বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ

রাজা গণেশ এবং তাঁর ছেলে জালালউদ্দিনের শাসনামলে ইলিয়াস শাহ-সিকান্দর শাহ-গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের বংশধরেরা রাজদরবার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, কিংবা তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বংশধরদের একজন ছিলেন নাসিরউদ্দিন। তিনি কিছু ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে সেগুলো তদারকের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজদরবারের প্রভাবপ্রতিপত্তির মোহ ও রাজনীতির কূটচাল থেকে দূরে সরে ছিলেন।

জালালউদ্দিন অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করায় তাঁর ছেলে শামসউদ্দিন আহমদ শাহও খুব অল্প বয়সে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু সবার প্রতিভার বিকাশ সমান দ্রুত হয় না। শামসউদ্দিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন সাদি খান ও নাসির খান নামের দুই অমাত্য। এঁদেরই মিলিত ষড়যন্ত্রে মাত্র তিন-চার বছর রাজত্ব করার পর ১৪৩৬ খ্রিষ্টাব্দে শামসউদ্দিন নিহত হন।

শামসউদ্দিনের মৃত্যুর পরপর একদা-মিত্র সাদি খান ও নাসির খান ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এই লড়াইয়ে দুজনেরই ব্যাপক শক্তি ক্ষয় হয়। সাদি খান নাসির খানের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। নাসির খানকে অমাত্যরা এক জোট হয়ে হত্যা করেন। এখন তাহলে সিংহাসনে বসবে কে?

দুঃসময়ে মানুষ অতীতের স্বর্ণযুগের কথা মনে করতে ভালোবাসে। অমাত্যরা ইলিয়াস শাহি রাজবংশের ন্যায়নিষ্ঠার কথা মনে করলেন। ইলিয়াস শাহি বংশের একজন প্রতিনিধির খোঁজ পড়ল। নাসিরউদ্দিন নিজের জমিদারি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাঁকে প্রায় ধরে-বেঁধে এনে বাংলার সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হলো, তাঁর নাম দেওয়া হলো নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ।

প্রথমে অনিচ্ছুক হলেও সুলতান হিসেবে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ অযোগ্য ছিলেন না। তিনি শাসনব্যবস্থা ও কর আদায়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। সামরিক অভিযানগুলোতে খুব একটা সফলতার পরিচয় দিতে পারেননি। তবে প্রায় চব্বিশ বছর নির্বিঘ্নে রাজত্ব করে ১৪৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী নির্বাচনে খুব একটা ঝামেলা হয়নি। কারণ, জীবদ্দশাতেই তাঁর ছেলে রুকনউদ্দিন বারবক অমাত্য ও সৈন্যদের আস্থা অর্জন করেন। বাবা নাসিরউদ্দিন জীবদ্দশাতেই যোগ্য ছেলেকে প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়েছিলেন। যুবরাজ থাকা অবস্থায় রুকনউদ্দিন দক্ষিণ বাংলায় প্রশাসনের দায়িত্ব নেন। যশোর রাজ্যের (আজকের বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চল) স্থানীয় জমিদারেরা প্রায়ই বাংলা সালতানাতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করতেন। যুবরাজ রুকনউদ্দিন উলুঘ খান নামের এক ধর্মপ্রচারকের সাহায্যে যশোরে বাংলার সুলতানের কর্তৃত্ব স্থায়ী করার ব্যবস্থা নেন। উলুঘ খান এককালে জৌনপুর সুলতানের সেনাপতি ছিলেন, ১৪১৮ খ্রিষ্টাব্দে অসফল বাংলা আক্রমণের পর সুলতান ইব্রাহিম শর্কি ফেরত গেলেও উলুঘ খান সম্ভবত পক্ষত্যাগ করে জালালউদ্দিনের সঙ্গে যোগ দেন, দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে যশোরে চলে যান। তিনি যশোর অঞ্চলে পুকুর, দিঘি, মাদ্রাসা, সরাইখানা ইত্যাদি স্থাপন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। রুকনউদ্দিন দক্ষিণবঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বর্ষীয়ান ধর্মপ্রচারকের জনপ্রিয়তা কাজে লাগান। সম্ভবত তাঁরই সুপারিশে সুলতান নাসিরউদ্দিন উলুঘ খানকে খান-ই-আজম উপাধি দিয়েছিলেন, যা পরে লোকমুখে ‘খানজাহান’ হয়ে ওঠে। উলুঘ খান বাগেরহাটে যে ষাট গম্বুজ মসজিদ (আসলে গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি, কিন্তু ৮১ গম্বুজ দাঁড়িয়ে আছে ৬০টি স্তম্ভের ওপর) নির্মাণ করেন, তার পাথর আনা হয়েছিল গৌড়ের সীমান্তসংলগ্ন রাজমহল থেকে। রুকনউদ্দিনের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া খানজাহান উলুঘ খান এই কাজ করতে পারতেন বলে মনে হয় না। ষাট গম্বুজ মসজিদ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

রুকনউদ্দিন বারবক শাহ সিংহাসনে বসে সামরিক প্রশাসন, বেসামরিক প্রশাসন, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, এই তিন ক্ষেত্রেই মনোযোগ দেন। নাসিরউদ্দিনের সময় থেকেই ওড়িশা-রাজ কপিলেন্দ্র দেব বাংলার সীমান্তে নিয়মিতভাবে রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা করছিলেন। রুকনউদ্দিন এই প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন। জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি বহু দিঘি ও খাল খনন করান, সরাইখানা-মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। গৌড়ের (এখন মালদহে) দাখিল দারওয়াজা নির্মাণের কৃতিত্ব ইতিহাসবিদেরা তাঁকেই দিয়েছেন। তিনি গৌড় নগরে খুব সুন্দর এক রাজপ্রাসাদ তৈরি করেছিলেন, শিলালিপিতে তার প্রমাণ আছে, কিন্তু রাজপ্রাসাদের কোনো ধ্বংসাবশেষ এখন আর টিকে নেই।

বারবক শাহ যে প্রতিভার কদর করতে জানতেন, তার অনেক উদাহরণ আছে। গৌড়ের কাছে (এখন মালদহে) তিনি একটি বাঁধ নির্মাণ করাচ্ছিলেন। তাঁর প্রকৌশলীরা কাজ করতে গিয়ে নদীর খরস্রোতের কারণে বারবার ব্যর্থ হন। এ সময় ইসমাইল কুরায়শি নামের এক অপরিচিত আরব ভাগ্যান্বেষী যেচে পরামর্শ দিতে এলেন। রাজকর্মচারীরা বাধা দিতে চেয়েছিলেন, বারবক শাহ তাঁদের অগ্রাহ্য করে ইসমাইলের পরামর্শ শুনলেন। কাজ সেই মতো হলো, বাঁধ নির্মাণে আর সমস্যা রইল না। বারবক শাহ এই বুদ্ধিমান মানুষটিকে সেনা বিভাগে কাজ দিলেন। তাঁর নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন ত্রিহুত আক্রমণ করতে। ইসমাইল ত্রিহুত আক্রমণ করে জমিদার ভরত সিংহকে জৌনপুরের সুলতানের বদলে বারবক শাহের কাছে কর দিতে বাধ্য করেন, বাংলা রাজ্যের সীমা গন্ডক নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। এরপর বারবক শাহ ইসমাইলকে কামরূপ অভিযানে পাঠান। ইসমাইল কামরূপ অভিযানে সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। আজকের ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তরাঞ্চল (নেত্রকোনা, জামালপুর ইত্যাদি) এই সময় থেকেই বাংলার স্থায়ী অধিকারে আসে। কামরূপের রাজা বারবক শাহের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, ইসমাইলের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ঈর্ষাকাতর কোনো সহকর্মী বারবক শাহের কাছে খবর পাঠান, ইসমাইল আনুগত্য পরিবর্তন করে কামরূপ-রাজের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। বারবক শাহ ১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপ দখলের জন্য আরেকটি সৈন্যবাহিনী পাঠান, তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে ইসমাইলের মৃত্যু হয়। তবে ইসমাইলের মৃত্যুর পর বারবক শাহ (সম্ভবত আসল ঘটনা জানতে বা অনুমান করতে পেরে) ইসমাইলের মরদেহ মন্দারণে (এখন বর্ধমান জেলায়) যথাযোগ্য মর্যাদায় সমাহিত করেন।

অনন্ত সেন ও নারায়ণ দাস নামের দুই ভিষককে রুকনউদ্দিন বারবক শাহ ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের চিকিৎসার খ্যাতি দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘোড়াঘাটের জমিদার বন্দশ্রী রায়কে (সম্ভবত বিকৃতির ফলে ইতিহাসে তাঁর নাম হয়ে গেছে ভাঁদসী রায়) রুকনউদ্দিন সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন, তিনিও কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে রুকনউদ্দিন তাঁর পূর্বসূরি সব সুলতানকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি ফারসি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। শরফনামার লেখক ইব্রাহিম কওয়াম ফারুকী তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা, রুকনউদ্দিন রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। তাঁর উৎসাহেই মালাধর বসু বাংলায় শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্য অনুবাদ করেন। তাঁরই আদেশে কৃত্তিবাস ওঝা বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেন। দূরদর্শী রুকনউদ্দিন জানতেন, আরবি-ফারসি-সংস্কৃত ভাষায় নয়, বাংলার জনগণকে সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে তাদের কাছে সাহিত্যকে তাদের মাতৃভাষা বাংলায় পৌঁছে দিতে হবে।

বহুভাষাবিদ পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, বাংলা ভাষার জন্ম যদিও সংস্কৃত থেকে মাগধি প্রাকৃত হয়ে, কিন্তু তার বাক্যপ্রকরণ রীতি ফারসি ভাষার সঙ্গে বেশি মেলে। সংস্কৃত বা অন্যান্য পূর্ব ভারতীয় ইন্দো-আর্য ভাষার (যেমন ওড়িয়া) সঙ্গে এখানে বাংলা ভাষার অমিল। ফারসিভাষী রুকনউদ্দিন বারবকের দরবারে জোরেশোরে বাংলার চর্চা শুরু হওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, ভাষা-সাহিত্যের গবেষকেরা তা অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন।

প্রশাসক হিসেবে তাঁর মনোভাব যেমন অসাম্প্রদায়িক, তেমন বর্ণবৈষম্যহীন ছিল। বাংলার সুলতানদের দরবারে বহু ‘হাবশি’ সৈন্য ও খোজা (নপুংসক) প্রহরী কাজ করতেন। নামে হাবশি (আবিসিনিয়া বা আজকের ইথিওপিয়ার অধিবাসী) হলেও এঁরা আসলে পুরো পূর্ব আফ্রিকা উপকূলের দেশগুলো থেকেই আসতেন। কিন্তু রুকনউদ্দিন বারবক শাহের আগে কেউই তাঁদের উঁচু রাজপদে বসাতে চাননি। রুকনউদ্দিন আফ্রিকা বংশোদ্ভূত যোগ্য সৈন্যদের সেনাপতি পদে নিয়োগ দেন। ‘খোজা’ হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রহরী যোগ্যতার পরিচয় দিলে তাঁকে অমাত্য বানাতে দ্বিধা করেননি।

পনেরো বছরের বর্ণাঢ্য শাসনের পর ১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রুকনউদ্দিন বারবক শাহ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু বাংলায় সাহিত্যচর্চায় সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতার একটা ধারা প্রতিষ্ঠা করে রেখে যান। ফারসি, আরবি, সংস্কৃত থেকে দুই হাতে ঐশ্বর্য গ্রহণ করে বাংলা ভাষা ক্রমেই বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠবে। কয়েক শতাব্দী পর এই ভাষার অধিকারের দাবিতেই বাঙালি তার স্বাধীন রাষ্ট্রচিন্তার প্রথম সোপানে পা দেবে।

রুকনউদ্দিন বারবক শাহ জানতে পারেননি, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তিনি এক মহিরুহের বীজ বপন করে গেছেন।

সকল অধ্যায়
১.
তরুণ তুর্কি : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২.
পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ
৩.
বাঙ্গালার জন্ম : শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
৪.
আবেগপ্রবণ শাসক : গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
৫.
নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ
৬.
বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ
৭.
দলিতের উত্থান : মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র
৮.
স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
৯.
সম্রাটদের সাক্ষাৎ : শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন
১০.
সিংহ-পরিবার : মসনদ-এ-আলা ঈসা খাঁ, স্বর্ণময়ী, মুসা খাঁ
১১.
প্রতিরোধের শেষ : প্রতাপাদিত্য
১২.
চিরদুঃখীজন : শায়েস্তা খান
১৩.
প্রথম নবাব : মুর্শিদ কুলি খান
১৪.
সুযোগসন্ধানী : আলিবর্দি খান
১৫.
হতভাগ্য : সিরাজ-উদ-দৌলা
১৬.
যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম
১৭.
পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপঞ্জি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%