মধ্যযুগের ইতিহাসের নায়কদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা যা দেখি, তার অনেকগুলোই চিরন্তন সত্য এবং আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
প্রথমত, কোনো শাসনব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। জোর করে কোনো শাসনব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করতে গেলে অন্তঃকোন্দল কিংবা বাইরের শত্রুর আক্রমণ কিংবা এই দুটোই সেই শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষ শাসককে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাত এড়িয়ে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে যোগ্য লোক নিতে হয়। যে শাসকেরা অমাত্য নির্বাচনে যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারিতা আর বংশপরিচয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাইকেই বিপদে পড়তে হয়েছে।
তৃতীয়ত, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো রাজ্য বা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। সফল শাসকেরা প্রায় সবাই নিজের ধর্মবিশ্বাসে অটল ছিলেন, কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে পরিহার করে রাজ্যশাসনের ক্ষেত্রে উদারনীতি অবলম্বন করেছেন।
চতুর্থত, সুশাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব শাসক জীবদ্দশায় যোগ্য উত্তরাধিকারী নির্দিষ্ট করতে পারেননি, উত্তরাধিকারীকে যথাযথ নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যেতে পারেননি, তাঁদের মৃত্যুর পর সুশাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি।
পঞ্চমত, বিশ্বাসঘাতকতা ও তঞ্চকতার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করা যায়, কিন্তু বিপুল যোগ্যতা না থাকলে সে ক্ষমতা রক্ষা করা কঠিন। বিশ্বাসঘাতক, দুর্নীতিপরায়ণ ও দুর্বৃত্ত অমাত্যদের সন্তুষ্ট করে যেসব শাসক ক্ষমতায় এসেছেন, হয় তাঁরা ক্ষমতা সংহত করে এই দুর্বৃত্তদের দমন করেছেন, নয় নিজেরাও এই দুর্বৃত্তদের অসীম লোভের শিকার হয়েছেন। কেউই আজীবন এই দুর্বৃত্তদের তুষ্ট রাখতে পারেননি।
আর ষষ্ঠত, যে শাসকেরা শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শাসনব্যবস্থায় উদ্ভাবন এড়িয়ে চলেছেন, তাঁদের পক্ষে ইতিহাসে গৌরবজনক আসন গড়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উৎপাদনব্যবস্থা, জনমানস ও সেনাবাহিনীর ক্রমাগত আধুনিকায়ন যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
মধ্যযুগের তুলনায় আজকের দিনে রাষ্ট্রশাসনে জটিলতা অনেক বেড়েছে। সে কালের তুলনায় আজকে রাষ্ট্রের জনগণের প্রত্যাশা বেশি, বাঙালির মতো স্বাধীনচেতা জাতির ক্ষেত্রে সে কথা আরও বেশি করে সত্যি। বিশ্বায়নের যুগে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাও আর শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, পৃথিবীর সব দেশের সুশাসন, বাণিজ্য আর মানবকল্যাণের মানদণ্ডই এখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যযুগের শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আজকের দিনেও রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসকদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, সিরাজউদদৌলা, মজুমদার লাইব্রেরি, কলকাতা, ২০১৯
অতুলচন্দ্র রায়, ভারতের ইতিহাস, কলকাতা মৌলিক লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৯৫৮
আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস-মোগল আমল, সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৯
আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস-সুলতানী আমল, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৯
আবুল ফজল আল্লামী, অনুবাদ : আহমদ ফজলুর রহমান, আইন-ই-আকবরী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৩
আব্বাস সারওয়ানী, অনুবাদ : সাদিয়া আফরোজ, শেরশাহ, নালন্দা, ঢাকা, ২০০৭
আহমদ হাসান দানী, বাংলায় মুসলিম স্থাপত্য, এশিয়াটিক সোসাইটি পাকিস্তান, ১৯৬১
কমল চৌধুরী, বৃহত্তর যশোর-খুলনা জেলার বিবরণ, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০০
নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ-কাহিনী, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১০
নূরুল করিম, পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে ঈসা খানের ভূমিকা, পাকিস্তান হিস্টোরিকাল সোসাইটি, ১৯৫৪
মমতাজুর রহমান তরফদার, অনুবাদ : মোকাদ্দেসুর রহমান, হোসেন শাহী আমলে বাংলা (১৪৯৪-১৫৩৮), বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০১
মাহবুবুর রহমান, মুসলমানদের ইতিহাস চর্চা, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, ২০১২
যদুনাথ সরকার, বাংলার ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, বি আর পাবলিশিং করপোরেশন, দিল্লি, ২০০৩
রজনীকান্ত চক্রবর্তী, গৌড়ের ইতিহাস, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৯
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৮
শামস সিরাজ আফিফ, অনুবাদ : ইশতিয়াক আহমেদ জিললি, তারিখ-ই-ফিরোজশাহী, প্রাইমাস বুকস, দিল্লি, ২০১৫
সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুলনার ইতিহাস, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০০
সুখময় মুখোপাধ্যায়, ১২০৪-১৫৭৬ বাংলার ইতিহাস, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ২০০০
সৈয়দ গোলাম হোসেন তবতবায়ি, অনুবাদ : আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন : বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার ইতিহাস, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০০৬
সৈয়দ মুজতবা আলী, রচনাবলী, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, ২০০৯
স্বরূপচন্দ্র রায়, সুবর্ণগ্রামের ইতিহাস, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০১
অন্যান্য
বাংলাপিডিয়া
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
উইকিপিডিয়া
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন