নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ

বাঙালি বৌদ্ধ ও বাঙালি হিন্দুর রাজ্যশাসনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। পাল রাজবংশ (৭৫০-১০৯০ খ্রিষ্টাব্দ), সেন রাজবংশ (১০৯৭-১২২৫ খ্রিষ্টাব্দ), দেব রাজবংশ (৭৮০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ, আবার ১০৫০-১২৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার বিভিন্ন জনপদ দীর্ঘদিন ধরে শাসন করেছে। দিল্লির সালতানাত সম্প্রসারণের অভিঘাত বাংলায় এসে না পড়লে হয়তো আরও বেশি দিন ধরে তাদের শাসন চলত।

কিন্তু বাংলায় সুলতানি আমল শুরু হওয়ার পর থেকেই আর কোনো বৌদ্ধ বা হিন্দু রাজা রাজত্ব করেননি। বাংলায় বৌদ্ধধর্মের শক্তি তখন কমে এসেছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও কোনো হিন্দু রাজা কেন সফল হলেন না, তা বিস্ময়কর। ক্ষমতার রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সব সময় কর্তৃত্বের সমার্থক নয়, ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ আছে। সংগঠিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অনেক সময় অসংগঠিত, বিভক্ত সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব চালায়। বাংলায় সুলতানি আমল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশ আমল—দুটোই আমাদের ঘরের কাছের উদাহরণ।

ইসলাম ধর্মের একটা মূল উপাদান হলো সামাজিক সাম্য। সমাজের ক্ষমতাবানেরা সব সময় এটা অস্বীকার করতে চেষ্টা করেন। তাঁরা অভিজাত-অনভিজাত ভাগ করেন, বংশপরম্পরায় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ধর্মের অনুমোদন নেই। মসজিদে সবাইকে এক সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়। সামাজিকতা-খাওয়া-বৈবাহিক সম্পর্ক কোনো কিছুতেই এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে সামাজিক শ্রেণির বিচারে বাদ দেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে জন্ম কারও আজন্ম পাপ থাকে না। কৃষকের সন্তান উজিরে আজম হয়ে উঠতে পারেন, এককালের ক্রীতদাস পরে সুলতান হয়ে উঠতে পারেন।

হিন্দুধর্মের প্রধান উপাদানগুলোর অন্যতম হলো বর্ণাশ্রম। সামাজিক কর্তৃত্ব ব্রাহ্মণের, রাজ্যচালনা আর যুদ্ধের দায়িত্ব ক্ষত্রিয়ের, বৈশ্যের দায়িত্ব বাণিজ্য, আর শূদ্র কিংবা ততোধিক ‘অদ্ভুত’ জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বাকি সবার জন্য ফসল ফলানো, সেবা দেওয়া, শ্রম দেওয়া, ময়লা পরিষ্কার কিংবা মৃতদেহ সৎকারের মতো ‘অপ্রিয়’ কাজগুলো করা। বর্ণাশ্রম বংশগত, ফলে ব্রাহ্মণের বুদ্ধিহীন সন্তানটিও সমাজপতি হয়ে উঠত, ভীরু ক্ষত্রিয় সন্তানকেও যোদ্ধা হতে হতো। খুব মেধাবী, যোগ্য শূদ্র সন্তানও নেতৃত্বের সুযোগ পেতেন না বললেই চলে। বর্ণাশ্রম না মানলে সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হতে হতো। আর একবার হিন্দুসমাজ থেকে বহিষ্কৃত হলে পূর্ণ মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ প্ৰায় ছিল না বললেই চলে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যোগ্যতার বদলে বংশগত সুবিধার মাপকাঠিতে বাছাই করার ফলে বাংলায় স্থানীয় প্রশাসনিক ও সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে এসেছিল বলেই মনে হয়। কয়েক শতাব্দী পর ইংরেজ এসে বর্ণাশ্রমের বিধানগুলোকে অন্তত আংশিকভাবে অস্বীকার করার আগপর্যন্ত বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধি রাজনৈতিকভাবে বাংলার নেতৃত্ব দিতে পারেননি।

ব্যতিক্রম কেবল রাজা গণেশ। তিনি বাংলার সালতানাতের ভিত্তি টলিয়ে দিয়েছিলেন। মধ্যযুগের ইতিহাসে একমাত্র বাঙালি হিন্দু রাজা হিসেবে দুই দফায় তিন বছর তিনি বাংলা শাসন করেছেন।

ইতিহাস রাজা গণেশের সঙ্গে সুবিচার করেনি। প্রথম কারণ, মধ্যযুগের ইতিহাস লিখে রেখেছেন মুসলিম ইতিহাসবেত্তারা। ইসলামি রাজ্য সম্প্রসারণের জয়জয়কারের কালে গণেশের রাজ্য কেড়ে নেওয়ার ‘ঔদ্ধত্যে’ তাঁদের খুশি হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। গণেশের চরিত্র তাঁরা যথাসাধ্য কালো রঙে এঁকেছেন।

পরবর্তীকালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের আমলে হিন্দু ইতিহাসবেত্তারা সুযোগ পেয়েও কেন গণেশের কথা গৌরবের সঙ্গে স্বীকার করতে পারেননি, সে কথা একটু পরে বলছি।

গণেশ জমিদার পরিবারের সন্তান। ধর্মপ্রচারক নূর-কুতব-ই-আলমের লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, গণেশের পূর্বপুরুষেরা চার শ বছর ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের ভাতুড়িয়া অঞ্চলে বিপুল ভূসম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। কারও কারও মতে, তিনি ভাদুড়ি উপাধিধারী ব্রাহ্মণ। কেউ আবার বলেন, তিনি কায়স্থ। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তাঁকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। ইতিহাসে এর সাক্ষ্য পাইনি। তবে আমার ধারণা, গণেশ সিকান্দর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে সাহায্য করেছিলেন। কারণ, গোয়ালপাড়া নামের যে এলাকায় বাবা-ছেলের এই যুদ্ধ হয়, সেটা ভাতুড়িয়ার খুব কাছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী, দুঃসাহসী গণেশ সম্ভবত সুবর্ণগ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়া গিয়াসউদ্দিনের বাহিনীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, নিজের সামরিক শক্তি সে বাহিনীর সঙ্গে যোগ করেন। ফলে গিয়াসউদ্দিনের আমলে তাঁর সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

আগেই বলেছি, গিয়াসউদ্দিন যখন মন্ত্রিসভা এবং রাজপ্রশাসন থেকে হিন্দু জমিদার ও কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন গণেশ উৎকোচ দিয়ে সুলতানের কিছু সেনাকে বশ করেন। তাদের অতর্কিত আক্রমণে গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যু হয়। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাইফউদ্দিন যখন সিংহাসনে বসলেন, তখন গণেশ আশা করেছিলেন, তিনি আবার মন্ত্রিত্ব ফিরে পাবেন। কিন্তু সাইফউদ্দিন বাবার মতোই কঠোরভাবে হিন্দুদের প্রশাসন থেকে দূরে রাখতে শুরু করলেন। রাজা গণেশ আবার ষড়যন্ত্র করলেন। সাইফউদ্দিনের সেনাপতি শিহাবউদ্দিন নতুন সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাঁকে হত্যা করলেন। রাজা গণেশের সমর্থনে তিনি শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ নামে গদিতে বসলেন, কিন্তু ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ক্রমেই গণেশের দিকে সরতে লাগল।

শিহাবউদ্দিন ক্ষমতা সংহত করতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চীনা সম্রাটের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য চীনে জিরাফ, ঘোড়া ইত্যাদি নানা উপহার পাঠিয়েছিলেন। তাঁর পাঠানো জিরাফ পেয়ে চীনের সম্রাট ইউং লি খুব খুশি হয়েছিলেন।

কিন্তু ইলিয়াস শাহি বংশের সুলতানকে খুন করে ক্ষমতায় আসার কারণে বাংলার রাজপুরুষদের অনেকেই শিহাবউদ্দিনের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। এবার তাঁরা গণেশের সঙ্গে ঐক্য করলেন। শিহাবউদ্দিন এক বিদ্রোহে নিহত হলেন। তাঁর শিশুপুত্রকে নামমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে গণেশ কার্যত বাংলার শাসনকর্তা হয়ে বসলেন। ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দে সে প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেল। রাজা উপাধি নিয়ে গণেশ নিজেই সিংহাসনে বসলেন।

রাজা গণেশের ক্ষমতা দখলে বাংলার ইসলাম প্রচারকেরা চিন্তায় পড়ে যান। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন নূর কুতব-ই-আলম। ইনি সুলতান গিয়াসউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা গণেশের চক্রান্তে গিয়াসউদ্দিন ও তাঁর পুত্র সাইফউদ্দিনকে নিহত হতে দেখে তাঁর ক্ষোভের সীমা ছিল না। তিনি জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে চিঠি লিখে বাংলায় হিন্দু রাজত্ব উৎখাতের আহ্বান জানালেন।

দিল্লির সালতানাত ১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে অন্তঃকোন্দলে বিপর্যস্ত। এই সুযোগে উত্তর প্রদেশের জৌনপুরের শাসনকর্তা মালিক সরওয়ার সেখানে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। মালিক সরওয়ার উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিরাট অংশ দখল করে নেন। তাঁর মৃত্যুর পর পালিত পুত্র ইব্রাহিম শর্কি জৌনপুরের সিংহাসনে বসেন। তিনি কুশলী যোদ্ধা ছিলেন। সীমান্তবর্তী বাংলায় অভিযানের সুযোগ তিনি হাতছাড়া করলেন না। ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে বিরাট এক বাহিনী নিয়ে তিনি পান্ডুয়ায় এসে উপস্থিত হলেন।

রাজা গণেশ যত না বীর যোদ্ধা ছিলেন, তার চেয়ে বেশি কুশলী কূটনীতিক ছিলেন। মিথিলারাজ শিবসিংহ গণেশের প্ররোচনায় ইব্রাহিম শর্কির সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত ও নিহত হন। গণেশ শিবসিংহের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিলেন। ইব্রাহিম শর্কির সঙ্গে একেবারেই যুদ্ধ করলেন না। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে প্রাসাদে নিয়ে এলেন। বিপুল পরিমাণ উপহার-উপঢৌকন দিলেন ইব্রাহিম শর্কি এত আতিথেয়তা আশা করেননি। তিনি বিগলিত হয়ে গেলেন। কিন্তু ইব্রাহিম ধর্মগুরুদের কাছে দায়বদ্ধ, বাংলায় হিন্দু শাসনের অবসান ঘটাবেন।

গণেশ সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। তিনি প্রস্তাব দিলেন, তাঁর ১২ বছর বয়স্ক ছেলে যদুকে ধর্মান্তরিত করা হোক। সেই ছেলেই সিংহাসনে বসবে। ইব্রাহিম মুসলিম ধর্মগুরুদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।

গণেশের ছেলে যদু ধর্মান্তরিত হলেন, তাঁর নাম দেওয়া হলো জালালউদ্দিন। এই শিশুর মনে ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়া বিপুল ছাপ ফেলেছিল, পরের ঘটনাপ্রবাহ তার সাক্ষ্য দেবে।

বাংলায় আবার মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, এই তৃপ্তি এবং কয়েকটি গাড়ি বোঝাই করে মূল্যবান উপহার নিয়ে ইব্রাহিম শর্কি জৌনপুরে ফিরে গেলেন। নাবালক ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে গণেশ স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন। যাঁরা তাঁর শাসন উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের ওপর নির্যাতনের খড়্গগ নেমে এল। ১৪১৬ খ্রিষ্টাব্দে গণেশ বুঝলেন, যথেষ্ট সামরিক শক্তি সঞ্চয় করা গেছে। জৌনপুরের সুলতানও এখন বাংলায় এসে তাঁকে আক্রমণ করতে পারবেন না। তিনি ছেলে জালালউদ্দিনকে নামিয়ে আবারও নিজে সিংহাসনে বসলেন। গণেশ এক লাখ মুদ্রা খরচ করে পান্ডুয়ায় নিজের বিশাল প্রাসাদ বানালেন। সে প্রাসাদে ঢোকার দরজাটি উচ্চতায় খাটো। এককালে যাঁকে অন্য শাসকের কাছে বহুবার মাথা নোয়াতে হয়েছে, তিনি চাইলেন, তাঁর প্রাসাদে ঢোকার সময় সবাই বাধ্যতামূলকভাবে তাঁর কাছে মাথা নোয়াবে। অনেক ব্যয় করে ছেলে জালালউদ্দিনকে তিনি আবার ধর্মান্তরিত করলেন। পুরোহিতদের বিধান অনুযায়ী বিরাট এক সোনার তৈরি গাভি বানানো হলো। গাভির পেছনে এবং সামনে বিরাট গহ্বর। জালালউদ্দিন গাভির পেছনের গহ্বর দিয়ে ঢুকলেন, সামনের গহ্বর দিয়ে বেরিয়ে এসে হিন্দুত্ব ফিরে পেলেন। তাঁকে আবার যদু নাম দেওয়া হলো।

সম্ভবত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে ১৪১৮ খ্রিষ্টাব্দে গণেশের মৃত্যু হয়। মুসলিম ইতিহাসবিদদের ধারণা, তাঁর ছেলে যদু এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেটা হওয়া একটু অস্বাভাবিক, কারণ যদুর বয়স তখন ১৫। আর গণেশের মৃত্যুর পর প্রথমে গদিতে বসেন তাঁর আরেক ছেলে মহেন্দ্র, যদু নন। তবে মহেন্দ্র এক বছরের কম সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁকে উৎখাত করে পান্ডুয়ার সৈন্যবাহিনী যদুকেই আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনল।

যদু সিংহাসনে বসলেন জালালউদ্দিন নাম নিয়ে। ধর্মান্তরের পর ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগের কারণেই হোক, কিংবা একবার ধর্মত্যাগ করলে হিন্দুধর্মে স্বমর্যাদায় ফেরত যাওয়ার কোনো উপায় নেই, তা বুঝতে পেরেই হোক, জালালউদ্দিন তাঁর বাবার করা ‘শুদ্ধি অনুষ্ঠান’ অস্বীকার করলেন। যে ব্রাহ্মণেরা তাঁর শুদ্ধি অনুষ্ঠানে সোনার গাভির ভাগ পেয়েছিলেন, তাঁদের ধরে এনে জোর করে গরুর মাংস খাইয়ে ধর্মান্তরিত করা হলো। ধর্মান্তরকরণের ঘটনায় এক কিশোরের সুতীব্র মর্মপীড়ার আঁচ এই ঘটনা থেকে অনুভব করা যায়। রাজা গণেশের ধ্বংস করা মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো তিনি আবার তৈরি করে দেন।

তবে রাজ্যশাসনে জালালউদ্দিন পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছিলেন। গিয়াসউদ্দিনের রক্তসম্পর্কীয় এক রাজকন্যাকে বিয়ে করে তিনি ইলিয়াস শাহি বংশের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। শোনা যায়, স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, দ্বিতীয় কোনো বিয়ে করেননি। তাঁর ১৭ বছরের শাসনে বাংলায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কির আক্রমণ তিনি সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করেছিলেন। চীনা সম্রাটের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, তাঁকে দিয়ে জৌনপুরের সুলতানের কাছে দূত পাঠিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি হিরাট এবং মিসরে দূত পাঠিয়ে মুসলিমবিশ্বের এই দুই ক্ষমতাকেন্দ্র থেকেও নিজের স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন।

আবার দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাধান্য দেননি। যোগ্য হিন্দু সেনাপতি, অমাত্য, কবিকে নিজের সভায় স্থান দিয়েছেন। নিজের নামাঙ্কিত মুদ্রায় কালেমার উল্লেখ করেছেন, আবার সিংহের ছবি দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি।

১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দে সম্ভবত রোগভোগে বেশ অল্প বয়সেই জালালউদ্দিনের মৃত্যু হয়। তত দিনে রাজা গণেশের স্থাপিত হিন্দু রাজ্যের শেষ চিহ্নটুকুও অপসারিত হয়েছে। বাবার বানানো এক লাখি প্রাসাদ জালালউদ্দিন নিজের সমাধিভবন হিসেবে মনোনীত করেন। সেই সুদৃশ্য প্রাসাদে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর কবর পাশাপাশি আছে।

রাজা গণেশ বাংলায় হিন্দু শাসন ফিরিয়ে আনতে পারেননি, বরং তাঁর ধর্মান্তরিত সন্তানের হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সম্ভবত এই ব্যর্থতার দায়েই হিন্দু ইতিহাসবেত্তারাও (কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদে) রাজা গণেশকে মনে রাখতে চাননি। কিন্তু ইতিহাসের চাকা যেদিকে ঘুরছিল, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রায় একক প্রচেষ্টায় গণেশ ইলিয়াস শাহি বংশের এবং বাংলা মুসলিম শাসনের ধারায় যে সাময়িক বিরতি আনতে পেরেছিলেন, তা তাঁর সাংগঠনিক আর কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ

পরবর্তীকালে অনেক হিন্দু জমিদার মোগল-পাঠান-ইংরেজ শাসকের কাছে রাজা উপাধি পেয়ে আত্মপ্রসাদে ভুগেছেন। শুধু ইতিহাস জানে, রাজা গণেশ বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা।

সকল অধ্যায়
১.
তরুণ তুর্কি : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২.
পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ
৩.
বাঙ্গালার জন্ম : শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
৪.
আবেগপ্রবণ শাসক : গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
৫.
নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ
৬.
বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ
৭.
দলিতের উত্থান : মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র
৮.
স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
৯.
সম্রাটদের সাক্ষাৎ : শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন
১০.
সিংহ-পরিবার : মসনদ-এ-আলা ঈসা খাঁ, স্বর্ণময়ী, মুসা খাঁ
১১.
প্রতিরোধের শেষ : প্রতাপাদিত্য
১২.
চিরদুঃখীজন : শায়েস্তা খান
১৩.
প্রথম নবাব : মুর্শিদ কুলি খান
১৪.
সুযোগসন্ধানী : আলিবর্দি খান
১৫.
হতভাগ্য : সিরাজ-উদ-দৌলা
১৬.
যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম
১৭.
পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপঞ্জি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%