ইতিহাসের পর্ব বদলের ক্ষণগুলো যুদ্ধের কুয়াশায় ঢাকা, ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তিতে ভরা। বাংলার ইতিহাসে মধ্যযুগ যখন শেষ হতে চলেছে, তখনো অবস্থাটা এ রকমই ছিল। আলিবর্দি খান এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই বাংলার সিংহাসনে বসেন।
আলিবর্দির আসল নাম ছিল মির্জা মুহাম্মদ আলী, তিনি জন্মেছিলেন ১৬৭১ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর বাবা মির্জা মুহাম্মদ মাদানি শাহ কুলি ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে শাহজাদা আজমের দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তাঁর মা (ইতিহাস তাঁর নাম লিখে রাখেনি) ছিলেন দিল্লির সুবাদার নওয়াব আকিল খানের মেয়ে। শাহজাদা আজম মির্জা মুহাম্মদ মাদানির অনুরোধে তাঁর দুই ছেলে মির্জা মুহাম্মদ আলী ও মির্জা আহমদ খানকে চাকরিতে নিয়োগ দেন। মির্জা মুহাম্মদ আলী শাহজাদার হাতিশাল ও পোশাকভান্ডারের অধ্যক্ষ ছিলেন। দুই ভাই দীর্ঘদিন শাহজাদা আজমের সেবা করেছিলেন, তবে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর যখন সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই শুরু হলো, তাঁরা আজমের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা না করে আহমেদনগরে থেকে গেলেন।
স্নেহভাজন দুই ভাইয়ের যুদ্ধে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে শাহজাদা আজম হতাশ হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু দেখা গেল, যুদ্ধে না গিয়ে দুই ভাই দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। জাজাউয়ের যুদ্ধে শাহজাদা আজম তাঁর ভাই শাহজাদা মুয়াজ্জমের কাছে পরাজিত ও নিহত হলেন। তাঁর সেনাপতি ও কর্মকর্তারা অনেকেই যুদ্ধে মারা পড়লেন।
তবে দুই ভাই বিপদ থেকে পুরোপুরি বাঁচতে পারলেন না। শাহজাদা মুয়াজ্জম সিংহাসনে বসলেন সম্রাট বাহাদুর শাহ নামে। তিনি আদেশ দিলেন, শাহজাদা আজমের সব কর্মকর্তাকে বিদ্রোহী বিবেচনা করে তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে। প্রাচুর্যের মধ্যে জীবন কাটিয়ে আসা মির্জা মুহাম্মদ আলী আর মির্জা আহমদ খান এই এক আদেশে সব সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়লেন। তাঁদের পরিবারের আকার তখন বড়। বাবা মির্জা মুহাম্মদ মাদানি কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছেন, কিন্তু মুহাম্মদ আলী আর আহমদ খানের মা, তাঁদের সৎমা, ছোট ভাই মির্জা মুহাম্মদ আমিন, ছোট বোন শাহ খানম, আহমদ খানের তিন স্ত্রী, মুহাম্মদ আলীর স্ত্রী শরফুননিসা বেগম, কয়েকটি ছেলেমেয়ে, সব মিলিয়ে দুই ভাই তখন পোষ্য-ভারাক্রান্ত।
বিনা আয়ে পোষ্যপালনের দায়িত্ব বহন করতে না পেরে হতাশ আহমদ খান ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে বাড়ি ছাড়েন, হজ পালনের জন্য মক্কায় চলে যান। ১৩ বছর তিনি সেখানেই ছিলেন।
বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে পরিবারের পুরো দায়িত্ব মুহাম্মদ আলীকে নিতে হয়েছিল। তিনি চাকরির সন্ধানে দিল্লি গেলেন। দিল্লিতে তখন মোগল সিংহাসন নিয়ে কিছুদিন পর পর হত্যা-অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান লেগেই আছে। অনেক চেষ্টার পর মুহাম্মদ আলী ছোট এক চাকরি জোটালেন, তার বেতনে পরিবার-প্রতিপালন করা মুশকিল। দিল্লিতে কিছুদিন চাকরি করে মুহাম্মদ আলী পাথেয় জোগাড় করলেন। সুবা-বাংলার সমৃদ্ধির কথা তাঁর কানে এসেছিল। দুর্বল মোগল সাম্রাজ্যের অরাজক অবস্থায় বলদে-টানা গাড়িতে করে অনিরাপদ সড়ক-এ-আজম দিয়ে ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সপরিবার দিল্লি থেকে মুর্শিদাবাদে এলেন।
মুর্শিদ কুলি খানের দরবারে এসে মুহাম্মদ আলী একটি চাকরির জন্য আবেদন করলেন। মুর্শিদ কুলি খান তত দিনে নিজেকে বাংলার নবাব ঘোষণা করেছেন। মোগল দরবার থেকে আসা দক্ষ কর্মকর্তাদের ভালো বেতনে চাকরি দিতে শুরু করেছেন। মুর্শিদ কুলি খান মুহাম্মদ আলীকে দেখা করার অনুমতি দিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বললেন, কিন্তু তাঁকে চাকরি দিতে রাজি হলেন না। তিনি বিবেচনা করেছিলেন, মনিব শাহজাদা আজমের পক্ষে যুদ্ধযাত্রা না করে মুহাম্মদ আলী যথেষ্ট আনুগত্যের পরিচয় দেননি। এ রকম আনুগত্যহীন কর্মকর্তাকে নিজের দরবারে নিয়োগ দেওয়া ঠিক হবে না।
হতাশ মুহাম্মদ আলী মুর্শিদ কুলি খানের দরবার থেকে বিফল হয়ে ফিরলেন। তিনি হয়তো দিল্লিতেই ফিরে যেতেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট মহাজন, নগর-শেঠ ফতেহ চাঁদ মুহাম্মদ আলীকে বললেন, তাঁর উচিত কটকে গিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখা। এই ফতেহ চাঁদকেই পরে মোগল সম্রাট ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি দেন।
ওড়িশার কটক নবাব মুর্শিদ কুলি খানের শাসনাধীন এলাকা। মাত্র এক বছর আগেই নবাব মুর্শিদ কুলি খান তাঁর মেয়ে আজমতউন্নিসা বেগমের স্বামী সুজাউদ্দিন খানকে ওড়িশার সুবাদার বানিয়ে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। শ্বশুর-জামাইয়ের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল না। ফতেহ চাঁদ ইঙ্গিত দিলেন, মুর্শিদ কুলি খান প্রত্যাখ্যান করেছেন শুনলে সুজাউদ্দিন খান মুহাম্মদ আলীকে সাদরে গ্রহণ করতে পারেন।
মুহাম্মদ আলী ভেবে দেখলেন, এত দূর যখন এসেই পড়েছেন, কটক পর্যন্ত গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করতে দোষ নেই। তিনি কটকে গেলেন। এই যাত্রা তাঁর ভাগ্য ফিরিয়ে দিল। সুজাউদ্দিন আলিবর্দিকে সাদরে গ্রহণ করলেন, তাঁকে নিজের দপ্তরে সহকারী প্রশাসক হিসেবে চাকরি দিলেন। সুজাউদ্দিনের দপ্তরে মুহাম্মদ আলী এক বছরের মধ্যেই ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করলেন। সে খবর শুনে হাজি আহমদ মক্কা থেকে ফিরে এসে কটকে সুজাউদ্দিনের সেনাবাহিনীতে কাজ নিলেন। ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হাজি আহমদ খান তাঁর তিন ছেলের (যথাক্রমে নওয়াজেশ মুহাম্মদ, সৈয়দ আহমদ খান ও জয়নউদ্দিন আহমদ) সঙ্গে মুহাম্মদ আলীর তিন মেয়ের (যথাক্রমে মেহেরউন্নিসা বেগম, মুনিরা বেগম ও আমিনা বেগম) বিয়ে দেন। সৈয়দ আহমদ-মুনিরা ও জয়নউদ্দিন-আমিনা দম্পতি সুখী হয়েছিলেন। কিন্তু মেহেরউন্নিসা দুর্ভাগা, তাঁর স্বামী নওয়াজেশ ছিলেন পুরুষত্বহীন। তাঁকে এক অসুখী দাম্পত্যজীবনের দায় বহুদিন ধরে টানতে হয়েছে। মধ্যযুগের ইতিহাস মেহেরউন্নিসাদের প্রতি কোনো বিচিত্র কারণে বড় বিরূপ। এই মেহেরউন্নিসা ইতিহাসে ঘসেটি বেগম নামে পরিচিত। ‘ঘসিট’ শব্দের অনেকগুলো অর্থের একটি হচ্ছে ‘ঘুরন্ত’। হয়তো ছোটবেলায় তাঁকে দুরন্ত গতিতে পাক খেতে দেখে স্নেহময় বাবা মুহাম্মদ আলী মেয়েকে ঘসেটি বলে ডাকতে শুরু করেন, লোকমুখে তাঁর সেই নামটিই কুখ্যাত হয়ে আছে।
১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে হৃদরোগে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যু হলো। মৃত্যুর অনেক আগেই মুর্শিদ কুলি খান জানিয়ে দিয়েছিলেন, জামাই সুজাউদ্দিন নয়, তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হবে নাতি সরফরাজ খান। মুহাম্মদ আলী আর হাজি আহমদ সুজাউদ্দিনকে বোঝালেন, এই সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য। সুজাউদ্দিন পুত্রস্নেহ ভুলে কটক থেকে সসৈন্যে মুর্শিদাবাদ গিয়ে সিংহাসন দাবি করলেন। সরফরাজের নানি নাসিরি বানু বেগম রক্তপাত এড়াতে সরফরাজকে অনুরোধ করলেন সুজাউদ্দিনকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে। নবাবি পেয়ে সুজাউদ্দিন অঙ্গীকার করলেন, তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে সরফরাজ সিংহাসনে বসবেন। কিছুদিনের জন্য শান্তি এল।
ক্ষমতা আরোহণে সাহায্য করায় মুহাম্মদ আলীর প্রতি কৃতজ্ঞ সুজাউদ্দিন তাঁকে রাজমহলের ফৌজদার নিয়োগ করলেন, সেই সঙ্গে তাঁকে আলিবর্দি খান উপাধি দিলেন। ফৌজদার আলিবর্দি ধুমধাম করে সৎবোন শাহ খানমের বিয়ে দিলেন তাঁর অধীনস্থ এক সেনাপতি সৈয়দ বংশীয় মির জাফর আলী খানের সঙ্গে।
১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সুজাউদ্দিন আলিবর্দিকে পদোন্নতি দিয়ে বিহারের নায়েবে নাজিম (সহকারী সুবাদার) করে দিলেন। এই দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে জয়নউদ্দিন-আমিনা দম্পতির প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। আলিবর্দি ভাবলেন, শিশুটির জন্মের উপলক্ষেই তাঁর এই সৌভাগ্য লাভ। তিনি ছোট মেয়ে-ছোট জামাইকে আদেশ করলেন, তাঁদের পুত্রসন্তানটি এখন থেকে তাঁর কাছে প্রতিপালিত হবে। তিনি নাতির নাম রাখলেন তাঁর বাবার নামে, মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলি। নিঃসন্তান ঘসেটি বেগমও এই ছেলেকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন। আলিবর্দি তাতে রাজি হতে পারেননি। ক্ষতিপূরণ হিসেবে জয়নউদ্দিন-আমিনার পরের সন্তানটিকে তিনি ঘসেটি বেগমের কাছে দত্তক দিলেন। জয়নউদ্দিন-আমিনা অখুশি হলেও নিজেদের সন্তানের ব্যাপারে আলিবর্দির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সুজাউদ্দিন নবাব হিসেবে সুনামের সঙ্গে রাজ্য শাসন করছিলেন। তাঁর সময়ে সুবা-বাংলায় শান্তি বিরাজ করছিল। জমিদারেরা নির্বিঘ্নে জমিদারি পরিচালনা করতে পেরে সুজাউদ্দিনের ওপর খুশি ছিলেন। সুজাউদ্দিন নিজে প্রশাসনের কাজে কমই সময় দিতেন। তাঁর হয়ে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন রায়-রায়ান আলম চাঁদ, মন্ত্রী হাজি আহমদ আর মোগল দরবার থেকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি পাওয়া ফতেহ চাঁদ।
১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের শাসক নাদির শাহ সসৈন্যে দিল্লি আক্রমণ করে দখল করলেন। তাঁর বাহিনী দিল্লি শহরে গণহত্যা করল। নাদির শাহ মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে অপদস্থ করে ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর হীরা, দরিয়া-ই-নূর হীরা এবং আরও অনেক মূল্যবান সম্পদ নিজের দেশে নিয়ে গেলেন। সুজাউদ্দিন গুজব শুনেছিলেন, দিল্লি জয়ের পর নাদির শাহ বাংলা জয় করতে আসবেন। এই দুশ্চিন্তায় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি সরফরাজ খানকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর সরফরাজ খান সিংহাসনে বসলেন। কিন্তু তত দিনে রাজ্য শাসনের ব্যাপারে তাঁর বৈরাগ্য দেখা দিয়েছিল। নবাব হয়েও প্রথম দিকে তিনি বাবার আমলের সভাসদদের হাতেই প্রশাসনের ভার রেখে নিজে ধর্মচর্চায় ব্যস্ত ছিলেন। হাজি আহমদ তাঁর এই অন্যমনস্কতার সুযোগ নিলেন। অন্য সভাসদদের সঙ্গে চক্রান্ত করে তিনি সরফরাজ খানের অনুগত সৈন্যদের অনেককে ব্যয়সংকোচের অজুহাতে কর্মচ্যুত করলেন। অন্যদিকে দিল্লি থেকে নাদির শাহ বাংলা আক্রমণ করতে এলে বিহারের ওপর দিয়েই আসবেন, এই অজুহাতে আলিবর্দি খানকে বিহারে নিজের সৈন্যসংখ্যা বহুগুণ বাড়ানোর অনুমতি দিলেন।
সরফরাজ খান কিছুদিনের মধ্যেই হাজি আহমদের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে তাঁর দুই ছেলে সৈয়দ আহমদ ও জয়নউদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তার করলেন। তিনি বিহারে আলিবর্দি খানের সামরিক ব্যয়ের যথার্থতা জানতে চেয়ে তদন্তও শুরু করলেন।
কৌশলী আলিবর্দি খান ইতিমধ্যে দিল্লির মোগল দরবারে তাঁর বন্ধু ইসহাক খান মারফত প্রস্তাব পাঠালেন, মোগল বাদশাহ মুহাম্মদ শাহ যদি সরফরাজ খানের বদলে তাঁকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হওয়ার অধিকার দেন, তবে তিনি মোগল রাজদরবারে বিপুল অঙ্কের টাকা পাঠাবেন। নাদির শাহের আক্রমণে রিক্ত হয়ে পড়া মোগল কোষাগারে তখন টাকার খুব দরকার। মোগল সম্রাট এই অন্যায় প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন।
১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে আলিবর্দি খান পাটনা থেকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করলেন। সরফরাজ খানকে তিনি জানালেন, যুদ্ধের উদ্দেশে নয়, প্রয়াত সুজাউদ্দিন খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি মুর্শিদাবাদে আসছেন। সরফরাজ খান এই বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু সভাসদদের ভুল মন্ত্রণায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে তিনি দেরি করে ফেললেন। এপ্রিল মাসে তিনি যখন যুদ্ধযাত্রা করলেন, আলিবর্দি তত দিনে ভাগীরথী নদীর তীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন। জঙ্গিপুরের কাছে গিরিয়ার প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো।
লড়াই দুই পক্ষ সমান বিক্রমের সঙ্গেই করছিল, ফলাফল অনিশ্চিত ছিল। কিন্তু আলিবর্দির কিছু সমর্থককে সরফরাজের দরবারের চক্রান্তকারীরা তাঁর দেহরক্ষী দলের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তাদেরই একজনের গুলিতে সরফরাজ খান নিহত হন। সরফরাজের মৃত্যুর পরও তাঁর অনুগত সৈন্যরা হাল ছাড়েনি। সরফরাজের সেনাপতি গাউস খান ও তাঁর দুই ছেলে আমৃত্যু লড়াই করে যান। শেষ পর্যন্ত আলিবর্দি বিহার থেকে আনা আফগান সেনাপতি ও সৈনিকদের সহায়তায় যুদ্ধে জিততে সমর্থ হন।
আলিবর্দি সসৈন্যে মুর্শিদাবাদ গিয়ে সেখানে নিজেকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করলেন। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মোগল দরবারে তিনি প্রায় পঁচাত্তর লাখ টাকা (নগদ ও মণিমুক্তায়) পাঠালেন। দিল্লির মোগল দরবারের উজির কমরউদ্দিন খান আর নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহকে চার লাখ টাকা ‘উপহার’ পাঠালেন। মুর্শিদ কুলি খানের আমলে ফতেহ চাঁদের কাছে নবাবি তহবিলের সাত কোটি টাকা গচ্ছিত রাখা হয়েছিল, সেসব নথিপত্র গায়েব করে ফতেহ চাঁদকে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিদান দিলেন। বড় জামাই নওয়াজেশকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের শাসনভার দিলেন। ছোট জামাই জয়নউদ্দিনকে দিলেন বিহারের শাসনভার। ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বালাশোরের কাছে আরেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রয়াত নবাব সুজাউদ্দিনের জামাই রুস্তম, জংকে পরাজিত করে তিনি ওড়িশার শাসনভার কেড়ে নিলেন। সেখানে নিজের মেজ জামাই সৈয়দ আহমদকে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। ভাই হাজি আহমদ প্রধানমন্ত্রী, নিদেনপক্ষে ওড়িশার শাসনকর্তা হতে চেয়েছিলেন। সে পদ না পেয়ে হাজি আহমদ মনের দুঃখে পাটনায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।
আলিবর্দি খান সত্যিকারভাবেই বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হলেন। ওড়িশা বিজয়ের পর বিহার থেকে যে আফগান সেনাপতি ও সৈন্যদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন, এদের অনেককেই তিনি বরখাস্ত করলেন। বিজয় সম্পন্ন হয়েছে, বিপুল সৈন্যের ব্যয়ভার আলিবর্দি আর টানতে চান না। তা ছাড়া সেনাপতিরা হীনবল না হয়ে পড়লে যে নিজেদের নবাবের বিরুদ্ধেই যেকোনো সময় বিদ্রোহ করতে পারেন, সে কথা তাঁর থেকে ভালো আর কে জানত?
আলিবর্দির বয়স তখন ৭০ ছুঁই ছুঁই। ভেবেছিলেন, দেরিতে হলেও জীবনে সুখের সময় এসেছে। অচিরেই তিনি বুঝলেন, সুখ তাঁর ভাগ্যে নেই। তিনি কটক থেকে মুর্শিদাবাদে ফেরার আগেই মারাঠা সেনাবাহিনী ছোট নাগপুর উপত্যকার মধ্য দিয়ে এসে বর্ধমানের প্রান্তে উপস্থিত হলো।
মোগল শক্তির পতনের এই সময়টাতে ভারতে মারাঠা শক্তির উত্থান হয়েছিল। মারাঠা নেতা শিবাজি এবং তাঁর ছেলে সম্ভাজি সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছেন। ১৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে আওরঙ্গজেব সম্ভাজিকে হত্যা করতে পারলেও সম্ভাজির ভাই রাজারাম ও সম্ভাজির ছেলে সাহু ভোঁসলে যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং ক্রমেই মারাঠা-নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমা সম্প্রসারণ করতে থাকেন।
সাহুর সময়ে রঘুজি ভোঁসলে নামের এক মারাঠা সেনাপতি বেরার প্রদেশের প্রশাসক ছিলেন। ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে নাগপুর রাজ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে অন্তঃকোন্দল চলছিল। কোন্দল মীমাংসার নামে নাগপুরের রাজধানী দেওগড়ে এসে রঘুজি ভোঁসলে নিজেই ক্ষমতা দখল করে রাজা হয়ে বসেন। নাগপুর ছোট পাহাড়ি রাজ্য। সেখানে আয়ের সুযোগ কম। কিন্তু নাগপুরের সীমানা ঘেঁষেই ছিল ওড়িশা আর বাংলা। রঘুজি ঠিক করেছিলেন, তিনি এই দুই প্রদেশ থেকে ‘চৌথ’ আর ‘সারদেশমুখী’ আদায় করবেন। ১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে মারাঠা উত্থানের মুখে অসহায় মোগল বাদশাহ মুহাম্মদ শাহ দাক্ষিণাত্যের ছয়টি প্রদেশে মারাঠাদের চৌথ আর সারদেশমুখী আদায়ের অধিকার স্বীকার করে নেন। চৌথ ছিল মূল খাজনার এক-চতুর্থাংশ আর সারদেশমুখী ছিল মূল খাজনার এক-দশমাংশ। কিন্তু দুর্বার হয়ে ওঠা মারাঠা সেনারা ঠিক করে, পুরো ভারত থেকেই তারা চৌথ আর সারদেশমুখী আদায় করবে। এই দাবি নিয়েই রঘুজি ভোঁসলে সেনাপতি ভাস্কর রাম কোলহাটকরের নেতৃত্বে ৪০ হাজার সৈন্যর একটি দল বাংলা আক্রমণ করতে পাঠিয়েছিলেন।
আলিবর্দি খান ওড়িশা থেকে ফেরা যুদ্ধক্লান্ত সৈনিকের দল নিয়ে বর্ধমানের কাছে মারাঠা বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়ায় অসন্তুষ্ট পাঠান সেনাপতিরা আলিবর্দির হয়ে আন্তরিকভাবে যুদ্ধ করলেন না। মির হাবিব নামে সরফরাজ খানের এক বিশ্বস্ত সেনাপতি সরফরাজের পরাজয়ের পর আলিবর্দির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তিনি রাতারাতি পক্ষত্যাগ করে মারাঠা পক্ষে সসৈন্যে যোগ দিলেন। মারাঠারা বর্ধমান শহরে আগুন লাগিয়ে দিল, যথেচ্ছ লুট-হত্যা-ধর্ষণ চালাল। বাঙালি সাধারণ মানুষ তাদের নাম দিল ‘বর্গি’। পুরো বাংলা বর্গির আক্রমণের ভয়ে কাঁপতে শুরু করল।
বর্ধমানে মারাঠি ও নবাব বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হলো। মারাঠি বাহিনীই যুদ্ধে বেশি সাফল্য পেয়েছিল। রঘুজি ভোঁসলে এগিয়ে এসে কাটোয়ায় শিবির স্থাপন করলেন। মির হাবিব মারাঠাদের নিয়ে এক ঝটিকা আক্রমণে মুর্শিদাবাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে সেখান থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুট করে আনলেন। কৌশলী জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদ এই বিপর্যয়কেও ব্যবসার কাজে লাগালেন। দাবি করলেন, মির হাবিব তাঁর কাছ থেকে দুই কোটি টাকা নিয়ে গেছেন।
আলিবর্দি স্থৈর্যের সঙ্গে রণকৌশল ঠিক করলেন। তিনি বিহার ও পূর্ববঙ্গ থেকে সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে কাটোয়ায় তিনি মারাঠা বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের প্রথমে মেদিনীপুর, পরে চিল্কা হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিম তীর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে বাধ্য করলেন। বারবার বাংলায় মারাঠা আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি মারাঠাদের প্রধান সেনাপতি পেশোয়া বালাজিরাওয়ের সঙ্গে সন্ধি করলেন, তাঁকে ২২ লাখ টাকা ও চৌথ দিতে রাজি হলেন। কিন্তু মারাঠাদের আক্রমণ থেকে তিনি রেহাই পেলেন না। থেমে থেমে রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতিদের নেতৃত্বে মারাঠা আক্রমণ চলতেই থাকল। বাংলার প্রায় চার লাখ লোক প্রাণ হারাল। অন্তত এক লাখ লোক দাসে পরিণত হলো। ভাগীরথী ও গঙ্গার পূর্ব তীর প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে পড়ল। ওড়িশার ওপর কর্তৃত্ব হারিয়ে আলিবর্দির মেজজামাই সৈয়দ আহমদ বাংলায় এসে হুগলির শাসনকর্তা হিসেবে থেকে যেতে বাধ্য হলেন।
১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে মারাঠা বাহিনী আবার এসে কাটোয়ায় শিবির ফেলল। বারবার মারাঠা আক্রমণে বিচলিত আলিবর্দি তাঁর প্রধান সেনাপতি মোস্তফা খানকে বললেন, কোনো উপায়ে মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করতে পারলে তিনি মোস্তফা খানকে আজিমাবাদের (পাটনার) শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। মোস্তফা খান ভাস্কর পণ্ডিতকে সন্ধির প্রস্তাব পাঠালেন। সন্ধির আলোচনার নামে মানকরায় (এখন সারগাছি, বহরমপুরের কাছে) শিবির স্থাপন করা হলো। আলিবর্দি খান নিজেও শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ভাস্কর পণ্ডিত ও তাঁর অন্য মারাঠা সেনাপতিরা আলোচনার জন্য শিবিরে উপস্থিত হতেই মোস্তফা খান ও আলিবর্দির অন্য সেনাপতিরা অতর্কিত আক্রমণে তাঁদের হত্যা করলেন। এই ‘যুদ্ধে’ মির জাফর ও তাঁর ভাই মির কাজিম বীরত্ব দেখিয়েছিলেন। আলিবর্দি এই কাপুরুষোচিত অভিযানের বিবরণ মোগল দরবারে পাঠিয়ে মোগল বাদশাহ মুহাম্মদ শাহের কাছ থেকে প্রশংসাও আদায় করে নিয়েছিলেন।
ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যার পর মোস্তফা খান আলিবর্দিকে প্রতিশ্রুতি পূরণের অনুরোধ করলেন। কিন্তু আলিবর্দি বিহারে মোস্তফা খানের শক্তি বাড়তে দিতে চাননি। তিনি টালবাহানা করতে শুরু করলেন। বিরক্ত মোস্তফা খান দুই মাস অপেক্ষা করে প্রায় হাজার দশেক অনুগত সৈন্যসহ পদত্যাগ করলেন। বকেয়া বেতন হিসেবে আলিবর্দির কাছ থেকে সতেরো লাখ টাকা আদায় করে নিয়ে পাটনার দিকে যাত্রা করলেন। বাংলা ও বিহারের নানা অঞ্চল থেকে বিক্ষুব্ধ আফগান সেনার একাংশ তাঁর সঙ্গে যোগ দিল।
মোস্তফা খান পাটনায় গিয়ে আলিবর্দির ছোট জামাই জয়নউদ্দিনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। স্থানীয় জমিদারদের সাহায্য নিয়ে জয়নউদ্দিন তাঁর মুখোমুখি হয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করলেন। তিন দফা যুদ্ধের পর মোস্তফা খান পরাজিত ও নিহত হলেন। কিন্তু আফগানদের সঙ্গে আলিবর্দির সম্পর্ক স্থায়ীভাবে শত্রুতায় রূপ নিল। আলিবর্দি তাঁর দুই আফগান সেনাপতি সরদার খান ও শমশের খানকে বরখাস্ত করলেন। তাঁরা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে মারাঠাদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে আলিবর্দির বিরুদ্ধে লড়াই করতে লাগলেন।
১৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মির হাবিবের নেতৃত্বে মারাঠা সৈন্য ওড়িশা দখল করে। আলিবর্দির মন্ত্রী জানকীরামের ছেলে দুর্লভরাম ওড়িশার শাসনকাজ চালাতেন। মারাঠারা তাঁকে বন্দী করে, পরে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। আলিবর্দি আবার এক অভিযানে গিয়ে কিছুদিনের জন্য ওড়িশা নিজের দখলে আনেন। মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে যুদ্ধক্লান্ত নবাব ভাবলেন, একটু আনন্দ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা দরকার। তিনি তাঁর দুই নাতির বিয়ের জোগাড় করলেন। দুই নাতির জন্যই তিনি মোগল বাদশাহের কাছ থেকে উপাধি আদায় করেছিলেন। বড় নাতি, যাঁকে আলিবর্দি নিজেই প্রতিপালন করতেন, সেই মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলির উপাধি হলো সিরাজ-উদ-দৌলা। তার পরেরজনের উপাধি হলো ইকরামউদ্দৌলা, একে প্রতিপালন করতেন তাঁর বড় মেয়ে-জামাই নওয়াজেশ। দুই বিয়েতে আলিবর্দি ও নওয়াজেশ পাল্লা দিয়ে খরচ করলেন। প্রচুর খাবার, উপহার বিতরণ হলো, গীত-বাদ্য হলো, আলোকসজ্জা-আতশবাজি হলো। সিরাজ-উদ-দৌলার বিয়ে হলো সরফরাজ খানের আমলের অভিজাত সভাসদ মির্জা ইরাজ খানের মেয়ে উমদাতউন্নিসার সঙ্গে। ইকরামউদ্দৌলার বিয়ে হলো তাঁদেরই জ্ঞাতি আতাউল্লাহ খানের মেয়ের সঙ্গে। বিয়ের অনুষ্ঠানে দিল্লি থেকে কয়েকজন নর্তকী নিয়ে আসা হয়েছিল। আলিবর্দির সেনাপতি ও ভগ্নিপতি মির জাফর আলী খান দুজন নর্তকীকে দেখে এতই মুগ্ধ হলেন, তাঁদের বিয়ে করে ফেললেন। এই দুই নর্তকীর নতুন নাম হলো বব্বু বেগম ও মিন্নি বেগম।
সিরাজ-উদ-দৌলার বিয়ের কিছুদিন পর, ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে আলিবর্দির ছোট জামাই জয়নউদ্দিন আলিবর্দিকে জানালেন, তাঁর বরখাস্ত করা দুই আফগান সেনাপতি সরদার খান ও শমশের খান বিরোধের অবসান চান। জয়নউদ্দিন তাঁদের নিজের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে আলিবর্দির অনুমতি চাচ্ছেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আলিবর্দি সে অনুমতি দিলেন।
জয়নউদ্দিন আজিমাবাদে আফগান সেনাপতিদের হাতে পানের বিড়া ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের বরণ করে নিচ্ছিলেন। তিনি জানতেন না, আফগানরা এই অনুষ্ঠানে এসেছেন মোস্তফা খানের হত্যার বদলা নিতে, আফগান সৈন্য ও সেনাপতিদের পদচ্যুতির প্রতিশোধ নিতে। ভাস্কর পণ্ডিতকে যেভাবে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়েছিল, সেই একই কায়দায় আফগান সেনাপতি আবদুর রশিদ খান জয়নউদ্দিনকে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করেন। আফগান সেনাপতিরা এরপর জয়নউদ্দিনের বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে লুট করেন, জয়নউদ্দিনের স্ত্রী-সন্তানদের বন্দী করেন। জয়নউদ্দিনের বাবা, আলিবর্দির ভাই হাজি আহমদকে গ্রেপ্তার করে ষোলো দিন ধরে নির্যাতন করে তাঁর যাবতীয় সম্পদের হিসাব জেনে নেওয়া হয় এবং তারপরই কেবল তাঁকে খুন করা হয়। আলিবর্দির মেয়ে, জয়নউদ্দিনের স্ত্রী, সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমিনা বেগমকে দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ (মির্জা মেহদি) এক শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়। আফগান সেনাপতি শমশের খানের ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা আমিনা বেগমকে ধর্ষণ করেন।
বিদ্রোহী আফগান সৈন্যরা জানতেন, আলিবর্দি প্রতিশোধ নিতে আসবেন। তাঁরা মৈত্রীর প্রস্তাব দিয়ে মারাঠা রাজা রঘুজি ভোঁসলের ছেলে জানোজি ভোঁসলে আর সেনাপতি মির হাবিবকে ডেকে আলিবর্দিবিরোধী মৈত্রী গড়তে প্রস্তাব দিলেন। জানোজি ভোঁসলে আফগানদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেননি। তিনি প্রস্তাব করলেন, আফগানরা আলিবর্দির বাহিনীকে উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করবেন। তিনি আলিবর্দিকে আক্রমণ করবেন দক্ষিণ দিক থেকে। আলিবর্দির পরাজয়ের পর তিনি আফগান শাসকদের হাতে বিহারের শাসনভার অর্পণ করবেন এবং তাঁদের কাছ থেকে বছর বছর চৌথ আদায় করবেন।
১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে আলিবর্দি খান মুর্শিদাবাদ থেকে ২৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আজিমাবাদ অভিযানে গেলেন। বার নামের এক এলাকায় তিরিশ হাজার আফগান সৈন্য তাঁর মুখোমুখি হলো। পেছন থেকে চল্লিশ হাজার সৈন্যর এক মারাঠা বাহিনী কেটে ফেলল তাঁর রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা। দুই দিকে বিপুল শত্রুর সমাবেশ দেখে আলিবর্দির সেনাপতিরা ভয় পেতে শুরু করলেন। আলিবর্দির প্রিয় নাতি সিরাজ-উদ-দৌলাও বলে ফেললেন, ‘আগে মারাঠাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে পরে আফগানদের ব্যবস্থা করা উচিত, না হলে বড় দেরি হয়ে যেতে পারে!’ জীবনে এই একবার আলিবর্দি নাতির দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। বললেন, ‘পেছনের শত্রুর কথা ভুলে যাও। আমাদের আসল শত্রু সামনে। আগে তাদের শিক্ষা দিয়ে নিই, তার পর পেছনে ফিরব!’
আলিবর্দি খান যে হিংস্রতার সঙ্গে পুরো শক্তি নিয়ে আফগানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, শমশের খান বা সর্দার খান তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, দুই দিকের লড়াইয়ে পর্যুদস্ত আলিবর্দির বাহিনীকে তাঁরা অনায়াসে নিশ্চিহ্ন করবেন। জানোজী ভোঁসলেও সম্ভবত অপেক্ষা করছিলেন, লড়াইয়ে নবাবের বাহিনী এবং আফগান বিদ্রোহীদের বাহিনী দুটোই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন তিনি দুই দলকে এক সুযোগে নিকাশ করে দেবেন।
কিন্তু আলিবর্দির বাহিনীর তেজের মুখে আফগান বাহিনী এক দিনের লড়াইয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হলো। সর্দার খান মারা পড়লেন কামানের গোলায়, শমশের খানের মাথা কেটে এনে আলিবর্দির পায়ের কাছে রাখল তাঁর সৈন্যরা। বিজয়ী নবাব বাহিনীর তেজ দেখে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আগুয়ান মারাঠা বাহিনীও থমকে গেল। জানোজি ভোঁসলে বুঝলেন, আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা এই বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে গেলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হবে। তিনি নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন, তবে মির হাবিব ও সৈন্যদের রেখে গেলেন বাংলা লুটের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য।
আমিনা বেগম ও তাঁর সন্তানদের উদ্ধার করে আলিবর্দি খানের কাছে নিয়ে আসা হলো। শোকগ্রস্ত, নির্যাতনের শিকার মেয়েকে দেখতে পেয়ে আলিবর্দির মতো শক্ত মানুষও কেঁদে ফেললেন। বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হয়েও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি, এই আক্ষেপ তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।
নিহত আফগান সেনাপতি শমশের খানের স্ত্রী ও কন্যাদের আলিবর্দি খানের সামনে নিয়ে আসা হলো। তিনি কাউকে তাঁদের অসম্মান করতে দিলেন না। মুর্শিদাবাদের প্রাসাদের এক অংশে তিনি আজীবন তাঁদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁদের মহলে কোনো পুরুষ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। এমনকি সিরাজ-উদ-দৌলা, যিনি প্রাসাদের সব অংশে অবাধে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন, তিনিও ওই মহলটিতে যাওয়ার অনুমতি পাননি। শত্রুর পরিবারের সম্মান রক্ষা করেই আলিবর্দি খান নিজের পরিবারের অসম্মানের শোধ নিয়েছিলেন।
আফগান বিদ্রোহ দমনের পর আলিবর্দি খান মারাঠা দমনের জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। বাংলার জমিদারেরা মারাঠা অভিযানের জন্য আলিবর্দি খানের কাছে যুদ্ধ-তহবিল হিসেবে এক কোটি টাকা দিলেন। ১৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে নাতি সিরাজ-উদ-দৌলাকে নিয়ে আলিবর্দি নতুন উদ্যমে মির হাবিবের সৈন্যদলকে ধাওয়া করতে শুরু করেন।
নানা-নাতি যখন মারাঠাবিরোধী অভিযানে ব্যস্ত, মির জাফর আলী খান বাংলার জমিদার ও আলিবর্দির অমাত্যদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে তাঁদের দিয়ে সৈন্যদের কিছু কাল্পনিক তালিকা বানিয়ে নেন। এই তালিকা অনুযায়ী সৈন্যদের বেতন হিসেবে নবাবের কোষাগার থেকে যে টাকা আদায় করা হতো, তা ভাগাভাগি হয়ে যেত মির জাফর ও তাঁর সহযোগীদের মধ্যে। মির জাফর অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন এবং ধীরে ধীরে নিজের একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে লাগলেন।
১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বারবার লড়াইয়ের পর নবাব আলিবর্দি খান এবং জানোজি ভোঁসলে উভয়েই বুঝলেন, যুদ্ধে মীমাংসা অসম্ভব। মির হাবিব মারাঠাদের হয়ে আলিবর্দি খানের সঙ্গে এক সন্ধি চুক্তি করলেন। চুক্তি অনুযায়ী মির হাবিব ওড়িশার শাসনকর্তা হলেন। সুবর্ণরেখা নদীর দক্ষিণ তীর পর্যন্ত মারাঠাদের এবং উত্তর তীর থেকে নবাবের এলাকা নির্ধারিত হলো। আলিবর্দি খান বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব থেকে শুধু বাংলা-বিহারের নবাবে পরিণত হলেন। তবে বাংলায় মারাঠা আক্রমণ থেমে গেল, অর্থনীতিতে গতি ফিরে এল। মারাঠাপীড়িত অঞ্চলে এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দিতে লাগল ইংরেজ, ফরাসি আর ওলন্দাজ বণিকেরা। ক্রমেই তাদের সম্পদ ও লোকবল বাড়তে লাগল। আলিবর্দি জেনেশুনেও তাঁদের বাধা দিতে পারলেন না। বিদেশি বণিকদের নৌশক্তি সম্পর্কে তিনি জানতেন, এ-ও জানতেন যে নিজেদের দুর্বল, প্রায় অস্তিত্বহীন নৌবহর দিয়ে তিনি এই বণিকদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন না।
পক্ষত্যাগী মির হাবিব বেশি দিন ওড়িশার ক্ষমতা ভোগ করতে পারেননি। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে জানোজির প্রশ্রয়ে এক সেনা বিদ্রোহে নিজের বাহিনীর সৈন্যদের হাতেই তিনি মারা পড়েন।
নবাব আলিবর্দি খান মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে কিছুদিন স্বস্তির সঙ্গে রাজত্ব করলেন। নানা দুর্যোগ পার হয়েও তিনি ক্ষমতায় টিকে আছেন, মারাঠা অত্যাচার বন্ধ করতে পেরেছেন—এটা দেখে তাঁর অমাত্যরা আলিবর্দির ওপর আস্থা ফিরে পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ (যেমন জগৎ শেঠ মাহতাব চাঁদ, বর্ধমানের রাজা ত্রিলোকচাঁদ) অনাদায়ী খাজনা পরিশোধ করে আলিবর্দির যুদ্ধপীড়িত কোষাগারের দুরবস্থা সামলান।
এই সুখের দিনেই আলিবর্দি কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হলেন। তাঁর অসুস্থ অবস্থা দেখে রাজপ্রাসাদে উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব-ষড়যন্ত্র চলতে লাগল। আলিবর্দি খান চেষ্টা করেও সে দ্বন্দ্বের অবসান করতে পারলেন না। প্রিয় নাতি সিরাজ-উদ-দৌলাও সিংহাসন পেতে অস্থির হয়ে উঠলেন, নানার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হলো। এর মধ্যে আলিবর্দির পরিবারে একের পর এক মৃত্যু ঘটল। গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে আলিবর্দির নাতি ইকরামউদ্দৌলা মারা গেলেন। সেই শোকে কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেলেন ইকরামউদ্দৌলার পালক পিতা, আলিবর্দির বড় জামাই নওয়াজেশ। এর কিছুদিন পরই মাথার টিউমারের কারণে বিহারে আলিবর্দির মেজ জামাই সৈয়দ আহমদ মারা গেলেন।
আলিবর্দি এসব শোকের ধকল আর কাটাতে পারেননি। ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে তিনি মারা যান। মতিঝিল প্রাসাদের উল্টো দিকে ভাগীরথী নদীর অপর তীরে ডাহাপাড়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আলিবর্দি ব্যক্তিজীবনে এক নিয়মনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। নামাজ-রোজা নিয়মিতভাবে করেছেন, কখনো মদ্যপান করেননি, একাধিক বিয়ে করেননি, নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গসুখ উপভোগ করেননি। অথচ রাজনীতিতে, ক্ষমতার লড়াইয়ে তিনি বহু চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন, বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিশ্রুতি রাখেননি। ষড়যন্ত্র করে সিংহাসন দখল করতে গিয়ে বাংলার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে তিনি খর্ব করেছিলেন। ইতিহাস সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাংলার পরাজয়ের নায়ক বলে বিবেচনা করলেও সেই পরাজয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব আলিবর্দি খানের সময়ে। অন্যায়ভাবে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে তিনি দুর্নীতি, অপকৌশল, অপশাসন, দুর্বৃত্তকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। ইতিহাসে এসব আচরণের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব যেমনই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বড় ভয়ংকর।
আলিবর্দি খানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অভিপ্রায়ই যে বাংলাকে দীর্ঘকালের পরাধীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, ইতিহাসের পাতায় সে কথা লেখা নেই। কেবল মুর্শিদাবাদের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হাহাকারের মতো বয়ে যাওয়া বাতাস এখনো অস্ফুটে তার গল্প বলে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন