প্রলয় কুমার নাথ
সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)
স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম
—"ওরে বাবা, এ যে দেখছি একেবারে রাজ প্রাসাদ!", সামনের প্রাসাদোপম বাড়িটির দিকে চেয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল সীমন্তিনী। তার কথা শুনে জয়দীপ ম্লান হেসে বলে উঠল,
—"তা কেন হবে না, ম্যাডাম! আফটার অল, মন্তেশ্বরের অতীতের একমাত্র জমিদার বাড়ি বলে কথা!"
আজ জয়দীপ আর সীমন্তিনী স্বামী স্ত্রী। সল্ট লেকের আই.টি কোম্পানির অফিস থেকে যে প্রেমের সূত্রপাত তাদের মধ্যে হয়েছিল, কয়েক মাস আগেই তা রূপ নিয়েছে তাদের দাম্পত্য জীবনে। দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতেই তাদের বিবাহ হলেও, তেমন বড় অনুষ্ঠান বা জাঁকজমকের সাথে তাদের বিয়ে হয়নি। অত্যন্ত সাধারণ ভাবেই তারা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে। জয়দীপ আর সীমন্তিনীর বন্ধু বান্ধব আর অফিস কলিগরা উপস্থিত ছিল এই বিয়েতে। এছাড়াও সীমন্তিনীর পরিবারের বেশ কিছু সদস্যরাও সাক্ষী হয়েছিলেন চার হাতের এই মিলনোৎসবের। এরপর নিজের ফ্ল্যাটেই একটা ছোট্ট পার্টির ব্যবস্থা করেছিল জয়দীপ, তার সাথেই স্থানীয় একটি অনাথ আশ্রম এবং বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে সেখানকার আবাসিকদের এক বেলার খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিল সে আর সীমন্তিনী। অন্তত একদিনের জন্য হলেও ছোট্ট অনাথ শিশুগুলো এবং অসহায় বয়স্ক মানুষগুলোর মুখের হাসি দেখে সন্তুষ্টিতে ভরে গিয়েছিল তাদের মন প্রাণ। তবে এই সব কিছুর মধ্যে একটি বিশেষ কারণবশত জয়দীপের পরিবারের কেউ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এর জন্য একটু হলেও আক্ষেপ আছে এই নতুন দম্পতির মনে।
চাকরিসূত্রে কলকাতার ফ্ল্যাটে থাকলেও জয়দীপের পৈতৃক বাড়ি হল বর্ধমান জেলার এই মন্তেশ্বর গ্রামে। এখানকার বিখ্যাত রায়চৌধুরী জমিদার বংশের বর্তমান প্রজন্ম সে। স্বর্গীয় শশাঙ্কশেখর রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, উমাশঙ্কর রায়চৌধুরী এবং তার স্ত্রী মৃনালিনী দেবীর একমাত্র ছেলে হল জয়দীপ। এছাড়াও এই পরিবারে আছেন জয়দীপের কাকা তথা উমাশঙ্কর বাবুর ভাই, বরদাশঙ্কর রায়চৌধুরী, তার স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দেবী এবং তাদের একমাত্র মেয়ে, তৃণা। এখনো জীবিত আছেন শশাঙ্কশেখর রায়চৌধুরীর বিধবা স্ত্রী তথা উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্কর বাবুর মা, কৃপালিনী দেবী, যার বয়স নব্বই বছরের কাছাকাছি। এই পরিবারের সকলেই সীমন্তিনীকে এই বাড়ির পুত্রবধূ হিসাবে খুশি মনে মেনে নিলেও, জয়দীপ আর সীমন্তিনীর বিবাহের সপ্তাহ খানিক আগে এই পরিবারের ঘটে যায় একটি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় যার জন্য এই পরিবারের কেউই তাদের বাড়ির একমাত্র ছেলের বিবাহে উপস্থিত থাকতে পারেননি!
উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্কর, এই দুই ভাইয়ের বয়স যত প্রৌঢ়ত্বের কাছে পৌঁছেছে, ততই বাড়তে থেকেছে তাদের মদ এবং সিগারেটের প্রতি আসক্তি। প্রতিদিন রাতের খাওয়া সেরে তাদের দুই ভাইয়ের এক সাথে পেয়ালা সাজিয়ে বসা চায়ই চায়। রাতের এই সময় তাদের সাথে পরিবারের অন্য কেউ আর থাকে না। এমনই একদিন রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান সেই সাত মহলা বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে গিয়েছিল এই দুই প্রৌঢ়র তীব্র ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। পরিবারের অন্যান্যরা তখনই ছুটে গিয়েছিল তাদের ঘরে। তারা দেখেছিল ঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিদেশি হুইস্কি, কাঁচের বোতলের টুকরো, সিগারেটের ছাই এবং অবশিষ্টাংশ!…আর দুই ভাই তাদের আরাম কেদারার পাশে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছেন ঘরের মেঝের ওপর। তাদের বিস্ফারিত চোখ, কম্পমান গোটা শরীর!..সেই দিনের পর থেকে আর উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হননি এই দুই ভাই, বিড়বিড় করে তারা কি বলতে চেষ্টা করতেন সেটাও বোঝেনি কেউ। ডাক্তার তাদের দেখে বলেছিলেন, এই দুই ভাইয়ের একসাথেই কোন কারণে স্ট্রোক হয়, যার ফলে প্যারালাইসিস হয়ে যায় তাদের হাতে এবং পায়ে, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'Quadriplegia'. এছাড়াও এই স্ট্রোকের ফলে প্রবল ভাবে বিঘ্নিত হয়েছে তাদের বাক শক্তি, যাকে বলা হয় 'Dysarthria'!
বিয়ের এত কাছে বিস্ফোরক এই খবর শুনে ভেঙে পড়ে জয়দীপ, কিন্তু তার বাড়ির লোকেরা তাকে আশ্বাস দেয়, বলে যা হওয়ার তা তো হয়েছে। এর জন্য সে যেন নিজের বিয়েটা না পেছোয়। তাদের আশীর্বাদ বাড়ির একমাত্র ছেলে এবং তার হবু স্ত্রীর প্রতি সবসময় থাকলেও, এই পরিস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। সেই জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে না করে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে জয়দীপ আর সীমন্তিনী। সীমন্তিনীর খুব ইচ্ছা ছিল তার স্বামীর পৈতৃক ভিটে দেখার, কিন্ত বিয়ে থেকে আগামী বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত অফিসে ওদের দুজনেরই অত্যাধিক কাজ থাকায় ওরা এতদিন ছুটি নিতে পারেনি। তাই এখন কাজের প্রেসার একটু হালকা হওয়ায় তারা দুজনে বেশ কিছু দিনের ছুটি নিয়ে এই গ্রামে এসেছে।
সীমন্তিনী খুব মিশুকে মেয়ে। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শ্বশুর বাড়ির সকলের সাথেই তার বেশ ভাব হয়ে গেল। পরিবারের সকলেই বেশ একাত্ম হলেও সীমন্তিনী লক্ষ্য করেছিল যে তাদের সকলের মধ্যেই কেমন যেন একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। যেন সে আর তার স্বামী এই গ্রামে এসেছে বলে প্রাণ খুলে খুশি হতে পারছেন না এই পরিবারের মানুষজন।
সেদিন রাতে খাওয়ার পাট চুকলে সীমন্তিনী মৃণালিনী দেবীকে এই কথা জিজ্ঞাসা করলে প্রথমে তিনি খানিক ইতস্তত করলেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা সীমন্তিনীর কাছে তিনি অবশেষে বলে বসলেন,
—"দেখ মা, ছেলের বউ প্রথম শ্বশুর ঘরে পা দিলে কেই বা খুশি হয় না, বল…আমরাও খুশি হতে পারতাম যদি না গাঁয়ের এই পরিস্থিতি হত!"
বেশ অবাক হল সীমন্তিনী,
—"গাঁয়ের পরিস্তিতি মানে? আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন মা?"
মৃণালিনী দেবীর মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। একবার ঢোক গিলে তিনি যেন মনের মধ্যে গুছিয়ে নিলেন কি বলতে চলেছেন।
—"গাঁয়ে কোন পিশাচের নজর লেগেছে রে, মা…কারণ কিছু দিন ধরে যা ঘটে চলেছে তা কোন মানুষের কম্ম হতেই পারে না।"
—"কি ঘটছে সেটা তো বলবে?"
রাতের অন্ধকারে ধীরে ধীরে বারান্দার রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন মৃণালিনী দেবী। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন মাতু পাগলীর সাথে যে নৃশংস ঘটিনাটি ঘটেছিল তার কথা, অন্তত যেটুকু তিনি লোক মুখে শুনেছিলেন।
একটা অস্বাভাবিক গা ছমছমে ভাব যেন গ্রাস করছিল সীমন্তিনীকে। তবুও সে বলে উঠল,
—"মেয়েটি জঙ্গলের মাঝে পড়ে প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করছিল নিশ্চয়ই, এমন তো হতেই পারে ওটা কোন বন্য জন্তুর কাজ…"
—"না রে মা, তেমন হলে তো ভয় পাওয়ার কারণই থাকত না…কিন্তু তেমনটা নয়, কারণ এর পর এই একই ঘটনা ঘটতে শুরু করল গাঁয়ের ভদ্র ঘরের অন্তঃসত্ত্বা বউদের সাথেও!"
একটু থেমে তিনি আবার বলতে লাগলেন গাঁয়ের লোকমুখে শোনা যমুনা এবং প্রতিমার সেই নৃশংস পরিণতির কথা তথা প্রতিমার ক্ষেত্রে মৃদুলার বলা সেই অবিশ্বাস্য বয়ান!
—"ব..ব..বানা চ..চ..চচুগুনু ভ..ভ..ভ্যের!!…এ আবার কী!!…এই কথার মানে কি মা?"
—"তা জানিনা…প্রথমে লোকে মৃদুলাকে বিশ্বাস করেনি, বরং তাকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিল। কিন্তু এই একই ধরণের ঘটনা, একই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান যখন বারে বারে আসতে লাগল গাঁয়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে…যখন গাঁয়ের সকল অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে একে একে ওই অজানা অশরীরীর হাতে মারা পড়তে লাগল, তখন সকলে বাধ্য হয়ে বিশ্বাস করতে লাগল মৃদুলার কথা। এখন গ্রামবাসীরা এতটাই ভীত, যে গাঁয়ের কোন মহিলা সন্তান সম্ভবা হলেই তার বাচ্চা না হওয়া অবধি তাকে গাঁয়ের বাইরে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে…সেই জন্যই বলছি মা, গাঁয়ের এই অবস্থার মাঝে তোদের দেখে আর কি করে খুশি হই বল?…যাই হোক, রাত অনেক হল, এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পর।"
এই বলে মৃণালিনী দেবী চলে গেলেন। কিন্তু এত জার্নি করে এসেও, সেই রাতে নরম বিছানায় শুয়েও আতঙ্কে এবং উত্তেজনায় ঘুম এলো না সীমন্তিনীর দুই চোখে।
পরদিন সকালে বাড়ির ছাদে একসাথে গল্প করছিল সীমন্তিনী আর তার স্বামীর খুড়তুতো বোন তৃণা। এই আতঙ্কময় পরিবেশ থেকে একটু বিরতি নিতে, সীমন্তিনী তৃণাকে বলে উঠল,
—"জানো তো ঠাকুর ঝি, কলকাতার ওই ইট কাঠ কংক্রিটের জঙ্গল দেখে দেখে চোখ পচে গিয়েছে…তোমাদের গ্রামের এই স্নিগ্ধ সবুজ পরিবেশ আমায় ভীষণ টানে। আচ্ছা, তোমাদের গাঁয়ের দেখার মত কি কি জায়গা আছে গো, ঠাকুর ঝি?"
তৃণা যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দিল,
—"দেখার মত বলতে তেমন কিছু নেই...ওই গ্রামে যা যা থাকে আর কি…মেঠো পথ, বাঁশবাগান, দীঘি, শস্যক্ষেত এই আর কি…আর ওই দিকে যে জঙ্গল দেখছো, ওখানে একটি ভাঙা শিবমন্দির আছে…ওটা আমাদের পূর্বপুরুষদেরই গড়া, কিন্তু একবার ওখানে পুজোর সময় কি ভাবে যেন আগুন লেগে যায়…আমাদের এক পূর্বপুরুষ বিনয়শেখর রায়চৌধুরী, তার স্ত্রী প্রমীলা এবং তাদের একমাত্র দুধের শিশুটা সহ বেশ কিছু মানুষ মারা যায় ওই দুর্ঘটনায়…এই ঘটনার পর থেকে এই জমিদারীর তৎকালীন প্রধান পুরুষ রাজশেখর রায়চৌধুরীর আদেশানুসারে ওই মন্দিরে পুজো বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে ওটা পরিত্যক্ত, কেউ যায় না ওখানে।"
ওই জায়গাটা দেখার জন্য বেশ কৌতূহল হচ্ছিল সীমন্তিনীর মনে। সে আব্দারের সুরে তৃণাকে বলল,
—"তাহলে চলো না ঠাকুর ঝি, আমরা দুজনে একবার ওই জায়গাটা থেকে ঘুরে আসি!"
—"না, তা হয়না বৌদি…আমার এই বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ!", মুখ কালো করে বলল তৃণা। কথাটা শুনে অবাক হল সীমন্তিনী।
—"সে কি! কেন?"
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তৃণা। তারপর মাথা নিচু করে বলতে লাগল,
—"আসলে বৌদি, ছোটবেলা থেকেই আমার আঁকার হাত খুব ভালো। তাই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর বাবার কাছে বায়না করি আমাকে কলকাতায় আর্ট কলেজে ভর্তি করে দিতে। সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন করে ভর্তি হই রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানেই আমার আলাপ হয় বুরাকের সাথে…বুরাক কালেভ…ও ইউ.এস.এর বাসিন্দা ছিল। কিন্তু ইন্ডিয়ান পেন্টিংএর ওপর ওর খুব ঝোঁক ছিল, তাই সুদূর ইউ.এস.এ থেকে পেন্টিং নিয়ে গ্রাজুয়েশন করার পর সেও কলকাতার এসে ভর্তি হয় ওই ইউনিভার্সিটিতে। আমরা একে অপরকে খুব ভালোবেসে ফেলি বৌদি…একদিন বাবাকে জানাই আমাদের সম্পর্কের কথা। বললাম যে আমরা বিয়ে করতে চাই। কিন্তু বাবা ওই ভিন দেশী ভিন্ন জাতির ছেলেটাকে মেনে নিলেন না। আমাকেও পড়া ছাড়িয়ে জোর করে করে এখানে নিয়ে এলেন। এখন বাবারই আদেশে আমি প্রায় গৃহবন্দী বলতে পারো!"
শুষ্ক হাসি হাসল তৃণা। মেয়েটার জন্য বেশ মায়া হল সীমন্তিনীর।
—"জয়দীপ তো আমাকে এই সব কথা কোনদিন বলেনি!"
—"দাদা বলবে কি করে বলো, দাদা তো বাইরে বাইরে থাকে। এত কিছু জানেই না…বাবা এই সব কথা খুব একটা পাঁচ কান করতে চাননি।"
তৃণা ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। অগত্যা সীমন্তিনী একাই বেরিয়ে পড়ল গ্রাম দেখার উদ্দেশ্যে।
*********
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন