প্রলয় কুমার নাথ
সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)
স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম
অস্বাভাবিক প্রসব যন্ত্রণার সাথে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা মূর্তিমান মৃত্যুকে দেখে আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে এল সীমন্তিনীর। সে বুঝতে পারল আর কোন উপায় নেই, তাকেও এই অশরীরীর হাতে মারার জন্যই অপহরণ করে এই জায়গায় রাখা রয়েছে। 'অ্যাবিজু'-র হাত দুটি এবার স্পর্শ করতে চলেছে সীমন্তিনীর যোনিকে…ঠিক এমন সময়!…গাছ কোমর করে ময়লা লাল পেড়ে শাড়ি পরা এক বয়স্ক মহিলার পা ভেসে উঠল সীমন্তিনীর মাথার কাছে…দেখা গেল কালো বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বুড়িটা, সেদিন যে সীমন্তিনীর কাছ থেকে খাবার চেয়েছিল!…তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল 'অ্যাবিজু'…সরিয়ে নিল নিজের হাত সীমন্তিনীর যোনির কাছ থেকে!…যেন একটি শুভ শক্তিকে দেখে সভয়ে পিছিয়ে গেল এক অশুভ শক্তি। যে হাত দিয়ে ডেমনটি সীমন্তিনীর যোনি স্পর্শ করতে চলেছিল, সেই হাতটা খপ করে চেপে ধরল বুড়িটা। একটা তীব্র চিৎকার করে উঠল সেই সর্পিনী, বুড়ির স্পর্শে খসে পড়ল দানবীটির সেই হাত! কিন্তু হাল ছাড়ল না সেই অশরীরী, নিজের অপর হাতটা বাড়িয়ে আবার হুঙ্কার দিয়ে সে ছুটে এলো সীমন্তিনীর কাছে।
—"অনেক অত্যাচার করেছিস, তুই…কিন্তু আর নয়!", গর্জে উঠল বুড়িটা, তারপর নিজের ডান হাতটা প্রসারিত করল সে সামনের দিকে। সীমন্তিনীর মনে হল যেন তার চারিপাশে প্রলয় ঝড় শুরু হয়েছে…বুড়িটার প্রসারিত হাতের তালু থেকে একটি উজ্জ্বল নীল আলোক রশ্মি বেরিয়ে এসে তা লাগলো 'অ্যাবিজু'র গায়ে। হাড় কাঁপানো চিৎকার করে উঠল সেই অশরীরী, নিচে পড়ে ছটফট করতে লাগল সে। তার শরীরের প্রবল দাপটে মনে হচ্ছিল যেন এই ঘরের ভেতর ভূমিকম্প হচ্ছে। যেন এখুনি এই স্থানের মাটি দুই ভাগ হয়ে পাতালের সমস্ত জল ছুটে আসবে এই ঘরে!
………………………………
ঠিক সেই সময় নিজের ঘরের খাটটাকে অদ্ভুত ভাবে নড়তে দেখে তৃণা ভয় পেয়ে নীচে নেমে এলো। সে বুঝতে পারল এই কম্পনের কেন্দ্রবিন্দু হল এই খাটের নিচে রাখা সিন্দুকটা যার মধ্যে রাখা রয়েছে 'অ্যাবিজু'র ছবিটা!
………………………………
ওদিকে বুড়িটা এবার তার পোষা কালো বেড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল,
—"তোর মনে খুব দুঃখু ছিল যে এই গাঁয়ের লোকেরা তোকে অপয়া, অশুভ মনে করে, তাই না? আজ তোর কাছে সুযোগ এসেছে মানুষের মন থেকে সেই ধারণা মুছে দেওয়ার। ওই শয়তানটাকে তোর হাতে সঁপে দিলাম…যা, শুধু ওকে নয়, ওর পাপিষ্ঠা আহবানকারীকেও শাস্তি দে তুই!"
সীমন্তিনী দেখল বুড়ির পোষ্যটি এক লাফে এগিয়ে গেল 'অ্যাবিজু'র কাছে…বেড়ালটির দুই চোখ দিয়ে দুটি উজ্জ্বল হলুদ আলোক রশ্মি নির্গত হয়ে তা গিয়ে পড়ল 'অ্যাবিজু'র দেহে…আর তখনই চক্ষের নিমেষে দাউ দাউ করে আগুন লেগে গেল সেই সবুজ দানবীর গায়ে। সেই আগুনের তাপে যেন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেই ডেমনটির শরীর, যেন সহস্র কেউটে সাপ কিলবিল করতে করতে বেরিয়ে এলো তার শরীরের ভেতর থেকে…এবং সেগুলো সেই ঝড়ো হাওয়ায় কোথায় মিলিয়ে গেল তা আর কেউ বুঝল না।
………………………………
আর ঠিক সময় একটি প্রবল বিস্ফোরণের সাথে তৃণার খাটের নিচে রাখা সিন্দুকটার ডালা খুলে গেল...তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো হলুদ আগুনের হলকা যা গ্রাস করল তৃণার সর্ব শরীরটাকে!
………………………………
বুড়িটি মাতৃসুলভ হাসি হেসে এবার হাত রাখল সীমন্তিনীর পেটে…তার এই অপার্থিব স্পর্শে সব জ্বালা যন্ত্রনা যেন নিমেষের মধ্যেই ভুলে গেল সীমন্তিনী…কিছুক্ষনের মধ্যেই সদ্যজাতর ক্রন্দন ধ্বনিতে ভরে উঠলো সেই স্থান। সীমন্তিনীর ছেলে হয়েছে। বুড়িটি হাসিমুখে তার ছেলেকে নিজের কোলে নিল…আর তখনই একটি অমোঘ পরিবর্তন হল তার চেহারার মধ্যে…কোথায় সেই ছেঁড়া শাড়ি পরা কালো বুড়িটা…সীমন্তিনীর সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপ সুন্দরী নারী…তার সোনার মত গায়ের রং, বহুমূল্য গহনা ও পোশাকে সুসজ্জিতা সেই দেবী মাতৃস্নেহে সীমন্তিনীর সন্তানকে কোলে নিয়ে আছে…কালো বেড়ালটাও যেন তার মালকিনের আসল রূপ দেখে 'ম্যাও ম্যাও' করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে।
—"কে মা তুমি? আর এভাবে আমাকে বাঁচালেই বা কেন ওই পিশাচিনীর হাত থেকে?", ভক্তি ভরে বলল সীমন্তিনী।
—"আমি তো সকলকেই বাঁচাতে চাইতাম রে…কিন্তু গাঁয়ের কেউই যে আমাকে খেতে দেয়নি, তাই অভিমান করেছিলাম সকলের ওপর। কিন্তু তুই আমাকে সেদিন খেতে দিলি…তাই এই কটা মাস অপেক্ষা করছিলাম কখন ওই শয়তানটা তোর বাচ্চাকে নিতে আসবে, আর আমিও ওকে শেষ করে এই গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করতে পারব!", এই বলে সেই দেবী নিজের বাঁ হাতটা আলতো করে রাখলেন সীমন্তিনীর কপালের ওপর। আর তখনই যেন বায়োস্কোপের মত একের পর এক ঘটনা ভেসে উঠতে লাগল সীমন্তিনীর বন্ধ চোখের সামনে…তৃণা ও বুরাকের প্রেম…তৃণার মা হতে যাওয়া…তার বাবা আর জ্যাঠার ষড়যন্ত্র…তৃণার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা…সব!
—"কে মা আপনি? বলুন…বলুন মা…", আবার বলে উঠল সীমন্তিনী।
বাচ্চাটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে মৃদু হাসলেন সেই দেবী, তারপর বললেন,
—"ওই শিব মন্দিরের মাঝে সবচেয়ে বড় দেউলটাতেই ছিল আমার বাসস্থান…আগে কারোর বাড়িতে বাচ্চা হলে তার ছয় দিনের মাথায় আমার পুজো হত…এছাড়া হিন্দু বর্ষপঞ্জির প্রতিটি চন্দ্র মাসের ষষ্ঠ দিনেও খুব ঘটা করে আমার পুজো হত..."
একটু থামলেন দেবী। ছলছল করে উঠল তার কাজল কালো চোখদুটো। তিনি আবার বলে চললেন,
—"পাপিষ্ঠ শশাঙ্কশেখর রায়চৌধুরী বরাবরই চেয়ে এসেছিল তার জমিদার বংশের বিপুল বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হোক শুধুমাত্র তার দুই ছেলে উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্কর। তার ইচ্ছা মতই তো চলছিল সব কিছু। তার দাদা রাজশেখর বিয়ে করেননি তাই তার সন্তানের প্রশ্নই উঠছে না। সে এটাও জেনে এসেছিল যে তার ভাইয়ের বউ প্রমীলা বাঁজা, সেটা জেনে মনে মনে খুব খুশিই হয়েছিল সে। কিন্তু যবে থেকে প্রমীলা সন্তানসম্ভবা হল তবে থেকেই মাথায় আগুন জ্বলে উঠল শশাঙ্কশেখরের। তাই সে ঠিক করেছিল আমার মন্দিরে পুজো দেওয়ার সময়ই তার ভাইয়ের পুরো পরিবারটাকেই একেবারে শেষ করে দিতে হবে! সেদিন সে জমিদারীর কয়েকজন বিশ্বস্ত লেঠেলকে পয়সা খাইয়ে আমার মন্দিরে আগুন লাগাতে বলে! জমিদার বাড়িতে তার এই কাজ করার উপায় ছিল না, কারণ এতে তার নিজের স্ত্রী এবং সন্তানদ্বয়েরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। আর সেইজন্যই তো মিথ্যা অসুখের বাহানায় সে কৃপালিনী এবং তার দুই সন্তানকে সেই দিন আমার মন্দিরে আসতে দেয়নি! আর তার দাদা তো এইসব পুজো পাঠ থেকে সর্বদা দূরেই থেকে এসেছে!"
—"মা, সেদিন অতগুলো মানুষ একে একে আপনার সামনেই মারা গেল! আপনি কেন পারলেন না তাদের রক্ষা করতে?", কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল সীমন্তিনী।
—"নিয়তি রে মা, নিয়তি!…অতগুলো মানুষের ভাগ্যে যদি একই দিনে, একই স্থানে, একই সময়ে মৃত্যু লেখা থাকে, তাহলে তাদের সকলের নিয়তির ডাক সংঘবদ্ধ ভাবে এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যে তাকে আটকানো আমরাও সাধ্যের বাইরে চলে যায়। এই যেমন এই গ্রামের এতগুলো মেয়ে এবং তাদের বাচ্চাদের মারল এই শয়তান, সেটাও তো তাদের নিয়তির লিখনই ছিল রে! আর আজ যে তোকে আমি বাঁচালাম এটাও হয়তো লেখা ছিল তোর নিয়তিতে!…কিন্তু ওই পাপিষ্ঠ শশাঙ্কশেখরকে তার কৃতকর্মের সাজা আমি দিয়েছিলাম সেই দিন রাত্রেই!"
একটু থেমে দেবী আবার বলে উঠলেন,
—"তাই তো এখন পুজো না পেয়ে, আমি ক্ষুধার্থ হয়ে ওই মলীন রূপে গাঁয়ের এমন মেয়েদের কাছে খাবার চেয়ে বেড়াই, যারা আর কিছুদিনের মধ্যেই মা হতে চলেছে!…তোকে সুস্থ করে দিলাম, ছেলেকে নিয়ে শ্বশুড় বাড়ি ফিরে যা…আর তারপর আবার গাঁয়ে আমার পুজোর প্রচলন ঘটাস!"
—"কিন্তু আপনি কোন দেবী মা?", আবার বলে উঠল সীমন্তিনী।
ঠিক সেই সময় যেন উলুধ্বনি ও মঙ্গল শঙ্খের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল চারিদিক। আকাশ থেকে দৈবকণ্ঠে উচ্চারিত হল অমোঘ এক মন্ত্র:
"ॐ হ্রীঁ ষষ্ঠীদেব্যৈয় স্বাহা,
ওম সাস্থামে চন্ডী বধূ কার্তিক প্রিয়ে নমঃ স্তুতি"
সেই দেবী সীমন্তিনীকে আশীর্বাদ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
—"আমি হলাম এই জগৎ সংসারের ছোট শিশু তথা গর্ভবতী মায়েদের রক্ষাকর্ত্রী…মা ষষ্ঠী!"
কোন অলৌকিক জাদুবলে সদ্যজাত ছেলেকে কোলে নিয়ে পরদিন সকালেই বাড়ি ফিরে এসেছিল সীমন্তিনী। ছোট বেলায় মা ঠাকুমার সাথে মা ষষ্ঠীর পুজোতে অনেকবার গিয়েছে সে। এখন তার একে একে মনে পড়তে লাগল সেই পুজোয় পুরুত ঠাকুরের মুখ থেকে শোনা বেশ কিছু কথা। মা ষষ্ঠীর আরেক নাম 'দেবসেনা'। স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী তিনি দেবতা কার্তিকের বা স্কন্দের স্ত্রী, তাই তো তিনি ‘স্কন্দ-জায়া’। কার্তিক হলেন যুদ্ধের দেবতা, তার আরেক নাম হল 'শক্তিপাণি'। মা ষষ্ঠীর বাহন হল বেড়াল। বট গাছ বা তার নিচে রাখা লাল রঙের পাথর, জল ভর্তি মাটির কুজো…এই সব কিছুই মা ষষ্ঠীর সাংকেতিক রূপ! প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই মা তাকে নিজের সম্বন্ধে নানা ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সীমন্তিনী সেগুলো বুঝতে পারেনি, উপরন্তু সে তাকেই দোষী মনে করেছিল! নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য বড্ড আক্ষেপ হতে লাগল সীমন্তিনীর!
কিন্তু বাড়ি ফিরে সে দেখেছিল সেখানে শোকের ছায়া বিরাজমান। গতকাল রাতে হঠাৎ করেই আগুন লেগে যায় তৃণার শোয়ার ঘরে। সেই আগুনে পুড়ে মারা যায় তৃণা…জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যায় সেই ঘরে রাখা সব আসবাব..তার খাট, সিন্দুক, এমনকি সেটার ভেতরে রাখা ওই দানবীর ছবিটাও…কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে পরিবারের অন্য কারোর কোন ক্ষতি হয়নি। তৃণার দগ্ধ মৃতদেহটি তখনো শায়িত ছিল বাড়ির উঠোনে। বাড়িতে পুলিশ এবং অ্যাম্বুলেন্সও এসেছে। হয়তো মা ষষ্ঠী তৃণাকে তার কৃতকর্মের সাজা দিয়েছেন…কিন্তু যা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য সত্যিই কি তৃণা দায়ী ছিল? তার সাথেও তো অনেক অন্যায় হয়েছিল তাই তো সে প্রতিশোধ কামী হয়ে উঠেছিল!
ততক্ষনে সীমন্তিনীকে দেখে অবাক হয়ে তার কাছে ছুটে এসেছে এই বাড়ির সকলে, তার স্বামী জয়দীপ, পুলিশ অফিসার এবং সেখানে উপস্থিত বেশ কিছু গ্রামবাসীরা। সকলে ভিড় করে ঘিরে ধরেছে তাকে। উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্করকেও হুইল-চেয়ারে বসিয়ে সীমন্তিনীর সামনে নিয়ে এসেছে তাদের স্ত্রীরা। হাসি মুখে ছেলেকে জয়দীপের কোলে দিয়ে সীমন্তিনী মুখ তুলে তাকালো এই দুই অত্যাচারী দাম্ভিক জমিদার সন্তানের দিকে, এখন যারা সম্পূর্ণ রূপে অসহায়, অথর্ব! নিজেদের কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তিই পেয়েছেন তারা! মনে মনে অনেক কথা একসাথে গুছিয়ে নিল সীমন্তিনী…আজ সকলের সামনে সে খুলতে চলেছে এক একটি রহস্যের জট।
………………………………
এরপর সীমন্তিনীর উদ্যোগে গোটা মন্তেশ্বর গাঁয়ে খুব ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করা শুরু হল। নতুন করে সংস্কার করা হল মায়ের মন্দিরটা। বলা বাহুল্য, এর পর থেকে এই গ্রামে আর কোন প্রসবরত মা বা তার সন্তানের কোন ক্ষতি হয়নি।
********************
(সমাপ্ত)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন