একাদশ অধ্যায়

প্রলয় কুমার নাথ

সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)

স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম

ঠিক এই মুহূর্তে মন্তেশ্বরের জমিদার বাড়িতে নিজের শয়ন কক্ষের বিছানার উপর শুয়ে ছিল তৃণা। আজ তার চোখে ঘুম নেই। অনেক…অনেক কথা মনে পড়ছে তার…নিজের জীবনের প্রথম প্রেম বুরাকের কথা…যাকে হয়তো আর কোন দিন ফিরে পাবে না সে। ধীরে ধীরে তৃণার সুন্দর নিষ্পাপ মুখটা কঠোর আর নিষ্ঠুর হতে লাগল। তার মনে পড়তে লাগল বছর খানেক আগেকার কথাগুলো…

………………………………

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কালীন বুরাকের সাথে শুধু প্রেম নয়, আরো অনেক দূর অবধি এগিয়ে গিয়েছিল তৃণা। সে হয়েছিল সেই সুদর্শন বিদেশী ছেলেটির শয্যাসঙ্গিনীও। এরপরই নিজের শরীরের মধ্যে একটি নতুন প্রানের অস্তিত্বের কথা টের পেয়েছিল তৃণা। বুরাককে জানিয়ে ছিল সেই কথা, সেও সাগ্রহে তার সন্তানকে পিতৃপরিচয় দিতে চেয়েছিল। বিয়ে করতে চেয়েছিল তৃণাকে। একদিন এই সব কথা বাবাকে ফোনে জানিয়েছিল তৃণা। তিনি সেই মুহূর্তে মেনে নিয়েছিলেন তাদের সম্পর্ক, খুব আহ্লাদের সাথে মেয়ে এবং হবু জামাইকে তাদের পৈতৃক বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তৃণার বাবা, বরদাশঙ্কর বাবু। কিছুদিন তৃণা আর বুরাক খুব আনন্দে কাটিয়েছিল এই মন্তেশ্বর জমিদার বাড়িতে। যেহেতু তখনও তাদের বিয়ে হয়নি, তাই দুজনের শয়নকক্ষ আলাদা ছিল। একদিন রাতে ঘরের দরজায় টোকা পড়ার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেয় বুরাক। আর অমনি বাইরে থেকে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা কয়েকটি বলিষ্ঠ চেহারার লোকেরা ছুটে এসে বুরাকের মুখে একটা অদ্ভুত গন্ধওয়ালা রুমাল চেপে ধরে। নিমেষের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যায় বুরাক! সেই রাতের পর থেকে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল বুরাক। তাকে সব জায়গায় খুঁজেও কোথাও পেল না তৃণা। কেঁদে কেটে তখন তার বেহাল অবস্থা। এমন সময় একদিন সে বাবার ঘরে আড়ি পেতে শুনলো, তার বাবা আর জেঠামশাই উমাশঙ্কর বাবু খুব গোপনে নিজেদের মধ্যে কি সব কথাবার্তা বলছেন।

বরদাশঙ্কর : "কাজটা কি ঠিক হল দাদা?? হাজার হোক তৃণা আমার নিজের সন্তান, তার ভালোবাসাকে এভাবে রাতের অন্ধকারে লোক লাগিয়ে খুন করে নদীর চরে পুঁতে দেওয়া…"

উমাশঙ্কর : "মন শক্ত কর ভাই…তুই আমার কথায় ভালোমানুষ সেজে ওদের এখানে ডেকে, তারপর সুযোগ বুঝে ওই ছেলেটাকে হত্যা করে কোন ভুল করিসনি…নাহলে তুই নিজেই বল, তুই কি কখনো ওই ম্লেচ্ছ ভিন জাতের ছেলেটাকে এই বাড়ির জামাই হিসাবে মেনে নিতে পারতিস!"

বরদাশঙ্কর : "কিন্তু দাদা, যদি এই সব কথা জানাজানি হয়ে যায়, তখন যে আমাদের দুজনের জেল…"

উমাশঙ্কর : "আরে ছাড় তো, এই গাঁয়ের থানার বড় থেকে ছোট…সব বাবুরাই আমার টাকায় ফুর্তি করে, তাই ওই সব ভেবে সময় নষ্ট করিসনা। এখন শুধু ভাব…গাছটাকে তো কাটলি, তা তৃণার পেট থেকে ওই গাছের বীজটাকে কিভাবে উপড়ে ফেলবি!"

সেদিন ওই ঘরের বাইরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়েছিল তৃণা। অবিরত ধারায় ওর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। সে কখনো ভাবতেও পারেনি তার বাবা এবং জ্যাঠামশাই তার বিরুদ্ধে এতবড় ষড়যন্ত্র করবে। এরপর সত্যি অকথ্য অত্যাচার শুরু করা হল তৃণার ওপর। সে না চাইতেও তার বাবা এবং জেঠু তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালে, এবং বলপূর্বক তার গর্ভপাত করিয়ে এনেছিল তারা। সেদিন যখন বাড়ি থেকে গ্রামের রাস্তা দিয়ে ওরা জোর করে তৃণাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, তৃণা নিজের গর্ভের সন্তানটিকে বাঁচানোর জন্য বাবা আর জেঠুর পা ধরে কাকুতি মিনতি করে যাচ্ছিল…তখন গোটা গ্রাম সেটা দেখছিল! জমিদার বাড়ির সামনে গ্রামবাসীদের ভিড় জমে গিয়েছিল ওদের ঘিরে। সেখানে শুধু গ্রামের পুরুষরাই ছিল না, ছিল মহিলারাও। কেউ তো বাঁচাতে আসেইনি তৃণাকে…বরং সকলে যেন খুব উপভোগ করছিল তার লাঞ্ছনা।

—"আরে ঠিকই তো বলছে তোমার বাবা আর জেঠু…ওই ভিন দেশি অস্পৃশ্য ছেলেটার বাচ্চাকে নিজের গর্ভে ধারণ করে পরিবারের মুখে চুনকালি মাখিও না তুমি!", গাঁয়ের পুরুষেরা বলে উঠেছিল তাকে।

—"কি নির্লজ্জ বেহায়া মেয়ে দেখো দেখি! বিয়ে না করেই মা হতে চাইছে, তাও আবার ওই ম্লেচ্ছ ছেলেটার বাচ্চার! ছি ছি এই মেয়ের মরণ হওয়াই উচিত!", এই কথা শোনা গিয়েছিল গ্রামের মহিলাদের মুখে।

সকলে যেন আরো সমীহের দৃষ্টিতে দেখছিল উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্করের দিকে…সকলে যেন বুঝেছিল এই দুই জমিদার সন্তান তাদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখার জন্য যে কোন কাজই করতে পারেন!

এই দুই পুরুষের দেওয়া আদেশ মেনেই সীমন্তিনী বা জয়দীপকে এই ঘটনার কোন কথা জানায়নি এই বাড়ির বা গ্রামের কেউ, কারণ উমাশঙ্কর আর বরদাশঙ্করের মনে হয়েছিল, হয়তো এই কথা স্বাধীনচেতা জয়দীপ বা সীমন্তিনী জানলে পারলে তারা নিশ্চয় এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে উদ্যত হবে।

প্রেমিক এবং গর্ভের সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিল তৃণা। একদিন রাতে অন্ধকার ঘরে মধ্যে বিছানার পাশে দাঁড়ানো একটি ছায়ামূর্তিকে দেখে ধড়মড় করে উঠে পড়েছিল তৃণা। জানলার বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল সেই ছায়ামূর্তির গায়ে। তৃণা চমকে উঠেছিল দেখে যে তার সামনে করুণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং তার মৃত প্রেমিক, বুরাক। বুরাক হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল তৃণাকে। তাকে নিয়ে গিয়েছিল নিজের ঘরে, যেখানে মৃত্যুর আগের কিছুদিন কাটিয়েছিল বুরাক। সেই ঘরে খুলে রাখা ছিল একটি আঁকার ক্যানভাস…যেখানে আঁকা ছিল এক ভয়ঙ্কর পিশাচিনীর মূর্তি। যার শরীরের অর্ধেকটা কোন ভয়ালদর্শী নারীর, আর বাকি অর্ধেকটা সাপের! আর সেই ক্যানভাসের সামনেই রাখা ছিল একটি অতি প্রাচীন ঝুরঝুরে পাতা ওয়ালা ডায়েরি! (ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে তৃণা আর বুরাকের মধ্যে শুরু হয়েছিল কথাবার্তা, যা পাঠকদের সুবিধার্থে বাংলায় দেওয়া হল।)

নিজের কলঙ্কময় অতীতের এক একটা ঘটনার কথা তৃণাকে বলে চলেছিল বুরাকের প্রেতাত্মা যা সে জীবিত কালে তাকে জানাতে সঙ্কোচ বোধ করেছিল…সেই বুরাক, শৈশবে ডুমান যার নতুন নাম দিয়েছিল 'লেভেন্ত'!

সেদিন ডুমান আর এলিফকে তাদের কৃতকর্মের সাজা দিয়ে, সেই বাড়ি থেকে যথাসম্ভব অর্থ লুট করে সেই গ্রাম থেকে পালিয়ে যায় বুরাক, ওরফে লেভেন্ত। সাথে তার দিদার ডায়েরিটাও নিতে ভোলে না সে। সেখান থেকে ইস্তানবুলে পাড়ি দিয়ে একটি সহৃদয় নিঃসন্তান আমেরিকান দম্পতির গড়ে তোলা রেস্তোরাঁয় একটি কাজ জুটিয়ে ফেলে সে। কিন্তু ব্যবসা মন্দা হতে শুরু করলে, সেই দম্পতি তুরস্ক থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ইউ.এস.এতে ফিরে আসেন। ততদিনে তারা বুরাককে নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতে শুরু করেছেন। তাই অনেক চেষ্টা করে বুরাকের পাসপোর্ট এবং ভিসার ব্যবস্থা করে তাকেও সঙ্গে করে তারা নিয়ে আসেন ইউ.এস.এতে। সেখানে ফিরে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে বুরাক, ইংরাজি শেখে। আঁকার প্রতি তার ভালোবাসার দরুন তাকে সেই দম্পতি ভর্তি করে দেন একটি আর্ট কলেজে।

ক্যানভাসে আঁকা ছবিটার দিকে ইঙ্গিত করে বুরাকের প্রেতাত্মা বলে উঠল,

—"জানো তৃণা, দিদার ওই ডায়েরিটা থেকেই জানতে পেরেছিলাম এই female demon-টির সম্বন্ধে, যার নাম হল 'অ্যাবিজু' (Abyzou). মূলতঃ মেসোপটেমিয়া এবং সুমেরিও পুরাণে এই অপশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। বলা হয় এই বিশ্বের সৃষ্টির সময় সমুদ্রের জল থেকে হয় এই ডেমনের উৎপত্তি। মনে করা হয় এই অপশক্তি হল বন্ধ্যা, তাই সে গর্ভবতী মহিলাদের খুব ঈর্ষা করে। তাই এই ডেমনিক সত্তাকে ইনভোক করলে সে ছুটে আসে কোন গর্ভবতী মহিলার কাছে, ঠিক সেই সময় যখন সে প্রসব করতে চলেছে। সেই মহিলাকে মেরে, তার যোনি ছিঁড়ে বাচ্চাটিকে বার করে ভক্ষণ করে এই ডেমন। নিজের শিকারের চোখে ধুলো দিতে তার যে কোন চেনা জানা বা কাছের মানুষের রূপ ধরতে পারে এই অশরীরী, সেই নির্দিষ্ট ব্যাক্তিটির মত হাব ভাব বা আচার আচরণ করে সে চেষ্টা করে তার শিকারের সাথে ছলনা করতে! Testament of Solomon-এ বর্ণিত আছে যে এই অপশক্তির ভয় পায় Solomon বা Raphael এত মত শুভ শক্তিদের। সেই জন্য এই দানবীর হাত থেকে গর্ভবতী মা বা তাদের সন্তানদের রক্ষা করার জন্য তাদের শরীরে বেঁধে দেওয়া হয় এমন তাবিজ, যাতে খোদাই করা থাকে পেছনে হাত বাঁধা এবং হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় এই অপশক্তিকে চাবুক মারছেন Solomon/Raphael."

কিছুটা থেমে আবার আবার হিংস্র কণ্ঠে অশরীরী বুরাক বলে উঠল,

—"ঠিক যেমন তোমার পরিবার তোমার গর্ভের সন্তানটিকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিল, ঠিক যেমন সারা গাঁয়ের লোক তোমার যন্ত্রনা উপভোগ করল…তুমি কি চাও না তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে? তুমি কি চাও না, তুমি আজ নিজের সন্তানকে হারানোর যে জ্বালা ভোগ করলে সেটা তোমার পরিবারের, তোমার গ্রামের প্রতিটা মেয়ে ভোগ করুক?"

—"চাই…চাই, বুরাক…চাই, চাই…", চিৎকার করে উঠেছিল তৃণা।

—"তাহলে আমার দিদার লেখা এই ডায়েরিটা পড়ে তন্ত্র মতে এই ডেমনকে আহবান করতে হবে তোমায়!…এটা করলেই জানবে আজ থেকে এই গ্রাম 'অ্যাবিজু'-র দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে উঠবে…এই গ্রামের প্রসবরত প্রতিটা নারীকেই হত্যা করে তার সন্তানকে ভক্ষণ করবে এই ডেমন…আর এটা করার আগে সে ফিসফিসিয়ে তাদেরকে বলবে "বানা চচুগুনু ভ্যের!"…তুর্কি ভাষায় যার অর্থ হল 'তোমার সন্তানকে আমার হাতে তুলে দাও'"

তৃণা দেখল যে এতটা বলার পর বুরাকের অশরীরী ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে এই বাড়ির সেই ঘরটির দিকে যেখানে এই সময় মদ্যপান করতে ব্যস্ত উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্কর।

—"যাও বুরাক যাও…ওদের কাছ থেকেও সকল হিসেব নিকেশ সম্পূর্ণ করে এসো। তবে একেবারে প্রাণে মেরো না ওদের…ওদের যা বয়স তাতে ওরা দুদিন পরে এমনই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করবে। তাই তুমি ওদের এমন অবস্থা করো যাতে আজ থেকে ওরা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থেকে তিলে তিলে মৃত্যু মুখে পতিত হয়…", অশরীরী বুরাকের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠেছিল প্রতিশোধ কামী তৃণা।

এরপর কয়েকদিন ধরে বুরাকের দিদার ডায়েরিটা পড়ে 'অ্যাবিজু'কে আহবান করার সকল প্রক্রিয়া কণ্ঠস্থ করেছিল তৃণা। জীর্ণ পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া সেই ডায়েরির পাতায় গোটা গোটা ইংরাজি হরফে লেখা ছিল সব কিছু। এরপর যখন বাড়ির সবাই উমাশঙ্কর এবং বরদাশঙ্করকে নিয়ে ব্যস্ত, তৃণা গোপনে বিক্রি করে এসেছিল তার কিছু গহনা। সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছুটা দিয়ে সে জোগাড় করেছিল 'অ্যাবিজু'কে ডাকার সকল সরঞ্জাম। একজন ডোমকে দিয়ে নদীর চরের মাটি খুঁড়ে বুরাকের পচা গলা লাশটা বার করিয়েছিল সে। এক শনিবারের অমাবস্যার রাতে শ্মশানের একটি নির্জন স্থানে একটি কুঁড়েঘরের মধ্যে সে শুরু করেছিল গুপ্ত তন্ত্র সাধনা! সেই ঘরের মেঝের ওপর আঁকা ছিল একটি বৃত্তের মাঝে পাঁচ-মুখী তারা চিহ্ন। একে বলে 'Pentagram' এই তারা চিহ্নের পাঁচটি কোণ যে পয়েন্টগুলোতে বৃত্তের সাথে ঠেকেছে, সেই স্থানেগুলোতে প্রজ্বলিত করা ছিল পাঁচটা সবুজ রঙের মোমবাতি।

বেশির ভাগ ডেমনিক সত্তার কিছু নির্দিষ্ট সাঙ্কেতিক চিহ্ন থাকে যাকে বলা হয় ‘সিজিল’ (Sigil). 'অ্যাবিজু'র সিজিল হিসাবে কেউ পতঙ্গের ছবি ব্যাবহার করেন (কারণ অনেকে মনে করেন এই ডেমনটি পতঙ্গের রূপ ধারন করতে সক্ষম), আবার কেউ ‘আজ-জাহি’ (Az Jahi) নামক অপর এক জরথুস্ট্রিয়ান অপদেবীর সিজিলও ব্যাবহার করেন। সেটাই কাগজে লাল কালি দিয়ে এঁকে রাখা ছিল পেন্টাগ্রামের তারার মাঝে। একটা অদ্ভুত ধূপের গন্ধে ভরে গিয়েছিল সেই ঘরের বাতাস। Pentagram এর একপাশে রাখা ছিল ক্যানভাসে আঁকা 'অ্যাবিজু'র ছবি এবং অন্যপাশে রাখা ছিল বুরাকের পচাগলা লাশটা।

দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসে, সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে, এক মনে Lucifer নামক অপর এক অপশক্তিকে প্রথমে ডেকে যাচ্ছিল তৃণা। হঠাৎ যেন তার মনে হল ঘরের মধ্যে তীব্র হাওয়ার আলোড়ন শুরু হয়েছে, সেই ঝড়ের দাপটে কেঁপে উঠছে অন্ধকারের মাঝে পাঁচটি মোমবাতির শিখা। মন্ত্রচ্চারণ করতে করতেই তৃণার চোখ গেল বুরাকের মৃতদেহের দিকে। এই মুহূর্তে দুই চোখ খুলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে সেটা। সেই লাশের একটি চক্ষু গোলক আছে, অপরটির জায়গায় আছে শুধু মাত্র একটি কালো গর্ত! সেখান দিয়ে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসছে কৃমির ন্যায় কিছু পোকা! অদ্ভুত ভাবে কাঁপতে লাগল বুরাকের লাশটা, মুখ খুলল সে, তার কন্ঠ থেকে যেন অসংখ্য কাক একসাথে ডেকে উঠল এই রাতের অন্ধকারে। তৃণার মনে হল যেন একাধিক অস্পষ্ট কিছু নারীর ছায়ামূর্তি প্রবেশ করেছে এই ঘরে…এরা প্রত্যেকেই এক একটি মুন্ডহীন কবন্ধ! তারা গোল হয়ে ঘুরতে লাগল বুরাকের লাশটির চারিপাশে…তারপর তারা সকলেই উবু হয়ে বৃত্তাকারে বসল লাশটিকে ঘিরে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ডান হাতগুলি আগে বাড়ালো…সেগুলো প্রসারিত হয়ে পৌঁছলো বুরাকের পচা গলা পুরুষাঙ্গটির কাছে!…ভয়ঙ্কর এই পিশাচিনীরা যেন জাগাতে চেষ্টা করছে এক পিশাচের পুরুষত্বকে! তৃণা বুঝতে পারল এটাই উপযুক্ত সময় Lucifer এর সাথে সঙ্গম ক্রিয়ার, কারণ তার সামনেই বুরাকের লাশের পুরুষাঙ্গটি উত্থিত হয়ে উঠেছে!…সাহসে বুক বেঁধে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল লাশটির দিকে…দুর্গন্ধযুক্ত মৃতদেহের শরীরের ওপর বসে তার সাথে সহবাসে মেতে উঠল এই রজঃস্বলা উন্মাদিনী!…সঙ্গম শেষে ক্লান্ত তৃণা তার যোনি মুখ থেকে নির্গত লাশটির বীর্য এবং নিজের রক্তের মিশ্রণকে একটি মাটির পাত্রে রাখল। এবার শুরু হবে 'অ্যাবিজু'র সাধনা। একটা তীক্ষ্ণ ছুরি নিয়ে বুরাকের লাশটিকে টুকরো টুকরো করে কাটলো তৃণা। তারপর এক মনে বলে চলল 'অ্যাবিজু'কে আহ্বার করার মন্ত্রটি:

"Hail thou Abyzou, Daughter of Storm

Mistress of Chaos and the Abyss…"

বলতে বলতেই তার যেন মনে হল অন্ধকার ঘরের জানলা দিয়ে একটা সাপের মত কোন জন্তু ঢুকছে সেই ঘরের ভেতর। সর্পিল গতিতে সে যেন ধেয়ে আসছে ক্যানভাসে আঁকা ছবিটার কাছেই! কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই ক্যানভাসে আঁকা ছবিটারই যেন জীবন্ত এক প্রতিরূপ দাঁড়িয়ে রইল ঠিক সেটার পাশে। অর্ধেক সাপ অর্ধেক নারীর দেহ নিয়ে সেই অপমানবী ক্ষুধার্থ চোখে তাকিয়ে রইল তৃণার দিকে। মন্ত্র বলা চালু রাখল তৃণা…মন্ত্রটির এক একটি লাইন বলার সাথে সাথেই বুরাকের শরীরের এক একটি টুকরো নিজের যোনি থেকে নেওয়া ওই রক্ত আর বীর্যের মিশ্রনের সাথে ঠেকিয়ে সেটাকে ছুঁড়ে দিতে লাগল 'অ্যাবিজু'র হা করা মুখের দিকে…সেই দানবীর ক্ষুধা নিবারণ করার উদ্দেশ্যে!

"Whose very essence is darkness

Antaura, Thou Night Wind Goddess of the Hunt and

Devouring Kiss, Arise thou to me, Abyzou

Thou whose face is scaled and green like the

serpent,

Twisting and terror-filling to those who behold you

Abyzou, thou Goddess of Blood drinking

Hail thou rushing hag-demon, granting no rest,

nor giving kindly sleep.

It is the beauty of night and day,

whose head is that of a demon,

whose shape is as a whirlwind

Thou appearance is like the darkening heavens,

and its face as the deep shadow of the forest ...'

Hail Abyzou, arise to me Goddess..”

Hail thou Goddess, who like her mate

Coils like a snake,

roars like a lion,

hisses like a dragon"

সকলের শেষে বুরাকের কাটা মুন্ডুটাও তৃণা ছুঁড়ে দিলো 'অ্যাবিজু'র উদ্দেশ্যে। শেষ হল তার মন্ত্র উচ্চারণ। সেই পিশাচিনী যেন পোষা কুকুরের মত প্রসন্ন চিত্তে নিজের সর্পিল লেজ নাড়াতে নাড়াতে এগিয়ে এলো তৃণা দিকে। তৃণা জানে এখন সে জানতে চাইছে তৃণার ইচ্ছার কথা, যা সে আজীবন কাল ধরে পূরণ করে চলবে। তৃণা চিৎকার করে বলে উঠল:

"Manifest to me, Fulfill my Desire of…

Let every pregnant woman of this village be killed by you during their child birth, tear apart their womb, snatch out their babies and devour them, O Great Abyzou!"

তন্ত্র ক্রিয়া মিটে গেলে 'অ্যাবিজু'র ছবিটাকে তৃণা রেখে দিয়েছিল তার খাটের তলায় একটি গোপন সিন্দুকের মধ্যে। গয়না বেচার বাকি অর্থ দিয়ে সেদিন সে গুন্ডা লাগিয়েছিল জয়দীপ আর তৃণার গাড়ির পেছনে। তৃণার কথামত ওরা সীমন্তিনীকে অপহরণ করে রেখেছিল এই গ্রামেরই শেষ প্রান্তে অবস্থিত একটি বিশাল বড় পরিত্যক্ত বাড়ির তলায় চোরা কুঠুরিতে। এই বাড়িটি আগে একটি ধনী ব্যবসায়ীর ছিল, তবে এখন সেটা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত। এই বাড়িটার খোঁজ তাকে ওই গুন্ডাগুলোই গোপনে দিয়েছিল। সেদিনকার ওই ঘটনার পর জয়দীপের জ্ঞান ফিরে আসে। দিনের পর দিন সে তন্ন তন্ন করে খোঁজে সীমন্তিনীকে, কিন্তু সে খুঁজে পায়নি তাকে। এই কটা মাসের পর স্ত্রীকে হারিয়ে অনেকটাই মানসিক ভারসাম্যহীনতার দিকে চলে যাচ্ছে জয়দীপ।

………………………………

এই সব ভাবতে ভাবতে খিল খিল করে হেসে ওঠে তৃণা….সন্তানের জন্ম দেওয়ার আগে সীমন্তিনীকে এই গ্রাম ছাড়তে কোন দিন দেবে না সে…'অ্যাবিজু'-র হাতে সীমন্তিনীও মরুক, তার সন্তানকেও ভক্ষণ করুক এই ডেমন, এমনটাই চায় তৃণা…আফটার অল, এই সীমন্তিনীই হল তার জেঠুর একমাত্র পুত্রবধূ…সেই জেঠু যার জন্য তাকে নিজের প্রেমিক এবং গর্ভের সন্তানকে হারাতে হয়েছে! সীমন্তিনী একই জাতের, ধর্মের এবং গোত্রের বলে তার সাথে জয়দীপের সম্পর্ক মেনে নিয়েছিল যে জেঠু…কিন্তু বুরাক ভিন দেশি, ভিন্ন জাতি ও ধর্মের বলে তাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছিল যে জেঠু…যে বোঝেনি ভালোবাসায় থাকে না কোন জাত, ধর্ম বা গোত্র!

*********

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%