যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম

যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম

চিঠি শেষ করার পর প্রয়োজনীয় দুই-এক কথা বাকি থেকে গেলে অনেক সময় ‘পুনশ্চ’ বলে সে বাক্যগুলো লেখা হয়। সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর থেকেই বাংলায় ইংরেজের ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়েছে, মধ্যযুগের অবসান ঘটেছে। কিন্তু একজন মানুষ সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও নবাবি শাসনকে আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী করার লড়াই করতে চেয়েছিলেন। তিনি মির কাসিম। বাংলার ইতিহাসে তিনিই ‘পুনশ্চ।’

মির কাসিমের এই শেষ লড়াইয়ের প্রচেষ্টাকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজরা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে মধ্যযুগ শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। পুরো ইউরোপ তখন আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব (রেনেসাঁ ও আবিষ্কারের যুগ) শেষ করে দ্বিতীয় পর্বে (বিপ্লবের যুগ-ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকান বিপ্লব, শিল্পবিপ্লব) পা দিতে চলেছে। এই নতুন যুগের প্রতিনিধি হয়ে এসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালকেরা মির কাসিমের মধ্যযুগকে ধরে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টায় পানি ঢেলে দিলেন।

মির কাসিম আলী খানের পূর্বপুরুষেরা ইরান থেকে এসেছিলেন। তাঁর দাদা ইমতিয়াজ খান এককালে আজিমাবাদে সম্রাট আওরঙ্গজেবের দেওয়ান হিসেবে কাজ করতেন। সম্ভবত ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দে পাটনায় তাঁর জন্ম হয়েছিল। মির কাসিমের বাবা মুহাম্মদ রেজা খান মুর্শিদ কুলি খান ও সুজাউদ্দিনের অমাত্য ছিলেন। মির কাসিম আলিবর্দি খানের আমলে মির জাফর আলী খানের মেয়ে ফাতিমা বেগমকে বিয়ে করে সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে তিনি শ্বশুর মির জাফরকে সম্পূর্ণ সহায়তা করেন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনিই সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নিসাকে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে মির কাসিম খানই নবাবের মূল্যবান রত্নের বাক্স হাতিয়ে নেন।

মির জাফর নবাব হয়ে বসার পর ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মির কাসিমকে রংপুরের ফৌজদার পদে নিয়োগ দিলেন। কিন্তু তাঁর আসল দায়িত্ব ছিল ইংরেজদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া আর সৈন্যদের বেতন দেওয়া। নবাব হওয়ার পর মির জাফর আলী খান প্রথমে নিজের জাফরগঞ্জের প্রাসাদে, পরে আলিবর্দির দুর্গ-প্রাসাদে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠলেন। রাজবল্লভ প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়ে ঢাকায় প্রায় স্বাধীনভাবে জমিদারি পরিচালনা করতে শুরু করলেন। পূর্ণিয়ার শাসনভার প্রথমে দেওয়া হয়েছিল মির জাফর আলী খানের বন্ধু খাদিম হাসান খানকে। তিনিও প্রায় স্বাধীন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কড়ায়-গন্ডায় তাদের পাওনা আদায় করে নিতে শুরু করল। বর্ধমানের রাজস্ব তাদের হাতে সমর্পণ করতে হলো। মির কাসিম সৈন্যদের বেতন দিতে গিয়ে দেখলেন, কোষাগারে টাকা নেই।

মির কাসিম হয়তো কখনোই বাংলার সিংহাসনে বসার সুযোগ পেতেন না। সে সুযোগ তৈরি করে দিলেন তাঁর শ্যালক, মির জাফর আলী খানের ছেলে মির মিরন। মিরন হীরাঝিলের প্রাসাদের মালিক হয়ে সেখানে বসে তাঁর বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমোদফূর্তি করছিলেন। দিল্লি ও আজিমাবাদ থেকে তিনি বহু নতুন অনুচর সংগ্রহ করেছিলেন, তাদের আনুগত্য বজায় রাখতে গিয়ে তাঁকে নিয়মিতভাবে বড় বড় উৎসবের আয়োজন করতে হচ্ছিল। নবাব না হয়েও তিনি প্রায় নবাবের মেজাজে শাসনকাজ চালাচ্ছিলেন। শুধু শাসন নয়, তাঁর নির্দেশে নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু হয়।

পলাশীর যুদ্ধের পর সিরাজ-উদ-দৌলার সাহসী সেনাপতি মোহনলালকে গ্রেপ্তার করে দুর্লভরামের হাতে সোপর্দ করা হয়েছিল। দুর্লভরাম পলাশী যুদ্ধের আগে থেকেই মোহনলালকে ঈর্ষা করতেন। তিনি মোহনলালের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন, কিন্তু মোহনলালকে তিনি হত্যা করেছিলেন কি না, সে ব্যাপারে ইতিহাসে স্পষ্ট কিছু লেখা নেই। তিনি সম্ভবত সব সম্পদ কেড়ে নিয়ে মোহনলালকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, মোহনলাল বাকি জীবন আত্মগোপনে কাটিয়ে দেন। মিরনের নির্দেশে পূর্ণিয়ায় মোহনলালের ছেলে শ্রীমন্ত লালকেও হত্যা করা হয়। কিন্তু পলাশী যুদ্ধের এক মাস পরেই মিরন আশঙ্কা করেন, দুর্লভরামের সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। তিনি দুর্লভরামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন—দুর্লভরাম সিরাজ-উদ-দৌলার ছোট ভাই মির্জা মেহদিকে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্র করছেন। কোনো তদন্ত না করেই নবাব মির জাফর এই অভিযোগ মেনে নেন। মির্জা মেহদিকে বুকে তক্তা চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। দুর্লভরামকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ইংরেজের হস্তক্ষেপে প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু মিরন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেন। পলাশী যুদ্ধের বিশ্বাসঘাতকতার এই প্রতিদান পেয়ে দুর্লভরাম কলকাতায় চলে যান, সেখানেই নিঃস্ব অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু দুর্লভরামের সৈন্য, যারা এখন মিরনের সৈন্য, তাদের বেতন দেওয়ার দায়িত্বও মির কাসিম খানের ওপর এসে পড়ল। মির কাসিম নিজের আয় থেকে সৈন্যদের বেতন দিয়ে কোনোমতে বিদ্রোহ ঠেকিয়ে রাখলেন, তবু মুর্শিদাবাদ থেকে বহু সৈন্য নবাব বাহিনী ত্যাগ করে নিজেদের অস্ত্র ও ঘোড়া নিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদলে যোগ দিতে শুরু করল।

দুর্লভরামের ভাই রাজা রামনারায়ণ রায় সিরাজ-উদ-দৌলার আমল থেকেই আজিমাবাদের (পাটনা) প্রশাসক ছিলেন। দুর্লভরামের পরিণতি দেখে তিনি ইংরেজের কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার করে তাদের আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। রবার্ট ক্লাইভ বুঝলেন, মুর্শিদাবাদের নবাবদের শাসন পতনোন্মুখ। তিনি রামনারায়ণ রায়কে আশ্বস্ত করলেন, ইংরেজের পক্ষাবলম্বন করলে তাঁর কোনো ভয় নেই।

মির কাসিম যখন সৈন্যদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, মিরন তখন মুর্শিদাবাদের সিংহাসনের ওপর নিজের দাবি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় ব্যস্ত। ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি মির জাফরের বিশ্বস্ত সেনাপতি মির কাজিম খানকে খুন করালেন। ইংরেজরা ক্রমেই এই নবাবপুত্রের রক্তপিপাসায় বিরক্ত হয়ে উঠছিল, মির কাসিম নিজেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু মিরনের কোনো ব্যবস্থা করার আগেই আজিমাবাদের সীমান্তে নতুন বিপদ এসে হাজির হলো।

বিপদের নাম শাহজাদা আলী গহর। শাহজাদা আলী গহর ছিলেন মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় আলমগীরের ছেলে। তাঁর বাবাকে উজির ফিরোজ জং ও মারাঠা সেনাপতি সদাশিবরাও ভাউ ষড়যন্ত্র করে বন্দী করে রেখেছিলেন। তাঁরা আলী গহরকেও বন্দী করেছিলেন। কিন্তু আলী গহর অনুগত সৈন্যদের সাহায্যে দিল্লি থেকে পালালেন। তিনি চলে এলেন উত্তর প্রদেশে। সেখানে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও এলাহাবাদের নবাব মুহাম্মদ কুলি খানের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি ঠিক করলেন, মোগল শাহজাদা হিসেবে তিনি বাংলা-বিহার-ওড়িশা পুনরুদ্ধার করবেন। তাঁদের মিলিত বাহিনী আজিমাবাদের প্রান্তে এসে রাজা রামনারায়ণকে মোগল শাহজাদার কাছে আনুগত্য স্বীকারের দাবি জানাল। রামনারায়ণ মুখে মুখে আনুগত্য জানিয়ে আজিমাবাদ দুর্গে দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকলেন। বিহারের পতন হতে যাচ্ছে দেখে অবশেষে মির জাফর ও মিরনের টনক নড়ল। নবাব অনেক অনুরোধ করে কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ ও মিরনের যৌথ নেতৃত্বে একটি বাহিনী আজিমাবাদের দিকে পাঠালেন।

বাংলা থেকে সৈন্য বিহারে আসার আগপর্যন্ত রাজা রামনারায়ণ বীরত্বের সঙ্গে দুর্গ রক্ষা করলেন। মোগল শাহজাদা আলী গহর আর এলাহাবাদের নবাব বারবার চেষ্টা করেও আজিমাবাদ দুর্গে ঢুকতে পারলেন না। তাঁদের মনোমালিন্য হলো, ঐক্যে ফাটল ধরল। এলাহাবাদের নবাব নিজের বাহিনী নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। ফরাসি সেনাপতি জ্যঁ লয়ের পরামর্শে শাহজাদা আলী গহর নিজেও আজিমাবাদ থেকে পশ্চিম দিকে সরে গেলেন।

মিরনকে নিয়ে রবার্ট ক্লাইভ আজিমাবাদে এলেন। মিরন যখন শুনলেন, শাহজাদা আলী গহরের বাহিনী পিছু হটে গিয়েছে, তিনি এই সুযোগে আজিমাবাদের প্রশাসক রাজা রামনারায়ণ আর পূর্ণিয়ার প্রশাসক খাদিম হোসেন খানকে অপসারণ করতে চাইলেন। রবার্ট ক্লাইভ এই প্রস্তাবে রাজি হলেন না। গদি বেঁচে যাওয়ার কৃতজ্ঞতায় রামনারায়ণ ও খাদিম হোসেন খান সেদিন থেকেই ক্লাইভের অনুগত ভক্তে পরিণত হলেন।

মিরনের জন্য আজিমাবাদ দুর্গে নাচগানের ব্যবস্থা করা হলো। মনের সুখে নাচগান উপভোগ করে মিরন আজিমাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদে যাত্রা করলেন। সঙ্গে আনা সৈন্যদের বলেছিলেন, আজিমাবাদ গিয়ে তাদের বকেয়া বেতন শোধ করার ব্যবস্থা করবেন। তার কোনো উদ্যোগই তিনি নিলেন না। মিরন আজিমাবাদ ছেড়ে যাওয়ার পরপর সেনাপতি দিলির খানের নেতৃত্বে বাংলার এই সৈন্যরা বিদ্রোহ করে শাহজাদা আলী গহরের বাহিনীতে যোগ দিল। শাহজাদা আলী গহর আবার আজিমাবাদ আক্রমণ করলেন। ততক্ষণে শাহজাদা খবর পেয়েছেন, দিল্লিতে তাঁর বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি নিজেকে মোগল সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলেন, নিজের উপাধি দিলেন দ্বিতীয় শাহ আলম। আজিমাবাদে আবার আক্রমণের খবর পেয়ে মিরন ও রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীকে মাঝপথেই আবার ঘুরে আজিমাবাদের দিকে যাত্রা করতে হলো।

রামনারায়ণ আগের মতো আজিমাবাদ দুর্গে বসে থাকলেই ভালো করতেন। কিন্তু আগের যুদ্ধে জিতে তাঁর সাহস বেড়ে গিয়েছিল। এবার তিনি দুর্গ থেকে বের হয়ে গঙ্গার ধারে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মুখোমুখি হলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধে উভয় পক্ষে বহু ক্ষয়ক্ষতি হলো। রামনারায়ণ নিজেও গুরুতর আহত হলেন। তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আজিমাবাদ দুর্গে ফিরে আসতে হলো। এর তিন দিন পরে মিরন ও ক্লাইভের বাহিনী আজিমাবাদে ফেরত এসে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের বাহিনীর মুখোমুখি হলো।

রবার্ট ক্লাইভ কোম্পানির সৈন্যদের মিরনের সৈন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিকে মিরনের সৈন্যরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলো, মিরন নিজেও আহত হলেন। সে সময়ে পাশ থেকে কোম্পানির সৈন্যরা মোগল সেনাকে আক্রমণ না করলে মিরনের বাহিনী পরাজিত হতো। কিন্তু ইংরেজ গোলন্দাজদের গোলায় মোগল সেনাবাহিনী বহু সৈন্য হারিয়ে পিছু হটল। একটু আগেই যে তিনি পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সে কথা মিরনের মনে রইল না। তিনি বিজয় উদযাপন করার জন্য শিবিরে ফিরে গেলেন।

মোগল সেনারা কিন্তু হার মেনে নেয়নি। সম্রাট শাহ আলম ও তাঁর সেনাপতি কামগার খান বর্ধমানে গিয়ে হামলা চালান। মুর্শিদাবাদ ও আজিমাবাদ—দুই দিক থেকেই নবাবের সৈন্য আর ইংরেজ সৈন্যের মিলিত বাহিনী সেখানে গিয়ে হাজির হলো। মুর্শিদাবাদ থেকে আসা সৈন্যদের মধ্যে নবাবের জামাই মির কাসিমও ছিলেন। মোগল সম্রাটের বাহিনী বর্ধমান থেকে শিবির গুটিয়ে আবার আজিমাবাদ অবরোধ করল। পূর্ণিয়ার শাসক ও মির জাফর আলী খানের একদা বন্ধু খাদিম হাসান খান মোগল সম্রাটের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে আজিমাবাদ অভিযানে যোগ দিতে এলেন। মির জাফর আর মিরন এই খবর শুনেও তাড়াহুড়ো করলেন না। মোগল সম্রাটের প্রতি অনুগত —কেবল এই সন্দেহে দুজন রাজকর্মচারীকে কামানের গোলায় হত্যা করে তবেই মিরনের বাহিনী ধীরেসুস্থে আজিমাবাদের পথে যাত্রা করল।

মোগল সম্রাটের ফরাসি সেনাপতি জ্যঁ ল আর মোগল সেনাপতি জয়নাল আবেদিন আজিমাবাদ দুর্গের পতন প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন, এমন সময় ইংরেজ ক্যাপ্টেন নক্স একটি সেনাদল নিয়ে এসে দুর্গ রক্ষা করেন। ক্যাপ্টেন নক্স ও আজিমাবাদের সহকারী দেওয়ান সেতাব রায় এর পর মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের বাহিনীকে আজিমাবাদ থেকে সরে যেতেও বাধ্য করলেন, পূর্ণিয়া থেকে আসা খাদিম হাসান খানের বাহিনীকেও মোগল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে দিলেন না। আজিমাবাদ দুর্গ আবারও অল্পের জন্য রক্ষা পেল।

১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে মিরন ও ক্লাইভের সৈন্যরা আবার আজিমাবাদে এল। তাদের আক্রমণে খাদিম হাসান খানও সসৈন্যে আজিমাবাদ থেকে পালালেন। বিনা ক্ষয়ক্ষতিতে যুদ্ধজয় হয়েছে দেখে মিরন ঠিক করলেন, তিনি বিজয় উদযাপন করবেন। মিরন এক খোলা মাঠে শিবির ফেললেন। সেখানে এক তাঁবুতে তিনি যথোপযুক্ত পাহারা ছাড়াই দুই ভৃত্যকে নিয়ে রাত কাটাচ্ছিলেন।

রবার্ট ক্লাইভ বাংলার সিংহাসনে কোনো উত্তরাধিকারী চাননি। বিশেষ করে নিষ্ঠুর ও রক্তপিপাসু মিরনকে সরিয়ে ফেলতে চাইছিলেন। মিরনের সৈন্যবাহিনীতেও অনেকে এই নবাবপুত্রের নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা আর কাপুরুষতা দেখে ক্ষুব্ধ ছিলেন। আজিমাবাদে মিরনকে অরক্ষিত অবস্থায় পেয়ে রবার্ট ক্লাইভ এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। মিরনের ক্ষুব্ধ সৈন্যদের সহজেই হাত করে তিনি মিরনকে তাঁরই তাঁবুতে গুলি করে হত্যা করালেন। পরের দিন রটিয়ে দেওয়া হলো, মিরন বজ্রপাতে মারা গিয়েছেন। বৃষ্টিহীন নির্মেঘ দিনে কখন বাজ পড়ল, পড়লেও কেউ তার শব্দ শুনতে পেল না কেন, এ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। বজ্রপাতে মারা যাওয়া মিরনের দেহে অতগুলো ছোট ছোট ফুটো কীভাবে হলো, তা-ও কেউ জানতে চাইল না। এক দিন পর্যন্ত মিরনের মৃত্যুর খবরই রবার্ট ক্লাইভ গোপন রাখলেন, এমনকি মিরনের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদেও নিয়ে গেলেন না। মিরনের মৃতদেহ প্রথমে একটা হাতিতে চাপিয়ে, পরে নৌকায় করে রাজমহলে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হলো।

এই ‘দুর্ঘটনায়’ মির কাসিমের নবাব হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো।

ইংরেজ আনুগত্য হারানোর ভয়ে নবাব মির জাফর ছেলের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তও করতে সাহস পাননি। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা তাঁদের গভর্নরের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে জানতেন। ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিল, তাঁর জায়গায় হেনরি ভ্যানসিটারট হলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন গভর্নর। রবার্ট ক্লাইভ প্রায় সাড়ে তিন লাখ পাউন্ড নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। ব্রিটিশ সম্রাট তৃতীয় জর্জ রবার্ট ক্লাইভকে ‘ব্যারন অব পলাশী’ খেতাব দিয়ে তাঁকে জাতে তুললেন। কিন্তু ক্লাইভের ভারত অধ্যায় শেষ হতে তখনো বাকি।

মুর্শিদাবাদের ধনাঢ্য জগৎ শেঠ পরিবারের দুই উত্তরাধিকারী মাহতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদ মিরনকে পছন্দ করতেন না। রাজ্য পরিচালনায় মির জাফরের শৈথিল্যের কারণে সৈন্যদের মধ্যে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তাতেও তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। এঁরা সৈন্যের বেতন দিতে মির কাসিমকে সাহায্য করছিলেন। তাঁরাই মির কাসিমকে বুদ্ধি দিলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে গিয়ে তাদের যাবতীয় পাওনা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে কোম্পানি মির কাসিমকে নবাবি পাইয়ে দেবে। মির কাসিম হেনরি ভ্যানসিটারটের সঙ্গে দেখা করে পাওনা পরিশোধের অঙ্গীকার করলেন। হেনরি ভ্যানসিটারট ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে মুর্শিদাবাদে গিয়ে মির জাফরকে অপসারণ করলেন। মির কাসিমকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁকেই সিংহাসনে বসালেন। মির কাসিমকে রাজ্য পরিচালনার কাজে সহযোগিতা করতে মুর্শিদাবাদ দরবারে থাকলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়ারেন হেস্টিংস।

মির জাফর তাঁর যাবতীয় শখের জিনিস, ধনরত্ন, দুই স্ত্রী মিন্নি বেগম-বন্ধু বেগম আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৌকায় করে কলকাতায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী, আলিবর্দি খানের সৎবোন শাহ খানম তাঁর সঙ্গে যেতে রাজি হননি। তিনি মির কাসিম-ফাতিমা বেগমের সঙ্গে মুর্শিদাবাদেই থেকে যান।

মির কাসিম শাসনভার হাতে নিয়েই প্রথমে সরকারি আয় ও ব্যয়ের নিরীক্ষা করান। তিনি দেখলেন, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নবাবের কোষ চিরকাল শূন্য থেকে যাবে। তিন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা আলী ইবরাহিম খান, সীতারাম আর মির মুনশির সহায়তায় তিনি বকেয়া পাওনা আদায় করতে শুরু করেন, তহবিলচোরদের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করেন।

মির কাসিম ইংরেজ সেনা প্রশিক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধকৌশল অনেকাংশে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করে। তিনি নিজের সেনাবাহিনী নতুনভাবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করলেন। আর্মেনীয় খাজা গুরগিনকে মির কাসিম গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেন, তাঁর সাহায্যে তিনি নিজের সৈন্যদের ব্রিটিশ কায়দায় প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। বিশ্বস্ত মসনদ আলী, ফরহাদ আলী আর বারকাত আলীকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে তিনি বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছিলেন।

রাজস্ব আদায়ে কঠোর হয়ে মির কাসিম শূন্য কোষাগার আবার ভরে তুললেন। সৈন্যরা নিয়মিত বেতন পেয়ে মির কাসিমের অনুগত হয়েছিল। তাদের নিয়ে মির কাসিম খাজনা পরিশোধে গাফিলতি করা জমিদারদের সঙ্গে লড়াই করেন। বীরভূমের জমিদার আসাদ-উয-জামান ছিলেন এঁদেরই একজন, মির কাসিম তাঁকে পরাজিত করেন।

মুর্শিদাবাদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে মির কাসিম বিহার সীমান্তের দিকে চোখ দিলেন। সেখানে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের আক্রমণ তখনো থামেনি। মিরনের মৃত্যুর পর রাজা রাজবল্লভ মিরনের সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। এই বাহিনীই মোগল সম্রাটের আক্রমণ থেকে আজিমাবাদ দুর্গকে রক্ষা করছিল।

রবার্ট ক্লাইভ ইংল্যান্ডে চলে যাবার পর ইংরেজ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন মেজর করনাক। নিজের বাহিনী, মেজর করনাকের বাহিনী, রাজবল্লভের বাহিনী ও রামনারায়ণের বাহিনী নিয়ে মির কাসিম সম্মিলিতভাবে মোগলদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। মোগল সম্রাট আজিমাবাদ দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হলেন, তাঁর ফরাসি সেনাপতি জ্যঁ ল ইংরেজদের হাতে বন্দী হলেন। অনন্যোপায় দ্বিতীয় শাহ আলম মির কাসিমের কাছে সন্ধির প্রস্তাব করেন। তাঁর সৌভাগ্যবশত ঠিক এই সময়ে দিল্লিতে আফগান সুলতান আহমদ শাহ আবদালি সসৈন্য এসে মারাঠাদের পরাস্ত করেন এবং সম্রাট শাহ আলমকে দিল্লির সিংহাসনে বসানোর জন্য সুপারিশ করেন। দ্বিতীয় শাহ আলম সত্যিকারভাবে মোগল সম্রাট হতে যাচ্ছেন দেখে মির কাসিমও তাঁর সঙ্গে সন্ধি করতে রাজি হয়ে যান। মোগল সম্রাট মির কাসিমের কাছে বছরে ২৪ লাখ টাকা খাজনার প্রতিশ্রুতি আদায় করে খুশি মনে লখনৌতে চলে গেলেন।

মোগল সম্রাটকে বিদায় করামাত্র মির কাসিম আজিমাবাদে দুর্গের রক্ষক রামনারায়ণ রায়ের কাছে এত দিনের খাজনার হিসাব চেয়ে পাঠান। রামনারায়ণ রায় পুরোপুরি সৎভাবে তহবিল রক্ষা করেননি, বিচারে তাঁর দোষ প্রমাণ হলো। ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে মির কাসিম আজিমাবাদের দেওয়ান রামনারায়ণ, সহকারী দেওয়ান সেতাব রায় ও জমিদার সুন্দর সিংহকে অপসারণ করলেন। তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলেন। এরপর খুব অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি রাজবল্লভকেও বন্দী করলেন এবং ঢাকায় তার হিসাব নিরীক্ষা করতে নিজের বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের পাঠালেন। এই কাজের পেছনে মির কাসিমের এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল। তিনি আসলে ইংরেজের অতি-অনুগত প্রশাসকদের নিজের কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছিলেন।

১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে মির কাসিম আজিমাবাদের আশপাশের শহরগুলো ঘুরে দেখলেন। মুঙ্গের শহর তাঁর বিশেষভাবে পছন্দ হলো। তিনি মুঙ্গেরকেই তাঁর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিলেন। এই শহরে চার শ বছর আগে মুহাম্মদ বিন তুঘলক এক দুর্ভেদ্য দুর্গ বানিয়েছিলেন। গঙ্গার ধারে হলেও, নদী থেকে আক্রমণ করে এই দুর্গ জয় করা কঠিন। মুঙ্গেরে গিয়ে মির কাসিম আগের চেয়েও দ্রুতগতিতে সৈন্য ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে লাগলেন। হেনরি ভ্যানসিটারট সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে মুঙ্গেরে এলেন। বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ভ্যানসিটারট মির কাসিমের সঙ্গে আলোচনা করলেন। মির কাসিম অনুযোগ করলেন, ইংরেজ বণিক ও তাদের দেশীয় দালালেরা বিনা শুল্কে ব্যবসা করছে, অথচ দেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিনি নবাব হিসেবে ৪০ শতাংশ কর আদায় করছেন। এতে বাংলার অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে, তিনি বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভ্যানসিটারট এর উত্তরে মির কাসিমকে তাঁর চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিলেন, আর এ-ও বললেন, মুঙ্গেরে যে সেনাবাহিনী মির কাসিম গড়ে তুলেছেন, তার ভরসায় ইংরেজের সঙ্গে লড়াই শুরু করলে তিনি ভুল করবেন। মির কাসিম এই হুমকি শুনে অপমানিত বোধ করলেন। হেনরি ভ্যানসিটারট মুঙ্গের থেকে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পর মির কাসিমের নির্দেশে বিনা শুল্কে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত ব্যবসা চালানোর দায়ে কয়েকজন ইংরেজ বণিককে ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে গ্রেপ্তার করা হলো।

ভ্যানসিটারট এই গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মির কাসিমকে আদেশ দিলেন, ইংরেজ বন্দীদের নিঃশর্তে ছেড়ে দিতে হবে। মির কাসিম সে আদেশ মানলেন, কিন্তু এটাও ঘোষণা করলেন, ইংরেজ বণিক যখন বিনা শুল্কেই ব্যবসা করে, এখন থেকে বাংলার বণিকেরাও শুল্ক না দিয়েই ব্যবসা করতে পারবে। এই ঘোষণায় বাংলায় ইংরেজের ব্যবসার একচেটিয়া সুবিধা হুমকির মুখে পড়ল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা একজোট হয়ে ‘উদারপন্থী’ ভ্যানসিটারটের বদলে ‘আপসহীন’ জোসেফ অ্যামিয়টকে মুঙ্গেরে পাঠালেন, যাতে তিনি মির কাসিমকে ‘কড়া হুমকি’ দিয়ে আসতে পারেন। চূড়ান্ত সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো।

ইংরেজের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে মির কাসিম ইংরেজ-ঘেঁষা দুই জগৎ শেঠ, মাহতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদকে সৈন্য পাঠিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে ধরে আনলেন। তাঁদের বলা হলো, আগের মতোই তাঁরা মুঙ্গের থেকে নিজেদের মহাজনি ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু মির কাসিম তাঁদের পেছনে গুপ্তচর লাগিয়ে রাখলেন।

১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে জোসেফ অ্যামিয়ট মুঙ্গেরে মির কাসিমকে ধমক দিতে এসে দেখলেন, মির কাসিম ধমকের জবাবে পাল্টা ধমক দিচ্ছেন। তিনি আলোচনায় সুবিধা করতে পারলেন না। তাঁকে মুর্শিদাবাদে ফেরত যেতে হলো। ক্ষিপ্ত অ্যামিয়ট নৌকায় করে মুর্শিদাবাদ ফিরে যাওয়ার পথে আজিমাবাদে ব্রিটিশ কারখানা প্রধান উইলিয়াম এলিসকে নির্দেশ দিলেন, আজিমাবাদে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে। উইলিয়াম এলিস ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার লোক। তিনি মেজর কারস্টেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে তৎক্ষণাৎ আজিমাবাদ দুর্গ আক্রমণ করলেন। অতর্কিত আক্রমণে আজিমাবাদের দুর্গপ্রধান মির মেহদি খান হকচকিয়ে গিয়ে পালাচ্ছিলেন। কিন্তু মুঙ্গের থেকে পাঠানো একদল সৈন্য গিয়ে তাঁকে সাহায্য করে। তিনি ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন, উইলিয়াম এলিস ও ইংরেজ সৈন্যদের গ্রেপ্তার করেন।

ইংরেজ সৈন্যর আক্রমণে ক্ষুব্ধ মির কাসিম মুর্শিদাবাদে সেনাপতি মুহাম্মদ তকি খানকে নির্দেশ দেন জোসেফ অ্যামিয়টকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করতে। অ্যামিয়ট মুর্শিদাবাদে গিয়ে নৌকা থেকে নামামাত্র সে আদেশ পালন করা হয়।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাউন্সিল মিটিংয়ে সব সদস্যের সম্মতিতে অ্যামিয়টের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মির কাসিমকে সরিয়ে তাঁরা মির জাফরকে আবার বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাবের পদে বসালেন। ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই কলকাতা থেকে আসা ইংরেজ সৈন্যদল পলাশীর কাছেই মির কাসিমের সৈন্যদের আক্রমণ করল। সেনাপতি মুহাম্মদ তকি খান লড়াই করলেন, কিন্তু তাঁর পাশেই মির কাসিমের তিনটি সৈন্যদল চুপ করে দাঁড়িয়ে লড়াই দেখল। মির কাসিম পলাশীতে সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে যা করেছিলেন, ইতিহাসের পরিহাসে তাঁর নিজের বেলাতেও সেই একই ঘটনা প্রায় একই জায়গায় ঘটল। মুহাম্মদ তকি খান ও তাঁর প্রশিক্ষিত বন্দুকধারী সৈন্যরা পরাজিত ও নিহত হলেন। মুর্শিদাবাদের পতন হলো। মির জাফর আলী খান ইংরেজ সৈন্যের সাহায্যে আবার মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করলেন। ইংরেজ সৈন্যের মূল বাহিনী উত্তরে এগিয়ে ১ আগস্ট গিরিয়ার প্রান্তরে (জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ) মির কাসিমের সেনাপতি শের আলী খান ও আসাদউল্লাহ খানের বাহিনীর মুখোমুখি হলো। এই যুদ্ধেও পরাজিত হয়ে নবাবের সৈন্যরা পিছিয়ে উদয়নালায় গিয়ে আশ্রয় নিল।

ইংরেজ সৈন্যের এগিয়ে আসার খবর পেয়ে মির কাসিমও তত দিনে তাঁর মূল সেনাদলকে মুঙ্গের দুর্গ থেকে বের করে উদয়নালায় ঘাঁটি স্থাপন করতে পাঠিয়েছেন। উদয়নালার সুরক্ষিত অবস্থানে মির কাসিমের মোট ৪০ হাজার সৈন্য মেজর টমাস অ্যাডামসের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিল। এই যুদ্ধ চলেছিল পুরো এক মাস। প্রথম দিকে মির কাসিমের বাহিনীর সাফল্যই ছিল বেশি। একবার অতর্কিত আক্রমণে মির কাসিমের সৈন্যরা যুদ্ধ দেখতে আসা মির জাফরের নৌকা আক্রমণ করে বসেছিল। ইংরেজ সৈন্য অনেক কষ্টে তাদের পুতুল-নবাবকে বাঁচায়। কিন্তু ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মির কাসিমের বাহিনীর এক বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ সৈন্যকে উদয়নালা দুর্গে ঢোকার এক গোপন পথ বলে দিল। সেই পথ ধরে ৪ সেপ্টেম্বর রাতে ইংরেজ সৈন্যের দুটি দল অতর্কিতে মির কাসিমের শিবির আক্রমণ করে প্রায় পনেরো হাজার সৈন্যকে হত্যা করল।

মির কাসিম মুঙ্গের দুর্গ থেকে বেরিয়ে চাপারনের কাছে (ভাগলপুর, বিহার) শিবির ফেলেছিলেন। উদয়নালার পতনের খবর পেয়ে তিনি মুঙ্গেরে ফিরে গেলেন। সেখানে মির কাসিমের নির্দেশে বন্দী রামনারায়ণ, দুই জগৎ শেঠ, মাহতাব চাঁদ ও ফতেহ চাঁদ, রাজবল্লভ ও তাঁর ছেলেদের হাত-পা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হলো। ইংরেজ বন্দীদের তিনি সঙ্গে করে পাটনা নিয়ে যান, সেখানেই তাঁর আর্মেনীয় সেনাপতি সমরু উইলিয়াম এলিসসহ অন্য ইংরেজ বন্দীদের হত্যা করেন। এ সময়ে মির কাসিমের বাহিনীতেও অন্তঃকোন্দল দেখা দেয়। মির কাসিমের আর্মেনীয় গোলন্দাজ সেনাপতি খাজা গুরগিন নিজের সৈন্যদের হাতে নিহত হন।

আজিমাবাদের যুদ্ধেও ইংরেজদের সঙ্গে মির কাসিমের পরাজয় হলো। তিনি অযোধ্যার নবাব এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের উজির সুজাউদ্দৌলার কাছে আশ্রয় চাইলেন। সুজাউদ্দৌলা মির কাসিমকে আশ্রয় দিলেন। নবাব সুজাউদ্দৌলা, কাশীর রাজা বলবন্ত সিং ও মির কাসিমের মিলিত বাহিনীর ৪০ হাজার সৈন্য ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২ অক্টোবর গঙ্গার তীরে বক্সার শহরে ইংরেজ মেজর হেক্টর মুনরোর ১০ হাজার সৈন্যের মুখোমুখি হলো। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘বক্সারের যুদ্ধ’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে।

বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিম ও তাঁর সাত হাজার সৈন্য যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিতে পারেননি। তাঁদের দ্বিধা ও নিষ্ক্রিয়তার ফলে সুজাউদ্দৌলা ও বলবন্ত সিংও বিপদে পড়ে যান। ইংরেজরা জয়ী হয়, তারা বাংলা, বিহারের পাশাপাশি অযোধ্যাও জয় করে নেয়। সুজাউদ্দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এক বছরের মধ্যেই অপমানজনক শর্তে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সন্ধি করতে রাজি হন। মির কাসিমের পরাজয়ের ফলে বাংলা শুধু নয়, পুরো মোগল সাম্রাজ্যই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে গিয়ে পড়ে।

বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিমের ভীরুতার শাস্তি দিতে সুজাউদ্দৌলা মির কাসিমের যাবতীয় সম্পদ কেড়ে নেন। সহায়-সম্বলহীন মির কাসিম ফকিরের বেশে রোহিলাখন্ড ও এলাহাবাদ হয়ে দিল্লিতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই কপর্দকশূন্য অবস্থায় ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে রোগে ভুগে এককালের এই প্রতাপশালী নবাব রাস্তার পাশে মারা যান। তাঁর শেষ সম্পদ–গায়ের দুটো দামি শাল বিক্রি করে তাঁর কবর দিতে হয়।

মির কাসিমের পর তাঁর শ্বশুর মির জাফর আলী খানও বেশি দিন রাজ্যভোগ করতে পারেননি। কুষ্ঠরোগে ভুগে ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর মৃত্যু হয়।

সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে পলাশী যুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী প্রায় সব পক্ষের মৃত্যুতে বিপুলভাবে লাভবান হলেন রবার্ট ক্লাইভ। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে তৃতীয়বারের মতো ভারতে এসে তিনি দেখলেন, ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিরঙ্কুশ শাসন বজায় রাখার ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধক নেই। সে বছরের ৩ মে তিনি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে অযোধ্যার দখল করা অংশ ফিরিয়ে দিয়ে তার বদলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও দাক্ষিণাত্যের রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব আদায় করে নিলেন। তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ঢেলে সাজালেন। ভারতে মোগল-কর্তৃত্বের অবসান হলো, কোম্পানি-যুগ শুরু হলো। এই যুগেই ভারতে শিল্পায়ন শুরু হলো, ‘শিক্ষার বিস্তার’ হলো, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনের আধুনিকায়ন হলো।

মির কাসিম ইংরেজ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই করতে চেয়েছিলেন, সে লড়াইয়ের নৈতিক ভিত্তি অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিল মুর্শিদাবাদের শাসকদের অন্তঃকোন্দল আর বিশ্বাসঘাতকতায়। তাই প্ৰথম দিকে সম্ভাবনা জাগিয়েও মির কাসিম বেশি দিন সাফল্য ধরে রাখতে পারেননি। ইংরেজদের সামরিক প্রশিক্ষণ আর আর্থিক নিরীক্ষার গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন, কিন্তু সেগুলো নিজের সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। ইংরেজদের অসম বাণিজ্যে আঘাত হানতে তিনি ঠিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য আরও কিছু সময় তাঁর নেওয়া উচিত ছিল। সমুদ্র থেকে দূরে, মুঙ্গেরে রাজধানী স্থাপন করে তিনি ভালো কৌশলের পরিচয় দিয়েছিলেন, কিন্তু সৈন্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর কৌশলের ঘাটতি ছিল। উদয়নালায় পরাজয়ের পর প্রতিপক্ষের প্রতি যে নিষ্ঠুরতা তিনি দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে তা বিরল নয়, তবু নিন্দনীয়। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলেই মনে হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, মির কাসিম প্রতিনিধিত্ব করছিলেন মধ্যযুগের, আর মধ্যযুগের আয়ু তত দিনে ফুরিয়ে এসেছিল। ইংরেজ এসেছিল প্রযুক্তি আর প্রশাসনে ‘শ্রেয়তর’ হয়ে, এক নতুন যুগের উদ্ভাবনের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে।

মির কাসিম তাঁর যুগের সঙ্গে সঙ্গেই তলিয়ে গিয়েছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। তাঁর পরাজয়ের পর ভারতে যে নতুন ঔপনিবেশিক যুগ এসেছিল, তার সূচনায় সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল বাংলা-বিহারের মানুষকেই। ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্বিচার রাজস্ব আদায়ের ফলে যে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তাতে এই শস্যসমৃদ্ধ অঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়। এই দুর্দশা ঠেকাতে না পারা মির কাসিম যে নিজেও প্রায় অনাহারেই মারা পড়েছিলেন, তাতে কোথায় যেন ইতিহাসের একটা তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ আছে।

সুশাসনের ব্যর্থতা যে জনগণের দুর্ভোগ আর শাসকের স্থায়ী গ্লানি ডেকে আনে, ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেও কেউই কিছু শেখে না।

সকল অধ্যায়
১.
তরুণ তুর্কি : ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২.
পূর্ব সীমান্তের নকশাকার : ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ
৩.
বাঙ্গালার জন্ম : শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
৪.
আবেগপ্রবণ শাসক : গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ
৫.
নিঃসঙ্গ যোদ্ধা : রাজা গণেশ
৬.
বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষক : রুকনউদ্দিন বারবক শাহ
৭.
দলিতের উত্থান : মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র
৮.
স্থিতধী : আলাউদ্দিন হোসেন শাহ
৯.
সম্রাটদের সাক্ষাৎ : শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন
১০.
সিংহ-পরিবার : মসনদ-এ-আলা ঈসা খাঁ, স্বর্ণময়ী, মুসা খাঁ
১১.
প্রতিরোধের শেষ : প্রতাপাদিত্য
১২.
চিরদুঃখীজন : শায়েস্তা খান
১৩.
প্রথম নবাব : মুর্শিদ কুলি খান
১৪.
সুযোগসন্ধানী : আলিবর্দি খান
১৫.
হতভাগ্য : সিরাজ-উদ-দৌলা
১৬.
যুগসন্ধির লড়াই : মির কাসিম
১৭.
পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপঞ্জি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%