প্রলয় কুমার নাথ
সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়ে)
স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম
জঙ্গলের মাঝে শিব মন্দিরটা বেশ বড়। মন্দিরে ঢুকতে গেলে একটা বেশ বড় বট গাছের নিচ দিয়ে যেতে হয়। গাছটার কত বছর বয়স তা কেউ জানে না, তাই ডাল পালা থেকে অসংখ্য ঝুড়ি নেমে এসেছে নিচে মাটির বুকে। কত অজানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে গাছটির নীচে। সীমন্তিনী দেখল যে গাছটির গোড়ার কাছে একটি লাল রঙের পাথর রয়েছে, আর তার ওপর বসানো রয়েছে একটি জল ভর্তি মাটির কুজো! বেশ অবাক হল সীমন্তিনী…এই স্থানে তো খুব একটা আসে না কেউ, তাহলে এই সব কে রেখেছে? তবুও বিষয়টিকে খুব একটা আমল না দিয়ে সে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রায় দশ বারোটা দেউল আছে এই মন্দির চত্বরে। প্রতিটির মধ্যেই একটি করে শিবলিঙ্গ আবর্জনার স্তুপের ন্যায় অবহেলায় পড়ে আছে। সকালের গ্রাম্য বাতাস বুকে ভরে নিয়ে জায়গাটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সীমন্তিনী। এই সকল দেউলের মধ্যে একটা বেশ বড় দেউল আছে। এর ভেতরে কোন শিবলিঙ্গ নেই, কি যেন কোন দেবীর পাথরের মূর্তি আছে। তবে এই মূর্তি তথা নির্দিষ্ট দেউলটির বেশিরভাগ অংশই অন্যান্য দেউলগুলোর থেকে একটু বেশিই ধংশপ্রায়, এবং এর আনাচে কানাচে এখনো অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ছাপ বর্তমান। তাই ওটা কোন ঠাকুরের মূর্তি তা বুঝতে পারল না সীমন্তিনী। তার মানে এখানেই কি হয়েছিল সেই ভয়ঙ্কর অগ্নিকান্ড? কথাটা ভেবেই শিউরে উঠল সীমন্তিনী। মন্দির থেকে ফিরতি পথে সেই বট গাছটার কাছে আসতেই একবার থমকে দাঁড়াল সীমন্তিনী। এখন আর গাছটির গোড়ার কাছে ওই লাল পাথর বা জলভর্তি কুজোটা নেই…এখন ওটার নীচে একটা বুড়ি বসে আছে!! পুরোনো ময়লা লাল পেড়ে শাড়ি গাছ কোমর করে পরে আছে সে, রোদে পোড়া কালো কুঞ্চিত তার মুখস্ত্রী, এবং জটা পাকানো সাদা চুলগুলো মৃদু মৃদু হাওয়ায় দুলছে। আর তার কোলে বসে আছে একটি কুচকুচে কালো বেড়াল। বুড়িকে দেখে একটু হলেও ভয়ে পিছিয়ে গেল সীমন্তিনী। কিন্তু ততক্ষণে বুড়ির চোখ গিয়েছে সীমন্তিনীর ওপর।
—"খিদে…বড্ড খিদে পেয়েছে রে মা…কতদিন কিছু খাইনি!", ঠান্ডা হিসহিসানো স্বরে বলে উঠলো বুড়িটি।
—"কিছু খেতে দে না রে মা…বড্ড খিদে পেয়েছে আমার…", এবার বুড়ির কণ্ঠস্বরটা বেশ কাতর মনে হল সীমন্তিনীর। তার মনে বুড়িটির প্রতি মায়া হল,
—"তুমি একটু অপেক্ষা করো জেঠিমা…আমি দেখি তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।"
সীমন্তিনীর কথা শুনে হাসিমুখে মাথা নাড়ল বুড়িটি। সীমন্তিনী গাঁয়ের বাজারের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল, তখন দোকানগুলো সবে খুলতে শুরু করেছে। একটি মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি দই, সন্দেশ কিনলো সে, আর একটি মুদিখানার দোকান থেকে কিনলো খই, আর ফলের দোকান থেকে কিনলো এক ছড়া কলা। সেই সময় তার কাছে পয়সা না থাকলেও সে জমিদার বাড়ির পুত্রবধূ, এই পরিচয় পেয়েই দোকানদাররা তাকে ধারে মাল বেচতে রাজি হয়ে গেল। তারপর সকল খাদ্যবস্তু নিয়ে ফিরে এল বুড়ির কাছে। দই, খই, সন্দেশ আর কলা একসাথে মেখে খুব তৃপ্তি সহকারে খেতে লাগল বুড়িটি, কিছুটা খাবার তার কোলে বসা কালো বেড়ালটাকেও খাওয়ালো। তার খাওয়া হলে সীমন্তিনী প্রশ্ন করল,
—"তোমার নাম কি গো জেঠিমা? কোথায় থাকো তুমি?"
—"বাপ মায়ে তো একখান গাল ভরা নাম দেচিল আমায়…দ্যাবছ্যানা…কিন্তু ওই নাম ধরে আমারে কেউ ডাকে না লো। সবাই আমারে বুড়ি বুড়ি করেই খেঁদিয়ে দেয় রে মা…", বলতে বলতে বুড়ির চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে বলতেই থাকল,
—"আর বাস তো আমার এই গাঁয়েই রে মা…সেই কোন ছোট বেলায় আমার বে হয়েচিল এই গাঁয়ে…আমার সোয়ামীর নাম ছ্যালো ছক্তিপাণি…সেই যে যুদ্ধু করতে গেলেন তিনি, একনো ফিরলেন নাকো!…পেটের ছেলেমেয়েরা একন আমায় লাথি ঝাঁটা মারে লো…", ময়লা শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছল বুড়ি।
এইবার বুঝতে পারল সীমন্তিনী। হয়তো এই মহিলার স্বামী আর্মিতে কাজ করত, সে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এখন ওর ছেলেমেয়েরাও ওকে আর দেখে না, তাই ওর এই অবস্থা। বুড়িটির প্রতি সমবেদনায় ভরে উঠল সীমন্তিনীর মন। সে মিষ্টি হেসে বুড়িকে বলল,
—"তুমি রোজ এখানেই বসে অপেক্ষা কোরো জেঠিমা, আমি তোমাকে খাবার দিয়ে যাবো।"
প্রত্যুত্তরে হাসল বুড়িটা, তারপর বলল,
—"না রে বাছা, রোজ কি আমার এক জায়গায় থাকা চলে…আমার যে হাজার কাজ আচে লো!" এই বলে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সীমন্তিনীর খুব কাছে…কেমন যেন একটা ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে বাতাস তার গা থেকে উড়ে এসে সীমন্তিনীর গায়ে লাগল। বুড়ির পোষা কালো বেড়ালটা তার কোল থেকে নীচে নেমে তার হলুদ চোখদুটি মেলে ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে লাগল সীমন্তিনীকে। বুড়িটি এবার ঈষৎ নিচু হয়ে সীমন্তিনীর পেটের কাছে মুখ নিয়ে গেল…তারপর আলতো করে হাত রাখল সীমন্তিনীর পেটে। একটা ঠান্ডা অপার্থিব স্পর্শ পেয়ে সীমন্তিনীর গোটা শরীরটা যেন কেঁপে উঠল। কেমন লোভী নিষ্পলক দৃষ্টিতে বুড়িটা সীমন্তিনীর পেটের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—"খুব তাড়াতাড়ি তোর মধ্যে নতুন প্রাণ আসতে হতে চলেচে রে, মা…খুব তাড়াতাড়ি!…তাই তোকে আর আমার কাছে আসতে হবে না লো…যেদিন তোর সন্তান এই পিতিবীর আলো দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে, সেদিন আমি নিজেই আসব তোর কাচে…আমি নিজেই আসবো রে, তৈরি থাকিস…হিহিহিহি!"
বুড়ির খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল সীমন্তিনীর। সে আর অপেক্ষা না করে ছুটে গিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরল। তাকে ওই ভাবে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে দেখে মৃণালিনী দেবী জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে। সীমন্তিনী তাকে সব কথা খুলে বলল। সব শুনে আবার গত রাতের মতই ভয়ের ফ্যাকাসে হয়ে উঠল মৃণালিনী দেবীর মুখটা। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
—"এ কি সর্বনাশ করলি তুই! তোকে কাল রাতে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, প্রতিমা সহ গাঁয়ের বেশ কিছু বউ ঝিরা নাকি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার আগে ওই বুড়ির দেখা পেয়েছিল। তাদের কাছেও নাকি একই ভাবে খাবার চেয়েছিল ওই বুড়ি। তবে তোর আগে কেউ ওকে খাবার দেয়নি!…শুধু কি তাই, শুনেছিলাম যেদিন ওই মন্দিরে আগুন লেগে যায়, সেই রাতে তোর শ্বশুর মশাইয়ের বাবা, শশাঙ্কশেখর রায়চৌধুরী নাকি বাড়ির ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মাথায় ছোট পেয়ে পাগল হয়ে যান। তিনিও নাকি মাঝে মাঝে সেই রাত্রে ওই বুড়ির দেখা পাওয়ার কথা বলতেন!!…আমার তো মনে হয়, ওই বুড়িটাই হল সেই ডাইনি! ওর জন্যই একে একে গ্রামের পোয়াতি বৌগুলোর ওই অবস্থা হয়েছে! আর তুই কিনা ওকেই খাবার দিয়ে আসলি!…হে ভগবান, এ কি করলি তুই!"
একটা অজানা আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল সীমন্তিনী। তার মানে কি ওই বুড়িটা কোন মানুষ নয়…ওই কি এইভাবে মায়ের গর্ভ থেকে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে!…তাহলে কে এই বুড়িটা? কিভাবে হবে এই রহস্যের সমাধান! ওর মনে পড়ল বুড়িটার বলা শেষ কথাগুলো,
—"যেদিন তোর সন্তান এই পিতিবীর আলো দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে, সেদিন আমি নিজেই আসব তোর কাচে…আমি নিজেই আসবো রে, তৈরি থাকিস…হিহিহিহি!"
………………………………
আজ জয়দীপ আর সীমন্তিনী কলকাতা ফিরে যাচ্ছে। ওদের বাড়ির গাড়িতে ইতিমধ্যেই সব মালপত্র গোছগাছ করে এনে রাখা হয়েছে। জমিদার বাড়ি থেকে স্টেশন গাড়িতে প্রায় ঘন্টা খানেকের পথ। এখন বেরিয়ে পড়লে মোটামুটি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার ট্রেনটা ওরা পেয়ে যাবে। আসলে ওদের অফিস থেকে নেওয়া ছুটির মেয়াদ কিন্তু এখনো শেষ হয়ে যায়নি, এছাড়া সীমন্তিনী আরো কিছুদিন থাকতেও চেয়েছিল এই গ্রামে, কিন্তু ওদের এখানে রাখতে কিছুতেই রাজি হলেন না জয়দীপের পরিবার। এর কারণ হল, গতকাল সকাল থেকেই শরীরটা বেশ খারাপ লাগছিল সীমন্তিনীর, মাথা ঘুরছিল, গা গোলাচ্ছিল। বেশ কয়েকবার বমিও হল, কিছু খেতেও ইচ্ছা করছিল না। গ্রামের এক ডাক্তারকে বাড়িতে ডেকে এনেছিল জয়দীপ, তিনি সীমন্তিনীকে চেক আপ করে জানিয়েছিলেন যে সে অন্তঃসত্ত্বা, এখন প্রায় দুই মাস চলছে। এই কথা শুনে যে কোন পরিবারেই খুশির বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু ওদের পরিবারে নেমে এসেছিল আতঙ্কের কালো মেঘ। মৃণালিনী দেবী তখনই জানিয়ে ছিলেন যে সীমন্তিনীকে আর একটা দিনও এই গ্রামে রাখা ঠিক হবে না। তাই আজকেই তারা গ্রামের মোহ কাটিয়ে ফিরে যেতে চলেছে কলকাতায়।
সন্ধ্যার অন্ধকারের মাঝে ওদের গাড়িটা চলছিল দুই পাশে জঙ্গলে ঘেরা পথ দিয়ে। ওদের বাড়ির ড্রাইভার ব্রতীনই গাড়িটা চালাচ্ছিল। এমন সময় ওরা দেখল রাস্তার মাঝে বেশ বড় কয়েকটা পাথরের টুকরো পরে আছে। ওগুলোকে না সরালে ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থামানোর পর জয়দীপ আর ব্রতীন গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা থেকে পাথরগুলো সরাতে গেল। আর ঠিক তখনই কয়েকজন কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোক ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলো আশেপাশের ঝোপঝাড়ের পেছন থেকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে লোহার রড। তারা চক্ষের নিমেষে ব্রতীন আর জয়দীপের মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করল। আতঙ্কিত সীমন্তিনী দেখল ওরা দুজনে চিৎকার করে নীচে পরে গেল। সীমন্তিনী গাড়ি থেকে নীচে নেমে পালাতে উদ্যত হল, কিন্তু পারল না। দুজন লোক ছুটে এলো ওর কাছে, তারপর কেমন যেন একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ মাখানো রুমাল চেপে ধরল সীমন্তিনীর নাকে মুখে…কিছুক্ষনের মধ্যেই জ্ঞান হারাল সীমন্তিনী।
………………………………
—"আহ…আহ…মাগো…আহ…"
প্রসব বেদনায় ছটফট করছিল সীমন্তিনী। সেদিন সন্ধ্যায় তাকে কারা অপহরণ করেছিল, এবং এই কয়েকটা মাস ধরে তাকে কোথায় আটকে রেখেছে শয়তানগুলো…এবং কেনই বা তারা করল এমন কাজ, তা কিছু জানেনা সীমন্তিনী। এত মাস ধরে একটা জেলখানার মত ছোট্ট খুপরি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে তাকে, যেখানে দিনের আলোর কোন দেখা পায়নি সীমন্তিনী। প্রতিদিন দুই বেলা করে কেউ না কেউ তাকে খাবার দিয়ে যায়, তাদেরকে চিৎকার করে সে বলেছে তাকে মুক্ত করতে, কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। এই অন্ধকূপের একধারে তার শোয়ার জায়গা, এবং অন্য ধারে ছোট্ট একটি শৌচাগার। সেখানে জলের ব্যবস্থা আছে। এই কয়েক মাস ধরে শুধু কেঁদেছে সীমন্তিনী, মরতে চেয়েও মরতে পারেনি নিজের গর্ভে থাকা সন্তানের কথা ভেবে। ধীরে ধীরে তার দেহে সন্তান সম্ভাবনার ছাপ প্রবল হয়েছে, আর আজ তার গর্ভে থাকা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে তৎপর।
ঠিক এমন সময় অন্ধকার ঘরের মধ্যে তীব্র বেগে হাওয়ার আলোরণের সৃষ্টি হল। সেই ঘূর্ণিঝড়ের ধূলিকণাগুলো যেন উড়ে এসে সৃষ্টি করল একটি অপার্থিব ছায়ামূর্তিকে…যার শরীরের সামনের অংশটা নারীর মত হলেও, পেছনের অংশটি সাপের মত। ঘরের মেঝের ওপর তার সবুজ তৈলাক্ত ত্বকের ঘর্ষণের ফলে খসখস শব্দ হতে লাগল। সর্পিল গতিতে সেই রাক্ষসী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল প্রসব বেদনায় কাতর সীমন্তিনীর দিকে…তার জ্বলন্ত চোখে ক্রুরতা, তার তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত আর লকলকে জিহ্বায় অপার লোভ এবং নিষ্ঠুরতা ঝলকে উঠছে…সে অনবরত ফিসফিস করে বলেই চলেছে,
—"বানাআআ চচুগুনুউউ ভ্যেএএর!"
যন্ত্রনা কাতর সীমন্তিনীর দুই পায়ের মাঝে চলে এসেছে সেই অশরীরী। এবার সে নিজের তীক্ষ্ণ নখ বিশিষ্ঠ কঙ্কালসার হাতের লম্বা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল সীমন্তিনীর যোনি পথের কাছে…আরো কাছে…
********
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন