পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ

বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ প্রায় ভুলে যাওয়া এক নাম। কিন্তু বাংলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংহতি ও স্বাবলম্বনের জন্য ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা রাখেন।

১২২৭ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির ওপর দিল্লির সুলতানদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তা কখনো সবল, কখনো দুর্বল হয়ে ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলেছে। প্রথমে দিল্লির বলবন সুলতানেরা, তারপর খলজি এবং শেষে তুঘলক সুলতানেরা বাংলার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন। এঁরা যাঁদের লখনৌতির প্রশাসক বানিয়ে পাঠিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। বারবার বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে বিরক্ত দিল্লির সুলতানেরা লখনৌতির নাম দেন ‘বলগাকপুর’ (বিদ্রোহ ভূমি)। বিদ্রোহ দমনে খুব কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও কাজ হয়নি। এর একটা উদাহরণ দিই।

১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির সহকারী প্রশাসক তুগরল খান বিদ্রোহ করেন। তিনি দুবার দিল্লির সুলতানের পাঠানো বাহিনীকে পরাজিত করেন, কিন্তু তৃতীয়বারে স্বয়ং দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন যখন যুদ্ধ করতে এলে পরাজিত হয়ে তুগরল খান মারা যান। বিদ্রোহের শাস্তি হিসেবে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন তুগরলের ছেলে-জামাই-মন্ত্রী-গোলাম-দেহরক্ষী-পাইক সবাইকে রাজধানীর বাজারে পাইকারি হারে হত্যা করেন। অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে না পেরে তিনি নিজের ছেলে বুগরা খানকে লখনৌতির শাসনকর্তা বানিয়ে রেখে গেলেন। যাওয়ার আগে তিনি বুগরা খানকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে গেলেন, বুগরা খান যেন তুগরল খানের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেন। বিদ্রোহ করলে ছেলে বলে তিনি বুগরা খানকে মাফ করবেন না, তাঁকেও কঠোর শাস্তিই দেবেন।

বুগরা খান কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পরই স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠেন। প্রকাশ্যে বিদ্রোহ না করলেও প্রায় স্বাধীনভাবেই রাজ্য চালাতে থাকেন। এমনকি তাঁর বড় ভাইয়ের অকালমৃত্যুর পর গিয়াসউদ্দিন বলবন যখন তাঁকে দিল্লির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন, তখন তিনি দিল্লির সিংহাসনের চেয়ে লখনৌতির গদিকেই বেশি প্রিয় মনে করলেন। অনন্যোপায় হয়ে গিয়াসউদ্দিন বলবনের মৃত্যুর পর দিল্লির মন্ত্রীরা বলবনের পৌত্র ও বুগরা খানের ছেলে কায়কোবাদকে দিল্লির সিংহাসনে বসালেন। বুগরা খান ছেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পুত্রস্নেহের কাছে সিংহাসনের আকাঙ্ক্ষা পরাজিত হলো। সরযূ নদীর তীরে বাবা-ছেলে মৈত্রীর মনোভাব নিয়ে সাক্ষাৎ করলেন। কায়কোবাদ দিল্লির সিংহাসনে ফেরত গেলেন, বাবাকে লখনৌতিতে সার্বভৌম রাজত্বের অধিকার দিয়ে গেলেন। এই ঘটনা নিয়ে দিল্লির বিখ্যাত কবি আমির খসরু (যিনি একই সঙ্গে বহুভাষাবিদ পণ্ডিত, তবলা এবং সেতারের আবিষ্কারক, কাওয়ালির প্রচলনকারী, উর্দু সাহিত্যের জনক আবার ধর্মপ্রচারক নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য) ‘কিরান-উস-সাদাইন’ (দুই নক্ষত্রের মিলন) নামের এক কাব্য রচনা করেন। বুগরা খানের আরেক ছেলে কায়কাউসও ভাইয়ের সম্মতিক্রমে কিছুদিন লখনৌতিতে স্বাধীন রাজ্য চালিয়েছেন। কিন্তু পরোক্ষভাবে বলবন বংশের অধিকার লখনৌতির ওপর কায়েম ছিল।

১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দিল্লির সঙ্গে শান্তি সম্পর্ক স্থাপন হওয়ার পর লখনৌতির রাজ্যসীমা বাড়তে থাকে। সেন বংশের পতন হয়, বঙ্গ জনপদের পুরোটাই লখনৌতির শাসনের আওতায় আসে। লখনৌতির শাসনকর্তারা হুগলি নদীর ধারে সপ্তগ্রাম (সাতগাঁও, এখন চুঁচুড়ার কাছে) নদীবন্দর নিজেদের অধিকারে আনেন, দেব রাজবংশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সুবর্ণগ্রামে (সোনারগাঁয়ে) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

তুঘলক আমলে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক আর তাঁর ছেলে মুহাম্মদ বিন তুঘলক লখনৌতির ওপর আরও কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, লখনৌতিকে একক রাজ্য হিসেবে রাখলে সেখানে বারবার বিদ্রোহ হতেই থাকবে। তাই তাঁরা লখনৌতিকে তিনটি প্রশাসনিক অংশে ভাগ করেন। প্রথম অংশের কেন্দ্র ছিল পুরোনো রাজধানী লখনৌতি, দ্বিতীয় অংশের কেন্দ্র ছিল সপ্তগ্রাম, তৃতীয় অংশের কেন্দ্র ছিল সুবর্ণগ্রাম। রাজ্যের পূর্ব পাশে লখনৌতির সীমানা তখনো মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরে এসেই শেষ হয়েছে।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক বাহরাম খান নামের এক সেনাপতিকে আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে সুবর্ণগ্রামের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এই বাহরাম খানের দেহরক্ষীদের একজন ছিলেন ফখর। মেধা আর সাহসের গুণে ক্রমেই তিনি বাহরাম খানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বাহরাম খানের মৃত্যুর পর তিনি আচমকা স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ নামে সুবর্ণগ্রামের সিংহাসনে বসেন।

একজন দেহরক্ষীর এই স্পর্ধায় অন্যান্য এলাকার প্রশাসকেরা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের নির্দেশে লখনৌতির প্রশাসক কদর খান, সপ্তগ্রামের প্রশাসক আজম-উল-মুলক মিলিত বাহিনী নিয়ে সোনারগাঁও আক্রমণ করলেন। বিচক্ষণ ফখরউদ্দিন নিজের নৌবহর তৈরি রেখেছিলেন। যুদ্ধে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই পরাজয় স্বীকার করে, বহন করার মতো সম্পদ সঙ্গে নিয়ে মেঘনা নদী পার হয়ে গেলেন। মেঘনার পূর্ব তীরের গ্রামগুলোতে নিজের অনুগত বাহিনী নিয়ে তিনি আত্মগোপন করে রইলেন। কদর খান বা আজম-উল-মুলকের সঙ্গে নৌবহর ছিল না, তাঁরা ফখরউদ্দিনকে ধাওয়া করতে পারলেন না।

সুবর্ণগ্রাম জয়ের ফলে যে সম্পদ ভাগে পেয়েছিলেন, তা নিয়ে আজম-উল-মুলক সপ্তগ্রামে ফেরত গেলেন। কিন্তু কদর খান ঠিক করলেন, তিনি আরও কিছুদিন সুবর্ণগ্রামে থেকে যাবেন, যাতে ফখরউদ্দিন ফিরে এসে আবার এলাকা দখল না করে ফেলেন। তিনি সুবর্ণগ্রামে থাকতে থাকতেই বর্ষা এল। কদর খান সুবর্ণগ্রামের আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, আগে থেকেই বর্ষার প্রস্তুতি নেননি। তাঁর সৈন্য-হাতি-ঘোড়ার খাবারের সংকট দেখা দিল।

ফখরউদ্দিন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি কদর খানের অসন্তুষ্ট সৈন্যদের ঘুষ পাঠিয়ে হাত করলেন। নিজেও বর্ষার মধ্যেই নৌবহর নিয়ে সুবর্ণগ্রামে ফিরে এসে অতর্কিত আক্রমণ করলেন। যুদ্ধের ফল কী হতো কে জানে, কিন্তু কদর খানের পক্ষত্যাগী কিছু সৈন্যই তাঁকে হত্যা করে ফখরউদ্দিনের বিজয় নিশ্চিত করল।

সিংহাসনের ওপর যার উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার নেই, মধ্যযুগে এ রকম শাসককে চেষ্টা করতে হতো বেশি পরিশ্রম করে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিজের সভাসদ আর সৈন্যদের মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। ফখরউদ্দিন এ রকম একজন শাসক ছিলেন। তিনি জানতেন, লখনৌতি কিংবা সপ্তগ্রাম থেকে তাঁর ওপর আবার আক্রমণ আসতে পারে। নিজের শক্তি বাড়ানোর জন্য তিনি পূর্ব দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ পড়ল সমতট জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকা আর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ওপর।

সমতট জনপদ এলাকায় (এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী) দুই শ বছর ধরে দেব রাজবংশের শাসন কায়েম ছিল, কিন্তু ফখরউদ্দিন যখন ক্ষমতায়, তত দিনে দেব রাজাদের ক্ষমতা অস্তমিত। সমতট ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, বেশির ভাগ রাজ্যই আবার ত্রিপুরার রাজা প্রতাপ মাণিক্যের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরও তখন ত্রিপুরা-রাজের অধিকারে। কিন্তু ফখরউদ্দিন জানতেন এই বন্দরের বাণিজ্যের অধিকার লাভজনক। সিংহল, জাভা, সুমাত্রা, গুয়াংঝু, এমনকি সুদূর বসরা থেকে নিয়মিত জাহাজ এসে এই বন্দরে ভেড়ে। ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই বন্দর থেকে বিপুল রাজস্ব আহরণ করা যাবে।

এক বছর সুবর্ণগ্রামে থেকেই ফখরউদ্দিন তাঁর পদাতিক ও নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করে গড়ে তুললেন, তারপর ১৩৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরা-রাজ প্রতাপ মাণিক্যকে আক্রমণ করলেন। কুমিল্লার কাছে ত্রিপুরা-রাজের বাহিনীকে পরাজিত করে তিনি নোয়াখালীর মধ্যে দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে গেলেন। ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে কর্ণফুলী নদীর ধারে ত্রিপুরা-রাজের চট্টগ্রাম-রক্ষী বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেও হার মানতে বাধ্য হলো। ফখরউদ্দিন চট্টগ্রাম দখল করলেন। তাঁর চেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দরে আরব বণিকদের যাতায়াত বাড়ল, সমুদ্র-বাণিজ্যও বহুগুণে বাড়ল।

ফখরউদ্দিন মধ্য এশিয়া থেকে আসা সেই অল্প কিছু মানুষের একজন, যাঁরা নৌশক্তি আর নৌবহরের গুরুত্ব বুঝতেন। তিনি নিজের নৌবহরের শক্তি বাড়ালেন। চট্টগ্রামের জাহাজ-নির্মাণশিল্পকেও বহুগুণে বাড়িয়ে তুললেন। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী, নোয়াখালী হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত এক বিরাট রাজপথ তৈরি করেছিলেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই পথের কিছু কিছু অংশ টিকে ছিল, নোয়াখালীর অধিবাসীরা একে ‘হদ্দিনের ফত (ফখরউদ্দিনের পথ)’ নামে ডাকতেন। এই এলাকায় তিনি বহু মসজিদ, সরাইখানা আর দিঘি স্থাপন করেছিলেন। ফেনীর শর্শদী ইউনিয়নে ফখরউদ্দিনের মসজিদ, পার্শ্ববর্তী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতী স্টেশনের কাছে ফখরউদ্দিনের দিঘি এখনো আছে।

চট্টগ্রাম দখলের যুদ্ধে কদর খান, শরিফউদ্দিন, বদর আলম, হাজি খলিলসহ মোট বারোজন ধর্মপ্রচারক তাঁদের অনুচরসহ ফখরউদ্দিনের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁরা চট্টগ্রামেই নিজেদের খানকাহ স্থাপন করে ধর্মপ্রচারের কাজ চালাতে শুরু করেন, সেই থেকেই ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ প্রবাদের শুরু।

চট্টগ্রামের পর ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ শ্রীহট্টেও (সিলেটে) অভিযান চালান। ইয়েমেন থেকে আসা ধর্মপ্রচারক হজরত শাহজালাল (রহ.) শ্রীহট্টের একাংশে তার আগেই কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সাহায্যে ফখরউদ্দিন জয়ন্তিয়া ও লাউড় অঞ্চলেও কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

চট্টগ্রাম ও সিলেট অভিযানের সময় ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ রাজ্য পরিচালনার জন্য ইসলাম প্রচারকদের সাহায্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সুফিসাধক ও দরবেশদের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা করেন। ফখরউদ্দিনের সুবর্ণগ্রাম রাজ্যে চলাচলের সময় তাঁরা অতিথিশালায় বিনা মূল্যে খাবার ও আশ্রয় পেতেন, তাঁদের নৌকাভাড়াও দিয়ে দেওয়া হতো সুলতানের কোষাগার থেকে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ফখরউদ্দিনের রাজ্যে ভ্রমণে এসে মরক্কোর বিখ্যাত ভূপর্যটক ইবনে বতুতা এই ব্যবস্থার বিশেষ সুফল পেয়েছিলেন। থাকা-খাওয়ার খরচ তাঁকে দিতেই হয়নি, বরং যে শহরেই গেছেন, দিনে আধা দিনার (আজকের মূল্যমানে প্রায় দুই হাজার টাকা) হাতখরচ পেয়েছেন। ইবনে বতুতা ফখরউদ্দিনের বাণিজ্যবহর এবং নৌবহর দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। বাংলায় শস্য, সম্পদ, মাছ-মাংসের প্রাচুর্যও তাঁকে খুব অবাক করেছিল। তবে মাত্র ৭ টাকায় (আজকের হিসাবে প্রায় ২৮ হাজার টাকায়) একটি সুন্দরী দাসী কিনে নিয়ে তিনি ইতিহাসে লিখে রেখে গেছেন, মানুষের দামও তখন বড় কম ছিল।

ফখরউদ্দিন পূর্ব দিকে রাজ্য বিস্তারের সাফল্যের পর পশ্চিম দিকে ও রাজ্যের সীমা বাড়াতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বারবার সপ্তগ্রাম বা লখনৌতি আক্রমণ করেও কখনোই তিনি এই শহরগুলো ধরে রাখতে পারেননি। ১৩৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুবর্ণগ্রামে রাজত্ব করে তিনি মারা যান। ছেলে ইখতিয়ার উদ্দিন গাজি শাহকে সিংহাসনে বসিয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে বেশি দিন সিংহাসন ধরে রাখতে পারেননি।

ফখরউদ্দিনের ১১ বছরের শাসনে বাংলার সীমান্তের পূর্বরেখাটি চিরদিনের মতো আঁকা হয়ে গেল। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা স্থায়ীভাবে বাংলার অংশ হয়ে গেল, এই দুই অঞ্চল পুনর্দখলের সব চেষ্টা করেও ত্রিপুরা রাজ্য আর আরাকান রাজ্য ব্যর্থ হয়ে একসময় হাল ছেড়ে দেয়। শ্রীহট্টের বড় অংশই পাকাপাকিভাবে বাংলার অধিকারে এল।

ফখরউদ্দিনের শাসনের আরেকটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব একটু অপ্রত্যক্ষ ফখরউদ্দিনের সঙ্গে লখনৌতির শাসনকর্তা আলাউদ্দিন আলী শাহের যুদ্ধ লেগেই থাকত। শুকনো মৌসুমে আলাউদ্দিন আলী শাহ সুবর্ণগ্রাম আক্রমণ করতেন, আর বর্ষা মৌসুমে ফখরউদ্দিন নৌবহর পাঠাতেন লখনৌতি আক্রমণ করতে। এই দীর্ঘ লড়াই লখনৌতিতে আলাউদ্দিন আলী শাহের প্রতি তাঁর সৈন্যদের আনুগত্য কমিয়ে দিয়েছিল। এই সুযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইলিয়াস শাহ লখনৌতির সিংহাসন দখল করেন। ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের মতো তিনিও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আনুগত্য স্বীকার না করে নিজেকে স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। পরের দুই শ বছর, ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে শের খান (পরে শেরশাহ) বাংলা জয় করার আগপর্যন্ত এই ভূখণ্ড স্বাধীন থাকবে, দুই শ বছর ধরে স্বাধীন সুলতানদের শক্তি জুগিয়ে যাবে ফখরউদ্দিনের জয় করে যাওয়া রাজ্যের পূর্ব অংশ, তার উর্বর জমি, তার নদীপ্রবাহ, তার সমুদ্রবন্দর।

এককালের দেহরক্ষী ফখরউদ্দিন রণকুশলতা আর সাহস সম্বল করে এভাবেই বাংলার ইতিহাসে প্রায় সবার অগোচরে তাঁর স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন।

সকল অধ্যায়
১.
তরুণ তুর্কি : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২.
পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ
৩.
বাঙ্গালার জন্ম : শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
৪.
আবেগপ্রবণ শাসক : গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
৫.
নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ
৬.
বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ
৭.
দলিতের উত্থান : মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র
৮.
স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
৯.
সম্রাটদের সাক্ষাৎ : শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন
১০.
সিংহ-পরিবার : মসনদ-এ-আলা ঈসা খাঁ, স্বর্ণময়ী, মুসা খাঁ
১১.
প্রতিরোধের শেষ : প্রতাপাদিত্য
১২.
চিরদুঃখীজন : শায়েস্তা খান
১৩.
প্রথম নবাব : মুর্শিদ কুলি খান
১৪.
সুযোগসন্ধানী : আলিবর্দি খান
১৫.
হতভাগ্য : সিরাজ-উদ-দৌলা
১৬.
যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম
১৭.
পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপঞ্জি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%