রুকনউদ্দিন বারবক শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ পাঁচ বছর সিংহাসনে ছিলেন। শামসউদ্দিন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। বাংলায় ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি বহু মসজিদ ও খানকাহ তৈরি করেন। এই সময়ে এসে বাংলায় ইসলাম মোটামুটিভাবে স্থায়ী রাজধর্মের চেহারা নিয়েছে। ধর্মান্তরিত মুসলমানের জন্য সুবিধাজনক রাষ্ট্রীয় নীতির টান এবং বর্ণবিভাজন নীতির বৈষম্যের ধাক্কা, এই দুই কারণে দলে দলে মানুষ সনাতন ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এই ধর্মান্তর শুধু নিম্নবর্ণের হিন্দুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যেহেতু নিম্নবর্ণের হিন্দুই বর্ণবিভাজনের কারণে বেশি বৈষম্যের শিকার হতো, তারাই বেশি সংখ্যায় ধর্মান্তরিত হচ্ছিল। হিন্দু ধর্মগুরুরা এই অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তাঁদের কিছু করার ছিল না।
রোগভোগে শামসউদ্দিনের অকালমৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সিকান্দর সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু দরবারের অমাত্যরা স্থির করলেন, সিকান্দর মানসিকভাবে সুস্থ নন। তাঁকে অপসারণ করে অমাত্যরা সিকান্দরের কোনো ভাইকে নয়, (ভাই ছিল কি না, জানা যায়নি) শামসউদ্দিনের কোনো ভাইকে নয়, ক্ষমতায় আনলেন বারবক শাহের বর্ষীয়ান ভাই জালালউদ্দিনকে। জালালউদ্দিনকে তাঁরা রাজ্য পরিচালনার জন্য অধিকতর যোগ্য বলে মনে করেছিলেন। জালালউদ্দিন দাদা হয়ে নাতির ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
জালালউদ্দিন ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতা হাতে পেয়ে বারবক শাহের বংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে সরাতে শুরু করেন। আগেই বলেছি, বারবক শাহ আফ্রিকা থেকে আসা হাবশি সৈন্য ও খোজা প্রহরীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে উঁচু পদে বসিয়েছিলেন। জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ এই হাবশি সভাসদ-সেনাপতিদের সীমান্ত অঞ্চলে পাঠাতে শুরু করলেন। অভিজাত আরব-রক্তের ‘সৈয়দ’ বংশের সভাসদদের উঁচু পদ ও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হলো। এঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন সৈয়দ আশরাফ আল হোসেনী। সীমান্ত অঞ্চলে মোতায়েন হাবশি সেনার কোনো কোনো অংশ বিদ্রোহ করলেও ফতেহ শাহ তাঁর হাবশি হটাও নীতিতে অটল ছিলেন।
ফতেহ শাহ শিক্ষিত শাসক ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যা ছাড়াও আইন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। কিন্তু রাজ্যের প্রায় দশ হাজার হাবশি সৈন্য ও প্রহরীকে তিনি দমিয়ে রাখতে পারেননি। ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দে হাবশি সৈন্যরা বিদ্রোহ করে। সুলতানের দেহরক্ষীদের উৎকোচ দিয়ে তারা ফতেহ শাহকে হত্যা করায়।
বিদ্রোহী হাবশি সৈন্যদের যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর আসল নাম ছিল বারবক। তিনি সুলতান শাহজাদা নামে সিংহাসনে বসলেন। ইনি প্রথমে ছিলেন খোজা (নপুংসক) প্রহরী, পরে নিজের বীরত্ব দেখিয়ে সেনাপতিতে পরিণত হন। সুলতান শাহজাদা সিংহাসনে বসে সৈয়দ বংশীয়দের অপসারণ করলেন। সীমান্ত অঞ্চল থেকে হাবশি সেনাপতি ও সভাসদদের ফিরিয়ে আনলেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী ছিলেন মালিক আন্দিল। ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে মালিক আন্দিলকে রাজধানী থেকে সরিয়ে বিরল অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি ফতেহ শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সীমান্তে এক ছোট্ট স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।
মালিক আন্দিল গৌড়ে ফিরে এলেন পুরো বাংলার সুলতান হওয়ার বাসনা নিয়ে। সুলতান শাহজাদা তা জানতেন না। মালিক আন্দিল প্রথম সুযোগে পাল্টা অভ্যুত্থান করলেন। এক উৎসবের রাতে মদের নেশায় বিভোর সুলতান শাহজাদার শোবার ঘরে ঢুকে তাঁকে খুন করলেন। মালিক আন্দিল প্রথমে নাকি ফতেহ শাহের ছেলেকেই সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন। পরে অমাত্যদের চাপে পড়ে নিজেই সিংহাসনে বসেন। খুব বেশি চাপ যে দিতে হয়নি, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সিংহাসনে বসার পর মালিক আন্দিল নিজের নাম বদলে রাখলেন সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ। তিনি রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করেন।
এককালে হাবশি ক্রীতদাস ছিলেন বলেই বোধ হয় তিনি দরিদ্রের কষ্ট বুঝতেন। সাইফউদ্দিন দুই হাতে দান করতে শুরু করলেন। একেকবারে এক লাখ টাকা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করতেন। তাঁর এই দানের বহর দেখে সভাসদেরা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এক বিচক্ষণ সচিব নাকি ভেবে দেখলেন, হাবশি ক্রীতদাস থেকে সুলতান হওয়া সাইফউদ্দিন আসলে জানেন না, এক লাখ মুদ্ৰা মানে কী। তাঁর পরামর্শমতো দানের আগে কোষাগারের কর্মচারীরা এক লাখ মুদ্রা মাটিতে বিছিয়ে রাখলেন। মাটিতে মুদ্রা রাখা দেখে বিস্মিত সুলতান জানতে চাইলেন, ‘এর মানে কী?’
সচিব বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, ‘এই হলো এক লাখ মুদ্রা, যা আপনি প্রজাদের বিলিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।’
সুলতান সব বুঝলেন। মুচকি হেসে বললেন, ‘এত অল্পে কি হবে? এবার এর দ্বিগুণ পরিমাণ দান করুন!’
এরপর থেকে সচিবেরা আর দান-ধ্যানে আপত্তি করেননি। সত্যিকারের নেতাকে তাঁর আমলারা পরিচালিত করতে পারেন না, উল্টোটাই হয়।
দালান নির্মাণে সাইফউদ্দিনের খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। গৌড়ে তিনি মাত্র একটি মসজিদ স্থাপন করেছিলেন। তবে একটি বড় জলাশয় তিনি খুঁড়িয়েছিলেন। আর দিল্লির কুতুব মিনারের আদলে একটি উঁচু মিনার তৈরি করিয়েছিলেন। পিরু নামের এক রাজমিস্ত্রি নাকি দক্ষ হাতে খুব অল্প সময়ে মিনার তৈরি করেছিলেন। মিনার দেখতে এসে সুলতান যখন তার প্রশংসা করলেন, একটু বেসামাল হয়ে পিরু নাকি বলে ফেলেন, ‘আমি এর চেয়েও উঁচু মিনার বানাতে পারতাম!’
এই কথায় সুলতান সাইফউদ্দিন রেগে গেলেন। জানতে চাইলেন, ‘তা হলে বানালে না কেন?’
রাজমিস্ত্রি পিরু বিপদ বুঝতে পেরে বললেন, ‘আর মালমসলা ছিল না!’ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সাইফউদ্দিন বললেন, ‘চাইলে না কেন?’
পিরু এর কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না। সুলতানের হুকুমে তাঁকে মিনারের মাথা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হলো। পরে রাগ শান্ত হয়ে এলে সুলতান সাইফউদ্দিন নাকি রাজমিস্ত্রিকে মিনারের কাছেই সমাহিত করেন।
দরিদ্রদের দানের ব্যাপারে যিনি এত উদার ছিলেন, রাজমিস্ত্রির ঔদ্ধত্যের জবাবে তিনি এমন কঠোর শাস্তি দেবেন, ভাবতে অবাক লাগে। কিন্তু মানুষের জীবন বৈপরীত্যে ভরা।
সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ বেশি দিন জীবিত থাকেননি। মাত্র তিন বছর রাজত্ব করার পর তাঁর মৃত্যু হয়। সে মৃত্যু রোগে, নাকি গুপ্তঘাতকের আক্রমণে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা দ্বিধান্বিত। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু হাবশি অমাত্যদের মধ্যে খুন-পাল্টাখুনের ধারা চলতে থাকে। কুতুবউদ্দিনও এক বছর পরই নিহত হন।
হাবশি সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহের ফিরোজ মিনার এখনো টিকে আছে। কুড়ি ফুট ব্যাস আর নব্বই ফুট উঁচু এই মিনার সগর্বে ঘোষণা করছে, ইতিহাসের একপর্যায়ে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে আসা এক ক্রীতদাস প্রথমে বাংলার সেনাপতি, পরে সুলতান হয়েছিলেন।
বাংলার ইতিহাস যখন একের পর এক হাবশি সুলতানের আসা-যাওয়া নিয়ে ব্যস্ত, তখন সবার অগোচরে নদীয়ায় এক বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবারে বিশ্বম্ভর মিশ্র নামের এক কিশোর বড় হয়ে উঠছেন। তাঁর বাবা জগন্নাথ মিশ্ৰ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, শ্রীহট্ট (এখন সিলেট) থেকে এসে নদীয়ায় বসত করেছিলেন। মা শচী দেবী আদর করে তাকে ‘নিমাই’ বলে ডাকতেন। কৈশোরে বাবার মৃত্যু হলে নিমাই নিজেই এক টোল স্থাপন করে সংসার চালাতে শুরু করেন। নিমাই ছিলেন নদীয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত তার্কিকদের একজন। মায়ের পছন্দে লক্ষ্মীপ্রিয়া নামের এক ব্রাহ্মণকন্যাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তরুণ নিমাই স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীহট্টে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে যাবার পথেই সাপের কামড়ে লক্ষ্মীপ্রিয়ার মৃত্যু হয়। মা তাঁকে বিষ্ণুপ্রিয়া নামের আরেক ব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে বিয়ে দিলেন, কিন্তু শোকাকুল নিমাইয়ের ততক্ষণে সংসারজীবন অসার মনে হতে শুরু করেছে। তিনি বাড়ি ছাড়লেন, ঈশ্বর পুরী নামের এক সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নিলেন।
নদীয়ায় হিন্দুধর্মের একটি শাখা চালু ছিল, যার নাম বৈষ্ণব। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিমাই আগে এই বৈষ্ণব শাখাটির ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন, এমন মনে হয় না। তবে ঈশ্বর পুরীর কাছ থেকে তিনি যখন দীক্ষা নিয়ে ফিরলেন, তখন ধর্মের এই শাখাটিকেই তিনি আপন করে নিলেন। শুধু তা-ই নয়, একে অধিকার করে ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব’ নামের এক নতুন ভাবধারার প্রবর্তন করলেন। এই নতুন ভাবধারার মাধ্যমে তিনি বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা বর্ণাশ্রমপ্রথাকে অস্বীকার করলেন। নিমাই কৃষ্ণভক্তি প্রচারের কাজে নেমে যে দর্শন প্রচার করতে লাগলেন, তা হলো, সবাইকে ভালোবাসার মাধ্যমেই ঈশ্বরকে ভালোবাসা যায়, আর এই ভালোবাসাই মানবজনমের সার কথা। নিজের দর্শনকে তিনি নিজের আচরণ দিয়ে প্রমাণ করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণ হয়েও নগর-সংকীর্তনে বেরিয়ে তিনি নদীয়ার তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরতে লাগলেন, তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়তে এবং তা নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহ দিলেন (এর আগে তাতে নিরুৎসাহ করা হতো)। যে নদীয়ায় লক্ষ্মণ সেনের পরাজয়ে বাংলায় হিন্দুধর্মের বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, সেই নদীয়াতেই এই ধর্মকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে দেওয়ার দূত এসে হাজির হলেন।
নদীয়ার স্থানীয় মুসলমান শাসক (সম্ভবত কাজী সাদ) ও তাঁর পাইক-বরকন্দাজরা নিমাই পণ্ডিতকে প্রথমে বাধা দিয়েছিলেন, পরে তার বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে নিরস্ত হন। তাঁর ভক্তির প্রাবল্যে প্রভাবিত হয়ে হিন্দু তো বটেই, এমনকি নদীয়ার মুসলমান নাগরিকদের কেউ কেউ বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করলেন। নিমাই তাঁদের স্বাগত জানালেন, এর আগে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিধান ছিল না।
নিমাই পণ্ডিতের বিপুল জনপ্রিয়তা হিন্দুধর্মের অপস্রিয়মাণ প্রভাবকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলল। নিমাই বুঝলেন, তাঁকে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে হবে। তিনি নদীয়া ছাড়লেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে সন্ন্যাসব্রত নিলেন। তাঁর নতুন নাম হলো কৃষ্ণচৈতন্যদেব ভারতী। তিনি বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও দাক্ষিণাত্যে ঘুরে ঘুরে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করতে লাগলেন। প্রেম-ধর্মের প্রতি তাঁর উদার আহ্বানে সেই সময়ে নিম্নবর্ণের, বিশেষ করে সমাজচ্যুত হিন্দুদের (ডাকাত, যৌনকর্মী ইত্যাদি) মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। ২৪ বছর ধরে তিনি ধর্মপ্রচার চালিয়ে গেলেন। ওড়িশার রাজা প্রতাপরুদ্রদেব তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পুরীর জগন্নাথধামে আশ্রয় নিয়ে চৈতন্যদেব তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। জগন্নাথধামে বছরের পর বছর কর্তৃত্ব করা ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা চৈতন্যদেবের উদারচেতা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ করেননি। ইতিহাসে পরিষ্কার কোনো প্রমাণ নেই, তবে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পুরীতে চৈতন্যদেবের যে মৃত্যু হয়েছিল, তা স্বাভাবিক কোনো মৃত্যু বলে মনে হয় না।
মধ্যযুগে, বলা ভালো কোনো যুগেই, দলিতের উত্থান সচরাচর ঘটেনি। ঘটলেও কায়েমি স্বার্থ তাকে দ্রুত দমন করেছে। বাংলায় হাশি সুলতানদের কৰ্তৃত্ব, হিন্দুধর্মে শ্রীচৈতন্যের ভাবধারায় নিম্নবর্ণের ধর্মীয় নেতৃত্ব, সবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু দলিতের উত্থান যত সাময়িকই হোক, কায়েমি স্বার্থকে দীর্ঘদিনের জন্য নাড়া দিয়ে যায়।
হাবশি সুলতানদের শাসন বাংলার সুলতানদের আরও জনমুখী হতে শিখিয়েছে। আমদানি করা সৈন্যের বদলে স্থানীয় সৈন্যের প্রতি, জনগণের প্রতি আস্থা বাড়াতে শিখিয়েছে। উত্তর ভারতে, পশ্চিম ভারতে (পরে পাকিস্তানে) মুসলমান সমাজ যেমন প্রবলভাবে অভিজাত-অনভিজাতে ভাগ হয়ে গেছে, বাংলায় তা ঘটতে পারেনি। কয়েক শতাব্দী পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাততন্ত্র আর পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণতন্ত্রের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্য পাকিস্তানের দুই অংশে বিভেদের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর হিন্দুধর্মকেও চৈতন্যদেব ক্ষয়িষ্ণুতার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তাঁর গৌড়ীয় বৈষ্ণব আদর্শ বাংলায় টিকে গেছে, উত্তর বা পশ্চিম ভারতের তুলনায় বাংলায় বর্ণাশ্রমের প্রখরতাকে অনেক কমিয়ে এনেছে। সমাজচ্যুত বহু হিন্দু কবি, গায়ক, শিল্পীকে ‘প্রেমধর্মে’ আশ্রয় দিয়ে বৈষ্ণবরা বাংলা সংস্কৃতিকে প্রাণবান করে রেখেছেন। শ্রীচৈতন্যের গৌড়ীয় বৈষ্ণব আদর্শকে সামনে রেখেই চৈতন্যদেবের জন্মের পাঁচ শ বছর পর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ চৈতন্য সমাজ (ইসকন) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠন প্রায় তিন শ শাখার মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার বহু অঞ্চলে মানুষকে হিন্দুধর্মের দিকে আহ্বান করছে, বৈদিক হিন্দুধর্মের পক্ষে যা প্রায় অসম্ভব ছিল।
সামাজিক সাম্যের ধারণা বাংলার জনমানসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হওয়ার পেছনে মধ্যযুগের অবদান আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন