মির্জা আবু তালিবের জীবনের ইতিহাস যেমন বর্ণাঢ্য, তেমন করুণ। তিনি জন্মেছিলেন ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে, এক শিক্ষিত ইরানি পরিবারে।
তাঁর দাদা মির্জা গিয়াস বেগ পারস্য থেকে এসে দিল্লিতে মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে যোগ দিয়েছিলেন। তালিবের ফুপু মেহেরুন্নিসাকে যুবরাজ সেলিম ভালোবাসতেন, সম্রাট আকবরের বাধায় বিয়েটা হতে পারেনি। ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর যুবরাজ সেলিম সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে সিংহাসনে বসলেন। মেহেরুন্নিসার স্বামী শের আফগানকে সম্রাট জাহাঙ্গীর জায়গির দিয়ে বাংলার বর্ধমানে পাঠালেন, আবার তিনিই ১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দে কুতবউদ্দিন খান কোকাকে দিয়ে তাঁকে হত্যা করালেন। ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করে তাঁকে সম্রাজ্ঞী বানালেন, নাম দিলেন নূরজাহান। বিয়েতে রাজি হওয়ার আগে নূরজাহান শর্ত দিয়েছিলেন, তাঁর বাবা ও ভাইকে সম্রাট জাহাঙ্গীর গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে বসাবেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর সে শর্ত মেনে নিলেন। মির্জা গিয়াস বেগ উজির হলেন, তাঁর ছেলে আসফ খান সেনাপতি হলেন।
নূরজাহানের ভাই আসফ খান মোগল সম্রাটের আরেক ইরানি সভাসদ খাজা গিয়াসউদ্দিনের মেয়ে দিউয়ানজি বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। আসফ খান-দিউয়ানজি বেগমের পাঁচ সন্তান—মালিকা বানু বেগম, আরজুমান্দ বানু বেগম, পারওয়ার খানম, ফারজানা বেগম, মির্জা আবু তালিব। তাঁদের মধ্যে অন্তত দুজন ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছেন।
সম্রাজ্ঞী হয়ে নূরজাহান ক্ষমতা সংহত করার জন্য আসফ খানের মেয়ে আরজুমান্দ বানু বেগমকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের ছোট ছেলে শাহজাদা খুররমের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর স্ত্রীর রূপেগুণে মুগ্ধ শাহজাদা খুররম আরজুমান্দের নতুন নাম রাখলেন মমতাজ মহল বেগম।
সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ভাইয়ের ছেলে মির্জা আবু তালিবকেও মোগল শাহজাদাদের সঙ্গে পড়াশোনা ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁরই অনুরোধে ১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর আবু তালিবকে ‘শায়েস্তা খান’ উপাধি দেন, পাঁচ শ সৈন্যর নিজস্ব বাহিনী পালনের অধিকার দেন।
জীবন ও রাজনীতির গতি বড় সর্পিল। ১৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে লোদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দাক্ষিণাত্য জয় করার সময় শাহজাদা খুররম ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের চোখের মণি। সম্রাট জাহাঙ্গীর বিদ্রোহী বড় ছেলে খসরুকে বাদ দিয়ে ছোট ছেলে খুররমকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন, তাঁকে ‘শাহজাহান’ উপাধি দিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই শাহজাহান ক্রমশ স্বাধীনচেতা হয়ে উঠতে থাকলেন, বিশেষত সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়েই চলল। সম্রাট জাহাঙ্গীর যতই জরাগ্রস্ত ও অসুস্থ হতে থাকলেন, শাহজাহান ততই খোলাখুলি নূরজাহানের বিরোধিতা করতে লাগলেন। এ সময় আরজুমান্দ-আবু তালিবের বাবা আসফ খান বোনের সঙ্গে জামাইয়ের দ্বন্দ্বে অনেক ভেবেচিন্তে জামাইয়ের পক্ষ নিলেন। বাবার মৃত্যুর পর নূরজাহানই ভাই আসফ খানকে লাহোরের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সে ক্ষমতা আসফ খান নূরজাহানের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করে শাহজাহানকে মোগল সিংহাসনে বসতে সাহায্য করলেন।
১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতায় বসে সম্রাট শাহজাহান প্রথমেই সিংহাসনের অন্য সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের হত্যা করলেন (এর মধ্যে তাঁর ভাই শাহজাদা শাহরিয়ারও ছিলেন), সত্মা নূরজাহানকে বন্দী করলেন আর শ্বশুর আসফ খানকে উজির-এ-আজম হিসেবে নিয়োগ দিলেন। নতুন সম্রাটের শ্যালক হিসেবে শায়েস্তা খানও দরবারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন।
ফুপু নূরজাহানের মতো শায়েস্তা খানের বোন মমতাজ মহলও বিচক্ষণ ছিলেন, সম্রাট শাহজাহানকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। বড় বোনের ছায়ায় শায়েস্তা খানের জীবন ভালোই কাটছিল। কিন্তু ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মমতাজ মহল রক্তক্ষরণে মারা গেলেন। ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে আসফ খানও মারা গেলেন। দুই অভিভাবককে হারিয়ে শায়েস্তা খান দেখলেন, দরবারের রাজনীতিতে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত সম্রাট শাহজাহান বহু ব্যয় করে চমৎকার নকশায় তাজমহল বানাতে শুরু করলেন, সে কথা আমরা অনেকেই জানি। যা জানি না, তা হলো, মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর থেকে শাহজাহান ব্যক্তিজীবনে খুব বিলাসী ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েন। শোনা যায়, শায়েস্তা খানের এক স্ত্রীর দিকে তিনি লালসার হাত বাড়িয়েছিলেন। নাম না-জানা সেই ভদ্রমহিলা অসম্মানিত হয়ে অনশনে প্রাণত্যাগ করেন। শায়েস্তা খান এর প্রতিবাদ করতে পারেননি। ভারতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মোগল সম্রাটের প্রতিবাদ করে তিনি সুবিধা করতে পারতেন না, সেটা বুঝেই এই অপমান তাঁকে নীরবে সহ্য করতে হয়েছে।
সম্রাট শাহজাহান শায়েস্তা খানকে ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে পাঠান তাঁর ছোট ছেলে আওরঙ্গজেবকে সাহায্য করতে। গোলকুন্ডার কুতুবশাহি সুলতানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আওরঙ্গজেব মামা শায়েস্তা খানের সামরিক কুশলতা দেখে চমৎকৃত হন। ১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই বেধে গেল। শাহজাহানের তিন ছেলে সুজা, মুরাদ ও আওরঙ্গজেব সবাই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী দারাশিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধে আওরঙ্গজেব সবচেয়ে বেশি সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা দেখালেন। মুরাদ ও দারাকে তিনি হত্যা করলেন, সুজাকে আরাকানে পালিয়ে যেতে বাধ্য করলেন। যেখানে আশ্রয়দাতা আরাকান-রাজার সঙ্গে বিবাদে সুজা খুন হলেন। ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাহানকে বন্দী করে আওরঙ্গজেব নিজেই মোগল সম্রাট হলেন। উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ে শায়েস্তা খান এবং তাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খান আওরঙ্গজেবের পক্ষ নিয়ে সুজা ও দারাশিকোর ছেলে সুলাইমান শুকোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ক্ষমতা হাতে পেয়েই শায়েস্তা খানকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার বানিয়ে দুর্ধর্ষ মারাঠা নেতা শিবাজির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার দায়িত্ব দিলেন।
১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শায়েস্তা খান আওরঙ্গাবাদে যান, সেখান থেকে পরের তিন বছর মারাঠা-বীর শিবাজির সঙ্গে লড়াইয়ে চাকান দুর্গ, কল্যাণ দুর্গ এবং পুনে শহর দখল করে নেন। কিন্তু পুনেতে বিপর্যয় আবার আঘাত হানল।
১৬৬৩ সালের এপ্রিল মাসে শিবাজি চার শ বাছাই করা সৈন্য নিয়ে বরযাত্রীর ছদ্মবেশে পুনে শহরে ঢুকে পড়লেন। শায়েস্তা খান যে লালমহলে অবস্থান করছিলেন, আগে সেটা শিবাজির নিজেরই প্রাসাদ ছিল। রাতের আঁধারে শিবাজি চেনা প্রাসাদে ঢুকে অতর্কিত হামলা করলেন। আহত শায়েস্তা খান কোনোমতে পালিয়ে বাঁচলেন, কিন্তু তাঁর এক হাতের তিনটি আঙুল হারাতে হলো। শায়েস্তা খানের ছেলে আবুল ফজল খানসহ ৪০জন সৈনিক ও প্রাসাদের ছয়জন মহিলা এই হামলায় নিহত হন। ঘটনার বিবরণ শুনে রুষ্ট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে দাক্ষিণাত্য থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে তাঁকে বাংলার সুবাদার করে পাঠালেন।
মোগল আমলে বাংলার সুবাদার পদটা আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু শায়েস্তা খানকে বাংলায় শাস্তি দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। ইসলাম খানের সময় থেকেই সুবা-বাংলার রাজধানী ঢাকা। ১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর ঢাকার সুবাদাররা কেউ সুবিধা করতে পারেননি। সারা বাংলায় মোগল শাসন কায়েম হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব হয়ে যাওয়ায় বাইরের শত্রুর উৎপাত সাংঘাতিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। পঞ্চাশ বছর ধরে পুরো পূর্ব আর দক্ষিণবঙ্গ দস্যুদের আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত। কখনো আরাকান থেকে আসা মগ দস্যু, কখনো সন্দ্বীপের ঘাঁটি থেকে আসা পর্তুগিজ-দস্যুর তাণ্ডবে বাংলার মানুষের তখন জীবন-সম্ভ্রম নিয়ে টানাটানি। মির জুমলা ইদ্রাকপুরে দুর্গ বানিয়ে ঢাকাকে রক্ষা করতে পারলেও পূর্ব বাংলায় নদীর ধারের অনেক জনপদ বিরান হয়ে পড়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরও সুবাদার ইসলাম খানের আসার আগেই আরাকান-রাজের দখলে চলে গিয়েছিল, এরপরের সুবাদাররা অনেক চেষ্টাতেও চট্টগ্রাম উদ্ধার করতে পারেননি। ফলে বাংলার রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়েছে।
শায়েস্তা খান বাংলায় পা দিয়েই বুঝতে পারলেন, পর্তুগিজ-মগ আক্ৰমণ ঠেকাতে হবে। তিনি নৌশক্তি বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিলেন। এর আগে মির জুমলা আসাম অভিযানের সময় কিছু রণতরি তৈরি করেছিলেন। উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে শাহজাদা সুজা সেই রণতরিগুলো ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করেননি। শায়েস্তা খান কিছু রণতরি মেরামত করলেন, কিছু রণতরি ঢাকা আর যশোরে নতুন করে তৈরি করালেন। ক্রমেই বাংলার নৌশক্তি আবার সুবাদার ইসলাম খানের আমলের অবস্থায় ফিরে এল।
শায়েস্তা খান কূটনীতির অস্ত্রও কাজে লাগালেন। পর্তুগিজদের দমনের জন্য তিনি ডাচ বণিকদের হাত করলেন, তারা আরাকান রাজ্য থেকে বাণিজ্যঘাঁটি সরিয়ে নিল। দক্ষ পর্তুগিজ নাবিকদের বেশি বেতনে মোগল নৌবহরে যোগ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে শায়েস্তা খান চট্টগ্রামে পর্তুগিজ আর আরাকান রাজার মধ্যে বিভেদকে উসকে দিলেন। এর ফলে পর্তুগিজ নাবিকদের একাংশ আরাকান-রাজ সান্দা থুঢ়ানামার পক্ষ ত্যাগ করে তাদের জাহাজ ও গোলাবারুদসহ শায়েস্তা খানের বাহিনীতে যোগ দেয়।
দুই বছর প্রস্তুতি নিয়ে ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে শায়েস্তা খান তাঁর ছেলে বুজুর্গ উমিদ খান ও সেনাপতি ইবন হোসাইনের নেতৃত্বে বিরাট নৌবহর চট্টগ্রাম অভিযানে পাঠালেন। মোগল নৌবহর কর্ণফুলী নদীতে আরাকান নৌবহরকে পর্যুদস্ত করল, চট্টগ্রাম দুর্গ অবরোধ করে দখল করল। চট্টগ্রামে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হাজার হাজার দাস মুক্তি পেয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেল। মগ-পর্তুগিজ আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলায় বাণিজ্য ও কৃষিকাজে গতির সঞ্চার হলো। ফসলের উৎপাদন বাড়ল। উদ্বৃত্ত ফসলের কারণে একবার দাম কমে এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যাচ্ছিল। শায়েস্তা খানের এই কৃতিত্ব প্রবাদ হয়ে আছে। ‘শায়েস্তা খানের আমল’ বাংলা ভাষায় ‘সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের যুগ’-এর সমার্থক। শায়েস্তা খান ঢাকায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেন, যার মধ্যে আছে ছোট কাটরা নামের সরাইখানা, হোসেনি দালান, শায়েস্তা খানের মসজিদ, সাতগম্বুজ মসজিদ, চকবাজার মসজিদ, খিজিরপুর মসজিদ। বুড়িগঙ্গার তীর বরাবর পোশতা নামের একটি বড় বাঁধ তৈরির পরিকল্পনাও তিনি নিয়েছিলেন, সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। শায়েস্তা খান কামরূপ, ত্রিপুরা ও মোরাঙ্গ রাজাদেরও আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানের কৃতিত্বে খুশি হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর তাঁর ছেলে শাহজাদা আজমের সঙ্গে তিনি শায়েস্তা খানের মেয়ে ইরান দুখত রহমত বানুর বাগদান করিয়ে দেন। রহমত বানু রূপসী ছিলেন বলে প্রাসাদের লোকেরা তাঁকে পরি বিবি বলে ডাকত। কিন্তু বিয়ে হলো না। সে বছরই অসুখে পড়ে পরি বিবি মারা গেলেন। শাহজাদা আজম সম্ভবত বাগদত্তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তিন বছর পর ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন অহোম-রাজকন্যা রামানি গাভারুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, তিনি রাজকন্যার নতুন নাম দেন রহমত বানু বেগম।
মেয়ের মৃত্যুতে শায়েস্তা খান বড় আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি মেয়েকে বুড়িগঙ্গার ধারে সমাহিত করেন, উত্তর ভারত থেকে প্রচুর অর্থব্যয়ে দামি পাথর এনে মেয়ের সমাধিসৌধ সাজান। তাঁর পালিত কন্যা চম্পা বিবিও অকালে মারা যান, তাঁকে শায়েস্তা খান সমাহিত করেন ছোট কাটরাসংলগ্ন মসজিদের আঙিনায়।
১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন সাময়িকভাবে শায়েস্তা খানকে বাংলা থেকে ফিরিয়ে নিলেন, তখন নিজের ছেলে শাহজাদা আজমকে বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। শাহজাদা আজম ১৫ মাস ঢাকায় ছিলেন। তিনিই বুড়িগঙ্গার ধারে পরি বিবির সমাধিসংলগ্ন এলাকায় আওরঙ্গাবাদ কেল্লা তৈরি করতে শুরু করেন। কিন্তু ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব মারাঠা বিদ্রোহ দমন করতে ছেলেকে আবার ডেকে পাঠান, শায়েস্তা খানকে ঢাকার সুবাদারের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শাহজাদা আজম ঢাকা থেকে ফিরে যাওয়ার আগে শায়েস্তা খানকে অনুরোধ করে গেলেন, অসমাপ্ত আওরঙ্গাবাদ দুর্গের কাজ যেন তিনি শেষ করেন।
শায়েস্তা খান চার বছর এই নির্মাণকাজ চালিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর বয়স ৮৪ বছর, শরীর ও মন ভেঙে এসেছে। দুর্গের কাজ তিনি শেষ করতে পারেননি। সম্ভবত সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যয় সংকোচননীতিও এর কারণ। দাক্ষিণাত্যে ও রাজপুতানায় যুদ্ধ চালাতে গিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে এ সময় বিপুল খরচ বহন করতে হচ্ছিল।
শায়েস্তা খানের শেষ উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো, বাংলায় ব্রিটিশ বণিকদের অবৈধ বাণিজ্যের অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করা। ১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সম্রাট শাহজাহানের এক ফরমানের বলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য করতে শুরু করে। কথা ছিল, বিনা শুল্কে তারা বছরে কেবল তিন হাজার মুদ্রা খাজনা দিয়ে যথেচ্ছ পরিমাণে বাণিজ্য করবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হরিহরপুর, কাসিমপুর আর হুগলিতে ঘাঁটি বসিয়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করতে শুরু করে। কেবল তা-ই নয়, ওই কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরাও ফরমানের আড়ালে বিনা শুল্কে ব্যক্তিগত বাণিজ্য করতে শুরু করেন। ফলে মোগল সরকার প্রচুর পরিমাণ শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়, দেশি উদ্যোক্তারাও অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ১৬৮২ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানি প্রশাসক উইলিয়াম হেজেস শায়েস্তা খানের কাছে অঙ্গীকার করেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়মবহির্ভূত বাণিজ্য করবে না। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জোরেশোরে নিয়মভঙ্গে লেগে পড়ে। এর প্রতিবিধান করতে ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেন। এর জবাবে ব্রিটিশ প্রতিনিধি জোসিয়া চাইল্ড আরাকান রাজা থিরি থুরিয়া ও ব্রিটিশ সম্রাট দ্বিতীয় জেমসের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়ে পাঠান। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা মোগল ফৌজদারদের আক্রমণ করে। জবাবে ক্রুদ্ধ সম্রাট আওরঙ্গজেব সব ইংরেজ ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তার করেন। ইতিহাসে এটিই প্রথম মোগল-ইংরেজ যুদ্ধ বা চাইল্ডস ওয়ার নামে পরিচিত হয়ে আছে।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই লড়াইয়ে জিততে পারেনি। দেড় লাখ রুপি জরিমানা দিয়ে তারা আওরঙ্গজেবের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, আগের শর্তে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে নেয়।
শায়েস্তা খানই সম্ভবত উপমহাদেশের প্রথম শাসক, যিনি ব্রিটিশ বণিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অভিসন্ধির আঁচ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবন তখন সায়াহ্নে ঢলে পড়েছে। ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে দিল্লিতে চলে যেতে অনুমতি দেন। নতুন সুবাদার ইব্রাহিম খানের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে শায়েস্তা খান ঢাকা ত্যাগ করেন। তত দিনে ঢাকা আর আগের ছোট শহরটি নেই, সত্যিকারের মোগল রাজধানীতে পরিণত হয়েছে। শহরে বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মোগল দরবারের কর্মচারীরা বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে চরাঞ্চলে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন, সেই থেকে ওই এলাকার নাম হয়ে যায় কেরানীগঞ্জ।
দিল্লিতেই ১৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খানের মৃত্যু হয়। সেখানে খুব বেশি লোক তাঁকে মনে রাখেনি। বরং বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই মোগল সুবাদারকে মনে রেখেছে—যিনি মগ-পর্তুগিজ দস্যুদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেছিলেন, যিনি ফসলের প্রাচুর্য এনেছিলেন। যিনি ঢাকায় রেখে গিয়েছেন এই শহরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মোগল স্থাপত্য। সম্রাট আওরঙ্গজেবের নামে রাখা নাম আওরঙ্গাবাদ কেল্লা এখন আর কারও মনে নেই, লোকের মুখে মুখে সে স্থাপনা জনপ্রিয় হয়েছে লাল কেল্লা নামে।
চিরদুঃখী শায়েস্তা খান বাংলার ইতিহাসে আর ঢাকার মানুষের মনে অমর হয়ে আছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন