একটা ট্যুরিস্ট-স্পট হয়ে ওঠে তাহলে তোমরাও অনেক রকম কাজ পাবে। স্কুল-কলেজ পাবে, দোকানপাট পাবে। ইচ্ছে করে না সেসব পেতে?
লোকটা ঘাড় নাড়ল। মুখে বলল, কিচ্ছু পাব না।
কেন?
ওই যে বললাম, আমরা বাইরের লোক।
ডক্টর সান্যালের মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটা বোধহয় বুঝতে পারল, যে তিনি তার কথা বুঝতে পারেননি। তাই সে চেয়ারটা একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল, গুহার ছবিতে যে লোকগুলো মার খাচ্ছে তাদের পা-গুলো দেখেছেন? কেন ওরকম হাঁসের মতন পা আঁকা হয়েছিল সে প্রশ্ন জাগেনি আপনার মনে?
ডক্টর সান্যাল বললেন, জেগেছে বই কি। সেটা নিয়েই তো ভাবছি। একটা ব্যাখ্যা হতে পারে যে, ওই লোকগুলো, মানে তোমার পূর্বপুরুষেরা খুব ভালো সাঁতার কাটত। সেটা বোঝানোর জন্যেই...মানে, মিশরে স্ফিঙ্কসের মূর্তি যেমন। সিংহের শরীর মানে সিংহের মতন শক্তি।
সবকিছু এত জটিল করে ভাবেন কেন? এটা ভাবতে পারছেন না যে, ওদের পা-গুলো অমন হাঁসের পায়ের মতনই ছিল।
তাই আবার হয় না কি? কি যা তা বকছ? ধমকে উঠলেন ডক্টর সান্যাল।
যা তা বকব কেন? যারা বাইরের লোক তাদের সবকিছু কি আপনাদের মতন হবে? তাদের আরো অনেক তফাত ছিল আপনাদের সঙ্গে। ওদের মনের ক্ষমতা ছিল সাংঘাতিক। আপনাদের থেকে কয়েক লক্ষ গুণ বেশি। ওদের তিনশো জন মহাকাশযাত্রীকে নিয়ে যে মহাকাশযানটা পনেরো হাজার বছর আগে এই উপত্যকায় ভেঙে পড়েছিল, সেটাও সমবেত মনের জোরেই চলত। পৃথিবীর আকাশে পৌঁছনোর পর আপনাদের এই নীলগ্রহের অসীম সৌন্দর্য দেখে ওদের মধ্যে একজনের মন উদাস হয়ে গিয়েছিল। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা।
ডক্টর সান্যাল ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ও, তুমি তাহলে অন্য গ্রহের লোক? তা পনেরো হাজার বছর আগে সেই লেংটি পরা জংলিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তোমার রকেটওলা পূর্বপুরুষেরা হারল কেমন করে?
সেটা আপনি ঠিক বুঝবেন না। একটা সভ্যতা যত উন্নত হয়, ততই তাদের মধ্যে হিংসা কমে আসে। আমরা সেদিনও কোনো প্রাণীকে হত্যা করতে পারতাম না, আজও পারি না। ভবিষ্যতে কোনোদিন হয় তো আপনারা, মানুষেরাও, সেরকম একটা মানসিক অবস্থা পেয়ে যাবেন। সেদিন আমরা আর আপনাদের ভয় পাব না। তবে আজ যদি আপনারা দল বেঁধে এখানে আসেন, তাহলে ওই যা বললাম। আমরা কেউ বাঁচব না।
এতক্ষণে ডক্টর সান্যাল মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তিনি পাগলের পাল্লায় পড়েছেন। এর সঙ্গে বকবক করে কাজের কাজ কিছু হবে না। হাঁসের পা-ওয়ালা ভিনগ্রহের আগন্তুকদের কথা তিনি যদি আগামী মাসের কোপেনহেগেন কনফারেন্সে বলেন, তা হলে ঠিক ক'টা পচা ডিম তার মাথায় পড়বে সে কথা ভেবেই শিউরে উঠলেন ডক্টর সান্যাল।
সঙ্গে সঙ্গেই হেসে উঠল সামনে বসে থাকা লোকটা। জিগ্যেস করল, কোপেনহেগেন কনফারেন্সের কথা ভাবছেন? সেখানে কিছু বলবেন কেন? আপনাকে বলতেই তো বারণ করছি।
ডক্টর সান্যালের মুখটা এত বড় হাঁ হয়ে গেল।
লোকটা চেয়ারের ওপর পা তুলে বসে বলল, হাজার হাজার বছর এই জঙ্গলে পড়ে থেকে থেকে পূর্বপুরুষদের জ্ঞানবিজ্ঞানের সবটুকুই হারিয়ে ফেলে একেবারেই জংলি হয়ে গেছি। কিন্তু মনটা তো হারাইনি। দেখতেই পাচ্ছেন এখনো আমরা মন পড়তে পারি। আরো অনেক কিছুই পারি। আমি যে পাগল নই সেটা বোঝানোর জন্যে তার কিছু নমুনা আপনাকে দ্যাখানো দরকার।
ডক্টর সান্যালের তাঁবুর ঠিক সামনে একটা হাতির সাইজের বড় পাথর পড়ে ছিল। তাঁবু থেকে ঢোকা বেরোনোর সময় সেটাকে পাশ কাটিয়ে যেতে হত। লোকটা সেই পাথরের দিকে তাকানোমাত্র সেটা হালকা পালকের মতন হাওয়ায় ভেসে উঠল। একটু বাদে মাটিতে নেমেও এল। ঠিক আগের জায়গায় বসল না অবশ্য। সেটার নতুন অবস্থান হল সুমন্তের তাঁবুর সামনে।
এই শীতেও ডক্টর সান্যালের মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছিল। সেইদিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, এ কী, এত ভয় পাচ্ছেন কেন? পূর্বপুরুষদের ওই গুণটাও তো আমাদের রয়ে গেছে—ভুলে গেলেন সে কথা? তাদের মতনই আমরাও প্রাণীহত্যা করতে পারি না। আচ্ছা, আমি তাহলে চলি। আশা করি এত কিছু শোনার পরে, এই নিরীহ কয়েকটা বাইরের লোককে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবেন না।
লোকটা দু-পা হেঁটে গিয়ে হঠাৎই মিলিয়ে গেল।
মনের জোরে যাতায়াতটাও এরা এখনো ভোলেনি দেখছি। রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ভাবলেন ডক্টর সান্যাল। তারপর কি মনে হতে টর্চটা নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন সামনের ধুলোর ওপরে। দুটো পায়ের ছাপ। না, পা নয়, চামড়ায় ঢাকা ফ্লিপারের ছাপ। ঠিক হাঁসের মতন। কিম্বা গুহার ছবির মতন। নিজের চপ্পল বুলিয়ে সেই দাগদুটোকে মুছতে মুছতেই ডক্টর সান্যাল শুনতে পেলেন পেছনে সুমন্তের অবাক গলা।—এ কী! পাথরটা আমার তাঁবুর সামনে চলে এল কেমন করে?
ডক্টর সান্যাল তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ছোট একটা আর্থকোয়েক হল টের পাওনি? ওই সময়েই একটু গড়িয়ে গেল আর কি।
তারপর সুমন্তকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই গড়গড় করে বলে গেলেন—আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা গেল, বুঝলে? সব রেকর্ড ঘেঁটে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। এই ছবিগুলো সব মডার্ন টাইমে আঁকা। হয়তো কোনো পিকনিক পার্টি এসেছিল। সেই দলের বাচ্চা-কাচ্চারাই গুহার দেয়ালে ওইসব হাঁসের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং এঁকে দিয়ে গেছে।
চল খেয়ে নেওয়া যাক। কাল ভোরেই আবার আমাদের ফিরতে হবে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন