বাংলার আফগান শাসক সুলাইমান খানের এক বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন ভবানন্দ। সুলাইমান খান ভবানন্দকে স্নেহ করতেন, ভবানন্দের ছেলে শ্রীহরি ও ভাইয়ের ছেলে জানকীবল্লভ সুলাইমানের ছেলে বায়েজিদ আর দাউদের সঙ্গেই পড়াশোনার সুযোগ ও অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। সুলাইমান খানের আমলেই শ্রীহরি আর জানকীবল্লভ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ পেয়েছিলেন। শ্রীহরি কায়স্থ ও বৈষ্ণব ছিলেন। সম্ভবত তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজপদের জন্যই এক কুলীন ব্রাহ্মণ তাঁর সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হন। ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দে অল্প বয়সেই শ্রীহরি ছেলের বাবা হলেন, ছেলের নাম রাখা হলো প্রতাপ। প্রতাপের জন্মের কয়েক দিন পরই শ্রীহরির স্ত্রী প্রসবজনিত জটিলতায় মারা যান। প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে শ্রীহরি ছেলের সম্পর্কে খানিকটা নিরাসক্ত হয়ে পড়েন, প্রতাপ মানুষ হতে থাকেন কাকা বসন্ত রায়ের কাছে।
১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান কররানি যখন বাংলার শাসক হলেন, তখন তিনি নিজের দুই বাল্যবন্ধুকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালেন। শ্রীহরিকে তিনি উজির পদে নিয়োগ দিলেন, তাঁর নতুন উপাধি হলো বিক্রমাদিত্য। আর জানকীবল্লভের উপাধি হলো বসন্ত রায়, তিনি পেলেন কোষাধ্যক্ষের পদ।
দাউদ খান কররানি যখন মোগল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন দূরদর্শী বিক্রমাদিত্য বুঝলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের পরিবারকে গৌড় বা তান্ডায় রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তিনি দাউদ খান কররানির কাছে আরজি জানালেন, চাঁদ খানের চক নামের জায়গিরটি তাঁকে দেওয়া হোক। চাঁদ খানের চক ছিল দক্ষিণবঙ্গে সুন্দরবনের কাছেই ইছামতী আর যমুনা নদীর তীরে। আজকে আমরা যাকে যমুনা নদী বলে জানি, সে নদীর তখন জন্ম হয়নি। পদ্মা নদীর একটি প্রবল শাখা তখন আজকের ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা এলাকা দিয়ে বইত, তারই নাম ছিল যমুনা নদী। সে নদীতে জাহাজ চলাচলের মতো নাব্যতা ছিল। চাঁদ খান নিঃসন্তান ছিলেন বলে তাঁর মৃত্যুর পর জায়গিরটি উত্তরাধিকারহীন হয়ে পড়ে। দাউদ খান কররানি খুশি হয়েই এই জঙ্গলাকীর্ণ জায়গিরটি বিক্রমাদিত্যকে দিতে রাজি হয়ে যান।
বিক্রমাদিত্য ভাই বসন্ত রায় আর ছেলে প্রতাপকে চাঁদ খানের চকে পাঠালেন। উদ্যমী বসন্ত রায় বহু লোকলস্কর নিয়ে সেখানে গেলেন। জঙ্গল কেটে এক দুর্গম জায়গায় নিজেদের জন্য দুর্গ-প্রাসাদ তৈরি করালেন। তিনি জানতে পারলেন, সেন রাজবংশের আমলে চাঁদ খানের চকে বিপুল জনবসতি ছিল। এই অঞ্চলকে যশোর রাজ্য বলা হতো। পরে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই এলাকা জনবিরল হয়ে যায়। এই খবর বিক্রমাদিত্যের কাছে পৌঁছাতে তিনি নিজের জমিদারির নাম রাখলেন যশোর, নিজের পরিবারের সবাইকে যশোরে পাঠিয়ে দিলেন। ব্যক্তিগত সম্পদ যা কিছু ছিল, তা-ও পাঠিয়ে দিতে ভুললেন না।
১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে যখন দাউদ খান কররানি ওড়িশায় পালাচ্ছেন, বিশ্বস্ত উজির বিক্রমাদিত্য দাউদ খানের বহনযোগ্য মূল্যবান সম্পদের একটা বড় অংশ নিজের নৌবহরে তুলে তাঁর পেছন পেছন যাচ্ছিলেন। দাউদ খান চাইছিলেন না, এই সম্পদ মোগলদের হাতে পড়ুক। তিনি বিক্রমাদিত্যকে বললেন, বিক্রমাদিত্য যেন তাঁর যাবতীয় সম্পদ নিয়ে যশোরের জংলা জমিদারিতে লুকিয়ে রাখেন। দাউদ খান শক্তি সঞ্চয় করে যদি ফিরে আসতে পারেন, তখন বিক্রমাদিত্যের কাছ থেকে সে সম্পদ ফিরিয়ে নেবেন। দাউদ খান বিক্রমাদিত্যকে ‘রাজা’ উপাধিও দিলেন।
মনিবের কথামতো বিক্রমাদিত্য নৌবহর নিয়ে যশোরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। দাউদ খান কররানির বিপুল সম্পদ থেকে তিনি কিছু নিজের জমিদারির পেছনেও খরচ করতে শুরু করেছিলেন বলে মনে হয়। তাঁর জমিদারির প্রজাসংখ্যা বাড়তে লাগল। গৌড় থেকে যাওয়া কিছু লোক নতুন রাজ্যকে ‘যশোহর’ বলে ডাকতে শুরু করলেন—কারণ গৌড়ের ‘যশ,’ তার প্রজা ও সম্পদ ‘হরণ’ করেই যশোর রাজ্য পরিপুষ্টি লাভ করেছে।
১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ে মোগল সুবাদার মুনেম খান মহামারিতে মারা যাওয়ার পর দাউদ খান কররানি আরেকবার বাংলা দখলের চেষ্টা করলেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লড়াই চলল। কিন্তু সম্রাট আকবর খান জাহান কুলির নেতৃত্বে যে বিরাট সৈন্য পাঠিয়েছিলেন, তার সামনে দাউদ খান কররানির বাহিনী পেরে উঠল না। দাউদ খানের দুই বিখ্যাত সেনাপতি জুনায়েদ খান ও কালাপাহাড় নিহত হলেন, দাউদ খান নিজেও পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে প্রাণ হারালেন। মোগলরা পাকাপাকিভাবে বাংলা দখল করে নিল। যুদ্ধের ডামাডোল শেষ হওয়ার পর মোগল সেনাপতিরা জানলেন, বিক্রমাদিত্য দাউদ খান কররানির বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছেন। একটি মোগল সেনাদল দক্ষিণবঙ্গে ব্যর্থ অভিযান চালিয়ে ফিরে এল, তারা বিক্রমাদিত্যের রাজ্য খুঁজে পায়নি। অথচ গৌড় এবং তান্ডা থেকে গিয়ে দাউদ খান কররানির বহু অমাত্য ও সৈনিক বিক্রমাদিত্যের কাছে আশ্রয় নিলেন। বাকলা (বরিশাল) আর ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) অঞ্চলের প্রচুর লোকও যশোর রাজ্যে এসে বসতি স্থাপন করল।
বাংলা বিজয়ের পর সম্রাট আকবর সম্পদের খতিয়ান নিতে তাঁর অর্থমন্ত্রী টোডর মলকে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন। বিচক্ষণ টোডর মল দেখলেন, যুদ্ধ করে দাউদ খান কররানির সম্পদ উদ্ধার করার জন্য প্রচুর ব্যয় ও লোকক্ষয় হবে। তিনি লোক পাঠিয়ে বিক্রমাদিত্যকে তান্ডায় ডেকে পাঠালেন। বিক্রমাদিত্যের কাছ থেকে দাউদ খান কররানির প্রশাসন ও সম্পদের হিসাব বুঝে নিলেন, কিন্তু বিক্রমাদিত্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা করলেন না। তিনি বিক্রমাদিত্যের রাজা উপাধি বহাল রাখলেন, মোগল সম্রাটের সামন্ত-রাজা হিসেবে আকবরের সনদ আদায় করে দিলেন। বিক্রমাদিত্য খুশি হয়ে নিজের যশোর রাজ্যে ফেরত গেলেন—যে রাজ্য পশ্চিমে আজকের মেদিনীপুর (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), পুবে খুলনা, উত্তরে কেশবপুর (যশোর, বাংলাদেশ) আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুযোগ্য ভাই বসন্ত রায়কে প্রশাসনকাজের ভার দিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো তিনি নির্বিঘ্নে কাটিয়েছেন।
বিক্রমাদিত্য রাজা উপাধি পাওয়ার পর থেকে তাঁর ছেলে প্রতাপকে সবাই প্রতাপাদিত্য বলে ডাকত। প্রতাপ খুব চঞ্চল ও দুঃসাহসী ছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি নিজের অনুচরদের নিয়ে অভিভাবকদের বিনা অনুমতিতে দীর্ঘদিন শিকারের নামে জঙ্গলে কাটিয়ে আসতেন। বৈষ্ণব বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় জীবহত্যা পছন্দ করতেন না। কিন্তু প্রতাপ কারও বারণ শোনার পাত্র ছিলেন না। তাঁকে ঘরে বেঁধে রাখার জন্য অল্প বয়সে দুবার বিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম স্ত্রীর নাম জানা যায়নি, তিনি অল্প বয়সেই মারা যান। দ্বিতীয় স্ত্রী শরৎকুমারীও প্রতাপকে ঘরে বেঁধে রাখতে পারেননি। বিক্রমাদিত্য ঠিক করলেন, তিনি প্রতাপাদিত্যকে আগ্রায় মোগল রাজদরবারে পাঠাবেন। সেখানে প্রতাপ রাজকাজের প্রশিক্ষণ পাবেন, মোগল দরবারে কিছু বন্ধু তৈরি করতে পারবেন।
বাবার আদেশ প্রতাপ ফেলতে পারেননি, কিন্তু তিনি এই সন্দেহ নিয়ে আগ্রায় গেলেন যে আসলে তাঁর কাকা বসন্ত রায় নিজেই রাজ্য দখল করার জন্য তাঁকে আগ্রায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বসন্ত রায় এবং তাঁর স্ত্রীই যে তাঁকে স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন, সে কথা তাঁর আর মনে থাকল না।
আগ্রায় টোডর মলের সুপারিশে সম্রাট আকবর প্রতাপাদিত্যকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতাপাদিত্য শুনলেন, মেবার রাজা প্রতাপসিংহ অসমসাহসে সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। নামের মিলের কারণেই হোক, কিংবা প্রতাপসিংহের ব্যাপারে মোগল দরবারের হিন্দু অমাত্যদের দুর্বলতা দেখেই হোক, প্রতাপাদিত্য ঠিক করলেন, নিজের রাজ্যে ফিরে গিয়ে তিনিও স্বাধীনভাবে রাজ্যশাসন করবেন। যে উদ্দেশ্যে বিক্রমাদিত্য তাঁকে আগ্রায় পাঠিয়েছিলেন, তার সম্পূর্ণ উল্টো ফল হলো। আগ্রা থেকে প্রতাপ আজমির ও চিতোর ঘুরে দেখলেন, সেনা-সংস্থান ও দুর্গ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন।
১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে টোডর মলকে আগ্রা ছেড়ে আবার বাংলায় আসতে হলো। টোডর মল যখন বসন্ত রায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলায় খাজনার হার নির্ধারণ করছেন, দুঃসাহসী প্রতাপ এক ফন্দি আঁটলেন। যশোর থেকে তাঁর কাছে মোগল দরবারে জমা দেওয়ার জন্য পাঠানো খাজনা তিনি আত্মসাৎ করলেন। আর সম্রাট আকবরকে বললেন, তাঁর বাবা ও কাকা খাজনা দিতে চান না। সম্রাটকে বিভ্রান্ত করে প্রতাপ যশোর রাজ্যের সনদ নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন, তারপর বাবার দেওয়া খাজনার টাকা সম্রাটের কোষাগারে জমা করে আকবরের প্রিয়ভাজন হলেন।
১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে এই সনদ নিয়ে প্রতাপ যখন দেশে ফিরে এলেন, বসন্ত রায় খুব আহত হলেন। বিক্রমাদিত্য জানতেন, তাঁর রাজ্য কার্যত বসন্ত রায়-ই চালান। তিনি একটা মীমাংসা করে দিলেন। রাজ্য দশ আনা ছয় আনা অংশে ভাগ করে বড় অংশ তিনি প্রতাপকে দিলেন, বাকি অংশ দিলেন বসন্ত রায়কে। প্রতাপ আপাতদৃষ্টে খুশি মনেই বাঁটোয়ারা মেনে নিলেন। তিনি নিজের জন্য ইছামতী-যমুনার সঙ্গমে ধুমঘাট নামের এলাকায় (এখন ঈশ্বরীপুর, শ্যামগঞ্জ, সাতক্ষীরা) নিজের নতুন দুর্গ ও রাজধানী বানিয়ে নিলেন। এই কাজে কাকা বসন্ত রায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর প্রতাপের রাজ্যাভিষেক হলো। সে উপলক্ষে বাংলার অন্য বিখ্যাত জমিদারদের মধ্যে ভূষণার মুকুন্দরাম আর সোনারগাঁয়ের ঈসা খানও উপস্থিত ছিলেন। অভিষেকের দিনেই প্রতাপ অন্য জমিদারদের সঙ্গে পরিকল্পনা করলেন, তিনি মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। তিনি নৌবহর গড়ে তুলতে লাগলেন, গোলন্দাজ বাহিনীকে বড় করতে লাগলেন। সরাসরি মোগলদের বিরোধিতা করলেন না, বরং ১৫৯১ খ্রিষ্টাব্দে ওড়িশায় পাঠানদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তিনি মোগল সুবাদার মানসিংহের পক্ষে থেকে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। যুদ্ধ শেষে অবশ্য পরাজিত পাঠান সেনাপতি ও সৈন্যদের কাউকে কাউকে তিনি নিজের রাজ্যে নিয়ে এলেন। বিদ্রোহের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি এ সময় নিজের রাজ্যে আট থেকে বারোটি দুর্গ নির্মাণ বা সংস্কার করেন।
মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগেই প্রতাপাদিত্য গৃহবিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। চাচাতো ভাইদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল। এই অবস্থাতেই ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে কাকা বসন্ত রায় তাঁকে নিজের প্রাসাদে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। নিরাপত্তার খাতিরে প্রতাপ সসৈন্য সেখানে গেলেন। তাঁকে সৈন্যসমেত আসতে দেখে তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা তাঁদের ওপর আক্রমণ করে বসলেন। প্রতাপ ধরে নিলেন, এটা পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তিনি চাচাতো ভাইদের হত্যা করলেন, কাকা বসন্ত রায়কেও রেহাই দিলেন না। তাঁর এক চাচাতো ভাই রাঘব রায় অবশ্য কচুবনের মধ্যে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন, সে কারণে লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায় কচু রায়। স্নেহময় পিতৃব্যকে খুন করার কলঙ্ক প্রতাপাদিত্যকে আজীবন বহন করতে হয়েছে।
১৬০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে চন্দ্রদ্বীপের জমিদার-পুত্র রামচন্দ্রের সঙ্গে নিজের মেয়ে বিন্দুমতীর বিয়ে দিয়ে প্রতাপাদিত্য নিজের শক্তি আরও বাড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে হাস্য-পরিহাসের বাড়াবাড়ি হয়ে যাওয়ায় জামাইয়ের সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের বিবাদ হয়ে গেল। জামাই রামচন্দ্র কোশা নৌকায় চড়ে পালিয়ে নিজের প্রাণরক্ষা করলেন।
বসন্ত রায়ের রাজ্য হাতে আসার পর প্রতাপ ঠিক করলেন, যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া গিয়েছে। তিনি মোগল সম্রাটকে কর দিতে অস্বীকার করলেন। নিজের নামে তিন কোনা মুদ্রা চালু করলেন। বসন্ত রায়ের জীবিত ছেলে রাঘব রায় গিয়ে মোগল সুবাদার রাজা মানসিংহের কাছে বসন্ত রায়ের হত্যা ও প্রতাপাদিত্যের বিদ্রোহের খবর দিয়েছিলেন। প্রতাপাদিত্যের বিদ্রোহের খবর শুনে মানসিংহ বিদ্রোহ দমন করতে সসৈন্য যাত্রা করলেন। প্রতাপাদিত্যের উত্থানে স্থানীয় অনেক জমিদার দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তাঁদের সাহায্য নিয়ে মোগল বাহিনী বসন্তপুরের প্রান্তরে এসে প্রতাপাদিত্যের বাহিনীর মুখোমুখি হলো।
তিন দিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর প্রতাপাদিত্য মানসিংহকে সন্ধির প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি তাঁর বাবা বিক্রমাদিত্যের বিলিব্যবস্থামতো বসন্ত রায়ের রাজ্যের অংশ তাঁর ছেলে রাঘব রায়কে ফেরত দেবেন, নিজের নামে মুদ্রা চালাবেন না এবং মোগল বাদশাহের আনুগত্য আবার স্বীকার করে নেবেন। মানসিংহ এই সন্ধি মেনে নিয়ে রাঘব রায়কে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে প্রথমে রাজমহল, পরে আগ্রায় ফেরত গেলেন।
১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সেলিম সিংহাসনে বসলেন, তাঁকে ইতিহাস সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে চেনে। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম খানকে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগ দিলেন। ইসলাম খান বাংলায় এসেই প্রতাপাদিত্যকে তলব করে পাঠালেন। প্রতাপাদিত্য দফায় দফায় দূত পাঠালেন। নিজের ছেলেকেও সুবাদারের কাছে পাঠালেন। কিন্তু নিজে গেলেন বহুদিন পর, ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে। সুবাদার ইসলাম খান প্রস্তাব করলেন, ঈসা খাঁর ছেলে মুসা খাঁর বিরুদ্ধে মোগল অভিযানে প্রতাপাদিত্য নিজের সৈন্যবাহিনী ও নৌবহর নিয়ে ইসলাম খানের সঙ্গে যোগ দেবেন, বিনিময়ে শ্রীপুর ও বিক্রমপুরের জমিদারি তাঁকে দেওয়া হবে।
এই প্রস্তাবের মর্মার্থ প্রতাপাদিত্য বুঝেছিলেন। ইসলাম খান কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে চাইছেন, বারো ভূঁইয়াদের একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছেন। একবার মুসা খাঁকে পর্যুদস্ত করতে পারলে তিনি তারপর প্রতাপাদিত্যের অধিকার খর্ব করবেন। প্রতাপাদিত্য প্রস্তাবে রাজি হওয়ার ভান করে চলে গেলেন, কিন্তু সৈন্য ও নৌবহর পাঠাতে টালবাহানা শুরু করলেন। সুবাদার ইসলাম খান সবই বুঝলেন, রাগে ফুঁসতে থাকলেন।
সুবাদার ইসলাম খান ঘোড়াঘাট দুর্গ থেকে আক্রমণ চালিয়ে পূর্ব বাংলার জমিদারদের দমন করলেন। এরপর তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকায় রাজধানী সরিয়ে আনলেন। বিচক্ষণ ইসলাম খান বুঝতে পেরেছিলেন, জলমগ্ন বাংলায় বিদ্রোহী জমিদার আর মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন করতে হলে ঢাকার মতো জায়গাতেই রাজধানী থাকা দরকার।
সুবাদার ইসলাম খান কারও সাহায্য ছাড়াই লড়াই জিতলেন দেখে প্রতাপাদিত্য সম্পূর্ণ সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ছেলে সংগ্ৰামাদিত্যকে ইসলাম খানের কাছে একটি নৌবহরসহ পাঠালেন। ইসলাম খান সে নৌবহর ধ্বংস করে ফেললেন, তারপর বাংলার অন্য জমিদারদের কাছ থেকে সৈন্য ও নৌকা সংগ্রহ করে উল্টো প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধেই বিরাট এক সেনাবাহিনী ও নৌবহর পাঠালেন।
১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে ইসলাম খানের সেনাপতি ইনায়েত খান ইছামতী নদী দিয়ে তাঁর বিশাল বহর নিয়ে প্রতাপাদিত্যকে আক্রমণ করতে এলেন। প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্য আরও বড় নৌবহর নিয়ে বাধা দিতে এসেছিলেন, কিন্তু মোগল তিরন্দাজ ও বন্দুকধারীদের অব্যর্থ নিশানায় তাঁকে পরাজিত হয়ে পালাতে হলো। প্রতাপাদিত্যের প্রধান সেনাপতি কামাল খোজা মারা পড়লেন।
উপায়ান্তরহীন প্রতাপাদিত্য ইনায়েত খানকে সন্ধিপ্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু ইনায়েত খান জানতেন, বিজয় এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। তিনি সন্ধির প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে বাহিনী নিয়ে প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাটে এসে হাজির হলেন। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে মোগল বাহিনীর সঙ্গে যশোর-সেনার তুমুল লড়াই হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রতাপাদিত্যের পাঠান সেনাপতি জামাল খান পক্ষত্যাগ করে মোগল পক্ষে যোগ দিলেন। হীনবল প্রতাপাদিত্য পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন। ইনায়েত খান তাঁকে বন্দী করে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। ইসলাম খান প্রতাপাদিত্যকে কোনো রকম দয়া দেখাতে রাজি হলেন না। তাঁকে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হলো।
যশোর রাজ্য সম্পূর্ণভাবে মোগল অধিকারে এল। প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্য ও তাঁর ভাইয়েরা ধুমঘাট দুর্গ রক্ষার যুদ্ধে প্রাণ হারালেন। তাঁদের মৃত্যুর খবর আসার পর প্রতাপাদিত্যের স্ত্রী শরৎকুমারী রাজপরিবারের অন্য মেয়েদের নিয়ে নৌকায় করে ধুমঘাট দুর্গের গোপন পথ দিয়ে বের হয়ে মাঝনদীতে গিয়ে পানিতে ডুবে আত্মহত্যা করে অপমান ও দাসত্বের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করলেন।
প্রতাপাদিত্য অসম্মান এড়ানোর সুযোগ পাননি। তাঁকে শিকলবাঁধা বাঘের মতো করে প্রদর্শন করতে করতে ঢাকা থেকে আগ্রায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, পথেই ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে (সম্ভবত কাশীতে) তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স তখন ৫০ বছর।
প্রতাপাদিত্য নিষ্কলঙ্ক ও নির্লোভ ছিলেন না। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সমপরিমাণে রণকুশলী ছিলেন না। কিন্তু মোগল আধিপত্য প্রতিরোধে তিনি চেষ্টা করেছিলেন। বারো ভূঁইয়ার মধ্যে তাঁকেই সে চেষ্টা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় স্বাধীন রাজত্ব স্থাপনের চেষ্টা আরও অন্তত এক শতাব্দীর জন্য থেমে যায়। প্রতাপাদিত্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে যশোর রাজ্যও নিজস্বতা হারায়, আকারে ছোট হয়ে আসে। এই রাজ্যের উত্তর সীমার মুডুলী-কসবাসংলগ্ন অঞ্চলই ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে যশোর জেলায় পরিণত হয়ে যশোর রাজ্যের স্মৃতি ধরে রেখেছে।
যশোরের স্বাধীনতার স্বপ্ন কোথাও না কোথাও আত্মগোপন করেছিল প্রায় সাড়ে তিন শ বছর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের যে জেলাটি সবার আগে স্বাধীন হয়েছিল, তার নাম যশোর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন