প্রলয় কুমার নাথ
সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)
স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম
—"আহহহ…মাগোওওও…আহহহ…আহহহ…"
নিশ্চুপ রাতের অন্ধকারকে ভেদ করে শোনা যাচ্ছিল অসহায় মেয়েটির আর্তচিৎকার। রাস্তার মাঝে পথের ধুলোয় পড়ে প্রসব বেদনায় ছটফট করছিল মেয়েটা। তাকে দেখার মত কেউ নেই তার চারিপাশে। থাকবেই বা কেন, তাকে এই গাঁয়ের সবাই এড়িয়েই চলে, কথনো সখনো গাঁয়ের বাচ্ছাগুলি তাকে ঢিল ছুঁড়ে মেরে হাসি তামাশা করে। তার নাম মাতু পাগলী। কোনো কোন দিন কোন সহৃদয় গৃহস্থের দয়ায়, আর বাকি দিনগুলো আবর্জনা থেকে এঁটো কাটা কুড়িয়ে খেয়ে দিন চলে তার।
বেশ স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল এই মাতঙ্গিনী, ওরফে মাতু। তার চেহারাটাও ছিল বেশ সুশ্রী, শুধু দোষের মধ্যে যা ছিল, তা হল তার শ্যমলা গায়ের রঙ। তবে গায়ের রঙ তো ঈশ্বরের দান, এর থেকেও বেশি দোষ করেছিল মাতঙ্গিনী বাবলুদাকে ভালোবেসে। হ্যাঁ বাবলু, মানে সেই ফর্সা রাজপুত্রের মত দেখতে ছেলেটা যাকে তার গৃহ-শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। পড়ানোর থেকে বেশি তার সদ্যযৌবনা শরীরটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত অঙ্কে এম.এস.সি পাশ পাড়ার ছেলে বাবলু। কত শীতের দুপুরে বাড়ির ছাদের মিঠে রোদে মাদুর পেতে বসে তাকে অঙ্ক শেখাতে আসত বাবলু। শীতল হাওয়ায় ফরফর করে উড়ে যেত বীজগণিত বইয়ের পাতা, অঙ্ক হয়তো একটাও হত কিনা সন্দেহ, কিন্তু ওদের চোখদুটি লেগে থাকত একে অপরের দিকে। একদিন রাতে কাউকে কিছু না বলে এই বাবলুদার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করে তার হাত ধরেই ঘর ছেড়ে ছিল মাতঙ্গিনী। তখন তার চোখে ছিল প্রেমিককে স্বামী হিসাবে পাওয়ার, তার সন্তানের মা হওয়ার কত অপূর্ন স্বপ্ন। লুকিয়ে কালী মন্দিরে বাবলুর হাতের সিঁদুর পরে মাতঙ্গিনীর মনে হয়েছিল তার সেই সকল সাধ বোধহয় পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু তার ভুল ভেঙেছিল কিছুদিনের মধ্যেই, যখন তার শরীরের সাধ মিটে গেলে বাবলু তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটি নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি করে দিয়ে মোটা টাকা আয় করেছিল। প্রতিদিন রাতে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষেদের নিজের শরীরটাকে ছিঁড়ে খেতে দেখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল মেয়েটা। একদিন সকলের অলক্ষ্যে সে পালাতে সক্ষম হয়েছিল সেই নরকবাস থেকে। সে পালিয়ে এসেছিল এই গাঁয়ে। কিন্তু ততদিনে সে আর মাতঙ্গিনী নেই, সে এই গাঁয়ের সকলের কাছে পরিচিত হয়েছে মাতু পাগলী হিসাবে। ভাগ্যের এমনই পরিহাস, যে তার বাড়ির লোকেরাও আর তার মত কুলটা মেয়ের কোন খোঁজখবর রাখতে চায়নি।
বেশ কয়েক মাস আগেকার ঘটনা। তখনো যে নিজের মধ্যে নতুন কোন প্রাণের সঞ্চার হতে চলেছে সেই কথা মাথাতেই আসেনি মাতুর। আগের রাতে বোধহয় গ্রামে কোন বিয়ে বা ওই জাতীয় অনুষ্ঠান ছিল। একটি আবর্জনার স্তুপের মাঝে বেশ কয়েকটা এঁটো পাত, মাছের কাঁটা, মাংসে হাড়, ফেলে দেওয়া ভাত, ডাল, তরকারি এমন নানাবিধ উচ্ছিষ্ট খাবার পড়ে থাকতে দেখেছিল মাতু। সেদিকে তাকিয়েই জিভে জল এসে গিয়েছিল মাতুর। মনে মনে সেদিনকার জন্য নিজের ভাগ্যের সুখ্যাতি করতে করতে সে ঝপ করে এসে বসে ছিল ওই এঁটো খাবারের মাঝে। মনের আনন্দে এঁটো পাতগুলো ধরে কুকুরের মত জিভ দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছিল সে। তার ভাগ্য সত্যিই ভালো ছিল সে সেই সময় তাকে নিয়ে উপহাস বা উত্যক্ত করার জন্য সেই স্থানে গাঁয়ের কোন কচি কাচারা ছিল না। ঠিক এমনই সময় তার পেছনে পড়ে থাকা পাতগুলোকে মাড়িয়ে মচ মচ শব্দে কেউ যেন এগিয়ে আসছিল তার দিকে। দুপুরের এই কাঠফাটা রোদের মাঝে এমন ভ্যাপসা গরমেও একটা ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস স্পর্শ করেছিল মাতুর দেহটাকে। উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকিয়ে ছিল মাতু। সে দেখে ছিল গাছ কোমর করে ময়লা ফুটিফাটা লালপেড়ে শাড়ি পরিহিতা এক কালো কুদর্শনা বুড়ি এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। তার কোলে আবার একটা বিশ্রী দেখতে কালো বেড়াল!
বুড়ির পাটের ফেসোর মত চুল হাওয়ায় উড়ছিল। সে চোখ বড় বড় করে চেয়েছিল সামনে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবারগুলোর দিকে।
—"খিদে….বড্ড খিদে পেয়েছে রে আমার…দে না…দে না আমারে কিছু খেতে!", ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলেছিল বুড়িটা। এই কথা শুনে মেজাজটা সপ্তমে চড়ে গিয়েছিল মাতুর। এতদিন সে নিজে একা যাও বা চেয়ে চিন্তে ভিক্ষে করে এই গাঁয়ের এঁটো কাটা কুড়িয়ে নিজের পেট ভরত, এখন সেই কাজেও অপর এক ভাগীদার এসে জুটেছে! মাতুর ভাগের ভিক্ষাটা না এই বুড়ি গাঁয়ের মানুষদের কাছ থেকে চেয়ে নেয়!
—"অ্যাইইই শালী…খানকি….", গালাগালি দিতে দিতে চিৎকার করে মাতু ছুটে গিয়েছিল বুড়িটার দিকে, তারপর তাকে শাসানোর ভঙ্গিতে বলে উঠেছিল,
—"চল ভাগ একেন থেকে…আর যদি কোনদিন তোকে একেনে দেকেচি না, তাহলে মুখে নুরো জ্বেলে দেবো…"
—"খিদে…বড্ড খিদে…", আরো কিছু বলতে চলেছিল বুড়িটা, কিন্তু তার আগেই নিচ থেকে একটা বড় পাথর কুড়িয়ে নিয়ে মাতু সেটা ছুঁড়ে মেরেছিল বুড়িটার দিকে।
কিন্তু ঢিলটা যেন বুড়ির দেহটাকে স্পর্শই করতে পারল না, বুড়ির দেহটা যেন বাতাস দিয়ে গড়া! নিমেষের মধ্যে সেটাকে ভেদ করে ঢিলটা ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরে একটি ঝোপের ভেতর।
—"হি হি হি হি", খিলখিল করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল বুড়িটা। তারপর দুপুরের আলোর মাঝেই ভোজবাজির মত মিলিয়ে গিয়েছিল বুড়ির অবয়বটি, শুধু আবার এক ফালি শীতল দমকা হাওয়া এসে পড়েছিল মাতুর গায়ে। ভয়ে পড়ি কি মরি করে ছুটতে ছুটতে সেই স্থান পরিত্যাগ করেছিল মাতু।
এর কিছুদিন পরেই মাতু পাগলী বুঝতে পেরেছিল যে সে মা হতে চলেছে। এত অসংখ্য পুরুষ তার শরীরটাকে ভোগ করেছিল যে যখন সে অন্তঃসত্ত্বা হল, তখন সে বুঝতেই পারল না কে তার গর্ভের সন্তানের পিতা…আর বুঝতে পারলেও গাঁয়ের কেই বা বিশ্বাস করবে তার কথা! ধীরে ধীরে তার শরীরে সন্তানসম্ভাবনার ছাপ যত পরিষ্কার হতে লাগল, ততই তার প্রতি গাঁয়ের মানুষের কটাক্ষ বাড়তে লাগল। তাই তার অসহায় আর্তচিৎকার শোনার মত কেউই আজ তার পাশে নেই!
কিন্তু সত্যিই কি কেউ তার পাশে নেই? না, কোন মানুষ হয়তো তার কাছে নেই…কিন্তু সে তো আছে! হ্যাঁ, সে আছে…সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে মাতুর কাছে, আরো কাছে! সাপের মত এঁকেবেঁকে মন্থর গতিতে সে এগিয়ে আসছিল তার দিকে। তার সবুজ পিচ্ছিল ত্বকের মাটির সাথে ঘর্ষণের ফলে অদ্ভুত একটা খসখস শব্দ হচ্ছিল। আগুনের গোলকের মত জ্বলছিল তার চোখদুটো, শনের নুড়ির মত তার চুলগুলো যেন সহস্র সর্প শাবকের মত ঘোরাফেরা করছিল তার মুখের চারিপাশে। নারী শরীরের মতই তার শরীরের ওপরের অংশ, তার দেহের গতির সাথেই উন্মুক্ত স্তন যুগল হেলে দুলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার দেহের বাকি অংশটা যেন একটা সাপের মত। তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা তীক্ষ্ণ শ্বদন্তে সীমাহীন লোভ এবং ক্ষুধা ঝিলিক দিয়ে উঠছে। সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
—"বানাআআ চচুগুনুউউ ভ্যেএএর!"
অপার্থিব যন্ত্রণার মাঝেই মাতু বুঝলো কয়েকটি বরফের মত ঠান্ডা, সরু সরু আঙ্গুল ক্রমশই তার যোনির ভেতর প্রবেশ করছে…যেন তার গর্ভে থাকা সন্তানটিকে টেনে বের করতে চাইছে সেই ভয়াল দর্শন অশরীরী! আর যন্ত্রনা সহ্য করতে পারল না মাতু, একটি প্রবল আর্তচিৎকার করে মৃত্যু বরণ করার আগে সে দেখতে পেল, সেই অশরীরী হাতদুটি এক ঝটকায় তার গর্ভ থেকে বাচ্চাটিকে টেনে হিচড়ে বার করে আনল…যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠল ছোট্ট প্রাণটি…কিন্তু সেটাই যেন ছিল তার জীবনের প্রথম তথা শেষ ক্রন্দন রব…সেই অশরীরী হাতগুলি বাচ্চাটিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই প্রেতিনীর হা করা মুখের দিকে, যার ভেতরে থাকা তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি এবং লকলকে জিহ্বাটি শিশুরক্তের স্বাদ পাওয়ার নারকীয় আনন্দে মত্ত…শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষণিক আগেও মাতুর কানে গেল আবার সেই অশরীরীর ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলো,
—"বানাআআ চচুগুনুউউ ভ্যেএএর!"
*********
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন