প্রলয় কুমার নাথ
সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)
স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম
কড়াইয়ে গরম তেলের মাঝে নুন হলুদ মাখানো বাটা মাছকটা ফেলে, রান্নাঘরের খোলা জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে অনেক কথা ভাবতে লাগল এই গাঁয়ের গৌতম মুদির পুত্রবধূ, যমুনা। আজ প্রায় আড়াই বছর হল এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে পাশের গাঁয়ের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের এই যুবতী। তাদের এই পুরোনো রঙ চটা একতলা বাড়িটাতে থাকে শুধুমাত্র সে এবং তার শ্বশুর মশাই গৌতম, যার এই গ্রামে একটি ছোট মুদিখানার দোকান আছে। যমুনার শাশুড়ি তার বিয়ের আগেই গত হয়েছে। যমুনার স্বামী তথা গৌতমের একমাত্র ছেলে বিশ্বনাথ তাদের পারিবারিক ব্যবসায় আসতে চায়নি। টানাটানির সংসারে ছেলেমেয়েদের অনেক দূর অবধি পড়ানো একটি বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়, তবুও গৌতম তার ছেলেকে শহরের কলেজ থেকে বি.কম পাশ করিয়ে ছিল, পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.কম পড়ার সুযোগও সে পায়, কিন্তু সেখানে পড়তে পড়তেই কলকাতার একটি প্রাইভেট ফার্মে একাউন্টস বিভাগে একটা কাজ জোগাড় করে ফেলে সে। মাইনে যৎসামান্য হলেও হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে না ঠেলে পড়া ছেড়ে সে চাকরিতেই ঢুকে পড়ে। এখান থেকে কলকাতায় রোজ যাওয়া আসা করা প্রায় অসম্ভব, তাই সেখানেই একটা ছেলেদের মেসে থাকে সে। তার ইচ্ছা ছিল আরো কিছুদিন পর, আরো কিছুটা অর্থ সঞ্চয় করে কলকাতায় একটি স্থায়ী বাসস্থান জোগাড় করে তারপর সংসারী হতে, কিন্তু তার আগেই বৃদ্ধ বাপের জোরাজুরিতে তাকে বসতেই হয় ছাদনাতলায়। সেই থেকে মাসে দুই তিনবার মাত্র গ্রামের বাড়িতে আসে সে, থাকে অল্প কিছুদিনের জন্যই। সেইটুকু সময়ের জন্যই যমুনা যা একটু স্বামীর সান্নিধ্য পায়। এখন আবার নতুন জেদ ধরেছে তার বাবা, পঞ্চাশোর্ধ মানুষটির এবার নাতি বা নাতনির মুখ না দেখলেই নয়। বাবার প্রতি মনে মনে বিরক্ত হলেও তাকে আঘাত করতে চায় না বিশ্বনাথ, সেই কথা সে যমুনাকেও জানিয়েছে।
সত্যি কথা বলতে যমুনাও চায় মা হতে, কিন্তু ইদানিং এই গ্রামে যা ঘটে চলেছে সেই কথা শুনে তার মন বারবার কু গাইছে। সবার প্রথমে তো ওই পাগলীটা, আর তারপর হারানের বউ প্রতিমা! হ্যাঁ, এই কথা ধরে নেওয়া যায় পাগলীটার ওই অবস্থা হয়তো কোন বন্য জন্তু করেছিল কারণ সে গ্রামের জঙ্গলের মাঝেই প্রসব বেদনা নিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রতিমার অমন অবস্থা কিভাবে হল? একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে তো আর কোন জন্তু আসতে পারেনা! তার ওপর মৃদুলা ধাইএর ওই বয়ান! ও কি সব সত্যি কথা বলছে? নাকি কিছু লুকোচ্ছে? ও সেদিন প্রতিমার ঘরে যাকে দেখেছিল সেটা ঠিক কি…কোন জন্তু নাকি অতিপ্রাকৃত কোন অপশক্তি? নাকি এই সব মৃদুলারই কারসাজি? কিন্তু এইসব করে তার লাভই বা কি? আর প্রতিমার বাচ্ছাটাই বা কোথায় গেল? পুলিশও এই প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর দিতে পারছে না।
কয়েকদিন আগে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যমুনার সাথে। যমুনার বহুদিনের আবদার মেনে, বোনাসের পয়সা দিয়ে অনেক কষ্টে সৃষ্টে একটা সাধারণ আকারের টিভি সেট কিনে দিয়েছিল বিশ্বনাথ। আর তারপর শুরু হয়েছে যমুনার বিকাল থেকে রাত অবধি জি-বাংলা আর স্টার-জলসার বাতিক। তা সেদিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ করে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়া শুরু হল। সিরিয়াল দেখতে দেখতে যমুনার খেয়ালই ছিল না যে সকালে বাড়ির ছাদে মেলা কাপড়গুলো এখনো সেখানেই পড়ে আছে। এই কথা মনে পড়তেই টিভি ফেলে তড়িঘড়ি ছাদে ছুটল প্রতিমা। জামা কাপড় তোলা হয়ে গেলে হঠাৎ তার চোখ গেল ছাদের এক কোণে। সন্ধ্যার অন্ধকারের, টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে কে যেন ছাদের রেলিংয়ের ওপর উবু হয়ে বসে নীচে পা দোলাচ্ছে!
—"কে? কে বসে আছো ওখানে?", ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল যমুনা।
তার ডাক শুনে রেলিং থেকে ছাদে নেমে এলো অপরিষ্কার ছেঁড়া লাল পেড়ে কাপড় পরিহিতা এক বুড়ি। নিজের বুকের মাঝে সে যত্ন সহকারে ধরে রেখেছে একটি বিকটাকার কালো বেড়ালকে!
—"বড্ড খিদে পেয়েছে রে মা!...কিছু খেতে দিবি আমায়?", অপার্থিব ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল বুড়িটা। তার শনের নুড়ির মত জটা পাকানো চুল আর কালো কুচকুচে কুঞ্চিত মুখস্ত্রী দেখে ভয়ে বুক হিম হয়ে গেল যমুনার। হ্যাঁ, এতক্ষনে তার মনে পড়েছে, প্রতিমাও তো মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে এমনই একটি বুড়িকে দেখে নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল! পরে এই কথা সে নিজে মুখেই বলেছিল গাঁয়ের অনেক মানুষকে!
—"কি রে দিবিনে আমাকে একটু খাবার? দেখ না রে মা, আমার পুষিটাও কত দিন কিছু খায়নি!", বলতে বলতে বুড়িটা তার যত কাছে আসতে লাগলো ততই একটা ঠান্ডা হওয়ার স্রোত যেন বয়ে যেতে লাগল যমুনার সর্ব শরীর জুড়ে। তার মানে কি এই বুড়িটাই যত নষ্টের গোড়া? এই শয়তানী কি কোন কালা জাদু জানে? এই বুড়িই কি কোন পিশাচ ডেকে এনেছে এই গ্রামে? ভাবতে ভাবতে ভয় চিৎকার করে উঠল যমুনা,
—"না…না…কাছে আসবে না তুমি! যাও, চলে যাও এখান থেকে…কোন খাবার নেই আমার কাছে…", এই কথা বলে সমস্ত কাপড় জামা সেখানেই ফেলে পড়ি কি মরি করে ছাদ থেকে নিচে নেমে এলো যমুনা, সশব্দে বুড়ির মুখের ওপর বন্ধ করে দিল ছাদের দরজা।
সেই স্থানে যদি আরো কিছুক্ষন থাকত যমুনা, তাহলে সে শুনতে পেত এরপরেই কেমন খিলখিল করে হেসে উঠেছিল বুড়িটি। সে উপলব্ধি করতে পারত যে এই হাসির পেছনে কোন আনন্দ বোধ নেই…আছে দীর্ঘশ্বাস, হতাশা এবং অভুক্ত থাকার বেদনা। সে দেখতে পেত কিভাবে ছাদের রেলিংএর কার্নিশ থেকে শূন্যে পা ফেলে হাটতে হাটতে একটা দমকা হাওয়ার ঝাপটার সাথেই ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়ে গেল বুড়িটার অবয়ব!
এর কিছুদিনের মধ্যেই সন্তানসম্ভবা হয়ে উঠেছিল যমুনা। এটা খুবই আনন্দের খবর হওয়া উচিত যে কোন পরিবারের কাছে, কিন্তু বর্তমার পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই স্থান পাচ্ছিল না যমুনা বা তার শ্বশুরের মনে। তাই তারা ছুটে গিয়েছিল গাঁয়ের এক ওঝার কাছে। তারপর বিশ্বনাথের মাস মাইনের প্রায় অর্ধেকটা সেই ওঝার পেছনে খসিয়ে যমুনা ধারণ করেছিল বেশ কিছু মাদুলি, তাবিজ, কবচ! প্রথমবার সন্তান জন্মাবার সময় গাঁয়ের মেয়ে বউরা সকলেই বাপের বাড়ি গিয়ে থাকে, কিন্তু যমুনা ছিল মাতৃ পিতৃহীন। সংসারের বোঝার মত সে মানুষ হয়েছিল মামা মামির পরিবারে, তাকে বিয়ে দিয়েই তারা সেই বোঝা জন্মের মত ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিল। তাই যমুনা রয়ে গেল এই গ্রামেই। গ্রামের সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারের দেওয়া তারিখ মত গৌতম তার বৌমাকে ভর্তি করিয়ে এসেছিল সেখানে। বিশ্বনাথের অফিস থেকে বেশি দিনের ছুটি পাওয়া মুশকিল, তাছাড়া কলকাতায় নিয়ে গিয়ে কোন প্রাইভেট হাসপাতালে স্ত্রীর চিকিৎসা করানোর সামর্থও তার নেই। তাই সব দায়িত্ব তার বৃদ্ধ বাবাকেই পালন করতে হচ্ছিল। এই অবস্থায় পোয়াতি বৌমাকে বাড়িতে রাখার বা কোন ধাইয়ের কাছে যাওয়ার রিস্ক নিতে চায়নি সে।
গ্রামের সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবস্থাও তথৈবচ। আসলে তেমন কোন মানুষ আসেই না এখানে, গ্রানের ধনীরা চিকিৎসা করায় শহরে গিয়ে, আর দরিদ্ররা চলে কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তারদের পেছনে। যমুনার প্রসবের দিন গোটা হাসপাতাল জুড়ে মাত্র একটিই ডাক্তার চিলেন, ডা: সামান্থা গোমস। কয়েক মাস হল তিনি বদলি হয়ে এখানে এসেছেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অবিবাহিতা এই মহিলাটি ডাক্তারি পড়া সত্ত্বেও ছিলেন ঘোরতর আস্তিক। তখনও প্রসব বেদনা ওঠেনি যমুনার। সামান্থা চাইছিলেন তার আগেই যমুনাকে অপারেট করে তার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে। এই কাজে একাই পারদর্শী এই অভিজ্ঞ ডাক্তারনিটি। যমুনাকে বেডে শুইয়ে তিনি তার গলায় একটি যীশু খ্রিস্টের ক্রুশের লকেট যুক্ত হার পরিয়ে দিয়েছিলেন, এবং বলেছিলেন,
—"আমি খুব ভালো করেই বুঝেছি এই গ্রামে যা ঘটেছে তা কোন মানুষ বা বন্য জন্তুর কারসাজি নয়…ইটস সাম কাইন্ড অফ অ্যান ইভিল স্পিরিট হু ইজ ডুইং অল দিজ!…কিন্ত আমি বুঝতে পারছি না সে কে!!"
একজন ডাক্তারের মুখে এই ধরণের কথা বেশ অস্বাভাবিক লাগছিল যমুনার, সে দেখেছিল স্বয়ং ডাক্তারনিটিও গলায় এমনই একটি হার পরে আছেন। ডা: সামান্থা বলেই চলেছিলেন,
—"তাই তোমার গলায় এই লকেটটি পরিয়ে দিলাম, মা…লেটস হোপ লর্ড জেসাস উইল প্রটেক্ট ইউ ফ্রম অল অড!"
ঠিক এমন সময় হঠাৎ করে একজন নার্স ছুটে এলো সেই ঘরের দরজার কাছে। তারপর সেই ঘরে না ঢুকেই সে হন্তদন্ত হয়ে বলে উঠল,
—"দিদিমণি…দিদিমণি, শিগগির চলুন দিদিমণি, এখুনই একজন বয়স্ক লোককে তার ছেলে এখানে এসে ভর্তি করিয়ে গিয়েছে। লোকটার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি তাকে ওই বারান্দার ওপারে তিন নম্বর রুমের বেডে রেখেছি। অক্সিজেন দিয়েছি। কিন্তু আপনি এখনই একবার না গেলেই যে নয়…"
যমুনার অপারেশন আর কিছুক্ষন পরে করলেও চলবে। তাই নার্সের কথা শুনে তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে সেই বয়স্ক লোকটিকে দেখতে গেলেন সামান্থা। কিন্তু তিনি ঠিকমত লক্ষ্যই করলেন না, যে ওই বয়স্ক লোকটির রুমে যাওয়ার সময় নার্সটি যেন সবসময় তার থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে চলছিল। নির্দিষ্ট ঘরে এসে ডা: সামান্থা এগিয়ে গেলেন বেডে শায়িত লোকটির দিকে, নার্সটি দাঁড়িয়ে রইল সেই ঘরের দরজার কাছেই। সামান্থা লোকটির কাছে গিয়ে তাকে একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই চমকে উঠলেন, এই ব্যক্তি তো আর বেঁচে নেই! এটা তো একটা ঠান্ডা লাশ! লোকটার মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে আরো হকচকিয়ে উঠলেন তিনি। আরে, এই লোকটাকে তো তিনি চিনতে পারছেন…কয়েকদিন আগে এই গাঁয়ের এক জঙ্গলে এই ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। সম্ভবত তিনি ওখানে কাঠ কাটতে ঢুকেছিলেন, তখনই তাকে সাপে কাটে। কয়েকজন গ্রামবাসী তাকে পৌঁছে দিয়ে যায় এখানে। কেউ ক্লেম করতে আসেনি বলে লাশটিকে কিছুদিন মর্গেই রাখার পরামর্শ দেন তিনি। তাহলে এই ব্যক্তির লাশ এখানে কি করছে? একটা লাশকে দেখার জন্য তাকে মিথ্যা কথা বলে এখানে নিয়ে আসলই বা কেন নার্সটি!! আর কিছু ভেবে ওঠার আগেই তার পেছন থেকে সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল ঘরের দরজা! সামান্থা ছুটে গিয়ে চিৎকার করে দরজায় কড়াঘাত করতে লাগলেন, কিন্তু সেই ঘরের বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়ানো নার্সটি কর্ণপাত করল না সেই শব্দে! কেমন অদ্ভুত ভাবে এক ঝটকায় যেন বেঁকে চুরে গেল নার্সটির শরীর, এবং অচৈতন্য নার্সটি সটান ধরাশায়ী হল মেঝের ওপর…দেখতে দেখতে একটা পুঞ্জীভূত কালো ধোঁয়ার তরঙ্গ যেন বেরিয়ে এলো তার নাক মুখ দিয়ে!
ডা: সামান্থার দেওয়া ক্রুশের লকেট যুক্ত হারটা গলায় পরে বিছানায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল যমুনা। এমন সময় সে দেখল হঠাৎ তার স্বামী বিশ্বনাথ হন্তদন্ত হয়ে সেই ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো।
—"তুমি!! তুমি যে বলেছিলে এখন অফিসে খুব কাজের চাপ তাই ছুটি পাবে না…", বিস্ময় তথা আবেগের সুর যমুনার গলায়।
—"হ্যাঁ বলেছিলাম তো…কিন্তু শেষ মেষ ম্যানেজার সাহেব আমার মুখের দিকে চেয়ে আমার ছুটি মঞ্জুর করলেন…আর আমিও সটান এখানে চলে এলাম, আসলে এই অবস্থায় তোমার পাশে না থাকতে পেরে আমিও যে শান্তি পাচ্ছিলাম না যমুনা…", অস্ফুট কণ্ঠে বলল বিশ্বনাথ। যমুনা মিষ্টি হেসে তাকে আরো কিছু বলতে চলেছিল, এমন সময় কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠল বিশ্বনাথের মুখ।
—"তুমি ওটা গলায় কি পড়েছ, যমুনা?"
—"এটা ডাক্তার দিদি আমায় পরিয়ে দিয়েছেন…বলেছেন যে এটা পরলে ঈশ্বর আমায় রক্ষা করবেন সকল অপশক্তির হাত থেকে…"
—"দেখো, তুমি যখন ওই ওঝার কাছ থেকে মাদুলি, তাবিজ বানিয়েছিলে তখন আমি কিচ্ছু বলিনি…কিন্তু ওটা আমি এক মুহূর্তের জন্যও বরদাস্ত করব না তোমার গলায়…তুমি জানো না, আমি কতটা ঘেন্না করি ওই ধর্মের মানুষদেরকে!…নেহাত আমার সামর্থ নেই তাই, নাহলে এই ডাক্তারনির কাছে তোমাকে না রেখে আমি অন্য কোথাও নিয়ে যেতাম…"
যমুনার মনে পড়ে গেল ফুলশয্যার রাতে তাকে বিশ্বনাথের বলা কয়েকটি কথা। শহরের কলেজে পড়া কালীন একটি খ্রিস্টান মেয়ের প্রেমে পড়েছিল বিশ্বনাথ। সে মেয়েটাকে এতটাই ভালোবেসে ছিল, যে তার জন্য নিজের ধর্মকেও বিসর্জন দিয়ে পরিকল্পনা করেছিল খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহন করার। কিন্তু শেষ মেষ মেয়েটি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, বিশ্বনাথের মত গরীব বাপের পুত্ৰকে পরিত্যাগ করে সে সাড়া দিয়েছিল অপর এক ধনীর দুলালের প্রণয় প্রস্তাবে। তারপর থেকেই এই ধর্মের মানুষদের একদম সহ্য করতে পারে না বিশ্বনাথ।
—"এতে এত রাগ করার কি আছে আপনার…ওই মেয়েটা আপনাকে ঠকিয়েছিল মানে এই নয় যে এই ধর্মের সকলেই…", যমুনার কথা শেষ না হতেই ক্রোধোন্মত্ত চিতাবাঘের মত বিশ্বনাথ চিৎকার করে উঠল,
—"আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না…তুমি এখনই ওটা খুলে ফেলে দাও নিজের গলা থেকে…আর যদি না করো, তাহলে সারা জীবনের জন্য তোমার আর তোমার বাচ্চার মুখ দর্শন করবো না আমি…"
এমন শারীরিক অবস্থায় স্বামীর এই রুদ্রমূর্তি দেখে এবং তার মুখে এমন ভয়ানক কথা শুনে আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না যমুনা। ডা: সামন্থার দেওয়া হারটা নিজের গলা থেকে একটানে ছিঁড়ে সে ছুঁড়ে ফেলে দিল ঘরের জানলার দিকে। লকেট সমেত হারটা ছিটকে গিয়ে পড়ল খোলা জানলার বাইরে। আর ঠিক তখনই সেই ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে তার কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল বিশ্বনাথ।
—"খিক খিক খিক খিক…", নিষ্পলক দৃষ্টিতে গর্ভবতী যমুনার পেটের দিয়ে চেয়ে কেমন একটা অদ্ভুত নারী সুলভ খ্যাসখ্যাসে স্বরে হেসে উঠল সে, আর কি যেন এক অজানা ভাষায় সে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
—"বাআনাআআ…চচুগুনুউউউ…ভ্যেএএএর…"
ডা: সামন্থার ক্রমাগত চিৎকার এবং কড়াঘাতের আওয়াজ অবশেষে পৌঁছলো এখানকার কিছু ওয়ার্ড বয়ের কানে। তারা সেই ঘরের দরজার বাইরে এসে সেই নার্সটিকে তখনও অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখল। তখনই তারা সেই ঘরের দরজা খুলে দিল। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন সামান্থা। আর তখনই এক নারী কণ্ঠের মুহুর্মুহু চিৎকার শুনে চমকে উঠল তারা সকলে। সামান্থা চিনতে পারলেন সেটা কার গলার আওয়াজ…যমুনার!! একবার নয়, বারবার অসহ্য মৃত্যু যন্ত্রনায় যেন চিৎকার করে চলেছে যমুনা! আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে তারা ছুটে চলল যমুনার ঘরের দিকে। হাসপাতালের সেই নির্দিষ্ট ঘরে এসে তারা দেখল ঘরের দরজা হা করে খোলা রয়েছে…সেই ঘরে ঢুকে যমুনার বেডের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কের চোটে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল তারা সকলে…কারণ সেই বিছানার ওপর শোয়ানো আছে যমুনার নিম্নাঙ্গ অনাবৃত রক্তাক্ত বীভৎস মৃতদেহটি! তার দেহে গাঁয়ের ভুয়ো ওঝার দেওয়া অজস্র নিষ্ক্রিয় মাদুলি কবচ থাকলেও, শুধু নেই সামান্থার দেওয়া প্রভু যীশুর প্রতীক সেই ক্রুশের লকেট সহ হারটি!…কেউ যেন তার দেহটাকে যোনি থেকে নাভীর ওপর অবধি প্রবল আক্রোশে চিরে দিয়েছে…আর তারপর টেনে হিচড়ে ছিঁড়ে বার করে নিয়ে গিয়েছে তার গর্ভের সন্তানটিকে!
***********
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন