স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বাবা সৈয়দ আশরাফ আল হোসেনি মক্কার অধিবাসী। এডেন বন্দর (এখন ইয়েমেনে) থেকে বাণিজ্য জাহাজে করে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। সেখান থেকে কাজের খোঁজে গৌড়ে আসেন, সুলতান ফতেহ শাহের আমলে সভাসদ হয়ে ওঠেন। বাবার সুপারিশে আলাউদ্দিন নগর-প্রশাসক সুবুদ্ধি রায়ের সহকারী হিসেবে চাকরি নেন। এখন যেখানে মুর্শিদাবাদ, সেই অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে বিভিন্ন জলাশয় খনন ও উন্নয়নকাজে জড়িত ছিলেন।

ফতেহ শাহ হাবশি বিতাড়ননীতি গ্রহণ করায় তাঁর দরবারে সৈয়দ বংশীয় সভাসদদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। আলাউদ্দিন গৌড়ে চলে আসেন এবং সৈন্যবাহিনীতে কাজ শুরু করেন।

ফতেহ শাহকে হত্যা করে হাবশি সুলতানরা যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতির মধ্যেও সৈয়দ আশরাফ আল হোসেনি এবং আলাউদ্দিন রাজদরবারে তাঁদের অবস্থান ধরে রাখেন। সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ, কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ যে চার বছর রাজত্ব করেন, সে চার বছরে আলাউদ্দিন প্রভাবশালী সেনাপতিতে পরিণত হন। তিনি উত্তর সীমান্তে কামতা ও কামরূপ রাজ্যের সঙ্গে এবং দক্ষিণ সীমান্তে জাজনগর রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শেষ হাবশি সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে উজির হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

সুলতান মুজাফফর শাহ তাঁর আগের সুলতানকে হত্যা করেছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। সৈন্যদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আরও অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরই সুযোগে বিদ্রোহ করে ১৪৯৩ খ্রিষ্টাব্দে আলাউদ্দিন বাংলায় হাবশি শাসনের অবসান ঘটান, নিজেই সুলতান হয়ে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নামে সিংহাসনে বসেন।

হোসেন শাহের বাবা আরব দেশ থেকে এলেও তাঁর মা সম্ভবত বাঙালি ছিলেন। পর্তুগিজ ইতিহাসবেত্তা হোয়াও দ্য ব্যারস তাঁর এশিয়ায় কয়েক দশক বইয়ে ভুল করে আলাউদ্দিনকে হাবশি সুলতান বলে উল্লেখ করেছেন, চট্টগ্রামের কবি পরমেশ্বর তাঁর মুখে শ্রীকৃষ্ণের আদল দেখতে পেয়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন, সবই সম্ভবত তাঁর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বঙ্গীয় শ্যামবর্ণের কারণে।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ জানতেন, হাবশি সুলতানদের আমলের অন্তঃকলহ বাংলার সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে ফেলেছে। সিংহাসনে বসার পর তিনি প্রথমে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অংশকে নিষ্ক্রিয় করেন। হাবশি দেহরক্ষীদের বদলে উজবেক ও আফগান দেহরক্ষী নিয়োগ করেন। বহু বিদ্রোহী পাইক চাকরি হারায়, বাংলার সীমান্ত পার হয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। রাজদরবারের উচ্চাভিলাষী সভাসদদেরও তিনি নিয়ন্ত্রণে আনেন। লুটতরাজ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। আলাউদ্দিন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। সব সমস্যার একবারে সমাধান করতে যাননি। একটি একটি করে নিরসন করেছেন। গৌড়ের হিংসাত্মক রাজনীতির হাত থেকে বাঁচতে তিনি রাজধানী একডালায় স্থানান্তর করেন।

সিংহাসনে বসার এক বছরের মাথায় আলাউদ্দিন একটি কূটনৈতিক সমস্যায় পড়লেন। ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান সিকান্দর লোদি জৌনপুরের সুলতান হোসেন শাহ শর্কিকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসে হোসেন শাহ শর্কি বাংলার সুলতানের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেন।

দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে বাংলার বহুকাল বিবাদ ছিল না। কিন্তু দিল্লির সুলতানের প্রতিপক্ষকে আশ্রয় দিলে সেই বিবাদ নতুন করে শুরু হবে। আলাউদ্দিন অনেক চিন্তাভাবনা করে ঝুঁকিটাই নিলেন। জৌনপুরের সুলতান এসে গৌড়ের প্রাসাদে আতিথ্য নিলেন, ওদিকে বাংলার সুলতান নিজের ছেলে দানিয়ালের নেতৃত্বে এক সেনাবাহিনী পাঠালেন আগুয়ান দিল্লি সুলতানের বাহিনীকে বাধা দেওয়ার জন্য। পাটনার কাছে দিল্লির সৈন্যদের সঙ্গে বাংলার সৈন্যদের সংঘর্ষ হলো।

দানিয়ালের বাংলা-বাহিনী যুদ্ধে যথেষ্ট শৌর্য-বীর্যের পরিচয় দিয়েছিল বলেই মনে হয়। দিল্লির সুলতান সন্ধি করে দিল্লি ফিরে যেতে বাধ্য হন। সুলতানি আমলে এটি ছিল বাংলা দখলে দিল্লির তৃতীয় অসফল প্রচেষ্টা। কৃতজ্ঞ হোসেন শাহ শর্কি বাংলার সুলতান আলাউদ্দিনের হাতে তাঁর রাজ্যের পাটনা, ভাগলপুর, মুঙ্গের, বিহার শরিফ এলাকা অর্পণ করেন।

১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিনের সেনাবাহিনী উত্তরে কামতা রাজ্য আক্রমণ করে। কামতা-রাজ নীলাম্বর বন্দী হন। কামতা-রাজ্যের এক অংশ বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়। দক্ষিণে ওড়িশার রাজা প্রতাপরুদ্রের সঙ্গেও আলাউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করেছেন। ১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দে আলাউদ্দিনের সেনাবাহিনী কটক পার হয়ে পুরীতে হামলা চালায়, কিন্তু ওড়িশা-রাজের প্রতিরোধের মুখে আবার বাংলার সীমান্ত পর্যন্ত পিছিয়ে আসে।

পূর্ব সীমান্তে ত্রিপুরা এবং আরাকান রাজ্যের সঙ্গেও সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে দীর্ঘ যুদ্ধ চালাতে হয়েছে। ত্রিপুরা-রাজ ধনমাণিক্য বাংলার কাছ থেকে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের আমলে বেদখল হয়ে যাওয়া অঞ্চল ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরাকান-রাজ সালিঙ্গাতু ও গজপতির মৈত্রী চুক্তি হয়। ধনমাণিক্য কুমিল্লা অঞ্চল দখল করেন, আরাকান-রাজের সহায়তায় চট্টগ্রামও দখল করে নেন। কিন্তু সুলতান ত্রিপুরার সঙ্গে যুদ্ধ করতে দুটি বাহিনী পাঠালেন। সেনাপতি গোরাই মল্লিক ও হায়দর খান কুমিল্লা অঞ্চলে হৃত অঞ্চল আবার দখল করে নিলেন। পরাগল খান এবং তাঁর ছেলে নসরত (ছোটে) খান ত্রিপুরা-আরাকান মিলিত বাহিনীর হাত থেকে চট্টগ্রাম পুনর্দখল করেন।

সীমান্তে এত সংঘর্ষের পরও বাংলা রাজ্যে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। ২৪ বছরের শাসনকালে তিনি বহু রাস্তা তৈরি করেছিলেন। দরিদ্র জনগণকে সাহায্য করার জন্য বহু লঙ্গরখানাও চালিয়েছেন। তাঁর কর্মকর্তা ওয়ালি খান পিরোজপুরে (এখন শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি বাংলাদেশের সীমান্তভুক্ত সুলতানি আমলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর একটি। গোয়ালদি মসজিদ (সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ) ও সাতৈর মসজিদ (বোয়ালমারী, ফরিদপুর) তাঁরই কীর্তি। ঢাকার বাবুবাজারেও আলাউদ্দিন হোসেন শাহ একটি মসজিদ স্থাপন করেছিলেন, সে মসজিদ এখন আর টিকে নেই।

আলাউদ্দিন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। সহিহ বুখারি হাদিস অনুবাদের জন্য তিনি মুহাম্মদ বিন ইয়াজদান বখশ নামের এক শিক্ষিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। রাজধানী একডালা থেকে পায়ে হেঁটে পান্ডুয়ায় তিনি সুফি ধর্মপ্রচারকদের শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন।

আবার শাসনকাজে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অসাম্প্রদায়িক। সেখানে তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আরব-উজবেক-আফগান ব্যক্তিরা যেমন ছিলেন, তেমন ছিলেন বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাও। রূপ ও সনাতন নামে দুই ভাই তাঁর শাসনামলে সাচিবিক দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁদের আরও কিছু আত্মীয় সরকারি উচ্চ পদে ছিলেন।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সাহিত্য রচনায় উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর অনুসরণে সে সময়ে অন্য প্রশাসক ও সেনাপতিরাও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁর সময়ে বিজয় গুপ্ত মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন। তাঁর সেনাপতি পরাগল খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর পাণ্ডব-বিজয় কাব্য রচনা করেন, ছোটে খানের উৎসাহে শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অনুবাদ করেন। যশরাজ খান নামে সুলতানের আরেক কর্মকর্তা নিজেই কিছু বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেন।

সুলতানের হিন্দু কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই বৈষ্ণবধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, এই ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সাহায্য করেছিলেন।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলেই প্রথমবারের মতো পর্তুগিজ বাণিজ্যবহর চট্টগ্রাম বন্দরে এসে হাজির হয়। ১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ার শাসনকর্তা আলবুকার্ক তাঁর দূত হোয়াও দ্য সিলভেরাকে সুলতান আলাউদ্দিনের কাছে পাঠান। সিলভেরা চট্টগ্রামে পর্তুগিজ কুঠি স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি পাওয়ার আগেই তিনি চট্টগ্রামের শাসনকর্তা নসরত খানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন। বাংলায় ঔপনিবেশিক বসতি কিছুকালের জন্য পিছিয়ে গেল।

১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ সন্তান রেখে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তত দিনে তাঁর বড় ছেলে নসরত শাহ বাবার সঙ্গে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব পালন করছেন, আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তিনিই সিংহাসনে বসেন। গৌড়ের কাছেই একনাখা নামের এক গ্রামে (এখন মাহদিপুর, মালদহ) তাঁর সমাধি ছিল। ১৮৪৬ সালেই সমাধিটি ধ্বংস হয়েছিল, এখন আর সমাধিটির চিহ্ন পাওয়া যায় না।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলের এক আপাত-তুচ্ছ ঘটনার কথা বলে রাখা দরকার। সে সময়ে চেঙ্গুটিয়ার জমিদার ছিলেন দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরী। তাঁর ছিল চার ছেলে: কামদেব, জয়দেব, রতিদেব, শুকদেব রায়চৌধুরী। কামদেব আর জয়দেব দক্ষিণবঙ্গের প্রশাসক পীর আলীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। পীর আলী প্রতিশোধ নিতে তাঁদের রাজনৈতিক চাপে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। অন্য দুই ভাই রতিদেব আর শুকদেব ধর্মান্তরিত হননি, কিন্তু ভাইদের ধর্মান্তরের অপরাধে তাঁদেরও সমাজচ্যুত হতে হলো। তাঁদের নামই হয়ে গেল পীরালি ঠাকুর। কুলীন ব্রাহ্মণেরা তাঁদের বাড়িতে বিয়ের সম্পর্কে জড়াতে অস্বীকার করতে শুরু করলেন।

সমাজ সম্পর্ক না রাখতে চাইলেও ব্যক্তিকে সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই হয়। শুকদেব রায়চৌধুরীর মেয়ের যখন বিয়ের বয়স হলো, তিনি সম্পত্তি দেবেন এই আশ্বাসে জগন্নাথ কুশারি নামের এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন। পীরালি ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে করায় জগন্নাথ নিজেও সমাজচ্যুত হলেন। শ্বশুর শুকদেব তাঁকে বারোপাড়া নামের গ্রামে প্রচুর জমিজিরাত দান করলেন। সেখানে জগন্নাথ কুশারির নতুন যাত্রা শুরু হলো।

দেড় শ বছর পর জগন্নাথ কুশারির দুই উত্তরপুরুষ শুকদেব আর পঞ্চানন কুশারি কাজের খোঁজে কলকাতায় গেলেন। তাঁরা ডাচ, পর্তুগিজ আর ইংরেজদের কুঠিতে রপ্তানির মাল সরবরাহ করতেন। ব্রাহ্মণ বলে সবাই তাঁদের ‘ঠাকুর’ বলে ডাকতে শুরু করল। ক্রমেই কুশারি পদবি মুছে গিয়ে তাঁদের পদবি হয়ে দাঁড়াল ঠাকুর। এই বংশেই পরের এক শ বছরের মধ্যে একে একে জন্ম নিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হিন্দুধর্মের কঠোর নিয়মের কারণে পূর্বপুরুষের নিগ্রহ-ভোগান্তির কথা মনে রেখে এঁরা প্রত্যেকেই আজীবন সংগ্রাম করে গেলেন আরেকটু উদার, আরেকটু আলোকিত, আরেকটু মানবিক সমাজ গঠন করার জন্য।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের যুগকেই বলা যায় বাংলা সালতানাতের শেষ স্বর্ণযুগ। তাঁর সুযোগ্য ছেলে নসরত শাহের আমলে ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাবর পানিপথের যুদ্ধে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে (যাঁর বাবা সিকান্দর লোদি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করেছিলেন) হারিয়ে দিল্লিতে মোগল বংশ স্থাপন করেন। ক্রমেই বাবরের চোখ পড়তে থাকে বাংলার সম্পদের দিকে। নসরত শাহ তাঁর বাবার মতোই দক্ষ কূটনীতিক ছিলেন। মোগল শাসনের শুরুর দিকে দিল্লি থেকে বিতাড়িত আফগানদের যেমন আশ্রয় দিয়েছেন, তেমনি সম্রাট বাবরের সঙ্গেও ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু নানা অজুহাতে ১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে বাবর বাংলা আক্রমণ করেন। নসরত শাহ এগিয়ে গিয়ে যুদ্ধ করেননি, তিনি প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেন। হতাশ বাবর সন্ধি করে পিছিয়ে যান, ফলে বাংলার স্বাধীনতা আরও কয়েক বছর টিকে যায়।

নসরত শাহের আমলেই হোসেন শাহি বংশে অন্তঃকোন্দল দেখা দিয়েছিল বলে মনে হয়। ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নসরত শাহ একনাখায় বাবার কবর জিয়ারত করছিলেন, এই সময় ঢিলেঢালা নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এক গুপ্তঘাতক তাঁকে খুন করে। নসরত শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আর ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এরই সুযোগে ১৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দুঃসাহসী ও রণকুশলী এক আফগান বাংলা আক্রমণ করে দখল করে নেন। তাঁর নাম শের খান। বাংলা দখল ছিল ভারতের সিংহাসন জয়ের পথে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইতিহাস তাঁকে শেরশাহ নামেই বেশি মনে রেখেছে।

আফগান শেরশাহের পর বাংলা দখল করে নেন মোগল সম্রাটরা। কিন্তু তত দিনে বাংলার রাজনৈতিক পরিচয় স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। সুবা-বাংলা বা বাংলা প্রদেশ নামেই পাঠান এবং মোগলরা সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

সকল অধ্যায়
১.
তরুণ তুর্কি : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২.
পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ
৩.
বাঙ্গালার জন্ম : শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
৪.
আবেগপ্রবণ শাসক : গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
৫.
নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ
৬.
বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ
৭.
দলিতের উত্থান : মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র
৮.
স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
৯.
সম্রাটদের সাক্ষাৎ : শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন
১০.
সিংহ-পরিবার : মসনদ-এ-আলা ঈসা খাঁ, স্বর্ণময়ী, মুসা খাঁ
১১.
প্রতিরোধের শেষ : প্রতাপাদিত্য
১২.
চিরদুঃখীজন : শায়েস্তা খান
১৩.
প্রথম নবাব : মুর্শিদ কুলি খান
১৪.
সুযোগসন্ধানী : আলিবর্দি খান
১৫.
হতভাগ্য : সিরাজ-উদ-দৌলা
১৬.
যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম
১৭.
পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপঞ্জি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%