সিরাজ-উদ-দৌলা যতখানি সিনেমার নায়ক, ইতিহাসের ততখানি নন। তাঁর ভাবমূর্তির নেতিবাচক অংশের অনেকটাই বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন করা ইংরেজের দ্বারা চরিত্রহননের কৌশল। আবার ইংরেজ শাসনে অতিষ্ঠ পরবর্তীকালের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ইংরেজকে নাকচ করতে গিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলাকে এক মহান স্বাধীনতাসংগ্রামীর রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। দুটোর কোনোটিই তাঁর আসল রূপ নয়। তিনি আসলে এক ভাগ্যহীন নবাবজাদা, নবাব হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠার সুযোগ যিনি পাননি।
১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দে যখন মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলির জন্ম, তাঁর দুর্ভাগ্যের তখন থেকেই শুরু। পুত্রহীন আলিবর্দি খান তাঁর জন্মের কিছুদিন পর বিহারের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হলেন। নবাব সুজাউদ্দিনের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে আলিবর্দি এই পদ পেয়েছিলেন, কিন্তু কেন যেন তাঁর মনে হলো, নাতির জন্মই এই সৌভাগ্যের কারণ। আলিবর্দি তাঁর ছোট মেয়ে আমিনা ও ছোট জামাই জয়নউদ্দিনকে হুকুম দিলেন, ছোট্ট মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলি আলিবর্দির উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিপালিত হবেন।
আলিবর্দির নিঃসন্তান বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম ও বড় জামাই নওয়াজেশ এই শিশুকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাবান আলিবর্দির ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার শক্তি তাঁদের ছিল না। তাঁরা মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলির অধিকার হারালেন, আর মির্জা মুহাম্মদ শাহ কুলি সারা জীবনের মতো তাঁদের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেন। শুধু তাঁদের নয়, মির্জা মুহাম্মদ তাঁর মেজ চাচা সৈয়দ আহমদ বা মেজ খালা মুনিরা বেগমের স্নেহও পাননি। জন্মের পরপর আলিবর্দি খানের উত্তরাধিকার নির্বাচিত হওয়ায় মা-বাবার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, খালা-চাচাদের ঈর্ষার শিকার হয়েছেন। মির্জা মুহাম্মদের অসুখী শৈশব মানুষ হিসেবে তাঁর পূর্ণ বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে আলিবর্দি যখন সরফরাজ খানকে হত্যা করে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হলেন, তখন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁকে যে আরও বেশি ঈর্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। আলিবর্দি তাঁর জন্য মোগল দরবার থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা উপাধি আনার পর এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, বাংলার সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার নির্বাচনে আলিবর্দি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। সেটা জেনে ঘসেটি-নওয়াজেশ দম্পতি সিরাজ-উদ-দৌলার আপন ছোট ভাইকে দত্তক নেন। নিজেদের এই পালিত পুত্রকে দিয়ে তাঁরা সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে খোলাখুলি উত্তরাধিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। তাঁদের ইচ্ছায় সিরাজ-উদ-দৌলার মতো তাঁদের পালিত পুত্রের জন্যও আলিবর্দি মোগল দরবার থেকে ‘ইকরামউদ্দৌলা’ উপাধি আনিয়ে দেন। ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে আলিবর্দি যখন ধুমধাম করে সিরাজ-উদ-দৌলার বিয়ে দিলেন, তখন ঘসেটি-নওয়াজেশ দম্পতিও সমান ধুমধামের সঙ্গে তাঁদের পালিত পুত্রের বিয়ে দেন। খালা-চাচাদের এই নির্দয় ঈর্ষা যেকোনো কিশোরকেই নিরাপত্তাহীনতায় ফেলতে পারে।
আলিবর্দির রাজত্বের পুরো সময়টাতেই তিনি রণাঙ্গনে ব্যস্ত ছিলেন। মারাঠাদের বিরুদ্ধে বাংলা আর ওড়িশায় অভিযান, বিহারে বিদ্রোহ দমন– শৈশব আর কৈশোরে দশ বছর ধরে বহু অভিযানে সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁর নানার কাছাকাছি যুদ্ধক্ষেত্রের বিপদ আর অস্থিরতার মধ্যে সময় কাটিয়েছেন। রাষ্ট্রচালনার উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য যে পরিবেশ, যে স্থিতি-অবস্থা, যে অভিভাবকত্ব দরকার হয়, সিরাজ-উদ-দৌলা সেসব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নানা আলিবর্দি খান আর নানি শরফউন্নিসা তাঁকে খুব স্নেহ করতেন ঠিকই, কিন্তু স্নেহ সব বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না।
বিহার বিদ্রোহের সময় ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনাটি তাঁর মনে কী রকম আঘাত দিয়েছিল, ইতিহাসের পুঁথির শুকনো পাতায় তার হদিস করা বৃথা। তিনি নিজে তখন পনেরো বছরের কিশোর, ইতিমধ্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই অবস্থায় তিনি খবর পেলেন, বিহারে বিদ্রোহী আফগান সেনাপতি শমশের খান তাঁর বাবা ও দাদাকে হত্যা করেছেন, বন্দিশিবিরে তাঁর মা ধর্ষিত হয়েছেন। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাটনায় যেতে পারেননি, নবাব আলিবর্দি খানের বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছে। মরণপণ যুদ্ধ করে আলিবর্দি খান আর সিরাজ-উদ-দৌলা বিদ্রোহী আফগানদের পরাজিত করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ লেখা আছে। কিন্তু আহত, ভেঙে পড়া মাকে উদ্ধার করে সিরাজ-উদ-দৌলার মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল, তা নিয়ে কেউ কিছু লেখেননি। এসব মানসিক আঘাত, হতাশা, যন্ত্রণাকে ইতিহাস পাত্তা দেয় না।
কিন্তু বিহারের সেই ঘটনার পর থেকে কিশোর সিরাজ ক্রমেই নবাব আলিবর্দি খানের ব্যাপারে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। সম্ভবত তাঁর মা-বাবা-দাদাকে রক্ষা করতে না পারার কারণে তিনি মনে মনে নানাকে দায়ী করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটল প্রেমে। নানি শরফউন্নিসার মহলের এক কিশোরী পরিচারিকাকে দেখে তিনি তাঁর প্রেমে পড়লেন। এই পরিচারিকার নাম ছিল রাজকুমারী। অতি অল্পবয়সে দুই বিয়ে (যথাক্রমে জেবউন্নিসা বেগম ও উমদাতউন্নিসা বেগমের সঙ্গে) করার পর সিরাজ-উদ-দৌলা আবার বিয়ে করতে চাইছেন দেখে নবাব আলিবর্দি রাজি হচ্ছিলেন না। একরকম জোর করেই সিরাজ-উদ-দৌলা নানির মত আদায় করলেন। রাজকুমারীকে বিয়ে করলেন, তাঁর নতুন নাম দিলেন লুৎফুন্নিসা। এই লুৎফুন্নিসার গর্ভেই এক বছর পর জন্ম নিল সিরাজ-উদ-দৌলার একমাত্র সন্তান উম্মে জোহরা বেগম।
সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নবাব আলিবর্দির সঙ্গে আবার বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এবার কারণটা রাজনৈতিক। জয়নউদ্দিনের মৃত্যুর পর আলিবর্দি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বিহারের নায়েবে নাজিম (প্রশাসক) বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলাকে তিনি কাছছাড়া করেননি। নবাবের প্রতিনিধি হিসেবে বিহার শাসন করতেন জানকীরাম। বিহারের এক পদচ্যুত কর্মকর্তা মেহদি নিসার খান সিরাজ-উদ-দৌলাকে খেপিয়ে তুললেন। তাঁকে বললেন, নবাব আলিবর্দি চিরকাল সিরাজ-উদ-দৌলাকে শিশুর মতো অসহায়, পরনির্ভর করে রাখতে চান। অপরিণত, মানসিক সংকটে থাকা সিরাজ-উদ-দৌলা এই পরামর্শ শুনে মুর্শিদাবাদ থেকে লুৎফুন্নিসা ও সদ্যোজাত উম্মে জোহরাকে নিয়ে প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে আজিমাবাদ (পাটনা) চলে গেলেন জানকীরামকে সরিয়ে নিজে বিহারের শাসনকর্তা হয়ে বসার আশায়। আলিবর্দি তখন মেদিনীপুর দুর্গে মারাঠা হামলার অপেক্ষায়। তিনি লোক পাঠিয়ে, বহু অনুনয়-বিনয় করেও সিরাজ-উদ-দৌলার মন গলাতে পারলেন না। সিরাজ-উদ-দৌলা আজিমাবাদ দুর্গ আক্রমণ করলেন।
ষাট-সত্তর জন সৈন্য নিয়ে আজিমাবাদ আক্রমণ করতে গিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজয় বরণ করতে হলো। তাঁর পরামর্শদাতা মেহদি নিসার খান মারা পড়লেন। নেহাত আলিবর্দির নাতি বলেই সিরাজ-উদ-দৌলার প্রাণরক্ষা হলো। এই হঠকারিতার ঘটনা আলিবর্দির অমাত্যদের মনে সিরাজ-উদ-দৌলার রাজ্য শাসনের ক্ষমতা নিয়ে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল।
সিরাজ-উদ-দৌলা নিজেও পরাজয়ের পর খানিকটা সংবিৎ ফিরে পেয়েছিলেন। আলিবর্দি খান বিহারে এসে পৌঁছানোর পর তিনি আলিবর্দি খানের কাছে ফিরে গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। আলিবর্দি খান তাঁকে শুধু ক্ষমাই করলেন না, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, সিরাজ-উদ-দৌলাই তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে বসবেন। নানা-নাতি একসঙ্গে মারাঠাদের বিরুদ্ধে অভিযানে গেলেন। ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি হলো, আলিবর্দি খান-সিরাজ-উদ-দৌলা মুর্শিদাবাদে ফিরে বছর দুয়েক শান্তির সময় উপভোগ করলেন। নবাব আলিবর্দি খান এ সময় প্রায়ই রাজধানী ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের গহিন জঙ্গলে (আজকের মেহেরপুর-কুষ্টিয়া অঞ্চলে) বাঘ ও হরিণ শিকার করতে যেতেন।
সীমান্তে শান্তি বিরাজ করলেও মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে ক্রমেই অশান্তি ঘনিয়ে আসছিল। আলিবর্দি খানের বড় জামাই নওয়াজেশ চাইছিলেন তাঁর পালিত পুত্র ইকরামউদ্দৌলা সিংহাসনে বসুক। তিনি রাজবল্লভ, জগৎ শেঠ মাহতাব চাঁদ, মানিকচন্দ্র ও মির জাফর আলী খানের সঙ্গে ইকরামউদ্দৌলাকে সিংহাসনে বসানোর পরিকল্পনা করছিলেন। নওয়াজেশের ভাগ্য খারাপ, বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইকরামউদ্দৌলা অকালে মারা গেলেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র কিছুকালের মতো বন্ধ রইল।
হোসেন কুলি খান ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে আবার এই সংকট জাগিয়ে তুললেন। হোসেন কুলি খান আলিবর্দি খানের বড় জামাই নওয়াজেশ খানের দেওয়ান হিসেবে ঢাকা থেকে রাজস্ব আদায় করতেন। নওয়াজেশ নানা বিষয়ে হোসেন কুলি খানকে খুব ভরসা করতেন। নওয়াজেশ খানের অন্দরমহলে হোসেন কুলি খানের অবাধ যাতায়াত ছিল। ক্রমেই ঘসেটি বেগমের সঙ্গে হোসেন কুলি খানের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। মুর্শিদাবাদে এই কথা অনেকেই জানত।
ভাইয়ের নপুংসক ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা স্মরণ করেই বোধ হয় আলিবর্দি খান কখনো এই সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। কিন্তু ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন কুলি খান ঘসেটির ছোট বোন আমিনার দিকে আকৃষ্ট হলেন। ঘসেটি ক্ষুব্ধ হলেন, তাঁর চেয়েও বেশি ক্ষুব্ধ হলেন সিরাজ-উদ-দৌলা। নবাব আলিবর্দি খানও ধৈর্য হারিয়েছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলা যখন নবাবের কাছে হোসেন কুলি খানকে হত্যার অনুমতি চাইলেন, তিনি নাতিকে বললেন, ‘বড় জামাইয়ের অনুমতি ছাড়া তাকে হত্যা করা যাবে না।’
এই কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন অনুমোদন আঁচ করতে সিরাজ-উদ-দৌলার অসুবিধা হয়নি। তিনি তাঁর বড় চাচা নওয়াজেশের অনুমতি নিলেন। ঘসেটি বেগম ঈর্ষার তাড়নায় নওয়াজেশের অনুমতি আদায় করে দিয়েছিলেন। ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে নবাব আলিবর্দি খান চক্ষুলজ্জা এড়াতে শিকারের জন্য রাজমহলে গেলেন, সেই সুযোগে সিরাজ-উদ-দৌলা লোক পাঠিয়ে হোসেন কুলি খানকে খুন করালেন। হোসেন কুলি খানের অন্ধ বড় ভাই প্রাক্তন সেনাপতি হায়দর আলী খানকেও হত্যা করা হলো। সিরাজ-উদ-দৌলা পারিবারিক কেলেঙ্কারির হাত থেকে বাঁচলেন, কিন্তু নবাবের অমাত্যদের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ বেড়ে উঠল।
হোসেন কুলি খানকে হত্যার পর মুর্শিদাবাদের কেল্লার ভেতর নবাব আলিবর্দির প্রাসাদে সিরাজ-উদ-দৌলা আর বসবাস করতে চাইছিলেন না— সেটা আত্মরক্ষার খাতিরেই হোক কিংবা নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ার প্রয়োজনেই হোক। নবাব আলিবর্দির অনুমতি নিয়ে তিনি ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে মনসুরগঞ্জে হীরাঝিল নামের আলিশান একটি প্রাসাদ তৈরি করে সেখানেই থাকতে লাগলেন। হীরাঝিল প্রাসাদে অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে তাঁর সুরাসক্তি বেড়ে গিয়েছিল, নর্তকীদের ব্যাপারেও খুব আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। দিল্লি থেকে আসা ফৈজি নামের এক নর্তকীকে সিরাজ-উদ-দৌলা নাকি ভালোবেসে ফেলেছিলেন, সে নর্তকী তাঁর আড়ালে তাঁরই বোনের স্বামী সৈয়দ মোহম্মদ খানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল। সিরাজ-উদ-দৌলা জানতে পেরে নর্তকীকে প্রাণদণ্ড দেন। রানি ভবানীর বিধবা মেয়ে তারাসুন্দরীকেও নাকি সিরাজ-উদ-দৌলা নিজের অন্তঃপুরে আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নবাব আলিবর্দি তাঁকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন।
১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজ-উদ-দৌলার দুই চাচা নওয়াজেশ খান ও সৈয়দ আহমদ মারা যান। ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে আলিবর্দি নিজেও কিডনির রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, সেই অসুখেই এপ্রিল মাসে তিনি মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে আলিবর্দি সিরাজ-উদ-দৌলাকেই নবাবি অর্পণ করে গিয়েছিলেন। তিনি সিরাজ-উদ-দৌলাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন, সিরাজ-উদ-দৌলা আর কখনো মদ স্পর্শ করবে না, ইন্দ্রিয়বিলাসকে প্রশ্রয় দেবে না। সিরাজ-উদ-দৌলা আমৃত্যু সে অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন।
সিরাজবিরোধী অমাত্যরাও সিরাজের সিংহাসন আরোহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি, কারণ তাঁদের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু সিরাজের বড় খালা ঘসেটি বেগম হার মানার পাত্রী নন। তিনি ইকরামউদ্দৌলার উপপত্নীর সন্তান মুরাদউদ্দৌলাকে সিংহাসনে বসানোর জন্য সেনাপতি মির নজর আলীকে প্রচুর টাকা দিলেন। মির নজর আলী টাকা দিয়ে মুর্শিদাবাদের সৈনিকদের কেনার চেষ্টা করলেন। তারা টাকা নিল, কিন্তু বিদ্ৰোহ করার বদলে যে যার গ্রামে চলে গেল। বিদ্রোহ অসফল হওয়ায় মির জাফর আলী, রাজবল্লভ, দুর্লভরাম সবাই ঘসেটি বেগমের পেছন থেকে সরে দাঁড়ালেন। সিরাজ-উদ-দৌলা এই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে তাঁর বড় খালাকে গ্রেপ্তার করলেন, মতিঝিল প্রাসাদ থেকে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখলেন। তিনি মির জাফর আলীকে সেনাবাহিনীর বেতন দেওয়ার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেন, সে দায়িত্ব দেওয়া হলো ঢাকা থেকে আসা মির মদনকে। সেনাবাহিনীতে অন্য সেনাপতিদের টপকে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলো সিরাজ-উদ-দৌলার অনুগত মোহনলাল কাশ্মীরিকে।
নবাবের দরবারে এই আমূল পরিবর্তন দেখে রাজবল্লভ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। মতিঝিল থেকে ঘসেটি বেগমের পনেরো লাখ নগদ টাকা আর রত্নভান্ডার বাজেয়াপ্ত হলেও তাঁর ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট থেকে পাওয়া রাজস্বের এক কোটি টাকা রাজবল্লভের কাছেই গচ্ছিত ছিল। জগৎ শেঠ মাহতাব চাঁদের পরামর্শে তাঁর ছেলে কৃষ্ণচাঁদকে সে টাকা নিয়ে কলকাতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসক রজার ড্রেকের কাছে আশ্রয় নিতে পাঠালেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা এই খবর পেলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা বিদেশি বণিকদের দুর্গে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে, এটা তাঁর অসহ্য বোধ হলো। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে রজার ড্রেককে চিঠি লিখে জানালেন, কৃষ্ণবল্লভকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে আর কলকাতায় ইংরেজ দুর্গে প্রাচীর নির্মাণের কাজ বন্ধ করতে হবে। সে চিঠি আর্মেনীয় বণিক খাজা ওয়াজেদের মারফত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পৌঁছাল, কিন্তু রজার ড্রেক তার কোনো উত্তর দিলেন না। ক্ষুব্ধ সিরাজ আরেকটি চিঠি পাঠালেন, তাতে লিখলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাবতীয় অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। সে চিঠিরও কোনো উত্তর এল না।
আলিবর্দির পরামর্শমতো সিরাজ-উদ-দৌলা বিদেশি বণিকদের নৌশক্তিকে সম্ভ্রম দেখিয়ে এত দিন তাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলেছেন। কিন্তু রজার ড্রেকের ঔদ্ধত্য তিনি বরদাশত করতে পারলেন না। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সেনাবাহিনী নিয়ে কলকাতার দিকে যাত্রা করলেন। ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে নবাবের বাহিনী প্রথমে কাসিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করে নিল, তারপর কলকাতায় গিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ করল।
৩৫ বছর বয়সী ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক যত উদ্ধত ছিলেন, তত রণকুশলী ছিলেন না। নবাবের সৈন্য আসতে দেখে তিনি দিশেহারা হয়ে মাদ্রাজ ঘাঁটি থেকে সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। কিন্তু মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় সৈন্য আসতে সময় লাগে। মাত্র পাঁচ শ সৈন্য নিয়ে রজার ড্রেক লড়াইয়ের জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু লড়াইয়ের আতঙ্কেই ইংরেজ বাহিনী থেকে দেশি লস্করেরা পালাতে শুরু করল। আতঙ্কে দিশেহারা ড্রেক দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু (উমিচাঁদ আর কৃষ্ণচাঁদ) পক্ষত্যাগ করে নবাবের পক্ষে যোগ দিতে পারেন, এই সন্দেহ করে তাঁদের এক অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে ঢুকিয়ে রাখলেন। এখানে মদ্যপদের আটকে রেখে সাজা দেওয়া হতো, ইংরেজরা এই ঘুটঘুটে অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠের নাম দিয়েছিল ব্ল্যাক হোল।
কিন্তু নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যখন কলকাতার কাছেই এসে পৌঁছালেন, তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেশি লস্করেরা পালালেন তো বটেই, এমনকি দুর্গ আক্রমণের আগের রাতে গভর্নর ড্রেক নিজেও জন হলওয়েল নামের এক কর্মকর্তার হাতে দুর্গ রক্ষার ভার দিয়ে নিজে দুর্গের ইংরেজ মহিলা ও শিশুদের নিয়ে ৩৫ মাইল দক্ষিণে ফলতায় পালিয়ে গেলেন, যাতে দরকার হলে জাহাজে উঠে মাদ্রাজ চলে যেতে পারেন। দুর্গ রক্ষার লড়াই করতে বাকি থাকল দেড় শ লোক। ইংরেজ ইতিহাসের বিজয়ী পক্ষ না হলে রজার ড্রেকের এসব নির্বুদ্ধিতার কথা বড় হরফে লেখা থাকত।
সিরাজ-উদ-দৌলা মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তা কলকাতায় কাজে লাগালেন। ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন সকালে তিনি বাহিনী নিয়ে তীব্রগতিতে ধেয়ে এলেন, ইংরেজদের প্রতিরক্ষার সময় দিলেন না। ইংরেজের কামান ঠিকমতো গর্জে ওঠার আগেই তাঁর সৈন্যরা দুর্গের দক্ষিণ দেয়াল টপকে ঢুকে পড়ল। যুদ্ধে তিরিশ-চল্লিশজন ইংরেজ সৈন্য নিহত হয়েছিল, বাকি সব ইংরেজ বন্দী হলো। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা দুর্গের যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিলেন। ইংরেজদের নেতা জন হলওয়েলসহ এক শ জনকে বন্দী করে রাখা হলো। রাতের বেলা বন্দী ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের সৈন্যদের হাতাহাতি হয়েছিল। নবাবের সৈন্যরা রেগে গিয়ে উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে যেখানে আটকে রেখেছিল, সেই অন্ধকূপেই প্রায় এক শ ইংরেজ বন্দীকে আটকে রাখে। জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে আলো-বাতাসহীন সেই কুঠুরিতে আটকে থাকা অবস্থায় এক রাতে অন্তত পঞ্চাশ-ষাটজন ইংরেজ বন্দী মারা যান। জন হলওয়েল প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরের দিন অবশিষ্ট ইংরেজ বন্দীকে মুক্তি দেন। জন হলওয়েল ও তাঁর তিন শীর্ষ কর্মকর্তা মুক্তি পান আরও তিন দিন পর। স্ত্রী লুৎফুন্নিসা ও নানি শরফউন্নিসার অনুরোধে তিনি কাসিমবাজার থেকে আটক কারখানা-প্রধান উইলিয়াম ওয়াটসকেও সপরিবার মুক্তি দেন।
কাসিমবাজার থেকে পালানোর সময় কয়েকজন ইংরেজ নারী মির জাফর আলী খানের কর্মকর্তা মির্জা আমির বেগের কাছে বন্দী হয়েছিলেন। মির্জা আমির বেগ মির জাফরের নির্দেশমতো নিজে নৌকায় করে তাদের ফলতায় রজার ড্রেকের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসেন। এই ঘটনায় ইংরেজরা মির জাফরের ওপর খুব সন্তুষ্ট হলেন। তাঁরা এ-ও বুঝতে পারলেন, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে লড়াই করলে তাঁরা মুর্শিদাবাদেই খুব প্রভাবশালী মিত্র পাবেন।
জন হলওয়েল মাদ্রাজে অতিরঞ্জিত খবর পাঠালেন, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সরাসরি নির্দেশে ঠান্ডা মাথায় ১২৩জন ইংরেজকে ‘ব্ল্যাক হোলে’ বন্দী রেখে হত্যা করা হয়েছে। মাদ্রাজের ইংরেজরা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হলেন। অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রবার্ট ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নেতৃত্বে মাদ্রাজ থেকে জাহাজে করে সেনাবাহিনী পাঠাল।
ফোর্ট উইলিয়াম দখল করার পর সিরাজ-উদ-দৌলা ভেবেছিলেন, ইংরেজ বণিক ঔদ্ধত্যের শাস্তি পেয়েছে। কলকাতাকে ‘আলিনগর’ নাম দিয়ে তিনি বর্ধমানের রাজার দেওয়ান মানিক চাঁদের হাতে এর প্রতিরক্ষার ভার অর্পণ করে মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ক্লাইভ-ওয়াটসনের নৌবহর হুগলি নদী দিয়ে ঢুকে পড়ে বেদম গোলাবর্ষণ শুরু করল। নৌযুদ্ধে অপটু মানিক চাঁদ সভয়ে কলকাতা থেকে পিছু হটলেন। ইংরেজ বণিকেরা কলকাতা পুনর্দখল করলেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা এই খবর পেয়েও কলকাতার দিকে মন দিতে পারলেন না। উত্তর সীমান্তে তখন নতুন সংকট ঘনিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিরাজ-উদ-দৌলার মেজ চাচার ছেলে শওকত জং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা হয়ে খুশি ছিলেন না। মোগল দরবারের উজির মির শিহাবউদ্দিনকে কাজে লাগিয়ে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে একটি সনদ আদায় করেছেন, যে সনদের বলে তিনিই বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হবেন। এই তরুণের বয়স সিরাজ-উদ-দৌলার চেয়েও কম, প্রশাসক হিসেবেও তিনি খুব অপরিণত ছিলেন।
সিরাজ-উদ-দৌলা বিপদের আশঙ্কা করলেন। তাঁর নানা আলিবর্দি খানও মোগল দরবার থেকে এ রকম একটি সনদ আদায় করেই সরফরাজ খানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তিনি প্রথমে জানকীরামের ছেলে রায় রাসবিহারীকে পূর্ণিয়ার দুটো অঞ্চলের (কুন্ডুয়া আর বীরনগর) ফৌজদার করে পাঠালেন। শওকত জং সিরাজ-উদ-দৌলার এই সিদ্ধান্ত মানলেন না, সিরাজ-উদ-দৌলাকে বলে পাঠালেন, তিনিই এখন থেকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব। চাচাতো ভাই হওয়ার সুবাদে তিনি দয়া করে সিরাজ-উদ-দৌলাকে ঢাকায় একটি জমিদারি দিতে রাজি আছেন।
এই জবাব পেয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা সসৈন্যে অগ্রসর হলেন। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পূর্ণিয়া থেকে চল্লিশ মাইল দূরে মনিহারির প্রান্তরে (এখন নবাবগঞ্জ, বিহার) শওকত জং নিজের বাহিনী নিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলার মুখোমুখি হলেন। যুদ্ধে অপটু শওকত ভুলভাল নির্দেশনা দিয়ে নিজের বাহিনীকে বিপদে ফেললেন। সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাপতি মোহনলাল সহজেই শওকত জংয়ের বাহিনীকে পরাজিত করলেন। শওকত জং যুদ্ধের মধ্যেই মাথায় কামানের গোলা লেগে মারা পড়লেন। তাঁর সেনাপতিদের বেশির ভাগেরও একই পরিণতি হলো। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশে শওকত জং এবং তাঁর আত্মীয়দের মরদেহ মুর্শিদাবাদে নিয়ে গিয়ে আলিবর্দির সমাধি প্রাঙ্গণের এক পাশে সমাহিত করা হলো। সিরাজ-উদ-দৌলা শওকত জংয়ের ভাইদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করলেন। পূর্ণিয়ার শাসনভার মোহনলালের হাতে দিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদে ফিরে যান।
পূর্ণিয়ায় সহজ বিজয়ের পর সিরাজ-উদ-দৌলা আশা করেছিলেন, মুর্শিদাবাদে শান্তি ফিরে আসবে। তা হয়নি। মির জাফর ও দুর্লভরাম দুজনেই পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা হতে চেয়েছিলেন। নবাব সে ভার মোহনলালের হাতে ন্যস্ত করায় দুজনেই ক্ষুব্ধ হন এবং খোলাখুলি বিদ্রোহ করেন। দুর্লভরাম মোহনলালের ওপর প্রতিশোধ নেবেন বলে ঠিক করেন। মির জাফর নবাবের দরবারে আসা বন্ধ করে দেন। জগৎ শেঠ এবং ঘসেটি বেগম গোপনে মির জাফরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। মুর্শিদাবাদের আশপাশে জমিদারবাড়িগুলোতে নাচের আসরের নামে নিয়মিত সিরাজবিরোধী মন্ত্রণাসভা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ইংরেজরা প্রথমে এসব সভায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে, পরে সশরীরে উপস্থিত হতে থাকেন।
১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে সিরাজ-উদ-দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সন্ধি করার চেষ্টা করেন। সে চেষ্টা সফল হয়নি। নবাব সসৈন্যে কলকাতায় আসার পর সন্ধির নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা কয়েকবার নবাবের শিবিরে এসে শিবিরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুঁটিয়ে দেখে যান। কয়েক দিন পর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা নবাবের বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। ইংরেজ পক্ষে দুই শ সৈন্য নিহত হলেও নবাবের বাহিনীর অন্তত চার শ সৈন্য নিহত হয়। নবাবের সেনাপতি দোস্ত মুহাম্মদ খান মারাত্মক আহত হয়ে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হন। তিনি ইংরেজদের তিন লাখ টাকা নগদ ক্ষতিপূরণ দেন। তাদের বাণিজ্যে আর বাধা সৃষ্টি করবেন না, এই অঙ্গীকারও করেন।
এই সময়ে বাংলা থেকে বহু দূরে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা বাংলার নবাবের দুর্ভাগ্যকে ত্বরান্বিত করে। প্রথমত, আফগান রাজা আহমদ শাহ দুররানি হামলা চালিয়ে দুর্বল মোগল সেনাবাহিনীকে তছনছ করে আগ্রা পর্যন্ত পৌঁছে যান, মোগল হেরেম থেকে শাহজাদিদের ধরে নিয়ে দাসীতে পরিণত করেন। গুজব শোনা যায়, তিনি বিহার ও বাংলা আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছেন। এই হামলা ঠেকাতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বিহারের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করতে বাধ্য হন, ফলে তাঁর নিজের শক্তি কমে যায়। আহমদ শাহ দুররানি শেষ পর্যন্ত বাংলা আক্রমণ করতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সাত বছরব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয়। সে ঢেউ ভারতেও এসে পড়ে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে ইংরেজ নৌবহর ফরাসি ঘাঁটি চন্দননগর আক্রমণ করে। চন্দননগরে ভাগীরথী নদীতে ফরাসিরা খুব কৌশলে জাহাজ ডুবিয়ে এমন ব্যবস্থা করেছিল যাতে তাদের চেনা একটিমাত্র খাত ধরে না এগিয়ে এলে যেকোনো নৌবহর ডোবা জাহাজ কিংবা চরায় আটকা পড়ে যেত। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক সব জাতিতেই থাকে। তারনো নামের এক ফরাসি বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ নৌবহরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। চন্দননগরে ফরাসি ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেল। নবাব সিরাজ দুর্লভরামকে আদেশ দিয়েছিলেন ফরাসিদের সাহায্য করতে। হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার এরই মধ্যে ইংরেজ পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি দুর্লভরামকে আটকে দিলেন, ফরাসিদের পরাজয় নিশ্চিত করলেন।
ফরাসি মিত্রদের হারিয়ে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার শক্তি আরও কমল। চন্দননগর থেকে পালিয়ে আসা কিছু ফরাসি সৈন্য কাসিমবাজারে ফরাসি সেনাপতি জ্যঁ ল-এর নেতৃত্বে জড়ো হয়ে মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাবের সেনাবাহিনীতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজের ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে একটু ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি চালে ভুল করলেন। জ্যঁ ল আর তার সৈন্যদের তিনি পাটনায় পাঠিয়ে দিলেন।
ক্লাইভ ও ওয়াটসন বুঝলেন, নবাবের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। এই সময়েই মির জাফর উমিচাঁদ ও মির্জা আমির বেগের মাধ্যমে ইংরেজদের কাছে প্রস্তাব পাঠালেন—ইংরেজরা যদি সিরাজ-উদ-দৌলাকে সরিয়ে তাঁকে বাংলার নবাব হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে, তিনি তাঁদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা দেবেন, তিন প্রদেশে অবাধ বাণিজ্যের অধিকার তো থাকলই।
চতুর ক্লাইভ এই প্রস্তাবে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে তিনি মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করলেন। তাঁর সৈন্যর সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার। নবাবের সৈন্যর সংখ্যা ষাট হাজার। ইংরেজ ইতিহাসবিদেরা একে বড় বীরত্বের কাজ বলে অভিধা দিয়েছেন। কিন্তু ক্লাইভ জানতেন, নবাবের ষাট হাজার সৈন্যর তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন ষড়যন্ত্রকারীরা, যাঁরা নবাবের পতন চান।
সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের জন্য বহু রথী-মহারথী একজোট হয়েছিলেন। জগৎ শেঠ মাহতাব চাঁদ তখন ইংরেজ বণিকের মহাজন, নিজের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার জন্য তিনি নবাবের জমিদারদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে দলে টানলেন। রানি ভবানী, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, রাজবল্লভ আগে থেকেই সিরাজ-উদ-দৌলার বিপক্ষে ছিলেন। নবাবের বড় খালা ঘসেটি বেগম মতিঝিল প্রাসাদ হাতছাড়া হওয়ার পরও অন্যদের কাছে গচ্ছিত বিপুল পরিমাণ টাকা ও সোনাদানার মালিক ছিলেন। তিনি নিজের সর্বস্ব সিরাজ-উদ-দৌলার সর্বনাশের পেছনে বিনিয়োগ করলেন। মির জাফর আলী খান নিজের খরচে একটি বড় সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন, সে বাহিনী সম্পূর্ণভাবে তাঁরই অনুগত ছিল। মির জাফর ইয়ার লুৎফে খান আর দুর্লভরামকেও দলে টেনেছিলেন। এই তিন সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার সৈন্য। সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় পলাশীর ময়দানে হয়নি, হয়েছিল মন্ত্রণাসভায়।
পলাশীতে যখন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বাহিনী ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি হলো, তখন সত্যিকারভাবে নবাবের অনুগত বাহিনী বলতে ছিল মির মদনের অনুগত অশ্বারোহী বাহিনী, রাজা মোহনলালের সৈন্যরা আর ফরাসি গোলন্দাজ সাঁ ফ্রের নেতৃত্বে থাকা গোলন্দাজরা। এই সাড়ে বারো হাজার সৈন্যের ভরসায় সিরাজ-উদ-দৌলা পলাশীর ময়দানে এসে হাজির হলেন।
২৩ জুন সকাল আটটায় যুদ্ধ শুরু হলো। সাঁ ফ্রের নেতৃত্বে নবাবের গোলন্দাজরা তাঁদের হালকা কামান দাগাতে শুরু করলেন। ইংরেজ ক্যাপ্টেন উইলিয়াম জেনিংস তাঁর ভারী কামান দিয়ে এই আক্রমণের জবাব দিলেন। কামানযুদ্ধের পাল্লা নবাবের বাহিনীর দিকেই হেলে ছিল।
সকাল এগারোটায় একপশলা বৃষ্টি হলো। নবাবের সৈন্যরা বৃষ্টির আশঙ্কা করেনি, বারুদ ঢেকে রাখার মতো কোনো আচ্ছাদন তাদের কাছে ছিল না। বেশির ভাগ বারুদ ভিজে যাওয়ায় সাঁ ফ্রের কামানগুলো কিছুক্ষণের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল। ইংরেজরাও কামান দাগানো বন্ধ করল। নবাবের অসমসাহসী সেনাপতি মির মদন ভাবলেন, ইংরেজের বারুদও ভিজে গিয়েছে। তিনি তাঁর বাহিনীকে সামনে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। মোহনলালের অনুগত বাহিনীও তাঁর পেছন পেছন সম্মুখযুদ্ধের জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ার লুৎফের বাহিনী, উত্তর-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্লভরামের বাহিনী কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে থাকা মির জাফরের বাহিনী এক পা-ও নড়ল না। মির মদন বা মোহনলাল যদি ইংরেজ সৈন্যকে পরাজিত করেও ফেলতেন, এই তিন বাহিনী সম্ভবত নবাবের অনুগত সৈন্যদের পেছন থেকে আক্রমণ করত।
তার দরকার পড়েনি। মির মদনের আক্রমণে ইংরেজ সৈন্য পিছিয়ে যাচ্ছিল ঠিক-ই, কিন্তু তাদের কামানের বারুদ ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ও শুকনো অবস্থায় ছিল। ইংরেজ হিসেবি জাতি, যুদ্ধের ময়দানেও তারা সুশৃঙ্খল অবস্থায় থাকতে জানে। ক্যাপ্টেন জেনিংস কামান দাগাতে শুরু করলেন। নবাবের সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। অকুতোভয় মির মদন তখনো সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, কামানের একটি গোলা এসে সোজা তাঁর বুকে লাগল।
মির মদনের মৃত্যুর পরও মোহনলাল আগুয়ান হয়ে ইংরেজ সৈন্যকে বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের ফলাফল অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু মির মদনের মৃত্যুর খবরে সিরাজ-উদ-দৌলা বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি মির জাফর আলী খানের কাছে গিয়ে তাঁর পায়ের কাছে নিজের মাথার পাগড়ি নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আমি আপনার কাছে আমার জীবন ও সম্মান সমর্পণ করছি। আপনার প্রতি আমার পরিবারের অবদানের কথা মনে রেখে আমাকে রক্ষা করুন!’
মির জাফরের মর্যাদাবোধ খুব উঁচু তারে বাঁধা ছিল না। সিরাজ-উদ-দৌলার এই অসহায় অবস্থার পুরো সুযোগ তিনি নিলেন। তিনি নবাবকে বললেন, আগুয়ান মোহনলালের বাহিনীকে ফিরিয়ে আনতে। কথা দিলেন, পরের দিন তিনি ইয়ার লুৎফে খান, দুর্লভরামের বাহিনীসহ ইংরেজদের আক্রমণ করবেন। মির জাফরের এই শঠতায় বিশ্বাস করে সিরাজ-উদ-দৌলা মোহনলালকে পিছু হটে আসার নির্দেশ দিলেন। নবাব হিসেবে এটি ছিল পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া তাঁর সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত।
রাজা মোহনলাল জানতেন, পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। তিনি এই নির্দেশ মানতে চাননি। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলা মির জাফরের প্ররোচনায় বারবার তাঁকে পিছিয়ে আসার নির্দেশ পাঠিয়ে যেতে লাগলেন। নিরুপায় মোহনলাল পিছিয়ে এলেন। তাঁর পিছু হটা দেখে নবাবের অনুগত সৈন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তাঁরা পালাতে শুরু করলেন। মেজর কিলপ্যাট্রিক রবার্ট ক্লাইভের অনুমতি নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করলেন। বিকেল পাঁচটার মধ্যেই ইংরেজরা যুদ্ধে বিজয় পেল। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা নিজেও তখন উটের পিঠে চড়ে মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করেছেন। মুর্শিদাবাদের বিশ্বাসঘাতক পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। এমনকি নবাবের অনুগত সৈন্যের মধ্যেও যুদ্ধে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা পাঁচ শর বেশি নয়। মির মদন, নৌবে সিং হাজারি, বাহাদুর খান আর দৌলত আলী ছাড়া নবাবের অনুগত সেনানায়কদের কেউই যুদ্ধে মারা যাননি। প্রায় বিনা যুদ্ধেই ইংরেজ সৈন্য ভারতে তাদের সাম্রাজ্য স্থাপনের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ ফেলল।
মির জাফর অবশ্য তখন এটাকে নিজের বিজয় ভেবে আনন্দে অস্থির হয়ে উঠেছেন। ২৪ জুন তিনি সকাল সকাল দাদপুরে রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করলেন। রবার্ট ক্লাইভ যখন তাঁকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব বলে সম্বোধন করলেন, মির জাফর তাঁর প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকার অঙ্গীকার করলেন। স্বভাববিরুদ্ধভাবে এই একটি অঙ্গীকার তিনি পালন করেছিলেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মুর্শিদাবাদে গিয়ে নিজের কোষাগার খুলে দিয়ে মুর্শিদাবাদের অমাত্যদের মধ্যে ধনরত্ন বিতরণ করে তাঁদের সৈন্য সংগ্রহ করতে বললেন। কিন্তু দুর্দশাগ্রস্ত নবাবের জন্য সৈন্য সংগ্রহ করে কেউ বিপদে পড়তে চাইলেন না। নবাবের কাছ থেকে ধনরত্ন, টাকাপয়সা নিয়ে তাঁরা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালালেন। সিরাজ-উদ-দৌলার শ্বশুর ইরাজ খান নিজেও এই কাজ করলেন, সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী উমদাতউন্নিসা বেগমও নবাবকে ত্যাগ করে বাবার সঙ্গে পালালেন।
এক দিন বৃথাই মুর্শিদাবাদে অপেক্ষা করে স্ত্রী লুৎফুন্নিসা আর মেয়ে উম্মে জোহরাকে নিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথমে গরুর গাড়িতে করে ভগবানগোলায় গেলেন, সেখান থেকে নৌকায় করে তিনি পাটনার দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে রাজমহলের কাছেই দানা শাহ ফকিরের আস্তানার কাছে নৌকা থেকে নেমে তাঁরা খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলার দুর্ভাগ্য, আস্তানার খাদেম ছিলেন মির জাফরের অনুগত। তিনি সংবাদবাহক পাঠালেন। মির জাফরের জামাই মির কাসিম খান ও তাঁর সেনাপতি দাউদ খান রাজমহলে সিরাজ-উদ-দৌলাকে খুঁজতে এসেছিলেন। তাঁরা খবর পেয়ে নদী পার হয়ে এসে সপরিবার সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করলেন।
মির জাফর ২৯ জুন রবার্ট ক্লাইভের হাত ধরে হীরাঝিল প্রাসাদে নবাবের সিংহাসনে বসেছিলেন, দুর্লভরামকে প্রধানমন্ত্রীর পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। তিনি নিজের জাফরগঞ্জের প্রাসাদ থেকেই নবাবি চালাবেন বলে ঠিক করলেন। নবাবের কোষাগার ও রত্নাগার তিনি হীরাঝিল থেকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। হীরাঝিল প্রাসাদ দিয়ে দিলেন নিজের ছেলে সাদিক আলী খানকে, যিনি মির মিরন নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলাকে যখন বন্দী করে আনা হলো, মিরন তাঁকে তাঁরই প্রাসাদের বাইরের দিকের এক ঘরে বন্দী করে রাখলেন। মিরন তাঁর অনুচরদের সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেউ রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমিনা বেগমের পালিত পুত্র মোহম্মদি বেগ সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করতে রাজি হলো এবং কৃতঘ্নতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
মোহম্মদি বেগ সিরাজ-উদ-দৌলাকে ছুরি মেরে হত্যা করার পর মিরন সেই মৃতদেহকে কয়েক টুকরো করে টুকরোগুলো দড়ি দিয়ে হাতির ওপর বেঁধে মুর্শিদাবাদ শহরে ঘোরালেন। সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমিনা বেগম ছেলের মৃতদেহ দেখতে অন্দরমহলের বাইরে এসে সৈন্যদের হাতে প্রহৃত হলেন।
মিরন এখানেই থামলেন না। তিনি সিরাজ-উদ-দৌলার ১৫ বছর বয়স্ক ভাই মির্জা মেহদিকে বুকে তক্তা চাপা দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেন। মির জাফর আলী খানের হস্তক্ষেপে অবশ্য সিরাজ-উদ-দৌলা এবং মির্জা মেহদিকে আলিবর্দির সমাধির পাশে দাফন করা হয়েছিল।
মিরন সিরাজ-উদ-দৌলার বিধবা স্ত্রী লুৎফুন্নিসাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। সে প্রস্তাব গ্রহণ না করায় মিরন লুৎফুন্নিসা, আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখলেন। আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগম সম্ভবত জিঞ্জিরা প্রাসাদেই মারা যান, তবে তাঁদের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদে আনা হয়েছিল। আলিবর্দির কবরের পাশেই তাঁদের কবর আছে। লুৎফুন্নিসা ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসার অনুমতি পান। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর জন্য মাসিক এক শ টাকা ভাতা বরাদ্দ দিয়েছিল। তিনি পরের পঁচিশ বছর বহু দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিয়ে খোশবাগে আলিবর্দি পরিবারের সবার কবর দেখাশোনা করেছেন, মেয়েকে মানুষ করেছেন, অকালমৃতা মেয়ের সন্তানদের লালনপালন করেছেন। ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদে সিরাজ-উদ-দৌলার স্মৃতিটুকু রক্ষা করার মতো মানুষও আর বেশি ছিল না।
সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই ইংরেজের ভারত বিজয়ের গৌরব শুরু হয়েছিল। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভ সিরাজ-উদ-দৌলাকে যে উপায়ে হারিয়েছিলেন, তা খুব একটা গৌরবজনক ছিল না। এই কলঙ্ক ঢাকতে গিয়ে আত্মগর্বী ইংরেজকে সিরাজ-উদ-দৌলার চরিত্রে অনেক কালি লাগাতে হয়েছে। বুঝে কিংবা না বুঝে অনেক ভারতীয় ইতিহাস-লেখকও সিরাজ-উদ-দৌলাকে অকারণ সমালোচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের লোকই আছেন, সুতরাং ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িকতার নয়, অসচেতনতার। তাঁদের লেখা পড়লে বোঝাই যায় না, মৃত্যুর সময় সিরাজ-উদ-দৌলার বয়স ছিল ২৩ বছর। যে শক্তিশালী শত্রুরা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল, একজন অনভিজ্ঞ, মেজাজি তরুণের পক্ষে সে ব্যূহ ভেদ করে বের হওয়া সম্ভব ছিল না।
আবার ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের সময়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় ইতিহাস-লেখকেরা পুরো উল্টো দিকে ঘুরে গিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলাকে জাতীয়তাবাদী নায়কের রূপ দিতে চেষ্টা করেন। পাকিস্তান আমলে সে চেষ্টা আরও জোরদার হয়, তাতে সাম্প্রদায়িক রং এসে লাগে। সিরাজ-উদ-দৌলা হয়ে ওঠেন খ্রিষ্টান-হিন্দুর মিলিত ষড়যন্ত্রে নিহত এক মুসলমান শহীদ। এর কোনোটিই সিরাজ-উদ-দৌলার সত্য রূপ নয়। সিরাজ-উদ-দৌলা নিজে সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, মোহনলাল, নারায়ণ সিংহ, দুর্লভরামের প্রতি তাঁর নির্ভরতাই এর প্রমাণ। আর তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে মির জাফর, ইয়ার লুৎফে খান প্রমুখ মুসলমান ছিলেন।
ইতিহাসের খুব নিষ্ঠুর এক বাঁকবদলের সময়ে হতভাগ্য এই নবাবের জন্ম হয়েছিল। তিনি মহাবীরও ছিলেন না, কাপুরুষও ছিলেন না। উদার ছিলেন না, সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। নীতিমান ছিলেন না, মহা দুশ্চরিত্রও ছিলেন না।
তিনি ছিলেন দোষেগুণে মিলিয়ে এক তরুণ নবাব। নেতৃত্বগুণ বিকশিত হওয়ার আগেই অসন্তুষ্ট আত্মীয়, বিদ্রোহী অমাত্য আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী বণিকের ত্রিমুখী আক্রমণে তাঁর জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
নিয়োগদাতা সুজাউদ্দিনের ছেলে সরফরাজ খানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে আলিবর্দি খান যে ঋণ করে গিয়েছিলেন, হতভাগ্য সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁর তরুণ জীবন দিয়ে যেন সেই ঋণ শোধ করে গিয়েছেন। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা আর বাঙালিও দীর্ঘ দুই শ বছরের জন্য ব্রিটিশ পরাধীনতার জালে জড়িয়ে পড়েছে। সিরাজ-উদ-দৌলার করুণ পরিণতির দুঃখ তাই বাঙালির দুঃখে পরিণত হয়েছে। নিজের বিভায় খুব উজ্জ্বল না হয়েও বাঙালির মানসে তাঁর স্থায়ী আসন থেকে গিয়েছে—তাঁর জীবন ঘিরে করা সিনেমা আর নাটকের জনপ্রিয়তা তারই সাক্ষ্য বহন করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন